টাকা দাও, টাকা নাও। সেবা দাও, সেবা নাও। কিংবা আরও সরল করে বললে, টাকা দাও, সেবা নাও; সেবা দাও, টাকা নাও। যদি রাষ্ট্রের কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে অর্থ, পরিচয়, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার ব্যবহার বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্নটি আর ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, প্রশ্ন চলে যায় রাষ্ট্রের চরিত্রের দিকে।
গণতন্ত্র আমাদের শেখায়, ক্ষমতার উৎস জনগণ। কিন্তু বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা যদি ক্রমাগত আমাদের বলে, ক্ষমতার কার্যকর উৎস অর্থ, প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতা, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে, টাকার উৎস কী?
প্রশ্নটি আরও কঠিন হয় যখন বিষয়টি রাষ্ট্রীয় চাকরিতে নিয়োগের মতো একটি মৌলিক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। কারণ সরকারি চাকরি শুধু একটি চাকরি নয়। এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা। একজন তরুণ যখন বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, পরীক্ষা দেয় এবং একটি সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখে, তখন সে শুধু একটি পদ পাওয়ার জন্য লড়াই করে না, সে বিশ্বাস করে যে তার যোগ্যতার একটি মূল্য আছে, পরিশ্রমের একটি অর্থ আছে এবং রাষ্ট্র অন্তত এই জায়গাটিতে ন্যায়বিচার করবে।
সেই বিশ্বাসে আঘাত লাগলে ক্ষতিটা একজন চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের পরীক্ষাপদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে, যদিও এখনো এটি গেজেট আকারে চূড়ান্ত হয়নি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১ ও ১২ গ্রেডে ভাইভার নম্বর ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হবে, অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাসের ন্যূনতম নম্বর ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ১৩ থেকে ১৬ গ্রেডে লিখিত ও ভাইভার নম্বর হবে ৬০ ও ৪০, যেখানে বর্তমানে তা ৯০ ও ১০। আর ১৭ থেকে ২০ গ্রেডে লিখিত ও ভাইভা হবে ২৫ ও ২৫।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। শুধু “ভাইভার নম্বর ৪০০ শতাংশ বাড়ছে” বললেই পুরো ছবিটি দেখা হয় না। আসল পরিবর্তন হচ্ছে লিখিত পরীক্ষার তুলনামূলক গুরুত্ব কমে গিয়ে মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। আর এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে।
এখানে চাঁদাবাজির কোনো সিন্ডিকেটের কারণেই ভাইভার নম্বর বাড়ানো হয়েছে, এমন অভিযোগ করা বা সেটিকে মূল প্রশ্ন বানানো উদ্দেশ্য নয়। মূল প্রশ্নটি আরও গভীরে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে, দুর্নীতি কোথায় ঢোকেনি? রাষ্ট্র ও সমাজের কত স্তরে দুর্নীতি আজ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে, কত ধরনের দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, সেটি কি আমাদের অজানা?
এমন বাস্তবতার মধ্যে সরকারি চাকরির নিয়োগে লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ভাইভার নম্বর এক লাফে ৪০০ শতাংশ বাড়ানোর মতো একটি সিদ্ধান্তকে তাই শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? এটি আমাদের সময়ের একটি তরতাজা ও জ্বলন্ত উদাহরণ, যাকে কোনোভাবেই আড়াল করে রাখা যায় না।
আরও একটি বাস্তবতার দিকে তাকানো যাক। জনগণের একটি অংশ যদি অর্থের বিনিময়ে ভোট বিক্রি করে এবং একজন নেতা অর্থ ব্যয় করে সেই ভোট কিনে ক্ষমতায় আসেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, ক্ষমতায় এসে সেই নেতা কি বসে আঙুল চুষবেন?

নির্বাচনে যে বিপুল অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন, সেটি কি কোনোভাবে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না? যদি রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিনিয়োগে পরিণত হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার পথও তৈরি হয়। আর সেখান থেকেই শুরু হতে পারে ক্ষমতা, অর্থ, প্রভাব ও দুর্নীতির একটি পরস্পরনির্ভর চক্র।
তাই প্রশ্নটি শুধু কে কত টাকা নিল বা কোন সিন্ডিকেট কোথায় কাজ করছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে টাকা দিয়ে ভোট কেনা যায়, ভোট দিয়ে ক্ষমতা কেনা যায় এবং ক্ষমতায় গিয়ে সেই অর্থ ও প্রভাব পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করা যায়?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে দুর্নীতি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নানা স্বার্থগোষ্ঠী ও সিন্ডিকেট।
সেই বাস্তবতার আলোতেই ভাইভার নম্বর ৪০০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে দেখতে হবে। কারণ একটি রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থায় যেখানে ব্যক্তিনির্ভর মূল্যায়নের সুযোগ বাড়ছে, সেখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এই অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর নিশ্চয়তা কোথায়?
