সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
প্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর
সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের মাধ্যমে বাড়তি মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। ম্যানগ্রোভ মৎস্য চাষে সহায়তা করে ও উৎপাদন বাড়ায়—এটি নতুন নয়। তবে কোথায় এ ধরনের চাষ করা যাবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোনোভাবেই প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে মৎস্য চাষ করা যাবে না। চকরিয়া সুন্দরবন এর বড় উদাহরণ।
২০১২ সাল থেকে আমরা উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের পাইলটিং করছি। কালীগঞ্জ ও শ্যামনগরে ১০০ হেক্টর এলাকায় ৩০০টি ঘেরে কেওড়া, বাইন, গোলপাতাসহ উপযোগী প্রজাতি লাগানো হয়েছে। সব এলাকায় ম্যানগ্রোভ না হওয়ায় কোথাও মূল ভূখণ্ডের প্রজাতিও পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো হয়েছে।
বড় পরিসরে যেতে সম্ভাবনাময় ১ লাখ ৯৫ হাজার হেক্টর এলাকার সঠিক ম্যাপিং করতে হবে। কোথায় ম্যানগ্রোভ উপযোগী এবং কারা নিজস্ব বা ইজারা নেওয়া জমিতে চাষ করছেন, তা চিহ্নিত করে প্রথম পর্যায়ে নিজস্ব জমির চাষিদের যুক্ত করা যেতে পারে।
চিংড়িঘের যেখানে আছে, সেখানে কী পরিমাণ মাটির বাঁধ আছে, আগে সেটার একটা প্রকৃত চিত্র (ম্যাপিং) করতে হবে। এ চিত্র পাওয়ার পর কী পরিমাণ ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করা যাবে, সেটা ঠিক করতে হবে।
চিংড়িঘেরে এ ধরনের ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ একদিকে মাছকে ছায়া দেবে, গাছের পাতা পানিতে পড়ে প্লাঙ্কটনের জোগান বাড়াবে। সব মিলিয়ে চিংড়ির জন্য একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। যেহেতু এখানে কীটনাশক, ফিড ও সারের ব্যবহার কম হবে, ফলে এখানে অর্গানিক চিংড়ির উৎপাদন বাড়বে। তাতে হাই ভ্যালু প্রোডাক্ট (উচ্চ মূল্যের) হিসেবে চিংড়ির রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ আছে। প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভকে রক্ষা করেই এটা করতে হবে।
মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)
কার্বন বাফারিংয়ের জন্য একটি দেশের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন। সে তুলনায় আমাদের বনাঞ্চল খুবই কম এবং এর বড় অংশ সুন্দরবন, শালবন ও মধুপুরে সীমিত। তাই উপকূলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মাছের প্রজনন, খাদ্য ও বিচরণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। চিংড়ি চাষ নিয়ে পরিবেশদূষণের অভিযোগের পর গবেষণায় আমরা দেখেছি, জোয়ারের পানি ঘেরে ওঠানামার ফলে পলি জমে এবং পানি পরিশোধিত হয়ে বের হয়। ম্যানগ্রোভের লিটারে থাকা নাইট্রোজেন ও ফসফরাস মৎস্যসম্পদের পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে।
‘আমাদের উপকূলে যেখানে চিংড়ির চাষ হয়, সেখানে সব জমি ম্যানগ্রোভ চাষের উপযোগী কি না, সেটা আগে দেখতে হবে। এর পাশাপাশি আমাদের চিংড়ির জোনিং (চিংড়ির জন্য নির্ধারিত অঞ্চল) করতে হবে।’ জোনিংয়ের পাশাপাশি জোনের ভেতরেও ঠিক করতে হবে কোথায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক, সেমি–ইনটেনসিভ ও এক্সটেনসিভ চাষ হবে। প্রয়োজনে সেমি–ইনটেনসিভ এলাকার পাশে ১০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ বাফার জোন রাখা যেতে পারে।
চিংড়ি একসময় রপ্তানি পণ্যের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। বর্তমানে রপ্তানিতে চিংড়ি এখন চতুর্থ বা পঞ্চম অবস্থানে। চিংড়িকে রপ্তানির তালিকায় ১ নম্বরে নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে আমাদের আধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। এ বিষয়ে মৎস্য, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
পরিচালক, ব্লু ইকোনমি, মৎস্য অধিদপ্তর
সুন্দরবনকে আমরা মৎস্যসম্পদের আঁতুড়ঘর হিসেবে দেখি। ম্যানগ্রোভের পাতা ও ছোট ডাল পানিতে পচে পুষ্টি তৈরি করে, যা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, জুপ্ল্যাঙ্কটনসহ চিংড়ির খাদ্য তৈরিতে সহায়তা করে। গবেষণায় আমরা দেখেছি, সুন্দরবনের লিফ লিটার ব্যবহার করলে চিংড়ির পোনার টিকে থাকার হার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। ম্যানগ্রোভের শিকড় চিংড়ির খোলস বদলের সময় আশ্রয়ও দেয়।
প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ করে কোথায় সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ করা যাবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতাকে আরও বড় পরিসরে প্রদর্শনী হিসেবে মাঠে প্রয়োগ করা দরকার। কারণ, লাভজনক মডেল দেখলে চাষিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আগ্রহী হবেন।
বড় পরিসরে যেতে হলে চাষিদের মালিকানা ও জমির ধরনও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এলাকার সঠিক ম্যাপিং জরুরি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি জাতীয় কাঠামো বা কারিগরি নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন। এতে স্থান নির্বাচন, ম্যানগ্রোভ প্রজাতি, পোনা, মজুত ঘনত্ব, জীবনিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগ নজরদারি ও পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়গুলো থাকতে হবে।
মৎস্য ও বন বিভাগের যৌথ ব্যবস্থাপনায় কাজটি আরও কার্যকর হতে পারে। তবে সাতক্ষীরা, খুলনা বা কক্সবাজার—সব এলাকার পরিবেশ এক নয়। তাই একসঙ্গে বড় পরিসরে না গিয়ে আগে এলাকার উপযোগিতা যাচাই করে যেখানে সুফল বেশি, সেখানে ধাপে ধাপে এ মডেল সম্প্রসারণ করা উচিত।
অধ্যাপক, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
মাঠপর্যায় ও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় আমরা দেখেছি, ম্যানগ্রোভ চিংড়ির টিকে থাকা ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করে। অগভীর পানিতে গাছের ছায়া চিংড়িকে আশ্রয় দেয় এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তবে উপকূলে শুধু ঘেরে গাছ লাগালেই হবে না; পুরো উপকূলীয় এলাকার পানি ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আমরা প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের কথা বলছি। কিন্তু চারদিকে বাঁধ, গেট ও বিভিন্ন অবকাঠামো দিয়ে পানি আটকে রেখে শুধু ভেতরে গাছ লাগালে প্রকৃতিনির্ভর সমাধান হবে না। প্রকৃতিকে তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তাই ম্যানগ্রোভ লাগানোর পাশাপাশি পুরো উপকূলীয় বেল্টকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
