জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে সম্ভবত হিমবাহটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পরে সেটি ধসে গত মাসে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে শত শত মানুষ প্রাণ হারান। এ দুর্যোগ নিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা হিমবাহধসের আগে ওই অঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়া শনাক্ত করেছেন। হিমবাহটি ধসে পড়ার পর প্রায় ১১ কোটি ঘনমিটার তুষার ও বরফ নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এতে প্রায় নজিরবিহীন আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। কোনো সতর্কতা ছাড়াই ভাটির জনপদগুলোয় আঘাত হানে সেই বন্যা।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, ‘হাজার হাজার মাইল দূরে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে হওয়া নিঃসরণ যে সংকট তৈরি করেছে, নেপালের মানুষ জীবন দিয়ে তার মূল্য দিচ্ছেন।’ ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এ গবেষণা করেছে।
অটো বলেন, ‘উষ্ণায়ন যখন পৃথিবীর ছাদকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তখন স্থানীয় পর্যায়ে যত অভিযোজনই করা হোক, ভাটির ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ থেকে পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব নয়। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নিঃসরণ শূন্যে নামাতে আরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী বছরগুলোয় এমন আরও দুর্যোগ অনিবার্যভাবে দেখতে হবে।’
গত ২৬ আগস্ট লাংটাং লিরুং পর্বত থেকে ঝুলন্ত হিমবাহ ও শিলার একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে। এর আয়তন ছিল প্রায় দুই লাখ বর্গমিটার। এ দুর্যোগে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এখনো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ।
হিমবাহ ও শিলার ওই অংশ প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার নিচে পড়ে। এত তীব্র শক্তিতে সেটি উপত্যকার মাটিতে আঘাত করে যে কম্পনটি ভূমিকম্প হিসেবেও ধরা পড়ে। এতে বরফ গলে যায় এবং হিমশীতল বন্যার সৃষ্টি হয়। সেই বন্যা ঘণ্টায় ১৭৭ কিলোমিটারের বেশি গতিতে নদীপথে নেমে আসে।
পানি, বরফ, শিলা ও পলির ভয়াবহ স্রোত পরিবার, ঘরবাড়ি, জনপদ, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষ আটকা পড়েন এবং অন্য এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘এত বড় শিলাধসের ঘটনা বিরল। আনুমানিক হিসাবে এক হাজার থেকে দশ হাজার বছরে এ আকারের একটি ঘটনা ঘটতে পারে। এ ঘটনা দেখিয়েছে, অভিযোজনের সীমাও ইতিমধ্যে স্পর্শ করা হচ্ছে।’
অটো ও তাঁর দল এর আগে ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন বা ডব্লিউডব্লিউএর অধীন যেসব গবেষণা করেছেন, এটি সেগুলোর চেয়ে আলাদা। ডব্লিউডব্লিউএ হলো ইম্পেরিয়াল কলেজ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জলবায়ুবিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ উদ্যোগ।
আগের গবেষণাগুলোয় সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট আবহাওয়াজনিত ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু বিপর্যয়ের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তেমনটি করা যায়নি।
গবেষকেরা দেখেছেন, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে এই দুর্যোগ ঘটিয়েছে। কয়েক দশক ধরে গ্রিনহাউস গ্যাসদূষণের কারণে বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হওয়ায় এসব কারণের প্রভাব আরও বেড়েছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজে চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন বেন ক্লার্ক। তিনি বলেন, ভয়াবহ ধসের আগে হিমবাহটির আশপাশে দীর্ঘ মেয়াদে যেসব পরিবর্তন ঘটেছিল, সেখানে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ছাপ’ স্পষ্ট।
গবেষণায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
যে অঞ্চলে ধসটি ঘটেছে, সেখানে শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। শুধু জুলাই ও আগস্টে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস।
স্থানীয়ভাবে ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট ছিল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ দুই মাস। হিমবাহধসের আগের দিনগুলোয় তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
১৯৮০-এর দশক থেকে হিমালয়ে হিমাঙ্কের উচ্চতা প্রতি দশকে প্রায় ১০০ মিটার করে ওপরে উঠেছে। অর্থাৎ বরফ গলার মতো তাপমাত্রা এখন আরও উঁচু এলাকায় এবং বেশি সময় ধরে থাকছে। এতে স্থায়ীভাবে জমাট মাটি বা পারমাফ্রস্টে গঠিত পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে।
উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এরই মধ্যে হিমবাহটি উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে গেছে। ধসের স্থানটির চারপাশে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা বরফ সরে গেছে। পাশাপাশি বরফগলা পানিও জমেছে।
২০১৫ সালের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প পাহাড়ি ঢাল দুর্বল হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। তবে আগস্টের দুর্যোগে ওই ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নিশ্চিত করা যায়নি।
অটো, ক্লার্ক ও ডব্লিউডব্লিউএর গবেষক দল সরাসরি বলেনি যে জলবায়ু বিপর্যয়ই এ দুর্যোগের মূল কারণ। তাঁদের মতে, বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তোলার একটি কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে দেখাই বেশি যুক্তিসংগত।
ক্লার্ক বলেন, ‘আমরা দেখেছি, জলবায়ু পরিবর্তন উঁচু পাহাড়ি পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে। এই ধসের সম্ভাব্য অনেক কারণের ওপরই এর প্রভাব পড়ছে।’
বন্যায় হওয়া ধ্বংস মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তা চেয়ে জাতিসংঘের ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে নেপাল। এই তহবিল থেকে সহায়তা পেতে দুর্যোগটির সঙ্গে জলবায়ু সংকটের সম্পর্কের প্রমাণ দিতে হয়।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল চীন ও ভারতের মতো বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে ‘জেগে ওঠার’ এবং এই দুর্যোগের যৌথ দায় স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডব্লিউডব্লিউএর অংশ রেডক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা মাধব উপ্রেতি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ও সম্মুখসারির জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার পথ তৈরি হতে পারে শুধু বিশ্বজুড়ে নিঃসরণ ব্যাপকভাবে কমানোর মাধ্যমে।
