ইথিওপিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ওমো ভ্যালিতে মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রামে গিয়েছিলেন লেখক। বিচ্ছিন্ন এই জনপদে এখনো টিকে আছে কৃষি, পশুপালন ও নিজস্ব সংস্কৃতিনির্ভর জীবনযাপন। মুরসিদের ঘরবাড়ি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-অলংকার, বিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে লেখকের চোখে ধরা পড়েছে এক ভিন্ন জগত।
জিনকা শহরে আমার প্রথম সকাল। রিসোর্টের ডাইনিং হলের পাশে গাছের নিচে চেয়ার–টেবিল পাতা আছে। কফি নিয়ে গাছের নিচে একটা চেয়ারে বসলাম। উঁচু উঁচু বেশ কিছু উডল্যান্ড, আকাশিয়াগাছ মাথার ওপর ছেয়ে আছে। অবশ্য পুরো এলাকাজুড়েই গাছ ছায়া দিচ্ছে৷ মনে হবে কোনো জঙ্গলে চলে এসেছি।
কিছুক্ষণ পর নাশতা এল, ইংলিশ ব্রেকফাস্ট। নাশতা শেষ করতে না করতেই আমার গাইড মেলাক এল জিপ নিয়ে। ইথিওপিয়া ভ্রমণের আগে থেকেই বলা ছিল, যেন একা কোথাও না বেরোই। অবশ্যই গাইড সঙ্গে নিয়ে বের হতে হবে। পৃথিবীর কোনো দেশেই একান্ত প্রয়োজন না পড়লে আমি গাইড নিই না। এই একান্ত প্রয়োজনের দেশ হলো ইথিওপিয়া। তবে নিজের মতো একা একা ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ আর কিছুতে হয় না।
আমি দক্ষিণ ইথিওপিয়ার ওমো ভ্যালিতে এসেছি মুরসি নৃগোষ্ঠীর জীবনযাপন দেখতে। তারা এখনো হাজার হাজার বছর আগের জীবন যাপন করছে। তাদের জীবনযাপন এখনো মূলত কৃষি, পশুপালন ও স্থানীয় সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এখানে নাকি আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পুরো ওমো ভ্যালির জন্য ট্যুর অপারেটর কোম্পানি থেকে দেওয়া আমার গাইড মেলাক। আর মুরসি জনগোষ্ঠীর আলাদা আলাদা গ্রামে তাদের গোষ্ঠীর একজন গাইড নিতে হবে। দেখা যাক সামনে আর কত ঝক্কি পোহাতে হয়।
ইথিওপিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য আজকাল ট্যুরিস্ট তেমন আসে না। অন্য ট্যুরিস্ট নেই, তাই আমাকে একাই একটা জিপ ভাড়া করতে হয়েছে।
আমি ব্যাকপ্যাক নিয়ে চললাম জিপের দিকে। জিপের পেছনের সিটে ব্যাকপ্যাক রাখতে না রাখতে দেখি মেলাক গিয়ে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে। আমি মেলাককে বললাম পেছনের সিটে গিয়ে বসতে। সামনের সিটে আমি বসব। মেলাক বসল পেছনে আর আমি সামনে। গাড়িটা ল্যান্ড ক্রুজার। চালকের নাম এবে।
আমরা এখন যাচ্ছি মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রাম দেখতে। মেলাক বলল, ‘মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রামে সকাল সকাল যেতে হয়।’

দুই পাশে পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পথ ধরে চলতে চলতে সামনে পড়ল একঝাঁক গিনিফাউল। এরা গাড়ি দেখে সরে গেল। মেলাককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভয়ংকর কোনো প্রাণী কি এই জঙ্গলে আছে?’ মেলাক বলল, ‘একসময় সিংহ ছিল, কিন্তু এখন তেমন দেখা যায় না। এ ছাড়া লেপার্ড, চিতা, বুনো কুকুর, হায়েনা আছে।’ মেলাক যতটা না বলছে তার চেয়ে বেশি আমি গুগল করে জানার চেষ্টা করছি। মেলাক তথ্য কম জানে, না আমাকে কিছুই জানাচ্ছে না বুঝতে পারছি না।
আমি ভাবলাম পরে হয়তোবা এরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মেলাক আরও অদ্ভুত কথা শোনাল। বলল, ‘এই গ্রামে দুপুরের পর সব নারী–পুরুষ স্থানীয় মদিরা পান করে টাল হয়ে থাকে। তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় পেতে হলে সকালেই যেতে হবে।’ এ কথা শোনার পর এর রেশ কাটতে অনেকটা সময় লাগল।
পথে পড়ল মাগো ন্যাশনাল পার্ক। দুই পাশে সবুজ টিলা আর মাঝখানে লাল মাটির কাঁচা রাস্তা। রাস্তায় চাকার দাগ ছাড়া বাকি অংশে ঘাস–গুল্ম জন্মেছে। আর আশপাশে প্রচুর ঝোপঝাড়ে ফুটেছে নানা রঙের ফুল। বেশির ভাগ ফুলের নাম মেলাক জানে না আর আমিও ফুলগুলো এই প্রথম দেখছি।
তবে ন্যাশনাল পার্কের ভেতর দিয়ে চলার সময় হঠাৎ একদল বেবুন সামনে এসে পড়ল। এরা গাড়ি দেখে তেমন ভয় পেল না।
দুই পাশে পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পথ ধরে চলতে চলতে সামনে পড়ল একঝাঁক গিনিফাউল। এরা গাড়ি দেখে সরে গেল। মেলাককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভয়ংকর কোনো প্রাণী কি এই জঙ্গলে আছে?’ মেলাক বলল, ‘একসময় সিংহ ছিল, কিন্তু এখন তেমন দেখা যায় না। এ ছাড়া লেপার্ড, চিতা, বুনো কুকুর, হায়েনা আছে।’ মেলাক যতটা না বলছে তার চেয়ে বেশি আমি গুগল করে জানার চেষ্টা করছি। মেলাক তথ্য কম জানে, না আমাকে কিছুই জানাচ্ছে না বুঝতে পারছি না। কাঁধসমান কোঁকড়া চুল, চোখ লাল—মেলাককে দেখে আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি চুপচাপ আছি। ভালোমতো বুঝে নিই, না পোষালে ট্যুর অপারেটরকে ফোন করব। আপাতত বাইরে মাগো ন্যাশনাল পার্কের দিকে মনোযোগ দিই।