আমাদের দেশে পরিকল্পনার ঘাটতি নেই; ঘাটতি মূলত কার্যকর বাস্তবায়ন ও পর্যায়ভিত্তিক উদ্যোগে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুন্দরবনভিত্তিক সমন্বিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাকে পুরো উপকূলীয় বেল্টে সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, দাতা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাজের ম্যাপিং করে কোথায় কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা জরুরি।
গবেষণায় দেখেছি, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ কৃষকের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং এর পরিবেশগত কিছু বাড়তি সুফলও রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের সহায়তা ছাড়া কৃষকেরা সহজে এ ধরনের চাষে যাবেন না। তাই এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে নীতি সহায়তা, কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
হেড অব সাসটেইনেবিলিটি, এইচএসবিসি বাংলাদেশ
আজকের মূল প্রবন্ধে যেমনটি উঠে এসেছে, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষে চাষিদের জন্য দৃশ্যমান আর্থিক লাভ নিশ্চিত করা গেলে এই পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে পারে। তাই উপকূলীয় মানুষের জীবিকা, পরিবেশগত অবদান এবং দুর্যোগঝুঁকি—তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষকে একটি লাভজনক ও টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করা গেলে এই মডেল দেশের পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা নিশ্চিতে কাজ করছে। দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা মিরসরাইয়ের জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ নিই। ব্র্যাকের সঙ্গে অংশীদারত্বে বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় দুই লাখের বেশি ম্যানগ্রোভ চারা বেড়ে উঠছে, যা উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে।
২০২৪ সালে আমরা সাতক্ষীরায় সলিডারিডাডের সঙ্গে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের একটি সমন্বিত উদ্যোগ শুরু করি। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব কমাতে সহায়তা করে এবং অন্যান্য অনেক গাছের তুলনায় বেশি কার্বন শোষণ ও সংরক্ষণ করতে পারে।
আমাদের লক্ষ্য শুধু ম্যানগ্রোভ রোপণ নয়, এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সুযোগকেও যুক্ত করা। ম্যানগ্রোভ চিংড়ির জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস তৈরি করে এবং চিংড়ি চাষে রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁরা ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারি পরিচালনা ও চারা উৎপাদনের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি করছেন।
এভাবে প্রকৃতি সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা, টেকসই জীবিকা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে একই উদ্যোগের আওতায় এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ। জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে অনেক কৃষক মৎস্য চাষ, বিশেষ করে চিংড়ি চাষে যুক্ত হয়েছেন। এ বাস্তবতায়, কীভাবে চিংড়ি চাষকে আরও পরিবেশবান্ধব করা যায় , যাতে প্রকৃতির ক্ষতি না করে কৃষকের জীবিকা নিশ্চিত করা যায়; এই লক্ষ্যেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ ও লবণাক্ত এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক জলবায়ু-অভিযোজন ও প্রশমন মডেল তৈরির চেষ্টা করেছি। এইচএসবিসির সহায়তায় ১০০ হেক্টর জমিতে ম্যানগ্রোভ রোপণের মাধ্যমে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। প্রায় ৩০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ রাখলে বাস্তুতন্ত্রে কী পরিবর্তন আসে, কৃষক কী সুবিধা পান এবং দীর্ঘ মেয়াদে কীভাবে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়, আমরা তা দেখার চেষ্টা করেছি।
অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি উপকূলের জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে ও প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে জোর দেওয়া জরুরি। ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ গ্রহণে কৃষকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এর সুবিধা পেতে দীর্ঘমেয়াদি সময় লাগে। আবার উপকূলের অনেক কৃষক ভাগচাষি; তাঁদের নিজেদের জমি নেই। নিজের জমি না থাকায় তাঁরা দীর্ঘমেয়াদি এই পদ্ধতি গ্রহণ করবেন কেন, সেটিও বড় প্রশ্ন।
উজানের পানির প্রবাহ কমে উপকূলে লবণাক্ততা ও পলি বাড়ছে। এতে চিংড়ির উৎপাদন কমে মৃত্যুহার বাড়ছে। তাই ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের পাশাপাশি কৃষকের চাষপদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য উপকূলীয় মানুষের সহনশীল জীবিকা নিশ্চিত করা। ১০০ হেক্টরের পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ৫ হাজার বা ১০ হাজার হেক্টরে মডেলটি সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ও গবেষণা দরকার। পাশাপাশি নারীদের জন্য ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদনে ভাসমান নার্সারির মতো বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অত্যন্ত কার্যকরী একটি প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান, যা কেবল খাদ্য ও জীবিকা নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং পুরো উপকূলীয় ইকোসিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিত করে টেকসই অভিযোজনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এক্সেমপ্লেরি কনসালটিং
উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবিকা কৃষি ও মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল। চিংড়ি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হলেও চিংড়ি চাষ করতে গিয়ে অনেক ম্যানগ্রোভ বন উজাড় হয়েছে। তাই আমাদের প্রশ্ন হলো, কৃষকের জীবিকা রক্ষা করে কীভাবে মাছ চাষ করা যায় এবং একই সঙ্গে প্রকৃতিকে রক্ষা করা যায়।
