দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বেত গাছ ও বেতশিল্প। একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশে অবহেলায় জন্ম নিত বেতগাছ। সেই বেত দিয়ে তৈরি হতো নানা ধরনের প্রয়োজনীয় ও শৌখিন জিনিসপত্র। কালের বিবর্তনে মাদারীপুরে এখন আর সহজে বেত গাছের দেখা মেলে না। পাশাপাশি প্লাস্টিকের পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় একসময় গুরুত্ব পাওয়া বেতের তৈরি জিনিসপত্রও হারিয়ে যেতে বসেছে।
এমন পরিস্থিতিতেও মাদারীপুরের আওয়াল জমাদ্দার ও কারিগর বেল্লাল বেপারি ধরে রেখেছেন বেতশিল্পের ঐতিহ্য। বেল্লালের হাতে তৈরি বেতের নানা পণ্য আজও মাদারীপুরবাসীর পছন্দের তালিকায় রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের খোয়াজপুর এলাকার হেলাল উদ্দিন জমাদ্দারের ছেলে আওয়াল জমাদ্দার। তিনি মাদারীপুর শহরের এমএম হাফিজ মেমোরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরির সামনে ১৬ বছর ধরে বেতের তৈরি নানা জিনিসপত্র বিক্রি করে আসছেন। শিবচর উপজেলার মিরারকান্দি গ্রামের তৈয়ব আলী বেপারির ছেলে বেল্লাল বেপারি সেখানে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিদিন তার হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের বেতের পণ্য।
শৌখিন মানুষজন এখান থেকেই ঐতিহ্যবাহী বেতের তৈরি নানা জিনিসপত্র কিনে নেন। ‘সুইট হোম’ নামের প্রতিষ্ঠানটিই মাদারীপুরে বেতের জিনিস তৈরি ও বিক্রির একমাত্র মাধ্যম বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ কারণে জেলার মানুষ বেতের তৈরি পণ্য কিনতে এখানে ছুটে আসেন।
একসময় প্রতি মাসে তিন থেকে চার লাখ টাকার নানা জিনিসপত্র বিক্রি হলেও বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। অল্প দামে চাহিদামতো প্লাস্টিকের জিনিসপত্র পাওয়া যাওয়ায় দিন দিন বেতশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

বেতের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র/ছবি: জাগো নিউজ
এখানে বেতের তৈরি নানা ধরনের জিনিসপত্র তৈরি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সোফাসেট, বেড সেট, ডিভান, বিভিন্ন ধরনের র্যাক, ট্রলি, টেবিল, চেয়ার, ফোল্ডিং চেয়ার, কর্নার, ইজি চেয়ার, ডাইনিং চেয়ার, বেবি কট, ম্যাগাজিন র্যাক, বিভিন্ন ধরনের দোলনা, বিভিন্ন ডিজাইনের শোপিস, চায়ের ট্রে ও ফলের ঝুড়ি। এ ছাড়া ক্রেতারা নিজেদের পছন্দের ডিজাইনের ছবি দেখিয়েও নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে নেন।
বেতের কারিগর বেল্লাল বেপারী বলেন, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি থেকে বেশি টাকা দিয়ে বেত কিনে আনতে হয়। পরে তা দিয়ে চাহিদামতো পণ্য তৈরি করা হয়। কিন্তু প্লাস্টিকের দাম কম হওয়ায় দিনে দিনে বেতের পণ্যের চাহিদা কমে যাচ্ছে। আগে কম দামে বেত কিনে আনতে পারলেও এখন কয়েক গুণ দাম বেড়েছে। তাই পণ্যের দামও বেশি রাখতে হচ্ছে। দাম অনুযায়ী পণ্য বিক্রি করতে না পারায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কষ্ট হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মালিকও প্রবাসে চলে গেছেন। তাই পুরো ব্যবসা আমাকে দেখতে হচ্ছে। মাদারীপুরে আমরাই একমাত্র এই বেতশিল্পকে ধরে রেখেছি। এটি হারিয়ে গেলে মাদারীপুর থেকে বেতশিল্পও হারিয়ে যাবে। তবে মাদারীপুরের একশ্রেণির শৌখিন মানুষ আছেন, যারা আমাদের নিয়মিত কাস্টমার। তারা আমাদের নিজস্ব শৈল্পিক কারুকাজ ও দৃষ্টিনন্দন নিপুণ হাতে তৈরি বেতের আসবাবপত্র ও ফার্নিচার বেশ পছন্দ করেন।’
