জাতীয়

র‍্যাব থেকে এসআরবি, নাম পাল্টালে কাজ পাল্টাবে কি

News সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ 0
র‍্যাব থেকে এসআরবি, নাম পাল্টালে কাজ পাল্টাবে কি
র‍্যাব থেকে এসআরবি, নাম পাল্টালে কাজ পাল্টাবে কি

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গোপন বন্দিশালায় নির্যাতন এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ততার কারণে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) দীর্ঘদিন ধরেই গুরুতরভাবে বিতর্কিত। তাই স্বাভাবিকভাবেই র‍্যাব বিলুপ্তির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন, আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ-এ র‍্যাব ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করে বলেছে, তাদের প্রতিবেদনে বর্ণিত গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা—এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল র‍্যাব। 

উল্লেখ্য যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর, অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের বিষয়ে স্বাধীন তথ্যানুসন্ধান পরিচালনাকারী জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের প্রতিবেদনেও র‍্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়। 

এই প্রেক্ষাপটে, র‍্যাব বিলুপ্তিকরণ–সংক্রান্ত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬ গত ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়াটা আশাব্যঞ্জক হওয়ার কথা ছিল। দুঃখজনকভাবে, বাস্তবে তেমনটা হচ্ছে না। আইনটিতে র‍্যাব বিলুপ্তির বিধান থাকলেও কার্যত বাহিনীটির মৌলিক কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যাবলি অক্ষুণ্ন রেখে এর নাম বদলানো ছাড়া খুব বেশি পরিবর্তন করা হয়নি। র‍্যাবের স্থলাভিষিক্ত করতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে একটি নতুন এলিট বাহিনী গঠন করা হচ্ছে। 

আইনটির অধীনে র‍্যাবের ক্ষমতা, কার্যাবলি, বিদ্যমান সম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, বিধিমালা ও আদেশ, জনবল, তহবিল, ব্যাংক আমানত, সম্পদ, দায়, চুক্তি, রেজিস্ট্রার ও নথিপত্র—সবকিছুই এসআরবি গ্রহণ করছে। নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও আদালতের কার্যধারা বিষয়ে র‍্যাবের বিদ্যমান ২০০৫ সালের বিধিমালা এসআরবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এটি পুলিশ বাহিনীর একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর সদস্যদের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা, অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর মনোনীত সদস্য কিংবা সরকারি কর্মচারী থাকতে পারবেন। সরাসরি নিয়োগ বা প্রেষণে তাঁরা এতে যোগ দেবেন। 

গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অন্যান্য নিপীড়নের ভয়াবহ মানবিক মূল্য বিবেচনায় এসব লঙ্ঘন থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে এবং এই নিবন্ধে আলোচিত তিনটি আইনই যথাযথভাবে সংশোধন করা হবে—দেশের জনগণের এই আশা খুবই স্বাভাবিক।

এসআরবির নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও পোশাক থাকবে। অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক এর নেতৃত্ব দেবেন। ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত এবং তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দসহ আইন প্রয়োগের বিস্তৃত ক্ষমতা থাকবে বাহিনীটির। এর নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থাও থাকবে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আইনটিতে একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান করা হয়েছে। এই কমিটি সাধারণ মানুষের অভিযোগের পাশাপাশি এসআরবি সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগও নিষ্পত্তি করবে। 

ওপরে উল্লেখ করা জাতিসংঘের প্রতিবেদনে র‍্যাব ভেঙে দেওয়ার সুপারিশের পাশাপাশি আরও বলা হয়েছিল, খুব ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এবং সীমিত সময়ের জন্য, সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে, বেসামরিক আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অধীনে এবং তাঁদের দায়িত্ব ও বলপ্রয়োগের বিধি সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেই কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত করা উচিত। 

প্রতিবেদনে বিজিবি ও ডিজিএফআইয়ের কার্যাবলি যথাক্রমে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমের মধ্যেই কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশও করা হয়েছিল। এর পেছনে যুক্তিটি স্পষ্ট—র‍্যাব বা নতুন প্রস্তাবিত এসআরবির মতো বাহিনীতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের পদায়ন করে তাঁদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সম্পৃক্ত করা হলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। 

এসআরবি আইন এসব সুপারিশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আগেই বলা হয়েছে, র‍্যাবের মতো এসআরবিতেও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা থাকতে পারবেন। আর পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে নেওয়া একই ধরনের জনবলসহ এর আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও এখতিয়ারগত সব কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকায় নতুন নাম এবং সম্ভবত নতুন পোশাক ছাড়া এটি আসলে র‍্যাবের অনুরূপ একটি বাহিনী। 