এই ন্যাশনাল পার্কে প্রচুর পাখি আছে, প্রায় ২৩০ প্রজাতির। এখন পাখি দেখা যাচ্ছে না, তবে গাছের উঁচু ডালে পাখির বাসা দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো পাখির বাসা ডাল থেকে গোল হয়ে ঝুলছে। আজকের দিনটি রৌদ্রোজ্জ্বল। বৃষ্টি হলে নাকি পথে পানি জমে যায়। তখন কাঁচা রাস্তায় জিপ নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। এখন ইথিওপিয়ায় বর্ষাকাল, তবে এখানে গতকাল থেকে বৃষ্টি হয়নি।

গ্রামপ্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কখন আনন্দিত হয়। উত্তর এল, পশুর সংখ্যা বাড়লে সে আনন্দিত হয় এবং আরও একটা সময় আনন্দিত হয়, যখন সে কয়েকটি বিয়ে করতে পারে। বর্তমান গ্রামপ্রধানের দুজন স্ত্রী। মুরসি সমাজে পুরুষের একাধিক বিয়ে প্রচলিত বলে জানাল মেলাক।
সবুজ পাহাড়, পাখি, ফুল দেখতে দেখতে আমরা মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রামে চলে এলাম। এই গ্রামগুলোতে ঢোকার শর্ত হলো, গ্রামের প্রধানকে কিছু টাকা উপঢৌকন হিসেবে দেওয়া। আমি প্যাকেজ ট্যুরে এসেছি। উপঢৌকনের টাকা ইত্যাদি সবই আমার প্যাকেজের মধ্যে পড়ে, টাকাপয়সা ট্যুর অপারেটরকে দিয়ে এসেছি। আমার গাইড এখন এসব দেখবে।
ওমো ভ্যালির জনগোষ্ঠী এখনো যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগে বসবাস করে। এরা নিজেদের শস্য নিজেরাই উৎপাদন করে, পশুপালন করে, নিজেদের পোশাক নিজেরা তাঁতে বোনে। একসময় কেউ পোশাক পরত না। এখন নিম্নাঙ্গে পোশাক পরে।
গ্রামে প্রবেশ করতেই দেখি একদল পুরুষ চট বিছিয়ে পাশাপাশি বসে আছে। এদের নিম্নাঙ্গ এক খণ্ড কাপড় দিয়ে আবৃত। দু–একজন অবশ্য পুরোনো ময়লা শার্ট গায়ে দিয়েছে। এদের গায়ের রং সাধারণ ইথিওপিয়ানদের চেয়েও কৃষ্ণবর্ণ। কারও কারও গলায় পুঁতির মালা, হাতে পুঁতির ব্রেসলেট।
এদের গ্রামপ্রধান তুলনামূলকভাবে বয়স্ক ব্যক্তি। আমি তাদের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম, যদি তারা বিরক্ত হয়। তারা তাদের নিজস্ব জগৎ, নিজস্ব আচার-ব্যবহার নিয়ে বেশ আছে। আমরা বাইরের লোকেরা গিয়ে তাদের জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটাই।
মেলাক বলার পর তাদের সঙ্গে গিয়ে বসলাম। তাদের জীবনযাপন এতটাই আলাদা যে কীভাবে কথোপকথন শুরু করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মুরসি নৃগোষ্ঠীর প্রধান এই গ্রামের ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নেয়। এদের নিজস্ব ধর্ম আছে, ঈশ্বর আছে। মূলত প্রকৃতিই এদের ঈশ্বর। ঈশ্বরের নাম তুমউই। এরা মনে করে সে আকাশে থাকে এবং মুরসি নৃগোষ্ঠীর চেয়ে শক্তিমান।
গ্রামপ্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কখন আনন্দিত হয়। উত্তর এল, পশুর সংখ্যা বাড়লে সে আনন্দিত হয় এবং আরও একটা সময় আনন্দিত হয়, যখন সে কয়েকটি বিয়ে করতে পারে। বর্তমান গ্রামপ্রধানের দুজন স্ত্রী। মুরসি সমাজে পুরুষের একাধিক বিয়ে প্রচলিত বলে জানাল মেলাক।

গ্রামের সীমানা আকাশিয়াগাছ আর ঝোপঝাড় দিয়ে বেড়া দেওয়া। বেড়া পার হয়ে ভেতরে একটু দূরে দূরে বেশ কয়েকটা খড়ের গাদা রাখা। বাংলদেশের গ্রামে এ রকম খড়ের গাদা আমি অনেক দেখেছি। তাই অবাক হলাম না। কিন্তু আরেকটু খেয়াল করতেই দেখি নিচু খড়ের গাদার মাঝে ছোট গোলাকার একটা দরজা আছে। আসলে এই খড়ের গাদার ভিত হয়ে আছে কাঠ বা চিকন ডালের অবয়ব, যাতে ঘরটি মজবুত থাকে।
তাদের সঙ্গে কথা খুব একটা হলো না। তারা আমাদের মতো আড্ডাবাজ না। বাইরের জগতে আলাপ করার কত কিছু আছে, কতভাবেই যে রাজা–উজির গপ্পো মারা যায়, তা তারা জানে না। আর আমাদের মতো বাইরের মানুষ তারা পছন্দও করে না। মুরসি গ্রামকে অনেক ইউরোপীয় ট্যুরিস্ট ‘ভয়ংকর গ্রাম’ নাম দিয়েছে। একটা ডকুমেন্টারিতে দেখেছি ট্যুরিস্টরা নানা প্রশ্ন করে তাদের বিরক্ত করছিল। এরপর মুরসিরা তাদের আটকে রেখেছিল। আমি আগে থেকেই সতর্ক আছি। একা এসেছি, বেশি প্রশ্ন বা বেশি কৌতূহল দেখানো যাবে না।
হঠাৎ সামনে দেখি ‘হি ম্যান’—এই গ্রামের শক্তসমর্থ তরুণ। মাসাই নৃগোষ্ঠীর মতো কাঁধের এক পাশে চাদর বেঁধে ঘুরছে। চাদরের ঝুল নেমেছে হাঁটু অবধি। হাতে স্থানীয়ভাবে ট্যাটু করেছে। ট্যাটুতে ফুলদানির মতো বিমূর্ত ছবি আঁকা। ট্যাটুর জায়গাটা ফুলে গেছে। এমনিতে কালি দিয়ে ট্যাটু করা হয় কিন্তু এরা তা করেনি। চামড়ার ওপর করেছে আর ফোলাভাব এখনো যায়নি। হয়তোবা এটা স্থায়ী হয়ে গেছে। ট্যাটু করা ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে এ গ্রামের পুলিশ ও আর্মিপ্রধান। নীল চাদর আর শর্টস পরা ছেলেটির কাঁধে একটি বন্দুক ঝুলছে। বন্দুক দেখে আমার কৌতূহল হলো—এটি তারা কী কাজে ব্যবহার করে?