বেতের পণ্য কিনতে আসা মাদারীপুর পুরানবাজারের মোসলেম হোসেন বলেন, ‘আমার কাছে বেতের জিনিসপত্র খুব ভালো লাগে। তাই কিনতে এসেছি। তবে দাম একটু বেশি। তবুও শখের জন্য একটি সোফাসেট কিনব। মাদারীপুরের একমাত্র দোকান এটি। এই বেতশিল্পের ঐতিহ্যও অনেক।’
আরেক ক্রেতা মুন্নি আক্তার বলেন, ‘আমার বাসায় সব ফার্নিচারই বেতের। বেতের ফার্নিচারের মধ্যে একটা ঐতিহ্য আছে। একটা আভিজাত্যের ভাবও আছে। তাই ঘরের কোনো ফার্নিচার দরকার হলে মাদারীপুরের একমাত্র বেতের দোকান সুইট হোম থেকেই কিনে থাকি।’
মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, ‘একসময় মাদারীপুরের আনাচে-কানাচে জন্ম নিত বেতগাছ। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আশপাশেই দেখা যেত বেতগাছ। কিন্তু আজ সেই বেতগাছ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তাই দিনে দিনে মাদারীপুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বেতশিল্প।’
তিনি আরও বলেন, ‘একসময় বেতের তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা ছিল ব্যাপক। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো বেতের তৈরি নানা পণ্য। সেই শিল্পের ঐতিহ্য এখন হারাতে বসেছে। প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টিলের মতো সস্তা পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে বেতশিল্পের চাহিদা কমে গেছে। এ ছাড়া কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা এবং পণ্যের উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় অনেক কারিগর তাদের পূর্বপুরুষদের এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেকেই অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এ কারণে ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্পও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’
মাদারীপুরের উন্নয়ন সংস্থা দেশগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা এবিএম বজলুর রহমান খান বলেন, এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/এসজেডএইচ/জেআইএম
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
প্রতিবছর ১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’। গণতন্ত্র শুধু ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, গণতন্ত্র হলো প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় নাগরিকের মৌলিক সম্মান ও অধিকারের প্রতিফলন। দিবসটি উপলক্ষ্যে এক বাণীতে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতিকে সাধুবাদ জানাই।’ ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ১৫ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মূলত ১৯৮৭ সালে বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বেগবান করতে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এবং ১৯৯৭ সালে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের গৃহীত ‘গণতন্ত্র সংক্রান্ত সার্বজনীন ঘোষণা’ স্মরণে রাখতে এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়। বিশ্বের প্রতিটি দেশে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ রক্ষা করা গণতন্ত্রের অবস্থা মূল্যায়ন করা, মূল্যবোধ রক্ষা করা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। আরও