জাতীয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দিন ধরে ভাইরাল এই 'রংধনু মেঘ' আসলে কী?

News সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬ 0
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দিন ধরে ভাইরাল এই 'রংধনু মেঘ' আসলে কী?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দিন ধরে ভাইরাল এই 'রংধনু মেঘ' আসলে কী?

বৃষ্টির পর রংধনু দেখে আমরা মুগ্ধ হই, কিন্তু ইরেডেসেন্ট ক্লাউড এক অন্য রকম সৌন্দর্য। পুরোপুরি রংধনু নয়, অথচ মেঘের গায়ে রংধনুর মতোই ছড়িয়ে থাকে নানা রঙের কোমল আভা। আকাশের এই বিরল অথচ অপূর্ব দৃশ্যের নাম ইরেডেসেন্ট ক্লাউড বা রংধনু মেঘ, যা মেঘের ইরেডেসেন্সের জন্যই হয়।

মেঘ দেখলে নানা রকম ভাবনা মাথায় আসে। কখনো মনে হয় নজরুলের ঝাঁকড়া চুল, কখনো রবীন্দ্রনাথের দাড়ি। গোধূলিতে কিংবা সূর্যোদয়ের সময় সোনালি আভায় মেঘ হয়ে ওঠে কোনো রূপবতী রাজকুমারী। আবার কখনো সাদা, নীল, গোলাপি, হলুদ কিংবা বেগুনি রঙের মিহি আভা মেঘের কিনারায় বা কোনো একটি অংশে এমনভাবে ফুটে ওঠে যে কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশটাকে বাস্তবের চেয়েও বেশি সুন্দর মনে হয়।

কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশটাকে বাস্তবের চেয়েও বেশি সুন্দর মনে হয়

বৃষ্টির পর রংধনু দেখে আমরা মুগ্ধ হই, কিন্তু ইরেডেসেন্ট ক্লাউড এক অন্য রকম সৌন্দর্য। পুরোপুরি রংধনু নয়, অথচ মেঘের গায়ে রংধনুর মতোই ছড়িয়ে থাকে নানা রঙের কোমল আভা। আকাশের এই বিরল অথচ অপূর্ব দৃশ্যের নাম ইরেডেসেন্ট ক্লাউড বা রংধনু মেঘ, যা মেঘের ইরেডেসেন্সের কারণে হয়।

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার জাঙ্গালের আকাশে দেখা গিয়েছিল এমনই এক বিরল দৃশ্য। গত ১ মে নীল আকাশের বুকে ভেসে থাকা একটি মেঘ হঠাৎ যেন রঙের ক্যানভাসে পরিণত হয়। গোলাপি, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজসহ রংধনুর নানা রঙে ঝলমল করছিল মেঘটি। দৃশ্যটি দেখে স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময় ও আনন্দ। মুহূর্তেই সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ একে ‘জাদুকরি’ দৃশ্য বলেছেন, আবার কারও কাছে এতটাই অবিশ্বাস্য লেগেছে যে কৃত্রিম ছবি বলেও মনে হয়েছে। অথচ এটি পুরোপুরিই স্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা।

গোলাপি, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজসহ রংধনুর নানা রঙে ঝলমল করছে মেঘ
এটি আলো, মেঘ আর প্রকৃতির নিজস্ব খেলা

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার আকাশেও এমন অপরূপ মেঘের দেখা মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন ভিত্তিহীন কৃত্রিম কনটেন্টের ছড়াছড়ি, তখন প্রকৃতির তৈরি এমন দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই মানুষের নজর কাড়ে। কারণ, ইরেডেসেন্ট ক্লাউড এমন এক সৌন্দর্য, যার কোনো কারিগরি নির্মাণ নেই, কোনো সাজানো পটভূমি নেই, আছে শুধু আলো, মেঘ আর প্রকৃতির নিজস্ব খেলা।

মেঘে এমন অদ্ভুত সুন্দর রং আসে কীভাবে?

বিষয়টি আসলে আলোর সঙ্গে মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণার এক সুন্দর সম্পর্কের ফল। সূর্যের আলো দেখতে সাদা হলেও এর মধ্যে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো রয়েছে। সূর্যের আলো যখন মেঘের খুব ছোট এবং প্রায় একই আকারের জলকণা বা বরফকণার স্তরের মধ্য দিয়ে যায়, তখন আলো ছড়িয়ে পড়ে এবং একে অন্যের ওপর পড়ে। এর ফলে মেঘের গায়ে দেখা দিতে পারে নানা রঙের কোমল আভা।

বিষয়টি আসলে আলোর সঙ্গে মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণার এক সুন্দর সম্পর্কের ফল
আলো এমনভাবে বিচ্ছুরিত হয় যে মেঘের গায়ে তৈরি হয় রঙিন আভা

অনেকটা তেলের ওপর পানির পাতলা স্তরে যে রঙিন ঝিলিক দেখা যায়, ইরেডেসেন্ট ক্লাউডের রঙের সঙ্গে তার কিছুটা মিল রয়েছে। সাধারণত পাতলা মেঘের আশপাশে এই দৃশ্য বেশি দেখা যায়। সূর্য যখন মেঘের পেছনে বা কাছাকাছি অবস্থানে থাকে এবং মেঘের কণাগুলোর আকার তুলনামূলকভাবে সমান হয়, তখন আলো এমনভাবে বিচ্ছুরিত হতে পারে যে মেঘের গায়ে তৈরি হয় রঙিন আভা।