মেলাকের সাহায্য নিতে হলো। জানতে পারলাম, মাঝেমধ্যে বন্য পশু তাড়ানোর জন্য তারা বন্দুক ব্যবহার করে। অন্য গ্রাম থেকে মানুষ এসে তাদের গ্রামের পশু নিয়ে যায়, তখন বন্দুক কাজে লাগে। তা ছাড়া এই প্রত্যন্ত এলাকায় বন্দুকের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
আমাকে দেখে গ্রামের কয়েকটা বাচ্চা ভেতর থেকে এসে পড়ল। ছেলেশিশুদের গায়ে কোনো পোশাক নেই। মেয়েশিশুদের নিম্নাঙ্গে শুধু এক খণ্ড কাপড় জড়ানো। বাচ্চাদের কারও কারও গলায় পুঁতির মালা।
গ্রামের সীমানা আকাশিয়াগাছ আর ঝোপঝাড় দিয়ে বেড়া দেওয়া। বেড়া পার হয়ে ভেতরে একটু দূরে দূরে বেশ কয়েকটা খড়ের গাদা রাখা। বাংলদেশের গ্রামে এ রকম খড়ের গাদা আমি অনেক দেখেছি। তাই অবাক হলাম না। কিন্তু আরেকটু খেয়াল করতেই দেখি নিচু খড়ের গাদার মাঝে ছোট গোলাকার একটা দরজা আছে। আসলে এই খড়ের গাদার ভিত হয়ে আছে কাঠ বা চিকন ডালের অবয়ব, যাতে ঘরটি মজবুত থাকে। এর আরেকটু দূরে নারকেলের পাতার মতো পাতা দিয়ে চাল বানানো, চারপাশ খোলা একটা ঘর। সেটি অবশ্য চারকোনা আর দোচালা। দেখে মনে হলো রান্নাঘর।

একজন মুরসি পুরুষ ঘর বাঁধছে। খড়ের মতো পাতা একটার পর আরেকটা সাজিয়ে গোলাকার ইগলুর মতো ঘর তৈরি করে ফেলেছে প্রায়। ঘরটিকে তাদের ভাষায় বলে দেবোয়তাস। ঘর বাঁধতে থাকা ছেলেটির বয়স হবে ২০–২১ আর তাকে ১০–১২ বছর বয়সী শিশুরা ঘিরে রেখেছে। দেখে ছেলেমেয়ে আলাদা করা যাচ্ছে না। সবার কবজিতে তামার চুড়ির মতো ব্রেসলেট শোভা পাচ্ছে। কারও কারও গলায় পুঁতির মালা।
মেলাক বলল, ‘মুরসি নৃগোষ্ঠীর পুরুষেরা পশুপালন করে আর সারা দিন বসে থাকে। বাকি সব কাজ করে নারীরা। রান্না করা, বাচ্চা সামলানো ইত্যাদি। পুরুষেরা ঘরের কুটাটাও নাড়ে না।’
সব মুরসি পুরুষ অবশ্য পশুপালন করে, তা নয়। কেউ কেউ কৃষিকাজও করে। তবে পশুপালকের সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া আমার মতো ট্যুরিস্টরা গ্রামে প্রবেশের জন্য যে অর্থ দেয়, তা–ও এদের উপার্জনের একটি উপায়। আগে ওমো ভ্যালিতে অনেক ট্যুরিস্ট আসত। এখন কমে গেছে। আমি ছাড়া আজ আর কেউ আসেনি।
আরেকটু এগিয়ে নারীদের দেখা পেলাম। পাঁচ-ছয়জন নারী গোল হয়ে বসে মাটি দিয়ে ছোট ছোট পশুপাখি তৈরি করছেন। কয়েকটা হাতি, সিংহ তৈরি করা হয়েছে। এখন চুনাপাথর গুঁড়া করে সাদা ফোটা ফোটা রং দিচ্ছে। নারীদের প্রায় সবার ঊর্ধাঙ্গে কোনো বস্ত্র নেই। একজন শুধু বুক থেকে কাপড় বেঁধেছে। তাদের মাঝে কয়েকজন ৯-১০ বছরের শিশুর কান ছিদ্র করা হয়েছিল আমাদের মতোই। আমরা কানে দুল পরি আর ওরা সেই ছিদ্রকে প্রথমে কাঠের ছোট গোল কাঠি ঢুকিয়ে একটু বড় করে, তারপর কাঠের ছোট গোল চাকতি ঢোকায়। ছিদ্র আরেকটু বড় হলে আরেকটু বড় চাকতি ঢোকায়। শেষে প্রায় তিন ইঞ্চি ব্যাসার্ধের চাকতি ঢোকায়। আমার সামনে একটি মেয়ে সন্তান কোলে নিয়ে বসে আছে, যার কানের চাকতির আকার বেশ বড়। ব্যাসার্ধ তিন ইঞ্চির মতো হবে। এখানে ১০ বছর বয়সী একটি শিশুর কানের চাকতির ব্যাসার্ধ প্রায় এক ইঞ্চি। এই শিশুটিরই যখন ১৬–১৭ বছর বয়স হবে, তখন সে আরও বড় চাকতি পরবে।
তবে মুরসি নৃগোষ্ঠীর নারীরা বিখ্যাত এদের ঠোঁটের ভেতরে ছিদ্র করে বড় বড় চাকতি রাখার জন্য।
আরেকটু সামনে এগিয়ে দেখি একজন মুরসি পুরুষ ঘর বাঁধছে। খড়ের মতো পাতা একটার পর আরেকটা সাজিয়ে গোলাকার ইগলুর মতো ঘর তৈরি করে ফেলেছে প্রায়। ঘরটিকে তাদের ভাষায় বলে দেবোয়তাস। ঘর বাঁধতে থাকা ছেলেটির বয়স হবে ২০–২১ আর তাকে ১০–১২ বছর বয়সী শিশুরা ঘিরে রেখেছে। দেখে ছেলেমেয়ে আলাদা করা যাচ্ছে না। সবার কবজিতে তামার চুড়ির মতো ব্রেসলেট শোভা পাচ্ছে। কারও কারও গলায় পুঁতির মালা।

আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার আগে মেলাক আমাকে বলল, ‘মুরসি নারীদের বৈশিষ্ট্য হলো নিচের ঠোঁটে ছিদ্র করে বড় একটা চাকতি বসিয়ে দেওয়া। চাকতিটি সাধারণত মাটির তৈরি হয়।’ আমার সামনে একজন মাঝবয়সী নারী দাঁড়িয়ে আছে নিচের ঠোঁটে বেশ বড় একটা চাকতি বসিয়ে। কাঁধ থেকে বাঁধা এক টুকরা কাপড় আর মাথায় বসিয়েছে গরুর মাথার কঙ্কাল। আর সে মাথায় বসানো আছে গোল লেবুর মতো হলুদ রঙের কয়েকটা বুনো ফল।
এখানে ঘরগুলো পাশাপাশি সাজানো।