মাধব উপ্রেতি আরও বলেন, ‘কল্পনাতীত মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি এ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। যে দেশটি এ সমস্যা তৈরিতে কার্যত কোনো ভূমিকা রাখেনি, তার এ পরিস্থিতি একটি বিষয় আরও স্পষ্ট করে, জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে তাদের সৃষ্টি না করা সংকট মোকাবিলায় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।’
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
শরতের সকাল থেকেই ভ্যাপসা গরম। এর মধ্যেই শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে পঞ্চগড় সরকারি অডিটোরিয়াম চত্বর। সারিতে দাঁড়িয়ে কেউ নিচ্ছে ক্রেস্ট ও উপহার। কেউ ছবি তুলছে, কেউবা ভিড় জমিয়েছে গেম জোনে। এভাবে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ে শুরু হয়েছে ‘শিখো-প্রথম আলো জিপিএ-৫ কৃতী সংবর্ধনা ২০২৬’।সকাল ১০টার দিকে বন্ধুসভার বন্ধুদের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল মঞ্চের আয়োজন।অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছে কৃতী শিক্ষার্থী শাহরিয়া ফেরদৌস (লিসা)। সে জেলার নতুনহাট সফিউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবার রংপুরের বেগম রোকেয়া কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে সে। শাহরিয়া বলে, ‘এখানে আসব বলে কাল থেকেই মনের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছিল। এখানে আসতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।’মো. আক্তারুজ্জামান নামের একজন শিক্ষার্থী বলে, ‘এখানে এসে মনে হলো, আপনারা আমাদের জন্য ভালো কিছু ভাবেন। এ ধরনের আয়োজন আমাদের এবং ছোট ভাইবোনদের আরও উজ্জীবিত করবে।’ফটোবুথে ছবি তুলছে শিক্ষার্থীরাপ্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা ২০২৬। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।প্রথম আলো যাত্রার শুরু থেকেই নতুন প্রজন্মের কৃতী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতে সংবর্ধনা দিয়ে আসছে। ১৯৯৯ সালে মেধাতালিকায় সেরাদের সংবর্ধনা দেওয়া শুরু হয়। জিপিএ পদ্ধতি চালুর পর ২০০১ সাল থেকে সারা দেশে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়ার এ আয়োজন চলছে।কৃতি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথিরাএবার পঞ্চগড় পর্বের উৎসবে অংশ নিতে সাড়ে চার শতাধিক শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ ও সফল ব্যক্তিদের বক্তব্য, সংবর্ধনা পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনুভূতি প্রকাশের পাশাপাশি রয়েছে সাংস্কৃতিক আয়োজন।এবারের অনুষ্ঠানটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় আছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
এক কোটি টাকা মুক্তিপণ চেয়ে ব্যবসায়ী আজিবর রহমানকে অপহরণের মামলায় কারাগারে ছিলেন চার আসামি। জামিন পেতে আদালতে দাখিল করা হলো একটি ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’। নথিতে দেখানো হলো, আজিবরের সঙ্গে তাঁদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। সেই নথি দেখেই মিলল জামিন। কিন্তু পরে ভুক্তভোগী জানালেন, এমন কোনো চুক্তির কথাই তিনি জানেন না। পুলিশের তদন্তে নথিটিকে ‘জাল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর আদালত উত্তরা পশ্চিম থানার একজন উপপরিদর্শককে তদন্তের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নথিপত্র যাচাই করে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আজিবরের সঙ্গে আসামিদের কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি বা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর আদালত চার আসামির জামিন বাতিল করে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই ঘটনায় জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার, আদালতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগে আলাদা মামলাও হয়েছে। মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবিমামলার নথি অনুযায়ী, গত ৯ জুন উত্তরা পশ্চিম থানার ৩ নম্বর সেক্টর এলাকায় পরিচিত একজনের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন ৫০ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আজিবর রহমান। সেখান থেকে ফেরার পথে রাজলক্ষ্মী মার্কেটের সামনে একটি সাদা গাড়িতে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যান।স্বজনেরা আর টাকা দিতে পারবেন না জানালে তাঁদের চেক দিতে বলা হয়। পরে জানানো হয়, আজিবরকে হালান অটোস্ট্যান্ড এলাকায় নিয়ে আসা হবে। পরে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আজিবরকে উদ্ধার করে।এজাহারে বলা হয়েছে, অপহরণকারীরা আজিবরের মাথায় আঘাত করেন। পরে তাঁর চোখ ও মুখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। এরপর স্বজনদের কাছে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।আজিবর বাড়িতে না ফেরায় ১১ জুন উত্তরা পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তাঁর স্বজনেরা। সেই রাতেই আজিবরের মেসেঞ্জার থেকে তাঁর স্ত্রীর কাছে ভিডিও কল আসে। সেখানে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে আটকে রেখে মারধর করছে। এরপর আবারও এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।২৫ লাখ টাকা দিয়েও মেলেনি মুক্তিমামলার নথি সূত্রে আরও জানা গেছে, আজিবরকে উদ্ধারের আশায় স্বজনেরা টাকা জোগাড় করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়।১৪ জুন অপহরণকারীদের নির্দেশ অনুযায়ী দক্ষিণখান এলাকার ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি হিসাবে ২০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। একই হিসাবে আজিবরের ভাগনে জহুরুল ইসলামের চাচাতো ভাই সোহেল রানা নিজের হিসাব থেকে আরও ৫ লাখ টাকা পাঠান বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়। —মেহেদী হাসান, তদন্ত কর্মকর্তা ও উপপরিদর্শক, উত্তরা পশ্চিম থানাআজিবরকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, সোনারগাঁসহ বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়। আসামিপক্ষ আদালতে যে চুক্তিপত্র দাখিল করেছে, সেটির পক্ষে কোনো প্রমাণও তাঁরা দেখাতে পারেননি।