আমরা তিনটি মডেল তুলনা করেছি—একক চিংড়ি চাষ, চিংড়ির সঙ্গে অন্যান্য মাছের সমন্বিত চাষ এবং সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষ। শেষের মডেলে পুকুরের প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় ম্যানগ্রোভ রাখা হয় এবং চিংড়ি, মাছ, কাঁকড়ার পাশাপাশি মধু, গোলপাতা ও অন্যান্য ম্যানগ্রোভজাত পণ্য থেকে আয় করার সুযোগ থাকে। শুরুতে কিছু বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে এ মডেলে কৃষকের আয় বেশি। পাশাপাশি ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষা, পানির মান উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও কার্বন সংরক্ষণের মতো বাড়তি সুবিধাও পাওয়া যায়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষে দীর্ঘ মেয়াদে কৃষক ও সমাজ—দুই পক্ষই বেশি উপকৃত হয়। তবে ম্যানগ্রোভ পরিপক্ব হতে পাঁচ থেকে আট বছর সময় লাগে। তাই কৃষকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, নিরাপদ জমির অধিকার এবং কার্বন ও প্রতিবেশব্যবস্থার সেবার মূল্যায়ন জরুরি।
বর্তমানে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনায় চিংড়ি চাষের বড় এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় মডেলটি সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। ১০০ হেক্টরের পাইলট প্রকল্প থেকে আমাদের আরও বড় পরিসরে যেতে হবে। এ জন্য সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ, গবেষণা, সহজ অর্থায়ন ও বেসরকারি অংশীদারত্ব প্রয়োজন। আমরা যদি এই মডেলকে বৃহৎ পরিসরে নিতে পারি, তাহলে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি উপকূলীয় প্রকৃতি ও সুন্দরবনের ওপর চাপও কমানো সম্ভব।
সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার-অ্যাগ্রিকালচার; ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস
ম্যানগ্রোভ শুধু গাছ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেশব্যবস্থা। তাই ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষে জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশব্যবস্থা পুনরুদ্ধারকেও গুরুত্ব দিতে হবে। চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণে চকরিয়া সুন্দরবনসহ অনেক প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করেছি। এর পরিণতি এখন উপকূলের নানা দুর্যোগে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি চাষ একসময় খুব লাভজনক ছিল। কিন্তু উৎপাদনশীলতা কমছে। শুধু চাষের এলাকা বাড়িয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না; আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা ও ভালো মানের পোনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মাছ চাষের মডেলকে আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। কোথায় কতটুকু ম্যানগ্রোভ থাকবে, কীভাবে অন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে এবং কোন এলাকায় কোন প্রজাতি উপযোগী—এসব বিষয়ও দেখতে হবে।
যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক বন ইতিমধ্যে নষ্ট হয়েছে, সেখানে শুধু গাছ লাগানো নয়, পুরো প্রতিবেশব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের দিকে যেতে হবে। তবে সব জায়গায় চিংড়ি চাষ উপযোগী হবে না। তাই বিদ্যমান চিংড়ি চাষের এলাকায় ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং উপযুক্ত জায়গায় সমন্বিত মডেল চালুর সুযোগ দেখতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কৃষকের লাভের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জমি কম, তাই আরও উৎপাদনশীল ও বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেতে হবে। বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি পোনা, হ্যাচারি, বিতরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদনে ভাসমান নার্সারির উদ্যোগটি আমার কাছে আশাব্যঞ্জক মনে হয়েছে। সফলভাবে এটি করা গেলে স্থানীয় মানুষ ও কৃষকের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
অ্যাকুয়াকালচার বিশেষজ্ঞ
ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত চিংড়ি চাষের সমস্যা, বিশেষ করে পলি জমে পানির গভীরতা কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত চাপ কমানো। আমরা দেখেছি, ম্যানগ্রোভ থাকলে রোগের ঝুঁকি কমে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং কৃষক ম্যানগ্রোভজাত পণ্য থেকে বাড়তি আয় করতে পারেন।
তবে এ পদ্ধতি নিয়ে আরও গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে যাচাই প্রয়োজন। কৃষকেরা নিজেরা কতটা এই প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন এবং কী কী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন, তা জানা জরুরি। কারণ কৃষক ও পরিবেশ—দুই পক্ষই উপকৃত হলে সরকারও এ খাতে আরও কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করতে পারবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এ মডেলের বড় সুযোগ রয়েছে। নতুন জেগে ওঠা দ্বীপ বা উপযুক্ত এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভ ও চিংড়ি চাষ সমন্বয় করা যেতে পারে। যেমন, ৬০ শতাংশ এলাকায় ম্যানগ্রোভ ও ৪০ শতাংশ এলাকায় চিংড়ি চাষের মতো মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে যেখানে লবণাক্ততা বা পলি জমার কারণে চিংড়ি চাষের উৎপাদনশীলতা কমে গেছে, সেসব এলাকার বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
আমাদের চিংড়ি খাতকে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। এলডিসি উত্তরণের পর বাড়তে পারে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয়—সেই চ্যালেঞ্জও এখন থেকেই বিবেচনায় নিতে হবে। ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়িকে পরিবেশবান্ধব ও মূল্য সংযোজিত পণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ব্যয় কমানো সম্ভব। আমার ২৪ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আরও গবেষণার মাধ্যমে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মৎস্য চাষ খাত, ব্র্যাক
