(পূর্ব প্রকাশের পর- পর্ব ১৫)
ষাটের দশকে ডাকসু, বিভিন্ন হল, বিভাগীয় সংসদ অথবা শ্রেণি-প্রতিনিধি বাছাই করার নিমিত্তে নির্বাচন হতো। এই পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল, যা আজকাল বিলুপ্তই বলা চলে। তা হচ্ছে, সংসদের বিভিন্ন পদে, বিশেষত ভিপি-জিএস পদে, কোন ছাত্র সংগঠন কত বেশি মেধাবীকে মনোনয়ন দিতে পারে, তার একটি প্রচ্ছন্ন প্রতিযোগিতা। এবং মেধার বিচার শুধু লেখাপড়ার মাপে নয়—বাগ্মিতা, আচার-আচরণ, আদর্শ ইত্যাদি সব মিলে। এতে করে ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের ছাত্ররাজনীতিতে জায়গা পাওয়ার অপার সম্ভাবনা থাকত এবং ইতিহাস বলে, সেই সময়টায় ছাত্ররাজনীতির মুকুট ছিল মেধাবীদের মাথায়। গ্রেশামসের বিখ্যাত সূত্র উল্টিয়ে বললে অবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল এমন যে, ভালো ছাত্র খারাপ ছাত্রকে রাজনীতির নেতৃত্ব থেকে বের করে দিত। এই ‘ট্যালেন্ট হান্ট’-এর দৌড়ে এমনকি তৎকালীন সরকার-সমর্থিত ছাত্র সংগঠন এনএসএফও বাদ ছিল না।
বস্তুত, আমাদের জানাশোনার মধ্যে অনেক মেধাবীকে এনএসএফ করতে দেখেছি। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, আইয়ুব স্বৈরশাসকের সেই জমানায়ও সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বেশ কটি হলের নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো।
মনে পড়ে, মুহসিন হলে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের ছাত্র খন্দকার মোশাররফ হোসেন (পরবর্তীতে বিএনপির মন্ত্রী ও নেতা)। তিনি এনএসএফের প্রার্থী মোমতাজ উদ্দিনকে পরাজিত করেন (পরবর্তীতে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ)। রোকেয়া হলের ভিপি ছিলেন আয়েশা খানম এবং ইকবাল হলের তোফায়েল আহমেদ। অবিসংবাদিত নেতা তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ডাকসুর সহ-সভাপতি। সেই হিসেবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক এবং ঊনসত্তরের গণজাগরণের অন্যতম প্রধান নায়ক। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের জেরে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সবাইকে জেল থেকে মুক্তি দিতে সরকার বাধ্য হয়। সেই সময় তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত জনসভায় তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি অর্পণ করেন।
তখনকার দিনে ইকবাল হল ছিল ছাত্রলীগ নামে সংগঠনটির দুর্জয় ঘাঁটি। শুনতাম সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, আ স ম আবদুর রব, নূর এ আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজ ইত্যাদি নেতার সংগ্রামী আলেখ্য; এস এম হল মূলত বামপন্থীদের এবং অন্যান্য হলে এনএসএফ কিংবা মিশ্র।
অবশ্য, সময়ের আবর্তনে এবং বাস্তবতার নিরিখে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ন্যায্য দাবির প্রতি বেশ কিছু এনএসএফ সমর্থক একাত্মতা প্রকাশ করেছিল। সম্ভবত ১৯৬৮ সালে এনএসএফ বিভক্ত হয়। একদিকে মাহবুবুল হক দোলন, অন্যদিকে জমির আলী। মাহবুবুল হক দোলনের পথ ধরে জিন্নাহ হলের নাজিম কামরান চৌধুরী, বদিউল আলম, লুতফর রহমান চৌধুরী এবং অনেকেই এনএসএফের তাবু ত্যাগ করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
যাই হোক, এমএ ক্লাসে উঠে শ খানেক ছাত্রছাত্রীর সরাসরি ভোটে আমি শ্রেণি প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলাম। এর ফলে নানা প্রয়োজনে বিভাগের তৎকালীন সভাপতি এম এন হুদা এবং অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক শানিত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে হলে উঠলাম। দীর্ঘ নয় মাস বিচ্ছেদের পর বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও আলিঙ্গনের মাধ্যমে। প্রাপ্তি এবং হারানো—উভয় কারণেই অশ্রুসিক্ত উভয় পক্ষ। সবার কামনায় তখন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্যবাদী এক বাংলাদেশ। এরই মধ্যে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী)-এর এক নেতার রুমে গেলাম সৌজন্য সাক্ষাতে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে হলে উঠলাম। দীর্ঘ নয় মাস বিচ্ছেদের পর বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও আলিঙ্গনের মাধ্যমে। প্রাপ্তি এবং হারানো—উভয় কারণেই অশ্রুসিক্ত উভয় পক্ষ। সবার কামনায় তখন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং সাম্যবাদী এক বাংলাদেশ।
