চুয়াডাঙ্গায় ২০২৬ সালের সার ডিলার নিয়োগে চার উপজেলায় ৪৫টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদন জমা পড়েছে। এতে প্রতিটি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে প্রায় ১৪ জন আবেদনকারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এদিকে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং কৃত্রিম সংকট ও অনিয়ম ঠেকাতে দেশের ৬৪ জেলায় মনিটরিং সেল গঠন করেছে সরকার।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ১১টি ডিলারশিপের বিপরীতে ১৭৪টি আবেদন জমা পড়েছে। আলমডাঙ্গায় ১৬টি ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন ১৯৮ জন। দামুড়হুদায় ৯টি ডিলারশিপের বিপরীতে ১৬০টি এবং জীবননগরে ৯টি ডিলারশিপের জন্য ১১১টি আবেদন জমা পড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরল ইসলাম জানান, ২০২৬ সালের সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী ধাপে ধাপে আবেদন যাচাই-বাছাই করা হবে। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রাথমিকভাবে আবেদন যাচাই করে উপজেলা কমিটির কাছে পাঠাবে। উপজেলা কমিটি আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। পরে জেলা কমিটি প্রস্তাবিত প্রার্থীদের তথ্য পুনরায় যাচাই করে তিনজনের তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠাবে। কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ইউনিয়ন প্রতি একজনকে মনোনয়ন দেবে। এরপর সাত কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত নিয়োগ অনুমোদনের কথা রয়েছে।
নূরল ইসলাম বলেন, চুয়াডাঙ্গার ৪৫টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদন পড়েছে। নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা অনুসরণ করে যোগ্য প্রার্থীদেরই ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
এদিকে জাতীয় সংসদে সারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং কৃত্রিম সংকট ও অনিয়ম ঠেকাতে দেশের ৬৪ জেলায় মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি সেলে দুজন করে যুগ্মসচিব ও উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সেল তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সারের মোট চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সরকারি মজুত রয়েছে ৫১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরকারি মজুত প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি।
কৃষকদের প্রত্যাশা, চুয়াডাঙ্গায় সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বা অনিয়মের পরিবর্তে আবেদনকারীর গুদাম সুবিধা, আর্থিক সক্ষমতা, সার বাজারজাতকরণের অভিজ্ঞতা ও সততার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। একইসঙ্গে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে কৃষকের কাছে সারের সুষম সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং কৃত্রিম সংকট ও বাজারে অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য গত ১ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গা জেলার ৪৫টি সার ডিলারশিপের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ছিল আবেদনের শেষ দিন।
হুসাইন মালিক/এফএ
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় আগামীকাল মঙ্গলবার ঘোষণা করা হবে।।বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ সোমবার এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।যুক্তিতর্ক শেষ, ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির রায় যেকোনো দিনএই মামলার অন্য আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ। মামলার সব আসামিই পলাতক।মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যা–নির্যাতনের আদেশ, উসকানি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাজধানীর অদূরে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রাম। একদিকে ঘনবসতি, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা, বালুর মাঠ ও চরাঞ্চল। সন্ধ্যা নামলেই অনেকটা বদলে যায় এলাকার চিত্র। ফাঁকা জায়গায় মাদকসেবীদের আড্ডা, মাদক কেনাবেচা, কিশোরদের সংঘবদ্ধ চলাফেরা আর বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় বড়দেশী। সর্বশেষ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সেই আলোচনাই আবার সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় গ্রেফতার কয়েকজন কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলাকারীদের বেশিরভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে জড়িত। মাদকের ‘ওপেন সিক্রেট’ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বড়দেশী এলাকায় মাদক কেনাবেচা অনেকটাই প্রকাশ্য। বিশেষ করে নির্জন জায়গা, বালুর মাঠ ও বসতিপ্রবণ এলাকার বাইরে কিছু স্পটে মাদকসেবীদের আড্ডা চলে। কেউ কোনো প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হতে হয়। সরকার দলীয় কয়েকজন নেতার পশ্রয়ে চলে এসব মাদক স্পট। শুধু অভিযোগ নয়, বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বড়দেশী এলাকা থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালের জুনে বড়দেশী এলাকা থেকে গাঁজা ও হেরোইনসহ দুজনকে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়েছিল পুলিশ। এর আগে বড়দেশী পশ্চিমপাড়া এলাকা থেকে ২০ কেজি গাঁজাসহ একজনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও বড়দেশী পশ্চিমপাড়া থেকে বিপুল পরিমাণ হেরোইনসহ এক নারীকে গ্রেফতার করে। তবে এসব ‘নামমাত্র অভিযান’ বলছে কেউ কেউ। আরও পড়ুন আমিনবাজারে পুলিশের এসবি সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে বেশিরভাগ মানুষই মাদকের সংঙ্গে জড়িত। কেউ খায়, না হয় কেউ বিক্রি করে। পুলিশ প্রশাসন আগে থেকেই মাসোয়ারা নিয়ে নীরব থাকে।’ হত্যার পুরোনো ইতিহাস বড়দেশীর অপরাধচিত্র শুধু মাদককেন্দ্রিক নয়। এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাধিক হত্যাকাণ্ডের পুরোনো ইতিহাসও। জানা গেছে, ২০০৭ সালের ৩ মার্চ আমিনবাজার এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব-১১ এর উপসহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির ও কনস্টেবল ফুল মিয়া নিহত হন। এর কিছুদিন পর একই এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে পুলিশের উপপরিদর্শক মতিউর রহমান নিহত হন। এরপর আসে ২০১১ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনা। ১৭ জুলাই বড়দেশীর কেবলারচরে বেড়াতে যাওয়া ছয় ছাত্রকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং বড়দেশীর নাম জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ওই মামলায় ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। অর্থাৎ এক দশকেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারও শেষ পর্যন্ত বড় একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। কিন্তু এরপরও বড়দেশীর অপরাধের ইতিহাস থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালে বাবা-ছেলে হত্যাকাণ্ড, ২০২৬ সালে দেলোয়ার হোসেন হত্যা, শারমিন আক্তার লিজা হত্যা এবং সর্বশেষ এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ড— সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও একের পর এক হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান সর্বশেষ এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর বড়দেশীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে। র্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেফতারদের মধ্যে আপন ও জিহাদ অপরাধপ্রবণ এবং তারা ওই অঞ্চলের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। র্যাব আপনকে একটি গ্যাংয়ের দলনেতা ও মাদক সরবরাহকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। র্যাব-১০ এর অধিনায়ক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, পুলিশ হত্যার সঙ্গে জড়িতরা অধিকাংশ মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। আটকরা সরাসরি হত্যার মিশনে অংশ নেন। নির্জনতা কি অপরাধীদের সুযোগ দিচ্ছে? বড়দেশীর ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে। এলাকার কিছু অংশ তুলনামূলক নির্জন। ফাঁকা জায়গা, বালুর মাঠ ও চরাঞ্চলের কারণে সন্ধ্যার পর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এমন পরিবেশ মাদকসেবী, মাদক কারবারি কিংবা অন্যান্য অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যে এসেছে, দিনের বিভিন্ন সময়ও কিছু ফাঁকা জায়গায় মাদকসেবীদের আড্ডা দেখা যায়। আরও পড়ুন সাগর-রুনি হত্যা / বিচার চেয়ে রুনির ভাইয়ের আবেদন, যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর তবে অপরাধের জন্য শুধু ভৌগোলিক অবস্থানকে দায়ী করা যায় না। পুলিশের টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, মাদকবিরোধী অভিযান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার—সবকিছুর