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা অনেক বড় এবং সব জায়গায় লবণাক্ততার মাত্রাও এক নয়। তাই সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ কোথায় কীভাবে করা হবে, তা নির্ধারণে লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করা জরুরি। লবণাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী কোন এলাকায় কোন ম্যানগ্রোভ প্রজাতি উপযোগী এবং কৃষক কীভাবে তা গ্রহণ করবেন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এই মডেলকে বড় পরিসরে নিতে হলে তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে। প্রথমত, কৃষকের লাভ কতটা হচ্ছে এবং তিনি পদ্ধতিটি কতটা গ্রহণ করছেন। আমরা দেখেছি, একক চাষের তুলনায় বহুমুখী চাষে লাভ বেশি। তবে কৃষক বাস্তবে কতটা এটি গ্রহণ করছেন, সেটি আরও যাচাই করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু সহনশীলতা তৈরিতে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের ভূমিকা কতটা। তৃতীয়ত, প্রতিবেশব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এর সুবিধা কতটা।
কৃষকের পর্যায়ে এ পদ্ধতি গ্রহণে আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চিংড়ি চাষে ক্ষতি বা উৎপাদন কমে গেলে কীভাবে আরও ভালো ও টেকসই পদ্ধতিতে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে।
চকরিয়া সুন্দরবনের মতো এলাকায় চিংড়ি চাষের কারণে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে আছে। তাই লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করে বেশি লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ চালু করা গেলে এটি বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব। কৃষকের লাভ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং প্রতিবেশব্যবস্থার সুবিধা—এই তিনটি দিক সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশের উপকূলের জন্য একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা সম্ভব।
সিনিয়র ডিরেক্টর ও হেড অব ক্লাইমেট অ্যাকশন, ফ্রেন্ডশিপ
আমরা প্রায় ১২ বছর ধরে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ নিয়ে কাজ করছি এবং প্রায় ১০ লাখ গাছ লাগিয়েছি। এত দিন ম্যানগ্রোভ ও চিংড়িকে দুটি বিপরীত বিষয় হিসেবে দেখেছি। কিন্তু চিংড়িকেও বাদ দেওয়া যায় না, ম্যানগ্রোভকেও নয়। তাই কয়েক বছর ধরে দুটিকে কীভাবে সমন্বিত করা যায়, তা নিয়ে ভাবছি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই মডেল কার জন্য—বড় ঘেরের মালিক, নাকি এক বিঘা বা জমিহীন কৃষকের জন্যও? ম্যানগ্রোভের সুবিধা শুধু উৎপাদন বা কার্বন নয়, উপকূলের মানুষের সুরক্ষা, জীবিকা ও প্রতিবেশব্যবস্থার সুবিধাও এর সঙ্গে যুক্ত। ম্যানগ্রোভ লাগানোর পর স্থানীয় মানুষ মাছ ধরে আয় করছেন, নারীরাও সুফল পাচ্ছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিতে হবে।
ম্যানগ্রোভের তাৎক্ষণিক খরচ হিসাব করলেও এটি না থাকলে পরিবেশগত ক্ষতির মূল্যায়ন করি না। ঘেরের চারপাশে ৩০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ রাখার মডেলটি জলবায়ু সহনশীলতার জন্য কতটা কার্যকর, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা দরকার। টেকসই জীবিকা ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের মধ্যে সমন্বয় করেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, আইইউসিএন বাংলাদেশ
ম্যানগ্রোভের সঙ্গে মৎস্য উৎপাদন ও জীবিকার সমন্বয় একটি ভালো প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের উদাহরণ হতে পারে। তবে শুধু গাছ লাগানো, বনভূমি বাড়ানো, পানির মান উন্নত করা বা মানুষের জীবিকা উন্নত হলেই সেটিকে নেচার-বেজড সলিউশন বলা যাবে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ২৮টি সূচক ও ৮টি মানদণ্ডের সঙ্গে এই উদ্যোগকে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উপকূলীয় এলাকায় সব জায়গায় ম্যানগ্রোভ লাগানো সম্ভব নয়। তাই বন, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য চাষ, মানুষের জীবিকা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার মানে শুধু গাছ লাগানো নয়, এর সঙ্গে জীবিকা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নও যুক্ত করতে হবে।
এ জন্য একটি জাতীয় মানদণ্ডভিত্তিক নির্দেশিকা দরকার। সব অংশীজনকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বর্তমান নীতি ও আইনগুলোতে নেচার-বেজড সলিউশনের বিষয়টি যুক্ত করে এগোতে পারলে ১০০ হেক্টর থেকে ১ হাজার, ২ হাজার বা ৫ হাজার হেক্টরে এ মডেল সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
উদ্যোক্তা, ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারি
আমি খুলনার পাইকগাছা থানার কেওড়াতলা গ্রামের এক নারী উদ্যোক্তা। ২০২৪ সালে আমাদের গ্রামে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সভায় অংশ নিয়ে জানতে পারি, ম্যানগ্রোভ চিংড়ি চাষের জন্য কতটা উপকারী, বিশেষ করে তাপমাত্রার প্রভাব থেকে চিংড়িকে রক্ষা করতে। তবে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষে বড় সমস্যা হলো চারার সংকট। প্রকল্পের মাধ্যমে নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগে আমি যুক্ত হই।
আমার সমতল জায়গা ছিল না, তাই বাড়ির পাশের পাঁচ শতকের ছোট পুকুরেই নার্সারি করি। প্রশিক্ষণে বীজ সংগ্রহ, রোপণ ও পরিচর্যার পদ্ধতি শিখি। সাড়ে আট কেজি বীজ থেকে প্রায় ৮ হাজার ২০০টি চারা তৈরি করে প্রকল্পের সহায়তায় বিক্রি করি। এতে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা আয় হয়। একই পুকুরে দুই হাজার বাগদা চিংড়ির পোনা ছেড়ে ১৫ কেজি বাগদা ও ২০ কেজি তেলাপিয়া বিক্রি করেছি। ফলে একই জায়গা আমার আয়ের দুটি উৎস হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্প না এলে এত বড় স্বপ্ন দেখাও সম্ভব হতো না।
চিংড়িচাষি, আইএমবিএ কৃষক
আমি প্রায় ১৪ বছর ধরে চিংড়ি চাষ করছি। বর্তমানে আমার প্রায় ২৫ বিঘা ঘের আছে। তবে গত সাত থেকে আট বছর মাছের উৎপাদন অনেক কমে গিয়েছিল। ২০২৪ সালে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জানতে পারি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খাদ্যের অভাবও মাছ মারা যাওয়ার কারণ।