দেখি, পড়ার টেবিলে বিএলএফ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের জন্য এক গাদা সনদপত্র রাখা আছে। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘নেবে নাকি একটা, নাও না।’ আমি বললাম, ‘না, আমার আগ্রহ নেই, কারণ মুক্তিযুদ্ধে আমি সরাসরি অংশগ্রহণ করিনি।’ পরে জেনেছি, তাঁর কাছ থেকে সনদপত্র নিয়েছে অনেকে, যারা বহাল তবিয়তে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের ভেতরেই ছিল।
একটা নজিরবিহীন ঘটনার উল্লেখ করতেই হয়। আমি প্রায়ই প্রতিবেশী হল জিন্নাহ হলে যেতাম আমার অত্যন্ত প্রিয় এক ঝাঁক ‘বড় ভাই’-এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। মাঝেমধ্যে আলাপচারিতায় উঠে আসত বদিউল আলম নামে অর্থনীতি বিভাগের আমাদের এক বছরের সিনিয়র ছাত্রের প্রসঙ্গ। উনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে স্ট্যান্ড করা, এনএসএফের ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয় ফ্রন্টেই ‘লড়াকু’ কর্মী ছিলেন।
১৯৭২ সালে হলে ফিরে এসে অনেকের মধ্যে তাঁর খবরও নিলাম। শোনা যায়, সেই বদির জীবন পাল্টে দিয়েছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং বিশেষত ২৫ মার্চের ভয়াল রাত্রি। সব পরিত্যাগ করে তিনি মুক্তিবাহিনীর ‘ক্র্যাক প্লাটুনে’ যোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেন। নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় কয়েকটি অবিস্মরণীয় অপারেশন চালানোর পর একদিন অস্ত্র হাতে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। অস্ত্রের উৎস বের করতে তাঁর ওপর প্রবল নির্যাতন চালালে বদি মৃত্যুবরণ করেছিলেন বটে, কিন্তু মুখ থেকে একটা কথাও বের করেননি।
সেই থেকে তিনি ‘শহীদ বদি’—হাইকোর্ট-সংলগ্ন একটি রাস্তা যার নামে রাখা—মরণোত্তর বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত।
মুহসিন হল থেকে বেশ কয়েকজন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, যার মধ্যে এম সাঈদ (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) এবং আবদুর রউফ (পরবর্তীতে কর্নেল) অন্যতম।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ১৯৭২ সালটি ছিল নানান দিক থেকে ঘটনাবহুল, তাৎপর্যপূর্ণ, আলোচনা ও সমালোচনামুখর। পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লন্ডন থেকে নয়াদিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পৌঁছান। লাখ লাখ সাধারণ মানুষ তাঁকে অশ্রুসিক্ত ও আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেয়। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে তিনি এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন ভাষণ দেন।
এই বছরেই শেষের দিকে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ধারণ করে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্য প্রথম সংবিধান রচিত হয়। ১৯৭২ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয়করণ কর্মসূচির আওতায় ব্যাংক, বিমা এবং শিল্প ইউনিটসহ প্রায় ৯০ ভাগ সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়।