রংধনু নয়, তবু রংধনুর মতো

দেখতে কাছাকাছি মনে হলেও ইরেডেসেন্ট ক্লাউড আর রংধনু এক ধরনের ঘটনা নয়। রংধনু সাধারণত বৃষ্টির জলকণার মধ্য দিয়ে সূর্যের আলোর প্রতিসরণ, অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ও বিচ্ছুরণের মাধ্যমে তৈরি হয়। অন্যদিকে মেঘের ইরেডেসেন্স মূলত মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণার কারণে আলোর ওভারল্যাপিংয়ের ফল।
রংধনুর রং সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ধনুকের আকৃতিতে দেখা যায়। ইরিডিসেন্ট ক্লাউডে রংগুলো অনেক বেশি কোমল এবং অনিয়মিতভাবে মেঘের গায়ে ছড়িয়ে থাকে। মেঘের একটি ছোট অংশে গোলাপি ও নীলের আভা দেখা যেতে পারে, আবার কখনো সবুজ, হলুদ ও বেগুনির মিশ্রণেও মেঘ সেজে ওঠে।

কয়েক মুহূর্তের সৌন্দর্য

ইরেডেসেন্ট ক্লাউডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক তার ক্ষণস্থায়িত্ব। এটি কোনো সাজানো দৃশ্য নয়, কখন দেখা যাবে বা কতক্ষণ থাকবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। মেঘের আকৃতি ও অবস্থান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে রংও বদলে যেতে পারে, এমনকি কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো দৃশ্যটি মিলিয়ে যেতে পারে।

ধরুন, অফিস থেকে ফেরার পথে রিকশায় বসে আছেন। হঠাৎ পাশের কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘ওই দেখুন!’ মাথা তুলে দেখলেন ধূসর মেঘের গায়ে গোলাপি আর নীলের আলো। ফোন বের করে ছবি তুলতে তুলতেই দৃশ্যটি বদলে গেল। এই ক্ষণস্থায়িত্বই সৌন্দর্যটাকে আরও গভীর করে।

আমাদের জীবনের অনেক সুন্দর মুহূর্তের মতো ইরেডেসেন্ট ক্লাউডও স্থায়ী নয়। তাকে ধরে রাখা যায় না, নিজের ইচ্ছেমতো ফিরিয়ে আনা যায় না। শুধু দেখা যায়, অনুভব করা যায়, আর কখনো একটি ছবিতে স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়া যায়।

আমাদের জীবনের অনেক সুন্দর মুহূর্তের মতো ইরেডেসেন্ট ক্লাউডও স্থায়ী নয়

শহরের আকাশেও দেখা মিলতে পারে

এমন দৃশ্য দেখতে শহর ছেড়ে দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অনুকূল আবহাওয়ায় শহরের আকাশেও মেঘের ইরেডেসেন্স দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে পাতলা মেঘ সূর্যের কাছাকাছি অবস্থান করলে মেঘের গায়ে এই রঙিন আভা ফুটে উঠতে পারে। তবে সূর্যের দিকে সরাসরি খালি চোখে তাকানো নিরাপদ নয়। তাই এমন দৃশ্য দেখার সময় চোখের নিরাপত্তার বিষয়টিও মনে রাখা জরুরি।

আকাশের দিকে তাকানোর অভ্যাসের সঙ্গে আমাদের অনুভূতির গভীর সম্পর্ক আছে। সারা দিন একই চার দেয়ালের মধ্যে কাজ করার পর কয়েক মিনিট খোলা আকাশ দেখা মনকে কিছুটা বিরতি দিতে পারে। মেঘের চলাচল, আলোর পরিবর্তন কিংবা বিকেলের রং বদলে যাওয়া আমাদের মনোযোগকে কিছুক্ষণের জন্য দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে আনে।

ইরেডেসেন্ট ক্লাউড যেন সেই পুরোনো অভ্যাসটাকেই আবার মনে করিয়ে দেয়

ছোটবেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেঘ দেখা কত ভালো লাগত। মেঘের মধ্যে কখনো হাতি, কখনো পাহাড়, কখনো কোনো মানুষের মুখ খুঁজে পাওয়া যেত। বড় হতে হতে সেই শিশুসুলভ অভ্যাসটা হারিয়ে গেছে। অথচ আকাশ এখনো প্রতিদিন নতুন নতুন ছবি আঁকে। ইরেডেসেন্ট ক্লাউড যেন সেই পুরোনো অভ্যাসটাকেই আবার মনে করিয়ে দেয়। জীবন সব সময় বড় কোনো ঘটনার জন্য অপেক্ষা করে না। কখনো একটি সুন্দর গান, বৃষ্টির গন্ধ, জানালায় এসে পড়া বিকেলের আলো কিংবা মেঘের গায়ে হঠাৎ ফুটে ওঠা কয়েকটি রংই মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ইরেডেসেন্ট ক্লাউডের সৌন্দর্য তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক বিষয়, আলৌকিক কোনো ঘটনা নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, চারপাশের পৃথিবীকে সুন্দরভাবে দেখার জন্য সব সময় বিশেষ কোনো জায়গায় যেতে হয় না। কখনো শুধু একটু থামতে হয়, মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাতে হয়। সেই মুহূর্তে মেঘের গায়ে রং না–ও থাকতে পারে, ধূসর আকাশই দেখা যেতে পারে, তবু তাকিয়ে থাকা যায়। কারণ, আকাশ বদলাতে খুব বেশি সময় নেয় না।যাপিত জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে প্রকৃতির এমন ছোট ছোট চমকই তো মনকে বাঁচিয়ে রাখার খোরাক জোগায়।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, স্কাইব্রেরি, দ্য গার্ডিয়ান