তাদের রান্নাঘর একটু দূরে। ঘরের দরজা বেশ নিচু, গোলাকার। মেলাককে বলতে সে একটা ঘরের ভেতর দেখাতে নিয়ে গেল। ঘরের দরজা দিয়ে নিচু হয়ে ঢুকতে হয়। ভেতরে তেমন কিছুই নেই। শুধু একটা বিছানা গুটিয়ে এক কোনায় রাখা। বিছানায় কোনো তোশক বা বালিশ নেই। শুধু চাটাই আর চাদর বিছিয়ে তারা ঘুমায়।
ঘর থেকে বেরিয়ে পেছনের আঙিনায় দেখি একজন নারী শিল–পাটায় ভুট্টা গুঁড়ো করছে। এই ভুট্টা ও সোরগাম দিয়ে তৈরি পরেজের মতো একধরনের খাবার তারা নিত্যদিন খায়। সঙ্গে জঙ্গলের শাকসবজি মিশিয়ে দেয়। প্রতি পরিবারের রান্না আলাদা রান্নাঘরে হয়। রান্নাঘর বলতে আসলে কিছুই নেই। খোলা আকাশের নিচে কয়েকটা পাথর সাজিয়ে চুলা বানিয়ে মাটির পাত্রে সেদ্ধ করা হয় সোরগাম। বৃষ্টি হলে মাথার ওপর কয়েকটা কাঠের খুঁটি আর খড় দিয়ে ছাউনি বানিয়ে নেয়।
এখানে কোনো বিদ্যালয় নেই। নেই কোনো হাসপাতাল। তাই চিকিৎসা হয় জড়িবুটি, ভেষজ উপায়ে। সরকার এদিকে আসে না, তাদের খোঁজখবরও রাখে না। তাদের উন্নয়নে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। দুর্গম বলে কোনো এনজিও এদিকে আসে না। এ এক বিচ্ছিন্ন জনপদ।
অবশ্য দুপুরের পরে এরা যে মদিরা পান করে তা–ও তৈরি হয় খেতের সোরগাম দিয়ে। বইয়ে পড়েছিলাম, আরও এক ধরনের পানীয় তারা পান করে। গরুর তাজা রক্ত তারা পান করে সঙ্গে সামান্য দুধ মিশিয়ে নেয়। অবশ্য এই পানীয় উৎসবের সময়ই পান করা হয়।
আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার আগে মেলাক আমাকে বলল, ‘মুরসি নারীদের বৈশিষ্ট্য হলো নিচের ঠোঁটে ছিদ্র করে বড় একটা চাকতি বসিয়ে দেওয়া। চাকতিটি সাধারণত মাটির তৈরি হয়।’
আমার সামনে একজন মাঝবয়সী নারী দাঁড়িয়ে আছে নিচের ঠোঁটে বেশ বড় একটা চাকতি বসিয়ে। কাঁধ থেকে বাঁধা এক টুকরা কাপড় আর মাথায় বসিয়েছে গরুর মাথার কঙ্কাল। আর সে মাথায় বসানো আছে গোল লেবুর মতো হলুদ রঙের কয়েকটা বুনো ফল।

গ্রামের সবার মাথা হয় কামানো, নয় কদম ছাঁট দেওয়া। মানে এখানে কেশবিন্যাসের সুযোগ নেই। অবশ্য কোঁকড়া চুলে মাটি ঢুকে গেলে তা পরিষ্কার করা বেশ মুশকিল। এ কারণে আফ্রিকান নারী-পুরুষ অনেকেই চুল ছোট রাখে। আরেকজন নারী ঠোঁটের চাকতি ছাড়া মাথায় গরুর মাথার কঙ্কাল বসিয়ে আমার সামনে এলেন। আমি একবারের পর তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। প্রথাগত সৌন্দর্যের ধারণায় অভ্যস্ত চোখে দৃশ্যটি আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছিল।
কেন জানি না চাকতি মুখে ঝোলানো ব্যাপারটা আমার অনভ্যস্ত চোখে বীভৎস লাগল। আসলে ঠোঁটে অত বড় একটা চাকতি বসাবার কারণেই হয়তো এমন লাগছে। চাকতির ব্যাসার্ধ প্রায় তিন ইঞ্চি। চাকতি বসাবার জন্য নারীরা সামনের পাটির নিচের দুটি দাঁত ফেলে দেয়। ঠোঁটের চাকতিটি মাটির তৈরি। আমাকে একজন চাকতি হাতে নিয়ে দেখতে দিল। আমি হাতে নিয়ে দেখি বেশ ভারী। এত ভারী জিনিস ঠোঁটে নিয়ে চলাফেরা করা খুবই মুশকিল।
বলা হয়ে থাকে, মুরসি পুরুষদের শিকার বা অন্য কাজে গ্রামের বাইরে যেতে হতো। তখন যেন অন্য পুরুষ তাদের নারীর প্রতি আকৃষ্ট না হয় সে কারণে ঠোঁটে চাকতি রাখার নিয়ম চালু হয়েছে।
আবার এ–ও প্রচলিত আছে যে ঠোঁটে বসানো চাকতি সৌন্দর্যের প্রতীক। যে নারীর চাকতি যত বড়, সে নারী তত সুন্দর।
এখন কমবয়সী মুরসি নারীরা ঠোঁটে ছিদ্র করতে চায় না। যুগের সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলেছে।
আরেক দিকে গ্রামের ১০–১২ বছরের শিশুরাও মাটি দিয়ে ছোট ছোট পুতুল তৈরি করছে। এদের সবার হাতে তামার ব্রেসলেট। কারও কারও গলায় পুঁতির মালা আর কানে ছিদ্র করা, তাতে কাঠের চাকতি।
গ্রামের সবার মাথা হয় কামানো, নয় কদম ছাঁট দেওয়া। মানে এখানে কেশবিন্যাসের সুযোগ নেই। অবশ্য কোঁকড়া চুলে মাটি ঢুকে গেলে তা পরিষ্কার করা বেশ মুশকিল। এ কারণে আফ্রিকান নারী-পুরুষ অনেকেই চুল ছোট রাখে।
আরেকজন নারী ঠোঁটের চাকতি ছাড়া মাথায় গরুর মাথার কঙ্কাল বসিয়ে আমার সামনে এলেন। আমি একবারের পর তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। প্রথাগত সৌন্দর্যের ধারণায় অভ্যস্ত চোখে দৃশ্যটি আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছিল।