পড়ুন আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস / প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে ভোটের বাক্সের বাইরের গণতন্ত্র আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় গণতন্ত্রের পরিধি অনেক বেশি বিস্তৃত। অনেকেই সাধারণ অর্থে গণতন্ত্রকে কেবল নির্দিষ্ট মেয়াদ পর পর ব্যালট বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মুক্ত ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম: যেখানে সাংবাদিকতা কোনো অদৃশ্য ভয় বা সেন্সরশিপের মুখোমুখি হবে না যেখানে সাধারণ মানুষ ও ক্ষমতাবানের জন্য আইনের বিচার সমান হবে এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা থাকবে, ভিন্নমতের সম্মান থাকবে, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের পাশাপাশি সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বর শোনা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা থাকবে। সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ নাগরিকের জানার অধিকার থাকবে। অর্থাৎ গণতন্ত্র মানে হলো সেই পরিবেশ, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের অনিয়মের বিরুদ্ধে ভয়হীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে ‘হাইব্রিড রেঝিম’ বা ছদ্মবেশী শাসনব্যবস্থার আধিক্য, যেখানে আপাতদৃষ্টিতে নির্বাচনের কাঠামো বজায় রাখা হলেও ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারকে সংকুচিত করা হয়।ভবর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র এক অভূতপূর্ব ও সূক্ষ্ম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়া যেমন মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে, তেমনি ভুয়া তথ্য, ঘৃণা ছড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে জনমতকে বিকৃত করার ঝুঁকি তৈরি করেছে। আরও পড়ুন বিশ্ব ডুচেন সচেতনতা দিবস / যে রোগটি শিশুর পায়ের শক্তি কেড়ে নেয় তরুণ সমাজ ও আগামীর পথ আজকের দিনে তরুণরা কেবল ভোটার হিসেবেই নয়, বরং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়া এবং সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যে কোনো গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখার বড় শক্তি হলো তরুণ সমাজ। তাই তরুণদের রাজনীতি বিমুখ না করে বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাষ্ট্রের আসল মালিক জনগণ। গণতন্ত্র কোনো নিশ্চল বিষয় বা স্থায়ী ট্রফি নয় যা একবার অর্জন করলেই কাজ শেষ হয়ে যায়; এটি প্রতিনিয়ত চর্চা, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের একটি প্রক্রিয়া। নাগরিক হিসেবে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার থাকা, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মাধ্যমেই গণতন্ত্র তার প্রকৃত রূপ পায়। কেএসকে
মাসুমুর রহমান মাসুদ নিবন্ধের শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে ক্ষুদ্র পরিসরে লেখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। যে শিরোনামে এই নিবন্ধ; তা অত্যন্ত বিশদভাবে আলোচিত হওয়ার গুরুত্ব রাখে। রবীন্দ্রনাথের গল্পে প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধন রয়েছে। প্রকৃতিকে তিনি বহুমাত্রিক দিক থেকে ছোটগল্পে চিত্রিত করেছেন। গল্পে প্রকৃতি কখনো মানবমনকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে, যেন