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন

জাতীয়

View more
প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের নীতিগত সহায়তা চায় বিটিএমএ
প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের নীতিগত সহায়তা চায় বিটিএমএ

প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখতে ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা বন্ড সুবিধার পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ বহাল রাখা, ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সহজ করাসহ একাধিক নীতিগত সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) গুলশান ক্লাবে প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভা থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। সভায় বিটিএমএ নেতারা বলেন, দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামালের অন্যতম প্রধান উৎস। এ খাতের উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে ব্যবসাবান্ধব নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধার পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির বিদ্যমান সুযোগ বহাল রাখার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বিটিএমএ বলছে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ ও নিয়মিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক রাখা জরুরি। সভা থেকে প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ, পুনঃঅর্থায়ন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সহজ করারও দাবি জানানো হয়। উদ্যোক্তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়া হলে শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হবে। এদিকে, সম্প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বিটিএমএ। সংগঠনটির নেতারা বলেন, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকটের পর সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিতে প্রাইমারি টেক্সটাইল মিলগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং তৈরি পোশাক শিল্পে কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সভায় বিটিএমএ সহসভাপতি ও জাতীয় সংসদের শিল্প বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম, এমপি বলেন, সরকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে কাজ করছে। জ্বালানি সংকট দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা উল্লেখ করে তিনি এর স্থায়ী সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির বিদ্যমান সুযোগ বহাল থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন। বিটিএমএ-এর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন । তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে । তিনি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থ, শিল্পের সক্ষমতা এবং রাজস্ব সুরক্ষাকে সমন্বয় করে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বন্ড ব্যবস্থার অপব্যবহার প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বৈধ ও নিয়মিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ আরও সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ।মতবিনিময় সভায় উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি-রপ্তানি, বন্ড সুবিধা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সক্ষমতাসহ প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। সভায় সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতারা এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অংশ নেন। আইএইচও/এসএনআর

News সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬ 0
সাবেক সেনা কর্মকর্তা তারেক সাঈদকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি

সাবেক সেনা কর্মকর্তা তারেক সাঈদকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি

বিদেশ থেকে ফেরার পথে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেফতার

বিদেশ থেকে ফেরার পথে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেফতার

শাহবাগ ব্লকেড

শাহবাগ ব্লকেড

ইয়েমেন কীভাবে বারবার যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে
ইয়েমেন কীভাবে বারবার যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে

ইয়েমেনের যুদ্ধ এক দশক পেরিয়ে গেলেও থামেনি। হুতি, সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা পক্ষের স্বার্থে জটিল হয়ে ওঠা এই সংঘাতের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানুন ভিডিওতে…

News সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬ 0
সাংবাদিক শ্যামল দত্তকে জিজ্ঞাসাবাদে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি

সাংবাদিক শ্যামল দত্তকে জিজ্ঞাসাবাদে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি

পালকের নাম মাশরেফা

পালকের নাম মাশরেফা

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে লম্বা ক্যারিয়ার কার

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে লম্বা ক্যারিয়ার কার

বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ
বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ

সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীমো. আমীর হোসাইন চৌধুরীপ্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তরসমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের মাধ্যমে বাড়তি মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। ম্যানগ্রোভ মৎস্য চাষে সহায়তা করে ও উৎপাদন বাড়ায়—এটি নতুন নয়। তবে কোথায় এ ধরনের চাষ করা যাবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোনোভাবেই প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে মৎস্য চাষ করা যাবে না। চকরিয়া সুন্দরবন এর বড় উদাহরণ।২০১২ সাল থেকে আমরা উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের পাইলটিং করছি। কালীগঞ্জ ও শ্যামনগরে ১০০ হেক্টর এলাকায় ৩০০টি ঘেরে কেওড়া, বাইন, গোলপাতাসহ উপযোগী প্রজাতি লাগানো হয়েছে। সব এলাকায় ম্যানগ্রোভ না হওয়ায় কোথাও মূল ভূখণ্ডের প্রজাতিও পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো হয়েছে।বড় পরিসরে যেতে সম্ভাবনাময় ১ লাখ ৯৫ হাজার হেক্টর এলাকার সঠিক ম্যাপিং করতে হবে। কোথায় ম্যানগ্রোভ উপযোগী এবং কারা নিজস্ব বা ইজারা নেওয়া জমিতে চাষ করছেন, তা চিহ্নিত করে প্রথম পর্যায়ে নিজস্ব জমির চাষিদের যুক্ত করা যেতে পারে।চিংড়িঘের যেখানে আছে, সেখানে কী পরিমাণ মাটির বাঁধ আছে, আগে সেটার একটা প্রকৃত চিত্র (ম্যাপিং) করতে হবে। এ চিত্র পাওয়ার পর কী পরিমাণ ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করা যাবে, সেটা ঠিক করতে হবে।চিংড়িঘেরে এ ধরনের ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ একদিকে মাছকে ছায়া দেবে, গাছের পাতা পানিতে পড়ে প্লাঙ্কটনের জোগান বাড়াবে। সব মিলিয়ে চিংড়ির জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। যেহেতু এখানে কীটনাশক, ফিড ও সারের ব্যবহার কম হবে, ফলে এখানে অর্গানিক চিংড়ির উৎপাদন বাড়বে। তাতে হাই ভ্যালু প্রোডাক্ট (উচ্চ মূল্যের) হিসেবে চিংড়ির রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ আছে। প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভকে রক্ষা করেই এটা করতে হবে।ড. মো. লতিফুল ইসলামড. মো. লতিফুল ইসলামমহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)কার্বন বাফারিংয়ের জন্য একটি দেশের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন। সে তুলনায় আমাদের বনাঞ্চল খুবই কম এবং এর বড় অংশ সুন্দরবন, শালবন ও মধুপুরে সীমিত। তাই উপকূলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মাছের প্রজনন, খাদ্য ও বিচরণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। চিংড়ি চাষ নিয়ে পরিবেশদূষণের অভিযোগের পর গবেষণায় আমরা দেখেছি, জোয়ারের পানি ঘেরে ওঠানামার ফলে পলি জমে এবং পানি পরিশোধিত হয়ে বের হয়। ম্যানগ্রোভের লিটারে থাকা নাইট্রোজেন ও ফসফরাস মৎস্যসম্পদের পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে।‘আমাদের উপকূলে যেখানে চিংড়ির চাষ হয়, সেখানে সব জমি ম্যানগ্রোভ চাষের উপযোগী কি না, সেটা আগে দেখতে হবে। এর পাশাপাশি আমাদের চিংড়ির জোনিং (চিংড়ির জন্য নির্ধারিত অঞ্চল) করতে হবে।’ জোনিংয়ের পাশাপাশি জোনের ভেতরেও ঠিক করতে হবে কোথায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক, সেমি–ইনটেনসিভ ও এক্সটেনসিভ চাষ হবে। প্রয়োজনে সেমি–ইনটেনসিভ এলাকার পাশে ১০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ বাফার জোন রাখা যেতে পারে।চিংড়ি একসময় রপ্তানি পণ্যের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। বর্তমানে রপ্তানিতে চিংড়ি এখন চতুর্থ বা পঞ্চম অবস্থানে। চিংড়িকে রপ্তানির তালিকায় ১ নম্বরে নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে আমাদের আধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। এ বিষয়ে মৎস্য, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।মো. সাজদার রহমানমো. সাজদার রহমানপরিচালক, ব্লু ইকোনমি, মৎস্য অধিদপ্তরসুন্দরবনকে আমরা মৎস্যসম্পদের আঁতুড়ঘর হিসেবে দেখি। ম্যানগ্রোভের পাতা ও ছোট ডাল পানিতে পচে পুষ্টি তৈরি করে, যা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, জুপ্ল্যাঙ্কটনসহ চিংড়ির খাদ্য তৈরিতে সহায়তা করে। গবেষণায় আমরা দেখেছি, সুন্দরবনের লিফ লিটার ব্যবহার করলে চিংড়ির পোনার টিকে থাকার হার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। ম্যানগ্রোভের শিকড় চিংড়ির খোলস বদলের সময় আশ্রয়ও দেয়।প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ করে কোথায় সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ করা যাবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতাকে আরও বড় পরিসরে প্রদর্শনী হিসেবে মাঠে প্রয়োগ করা দরকার। কারণ, লাভজনক মডেল দেখলে চাষিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আগ্রহী হবেন।বড় পরিসরে যেতে হলে চাষিদের মালিকানা ও জমির ধরনও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এলাকার সঠিক ম্যাপিং জরুরি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি জাতীয় কাঠামো বা কারিগরি নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন। এতে স্থান নির্বাচন, ম্যানগ্রোভ প্রজাতি, পোনা, মজুত ঘনত্ব, জীবনিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগ নজরদারি ও পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়গুলো থাকতে হবে।মৎস্য ও বন বিভাগের যৌথ ব্যবস্থাপনায় কাজটি আরও কার্যকর হতে পারে। তবে সাতক্ষীরা, খুলনা বা কক্সবাজার—সব এলাকার পরিবেশ এক নয়। তাই একসঙ্গে বড় পরিসরে না গিয়ে আগে এলাকার উপযোগিতা যাচাই করে যেখানে সুফল বেশি, সেখানে ধাপে ধাপে এ মডেল সম্প্রসারণ করা উচিত।