সলিডারিডাড কর্তৃক আয়োজিত প্রশিক্ষণ ও সভায় অংশ নিয়ে ম্যানগ্রোভভিত্তিক চিংড়ি চাষের উপকারিতা জেনে ও প্রকল্পের সহায়তায় তিনটি ঘেরে প্রায় ১৪ বিঘা জমিতে ২৫০টি ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ করি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক গাছ মারা গেলেও এখন প্রায় ১৩০টি টিকে আছে। রৌদ্রের সময় চিংড়ি গাছের ছায়া ও শিকড়ের আশপাশে আশ্রয় নেয়। পানিও সবুজ হয়েছে, প্ল্যাঙ্কটন তৈরি হওয়ায় মাছের খাবারের চাহিদা মিটছে। ফলে সার ও খাবারের ব্যবহার ও উৎপাদন খরচ কমছে। ভবিষ্যতে ম্যানগ্রোভ থেকে বাড়তি আয়ও হবে। এই সমন্বিত চাষ চিংড়ি চাষের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।
প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ রক্ষা করে উপযুক্ত এলাকায় ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ।
উপকূলীয় এলাকার ম্যাপিং ও লবণাক্ততার মানচিত্র তৈরি করে চাষের এলাকা নির্ধারণ।
মৎস্য, বন ও পরিবেশ বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন।
চাষিদের জন্য সহজ অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা।
স্থানীয়ভাবে ম্যানগ্রোভের চারা উৎপাদন ও ভাসমান নার্সারি সম্প্রসারণ।
ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করা।
মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, প্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর।
মো. লতিফুল ইসলাম, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)।
মো. সাজদার রহমান, পরিচালক, ব্লু ইকোনমি, মৎস্য অধিদপ্তর।
ড. নাজমুল আহসান, অধ্যাপক, ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
সৈয়দা আফজালুন নেসা, হেড অব সাসটেইনেবিলিটি, এইচএসবিসি বাংলাদেশ।
সেলিম রেজা হাসান, বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া।
মোহাম্মদ নুরুল আযম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এক্সেমপ্লেরি কনসালটিং।
এ কে ওসমান হারুনী, সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার-অ্যাগ্রিকালচার, ঢাকার নেদারল্যান্ডস দূতাবাস।
মইন উদ্দিন আহমেদ, অ্যাকুয়াকালচার বিশেষজ্ঞ।
কানিজ ফাতেমা–তুজ–জহুরা, বিশেষজ্ঞ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মৎস্য চাষ খাত, ব্র্যাক।
কাজী ইমদাদুল হক, সিনিয়র ডিরেক্টর ও হেড অব ক্লাইমেট অ্যাকশন, ফ্রেন্ডশিপ।
সারোয়ার আলম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, আইইউসিএন।
লতিকা বালা বৈদ্য, উদ্যোক্তা, ভাসমান ম্যানগ্রোভ নার্সারি। তুষার কান্তি মণ্ডল, চিংড়িচাষি, আইএমবিএ কৃষক।
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
পবিত্র মক্কা নগরীর দক্ষিণে হুথি বিদ্রোহীরা ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সৌদি আরব। তবে, ড্রোনটি ধ্বংস করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী। পবিত্র মক্কা ও মুসল্লিদের নিরাপত্তার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটি। গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় মক্কার দক্ষিণে ড্রোনটি শনাক্ত করে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী।সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, ড্রোনটি মক্কার নির্ধারিত সীমার আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি বলেন, মক্কাকে নিশানা করে হুথিদের এটি দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা। এর আগে ২০১৭ সালে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনাকেও মক্কায় হামলার চেষ্টা বলে উল্লেখ করেছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। আরও পড়ুন সৌদি আরবের দুই এলাকায় জরুরি সতর্কতা তবে, মক্কাকে নিশানা করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুথিরা। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র হাজেম আল-আসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সৌদির দাবিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, এর আগেও সৌদি আরব একই ধরনের অভিযোগ করেছিল। এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। সংস্থাটি ঘটনাটিকে গুরুতর হামলা হিসেবে বর্ণনা করে এর জন্য হুথিদের দায়ী করেছে। একই সঙ্গে, ৫৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের এ জোট সৌদি আরবের বিরুদ্ধে চলমান হামলারও নিন্দা জানিয়েছে। এদিকে, সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহে হুথিদের হামলা বেড়ে যাওয়ার পর এই সতর্কতা জারি করা হয়। এতে আঞ্চলিক সংঘাতে সৌদি আরব আরও জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আরও পড়ুন পাইপলাইন বন্ধ / সৌদির তেল ফুরিয়ে যেতে পারে কয়েক দিনের মধ্যেই হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব এলাকা বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন হয়। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর লোহিত সাগরপথে তেল পরিবহন নিয়েও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে হুথিরা। এসব হামলার পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ানএমডিআরএইচ/
সাপ মানেই সেটি বিষধর- এমন ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যে রয়েছে। বাড়ির উঠান, ঝোপঝাড়, কৃষিজমি কিংবা জলাশয়ের পাশে সাপের দেখা গেলে আতঙ্কিত হয় আমরা। অনেকে সাপটি চেনার আগেই সেটিকে মেরে ফেলে। অথচ বাংলাদেশে নিয়মিত দেখা যায় এমন সাপের একটি বড় অংশই বিষধর নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেছেন, বাংলাদেশে যেসব সাপ আছে, তার ৮০ শতাংশই বিষধর না। এইসব সাপের কোনোটি মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে থাকে, কোনোটি কৃষিজমি বা জলাশয়ে, আবার কোনোটির দেখা মেলে গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. এম. মনিরুল এইচ. খানের ‘ফটোগ্রাফিক গাইড টু দ্য ওয়াইল্ডলাইফ অব বাংলাদেশ’ বইয়ে বাংলাদেশে মোট ১০৫ প্রজাতির সাপ আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশে ২৪ প্রজাতির সাপের উপস্থিতি এখনো নিশ্চিত হয়নি। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে ৮১ প্রজাতি সাপের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রজাতি বিরল এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। আবার কিছু সাপ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। আইইউসিএন বাংলাদেশ এমন ১০টি নাম জানিয়েছে। চলুন, সেগুলোর নাম, কোথায় বসবাস এবং কোনগুলো বিষধর, জেনে নিই। ঢোঁড়াবাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন সাপের একটি ঢোঁড়া। এর বৈজ্ঞানিক নাম জেনোক্রোফিস পিসকেটর। ইংরেজিতে এটি চেকার্ড কিলব্যাক বা এশিয়াটিক ওয়াটার স্নেক নামে পরিচিত। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটিকে ‘লিস্ট কনসার্ন’ বা অনুন্যতম সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই ঢোঁড়া পাওয়া যায়। পুকুর, খাল, হ্রদ, ধীরগতির নদী, জলাভূমি, মাছের খামার ও ধানক্ষেতের মতো পানির কাছাকাছি পরিবেশ এদের পছন্দ। গ্রাম কিংবা শহরের বসতবাড়ির পাশের পুকুর বা জলাশয়েও তাই প্রায়ই এই সাপের দেখা মেলে। ছোট ঢোঁড়া ব্যাঙের ডিম, ব্যাঙাচি, ছোট ব্যাঙ ও পোকামাকড় খায়। বয়স বাড়লে মাছ ও ব্যাঙের পাশাপাশি টিকটিকি, ইঁদুর এবং ছোট পাখিও শিকার করতে পারে। মানুষের আশপাশে প্রায়ই দেখা গেলেও ঢোঁড়া বিষধর নয়। তবে বিপদের মুখে পড়লে আত্মরক্ষার জন্য কামড় দিতে পারে। এদের শরীর বাদামী রঙের, তার ওপর কালো ও হলুদ রঙের ছোপছোপ দাগ থাকে। লাউডগালাউডগা বাংলাদেশের পরিচিত বৃক্ষচারী সাপগুলোর একটি। আইইউসিএনের রেড লিস্টে আহেটুলা নাসুটা এবং আহেটুলা প্রসিনা, দুই প্রজাতির স্থানীয় নাম হিসেবেই লাউডগা বা সুতানলি সাপের উল্লেখ রয়েছে। উভয় প্রজাতিই বাংলাদেশে অনুন্যতম সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত। লম্বা, সরু ও সবুজ দেহের কারণে গাছের ডালপালা ও পাতার সঙ্গে সহজেই মিশে থাকতে পারে লাউডগা। বন ও ঝোপঝাড়ের পাশাপাশি বাগান এবং মানুষের বসতবাড়ির আশপাশের গাছেও এর দেখা মেলে। দিনের বেলায় এরা বেশি সক্রিয় থাকে এবং বেশিরভাগ সময় গাছেই কাটায়। টিকটিকি, গিরগিটি, ব্যাঙ, ছোট পাখি ও অন্যান্য ছোট প্রাণী এদের খাবার। শিকার ধরার সময় গাছের ডালে প্রায় নিশ্চল হয়ে অপেক্ষা করতে পারে। লাউডগা বিষধর না হলেও ‘চট করে কামড় দিয়ে ফেলে,’ বলেন অধ্যাপক ফরিদ আহসান। এরা বেশ লম্বা ও চিকন হয়। পাশাপাশি, গাছে বেশি থাকলেও এরা নিচে নামে মাঝে মাঝে। কালনাগিনীউজ্জ্বল রঙের কারণে সহজেই নজর কাড়ে কালনাগিনী। এর ইংরেজি নাম অর্নেট ফ্লাইং স্নেক। বৈজ্ঞানিক নাম ক্রাইসোপেলিয়া অর্নাটা। নামের সঙ্গে ‘নাগিনী’ থাকলেও এটি গোখরা বা কেউটে গোত্রের সাপ নয়। কালনাগিনী মূলত বৃক্ষচারী। বনাঞ্চল, ঝোপঝাড়, বাগান এবং গাছপালাসমৃদ্ধ এলাকায় এদের দেখা যায়। গাছ বেয়ে ওঠায় অত্যন্ত দক্ষ এই সাপ এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাওয়ার সময় শরীর চ্যাপ্টা করে বাতাসে ভেসে কিছুটা দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। এ কারণেই এর ইংরেজি নামে ‘ফ্লাইং স্নেক’ কথাটি এসেছে। টিকটিকি, গিরগিটি, ব্যাঙ, ছোট পাখি ও বাদুড়সহ ছোট প্রাণী এদের খাবার। সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে। ধারণা প্রচলিত আছে, এই সাপ ছোবল দিলেই নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু বাস্তবে এটি মানুষের জন্য সাধারণত বিপজ্জনক নয়। অধ্যাপক আহসান বলেন, ‘কালনাগিনী দেখতে খুব সুন্দর। এই সাপ খুবই হালকা বিষধর। তবে এখন পর্যন্ত ওই বিষে কোনো মানুষ মারা যায়নি।’ ঘরগিন্নীঘরগিন্নী নামের সাপটি মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে দেখা যাওয়ার কারণেই সম্ভবত এমন নাম পেয়েছে। আইইউসিএনের তালিকায় লাইকোডন অলিকাস, লাইকোডন জারা, লাইকোডন জাউইসহ একাধিক সাপের স্থানীয় নামের সঙ্গে ঘরগিন্নী নামটি যুক্ত রয়েছে। ঘরের দেয়ালের ফাঁক, ইটের স্তূপ, পুরোনো ঘর, গাছের বাকল ও বসতবাড়ির আশপাশের আড়ালযুক্ত জায়গায় এদের দেখা যেতে পারে। এরা মূলত নিশাচর। দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকে এবং রাত হলে খাবারের সন্ধানে বের হয়। টিকটিকি ও স্কিঙ্কজাতীয় ছোট টিকটিকি এদের অন্যতম প্রধান খাবার। মানুষের বাসা-বাড়িতে টিকটিকি বেশি থাকায় অনেকসময় খাবারের সন্ধানে ঘরেও ঢুকে পড়ে এরা। এছাড়া, ছোট ইঁদুর ও অন্যান্য ছোট প্রাণীও খেতে পারে। ঘরগিন্নী সাপ বিষধর নয়। তবে শরীরের রঙ ও নকশার কারণে অনেক সময় বিষধর সাপ ভেবে মানুষ একে মেরে ফেলে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ আহসান বলেন, এই সাপ চট্টগ্রাম অঞ্চলে খুবই পরিচিত। পাতি দুধরাজপাতি দুধরাজের বৈজ্ঞানিক নাম কোয়েলোগনাথাস হেলেনা। ইংরেজিতে এটি কমন ট্রিঙ্কেট স্নেক নামে পরিচিত। বাংলাদেশে পরিচিত নির্বিষ সাপগুলোর একটি এটি। ঝোপঝাড়, বনাঞ্চলের প্রান্ত, কৃষিজমি এবং মানুষের বসতবাড়ির আশপাশেও পাতি দুধরাজের দেখা পাওয়া যায়। মাটিতে চলাচল করলেও প্রয়োজনে গাছেও উঠতে পারে। বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকায় লোকালয়েও এর দেখা মেলে। ইঁদুর এই সাপের অন্যতম খাবার। এছাড়া, টিকটিকি, ব্যাঙ, ছোট পাখি ও অন্যান্য ছোট প্রাণীও খেতে পারে। ইঁদুর শিকার করায় কৃষিজমি ও বসতবাড়ির আশপাশে এদের দেখা যায়। নামের মধ্যে ‘দুধ’ থাকলেও এই সাপ দুধ খেতে আসে, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বেত আঁচড়াবেত আঁচড়া বা কমন ব্রোঞ্জব্যাক ট্রি স্নেকের বৈজ্ঞানিক নাম ডেনড্রেলাফিস ট্রিস্টিস। ইংরেজিতে এর নাম দাউদিন'স ব্রোঞ্জব্যাক। এটি সরু ও লম্বাটে দেহের অত্যন্ত দ্রুতগতির একটি বৃক্ষচারী সাপ। তাই এটি স্থানীয়দের কাছে গেছো সাপ নামেও পরিচিত। বন, ঝোপঝাড়, বাগান ও গাছপালাসমৃদ্ধ এলাকায় এই সাপের দেখা পাওয়া যায়। মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে পর্যাপ্ত গাছপালা থাকলেও সেখানে চলে আসতে পারে। মাটিতে নামলেও এদের জীবনের বড় একটি অংশ গাছ ও ঝোপঝাড়েই কাটে। এটি প্রধানত দিনের বেলা সক্রিয় থাকে। টিকটিকি, গিরগিটি, ব্যাঙ এবং ছোট পাখি এদের খাবারের মধ্যে রয়েছে। দ্রুত চলাফেরা এবং গাছে ওঠার দক্ষতা শিকার ধরতে সাহায্য করে। বেত আঁচড়া বিষধর নয়। মানুষকে এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করে এবং সুযোগ পেলে দ্রুত পালিয়ে যায়। দাঁড়াশবাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত বড় আকারের নির্বিষ সাপগুলোর একটি দাঁড়াশ। এর বৈজ্ঞানিক নাম পিটিয়াস মিউকোসা এবং ইংরেজিতে ইন্ডিয়ান র্যাট স্নেক বা ওরিয়েন্টাল র্যাট স্নেক নামে পরিচিত। কৃষিজমি, ঝোপঝাড়, গ্রামের বসতবাড়ি, পুকুরপাড় এবং মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়াশের দেখা পাওয়া যায়। মাটিতে দ্রুত চলতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে গাছে ওঠা ও পানিতে সাঁতার কাটতেও সক্ষম। ইঁদুর দাঁড়াশের অন্যতম প্রধান খাবার। এছাড়া