টাকা পাওয়ার পর অপহরণকারীরা আজিবরের মেসেঞ্জার থেকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। জানায়, টাকা পাওয়া গেছে। কিন্তু আজিবরকে ছেড়ে দেওয়ার বদলে আরও টাকা দাবি করা হয়।স্বজনেরা আর টাকা দিতে পারবেন না জানালে তাঁদের চেক দিতে বলা হয়। পরে জানানো হয়, আজিবরকে হালান অটোস্ট্যান্ড এলাকায় নিয়ে আসা হবে। পরে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আজিবরকে উদ্ধার করে।উদ্ধারের পর আজিবরকে উত্তরা কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।এ ঘটনায় ১৫ জুন উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন আজিবরের ভাগনে জহুরুল ইসলাম। মামলায় ছয়জনকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার হন মো. সজীব মিয়া (২৯), আবদুল আলীম বাবু (৩০), মো. ময়নুদ্দিন (৪০) ও মহিউদ্দিন (৩৬)।জামিনের জন্য আদালতে ‘চুক্তিপত্র’ দাখিলকারাগারে থাকা চার আসামির পক্ষে ১৮ জুন আদালতে জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান।২২ জুন জামিন শুনানির সময় আদালতে দাখিল করা হয় ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ নামে একটি দলিল। এতে আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও লেনদেনের কথা উল্লেখ ছিল। নথিটি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আসামিদের জামিন মঞ্জুর করেন।গত ২২ জুন জামিন শুনানির সময় আদালতে দাখিল করা হয় ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ নামে একটি দলিল। এতে আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও লেনদেনের কথা উল্লেখ ছিল। নথিটি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আসামিদের জামিন মঞ্জুর করেন।কিন্তু পরে এই চুক্তিপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২৬ জুলাই মামলার ধার্য তারিখে বাদী ও ভুক্তভোগী পক্ষ আদালতকে জানান, আসামিদের সঙ্গে তাঁদের কোনো আপসনামা বা ব্যবসায়িক চুক্তি হয়নি। আদালতে দাখিল করা চুক্তিপত্র সম্পর্কেও তাঁরা কিছু জানেন না।এরপর চুক্তিপত্রটি সত্য কি না, তা তদন্ত করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসানকে নির্দেশ দেন আদালত।সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকও জানেন নাতদন্তে পুলিশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আল-ফারাবি ট্রেডার্স লিমিটেডের মালিক শরিফুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আদালতে দাখিল করা চুক্তিপত্রটির সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চাওয়া হয়।তদন্ত কর্মকর্তার কাছে শরিফুল ইসলাম জানান, এ ধরনের কোনো চুক্তি তাঁর প্রতিষ্ঠানে হয়নি।বাদী জহুরুল ইসলাম ও ভুক্তভোগী আজিবর রহমানও এমন কোনো চুক্তির বিষয়ে কিছু জানেন না বলে তদন্তে জানান।৮ আগস্ট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মেহেদী হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা চুক্তির সত্যতা পাওয়া যায়নি। তদন্তে জানা গেছে, মুক্তিপণ আদায়ের জন্যই আজিবরকে অপহরণ করা হয়েছিল। —শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান, আসামিপক্ষের আইনজীবীআসামিরা জানিয়েছেন, আদালতে দাখিল করা নথিটি আসল। আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল, মুক্তিপণের জন্য নয়।তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আজিবরকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, সোনারগাঁসহ বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়। আসামিপক্ষ আদালতে যে চুক্তিপত্র দাখিল করেছেন, সেটির পক্ষে কোনো প্রমাণও তাঁরা দেখাতে পারেননি।তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এজাহারভুক্ত আসামি আবদুল আলীম বাবুকে চুক্তিপত্রের বিষয়ে প্রত্যক্ষ বা দালিলিক প্রমাণ দিতে বলা হলেও তিনি তা পারেননি। আসামি সজীব ও আলীমের বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ একাধিক মামলা আছে। এ ছাড়া সজীবের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও আছে।হাজির না হওয়ায় জামিন বাতিলজামিনের পর এই মামলায় আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার তারিখ ছিল ৯ আগস্ট। কিন্তু সেদিন তাঁরা আদালতে হাজির হননি।এরপর আদালত তাঁদের জামিন বাতিল করে চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে আদালতে দাখিল করা কথিত চুক্তিপত্রের বিষয়ে জাল নথি ও প্রতারণার অভিযোগে আলাদা মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ আগস্ট উত্তরা পশ্চিম থানায় নতুন মামলা করেন ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. হেলাল উদ্দিন।নতুন মামলায় দণ্ডবিধির ১৮১, ১৮২, ৪৬৫, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৩৪ ও ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, আসামিরা জাল দলিল তৈরি ও ব্যবহার করেছেন, আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন এবং পরস্পরের যোগসাজশে এসব করেছেন।এসআই হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা আদালতকে ভুল বুঝিয়ে জামিন নিয়েছেন। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা চুক্তিপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছিল।হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, আদালত এক হাজার টাকার বন্ডে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত আসামিদের জামিন দিয়েছিলেন। পরে ভুক্তভোগী পক্ষ চুক্তিপত্রের বিষয়ে আপত্তি জানালে আদালত তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে নথিটি জাল বলে উঠে আসে। এরপর আদালতের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়।মান যাচাই করে হেলমেট কিনছেন তো, আমদানির সাড়ে ২৪ শতাংশ নিরাপত্তা পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণআসামিপক্ষের দাবি, চুক্তিপত্রটি আসলতবে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন।এই আইনজীবী প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা তাঁকে জানিয়েছেন, আদালতে দাখিল করা নথিটি আসল। তাঁর দাবি, আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল, মুক্তিপণের জন্য নয়।আসামিপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, তিনি আবদুল আলীম বাবুকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন। তবে তিনি এখনো আত্মসমর্পণ করেননি।নথিটি কীভাবে জাল প্রমাণিত হলো, সে প্রশ্নও তোলেন আইনজীবী। তাঁর দাবি, পুলিশ এ বিষয়ে আসামিদের যথাযথভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।তবে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তিপত্রের পক্ষে প্রত্যক্ষ বা দালিলিক প্রমাণ দিতে বলা হলেও আবদুল আলীম বাবু তা পারেননি।গাড়ি ব্যবহারে অনিয়মে জড়িত এই আমলারা, জানতে চাইলে জবাব, ‘আমি একা করি নাকি’‘আমি তাঁদের আগে কখনো দেখিনি’ভুক্তভোগী আজিবর রহমান অবশ্য আসামিদের সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরা আমাকে তুলে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আটকে রাখে। টাকার জন্য বেধড়ক মারধর করে। আমি আসামিদের আগে কখনো দেখিনি, চিনিও না। তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো ব্যবসায়িক লেনদেনও নেই।’আজিবর বলেন, তিনি এখনো অসুস্থ। আসামিরা যে নথি দেখিয়ে জামিন নিয়েছিলেন, সেটিও ভুয়া। তাঁদের সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের চুক্তি বা লেনদেনের সম্পর্ক ছিল না।নিজের মুঠোফোনের ফাঁস হওয়া তথ্য দেখে মন্ত্রী বললেন, এটা কীভাবে সম্ভবনতুন মামলায় গ্রেপ্তার দুজনজাল নথি দাখিল ও প্রতারণার অভিযোগে করা নতুন মামলাটি এখন তদন্ত করছে কোতোয়ালি থানার এসআই জাহাঙ্গীর আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি চারজন। তাঁদের মধ্যে এজাহারভুক্ত মহিউদ্দিন ও তদন্তে পাওয়া আসামি ওসমানকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিরা পলাতক।তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, জাল নথি কীভাবে তৈরি হলো, কারা এটি তৈরি ও আদালতে দাখিলের সঙ্গে জড়িত এবং এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।মামলার নথি অনুযায়ী, জাল নথি দাখিলের অভিযোগে করা নতুন মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ ২১ সেপ্টেম্বর।
জিআই ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতি টাঙ্গাইল শাড়িকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দিয়েছে; কিন্তু যে হাত এই শাড়ি বোনে, সেই হাত যদি তাঁত ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার হ্যান্ডেলে চলে যায়, তাহলে এই স্বীকৃতির ভবিষ্যৎ কোথায়?টাঙ্গাইল শাড়ির দুটি বড় স্বীকৃতি আছে আমাদের। একটি দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে এর আইনি পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তার চেয়েও বড় সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এসেছে ইউনেসকোর কাছ থেকে। ২০২৫ সালে ‘ট্র্যাডিশনাল শাড়ি উইভিং আর্ট অব টাঙ্গাইল’ ইউনেসকোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্টে’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই স্বীকৃতি শুধু একটি শাড়িকেই নয়, শাড়ি তৈরির সঙ্গে যুক্ত জ্ঞান, দক্ষতা ও সামাজিক অনুশীলনকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। কাগজে-কলমে এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এর সঙ্গেই একটি প্রশ্ন অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়—এসব স্বীকৃতি একজন বয়নশিল্পী কিংবা বয়নসংশ্লিষ্ট কারিগরের জীবন কতটা বদলে দিতে পেরেছে? কিংবা পরম্পরার এই শিল্প পেশা হিসেবে তরুণ প্রজন্মের কাছে কতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে? আছে স্বীকৃতি, নেই উন্নতিএই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর এখনো সহজে দেওয়া যায় না। তাই জিআই ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতির অর্থ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হয়। কারণ, কোনো একটি হেরিটেজ টেক্সটাইল শেষ পর্যন্ত কোনো সনদ, লোগো বা নিবন্ধনের সংখ্যায় বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে মানুষের হাতে, তাদের দক্ষতায়। সেই সক্ষম হাত যদি তাঁত ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যায়, তাহলে একসময় আমাদের কাছে থাকবে কেবল টাঙ্গাইল শাড়ির নাম; থাকবে না টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরির প্রয়োজনীয় শিল্পী।তাই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা আসলে কী বাঁচাতে চাই? আমরা বাঁচাতে চাই টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্প। আর সেটা হলে আমাদের উচিত হবে টাঙ্গাইল নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ শুরু করা করা। টাঙ্গাইল শাড়ি ও টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প এক নয়টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প এবং টাঙ্গাইল শাড়িকে এক করে দেখলে সমস্যাটি বোঝা কঠিন হবে। টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প একটি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিসর। এই শিল্পের সঙ্গে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বয়নশিল্পী ও নানা ধরনের শ্রম যুক্ত। অন্যদিকে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ নামে যে স্বতন্ত্র পণ্য-পরিচয় ও ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে, তার ঐতিহাসিক নির্মাণে বসাক তাঁতিদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে এই উৎপাদনধারায় মুসলিম তাঁতিরাও বড় অংশীদার হয়ে ওঠেন। ইউনেসকোর বর্ণনায়ও বসাক ও জোলা—উভয় সম্প্রদায়ের কথা এসেছে এবং পরিবারভিত্তিকভাবে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।পরিচয়ের সংকট তৈরি করা যাবে নাটাঙ্গাইলের বয়নশিল্প কোনো এক সম্প্রদায়ের একক সম্পত্তি নয়। কিন্তু টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহাসিক ব্র্যান্ড পরিচয়ের সঙ্গে বসাকদের সম্পর্ক অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সংরক্ষণনীতি তাই একই সঙ্গে হেরিটেজ-স্পেসিফিক এবং সোশ্যালি ইনক্লুসিভ হতে হবে। অর্থাৎ টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও কারিগরি পরিচয় সংরক্ষণ করতে হবে; পাশাপাশি আজ যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বয়নশিল্পী ও কারুশিল্পী এই শিল্পকে জীবিত রাখছেন, তাঁদের সবাইকে হেরিটেজ ইকোনমির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো সম্প্রদায়ের মালিকানা প্রতিষ্ঠা নয়; দক্ষতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।