নাজমুল আহসাননাজমুল আহসানঅধ্যাপক, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়মাঠপর্যায় ও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় আমরা দেখেছি, ম্যানগ্রোভ চিংড়ির টিকে থাকা ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করে। অগভীর পানিতে গাছের ছায়া চিংড়িকে আশ্রয় দেয় এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তবে উপকূলে শুধু ঘেরে গাছ লাগালেই হবে না; পুরো উপকূলীয় এলাকার পানি ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।আমরা প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের কথা বলছি। কিন্তু চারদিকে বাঁধ, গেট ও বিভিন্ন অবকাঠামো দিয়ে পানি আটকে রেখে শুধু ভেতরে গাছ লাগালে প্রকৃতিনির্ভর সমাধান হবে না। প্রকৃতিকে তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তাই ম্যানগ্রোভ লাগানোর পাশাপাশি পুরো উপকূলীয় বেল্টকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।আমাদের দেশে পরিকল্পনার ঘাটতি নেই; ঘাটতি মূলত কার্যকর বাস্তবায়ন ও পর্যায়ভিত্তিক উদ্যোগে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুন্দরবনভিত্তিক সমন্বিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাকে পুরো উপকূলীয় বেল্টে সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, দাতা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাজের ম্যাপিং করে কোথায় কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা জরুরি।গবেষণায় দেখেছি, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ কৃষকের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং এর পরিবেশগত কিছু বাড়তি সুফলও রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের সহায়তা ছাড়া কৃষকেরা সহজে এ ধরনের চাষে যাবেন না। তাই এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে নীতি সহায়তা, কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।সৈয়দা আফজালুন নেসাসৈয়দা আফজালুন নেসাহেড অব সাসটেইনেবিলিটি, এইচএসবিসি বাংলাদেশআজকের মূল প্রবন্ধে যেমনটি উঠে এসেছে, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষে চাষিদের জন্য দৃশ্যমান আর্থিক লাভ নিশ্চিত করা গেলে এই পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে পারে। তাই উপকূলীয় মানুষের জীবিকা, পরিবেশগত অবদান এবং দুর্যোগঝুঁকি—তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষকে একটি লাভজনক ও টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করা গেলে এই মডেল দেশের পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।এইচএসবিসি বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা নিশ্চিতে কাজ করছে। দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা মিরসরাইয়ের জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ নিই। ব্র্যাকের সঙ্গে অংশীদারত্বে বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় দুই লাখের বেশি ম্যানগ্রোভ চারা বেড়ে উঠছে, যা উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে।২০২৪ সালে আমরা সাতক্ষীরায় সলিডারিডাডের সঙ্গে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের একটি সমন্বিত উদ্যোগ শুরু করি। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব কমাতে সহায়তা করে এবং অন্যান্য অনেক গাছের তুলনায় বেশি কার্বন শোষণ ও সংরক্ষণ করতে পারে।আমাদের লক্ষ্য শুধু ম্যানগ্রোভ রোপণ নয়, এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সুযোগকেও যুক্ত করা। ম্যানগ্রোভ চিংড়ির জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস তৈরি করে এবং চিংড়ি চাষে রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁরা ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারি পরিচালনা ও চারা উৎপাদনের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি করছেন।এভাবে প্রকৃতি সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা, টেকসই জীবিকা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে একই উদ্যোগের আওতায় এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।সেলিম রেজা হাসানসেলিম রেজা হাসানবাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়াবাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ। জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে অনেক কৃষক মৎস্য চাষ, বিশেষ করে চিংড়ি চাষে যুক্ত হয়েছেন। এ বাস্তবতায়, কীভাবে চিংড়ি চাষকে আরও পরিবেশবান্ধব করা যায় , যাতে প্রকৃতির ক্ষতি না করে কৃষকের জীবিকা নিশ্চিত করা যায়; এই লক্ষ্যেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক জলবায়ু-অভিযোজন ও প্রশমন মডেল তৈরির চেষ্টা করেছি। এইচএসবিসির সহায়তায় ১০০ হেক্টর জমিতে ম্যানগ্রোভ রোপণের মাধ্যমে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। প্রায় ৩০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ রাখলে বাস্তুতন্ত্রে কী পরিবর্তন আসে, কৃষক কী সুবিধা পান এবং দীর্ঘ মেয়াদে কীভাবে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়, আমরা তা দেখার চেষ্টা করেছি।অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি উপকূলের জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে ও প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে জোর দেওয়া জরুরি। ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ গ্রহণে কৃষকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এর সুবিধা পেতে দীর্ঘমেয়াদি সময় লাগে। আবার উপকূলের অনেক কৃষক ভাগচাষি; তাঁদের নিজেদের জমি নেই। নিজের জমি না থাকায় তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি এই পদ্ধতি গ্রহণ করবেন কেন, সেটিও বড় প্রশ্ন।উজানের পানির প্রবাহ কমে উপকূলে লবণাক্ততা ও পলি বাড়ছে। এতে চিংড়ির উৎপাদন কমে মৃত্যুহার বাড়ছে। তাই ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের পাশাপাশি কৃষকের চাষপদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।