এ গ্রামে বেশ কয়েকজন প্রবীণ নারীর ঠোঁটে আর কানে বড় ছিদ্র দেখলাম। তাদের কেউ কেউ চাকতি পরে আছে, কেউ পরে নেই। একজন নারী খেলনা পুতুল পোড়াবার জন্য পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালালো আর আগুন উসকে দেওয়ার জন্য সোরগামের খড় ব্যবহার করল। ব্যাপারটা বেশ চমকপ্রদ। এর আগে কেনিয়ার মাসাই মারা গ্রামে এ রকমভাবে আগুন জ্বালাতে দেখেছি। তবে মাসাই নৃগোষ্ঠীরা এখন আধুনিক জগতে প্রবেশ করেছে। ট্যুরিস্টদের দেখানোর জন্য এভাবে আগুন জ্বালায়।
পুরুষেরা এখন পশু চড়াতে গিয়েছে আর অল্প কিছু পুরুষ গ্রামে ঢোকার মুখে বসে আছে। নারী ও শিশুরা গ্রামে আছে এখন। গ্রামে ৩৫টির মতো ঘর আছে। সবাই ঘরের পাশেই অস্থায়ী চুলা বসিয়ে রান্নার কাজ সারে। এখন প্রায় সব নারী বসে আছে। কেউ রান্না করছে না। কয়েকটা চুলার আগুন নিবু নিবু অবস্থায় আছে। কারণ, তারা ভোরে উঠে সোরগাম বা ভুট্টা সেদ্ধ করে ফেলে। এরপর সারা দিন আর কাজ থাকে না। দুপুরের পর সোরগাম দিয়ে বানানো মদিরা পান করে সময় কাটায়। এই প্রত্যন্ত গ্রামে বিদ্যুৎ বা পানির সুব্যবস্থা নেই। পানি এরা জেরিক্যান ভরে কাছের নদী থেকে বহন করে আনে।
আফ্রিকায় লাউয়ের খোল দিয়ে অনেক কিছু তৈরি করে। মুরসিরা তৈজসপত্র তৈরি করে কাঠ বা মাটি দিয়ে। লাউয়ের খোলের একটা পাত্রে এক মা তার তিন বছর বয়সী শিশুকে পানি খাওয়াচ্ছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই মায়ের রূপ এক।
তাদের রান্নার অংশ হিসেবে দু–একটা স্টিলের পাত্র জুটেছে। তাদের নিয়মিত বাজারে যাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, বাজার প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে, সেই মাগো ন্যাশনাল পার্ক পেরিয়ে জিনকায়। কেউ যদি আসে বা মেলাকের মতো গাইড আসে তাহলে তারা এ রকম কিছু জিনিস পায়।
সোরগাম ও ভুট্টাখেতে যা চাষ হয় তা দিয়ে গ্রামের মানুষের না চললে নিজেদের পালিত পশুর বিনিময়ে তারা শস্য কেনে। অবশ্য সেটাও হয় কালেভদ্রে। সে জন্য কাউকে গ্রামে এসে খবর নিয়ে যেতে হয়। এরপর অন্য কেউ এসে শস্য দিয়ে, পশু নিয়ে চলে যায়।
তাদের বিয়েও হয় অদ্ভুত এক উপায়ে। কন্যার পিতাকে বর সামর্থ্য অনুযায়ী পশু যৌতুক দেয়। তবে তাদের সন্তানের সংখ্যা দু–তিনটির বেশি নয়। সে কারণে এখানে খাদ্য বণ্টনে সুবিধা হয়।
এ গ্রামে বেশ কয়েকজন প্রবীণ নারীর ঠোঁটে আর কানে বড় ছিদ্র দেখলাম। তাদের কেউ কেউ চাকতি পরে আছে, কেউ পরে নেই। একজন নারী খেলনা পুতুল পোড়াবার জন্য পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালালো আর আগুন উসকে দেওয়ার জন্য সোরগামের খড় ব্যবহার করল। ব্যাপারটা বেশ চমকপ্রদ। এর আগে কেনিয়ার মাসাই মারা গ্রামে এ রকমভাবে আগুন জ্বালাতে দেখেছি। তবে মাসাই নৃগোষ্ঠীরা এখন আধুনিক জগতে প্রবেশ করেছে। ট্যুরিস্টদের দেখানোর জন্য এভাবে আগুন জ্বালায়। আদতে নিত্য ব্যবহারের জন্য জ্বালায় না। তবে মুরসি নৃগোষ্ঠী এখনো আগুন জ্বালায় প্রাকৃতিক উপায়ে। এরা এখনো যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগেই রয়ে গেছে।

মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রাম দেখা হয়ে গেছে। আমাদের জিনকা হয়ে তারপর যেতে হবে হামার নৃগোষ্ঠীর গ্রামে। মাগো ন্যাশনাল পার্কের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বাবুই পাখির বাসার মতো গোল গোল বাসা আকাশিয়াগাছে ঝুলছে দেখে থামলাম। এদেশে আকাশিয়াগাছগুলো বেশ উঁচু উঁচু। আর পাশেই আফ্রিকান শিরীষগাছ। যেমন ঝাঁকড়া তেমনি উঁচু। আর এদের পায়ের কাছে ফুটে আছে নানা রঙের নানা জাতের ফুল।
সামনে একজন নারী লাল পাথর গুঁড়ো করছেন পুতুলে রং দেবার জন্য। আরেকজন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি সেই রং মুখে মাখতে চাই কিনা। আমি তাতে মত দিইনি।
যেকোনো ‘সংখ্যালঘু’ গোষ্ঠীর মতো করে সাজা বা তাদের পোশাক পরার ঘোর বিরোধী আমি। ‘সংখ্যালঘু’দের বেশভূষা ধারণ করাকে কালচারাল অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন (সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ) বলে। এটা সাধারণত অনেকে না বুঝে, সেই সংস্কৃতি সম্পর্কে না জেনে করে, যা নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ। আমি কোথাও গেলে কখনোই কোনো নৃগোষ্ঠীর বেশভূষা ধারণ করি না। তাদের সাথে কয়েক বছর না থাকলে তাদের সংস্কৃতি জানা সম্ভব নয়। না জেনে শুধু পোশাক পরা তাদের সংস্কৃতিকে অসম্মান করা বলে মনে করি।