র‍্যাব যে জবাবদিহিহীনতা ও দায়মুক্তির আইনগত পরিমণ্ডলে কাজ করেছে, এসআরবিও সেই একই পরিমণ্ডলে কাজ করবে—এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কোনো আইন বিচ্ছিন্নভাবে প্রযোজ্য হয় না বরং সামগ্রিক আইনগত কাঠামোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে। দুঃখজনকভাবে, যে মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি সৃষ্টি করেছিল, সেই একই কর্মকাণ্ড ও অপরাধ ঠেকাতে এই ব্যবস্থা আবারও অকার্যকর থেকে যেতে পারে। 

এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬। বিরোধী দলের ওয়াকআউট এবং মানবাধিকারকর্মী ও অতীতের নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের প্রতিবাদের মধ্যেই আইন দুটি সংসদে পাস হয়েছে। এর ফলে একদিকে সম্পূর্ণ ক্ষমতাহীন একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে গুম প্রতিরোধে একটি অপর্যাপ্ত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

নতুন আইন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হবে না। এর সদস্য নিয়োগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং নিরপেক্ষ ও যোগ্য মানবাধিকারকর্মীদের পরিবর্তে সরকার দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে পারবে। নিয়োগের পরও জনবল নিয়োগ, বাজেট নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্নভাবে সরকার এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসআরবিসহ নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে মানবাধিকার কমিশন সরাসরি ও স্বাধীন তদন্ত করতে পারবে না।

একইভাবে সদ্য পাস হওয়া গুমবিষয়ক আইনটি গুমের ঘটনা তদন্তে মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে, যে ক্ষমতা পূর্ববর্তী অধ্যাদেশে দেওয়া হয়েছিল এবং যে অধ্যাদেশ পরে রহিত করা হয়। এর পরিবর্তে বর্তমান আইনে বলা হয়েছে, একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত সংস্থাকে বাদ দিয়ে অন্য একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা অথবা আন্তসংস্থা তদন্ত দল অভিযোগটি তদন্ত করবে। 

এতে তিনটি বড় সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। প্রথমত, একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা অন্য একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত করলে সেই তদন্ত স্বাধীন হওয়ার সম্ভাবনা কম। দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রেই কোন সংস্থা গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল তা শুরুতেই নির্ধারণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। ফলে তদন্তের জন্য অন্য কোনো সংস্থা চিহ্নিত করাও সম্ভব হবে না। তৃতীয়ত, আইনে যেহেতু একটি সংস্থাকে অন্যটির বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাই বিব্রত হওয়ার আশঙ্কায় প্রতিটি সংস্থাই দাবি করতে পারে যে তদন্তটি পরিচালনার জন্য তারা উপযুক্ত নয়। এতে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে এবং মূল্যবান সময় নষ্ট হতে পারে। 

স্পষ্টতই, এসআরবি যে আইনি এবং পারিপার্শ্বিক কাঠামোর অধীনে কাজ করবে, তা র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি সৃষ্টিকারী গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকানোর ক্ষেত্রে অনুপযুক্তই রয়ে যাচ্ছে। সরকার আমাদের বলছে, তাদের সদিচ্ছা আছে, তাই আইন নিয়ে মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু শুধু সদিচ্ছাই যদি যথেষ্ট হতো, তাহলে কোনো দেশই মানবাধিকার সুরক্ষাকে কেন্দ্রে রেখে তার আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলত না, কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে জবাবদিহির প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করত না। 

গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অন্যান্য নিপীড়নের ভয়াবহ মানবিক মূল্য বিবেচনায় এসব লঙ্ঘন থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে এবং এই নিবন্ধে আলোচিত তিনটি আইনই যথাযথভাবে সংশোধন করা হবে—দেশের জনগণের এই আশা খুবই স্বাভাবিক।

ড. শরীফ ভূঁইয়া কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিজিটিং ফেলো ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনেরও সদস্য ছিলেন

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন

জাতীয়

View more
বিয়েতে নাচতে ডেকে দুই শিল্পীকে ধর্ষণ, সংস্কৃতি চর্চায় মন্দ হাওয়া
বিয়েতে নাচতে ডেকে দুই শিল্পীকে ধর্ষণ, সংস্কৃতি চর্চায় মন্দ হাওয়া