সমন্বিত চিত্র প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ কেন মুখ খুলতে ভয় পান? স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কথা বললে হামলা বা হয়রানির আশঙ্কা থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তিনি ও তার ছেলে আগে মারধরের শিকার হয়েছিলেন। এই ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু মাদক ব্যবসার প্রশ্ন নয়; বরং এলাকায় অপরাধীদের সামাজিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত, সেই প্রশ্নও সামনে আসে। আলতাব হত্যা কি সতর্কবার্তা? এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ড বড়দেশীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি গাড়ি পার্কিং ও অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে বিরোধের মধ্যে আলতাফ হোসেন সেখানে মধ্যস্থতা করতে যান। এরপর তিনি হামলার শিকার হন। তাকে ও তার ছেলেকে একটি পোশাক কারখানার ভেতরেও মারধর করা হয় বলে পুলিশ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। গুরুতর আহত আলতাব হাসপাতালে মারা যান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- হামলার সময় তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও হামলা থামেনি বলে র্যাবের বক্তব্যে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় এরই মধ্যে একাধিক ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছেন। র্যাবের দাবি, গ্রেফতারদের কয়েকজন কিশোর গ্যাং ও মাদক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এখন প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান বড়দেশীর অপরাধচিত্র বুঝতে হলে শুধু সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নয়, গত দুই দশকের পুলিশি নথি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোন বছরে কতটি হত্যা মামলা হয়েছে? কতজন নিহত হয়েছেন? কত মামলায় আসামি গ্রেফতার হয়েছে? কতটির চার্জশিট হয়েছে? কত মামলার বিচার শেষ হয়েছে? কতজন সাজা পেয়েছেন? আর কতজন খালাস পেয়েছেন? এর পাশাপাশি মাদক মামলার সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। গত পাঁচ বা দশ বছরে বড়দেশী এলাকায় কতটি মাদক মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেফতার হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা কী হয়েছে- সেই হিসাবও বের করা প্রয়োজন। আরও পড়ুন পুলিশকে প্রতিমন্ত্রী টুকু / মাদককারবারির তালিকা করেন, ব্যবস্থা নেওয়া হবে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে- বড়দেশীর সমস্যা কি শুধুই কয়েকজন অপরাধীর কারণে? নাকি দীর্ঘদিনের মাদক ব্যবসা, নির্জন পরিবেশ, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, স্থানীয় বিরোধ এবং দুর্বল নজরদারির সমন্বিত ফল? এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। বড়দেশীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাধিক হত্যাকাণ্ড, মাদক উদ্ধারের ঘটনা এবং কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অপরাধ হিসেবে দেখার পাশাপাশি এলাকাটির সামগ্রিক অপরাধপ্রবণতা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনার দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে বড়দেশীর সব বাসিন্দাকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। হাজারো সাধারণ মানুষ সেখানে বসবাস করেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। অপরাধ দমনে প্রয়োজন নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান, দৃশ্যমান পুলিশি টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর কারণ চিহ্নিত করা এবং মামলা দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা। যদিও সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, বড়দেশী গ্রামটিতে চলাচলের ব্যবস্থা নাজুক, তবুও গ্রামটিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখার পরিকল্পনা চলছে। আপরাধীদের চিহ্নিত ও ধরতে সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা চলছে। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, শুধু পুলিশ নয়, মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাংদের প্রতিহত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা বড়দেশীকে অপরাধমুক্ত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেব। এফএ