কয়েকটা ১০–১২ বছর বয়সী বাচ্চা আমাকে ঘিরে ধরল তাদের হাতের পুতুল কেনার জন্য। তারা যেখানে সারিবদ্ধভাবে পুতুল নিয়ে বসে আছে, সেখানে গিয়ে কয়েকটা পুতুল কিনলাম। একেকটা পুতুল লম্বায় পাঁচ–ছয় ইঞ্চি। লাল মাটির ওপর সাদা ফোটা ফোটা দেওয়া পুতুল। পুতুল বিক্রির টাকা চলে যাবে গ্রামপ্রধানের কাছে। তিনি পরে এখান থেকে খরচ করবেন। এদের জীবন এতই সরল যে বাড়তি কিছুই প্রয়োজন নেই। এমনকি চেহারা দেখার জন্য আয়নাও নেই।
মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রাম দেখা হয়ে গেছে। আমাদের জিনকা হয়ে তারপর যেতে হবে হামার নৃগোষ্ঠীর গ্রামে।
মাগো ন্যাশনাল পার্কের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বাবুই পাখির বাসার মতো গোল গোল বাসা আকাশিয়াগাছে ঝুলছে দেখে থামলাম। এদেশে আকাশিয়াগাছগুলো বেশ উঁচু উঁচু। আর পাশেই আফ্রিকান শিরীষগাছ। যেমন ঝাঁকড়া তেমনি উঁচু। আর এদের পায়ের কাছে ফুটে আছে নানা রঙের নানা জাতের ফুল।
এই গাছপালা আর প্রকৃতির কাছের মানুষ প্রকৃতির মাঝেই সুন্দর। আমরা শহরের মানুষ এখানে বেমানান।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
স্মার্টফোনের বাজারে ‘আইফোন’ নামটি এতটাই পরিচিত যে এর নামের প্রতিটি অক্ষর নিয়েই আলাদা করে ভাবেন খুব কম মানুষ। কিন্তু আইফোনের শুরুতে থাকা ছোট্ট ‘i’ আসলে কী বোঝায়? অনেকেই মনে করেন, এর অর্থ শুধু ‘Internet’। তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস বহু বছর আগেই এই একটি অক্ষরের সঙ্গে একাধিক ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। আইফোনের নামের এই ‘i’ আসলে প্রথমে ব্যবহার করা হয়েছিল আইম্যাকের ক্ষেত্রে। ১৯৯৮ সালে আইম্যাক উন্মোচনের সময় স্টিভ জবস ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘i’ শুধু একটি শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পাঁচটি আলাদা অর্থ-Internet, Individual, Instruct, Inform এবং Inspire। ইন্টারনেট (Internet) ‘i’-এর সবচেয়ে পরিচিত অর্থ হলো Internet। ১৯৯৮ সালে আইম্যাক বাজারে আসার সময় ইন্টারনেট ব্যবহার আজকের মতো সহজ ছিল না। অ্যাপল এমন একটি কম্পিউটার তৈরি করতে চেয়েছিল, যা ব্যবহারকারীদের সহজেই ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই ‘i’ অক্ষরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আরও পড়ুন আইফোন ১৮ কিনতে কিডনি বিক্রি! ভাইরাল এআই ছবি বানাবেন যেভাবে ইন্ডিভিজ্যুয়াল (Individual) দ্বিতীয় অর্থ Individual। অর্থাৎ ব্যক্তিগত বা ব্যক্তি-কেন্দ্রিক। অ্যাপলের ভাবনায় প্রযুক্তি শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং প্রত্যেক ব্যবহারকারীর নিজস্ব প্রয়োজন ও পছন্দের সঙ্গে মানানসই অভিজ্ঞতা তৈরি করবে। সেই ব্যক্তিগত ব্যবহারের ধারণাটিও ‘i’-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। ইনস্ট্রাক্ট (Instruct) তৃতীয় অর্থ Instruct। এর মাধ্যমে শেখানো, নির্দেশ দেওয়া বা শিক্ষার বিষয়টি বোঝানো হয়। অ্যাপলের প্রযুক্তি যেন শুধু বিনোদন বা কাজের জন্য নয়, শেখার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায় এই ধারণার প্রতিফলন ছিল এই শব্দে। ইনফর্ম (Inform) ‘i’-এর চতুর্থ অর্থ Inform। অর্থাৎ তথ্য দেওয়া বা জানানো। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ যাতে দ্রুত তথ্য পেতে পারে এবং বিশ্বের নানা ঘটনার সঙ্গে আপডেট থাকতে পারে, সেই ভাবনাও এর মধ্যে রয়েছে। ইন্সপায়ার (Inspire) সবশেষে রয়েছে Inspire, অর্থাৎ অনুপ্রাণিত করা। অ্যাপলের পণ্য ও প্রযুক্তি মানুষের সৃজনশীলতা বাড়াবে এবং নতুন কিছু ভাবতে উৎসাহ দেবে এই দর্শনের সঙ্গে শব্দটি যুক্ত। আরও পড়ুন আইফোন ডুওর দাম প্রায় ৫ লাখ, তবুও কেন মানুষ কিনবে স্টিভ জবস নিজেই দিয়েছিলেন ব্যাখ্যা ১৯৯৮ সালে আইম্যাক উন্মোচনের একটি অনুষ্ঠানে স্টিভ জবস একটি স্লাইডের মাধ্যমে ‘i’-এর এই পাঁচটি অর্থ ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ iPhone-এর ‘i’ কোনো নির্দিষ্ট একটি শব্দের ‘ফুল ফর্ম’ নয়। বরং এটি অ্যাপলের একটি নির্দিষ্ট ভাবনা ও ব্র্যান্ড দর্শনের অংশ। সময় বদলের সঙ্গে অ্যাপলের নামকরণের ধরনও বদলেছে। নতুন অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে সংস্থাটি ‘i’ প্রফিক্সের বদলে সরাসরি ‘Apple’ নাম ব্যবহার করছে। কিন্তু iPhone, iPad-এর মতো জনপ্রিয় পণ্যের ক্ষেত্রে ছোট্ট ‘i’ এখনো অ্যাপলের পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে। কেএসকে