এর প্রথম কারণ হিসেবে বলা হতো তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য এবং দ্বিতীয় কারণ, এগুলো চালানোর মতো শক্তিশালী ব্যক্তি খাত, বিশেষত পাকিস্তানি উদ্যোক্তাদের প্রস্থানের পর, তখনকার বাংলাদেশে ছিল না। তবে এ সমস্ত ইউনিট পরিচালনায় যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ ছিল দলীয় রাজনৈতিক কর্মী এবং অচিরেই এদের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ উঠতে থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না, অদক্ষতা এবং দুর্নীতির কারণে শিল্পকারখানাগুলো অচিরেই রুগ্ণ হওয়ার পথ ধরে।
১৯৭২ সালে গঠিত হয় জাতীয় রক্ষীবাহিনী। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অস্ত্র উদ্ধার, চোরাচালান রোধ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রতিনিধিরা—এমনকি আমার নিজ এলাকা মতলব উত্তরেও—গণসংযোগ করতেন সশস্ত্র রক্ষীবাহিনীর সদস্য সঙ্গে নিয়ে।
অভিযোগ ছিল যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য রক্ষীবাহিনীকে ব্যবহার করা হতো। সেই সময়কার সরকারবিরোধী পক্ষ মনে করত, তাদের অনেক রাজনৈতিক কর্মী রক্ষীবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত বা গুম হয়েছিল এবং সারা দেশে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে।
অপরদিকে, ১৯৭২ সালে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সশস্ত্র গণবাহিনী এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্ম নেওয়া সিরাজ শিকদারের ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’র সশস্ত্র সদস্যদের হাতেও অনেক মানুষ, বিশেষত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, নিগৃহীত বা নিহত হওয়ার খবর চাউর ছিল। সরকারি পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ উঠল যে, বস্তুত এই দুই দলের লক্ষ্য ছিল অস্ত্রশক্তির মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। একদিকে সরকারি রক্ষীবাহিনী এবং অন্যদিকে বেসরকারি গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সাঁড়াশি আক্রমণে সাধারণ জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে অবকাঠামোগত পুনর্গঠন, খাদ্য ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অস্ত্রের ঝনঝনানি দেশটির স্থিতিশীলতার পক্ষে অন্তরায় হয়ে উঠেছিল।
(চলবে)
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীনরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/জেআইএম
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বেত গাছ ও বেতশিল্প। একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশে অবহেলায় জন্ম নিত বেতগাছ। সেই বেত দিয়ে তৈরি হতো নানা ধরনের প্রয়োজনীয় ও শৌখিন জিনিসপত্র। কালের বিবর্তনে মাদারীপুরে এখন আর সহজে বেত গাছের দেখা মেলে না। পাশাপাশি প্লাস্টিকের পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় একসময় গুরুত্ব পাওয়া বেতের তৈরি জিনিসপত্রও হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন পরিস্থিতিতেও মাদারীপুরের আওয়াল জমাদ্দার ও কারিগর বেল্লাল বেপারি ধরে রেখেছেন বেতশিল্পের ঐতিহ্য। বেল্লালের হাতে তৈরি বেতের নানা পণ্য আজও মাদারীপুরবাসীর পছন্দের তালিকায় রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের খোয়াজপুর এলাকার হেলাল উদ্দিন জমাদ্দারের ছেলে আওয়াল জমাদ্দার। তিনি মাদারীপুর শহরের এমএম হাফিজ মেমোরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরির সামনে ১৬ বছর ধরে বেতের তৈরি নানা জিনিসপত্র বিক্রি করে আসছেন। শিবচর উপজেলার মিরারকান্দি গ্রামের তৈয়ব আলী বেপারির ছেলে বেল্লাল বেপারি সেখানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিদিন তার হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের বেতের পণ্য। শৌখিন মানুষজন এখান থেকেই ঐতিহ্যবাহী বেতের তৈরি নানা জিনিসপত্র কিনে নেন। ‘সুইট হোম’ নামের প্রতিষ্ঠানটিই মাদারীপুরে বেতের জিনিস তৈরি ও বিক্রির একমাত্র