সরকারের বক্তব্যও শুনতে হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হলো, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের মতো অনিয়ম ঠেকানো এবং প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার জন্য পরীক্ষার কাঠামো পরিবর্তন প্রয়োজন। জনপ্রশাসন সচিবও বলেছেন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
যুক্তিটি যদি সত্যিই সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে সেটি অবশ্যই বিবেচনার যোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অনিয়ম ঠেকাতে লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে ভাইভার গুরুত্ব বাড়ানোই কি সবচেয়ে নিরাপদ পথ?
লিখিত পরীক্ষা অন্তত একটি তুলনামূলকভাবে পরিমাপযোগ্য ব্যবস্থা। সেখানে একই প্রশ্ন, একই সময় এবং একই মূল্যায়ন কাঠামোর মধ্যে অনেক প্রার্থীকে বিচার করা সম্ভব। কিন্তু ভাইভা অনেক বেশি ব্যক্তিনির্ভর। বোর্ডের সদস্যদের মূল্যায়ন, প্রশ্ন করার ধরন, উত্তর গ্রহণের মানদণ্ড এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মতো বিষয় সেখানে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভাইভার নম্বর যত বাড়ে, ব্যক্তিগত বিবেচনার সম্ভাব্য প্রভাবও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসনবিষয়ক গবেষক আব্দুল আওয়াল মজুমদার বলেছেন, ১০ নম্বরের ভাইভাই যথেষ্ট, সর্বোচ্চ ২০ পর্যন্ত হতে পারে; তার আশঙ্কা, ভাইভার নম্বর বাড়ালে নিয়োগের জটিলতা আরও বাড়তে পারে এবং এটি সুশাসনের পরিপন্থি হতে পারে।
এখন আসি সেই প্রশ্নে, যেটি হয়তো সবচেয়ে অস্বস্তিকর। ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সঙ্গে কি টাকা লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি বা নিয়োগ-বাণিজ্যের কোনো সম্পর্ক আছে?
এখানে সততার জায়গাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে নেই যে এই প্রস্তাব টাকা নিয়ে চাকরি দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তাই প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ করা দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে নিয়োগ ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে।
সুতরাং প্রশ্নটি অভিযোগ নয়, প্রশ্নটি হওয়া উচিত ঝুঁকি নিয়ে। যে ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, সেই ব্যবস্থায় লিখিত পরীক্ষার তুলনামূলক গুরুত্ব কমিয়ে ভাইভার গুরুত্ব কয়েক গুণ বাড়ানো হলে, দুর্নীতির সম্ভাব্য দরজা কি আরও বড় হয় না?
রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের একটি নিয়োগ পরীক্ষায় শুধু একজন প্রার্থী নির্বাচিত হয় না, রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ কর্মচারী নির্বাচন করে। আজ যে তরুণ যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পেল না, তার মনে যদি জন্ম নেয় যে “যোগ্যতা নয়, অন্য কিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ”, তাহলে সেই হতাশা আগামী দিনের রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থাকেও দুর্বল করবে।
আমরা অতীতে কোটা নিয়ে বড় আন্দোলন দেখেছি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ দেখেছি। বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন, অনেকে দেশ ছেড়েছেন, অসংখ্য পরিবার সেই সময়ের অভিঘাত বহন করেছে। সেই অভিজ্ঞতার পর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল, নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি না করা, যেন নতুন করে বৈষম্য বা পক্ষপাতের সন্দেহ জন্ম নেয়।
কোটা যদি বৈষম্যের প্রতীক হয়ে থাকে, তাহলে অস্বচ্ছ ভাইভা-নির্ভর নিয়োগও যেন আরেক ধরনের বৈষম্যের দরজা না হয়।
এখানে আরও একটি বিষয় ভাবতে হবে। বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে। সরকারি চাকরি তাদের কাছে শুধু পেশা নয়, সামাজিক নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার প্রতীক। সেই জায়গায় যদি পরীক্ষার কাঠামো নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
তাই সরকারের কাছে দাবি হওয়া উচিত না যে, “ভাইভার নম্বর বাড়ানো মানেই দুর্নীতি।” সেটি প্রমাণ ছাড়া বলা ঠিক হবে না। বরং দাবি হওয়া উচিত, যদি ভাইভার নম্বর বাড়াতেই হয়, তাহলে এমন স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা কোথায়, যা নিশ্চিত করবে যে একজন বোর্ড সদস্য নিজের ইচ্ছামতো কোনো প্রার্থীকে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারবেন না?
ভাইভার প্রতিটি নম্বরের কারণ কি লিখিতভাবে সংরক্ষিত হবে? বোর্ডের সদস্যদের মূল্যায়ন কি পরবর্তীতে অডিট করা যাবে?ভাইভা কি রেকর্ড করা হবে? একজন প্রার্থী কেন ৪৫ পেলেন এবং অন্যজন কেন ২৫ পেলেন, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা কি থাকবে?