পাঠকমাত্রই বুঝতে পারে—‘মানুষ প্রকৃতিরই অংশ’। প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার চেয়ে, মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণে প্রকৃতির সক্ষমতা অনেক বেশি। তাঁর অখণ্ড ‘গল্পগুচ্ছ’ গ্রন্থে ৯৫টি ছোটগল্প সংকলিত হয়েছে। এ ছাড়া আরও গল্প রয়েছে। আজকের আলোচনা ‘হৈমন্তী’ গল্প অবলম্বনে। প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধনে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হৈমন্তী’, ‘অপরিচিতা’ ও ‘সুভা’ গল্পগুলো চিরন্তন মানব ও নিসর্গের অনন্য রূপায়ণ। এখানে মানবজীবনের বেদনা এবং বাংলার রূপ একাকার হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের গল্পে প্রকৃতি কোনো পটভূমি নয় বরং তা মানবমনের অনুভূতি ও ভাগ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। ‘হৈমন্তী’ ও ‘অপরিচিতা’ গল্প দুটির প্লট নির্মিত হয়েছে তৎকালীন সমাজের প্রচলিত যৌতুক প্রথার ওপর নির্ভর করে। হৈমন্তী গল্পে অমানবিক যৌতুক প্রথার বলি হওয়া নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছে হৈমন্তী। গল্পটি এমন—পনেরো হাজার টাকা নগদ এবং পাঁচ হাজার টাকার গহনা দিয়ে সহজ-সরল ও সত্যভাষী হৈমন্তীর সঙ্গে অপূর্বর বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর হৈমন্তীর সততা ও মুক্তবুদ্ধি থাকার পরেও তার লোভী শ্বশুরবাড়ি এবং প্রথাগত সমাজের অমানসিক নির্যাতনের কারণে সে টিকতে পারেনি। অপূর্বর পরিবার হৈমন্তীর বয়স ও তার বাবার সরলতাকে সব সময় বাঁকা চোখে দেখত। শ্বশুরের পরিবারে একদিন পিতার ভীষণ অপমান মেয়েটি মেনে নিতে পারেনি। নির্মম মানসিক চাপ, অবহেলা ও দমবন্ধ পরিবেশ এই কোমলপ্রাণ তরুণীর জীবনকে গ্রাস করে নেয়। শেষ পর্যন্ত সমাজের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে হার মেনে এবং হৃদয়ে গভীর কষ্ট নিয়ে হৈমন্তীর অকালমৃত্যু ঘটে, যা অপুকে ভীষণভাবে কষ্ট দেয়। তদুপরি তৎকালীন সমাজের রীতিনীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তার শেষাব্ধি হয়ে ওঠেনি। আরও পড়ুন স্মৃতির অ্যালবামে নীললোহিত ও সাহিত্য পুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ০২.হৈমন্তী পিতার একমাত্র মেয়ে। মাতৃ বিয়োগের পর পিতার যত্নে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেছে। গল্পের শুরুতে হৈমন্তী সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাকে শিশিরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ভোরবেলা শিশির দিবাকর আলোয় বিলীন হয়ে যায়। হৈমন্তীও ঠিক তেমনি অপূর্বের জীবনে ক্ষণস্থায়ী ছিল। কথক তাকে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, ‘আচ্ছা, তাহার নাম দিলাম শিশির। কেননা, শিশিরে কান্নাহাসি একেবারে এক হইয়া আছে, আর শিশিরে ভোরবেলাটুকুর কথা সকালবেলায় আসিয়া ফুরাইয়া যায়।’ শরৎচন্দ্র বিলাসী গল্পে বিলাসীর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসি ফুলের মত। হাত দিয়ে এতটুকু স্পর্শ করলে, এতটুকু নাড়াচাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে।’ ফুল এবং শিশির দুটিই প্রকৃতির অসামান্য উপাদান। হৈমন্তী গল্পে অপূর্বর শ্বশুরের পরিচয়ও প্রাকৃতিক উপাদান মিশ্রিত করে উপস্থাপিত হয়, ‘আমার শ্বশুরের নাম গৌরীশংকর। যে হিমালয়ে বাস করিতেন সেই হিমালয়ের তিনি যেন মিতা। তাঁহার গাম্ভীর্যের শিখরদেশে একটি স্থির হাস্য শুভ্র হইয়াছিল।’ বাস্তবে গৌরীশঙ্কর হচ্ছে হিমালয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। এই পর্বতের চূড়ায় প্রচণ্ড ঠান্ডা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মানুষ বসবাস না করলেও এর পাদদেশে এবং চারপাশের উপত্যকায় হাজার হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করে। বাস্তবের সেই শৃঙ্গ ওঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে অত্যন্ত সতর্কতা ও সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে। হৈমন্তী গল্পের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে স্ত্রীর আসল পরিচয় উন্মোচন করে কথক। সেখানেও প্রকৃতির উপাদান মিশিয়ে পাঠককে নৈসর্গিক সুখ প্রদান করেন রবীন্দ্রনাথ। অপূর্ব বলে, ‘শিশির—না, এ নামটা আর ব্যবহার করা চলিল না। একে তো এটা তাহার নাম নয়, তাহাতে এটা তাহার পরিচয়ও নহে। সে সূর্যের মতো ধ্রুব; সে ক্ষণজীবিনী উষার বিদায়ের অশ্রুবিন্দুটি নয়। কী হইবে গোপনে রাখিয়া। তাহার আসল নাম হৈমন্তী।’ নারী চরিত্রের কোমলতা তুলে ধরতে রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ কেউ নেই। হৈমর বর্ণনা দেওয়া হয়—‘দেখিলাম, এই সতেরো বছরের মেয়েটির উপরে যৌবনের সমস্ত আলো আসিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু এখনো কৈশোরের কোল হইতে সে জাগিয়া উঠে নাই। ঠিক যেন শৈলচূড়ার বরফের উপর সকালের আলো ঠিকরিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু বরফ এখনো গলিল না। আমি জানি, কী অকলঙ্ক শুভ্র সে, কী নিবিড় পবিত্র।’ সে শুভ্রতার ভালোবাসায় অপূর্ব তার পরিবারের বিরুদ্ধ পরিবেশের প্রতি কিছুটা বিরক্ত। আরও পড়ুন ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাসের বিষয়-আশয় ০৩.তৎকালীন সমাজে গৌরীদান প্রথা প্রচলিত ছিল। আট বছরের মেয়েদের গৌরী, নয় বছরের মেয়েদের রোহিনী এবং দশ বছরের মেয়েদের কুমারী বলা হতো। কুমারী মেয়েদের বিয়ে না হওয়া, সেই সমাজে খুবই কুলক্ষণা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা ছিল। এদিকে হৈমর বয়স সতেরো। এটি অপূর্বরে পরিবারে সমস্যা তৈরি করেছে। হৈম যখন অন্যদের দ্বারা জিজ্ঞাসিত হয়ে নিজের বয়স না লুকিয়ে সত্যতার সাথে অন্যদের কাছে উপস্থাপন করে; তখন অপূর্বর পরিবার হৈমন্তীর ওপর খুবই রূঢ় আচরণ করে। এর প্রতিবাদ করে অপূর্ব, অথচ দায় পড়ে হৈমন্তীর ওপর। ‘সে তো বটেই। দোষ সমস্তই হৈমর। তাহার দোষ যে তাহার বয়স সতেরো; তাহার দোষ যে আমি তাহাকে ভালোবাসি; তাহার দোষ যে বিধাতার এই বিধি, তাই আমার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্ত আকাশ আজ বাঁশি বাজাইতেছে।’ অপূর্বর এই যন্ত্রণাও প্রকাশিত হয়েছে প্রকৃতির উপাদান দিয়ে। আবার হৈমর প্রতি অপূর্বর ভালোবাসাও প্রকাশিত হয়েছে প্রকৃতির উপাদান দিয়ে—‘তাহার দুইটি কারণ ছিল—এক তো হৈমর ভালোবাসার মধ্যে এমন একটি আকাশের বিস্তার ছিল যে, সংকীর্ণ আসক্তির মধ্যে সে মনকে জড়াইয়া রাখিত না, সেই ভালোবাসার চারিদিকে ভারি একটি স্বাস্থ্যকর হাওয়া বহিত। দ্বিতীয়, পরীক্ষার জন্য যে বইগুলি পড়ার প্রয়োজন তাহা হৈমর সঙ্গে একত্রে মিলিয়া পড়া অসম্ভব ছিল না।’ ০৪.