আমাদের লক্ষ্য উপকূলীয় মানুষের সহনশীল জীবিকা নিশ্চিত করা। ১০০ হেক্টরের পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ৫ হাজার বা ১০ হাজার হেক্টরে মডেলটি সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ও গবেষণা দরকার। পাশাপাশি নারীদের জন্য ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদনে ভাসমান নার্সারির মতো বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অত্যন্ত কার্যকরী একটি প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান, যা কেবল খাদ্য ও জীবিকা নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং পুরো উপকূলীয় ইকোসিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিত করে টেকসই অভিযোজনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।মোহাম্মদ নুরুল আযমমোহাম্মদ নুরুল আযমপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এক্সেমপ্লেরি কনসালটিংউপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবিকা কৃষি ও মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল। চিংড়ি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হলেও চিংড়ি চাষ করতে গিয়ে অনেক ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হয়েছে। তাই আমাদের প্রশ্ন হলো, কৃষকের জীবিকা রক্ষা করে কীভাবে মাছ চাষ করা যায় এবং একই সঙ্গে প্রকৃতিকে রক্ষা করা যায়।আমরা তিনটি মডেল তুলনা করেছি—একক চিংড়ি চাষ, চিংড়ির সঙ্গে অন্যান্য মাছের সমন্বিত চাষ এবং সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ। শেষের মডেলে পুকুরের প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় ম্যানগ্রোভ রাখা হয় এবং চিংড়ি, মাছ, কাঁকড়ার পাশাপাশি মধু, গোলপাতা ও অন্যান্য ম্যানগ্রোভজাত পণ্য থেকে আয় করার সুযোগ থাকে। শুরুতে কিছু বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে এ মডেলে কৃষকের আয় বেশি। পাশাপাশি ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষা, পানির মান উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও কার্বন সংরক্ষণের মতো বাড়তি সুবিধাও পাওয়া যায়।বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষে দীর্ঘ মেয়াদে কৃষক ও সমাজ—দুই পক্ষই বেশি উপকৃত হয়। তবে ম্যানগ্রোভ পরিপক্ব হতে পাঁচ থেকে আট বছর সময় লাগে। তাই কৃষকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, নিরাপদ জমির অধিকার এবং কার্বন ও প্রতিবেশব্যবস্থার সেবার মূল্যায়ন জরুরি।বর্তমানে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনায় চিংড়ি চাষের বড় এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় মডেলটি সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। ১০০ হেক্টরের পাইলট প্রকল্প থেকে আমাদের আরও বড় পরিসরে যেতে হবে। এ জন্য সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ, গবেষণা, সহজ অর্থায়ন ও বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রয়োজন। আমরা যদি এই মডেলকে বৃহৎ পরিসরে নিতে পারি, তাহলে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি উপকূলীয় প্রকৃতি ও সুন্দরবনের ওপর চাপও কমানো সম্ভব।এ কে ওসমান হারুনীএ কে ওসমান হারুনীসিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার-অ্যাগ্রিকালচার; ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাসম্যানগ্রোভ শুধু গাছ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেশব্যবস্থা। তাই ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষে জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশব্যবস্থা পুনরুদ্ধারকেও গুরুত্ব দিতে হবে। চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণে চকরিয়া সুন্দরবনসহ অনেক প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করেছি। এর পরিণতি এখন উপকূলের নানা দুর্যোগে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি চাষ একসময় খুব লাভজনক ছিল। কিন্তু উৎপাদনশীলতা কমছে। শুধু চাষের এলাকা বাড়িয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না; আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা ও ভালো মানের পোনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষের মডেলকে আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কোথায় কতটুকু ম্যানগ্রোভ থাকবে, কীভাবে অন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে এবং কোন এলাকায় কোন প্রজাতি উপযোগী—এসব বিষয়ও দেখতে হবে।যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক বন ইতিমধ্যে নষ্ট হয়েছে, সেখানে শুধু গাছ লাগানো নয়, পুরো প্রতিবেশব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের দিকে যেতে হবে। তবে সব জায়গায় চিংড়ি চাষ উপযোগী হবে না। তাই বিদ্যমান চিংড়ি চাষের এলাকায় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং উপযুক্ত জায়গায় সমন্বিত মডেল চালুর সুযোগ দেখতে হবে।এ ক্ষেত্রে কৃষকের লাভের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জমি কম, তাই আরও উৎপাদনশীল ও বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেতে হবে। বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি পোনা, হ্যাচারি, বিতরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদনে ভাসমান নার্সারির উদ্যোগটি আমার কাছে আশাব্যঞ্জক মনে হয়েছে। সফলভাবে এটি করা গেলে স্থানীয় মানুষ ও কৃষকের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।মইন উদ্দিন আহমেদমইন উদ্দিন আহমেদঅ্যাকুয়াকালচার বিশেষজ্ঞম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত চিংড়ি চাষের সমস্যা, বিশেষ করে পলি জমে পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত চাপ কমানো। আমরা দেখেছি, ম্যানগ্রোভ থাকলে রোগের ঝুঁকি কমে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং কৃষক ম্যানগ্রোভজাত পণ্য থেকে বাড়তি আয় করতে পারেন।