ব্যাঙ, টিকটিকি, পাখি, ডিম ও অন্যান্য ছোট প্রাণীও খায়। ইঁদুর শিকার করার কারণে কৃষিজমিতে এই সাপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আকারে বড় এবং দ্রুত চলার কারণে দাঁড়াশ দেখে অনেকে ভয় পেলেও এটি বিষধর নয়। বিপদে পড়লে আত্মরক্ষার জন্য কামড় দিতে পারে, তবে এতে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি নেই। অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, দাঁড়াশ সাপে কামড় দিলে অনেকসময় মাংসও ছিঁড়ে যেতে পারে। এই সাপে কামড় খাওয়া সাধারণ ঘটনা। মাইট্যামাইট্যা বা মেটে সাপ বলতে সাধারণত অলিভ কিলব্যাক ওয়াটার স্নেককে বোঝানো হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাট্রেটিয়াম স্কিস্টোসাম। এটি মূলত পানির কাছাকাছি থাকা সাপ। পুকুর, জলাভূমি, ধানক্ষেত, খাল ও অন্যান্য স্বাদুপানির জলাশয়ের আশপাশে এদের দেখা যায়। জলজ পরিবেশের সঙ্গে ভালোভাবে মানিয়ে নেওয়ায় গ্রামীণ এলাকার পুকুর ও ধানক্ষেতেও মানুষের চোখে পড়ে। ব্যাঙ, ব্যাঙাচি, মাছ এবং জলাশয়ের আশপাশে থাকা বিভিন্ন ছোট প্রাণী এদের খাবার। মাটি ও পানি দুই জায়গাতেই চলাচল করতে পারে। মাইট্যা সাপ বিষধর নয়। জলাশয়ের কাছাকাছি বেশি দেখা যাওয়ায় অনেক সময় ঢোঁড়ার সঙ্গেও এটিকে গুলিয়ে ফেলা হয়।এই সাপ সহজে কামড়ায় না, বলেন অধ্যাপক আহসান। গোখরাগোখরা বাংলাদেশের বহুল পরিচিত অত্যন্ত বিষধর সাপ। বাংলাদেশে একাধিক প্রজাতির গোখরা পাওয়া যায়, যার মধ্যে মনোকল্ড কোবরা বা নাজা কাউথিয়া (পদ্ম গোখরা) এবং স্পেকট্যাকল্ড কোবরা বা নাজা নাজা (খৈয়া গোখরা) উল্লেখযোগ্য। কৃষিজমি, ঝোপঝাড়, গ্রামের বসতবাড়ির আশপাশ, ইঁদুরের গর্ত, পরিত্যক্ত জায়গা ও বিভিন্ন আড়ালযুক্ত স্থানে গোখরার দেখা পাওয়া যেতে পারে। মানুষের বসতির আশপাশে ইঁদুরের উপস্থিতি থাকায় খাবারের সন্ধানে গোখরাও সেখানে চলে আসতে পারে। অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, পদ্ম গোখরা ও খৈয়া গোখরা সারা বাংলাদেশেই আছে। পদ্ম গোখরা বেশি থাকে পানিযুক্ত এলাকার কাছাকাছি, আর খৈয়া গোখরা থাকে ধানক্ষেতে। তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পদ্ম গোখরা বেশি, রাজশাহীতে আবার খৈয়া গোখরা বেশি। ইঁদুর, ব্যাঙ, টিকটিকি এবং অন্যান্য সাপ এদের খাবারের মধ্যে রয়েছে। বিপদের মুখে পড়লে গোখরা শরীরের সামনের অংশ উঁচু করে ফণা মেলে, যা এর সবচেয়ে পরিচিত আত্মরক্ষামূলক আচরণ। গোখরার বিষ স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে এবং দংশনের পর দ্রুত চিকিৎসা না হলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে। তাই, গোখরা দেখলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। অধ্যাপক আহসান বলেন, কোবরা ভালোভাবে কামড় দিলে আধ ঘণ্টার মাঝেই লক্ষণ দেখা যায়। কাল কেউটেকাল কেউটে বাংলাদেশের পরিচিত বিষধর সাপগুলোর একটি। বাংলাদেশে যে কয়টি সাপের ছোবলে মানুষের মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয়, এটি তার অন্যতম। বাংলাদেশে বাঙ্গারাস গণের একাধিক প্রজাতির কেউটে রয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে 'কাল কেউটে' বা 'কালাচ' নামটিও একাধিক কাছাকাছি প্রজাতির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, গোখরার চেয়ে বেশি বিষধর হলো এই কালাচ সাপ। কেউটে মূলত নিশাচর। দিনের বেলায় গর্ত, ইট-কাঠের স্তূপ, মাটির ফাটল কিংবা অন্য কোনো অন্ধকার ও আড়ালযুক্ত জায়গায় লুকিয়ে থাকে। রাত হলে খাবারের সন্ধানে বের হয়। মানুষের বসতবাড়ির কাছেও এদের দেখা যেতে পারে। অন্যান্য সাপ এদের খাবারের বড় অংশ। পাশাপাশি, টিকটিকি, ব্যাঙ বা ছোট প্রাণীও খেতে পারে। রাতের বেলা সক্রিয় হওয়ায় অন্ধকারে মানুষের সঙ্গে হঠাৎ মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অধ্যাপক আহসান আরও বলেন, কেউটে চুপচাপ থাকে এবং ফস করে কামড় দেয়। বোঝাও যায় না। তিন থেকে চার ঘণ্টা পরে এর বিষের প্রভাব শুরু হয়। তার আগে হয় না। কাল কেউটের বিষ স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে এবং গুরুতর বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। দংশনের শুরুতে ব্যথা বা ফোলা তুলনামূলক কম হলেও পরে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই সাপের গায়ের রঙ সাদা কালো এবং এদের শিরদাঁড়া তুলনামূলত উঁচু।জেএইচ
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্ট। সবে ভোরের সূর্য উঁকি দিয়েছে পুব দিগন্তে। এত ভোরেও সৈকতে যে দুই-একজন পর্যটক এসেছেন, তাঁরা কৌতূহল নিয়ে দেখেন, বালিয়াড়ি দিয়ে সুইমিং স্যুট পরে সার্ফিং বোর্ড বগলে নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন দুই সার্ফার। পানিতে সার্ফবোর্ড ভাসিয়ে জলক্রীড়ায় মেতে ওঠা দুই সার্ফারের কসরত দেখতে অল্প সময়ে ভিড় জমে ওঠে ভোরের সৈকতে। লাবণী পয়েন্ট সৈকতের পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে সার্ফার ফাতেমা আক্তার ( ১৬) ও মো. মান্নানের (২২) এমন নিবিড় অনুশীলন। সার্ফিং গুরু ও কোচ রাশেদ আলমের তত্ত্বাবধানে নিজেদের প্রস্তুত করছেন তাঁরা। স্বপ্ন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করা। এই দুই সার্ফার প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন এশিয়ার সর্ববৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞ এশিয়ান গেমসে। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ৪ অক্টোবর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠেয় গেমসে অংশ নিয়ে ইতিহাস রচনা করতে চলেছেন এই দুই সার্ফার। সব প্রতিকূলতা, বাজেট-স্বল্পতা, সামাজিক বাধা এবং অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের পরও ফাতেমা ও মান্নানের চোখেমুখে আশার আলো। কেমন করবেন তাঁরা? জানতে চাইলে সাবেক সার্ফার ও কোচ রাশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার পাহাড় ডিঙিয়েও মান্নান-ফাতেমা বিশ্বমঞ্চে চমক দেখাতে পারবেন, দুজনের সেই প্রতিভা আছে। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে কক্সবাজারের সৈকতে যে ঘাম তাঁরা ঝরাচ্ছেন, তার সুফল যেন জাপানের মাটিতেও দেখা মেলে—এটাই এখন দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের একমাত্র প্রত্যাশা।’