মাধ্যম বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ কারণে জেলার মানুষ বেতের তৈরি পণ্য কিনতে এখানে ছুটে আসেন। একসময় প্রতি মাসে তিন থেকে চার লাখ টাকার নানা জিনিসপত্র বিক্রি হলেও বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। অল্প দামে চাহিদামতো প্লাস্টিকের জিনিসপত্র পাওয়া যাওয়ায় দিন দিন বেতশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে। বেতের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র/ছবি: জাগো নিউজ এখানে বেতের তৈরি নানা ধরনের জিনিসপত্র তৈরি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সোফাসেট, বেড সেট, ডিভান, বিভিন্ন ধরনের র্যাক, ট্রলি, টেবিল, চেয়ার, ফোল্ডিং চেয়ার, কর্নার, ইজি চেয়ার, ডাইনিং চেয়ার, বেবি কট, ম্যাগাজিন র্যাক, বিভিন্ন ধরনের দোলনা, বিভিন্ন ডিজাইনের শোপিস, চায়ের ট্রে ও ফলের ঝুড়ি। এ ছাড়া ক্রেতারা নিজেদের পছন্দের ডিজাইনের ছবি দেখিয়েও নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে নেন। বেতের কারিগর বেল্লাল বেপারী বলেন, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি থেকে বেশি টাকা দিয়ে বেত কিনে আনতে হয়। পরে তা দিয়ে চাহিদামতো পণ্য তৈরি করা হয়। কিন্তু প্লাস্টিকের দাম কম হওয়ায় দিনে দিনে বেতের পণ্যের চাহিদা কমে যাচ্ছে। আগে কম দামে বেত কিনে আনতে পারলেও এখন কয়েক গুণ দাম বেড়েছে। তাই পণ্যের দামও বেশি রাখতে হচ্ছে। দাম অনুযায়ী পণ্য বিক্রি করতে না পারায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘মালিকও প্রবাসে চলে গেছেন। তাই পুরো ব্যবসা আমাকে দেখতে হচ্ছে। মাদারীপুরে আমরাই একমাত্র এই বেতশিল্পকে ধরে রেখেছি। এটি হারিয়ে গেলে মাদারীপুর থেকে বেতশিল্পও হারিয়ে যাবে। তবে মাদারীপুরের একশ্রেণির শৌখিন মানুষ আছেন, যারা আমাদের নিয়মিত কাস্টমার। তারা আমাদের নিজস্ব শৈল্পিক কারুকাজ ও দৃষ্টিনন্দন নিপুণ হাতে তৈরি বেতের আসবাবপত্র ও ফার্নিচার বেশ পছন্দ করেন।’ বেতের পণ্য কিনতে আসা মাদারীপুর পুরানবাজারের মোসলেম হোসেন বলেন, ‘আমার কাছে বেতের জিনিসপত্র খুব ভালো লাগে। তাই কিনতে এসেছি। তবে দাম একটু বেশি। তবুও শখের জন্য একটি সোফাসেট কিনব। মাদারীপুরের একমাত্র দোকান এটি। এই বেতশিল্পের ঐতিহ্যও অনেক।’ আরেক ক্রেতা মুন্নি আক্তার বলেন, ‘আমার বাসায় সব ফার্নিচারই বেতের। বেতের ফার্নিচারের মধ্যে একটা ঐতিহ্য আছে। একটা আভিজাত্যের ভাবও আছে। তাই ঘরের কোনো ফার্নিচার দরকার হলে মাদারীপুরের একমাত্র বেতের দোকান সুইট হোম থেকেই কিনে থাকি।’ মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, ‘একসময় মাদারীপুরের আনাচে-কানাচে জন্ম নিত বেতগাছ। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশেই দেখা যেত বেতগাছ। কিন্তু আজ সেই বেতগাছ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তাই দিনে দিনে মাদারীপুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বেতশিল্প।’ তিনি আরও বলেন, ‘একসময় বেতের তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা ছিল ব্যাপক। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো বেতের তৈরি নানা পণ্য। সেই শিল্পের ঐতিহ্য এখন হারাতে বসেছে। প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টিলের মতো সস্তা পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে বেতশিল্পের চাহিদা কমে গেছে। এ ছাড়া কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা এবং পণ্যের উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় অনেক কারিগর তাদের পূর্বপুরুষদের এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এ কারণে ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্পও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’ মাদারীপুরের উন্নয়ন সংস্থা দেশগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা এবিএম বজলুর রহমান খান বলেন, এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/এসজেডএইচ/জেআইএম