হৈমকে গিরিনন্দিনী হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ। শ্বশুরের পরিবারে অপমানিত হয় হৈম। অপূর্ব জানায়, ‘আমাদের সংসারে অপমানের কণ্টকশয়নে সে বসিয়া; সে শয়ন আমিও তাহার সঙ্গে ভাগ করিয়া লইয়াছি। সেই দুঃখে হৈমর সঙ্গে আমার যোগ ছিল, তাহাতে আমাদিগকে পৃথক করে নাই। কিন্তু এই গিরিনন্দিনী সতেরো-বৎসর-কাল অন্তরে বাহিরে কত বড়ো একটা মুক্তির মধ্যে মানুষ হইয়াছে। কী নির্মল সত্যে এবং উদার আলোকে তাহার প্রকৃতি এমন ঋজু শুভ্র ও সবল হইয়া উঠিয়াছে। তাহা হইতে হৈম যে কিরূপ নিরতিশয় ও নিষ্ঠুররূপে বিচ্ছিন্ন হইয়াছে এতদিন তাহা আমি সম্পূর্ণ অনুভব করিতে পারি নাই, কেননা সেখানে তাহার সঙ্গে আমার সমান আসন ছিল না।’ অপমানের পর হৈমর পরিবর্তন বিশেষ লক্ষণীয়। সে পরিবর্তন অপূর্ব ও তার বোন ছাড়া আর কারো নজরে আসেনি। সে বর্ণনাও প্রকৃতির উপাদান দিয়ে প্রকাশিত হয়। অপূর্ব পাঠককে জানায়—‘হৈম যে অন্তরে অন্তরে মুহূর্তে মুহূর্তে মরিতেছিল। তাহাকে আমি সব দিতে পারি কিন্তু মুক্তি দিতে পারি না—তাহা আমার নিজের মধ্যে কোথায়? সেইজন্যই কলিকাতার গলিতে ঐ গরারে ফাঁক দিয়া নির্বাক আকাশের সঙ্গে তাহার নির্বাক মনের কথা হয়; এবং এক-একদিন রাত্রে হঠাৎ জাগিয়া উঠিয়া দেখি সে বিছানায় নাই, হাতের উপর মাথা রাখিয়া আকাশ-ভরা তারার দিকে মুখ তুলিয়া ছাতে শুইয়া আছে।’ আরও পড়ুন কবিতা ও কথাসাহিত্যে কামরুল হাসান বাদলের মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস অসুস্থ হয়ে পড়লে হৈমকে ডাক্তার দেখানো হলো। সেখানে ডাক্তারের যে পরামর্শ, তাতেও প্রকৃতি মিশ্রিত করে রোগ নিরাময় পরামর্শই প্রতীয়মান হয়—‘শ্বশুরমশায় স্বয়ং একজন ভালো ডাক্তার আনিয়া পরীক্ষা করাইলেন। ডাক্তার বলিলেন, ‘বায়ু-পরিবর্তন আবশ্যক, নহিলে হঠাৎ একটা শক্ত ব্যামো হইতে পারে’।’ গল্পের শেষে অপূর্ব জানায়, ‘শুনিতেছি, মা পাত্রী সন্ধান করিতেছেন। হয়তো একদিন মার অনুরোধ অগ্রাহ্য করিতে পারিব না, ইহাও সম্ভব হইতে পারে। কারণ- থাক্, আর কাজ কী!’ গল্পের সমাপ্তিতে আমাদের মনে অতৃপ্তি থেকেই যায়। হৈম নেই সেটা স্পষ্ট। তার মৃত্যু নিয়ে পাঠক মনে রহস্যের জন্ম দিয়ে রবীন্দ্রনাথ শেষ করেন গল্পটি। তবে আমাদের মনে ছোটগল্পের সংজ্ঞাটি ভেসে ওঠে—‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে, শেষ হয়েও হইল না শেষ।’ ০৫.গল্পে প্রাকৃতিক উপাদানের পাশাপাশি রবীন্দ্র দর্শনের প্রভাব রয়েছে। পিতাকে অঙ্গীকারের কথা বলা হলে তিনি মেয়েকে জানিয়েছেন—‘মানুষ পণ করে পণ ভাঙিয়া ফেলিয়া হাঁফ ছাড়িবার জন্য, অতএব কথা না-দেওয়াই সব চেয়ে নিরাপদ।’ আবার সৎপাত্রে কন্যাদানের বিষয়ে সম্প্রদান কারকের প্রভাব লক্ষণীয়, যা চিরন্তন সত্য প্রথা; পিতা যখন বলেন—‘যাহা দিলাম তাহা উজাড় করিয়াই দিলাম। এখন ফিরিয়া তাকাইতে গেলে দুঃখ পাইতে হইবে। অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার রাখিতে যাইবার মতো এমন বিড়ম্বনা আর নাই।’ পরিশেষে বলা যায়, ‘হৈমন্তী’ গল্পের হৈমন্তী সরলতার প্রতিমূর্তি, প্রকৃতির নানা উপাদান তার চরিত্রে কোমলতা, শুভ্রতা, সরলতাকে উজ্জল করেছে। সে কৃত্রিম সমাজের জটিলতা বোঝে না। শরৎকালের শিউলি ফুলের মতো তার স্নিগ্ধ উপস্থিতি চারপাশ আলোকিত করে তোলে। কিন্তু নির্মম সামাজিক নিয়ম তাকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি। এই গল্পে হৈমন্তী চরিত্রে অন্তরের কোমলতা ও পবিত্রতা প্রকৃতির রূপের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সমাজ তার ওপর অত্যাচার চালালেও রবীন্দ্রনাথ তার প্রকৃতির মতো চিরন্তন ও মহিমাময় করে তুলেছেন। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা, চান্দিনা, কুমিল্লা। এসইউ