টাকা দাও, টাকা নাও। সেবা দাও, সেবা নাও। কিংবা আরও সরল করে বললে, টাকা দাও, সেবা নাও; সেবা দাও, টাকা নাও। যদি রাষ্ট্রের কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে অর্থ, পরিচয়, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার ব্যবহার বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্নটি আর ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, প্রশ্ন চলে যায় রাষ্ট্রের চরিত্রের দিকে। গণতন্ত্র আমাদের শেখায়, ক্ষমতার উৎস জনগণ। কিন্তু বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা যদি ক্রমাগত আমাদের বলে, ক্ষমতার কার্যকর উৎস অর্থ, প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে, টাকার উৎস কী? প্রশ্নটি আরও কঠিন হয় যখন বিষয়টি রাষ্ট্রীয় চাকরিতে নিয়োগের মতো একটি মৌলিক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। কারণ সরকারি চাকরি শুধু একটি চাকরি নয়। এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা। একজন তরুণ যখন বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, পরীক্ষা দেয় এবং একটি সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখে, তখন সে শুধু একটি পদ পাওয়ার জন্য লড়াই করে না, সে বিশ্বাস করে যে তার যোগ্যতার একটি মূল্য আছে, পরিশ্রমের একটি অর্থ আছে এবং রাষ্ট্র অন্তত এই জায়গাটিতে ন্যায়বিচার করবে। সেই বিশ্বাসে আঘাত লাগলে ক্ষতিটা একজন চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের পরীক্ষাপদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে, যদিও এখনো এটি গেজেট আকারে চূড়ান্ত হয়নি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১ ও ১২ গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হবে, অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাসের ন্যূনতম নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ১৩ থেকে ১৬ গ্রেডে লিখিত ও ভাইভার নম্বর হবে ৬০ ও ৪০, যেখানে বর্তমানে তা ৯০ ও ১০। আর ১৭ থেকে ২০ গ্রেডে লিখিত ও ভাইভা হবে ২৫ ও ২৫। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। শুধু “ভাইভার নম্বর ৪০০ শতাংশ বাড়ছে” বললেই পুরো ছবিটি দেখা হয় না। আসল পরিবর্তন হচ্ছে লিখিত পরীক্ষার তুলনামূলক গুরুত্ব কমে গিয়ে মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। আর এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে। এখানে চাঁদাবাজির কোনো সিন্ডিকেটের কারণেই ভাইভার নম্বর বাড়ানো হয়েছে, এমন অভিযোগ করা বা সেটিকে মূল প্রশ্ন বানানো উদ্দেশ্য নয়। মূল প্রশ্নটি আরও গভীরে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে, দুর্নীতি কোথায় ঢোকেনি? রাষ্ট্র ও সমাজের কত স্তরে দুর্নীতি আজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে, কত ধরনের দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, সেটি কি আমাদের অজানা? এমন বাস্তবতার মধ্যে সরকারি চাকরির নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ভাইভার নম্বর এক লাফে ৪০০ শতাংশ বাড়ানোর মতো একটি সিদ্ধান্তকে তাই শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? এটি আমাদের সময়ের একটি তরতাজা ও জ্বলন্ত উদাহরণ, যাকে কোনোভাবেই আড়াল করে রাখা যায় না। আরও একটি বাস্তবতার দিকে তাকানো যাক। জনগণের একটি অংশ যদি অর্থের বিনিময়ে ভোট বিক্রি করে এবং একজন নেতা অর্থ ব্যয় করে সেই ভোট কিনে ক্ষমতায় আসেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, ক্ষমতায় এসে সেই নেতা কি বসে আঙুল চুষবেন? আরও পড়ুন মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক নির্বাচনে যে বিপুল অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন, সেটি কি কোনোভাবে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না? যদি রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিনিয়োগে পরিণত হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার পথও তৈরি হয়। আর সেখান থেকেই শুরু হতে পারে ক্ষমতা, অর্থ, প্রভাব ও দুর্নীতির একটি পরস্পরনির্ভর চক্র। তাই প্রশ্নটি শুধু কে কত টাকা নিল বা কোন সিন্ডিকেট কোথায় কাজ করছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে টাকা দিয়ে ভোট কেনা যায়, ভোট দিয়ে ক্ষমতা কেনা যায় এবং ক্ষমতায় গিয়ে সেই অর্থ ও প্রভাব পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করা যায়? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে দুর্নীতি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নানা স্বার্থগোষ্ঠী ও সিন্ডিকেট। সেই বাস্তবতার আলোতেই ভাইভার নম্বর ৪০০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে দেখতে হবে। কারণ একটি রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থায় যেখানে ব্যক্তিনির্ভর মূল্যায়নের সুযোগ বাড়ছে, সেখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এই অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর নিশ্চয়তা কোথায়? সরকারের বক্তব্যও শুনতে হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হলো, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মতো অনিয়ম ঠেকানো এবং প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার জন্য পরীক্ষার কাঠামো পরিবর্তন প্রয়োজন। জনপ্রশাসন সচিবও বলেছেন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। যুক্তিটি যদি সত্যিই সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে সেটি অবশ্যই বিবেচনার যোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অনিয়ম ঠেকাতে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে ভাইভার গুরুত্ব বাড়ানোই কি সবচেয়ে নিরাপদ পথ? লিখিত পরীক্ষা অন্তত একটি তুলনামূলকভাবে পরিমাপযোগ্য ব্যবস্থা। সেখানে একই প্রশ্ন, একই সময় এবং একই মূল্যায়ন কাঠামোর মধ্যে অনেক প্রার্থীকে বিচার করা সম্ভব। কিন্তু ভাইভা অনেক বেশি ব্যক্তিনির্ভর। বোর্ডের সদস্যদের মূল্যায়ন, প্রশ্ন করার ধরন, উত্তর গ্রহণের মানদণ্ড এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মতো বিষয় সেখানে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভাইভার নম্বর যত বাড়ে, ব্যক্তিগত বিবেচনার সম্ভাব্য প্রভাবও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই কারণেই সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসনবিষয়ক গবেষক আব্দুল আওয়াল মজুমদার বলেছেন, ১০ নম্বরের ভাইভাই যথেষ্ট, সর্বোচ্চ ২০ পর্যন্ত হতে পারে; তার আশঙ্কা, ভাইভার নম্বর বাড়ালে নিয়োগের জটিলতা আরও বাড়তে পারে এবং এটি সুশাসনের পরিপন্থি হতে পারে। এখন আসি সেই প্রশ্নে, যেটি হয়তো সবচেয়ে অস্বস্তিকর। ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সঙ্গে কি টাকা লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি বা নিয়োগ-বাণিজ্যের কোনো সম্পর্ক আছে? এখানে সততার জায়গাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে নেই যে এই প্রস্তাব টাকা নিয়ে চাকরি দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তাই প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ করা দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে নিয়োগ ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। সুতরাং প্রশ্নটি অভিযোগ নয়, প্রশ্নটি হওয়া উচিত ঝুঁকি নিয়ে। যে ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, সেই ব্যবস্থায় লিখিত পরীক্ষার তুলনামূলক গুরুত্ব কমিয়ে ভাইভার গুরুত্ব কয়েক গুণ বাড়ানো হলে, দুর্নীতির সম্ভাব্য দরজা কি আরও বড় হয় না? রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের একটি নিয়োগ পরীক্ষায় শুধু একজন প্রার্থী নির্বাচিত হয় না, রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ কর্মচারী নির্বাচন করে। আজ যে তরুণ যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পেল না, তার মনে যদি জন্ম নেয় যে “যোগ্যতা নয়, অন্য কিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ”, তাহলে সেই হতাশা আগামী দিনের রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থাকেও দুর্বল করবে। আমরা অতীতে কোটা নিয়ে বড় আন্দোলন দেখেছি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ দেখেছি। বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন, অনেকে দেশ ছেড়েছেন, অসংখ্য পরিবার সেই সময়ের অভিঘাত বহন করেছে। সেই অভিজ্ঞতার পর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল, নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি না করা, যেন নতুন করে বৈষম্য বা পক্ষপাতের সন্দেহ জন্ম নেয়। কোটা যদি বৈষম্যের প্রতীক হয়ে থাকে, তাহলে অস্বচ্ছ ভাইভা-নির্ভর নিয়োগও যেন আরেক ধরনের বৈষম্যের দরজা না হয়। এখানে আরও একটি বিষয় ভাবতে হবে। বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে। সরকারি চাকরি তাদের কাছে শুধু পেশা নয়, সামাজিক নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার প্রতীক। সেই জায়গায় যদি পরীক্ষার কাঠামো নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই সরকারের কাছে দাবি হওয়া উচিত না যে, “ভাইভার নম্বর বাড়ানো মানেই দুর্নীতি।” সেটি প্রমাণ ছাড়া বলা ঠিক হবে না। বরং দাবি হওয়া উচিত, যদি ভাইভার নম্বর বাড়াতেই হয়, তাহলে এমন স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা কোথায়, যা নিশ্চিত করবে যে একজন বোর্ড সদস্য নিজের ইচ্ছামতো কোনো প্রার্থীকে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারবেন না? ভাইভার প্রতিটি নম্বরের কারণ কি লিখিতভাবে সংরক্ষিত হবে? বোর্ডের সদস্যদের মূল্যায়ন কি পরবর্তীতে অডিট করা যাবে?