তবে এ পদ্ধতি নিয়ে আরও গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে যাচাই প্রয়োজন। কৃষকেরা নিজেরা কতটা এই প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন এবং কী কী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন, তা জানা জরুরি। কারণ কৃষক ও পরিবেশ—দুই পক্ষই উপকৃত হলে সরকারও এ খাতে আরও কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করতে পারবে।বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এ মডেলের বড় সুযোগ রয়েছে। নতুন জেগে ওঠা দ্বীপ বা উপযুক্ত এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভ ও চিংড়ি চাষ সমন্বয় করা যেতে পারে। যেমন, ৬০ শতাংশ এলাকায় ম্যানগ্রোভ ও ৪০ শতাংশ এলাকায় চিংড়ি চাষের মতো মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে যেখানে লবণাক্ততা বা পলি জমার কারণে চিংড়ি চাষের উৎপাদনশীলতা কমে গেছে, সেসব এলাকার বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।আমাদের চিংড়ি খাতকে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। এলডিসি উত্তরণের পর বাড়তে পারে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয়—সেই চ্যালেঞ্জও এখন থেকেই বিবেচনায় নিতে হবে। ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়িকে পরিবেশবান্ধব ও মূল্য সংযোজিত পণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ব্যয় কমানো সম্ভব। আমার ২৪ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আরও গবেষণার মাধ্যমে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।কানিজ ফাতেমা–তুজ–জহুরাকানিজ ফাতেমা–তুজ–জহুরাবিশেষজ্ঞ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মৎস্য চাষ খাত, ব্র্যাকবাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা অনেক বড় এবং সব জায়গায় লবণাক্ততার মাত্রাও এক নয়। তাই সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ কোথায় কীভাবে করা হবে, তা নির্ধারণে লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করা জরুরি। লবণাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী কোন এলাকায় কোন ম্যানগ্রোভ প্রজাতি উপযোগী এবং কৃষক কীভাবে তা গ্রহণ করবেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।এই মডেলকে বড় পরিসরে নিতে হলে তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে। প্রথমত, কৃষকের লাভ কতটা হচ্ছে এবং তিনি পদ্ধতিটি কতটা গ্রহণ করছেন। আমরা দেখেছি, একক চাষের তুলনায় বহুমুখী চাষে লাভ বেশি। তবে কৃষক বাস্তবে কতটা এটি গ্রহণ করছেন, সেটি আরও যাচাই করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু সহনশীলতা তৈরিতে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের ভূমিকা কতটা। তৃতীয়ত, প্রতিবেশব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এর সুবিধা কতটা।কৃষকের পর্যায়ে এ পদ্ধতি গ্রহণে আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চিংড়ি চাষে ক্ষতি বা উৎপাদন কমে গেলে কীভাবে আরও ভালো ও টেকসই পদ্ধতিতে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে।চকরিয়া সুন্দরবনের মতো এলাকায় চিংড়ি চাষের কারণে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে আছে। তাই লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করে বেশি লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ চালু করা গেলে এটি বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব। কৃষকের লাভ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং প্রতিবেশব্যবস্থার সুবিধা—এই তিনটি দিক সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশের উপকূলের জন্য একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা সম্ভব।কাজী ইমদাদুল হককাজী ইমদাদুল হকসিনিয়র ডিরেক্টর ও হেড অব ক্লাইমেট অ্যাকশন, ফ্রেন্ডশিপআমরা প্রায় ১২ বছর ধরে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ নিয়ে কাজ করছি এবং প্রায় ১০ লাখ গাছ লাগিয়েছি। এত দিন ম্যানগ্রোভ ও চিংড়িকে দুটি বিপরীত বিষয় হিসেবে দেখেছি। কিন্তু চিংড়িকেও বাদ দেওয়া যায় না, ম্যানগ্রোভকেও নয়। তাই কয়েক বছর ধরে দুটিকে কীভাবে সমন্বিত করা যায়, তা নিয়ে ভাবছি।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই মডেল কার জন্য—বড় ঘেরের মালিক, নাকি এক বিঘা বা জমিহীন কৃষকের জন্যও? ম্যানগ্রোভের সুবিধা শুধু উৎপাদন বা কার্বন নয়, উপকূলের মানুষের সুরক্ষা, জীবিকা ও প্রতিবেশব্যবস্থার সুবিধাও এর সঙ্গে যুক্ত। ম্যানগ্রোভ লাগানোর পর স্থানীয় মানুষ মাছ ধরে আয় করছেন, নারীরাও সুফল পাচ্ছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিতে হবে।ম্যানগ্রোভের তাৎক্ষণিক খরচ হিসাব করলেও এটি না থাকলে পরিবেশগত ক্ষতির মূল্যায়ন করি না। ঘেরের চারপাশে ৩০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ রাখার মডেলটি জলবায়ু সহনশীলতার জন্য কতটা কার্যকর, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা দরকার। টেকসই জীবিকা ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের মধ্যে সমন্বয় করেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।সারোয়ার আলমসারোয়ার আলমপ্রোগ্রাম ম্যানেজার, আইইউসিএন বাংলাদেশম্যানগ্রোভের সঙ্গে মৎস্য উৎপাদন ও জীবিকার সমন্বয় একটি ভালো প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের উদাহরণ হতে পারে। তবে শুধু গাছ লাগানো, বনভূমি বাড়ানো, পানির মান উন্নত করা বা মানুষের জীবিকা উন্নত হলেই সেটিকে নেচার-বেজড সলিউশন বলা যাবে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ২৮টি সূচক ও ৮টি মানদণ্ডের সঙ্গে এই উদ্যোগকে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।