চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল কর্মী মোহাম্মদ করিম হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো অস্ত্র এবং দুটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
আজ সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে রোববার চট্টগ্রাম নগর ও হাটহাজারী এলাকা থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানীহাট বাজারে মোটরসাইকেলে করে এসে ১০ থেকে ১২ জন অস্ত্রধারী কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেন যুবদল কর্মী মোহাম্মদ করিমকে। পরদিন নিহত করিমের স্ত্রী বিলকিস আক্তার বাদী হয়ে রাউজান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন।
গ্রেপ্তার চারজন হলেন সৈয়দ মোহাম্মদ শুক্কুর (২৭), মো. জাবেদ (২৮), মো. সেলিম (৫০) ও মো. আলামিন (২৯)। তাঁদের মধ্যে শুক্কুর ও জাবেদকে নগরের চান্দগাঁও থানার কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেলিম ও আলামিনকে গ্রেপ্তার করা হয় হাটহাজারীর দক্ষিণ মাদার্শা এলাকা থেকে। তাঁদের সবার বাড়ি রাউজানের উরকিরচরে।

পুলিশ জানায়, শুক্কুর ও জাবেদের তথ্যে হত্যা মামলার পলাতক আসামি মো. পারভেজের পরিত্যক্ত একটি গরুর খামার থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতি এবং দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০ দিন আগে মো. পারভেজের মামা আজগর আলীর একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। পারভেজ ওই চুরির ঘটনায় করিমকে সন্দেহ করে আসছিলেন। মোটরসাইকেলটি ফেরত দেওয়ার জন্য করিমকে বলেন তিনি। তবে করিম চুরির বিষয়টি অস্বীকার করায় পারভেজ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন।

পুলিশ জানায়, ৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পারভেজ এক ব্যক্তির মাধ্যমে কৌশলে করিমকে রাউজানের কেরানীহাট বাজারে ডেকে আনেন। করিম আসা মাত্রই তাঁকে প্রথমে কুপিয়ে ও পরে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত যুবদল কর্মী করিম অন্তত ১০টি মামলার আসামি ছিলেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। এ সময় তাঁর সঙ্গে জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
এক যুগেরও বেশি সময় আগে নির্মাণ করা হয় পাবনার বেড়া উপজেলার বড়শিলা-নলভাঙা-খাকছাড়া পাকা সড়ক। শত শত বিঘা জমির ফসল আনা-নেওয়া ও অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ সহজ করতে সড়কটি নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় এক কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে দীর্ঘ পাঁচ কিলোমিটার সড়কটি এখন নিশ্চিহ্নের পথে। ছেয়ে গেছে ঝোপঝাড়ে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, এক কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালে বড়শিলা-নলভাঙা-খাকছাড়া সড়কের নির্মাণকাজ শেষ হয়। বেড়া পৌরসভার বড়শিলা থেকে চাকলা ইউনিয়নের নলভাঙা হয়ে খাকছাড়া পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি বিল এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে। সড়কটি চালু হওয়ার পর উপজেলা সদরের সঙ্গে চাকলা ও কতলা ইউনিয়নের নলভাঙা, খাকছাড়া, চাকলা, দমদমা, জয়নগর, কৈতলাসহ অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ সহজ হয়ে যায়। কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে এটি দ্রুতই উপজেলার অন্যতম ব্যস্ত সড়কে পরিণত হয়। প্রতিদিন কয়েকশ যানবাহন চলাচল করত এ পথে। কিন্তু এখন এর চিত্র ঠিক উল্টো। সড়কটি এখন চলাচলের অনুপযোগী। আরও পড়ুন আর কত প্রাণ গেলে নিরাপদ হবে যাত্রা? স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিল এলাকার কথা বিবেচনায় না এনে নিচু ও সরু করে সড়কটি নির্মাণ করা হয়। ফলে নির্মাণের প্রথম বছর থেকেই বৃষ্টি ও বিলের পানির চাপে বিভিন্ন অংশ ভাঙতে শুরু করে। বর্ষা মৌসুমে কয়েকটি স্থানে পানি উঠে যেত। তারপরও কয়েক বছর সড়কটি ব্যবহার করা গেছে। তবে নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময় এটি পুরোপুরি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ‘বিল এলাকার কথা বিবেচনায় না এনে নিচু ও সরু করে সড়কটি নির্মাণ করা হয়। ফলে নির্মাণের প্রথম বছর থেকেই বৃষ্টি ও বিলের পানির চাপে বিভিন্ন অংশ ভাঙতে শুরু করে। বর্ষা মৌসুমে কয়েকটি স্থানে পানি উঠে যেত। তারপরও কয়েক বছর সড়কটি ব্যবহার করা গেছে। তবে নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময় এটি পুরোপুরি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে’ সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তার ওপরই জন্মেছে ঘন আগাছা।