ইতালির ভেনিসে অনুষ্ঠিত হলো ‘সন অব এ পিচ অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’। সেখানে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘হাওয়াই মিঠাই’-এর জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতেছেন বাংলাদেশের নির্মাতা রাকায়েত রাব্বি। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ভেনিসের ঐতিহাসিক হোটেল এক্সেলসিয়রের ক্যামপারি লাউঞ্জে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বসিত রাকায়েত রাব্বিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত ‘হাওয়াই মিঠাই’ চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে এক শিশুর মনস্তত্ত্ব এবং যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা। বুলেটের খোসার বিনিময়ে হাওয়াই মিঠাই কেনার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটির মানবিক ও সংবেদনশীল গল্প। ব্যতিক্রমী এই উপস্থাপনই বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে রাকায়েত রাব্বি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের হয়ে পুরস্কার পাওয়া তার জীবনের অন্যতম সেরা অনুভূতি। রাকায়েত জানান, ‘হাওয়াই মিঠাই’ তার নির্মিত দ্বিতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর আগে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বায়োস্কোপের জন্য আলফা আইয়ের ব্যানারে ‘জহরে কহরে’ নির্মাণ করেন তিনি। এরপর ‘হাওয়াই মিঠাই’ নির্মাণের পাশাপাশি চরকির জন্য ‘গ্যাড়াকল’ ও ‘টিফিন বক্স’ ফ্ল্যাশফিল্ম নির্মাণ করেন। এর আগে রাকায়েতের নির্মিত চলচ্চিত্র বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হলেও ভেনিসের এই পুরস্কারই তার প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ‘হাওয়াই মিঠাই’ চলচ্চিত্রের বার্তা প্রসঙ্গে নির্মাতা বলেন, পৃথিবীর সব যুদ্ধ বন্ধ হোক। সব শিশু যেন মায়ের বুকে ফিরে যেতে পারে এবং পরিবারের সঙ্গে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। কোনো শিশুকে যেন যুদ্ধের নির্মমতার মধ্যে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো সামান্য কিছুর লোভ দেখানো না হয়- এমনই একটি মানবিক বার্তা তুলে ধরা হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে। এলআইএ
বিকেলের ম্লান আলো তখন বুড়িগঙ্গার বুকে এসে পড়েছে। পুরান ঢাকার সরু গলির জ্যাম ঠেলে শ্যামবাজারের ফরাশগঞ্জে ঢুকতেই নাকে এসে লাগে আদা, রসুন আর শুকনা মরিচের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ। জীর্ণ ইটের দেয়াল, চুনকাম খসে পড়া কার্নিশ আর মাথার ওপর তারের জটলা পেরিয়ে একটু এগোতেই থমকে দাঁড়াতে হয়। মসলার বস্তা আর কুলিদের হাঁকডাকের আড়ালে যেন এক ম্রিয়মাণ সম্রাট দাঁড়িয়ে আছেন। এটাই রূপলাল হাউস। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, এই জরাজীর্ণ দেয়ালগুলো আসলে একেকটা জীবন্ত ইতিহাস।উনিশ শতকের ঢাকার অন্যতম জমকালো প্রাসাদ ছিল রূপলাল হাউস। আর্মেনীয় জমিদার আরাতুন ১৮২৫ সালের দিকে ঢাকার ফরাশগঞ্জের শ্যামপুরে একটি দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করে নাম দিয়েছিলেন ‘আরাতুন হাউস’। এর ১০ বছর পর ১৮৩৫ সালের দিকে তিনি বাড়িটি বিক্রি করে দেন ঢাকার বিখ্যাত ব্যবসায়ী রূপলাল দাসের কাছে। ভবনটি কিনে পুনর্নির্মাণ করেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী রূপলাল দাস ও তাঁর ভাই রঘুনাথ দাস। শৌখিন রূপলাল কলকাতার বিখ্যাত ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি মার্টিন অ্যান্ড কোং-কে দিয়ে বাড়িটি পুনর্নির্মাণ করান। বাড়িটির নতুন নাম দেন ‘রূপলাল হাউস’।