স্বীকৃতি আছে, কিন্তু পেশার ভবিষ্যৎ কোথায়?বাংলাদেশের জিআই আবেদনে টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপাদন এলাকার বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসর দেখানো হয়েছে। দেলদুয়ারের পাথরাইল-চণ্ডীসহ বিভিন্ন এলাকা, কালিহাতীর বহু গ্রাম এবং টাঙ্গাইল সদরের বিভিন্ন অঞ্চল এর উৎপাদনভূমির অংশ। অর্থাৎ ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ কোনো একটি কারখানা বা একটি গ্রামের পণ্য নয়; এটি একটি বিস্তৃত প্রোডাকশন ইকোসিস্টেম।শাড়ি তৈরি একটা একটা ইকোসিস্টেমএই ইকোসিস্টেমের সমস্যা হলো, আমরা পণ্যের হিসাব করতে শিখেছি, কিন্তু মানুষের হিসাব এখনো যথেষ্টভাবে করি না। কতটি তাঁত আছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন সক্রিয় তাঁতি আছেন? কতজন মাস্টার উইভার? কতজন ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী? কতজন নতুন করে এই পেশায় ঢুকছেন? কতজন বেরিয়ে যাচ্ছেন? কতজন নারী ও পুরুষ বয়নপূর্ব ও বয়নোত্তর কাজে যুক্ত? কতজন শিক্ষানবিশ আগামী পাঁচ বছরে একজন দক্ষ বয়নশিল্পী বা বয়নকারিগর হতে পারবেন?এসব তথ্য ছাড়া হেরিটেজ পলিসি অনেকটাই অন্ধকারে তৈরি হবে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের জিআই আবেদনে তাঁতিদের প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং বয়নপূর্ব ও বয়নোত্তর সহায়তার মতো কাজের কথাও উল্লেখ আছে। কিন্তু জিআই পাওয়ার পর পরবর্তী প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই দায়িত্বগুলোকে কীভাবে একটি পরিমাপযোগ্য সেফগার্ডিং প্রোগ্রামে পরিণত করা হবে?হ্যান্ডলুমের সংকটের জন্য কেবল পাওয়ারলুম দায়ী নয়টাঙ্গাইলের হ্যান্ডলুমের সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই পাওয়ারলুমের দিকে আঙুল তুলি। এতে সমস্যার একটি অংশ ধরা পড়ে, পুরোটা নয়। কারণ, প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। জ্যাকার্ড, চিত্তরঞ্জন কিংবা পরবর্তী প্রযুক্তিগত পরিবর্তন টাঙ্গাইলের বয়নে নতুন নকশা ও উৎপাদনের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পণ্য ও ভোক্তার চাহিদাও বদলেছে।হ্যান্ডলুমের সংকটের দায় এককভাবে পাওয়ারলুমের নয়তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—পাওয়ারলুম থাকবে কি থাকবে না? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন পণ্য হ্যান্ডলুমে থাকবে এবং কেন থাকবে? কারণ, ম্যাস-মার্কেট প্রডাক্ট এবং হেরিটেজ প্রোডাক্টের অর্থনীতি এক নয়। একটি পাওয়ারলুম যদি কম সময়ে বেশি কাপড় তৈরি করে, তাহলে সাধারণ বাজারে তার সঙ্গে হ্যান্ডলুমের সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি করা হ্যান্ডলুমের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।রাষ্ট্রের কাজ তখন পাওয়ারলুম বন্ধ করা নয়; হেরিটেজ হ্যান্ডলুমের জন্য আলাদা ইকোনমিক স্পেস তৈরি করা।কমে যাচ্ছে দক্ষ মাস্টার উইভারটাঙ্গাইলের বয়নশিল্পের সামনে আরেকটি বড় সংকট দক্ষ মাস্টার উইভারের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা। যাঁরা বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা ও হাতে-কলমে অর্জিত দক্ষতার মাধ্যমে একটি তাঁতকে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করেছেন, তাঁদের বড় একটি অংশের বয়স এখন ৫০ বছর বা তার বেশি। অন্যদিকে, তাঁদের জায়গা নেওয়ার মতো তরুণ প্রজন্মও পর্যাপ্ত সংখ্যায় এই পেশায় আসছে না। ফলে তৈরি হচ্ছে একটি গুরুতর প্রজন্মগত শূন্যতা।একজন দক্ষ মাস্টার উইভার শুধু তাঁত চালান না; তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সুতা বোঝা, টান নিয়ন্ত্রণ, নকশা পড়া, তাঁতের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং কাপড়ের গুণমান ধরে রাখার মতো বহু সূক্ষ্ম দক্ষতা। তাই একজন মাস্টার উইভার হারানো মানে শুধু একজন শ্রমিক হারানো নয়, একটি জ্ঞানভান্ডার হারানো।এসব জ্ঞান মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে দীর্ঘদিনের কাজের মধ্য দিয়ে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। একে গুরুমুখী বিদ্যা বলা যেতে পারে।তাঁত থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায়রিকশা চালালে আয় বেশিএই সমস্যা সব বয়ন অঞ্চলে আছে। তবে টাঙ্গাইলের সমস্যাটিকে একটু অন্যভাবে দেখা দরকার। একজন তরুণের কাছে পেশা বেছে নেওয়ার সময় ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেটি একমাত্র সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে না। তার দরকার আয়, স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ। তাঁতে বসে সারা দিনে বড়জোর ৫০০ টাকা আয় করা যায়। সেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়ে দিনে নিদেনপক্ষে তার দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব। একজন তরুণ তখন রিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকবে—এটাই স্বাভাবিক। তাঁকে এজন্য দোষ দেওয়া যায় না। ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো ‘খারাপ পেশা’র প্রতীক নয়; এটি শ্রমবাজারের একটি বিকল্প। আর সেটিই সমস্যার গভীরতা বোঝায়।ভবিষ্যৎ টেকসই ফ্যাশনের: হাতে তৈরি পণ্যের বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিতএখানে টাঙ্গাইলের জন্য একটি বড় আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সারা বিশ্বে ফ্যাশন ও টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি এখন সাসটেইনেবিলিটি এবং সার্কুলারিটির দিকে এগোচ্ছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ইউএনইপি টেক্সটাইল ভ্যালু চেইনকে আরও সাসটেইনেবল ও সার্কুলার করার জন্য কনজামশান প্যাটার্ন বদলানো, উৎপাদন পদ্ধতি উন্নত করা এবং অবকাঠামোয় বিনিয়োগ—এই তিনটি অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের Sustainable and Circular Textiles Strategy-ও দীর্ঘস্থায়ী, রিপেয়ারেবল, রিসাইকেল এবং মানসম্পন্ন টেক্সটাইলমুখী বাজার বিস্তারের কথা বলছে।অর্থাৎ ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ কেবল বেশি উৎপাদন ও দ্রুত বিক্রিতে নয়; পণ্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব, মেরামত, পুনঃব্যবহার ও কম অপচয়ের মধ্যেও।