বোর্ডের সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত কীভাবে যাচাই হবে? নিয়োগের ফল প্রকাশের পর অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা থাকবে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু “মেধাভিত্তিক নিয়োগ” বললে জনগণের সন্দেহ দূর হবে না। কারণ রাষ্ট্রে আস্থা শুধু ভালো কথা দিয়ে তৈরি হয় না, ভালো ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি হয়।
আর এখানেই ফিরে আসে সেই পুরোনো প্রশ্ন, ক্ষমতার উৎস জনগণ, নাকি টাকা? গণতন্ত্রের কাগজে ক্ষমতার উৎস জনগণ। কিন্তু যদি সমাজে ধীরে ধীরে এমন সংস্কৃতি তৈরি হয় যেখানে টাকা দিয়ে সুযোগ কেনা যায়, পরিচয় দিয়ে দরজা খোলা যায়, ক্ষমতা দিয়ে নিয়ম বদলানো যায়, তাহলে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকলেও তার ভেতরের নৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
তখন “টাকা দাও, সেবা নাও” শুধু বাজারের ভাষা থাকে না, রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরেও তার ছায়া পড়তে শুরু করে। এখানেই নেতৃত্বের প্রশ্নটি আসে।
একটি জাতি যেমন, তার নেতৃত্বও অনেকাংশে তেমন। আবার নেতৃত্ব যেমন, প্রতিষ্ঠানও ধীরে ধীরে তেমন হয়ে ওঠে। সমাজে যদি সততার মূল্য কমে যায়, নেতৃত্ব যদি স্বচ্ছতার বদলে সুবিধাবাদকে পুরস্কৃত করে, প্রতিষ্ঠান যদি জবাবদিহির বদলে প্রভাবকে ভয় পায়, তাহলে সাধারণ মানুষও একসময় সেই সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে।
আমগাছের তলায় আমই পড়ে। আপনি আমগাছ লাগিয়ে কাঁঠাল আশা করতে পারেন না। একইভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অস্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থের প্রভাব এবং জবাবদিহির অভাব রেখে একটি শক্তিশালী, সৎ ও দক্ষ রাষ্ট্র আশা করা কঠিন।
তাই আজকের প্রশ্ন শুধু ভাইভার নম্বর ১০, ২৫, ৪০ না ৫০ হবে কি না, সেই প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন বাংলাদেশ তৈরি করতে চাই? এমন বাংলাদেশ, যেখানে একজন তরুণ তার মেধা, পরিশ্রম ও সততার ওপর আস্থা রেখে পরীক্ষার হলে বসবে?
নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে পরীক্ষার আগে তাকে ভাবতে হবে, “আমি কত নম্বর পাব?”-এর চেয়ে “আমার পেছনে কে আছে?” প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ কি না? রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা আর কী হতে পারে?
যদি সত্যিই মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে নিয়োগের প্রতিটি দরজা হতে হবে স্বচ্ছ, প্রতিটি মূল্যায়ন হতে হবে যাচাইযোগ্য এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে হবে যুক্তি ও জবাবদিহি।
কারণ একটি চাকরি হারানো একজন তরুণের ব্যক্তিগত পরাজয় হতে পারে। কিন্তু একটি নিয়োগব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানো একটি প্রজন্মের পরাজয়।
বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত শুধু সরকার নেবে না। আমরা সবাই নেব। তবে পথ দেখানোর দায়িত্ব নেতৃত্বের। আর নেতৃত্ব যদি সত্যিই জনগণের কাছ থেকে ক্ষমতা পেয়ে থাকে, তাহলে জনগণের কাছে তার সবচেয়ে বড় ঋণ একটাই, যোগ্যতার কাছে ক্ষমতাকে, সততার কাছে অর্থকে এবং ন্যায়ের কাছে স্বার্থকে পরাজিত করা।
নইলে প্রশ্নটি থেকেই যাবে, ক্ষমতার উৎস জনগণ বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার দরজা খুলতে যদি টাকা লাগে, তাহলে সেই টাকার উৎস কোথায়? আর উত্তর খুঁজতে গেলে হয়তো আমাদের শেষ পর্যন্ত নিজের সমাজের দিকেই তাকাতে হবে।
কারণ আমগাছের তলায় আমই পড়ে।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com
এমআরএম
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
মো. কায়সার নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “যে জায়গা দিয়ে সংযোগ সড়ক হওয়ার কথা, সেটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি। সেখানে কিছু মানুষ বাড়িঘর করে বসবাস করছেন। তাই জমির বিষয়টি যেন সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার কারণ না হয়, সেটিই স্থানীয়দের প্রত্যাশা।”
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) আনন্দ-উদ্দীপনা ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমী ‘লুঙ্গি প্যারেড’।
এইচএসসি পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের জন্য আগামী ২ ডিসেম্বর থেকে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা নেওয়ার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করেছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটি। এ পরীক্ষার ফল ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সারা দেশের মতো ময়মনসিংহেও নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল। তবে, ফল প্রকাশের দিনেও নগরীর কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে দেখা যায়নি চিরচেনা উৎসব। শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস, বন্ধুদের সঙ্গে ফল জানার অপেক্ষা কিংবা আনন্দ-হতাশা ভাগাভাগির সেই দৃশ্য যেন হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের ব্যবধানে। প্রযুক্তির কল্যাণে ঘরে বসেই ফল জানার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বদলে গেছে ফল প্রকাশের দিনের চেনা চিত্র।
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।