গ্রিক ডোরিক স্থাপত্যশৈলীর এই ভবনের মূল আকর্ষণ ছিল এর বিশাল হলরুম এবং বুড়িগঙ্গা অভিমুখী কাঠের মেঝেযুক্ত জমকালো নাচঘর। এটি প্রায় ৯১ দশমিক ৪৪ মিটার দীর্ঘ একটি দ্বিতল ভবন। পুরো প্রাসাদটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০টির বেশি কক্ষ রয়েছে। ভবনটির ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল ‘কোরিনথীয়’ রীতিতে। নদীর দিকে সম্মুখভাগে ভবনের চূড়াতে একটি বড় ঘড়ি ছিল, যা বুড়িগঙ্গা নদীতে চলাচলকারী সব নৌযান থেকে স্পষ্ট দেখা যেত। এর সাহায্যে সময় জানা যেত। কিন্তু ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ভূমিকম্পে ঘড়িটি ভেঙে পড়ার পড়ে আর ঠিক করা হয়নি।১৮৮৮ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন ঢাকা সফরে এসেছিলেন। সে সময় তাঁর সম্মানে একটি নাচের আসর আয়োজন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। নাচ ও আপ্যায়নের স্থান নির্বাচনের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয় আহসান মঞ্জিল ও রূপলাল হাউসের মধ্যে। ভোটের মাধ্যমে রূপলাল হাউস নির্বাচিত হয়। ডাফরিনের নাচের জন্য ইংরেজরা রূপলাল হাউস দুই দিনের জন্য ২০০ টাকায় ভাড়া নিয়েছিল। তবে লর্ড ডাফরিনকে অভ্যর্থনা জানাতে ভবনটি সাজাতেই তৎকালীন মালিকদের খরচ হয়েছিল প্রায় ৪৫ হাজার টাকা! এ ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, সে সময় রূপলাল পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এবং সামাজিক মর্যাদা কতটা ছিল।শুধু নাচের আসর নয়, একসময় এই প্রাসাদে নিয়মিত উচ্চাঙ্গসংগীতের আসর বসত। যেখানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং ওস্তাদ ওয়ালীউল্লাহ খাঁর মতো বিখ্যাত সংগীতজ্ঞরা পারফর্ম করেছেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই ভবনে বেশ কয়েকবার এসেছিলেন।সময়ের বিবর্তনে ১৯৪৭ সালের পর রূপলাল দাসের পরিবার দেশত্যাগ করলে ভবনটি তার জৌলুশ হারায়। একসময় যে ভবনে অভিজাতদের নাচ-গান ও সাংস্কৃতিক আসর বসত, সেখানে সময়ের সঙ্গে জমতে থাকে অবহেলা ও নিস্তব্ধতা।১৯৫৮ সালে মোহাম্মদ সিদ্দিক জামাল বাড়িটি কিনে এর নাম দেন ‘জামাল হাউস’। ভবনের আরেকটি অংশে পাওয়া যায় ‘নূরজাহান হাউস’ নামটি। যদিও ‘রূপলাল হাউস’ নামেই এখনো এর খ্যাতি।অপমানের জবাব দিতে নির্মাণ করা হয় যে প্রাসাদএকসময় বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে যে প্রাসাদ ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্র ছিল, আজ সেটিই টিকে থাকার লড়াই করছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় থাকা সত্ত্বেও ভবনটির বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক।স্থানীয় মসলা ও সবজি ব্যবসায়ীদের গুদামঘর হিসেবে ভবনের বিভিন্ন অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। কোথাও জমেছে পণ্যের স্তূপ, কোথাও দেখা যায় দখলের চিহ্ন। চারপাশের বাজারের কোলাহল, মসলার গন্ধ, শ্রমিকদের ব্যস্ততা আর ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে চাপা পড়ে গেছে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক পরিচয়।তবু ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষয়ে যাওয়া দেয়াল, পুরোনো কার্নিশ আর বিবর্ণ স্থাপত্য যেন নীরবে বলে যাচ্ছে তার অতীতের গল্প। যে ভবনে একসময় আলোঝলমলে নাচের আসর বসত, সেখানে আজ মসলার বস্তা আর বাজারের কোলাহল।রূপলাল হাউস ঢাকার হারিয়ে যেতে বসা নগর-ঐতিহ্যের প্রতীক। এর দেয়ালে জমে থাকা সময়ের দাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষিত তালিকায় নাম লিখে রাখার বিষয় নয়, তাকে বাঁচিয়ে রাখারও প্রয়োজন আছে। নইলে একদিন হয়তো রূপলাল হাউস থাকবে শুধু ইতিহাসের পাতায়, আর তার অস্তিত্ব খুঁজতে হবে পুরোনো কোনো ছবিতে।শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়