এই পরিবর্তনের ভেতর হ্যান্ডলুম ও হ্যান্ডমেডের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ হাতে তৈরি একটি পণ্যের সঙ্গে কারিগরের দক্ষতা, সময়, স্থানীয় জ্ঞান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক থাকে।তাই ‘Future is Handmade’ কথাটি শুধু একটি সুন্দর স্লোগান হিসেবে নয়, টাঙ্গাইলের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। হ্যান্ডমেডের ভবিষ্যৎ তখনই তৈরি হবে, যখন এর বাজারমূল্য, কারিগরের আয় ও সামাজিক মর্যাদা—তিনটিই বাড়বে।তবে হ্যান্ডলুমকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাসটেইনেবল ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না। টেকসইতার প্রশ্নে সুতা, রং, পানি, জ্বালানি, উৎপাদন, ব্যবহার, মেরামত, পুনঃব্যবহার এবং বর্জ্য—পুরো ভ্যালু চেইন দেখতে হবে। কিন্তু এই নতুন বৈশ্বিক চাহিদা টাঙ্গাইলের মতো ঐতিহ্যবাহী হ্যান্ডলুমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।কারিগরকে বাঁচানো নয়, কারিগর হওয়াকে আকর্ষণীয় করতেআমাদের বয়নশিল্পীদের যথাযথ সম্মান দিতে হবেএখানেই আমাদের হেরিটেজ বা পরম্পরার পেশার নীতিমালার দর্শন বদলানো দরকার। আমরা সাধারণত কারুশিল্পীকে দেখি দরিদ্র, সহায়তাপ্রার্থী, প্রান্তিক ও ব্রাত্য হিসেবে। অথচ তাঁদেরই বলা হয় ঐতিহ্য ধরে রাখতে। এভাবে হেরিটেজ ইকোনমি তৈরি হয় না।একজন মাস্টার উইভারকে একজন মাস্টার ক্র্যাফটসম্যানের সম্মান ও মূল্য দিতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর দক্ষতার বাজারমূল্য থাকতে হবে, তাঁর কাজের পরিচয় থাকতে হবে, তাঁর নিজের নাম থাকতে হবে। একজন ক্রেতা যেন বলতে পারেন, ‘এই শাড়িটি অমুক মাস্টার উইভারের বোনা।’যেভাবে একজন ফ্যাশন ডিজাইনারের নাম প্রোডাক্টের মূল্য বাড়ায়, একজন কারুশিল্পীর নামও সেভাবে ভ্যালু তৈরি করবে—এমন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। একজন তরুণ তখন বাবার পেশা ‘চালিয়ে যাচ্ছে’ না; সে একটি ক্রিয়েটিভ প্রফেশন বেছে নিচ্ছে।বয়নশিল্প বাঁচাতে যে পাঁচটি বিষয় জরুরি আয়: কারুশিল্পীকে তাঁর দক্ষতার উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে।পরিচয়: তাঁর কাজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় যুক্ত করতে হবে।উদ্ভাবন: নতুন প্রযুক্তি, নতুন পণ্য ও নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে।দৃশ্যমানতা: ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি, মিডিয়া, জাদুঘর, ডিজাইনার, গবেষণা, লাকজারি রিটেইল—সব জায়গায় কারুশিল্পীদের দৃশ্যমানতা বাড়াতে হবে।জাতীয় স্বীকৃতি: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বীকৃতি দিতে হবে, যাতে মাস্টার ক্র্যাফটসম্যান হওয়া একটি সামাজিক মর্যাদার পরিচয় হয়ে ওঠে।এই পাঁচটি স্তম্ভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে কারুশিল্পী-ডিজাইনার-ব্র্যান্ডের একটি কার্যকর চক্র। আমাদের দেশে এই কলাবোরেশন এখনো যথেষ্ট নয়। অথচ বয়নশিল্পী, ডিজাইনার ও গবেষক মিলে কাজ করলে নতুন পণ্য, নতুন গল্প ও নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। বেনারসিতে এমন একটি পরীক্ষায় আমি নিজে একজন ডিজাইনারের সঙ্গে কাজ করে সফল হয়েছি; টাঙ্গাইলেও সেই অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করা যেতে পারে।টাঙ্গাইলের জন্য একটি নতুন অর্থনীতি দরকারটাঙ্গাইল শাড়িকে শুধু ‘তাঁতজাত পণ্য’ হিসেবে বাজারজাত করলে হবে না। এটিকে একটি হেরিটেজ টেক্সটাইল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং শাড়ির পাশাপাশি ডাইভারসিফায়েড প্রোডাক্ট রেঞ্জ তৈরি করতে হবে। কারণ, একটি ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পকে টেকসই করতে হলে তার বাজার শুধু শাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পোশাক, ওড়না, স্কার্ফ, স্টোল, কুশন ও টেবিল-টেক্সটাইল, ব্যাগ, হোম ডেকর, ছোট লাইফস্টাইল প্রোডাক্ট এবং ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ—টাঙ্গাইলের বয়ন, নকশা ও কাপড়ের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নতুন পণ্য তৈরি করা যেতে পারে।সাধারণ ক্রেতার জন্য দৈনন্দিন টাঙ্গাইল; নির্দিষ্ট ঐতিহ্যবাহী বয়ন ও মানের হেরিটেজ টাঙ্গাইল; উন্নত সুতা, বিশেষ বয়ন ও অলংকরণ এবং সীমাবদ্ধ উৎপাদনের জন্য প্রিমিয়াম টাঙ্গাইল; আর মাস্টার উইভারের সিগনেচার পিস হিসেবে কালেকটর’স টাঙ্গাইল।এই ডাইভারসিফিকেশনে উদ্দেশ্য শাড়ির গুরুত্ব কমানো নয়; বরং শাড়িকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর টাঙ্গাইল টেক্সটাইল ইকোসিস্টেম তৈরি করা। এতে একই তাঁতি ও তাঁতপ্রযুক্তির জন্য একাধিক বাজার তৈরি হবে, সিজনাল ডিমান্ডের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং নতুন প্রজন্মের ডিজাইনার ও উদ্যোক্তারা হেরিটেজ টেকনিক নিয়ে কাজ করার আরও সুযোগ পাবেন।তখন একটি শাড়ির দাম শুধু কাপড়ের পরিমাণ বা উৎপাদন খরচ দিয়ে নির্ধারিত হবে না। তার সঙ্গে যুক্ত হবে দক্ষতা, সময়, উৎস, বয়ননৈপুণ্য ও প্রাপ্যতা, যা লাক্সারি ইকোনমির ভিত্তি তৈরি করে।একটি শাড়িরও ‘পাসপোর্ট’ থাকা উচিতনারীদের আরও বেশি করে ক্ষমতায়িত করতে হবেজিআইয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই। একটি অথেনটিক টাঙ্গাইল শাড়ির সঙ্গে এমন একটি ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কিউআর কোড স্ক্যান করলে ক্রেতা জানতে পারবেন—কোন গ্রামের, কোন বয়নশিল্পীর, কোন তাঁতে তৈরি, কোন সুতা, কত কাউন্ট, কোন টেকনিক এবং কবে তৈরি।গ্রাম-বয়নশিল্পী-তাঁত-সুতা-টেকনিক-প্রোডাক্ট—এই চেইনকে দৃশ্যমান করা গেলে জিআই কেবল আইনি প্রোটেকশন হিসেবে থাকবে না; বাজারমূল্যও তৈরি করবে। আর সেই মূল্য তৈরি হলেই বাড়বে বয়নশিল্পী তথা বৃহত্তর অর্থে কারুশিল্পীর গ্রহণযোগ্যতা।নারীকে সহকারী নয়, উদ্যোক্তা করতে হবেটাঙ্গাইলের বয়নশিল্পে নারীদের ভূমিকা নতুন করে দেখতে হবে। ইউনেসকোর বর্ণনায়ও পুরুষের পাশাপাশি বয়নপূর্ব ও বয়নোত্তর পর্যায়ে নারী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ভূমিকার কথা এসেছে। কিন্তু নারীকে যদি শুধু ‘বয়নশিল্পীর স্ত্রী’ বা ‘পরিবারের সহায়ক শ্রমিক’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এই সম্ভাবনাটিই নষ্ট হবে।নারী হতে পারেন—আর্টিজান, ডিজাইনার, ফিনিশার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার, উদ্যোক্তা, সমবায় নেতা, অনলাইনে বিক্রেতা কিংবা ব্র্যান্ড ওনারও।