‘প্রকৃত সংবাদ প্রাপ্তি সকলের অধিকার, অপতথ্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে’ - এ স্লোগানকে সামনে রেখে পুলিশিং সেবা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের গত ২৪ ঘণ্টার অপরাধ চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। এ সময়ে রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পরোয়ানাভুক্ত ও বিভিন্ন মামলার আসামিসহ মোট ১৮৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজশাহী রেঞ্জ কার্যালয়ের মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। পুলিশের প্রকাশিত অপরাধ চিত্র অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী রেঞ্জ এলাকায় মোট ৫৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি খুন, একটি যৌতুকের জন্য হত্যা, সাইবার সুরক্ষা আইনে একটি, চুরির চারটি, নারী ও শিশু নির্যাতনের পাঁচটি এবং অন্যান্য অপরাধে ৪২টি মামলা রয়েছে। একই সময়ে অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ছয়টি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত অভিযানে গ্রেফতার ১৮৩ জনের মধ্যে পরোয়ানামূলে ৯৭ জন, সাজাপ্রাপ্ত ১৫ জন, তদন্তাধীন মামলায় ৫৯ জন এবং অন্যান্য (প্রতিরোধমূলক) ব্যবস্থায় ১২ জন রয়েছেন। এছাড়া মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী হিসেবে ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযানকালে পুলিশ দুটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও সাত রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে। এছাড়া উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ২২ গ্রাম হেরোইন, ১২২ পিস ইয়াবা, ৩২২ পিস ট্যাপেন্টাডল, ২ কেজি ৭০৮ গ্রাম গাঁজা, ২ দশমিক ২ লিটার বিদেশি মদ এবং ২০ লিটার চোরাই মদ। গ্রেফতার ও মাদক-অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে রাজশাহী রেঞ্জজুড়ে মোট ১৪৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এদিকে পুলিশি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক থানায় এসেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী রেঞ্জের বিভিন্ন থানায় মোট ১ হাজার ৮৩ জন নাগরিক বিভিন্ন ধরনের পুলিশি সেবা গ্রহণ করেছেন। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত রেঞ্জভুক্ত থানাগুলোতে সেবাগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১২২ জনে। মনির হোসেন মাহিন/কেজে/এএসএম
একটি সুস্থ, সুশৃঙ্খল ও নৈতিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় পরিবারের অভ্যন্তরে। আর সেই পরিবারের আত্মিক কেন্দ্রবিন্দু হলো নারী। ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকারকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে পবিত্র কোরআনে একটি স্বতন্ত্র সুরার নামকরণ করা হয়েছে ‘সুরা নিসা’ (নারী)।মানবজাতির সৃষ্টি পরম্পরা ও দাম্পত্য সম্পর্কের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরে আল্লাহ–তাআলা পৃথিবীর বুকে নর–নারীর সৃষ্টিকে তাঁর কুদরতের অন্যতম বড় নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো—তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১)দাম্পত্যের মূল ভিত্তি প্রশান্তি, ভালোবাসা ও সহানুভূতি স্বামী–স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা, গভীর মমত্ব ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই একটি আদর্শ পরিবার গড়ে ওঠে। দাম্পত্য সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য শুধু শারীরিক সাহচর্য নয়; বরং তা হলো আত্মিক ও মানসিক আশ্রয়।