অনেক সমালোচনা ও কটূক্তি সয়ে সার্ফিং করছে ফাতেমা আক্তারকটূক্তির বিরুদ্ধে ফাতেমার লড়াইকক্সবাজারের মহেশখালীর সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন ফাতেমা আক্তার। তিন বোনের মধ্যে দুই বোনের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য ফাতেমা কক্সবাজার শহরের ঘোনাপাড়ায় মায়ের সঙ্গে থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি সার্ফিং রপ্ত করছেন। তিনি এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। অভাবের তাড়না আর সামাজিক নানা বেড়াজাল ডিঙিয়ে ফাতেমার এই অবস্থানে পৌঁছানো রূপকথাকেও হার মানায়।একবার কটূক্তির কারণে সাত দিন সার্ফিং বন্ধ রাখতে হয় বলে ফাতেমা জানান। কোচ রাশেদ আলম তখন তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁকে বোঝান। ফাতেমাও নিয়মিত মাকে বোঝাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের সম্মতি মেলে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখে ফাতেমা প্রমাণ করতে চান, মেয়েরাও সব পারে।সার্ফিং শুরু করার পর থেকেই নানা কটূক্তি সইতে হয়েছে তাঁকে। ফাতেমা বলেন, ‘আমি যখন প্রতিদিন সার্ফিং করতে আসতাম, তখন মানুষ অনেক কিছু বলত, খারাপ চোখে তাকিয়ে থাকত। এমনকি আমার পরিবারকেও নানা কথা শুনতে হয়েছে। বলত, মেয়ের বিয়ে হবে না।’একবার এমন কটূক্তির কারণে সাত দিন সার্ফিং বন্ধ রাখতে হয় বলে ফাতেমা জানান। কোচ রাশেদ আলম তখন তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁকে বোঝান। ফাতেমাও নিয়মিত মাকে বোঝাতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত মায়ের সম্মতি মেলে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখে ফাতেমা প্রমাণ করতে চান, মেয়েরাও সব পারে।সার্ফার মান্নানে বাড়ি শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বাহার ছড়ায়। চতুর্থ শ্রেণি পড়া মান্নান মাকে হারিয়েছেন শৈশবে। বাবা ভাঙারির জিনিসপত্র বিক্রি করেন। সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই মান্নানের কাঁধে চেপেছে এখন। তাই দিনে সার্ফিং অনুশীলনের পর রাতে সৈকতে ঝিনুকের মালা বিক্রি করেন তিনি। মান্নান বলেন, ‘অনেক বাধা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু এসব বাধা এড়িয়ে আমি সার্ফিংকে আঁকড়ে ধরে আছি, সার্ফিং করে যাচ্ছি, যার কারণে আজ এশিয়ান গেমসে নির্বাচিত হতে পেরেছি।’ফাতেমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল দেশের বাইরে গিয়ে সার্ফিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেব। সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। প্রত্যাশা, জাপানে গিয়ে বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু করব।’দিনে সার্ফিং রাতে ঝিনুকের মালা বিক্রিসার্ফার মান্নানে বাড়ি শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বাহার ছড়ায়। চতুর্থ শ্রেণি পড়া মান্নান মাকে হারিয়েছেন শৈশবে। বাবা ভাঙারির জিনিসপত্র বিক্রি করেন। সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই মান্নানের কাঁধে চেপেছে এখন। তাই দিনে সার্ফিং অনুশীলনের পর রাতে সৈকতে ঝিনুকের মালা বিক্রি করেন তিনি। মান্নান বলেন, ‘অনেক বাধা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু এসব বাধা এড়িয়ে আমি সার্ফিংকে আঁকড়ে ধরে আছি, সার্ফিং করে যাচ্ছি। যার কারণে আজ এশিয়ান গেমসে নির্বাচিত হতে পেরেছি।’দারিদ্র্য জয় করে সার্ফিং করছেন মান্নানপ্রস্তুতি কতটুকুকক্সবাজার সৈকত প্রাকৃতিকভাবে সার্ফিংয়ের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও এখানকার ঢেউয়ের ধরন এবং জাপানের আইচি-নাগোয়ার সমুদ্রের পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। জাপানে যে ধরনের শক্তিশালী ও টেকনিক্যাল ঢেউয়ের মুখোমুখি হতে হবে, তার জন্য আগে থেকেই আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং ক্যাম্পে অভ্যস্ত হওয়া জরুরি বলে জানান সার্ফাররা। সার্ফার মান্নান বলেন, ‘কক্সবাজারের ঢেউ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিদেশের ওই চ্যালেঞ্জিং ঢেউয়ের সঙ্গে যদি আমরা আগে পরিচিত না হই, তবে প্রতিযোগিতায় গিয়ে তো টেকাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে!’মান্নান ও ফাতেমার স্বপ্নযাত্রার পেছনে আছেন কোচ রাশেদ আলম। বছরের পর বছর সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে যিনি তৈরি করছেন দেশের সম্ভাবনাময় সার্ফারদের। রাশেদ আলমেরও অভিযোগ-নিয়মিত প্রশিক্ষণ কিংবা আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতির জন্য নেই পর্যাপ্ত সহায়তা।কোচ রাশেদ আলম আক্ষেপের বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া বা বালিতে গিয়ে অনুশীলন করতে। কারণ, জাপানে গিয়ে যে ধরনের ঢেউয়ের মুখোমুখি হতে হবে, সেগুলোর সঙ্গে আগে থেকে পরিচিত হলে আমাদের সার্ফারদের পারফরম্যান্স আরও ভালো হতে পারত।’কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে কোচ রাশেদ আলমের সঙ্গে সার্ফার মান্নান ও ফাতেমা। সম্প্রতি তোলাবাজেট-স্বল্পতার কারণে এবারের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলকেও সাজাতে হয়েছে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে। বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ ও সার্ফিং প্রশিক্ষক সাইফুল্লাহ সিফাত জানান, বর্তমান সরকারের বাজেট-স্বল্পতা ও সার্বিক যৌক্তিক কারণে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২১ সেপ্টেম্বর দুই অ্যাথলেটের সঙ্গে মাত্র একজন অফিশিয়াল জাপানে যাবেন। সেই একজন মানুষই একই সঙ্গে কোচ, ম্যানেজার ও কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। আলাদা করে কোচ বা টেকনিক্যাল টিম পাঠানোর সুযোগ না থাকায় কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে দলটিকে।ফাতেমা বলেন, ‘কোচ ছাড়া এত বড় প্রতিযোগিতায় গিয়ে আমরা কীভাবে নিজেদের সেরাটা দেব? পানিতে নামার পর আমাদের ভুলগুলো ধরে দেওয়ার জন্য কোচের উপস্থিতি অপরিহার্য ছিল।’২০২৬ সালের জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় পুরুষ ও নারী বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মান্নান ও ফাতেমা এশিয়ান গেমসের জন্য নির্বাচিত হন। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩টি ডিসিপ্লিন অংশগ্রহণ করছে। বর্তমানে সার্ফিং দলের প্রশিক্ষণ চলছে কক্সবাজার সৈকতে। সমুদ্রের ঢেউ ও আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই চলছে অনুশীলন।