বিশেষ করে ডিজিটাল কমার্সের যুগে গ্রাম থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই প্রয়োজন হতে পারে, একটি উইমেন উইভার অ্যান্ড হেরিটেজ এন্টারপ্রাইজ প্রোগ্রাম—যেখানে শুধু বোনার ট্রেনিং নয়, ডিজাইন, কস্টিং, ব্র্যান্ডিং, ফটোগ্রাফি, ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স ও এক্সপোর্ট রেডিনেসের মতো বিষয় থাকবে।জিআইয়ের নামে ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্নভারতের ‘Tangail Saree of Bengal’ জিআই নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্নটি শুধু নামের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পণ্যের প্রকৃত ভৌগোলিক পরিচয়, ইতিহাস এবং বয়নপ্রযুক্তির প্রশ্ন। ভারতের আবেদনটি ২০২০ সালে প্রথমে ‘Tangail Saree of West Bengal’ নামে করা হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় পণ্যের নাম নিয়েই একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে—নথিতে ‘Tangail Saree of West Bengal’, ‘Fulia Tangail Saree’, ‘Tangail Jamdani’ এবং ‘Tangail Saree (Indian variety)’—এমন একাধিক নাম ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে পরামর্শক গোষ্ঠীর সুপারিশে নাম পরিবর্তন করে ‘Tangail Saree of Bengal’ করা হয়।আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভারতের নিজস্ব আবেদনের নথিতেই টাঙ্গাইল, বাংলাদেশ এবং পূর্ববঙ্গকে এই শাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি ভারতের GI Journal-সংক্রান্ত গবেষণায় উল্লেখ আছে, আবেদনপত্রের কিছু নথিতে বাংলাদেশের টাঙ্গাইলকে উৎপত্তিস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে পরে ‘Tangail Saree of Bengal’ নামে জিআই দেওয়া হলে প্রশ্ন ওঠে—একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নামকে কীভাবে এত বিস্তৃত ঐতিহাসিক-ভৌগোলিক পরিচয়ের মধ্যে পুনর্নির্ধারণ করা হলো?প্রযুক্তিগত পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন আছে। ভারতের GI Journal-এ পণ্যটিকে ‘Tangail Saree of Bengal (Jamdani variety)’ বলা হয়েছে এবং extra-weft অলংকরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জামদানি কোনো মোটিফের নাম নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র বয়নপ্রযুক্তি। ফলে টাঙ্গাইলের নিজস্ব নকশা বা মোটিফ এবং জামদানির বয়নপ্রযুক্তিকে কীভাবে একই পরিচয়ের মধ্যে আনা হচ্ছে, সে বিষয়ে কারিগরি প্রশ্ন থেকেই যায়। ভারতের নথিতে এই পরিভাষার ব্যবহারকে তাই গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।এখানেই বিষয়টি আইনি লড়াইয়েও গড়িয়েছে। বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ভারতের এই জিআই নিবন্ধনকে চ্যালেঞ্জ করে মাদ্রাজ হাইকোর্টে OP(GI) No. 1 of 2025 মামলা করেছেন। ৮ এপ্রিল ২০২৬-এর সর্বশেষ পাওয়া আদেশে প্রথম বিবাদীপক্ষ আবেদনকারী ‘person aggrieved’ নন—এই যুক্তিতে মামলা খারিজের আবেদন করেছে বলে আদালত নথিভুক্ত করেছে এবং সেই আবেদনটি মূল rectification petition-এর সঙ্গে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের বয়ানও তৈরি করতে হবেভারতের জিআই নিয়ে আইনি লড়াই এবং তাদের নথিতে থাকা অসংগতিগুলো নিয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কিন্তু শুধু অন্যের নথির ভুল ধরিয়ে দিলেই হবে না; টাঙ্গাইল সম্পর্কে আমাদের নিজেদের তথ্য ও বয়ানকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে নির্ভরযোগ্য ও authoritative documentation তৈরি করা জরুরি।আন্তর্জাতিক ক্রেতা, গবেষক, ডিজাইনার, মিউজিয়াম ও গণমাধ্যম টাঙ্গাইল সম্পর্কে তথ্য খুঁজলে যেন বাংলাদেশের তৈরি তথ্যই সহজে পাওয়া যায়—সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাস, বয়নপ্রযুক্তি, কারিগরি পরিভাষা ও টাঙ্গাইলের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আমাদের নিজেদের ভাষ্য আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত না হলে অন্যের তৈরি বয়ানই সেখানে প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। এজন্য জিআই রক্ষা তাই শুধু আদালতে নয়; তথ্যের ক্ষেত্রেও আবশ্যক।হেরিটেজ হ্যান্ডলুম জোনটাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর জন্য আলাদা জোনিং পলিসি নিয়েও ভাবা দরকার। এটি পাওয়ারলুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়; বরং এমন একটি হেরিটেজ হ্যান্ডলুম জোন, যেখানে হ্যান্ডলুম ক্লাস্টারকে বিশেষ সুরক্ষা ও প্রণোদনা দেওয়া হবে।এই অঞ্চলে থাকতে পারে:১. কাঁচামালের সাপোর্ট, ২. সুতা রং করার ব্যবস্থা, ইয়ার্ন ও ডাই ব্যাংক, লুম রিপোয়ার সেন্টার, ডিজাইন স্টুডিও, টেস্টিং ল্যাব ও ট্রেনিং সেন্টার, শিক্ষানবিশ তৈরির কর্মসূচি, ডিজিটাল মার্কেট সাপোর্ট। আর অবশ্যই ছোট পরিসরের হলেও একটি টাঙ্গাইল হেরিটেজ টেক্সটাইল মিউজিয়াম থাকা দরকার। প্রয়োজনে ঐতিহ্যবাহী ক্লাস্টারের চারপাশে নির্দিষ্ট বাফার জোনে পাওয়ারলুম স্থাপন নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। ব্লাঙ্কেট ব্যান নয়, হেরিটেজ-সেনসেটিভ জোনিংই হবে বাস্তবানুগ পথ।পরম্পরা টিকিয়ে রাখাটাই জরুরিইউনেসকো যে বিষয়টিকে হেরিটেজের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তার কেন্দ্রে আছে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া। এ জন্য অ্যাপ্রেন্টিস বা শিক্ষানবিশ তৈরি না হলে কোনো সেফগার্ডিং প্রোগ্রাম সফল হবে না।রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিতে পারে একজন মাস্টার উইভার কত বছরে কতজন শিক্ষানবিশ তৈরি করবেন। প্রশিক্ষণের সময় মাস্টার উইভার যেমন সম্মানী পাবেন, তেমনি শিক্ষানবিশও ভাতা পাবেন। নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনের পর শিক্ষানবিশ পাবেন সার্টিফিকেট। এতে ‘বয়নশিল্পী বা বয়ন কারিগর হওয়া’ আবার একটি স্ট্রাকচারড ক্যারিয়ার পাথ হয়ে উঠতে পারে।ইউনেসকোর পর এখন কী?ইউনেসকোর ইন্সক্রিপশন কোনো শেষ নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি; এর সঙ্গে সেফগার্ডিংয়ের দায়িত্বের প্রশ্নও আসে। তাই বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি টাঙ্গাইল সেফগার্ডিং অ্যাকশন প্ল্যান। এতে শুধু হেরিটেজ সেলিব্রেশন থাকবে না; থাকবে মেজারেবল টার্গেট।