উপকূলীয় এলাকায় সব জায়গায় ম্যানগ্রোভ লাগানো সম্ভব নয়। তাই বন, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য চাষ, মানুষের জীবিকা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার মানে শুধু গাছ লাগানো নয়, এর সঙ্গে জীবিকা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নও যুক্ত করতে হবে।এ জন্য একটি জাতীয় মানদণ্ডভিত্তিক নির্দেশিকা দরকার। সব অংশীজনকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বর্তমান নীতি ও আইনগুলোতে নেচার-বেজড সলিউশনের বিষয়টি যুক্ত করে এগোতে পারলে ১০০ হেক্টর থেকে ১ হাজার, ২ হাজার বা ৫ হাজার হেক্টরে এ মডেল সম্প্রসারণ করা সম্ভব।লতিকা বালা বৈদ্যলতিকা বালা বৈদ্যউদ্যোক্তা, ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারিআমি খুলনার পাইকগাছা থানার কেওড়াতলা গ্রামের এক নারী উদ্যোক্তা। ২০২৪ সালে আমাদের গ্রামে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সভায় অংশ নিয়ে জানতে পারি, ম্যানগ্রোভ চিংড়ি চাষের জন্য কতটা উপকারী, বিশেষ করে তাপমাত্রার প্রভাব থেকে চিংড়িকে রক্ষা করতে। তবে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষে বড় সমস্যা হলো চারার সংকট। প্রকল্পের মাধ্যমে নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগে আমি যুক্ত হই।আমার সমতল জায়গা ছিল না, তাই বাড়ির পাশের পাঁচ শতকের ছোট পুকুরেই নার্সারি করি। প্রশিক্ষণে বীজ সংগ্রহ, রোপণ ও পরিচর্যার পদ্ধতি শিখি। সাড়ে আট কেজি বীজ থেকে প্রায় ৮ হাজার ২০০টি চারা তৈরি করে প্রকল্পের সহায়তায় বিক্রি করি। এতে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা আয় হয়। একই পুকুরে দুই হাজার বাগদা চিংড়ির পোনা ছেড়ে ১৫ কেজি বাগদা ও ২০ কেজি তেলাপিয়া বিক্রি করেছি। ফলে একই জায়গা আমার আয়ের দুটি উৎস হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্প না এলে এত বড় স্বপ্ন দেখাও সম্ভব হতো না।তুষার কান্তি মন্ডলতুষার কান্তি মন্ডলচিংড়িচাষি, আইএমবিএ কৃষকআমি প্রায় ১৪ বছর ধরে চিংড়ি চাষ করছি। বর্তমানে আমার প্রায় ২৫ বিঘা ঘের আছে। তবে গত সাত থেকে আট বছর মাছের উৎপাদন অনেক কমে গিয়েছিল। ২০২৪ সালে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জানতে পারি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খাদ্যের অভাবও মাছ মারা যাওয়ার কারণ।সলিডারিডাড কর্তৃক আয়োজিত প্রশিক্ষণ ও সভায় অংশ নিয়ে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের উপকারিতা জেনে ও প্রকল্পের সহায়তায় তিনটি ঘেরে প্রায় ১৪ বিঘা জমিতে ২৫০টি ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ করি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক গাছ মারা গেলেও এখন প্রায় ১৩০টি টিকে আছে। রৌদ্রের সময় চিংড়ি গাছের ছায়া ও শিকড়ের আশপাশে আশ্রয় নেয়। পানিও সবুজ হয়েছে, প্ল্যাঙ্কটন তৈরি হওয়ায় মাছের খাবারের চাহিদা মিটছে। ফলে সার ও খাবারের ব্যবহার ও উৎপাদন খরচ কমছে। ভবিষ্যতে ম্যানগ্রোভ থেকে বাড়তি আয়ও হবে। এই সমন্বিত চাষ চিংড়ি চাষের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।সুপারিশপ্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ রক্ষা করে উপযুক্ত এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ।উপকূলীয় এলাকার ম্যাপিং ও লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করে চাষের এলাকা নির্ধারণ। মৎস্য, বন ও পরিবেশ বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন।চাষিদের জন্য সহজ অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা।স্থানীয়ভাবে ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদন ও ভাসমান নার্সারি সম্প্রসারণ।ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করা। অংশগ্রহণকারীমো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, প্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর। মো. লতিফুল ইসলাম, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। মো. সাজদার রহমান, পরিচালক, ব্লু ইকোনমি, মৎস্য অধিদপ্তর।ড. নাজমুল আহসান, অধ্যাপক, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। সৈয়দা আফজালুন নেসা, হেড অব সাসটেইনেবিলিটি, এইচএসবিসি বাংলাদেশ। সেলিম রেজা হাসান, বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া। মোহাম্মদ নুরুল আযম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এক্সেমপ্লেরি কনসালটিং।এ কে ওসমান হারুনী, সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার-অ্যাগ্রিকালচার, ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস। মইন উদ্দিন আহমেদ, অ্যাকুয়াকালচার বিশেষজ্ঞ। কানিজ ফাতেমা–তুজ–জহুরা, বিশেষজ্ঞ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মৎস্য চাষ খাত, ব্র্যাক। কাজী ইমদাদুল হক, সিনিয়র ডিরেক্টর ও হেড অব ক্লাইমেট অ্যাকশন, ফ্রেন্ডশিপ। সারোয়ার আলম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, আইইউসিএন। লতিকা বালা বৈদ্য, উদ্যোক্তা, ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারি। তুষার কান্তি মণ্ডল, চিংড়িচাষি, আইএমবিএ কৃষক। সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।

News সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬ 0
কাপ্তাই লেকে প্রভা, ভাসমান ভিলায় কাটালেন 'কোয়ায়েট এস্কেপ'

কাপ্তাই লেকে প্রভা, ভাসমান ভিলায় কাটালেন 'কোয়ায়েট এস্কেপ'

সাইবার যুদ্ধ ঘনিয়ে আসছে, চীনকে কীভাবে ঠেকাবে যুক্তরাষ্ট্র

সাইবার যুদ্ধ ঘনিয়ে আসছে, চীনকে কীভাবে ঠেকাবে যুক্তরাষ্ট্র

সুনেরাহ্‌ বিনতে কামাল বললেন, ‘আমি আসলে খানিকটা সময়ের জন্য পেতনি হতেও চাই’

সুনেরাহ্‌ বিনতে কামাল বললেন, ‘আমি আসলে খানিকটা সময়ের জন্য পেতনি হতেও চাই’

0 Comments