পবিত্র কোরআনে স্ত্রীর পরিচয় দিতে গিয়ে ‘সাকিনা’ বা অন্তরের পরম শান্তির কথা বলা হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার স্ত্রীকে বানিয়েছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮৯)সুরা আন–নিসা, আয়াত: ১৯তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমনও হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তা–ই অপছন্দ করছ।ইসলামে নারী কি পুরুষের অনুগামীসংসারজীবন কখনো শতভাগ নিখুঁত হতে পারে না; মান–অভিমান, মতভেদ কিংবা স্বভাবের ভিন্নতা আসতেই পারে। ইসলাম সেখানে পারস্পরিক ক্ষমা, ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেয়।স্ত্রীর কোনো আচরণ পছন্দ না হলেও তার ভালো গুণগুলোর দিকে তাকিয়ে সহনশীল থাকার তাগিদ দিয়ে আল্লাহ–তাআলা স্বামীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমনও হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তা–ই অপছন্দ করছ।’ (সুরা আন–নিসা, আয়াত: ১৯)উত্তম স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য পরিবারের সামগ্রিক পরিবেশ শান্তিময় রাখতে স্ত্রীর মননশীলতা ও ইতিবাচক মনোভাবের ভূমিকা অপরিসীম। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা ও ক্লান্তি শেষে স্বামী ঘরে ফিরে যখন স্ত্রীর মুখে স্নিগ্ধ হাসি ও উষ্ণ সান্নিধ্য পায়, তখন সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়।একবার নবীজিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘কোন নারী সবচেয়ে উত্তম?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘স্বামী যার দিকে তাকালে সে তার মন প্রফুল্ল করে দেয়, কোনো বৈধ নির্দেশ দিলে তা সানন্দে পালন করে এবং নিজের সততা ও স্বামীর সম্পদের ব্যাপারে এমন কোনো আচরণ করে না, যা স্বামীর কাছে অপছন্দনীয়।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩২৩১)পার্থিব মোহ ও বিভ্রান্তির পথ পরিহার পরিবারে নারীর ভূমিকা শুধু সুখের নয়, নৈতিক দিকনির্দেশনারও। কোনো স্ত্রী যদি স্বামীকে হালাল আয়ে সন্তুষ্ট থাকার অনুপ্রেরণা না জুগিয়ে অতিরিক্ত ভোগবিলাসের চাপে হারাম উপার্জনের দিকে ঠেলে দেয়, তবে সে পরিবার নৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।ফকিহদের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের মধ্যকার প্রেম–ভালোবাসাপ্রয়োজন স্বামী–স্ত্রীর মধ্যকার গভীর বিশ্বাস, পারস্পরিক হক আদায় ও ত্যাগ স্বীকার। পরিবারে যদি সংঘাত ও অশান্তি বিরাজ করে, তবে তার বিষবাষ্প ধীরে ধীরে সন্তান ও সামগ্রিক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।ইসলামে এমন অসৎ প্ররোচনা ও অতিরিক্ত পার্থিব চাহিদাকে মারাত্মক সতর্কতার সঙ্গে দেখা হয়েছে।পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা মুমিনদের সতর্ক করে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু (অর্থাৎ তাদের অতিরিক্ত মোহ তোমাদের আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে)। সুতরাং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো। তবে তোমরা যদি তাদের মার্জনা করো, এড়িয়ে চলো এবং ক্ষমা করে দাও, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আত–তাগাবুন, আয়াত: ১৪)এখানে শত্রুর অর্থ হলো এমন মোহ বা প্ররোচনা, যা মানুষকে তার ইমান ও হালাল উপার্জনের পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে একজন স্বামীর দায়িত্ব হলো প্রজ্ঞার সঙ্গে স্ত্রীকে নসিহত করা এবং সংশোধনের চেষ্টা অব্যাহত রাখা।সুস্থ পরিবার থেকেই সুস্থ সমাজ একটি পরিবারের সুখ–শান্তি কোনো কৃত্রিমতা বা লোকদেখানো আচার দিয়ে স্থায়ী হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন স্বামী–স্ত্রীর মধ্যকার গভীর বিশ্বাস, পারস্পরিক হক আদায় ও ত্যাগ স্বীকার। পরিবারে যদি সংঘাত ও অশান্তি বিরাজ করে, তবে তার বিষবাষ্প ধীরে ধীরে সন্তান ও সামগ্রিক সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।সমাজ রূপান্তরের সবচেয়ে প্রাথমিক ও মৌলিক দুর্গ হলো পরিবার। আর সেই পরিবারের প্রশান্তির চাবিকাঠি রয়েছে নারীর স্নেহ, প্রজ্ঞা ও নৈতিক দৃঢ়তার হাতে। ঘর ঠিক থাকলে তবেই একটি পরিশুদ্ধ ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।মাহমুদ হাসান ফাহিম: আলেম ও লেখকহিজরতে মহানবী (সা.)–কে সাহায্য করলেন দৃঢ়চেতা এক নারী