এটি পাঁচ বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা হতে পারে। আগামী পাঁচ বছরে কতজন নতুন বয়নশিল্পী ও বয়নসহায়ক কারুশিল্পী তৈরি হবে? কয়টি হ্যান্ডলুম সক্রিয় থাকবে? কতজন মাস্টার উইভার স্বীকৃতি পাবেন? কতজন নারী উদ্যোক্তা তৈরি হবে? কয়টি ঐতিহ্যবাহী টেকনিক ডকুমেন্টেড হবে? কতটি নতুন আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হবে? একজন সার্টিফায়েড হেরিটেজ উইভারের বাৎসরিক গড় আয় কতটা বাড়বে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া ইউনেসকোর স্বীকৃতি উদ্যাপন করা সহজ; কিন্তু তার অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করা কঠিন।টাঙ্গাইল বয়নশিল্প বাঁচাতে তিনটি অগ্রাধিকারক. মানুষ ও দক্ষতা: কারিগরকে পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা১. জাতীয় টাঙ্গাইল আর্টিজান রেজিস্ট্রি: শুধু বয়নশিল্পী নয়, মাস্টার উইভার, শিক্ষানবিশ, ডায়ার, ডিজাইনার, ফিনিশার ও তাঁতসংশ্লিষ্ট সব কারুশিল্পীকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ডেটাবেজ তৈরি করা।২. মাস্টার উইভার কর্মসূচি: দক্ষ বয়নশিল্পী ও বয়নসহায়ক কারুশিল্পীদের জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া।৩. মাস্টার উইভার শিক্ষানবিশ কর্মসূচি: নতুন প্রজন্মকে পেশায় আনতে মাস্টার উইভারের অধীনে শিক্ষানবিশ তৈরির জন্য ভাতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।৪. উইমেন হেরিটেজ এন্টারপ্রাইস মিশন: নারীকে দক্ষ কর্মী থেকে উদ্যোক্তা ও ব্র্যান্ড ওনারে উন্নীত করা।৫. কারুশিল্পীর আয় ও সামাজিক নিরাপত্তা: স্বল্পসুদের ঋণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে কারুশিল্পীকে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক হিসেবে না দেখে পেশাজীবী ক্র্যাফটসম্যান হিসেবে বিবেচনা করা।খ. পণ্য ও বাজার: টাঙ্গাইলকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা১. প্রিমিয়াম ও ডাইভারসিফায়েড টাঙ্গাইল মার্কেট স্ট্র্যাটেজি: সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি হেরিটেজ ও লাকজারি সেগমেন্ট আলাদা করার পাশাপাশি শাড়ির বাইরে পোশাক, অ্যাকসেসরিজ, হোম টেক্সটাইল ও লাইফস্টাইল প্রডাক্টের নতুন বাজার তৈরি করা।২. অথেনটিক টাঙ্গাইল সার্টিফিকেশন: জিআই-এর সঙ্গে যুক্ত ট্রেসেবিলিটি ও কিউআর-ভিত্তিক অথেনটিকেশন সিস্টেম চালু করা।৩. সাসটেইনেবল হ্যান্ডলুম ইনিশিয়েটিভ: পানি, রং, সুতা, জ্বালানি, বর্জ্য, রিপেয়ার ও রিইউজসহ পুরো ভ্যালু চেইন বিবেচনায় নিয়ে টাঙ্গাইল হ্যান্ডলুমের জন্য টেকসই মান তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ ঘটানো।গ. জ্ঞান, সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠান: ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা১. হেরিটেজ হ্যান্ডলুম জোন: ঐতিহ্যবাহী ক্লাস্টারগুলোকে আলাদা পলিসি প্রটেকশন ও প্রণোদনা দেওয়া।২. টাঙ্গাইল ডিজাইন ও নলেজ আর্কাইভ: ঐতিহ্যবাহী টেকনিক, কনস্ট্রাকশন, ডিজাইন ভোকাবুলারি, মোটিফ ও প্রোডাকশন নলেজ ডকুমেন্টেড করা।৩. ইউনেস্কো টাঙ্গাইল সেফগার্ডিং অ্যাকশন প্ল্যান: ইউনেস্কোর ইন্সক্রিপশনকে কেন্দ্র করে পাঁচ ও দশ বছরের পরিমাপযোগ্য জাতীয় কর্মসূচি তৈরি করা।অতঃপরটাঙ্গাইল শাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসলে বাইরের প্রতিযোগিতা নয়; দেশের ভেতরের শ্রমবাজার। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিচয় ও ঐতিহ্যগত দাবির সুরক্ষার জন্য আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ চলতেই হবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ দেশের ভেতরে। প্রশ্নটি হলো টাঙ্গাইলের বয়নশিল্প কি আগামী প্রজন্মের কাছে একটি সম্মানজনক, লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী পেশা হয়ে উঠতে পারবে?বিশ্ব যখন ফাস্ট ফ্যাশনের অপচয় থেকে সরে ডিউরেবল, রিপেয়ারেবল, রিইউজেবল এবং সার্কুলার টেক্সটাইলের দিকে তাকাচ্ছে ও ঝুঁকছে, তখন টাঙ্গাইলের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। ‘ফিউচার ইজ হ্যান্ডমেড’ তাই শুধু আবেগের কথা নয়; এটি হতে পারে নতুন বাজারের ভাষা, যদি আমরা হ্যান্ডমেডের সঙ্গে ন্যায়সংগত আয়, ট্রেসেবিলিটি, মান, উদ্ভাবন আর সাসটেইনেবিলিটিকে এক সূত্রে গাঁথতে পারি। ইউএনইপি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান টেক্সটাইল পলিসিতেও দীর্ঘস্থায়িত্ব, রিইউজ, রিপেয়ার, সার্কুলারিটি এবং রেসপন্সিবল প্রডাকশনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।হেরিটেজ প্রোডাক্টের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর শিল্পীরাএকটি হেরিটেজ প্রোডাক্টের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ডিজাইন নয়, তার ব্র্যান্ড নয়, এমনকি তার জিআইও নয়; বরং তার সবচেয়ে বড় সম্পদ সেই মানুষ—যিনি জানেন কীভাবে সেটি তৈরি করতে হয়।একজন তরুণ যদি তাঁত ছেড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ধরেন, তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ, সে তার জীবনের জন্য একটি বাস্তব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু তখন রাষ্ট্রকে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—কেন তাঁতে বসে থাকার চেয়ে এই রিকশা চালানোই তার কাছে বেশি নিরাপদ ভবিষ্যৎ হয়ে উঠল?এ প্রশ্নের উত্তর না বদলালে কোনো হেরিটেজ পলিসিই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারুশিল্প বাঁচাতে হলে শুধু কারিগরকে টিকিয়ে রাখলে হবে না। কারিগর হওয়াকে আকর্ষণীয় করতে হবে।তাঁতে বসে যেন একজন তরুণ বলতে পারেন—এটি আমার বাবার পেশা নয়। এটি আমার পেশা। এটি আমার দক্ষতা। এটি আমার পরিচয়। এবং এটাই আমার ভবিষ্যৎ।তখনই জিআই অর্থবহ হবে, ইউনেসকোর স্বীকৃতি অর্থবহ হবে, আর টাঙ্গাইল শাড়ির ভবিষ্যৎও সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হবে। কারণ, হেরিটেজ কোনো সার্টিফিকেটে বেঁচে থাকে না; বেঁচে থাকে মানুষের হাতে।তথ্যসূত্র: ইউএনইপি, সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড সার্কুলারিটি ইন দ্য টেক্সটাইল ভ্যালু চেইন: আ গ্লোবাল রোডম্যাপ (২০২৩); ইউএনইপি টেক্সটাইল ইনিশিয়েটিভ, সাসটেইনেবল অ্যান্ড সার্কুলার টেক্সটাইলস (আপডেটেড ২০২৬); ইউরোপিয়ান কমিশন, সাসটেইনেবল অ্যান্ড সার্কুলার টেক্সটাইলস স্ট্র্যাটেজি (২০২২, কারেন্ট ইমপ্লিমেন্টেশন আপডেটস)।লেখক: কনসালট্যান্ট, হাল ফ্যাশন ও হেরিটেজ টেক্সটাইল গবেষকছবি: পটের বিবি ও লেখকের আর্কাইভ