বিনোদনজগতের আলো ঝলমলে মঞ্চে দর্শকের চোখে থাকে শিল্পীর পরিবেশনা, পোশাক, নাচের ছন্দ আর হাততালির শব্দ। কিন্তু সেই মঞ্চের আড়ালে শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তা, যাতায়াত ও কাজের পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত- সেই প্রশ্নটি খুব কমই সামনে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সম্প্রতি বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশনের কথা বলে দুই নারী নৃত্যশিল্পীকে ডেকে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের বিষয়টি সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। অতি সম্প্রতি সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে প্রান্তিক শিল্পীদের নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমার প্রদর্শনী, কনসার্ট স্থগিতের বিষয়গুলো সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য উদ্বেগের। এরমধ্যেই এবার এলো জেলাটির সরাইলে দুই নৃত্যশিল্পীর ধর্ষণের খবর। জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশন করতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দুই নারী নৃত্যশিল্পী। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে এক যুবককে গ্রেফতারও করেছে সরাইল থানা পুলিশ। বিষয়টি সংস্কৃতিকর্মীদের মনে অস্বস্তি ও তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে এর প্রভাবটাও নেতিবাচক হবে বলে মনে করছেন অনেকে। শোবিজে অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী কিংবা নৃত্যশিল্পীদের কাজের ধরন অনেকটাই চুক্তিনির্ভর। বিশেষ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিয়ে, করপোরেট আয়োজন কিংবা ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে পারফর্ম করা শিল্পীদের অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেই কাজের প্রস্তাব আসে। পরিচিতি, পারিশ্রমিক ও অনুষ্ঠানের স্থান এসব তথ্যের ভিত্তিতে শিল্পীরা কাজ গ্রহণ করেন। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই, যখন কাজের প্রস্তাব দেওয়া ব্যক্তি বা আয়োজকের পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না। কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে আয়োজকের পরিচয়, অনুষ্ঠানের প্রকৃতি, সঠিক ভেন্যু এবং সেখানে কারা উপস্থিত থাকবেন- এসব বিষয় নিশ্চিত না করলে একজন শিল্পী অজান্তেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে পারেন। সোশ্যাল মিডিয়া কাজের প্লাটফর্ম হলেও যাচাই বাছাই জরুরিসরাইলের ঘটনাটিতে পুলিশের ভাষ্য ও মামলার এজাহার অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে যোগাযোগের পর বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচ পরিবেশনের জন্য দুই নৃত্যশিল্পীকে ডাকা হয়েছিল। নির্ধারিত পারিশ্রমিকের কথা বলে তাদের নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাদের গন্তব্য পরিবর্তন করে নৌকায় তোলা এবং সেখানে তাদের ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু অপরাধের ভয়াবহতা নয়; বরং একজন শিল্পী কীভাবে একটি পেশাগত কাজের সূত্র ধরে এমন একটি অনিরাপদ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলেন, সেটিও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এই ঘটনাটি এটা বলছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজের প্রস্তাব পেলেই সেগুলো যাচাই বাছাই না করে গ্রহণ করা উচিত নয়। বর্তমানে শোবিজের অনেক শিল্পীর জন্য ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কাজ পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নতুন শিল্পীদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি কার্যকর। কোনো এজেন্সি বা পরিচিত প্রযোজকের মাধ্যমে নয়, সরাসরি ফোন নম্বর সংগ্রহ করে কাজের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। এই ব্যবস্থার সুবিধা যেমন আছে, তেমনি ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ অনলাইনে একজন ব্যক্তি নিজের পরিচয় বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে তথ্য দেন, তা সবসময় সত্য নাও হতে পারে। তাই শিল্পীর নিরাপত্তার জন্য একটি ভেরিফিকেশন সংস্কৃতি তৈরি হওয়া জরুরি। কাজের প্রস্তাব এলেই শুধু পারিশ্রমিক ও অনুষ্ঠানস্থল নিয়ে আলোচনা না করে আয়োজকের পরিচয়, ঠিকানা, যোগাযোগের তথ্য এবং অনুষ্ঠানের বিস্তারিত যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অপরিচিত কোনো আয়োজকের সঙ্গে কাজ হলে একা না গিয়ে সহকারী, ম্যানেজার কিংবা বিশ্বস্ত কাউকে সঙ্গে রাখা এবং যাতায়াতের বিষয়টি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। নৃত্যশিল্পীরা কি শোবিজের তুলনামূলক অরক্ষিত কর্মী?বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে নৃত্যশিল্পীদের অবদান দীর্ঘদিনের। টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সিনেমা, মিউজিক ভিডিও, স্টেজ শো ও ব্যক্তিগত আয়োজন- বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তারা কাজ করছেন। তবে সব নৃত্যশিল্পী সমান সাংগঠনিক সুরক্ষা পান না। অনেকেই ফ্রিল্যান্স বা প্রজেক্টভিত্তিক কাজ করেন। ফলে কাজের সময় নিরাপত্তা, যাতায়াত, পারিশ্রমিক, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা অভিযোগ জানানোর নির্দিষ্ট কাঠামো সবকিছু সবসময় পরিষ্কার থাকে না। এ কারণেই এই শ্রেণির শিল্পীদের নিয়ে পেশাগত সংগঠন, ইভেন্ট আয়োজক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। একজন শিল্পী মঞ্চে পারফর্ম করতে যাচ্ছেন মানেই তিনি আয়োজকের কাছে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় থাকবেন- এমন মানসিকতা বদলাতে হবে। শিল্পীর পারফরম্যান্স যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার নিরাপত্তাও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। ‘অনুষ্ঠানে নাচ’ মানেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু শিল্পীর নয়প্রায়ই কোনো নারী শিল্পী ঝুঁকির মুখে পড়লে তার পোশাক, পেশা, কোথায় গিয়েছিলেন কিংবা কার সঙ্গে গিয়েছিলেন- এসব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অথচ কোনো পেশার কারণে কেউ সহিংসতার শিকার হওয়ার দায় তার ওপর বর্তায় না। এই ঘটনাটিও সেই জায়গা থেকে দেখা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, তবে অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে দায় সম্পূর্ণভাবে অপরাধীর। একজন নৃত্যশিল্পী কোনো অনুষ্ঠানে নাচতে গেছেন মানে এটি তার পেশাগত কাজ। সেই পেশাগত সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে তার প্রতি কোনো ধরনের সহিংসতা বা যৌন নিপীড়ন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংস্কৃতিকর্মীদের দরকার নিরাপদ কাজের পরিবেশএই ঘটনা বিনোদন অঙ্গনের জন্য একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায় শিল্পীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরিতে আমরা কতটা প্রস্তুত? প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, নৃত্যদল ও শিল্পী সংগঠনগুলো চাইলে কিছু মৌলিক নিয়ম চালু করতে পারে। যেমন- কাজের লিখিত চুক্তি, আয়োজকের পরিচয় যাচাই, নির্দিষ্ট ভেন্যু নিশ্চিত করা, যাতায়াতের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির তথ্য রাখা। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজের প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রেও শিল্পীদের জন্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। নতুন শিল্পীরা যেন শুধু কাজ পাওয়ার আশায় যেকোনো প্রস্তাবে রাজি না হন, সে বিষয়ে পেশাগত গাইডলাইন থাকা দরকার। বিনোদনের আড়ালে যে বাস্তবতাদর্শক যখন কোনো অনুষ্ঠানে একজন নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনা দেখেন, তখন সাধারণত তার পেছনের গল্পটি জানেন না। একজন শিল্পী কত দূর থেকে এসেছেন, কীভাবে অনুষ্ঠানে পৌঁছেছেন, কে তাকে নিয়ে এসেছে কিংবা অনুষ্ঠান শেষে কীভাবে ফিরবেন- এসব প্রশ্ন দর্শকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু শিল্পীর নিরাপত্তার জন্য এগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। সরাইলের ঘটনাটি তাই শুধু একটি অপরাধের অভিযোগ নয়; এটি বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের অনানুষ্ঠানিক ও চুক্তিভিত্তিক কাজের পরিবেশ নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নারী নৃত্যশিল্পীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সম্মান ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করা এখন আর উপেক্ষা করার বিষয় নয়।   এলআইএ

News সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ 0
পণ্যের আলোচনা করলেই বিজ্ঞাপন আসছে! ফোনের আড়ি পাতা বন্ধ করুন

পণ্যের আলোচনা করলেই বিজ্ঞাপন আসছে! ফোনের আড়ি পাতা বন্ধ করুন

জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রের  বৈধতা নেই: হাইকোর্ট

জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রের  বৈধতা নেই: হাইকোর্ট

বাড্ডায় চাঁদা না দেওয়ায় বাসায় ঢুকে যুবককে গুলি

বাড্ডায় চাঁদা না দেওয়ায় বাসায় ঢুকে যুবককে গুলি

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বৈধতা নিয়ে রিট খারিজ
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের বৈধতা নিয়ে রিট খারিজ

আওয়ামী লীগসহ সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট উত্থাপিত হয়নি মর্মে (নট প্রেস রিজেক্ট) খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত বিষয়ে দায়ের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা মো. আল আমিন এ রিট দায়ের করেন। রিটের পক্ষে আইনজীবী হলেন অ্যাডভোকেট ইউনূস আলী। রিট আবেদনে ২০২৫ সালের ১২ মের প্রজ্ঞাপন জারি কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, এ বিষয়ে রুল চাওয়া হয়। রুল হলে তা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ১২ মের প্রজ্ঞাপনটির কার্যক্রম স্থগিত চাওয়া হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে গত বছরের ১২ মে ওই প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যেকোনো ধরনের প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। এফএইচ/জেএইচ

News সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ 0
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে নতুন করে হামলা, তেল সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে নতুন করে হামলা, তেল সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে

পদ্মায় নিখোঁজের ৩৮ ঘণ্টা পর ভেসে উঠলো ছাত্রদল নেতার মরদেহ

পদ্মায় নিখোঁজের ৩৮ ঘণ্টা পর ভেসে উঠলো ছাত্রদল নেতার মরদেহ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট ইস্যুতে সমঝোতা, মানতে হবে যে শর্ত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট ইস্যুতে সমঝোতা, মানতে হবে যে শর্ত

0 Comments