ভাইভা কি রেকর্ড করা হবে? একজন প্রার্থী কেন ৪৫ পেলেন এবং অন্যজন কেন ২৫ পেলেন, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা কি থাকবে? বোর্ডের সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত কীভাবে যাচাই হবে? নিয়োগের ফল প্রকাশের পর অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা থাকবে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু “মেধাভিত্তিক নিয়োগ” বললে জনগণের সন্দেহ দূর হবে না। কারণ রাষ্ট্রে আস্থা শুধু ভালো কথা দিয়ে তৈরি হয় না, ভালো ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি হয়। আর এখানেই ফিরে আসে সেই পুরোনো প্রশ্ন, ক্ষমতার উৎস জনগণ, নাকি টাকা? গণতন্ত্রের কাগজে ক্ষমতার উৎস জনগণ। কিন্তু যদি সমাজে ধীরে ধীরে এমন সংস্কৃতি তৈরি হয় যেখানে টাকা দিয়ে সুযোগ কেনা যায়, পরিচয় দিয়ে দরজা খোলা যায়, ক্ষমতা দিয়ে নিয়ম বদলানো যায়, তাহলে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকলেও তার ভেতরের নৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন “টাকা দাও, সেবা নাও” শুধু বাজারের ভাষা থাকে না, রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরেও তার ছায়া পড়তে শুরু করে। এখানেই নেতৃত্বের প্রশ্নটি আসে। একটি জাতি যেমন, তার নেতৃত্বও অনেকাংশে তেমন। আবার নেতৃত্ব যেমন, প্রতিষ্ঠানও ধীরে ধীরে তেমন হয়ে ওঠে। সমাজে যদি সততার মূল্য কমে যায়, নেতৃত্ব যদি স্বচ্ছতার বদলে সুবিধাবাদকে পুরস্কৃত করে, প্রতিষ্ঠান যদি জবাবদিহির বদলে প্রভাবকে ভয় পায়, তাহলে সাধারণ মানুষও একসময় সেই সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে। আমগাছের তলায় আমই পড়ে। আপনি আমগাছ লাগিয়ে কাঁঠাল আশা করতে পারেন না। একইভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অস্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থের প্রভাব এবং জবাবদিহির অভাব রেখে একটি শক্তিশালী, সৎ ও দক্ষ রাষ্ট্র আশা করা কঠিন। তাই আজকের প্রশ্ন শুধু ভাইভার নম্বর ১০, ২৫, ৪০ না ৫০ হবে কি না, সেই প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন বাংলাদেশ তৈরি করতে চাই? এমন বাংলাদেশ, যেখানে একজন তরুণ তার মেধা, পরিশ্রম ও সততার ওপর আস্থা রেখে পরীক্ষার হলে বসবে? নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে পরীক্ষার আগে তাকে ভাবতে হবে, “আমি কত নম্বর পাব?”-এর চেয়ে “আমার পেছনে কে আছে?” প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি না? রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা আর কী হতে পারে? যদি সত্যিই মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে নিয়োগের প্রতিটি দরজা হতে হবে স্বচ্ছ, প্রতিটি মূল্যায়ন হতে হবে যাচাইযোগ্য এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে হবে যুক্তি ও জবাবদিহি। কারণ একটি চাকরি হারানো একজন তরুণের ব্যক্তিগত পরাজয় হতে পারে। কিন্তু একটি নিয়োগব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানো একটি প্রজন্মের পরাজয়। বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত শুধু সরকার নেবে না। আমরা সবাই নেব। তবে পথ দেখানোর দায়িত্ব নেতৃত্বের। আর নেতৃত্ব যদি সত্যিই জনগণের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়ে থাকে, তাহলে জনগণের কাছে তার সবচেয়ে বড় ঋণ একটাই, যোগ্যতার কাছে ক্ষমতাকে, সততার কাছে অর্থকে এবং ন্যায়ের কাছে স্বার্থকে পরাজিত করা। নইলে প্রশ্নটি থেকেই যাবে, ক্ষমতার উৎস জনগণ বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার দরজা খুলতে যদি টাকা লাগে, তাহলে সেই টাকার উৎস কোথায়? আর উত্তর খুঁজতে গেলে হয়তো আমাদের শেষ পর্যন্ত নিজের সমাজের দিকেই তাকাতে হবে।কারণ আমগাছের তলায় আমই পড়ে। রহমান মৃধাগবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com এমআরএম