দুই পাশের ঝোপঝাড় মিলিয়ে অনেক স্থানে রাস্তা নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েছে। সড়কটি দিয়ে কেউ চলাচল করতে পারেন না। বড়শিলা গ্রামের বাসিন্দা হযরত আলী। আলাপকালে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই পুরো বিল এলাকায় দেখেন শুধু আবাদি জমি। এখানে ধান, পেঁয়াজ ও রসুনসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ হয়। এখন পাট তোলা হচ্ছে। রাস্তার অবস্থা বেহাল হওয়ায় জমি থেকে পাট ও খড়ি আনা-নেওয়াতে যে কী ভোগান্তি, তা বলে শেষ করা যাবে না। এত টাকা দিয়ে রাস্তা করলো কিন্তু কেউ তার আর দেখভাল করলো না। আমাদের ভোগান্তি দেখার কেউ নেই।’ আরও পড়ুন চলে হাজারো শিল্প-কারখানার যান, বেহাল সড়কটি সংস্কারে দায় নিচ্ছে না কেউ স্থানীয় ভ্যানচালক হাসেম আলী বলেন, ‘পাঁচ কিলোমিটারের হাফ কিলোমিটার রাস্তায়ও যাওয়ার উপায় নেই। দু-চার মিনিট যাওয়া যায়, সেখান থেকেই পাটের খড়ি আনলাম। সামনে যে রাস্তা নেইই বলা যায়।’ তিনি বলেন, ‘কয়েকজন চালকের অজানা থাকায় এদিক দিয়ে গতকাল ভ্যান নিয়ে এসেছিল। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে রাস্তা না পেয়ে ফিরে এসেছে। অথচ একসময় এই রাস্তা দিয়েই অহরহ ভ্যানসহ বিভিন্ন গাড়ি চলাচল করেছে।’ স্থানীয় আরেক বাসিন্দা রমিস মিয়া বলেন, ‘রাস্তাটি হবার পর জমি থেকে আমরা উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারতাম। কিন্তু এখন হেঁটে যাবার রাস্তাও নেই। একটি ব্রিজ করা হয়েছিল। সেটি রাস্তার চেয়েও নিচু। দ্রুত এই রাস্তা ঠিক করা হোক।’ আরও পড়ুন এক সড়কে বদলে গেছে ১৫ গ্রামের মানুষের ভাগ্য সড়কের পাশে বিলে খড়া জালে মাছ ধরছিলেন মিলন। আলাপকালে তিনি জানান, এটিকে ‘কাজলকুড়ো বিল’ বলে। পাশে যে রাস্তাটি দেখছেন, এটি রাস্তা নয়; মনে হবে জঙ্গল। এটি আর চলাচলের উপযোগী নেই। খাকছাড়া গ্রামের খাকছাড়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মানিক হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সড়কটি চালু হওয়ার পর আশপাশের কয়েকটি গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী আমাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। এখন ওইসব গ্রামের শিক্ষার্থীদের অনেকেই আর এ পথে আসতে পারে না।’ এলাকাবাসী ও এলজিইডি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি পুনর্নির্মাণ ও উন্নয়নের জন্য একটি প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করে এলজিইডি। পরে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দ না হওয়ায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি। পরে আর তেমন উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। আরও পড়ুন বাংলাদেশ লাগোয়া ‘চিকেন্স নেকে’ নতুন মহাসড়ক বানাবে ভারত এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এরইমধ্যে সড়কটি পরিদর্শন করেছি। পাবনার উন্নয়ন শীর্ষক একটি প্রকল্পের আওতায় শিগগির সড়কটি পুনঃনির্মাণ করা হবে।’ এএইচআইএন/এসআর/এএসএম
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা যেমন ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছে, তেমনি সময়ের পরীক্ষা পেরিয়ে কালোত্তীর্ণতার মর্যাদাও পেয়েছে। সহজ করে বললে তারাশঙ্কর একই সঙ্গে পাঠকপ্রিয়, জনপ্রিয় ও কালোত্তীর্ণ সাহিত্যিক। আজও তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। মানের বিচারের দিক থেকে তাঁর সমালোচকেরাও এ কথা অস্বীকার করতে পারবেন না। সাধারণত বাণিজ্যিক পাঠকপ্রিয়তা ও শিল্পমানকে দুটি ভিন্ন মেরুর মনে করা হলেও, তারাশঙ্করের কলমে এই দুইয়ের সংমিশ্রণ ঘটেছে। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? তারাশঙ্কর কেন আলাদা? কেন তিনি একই সঙ্গে পাঠকপ্রিয় ও কালোত্তীর্ণ?বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্য থেকে নজর বুলিয়ে এলে বুঝতে বেগ হবে না যে তারাশঙ্কর তাঁর সময়ে তো বটেই এখনো, এই সময়েও ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার হিসেবে কিংবদন্তিতুল্য। তাঁর আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যে যোগ করেছে সোনার ফসল। প্রায় চার দশকের সাহিত্যসাধনা দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যকে বিশাল মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি দান করেছেন এই শব্দশিল্পী। বিশেষ করে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের ত্রয়ী; তারাশঙ্কর, মানিক ও বিভূতিভূষণের মধ্যে তারাশঙ্কর অন্যতম স্বতন্ত্র ধারার স্রষ্টা। তাঁর রচনায় মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের জীবনের ঘনঘটা এত বিস্তৃতভাবে বিস্তার পেয়েছে, যা আঞ্চলিক সাহিত্যের প্রভাবকে ত্বরান্বিত করেছে।তারাশঙ্কর ছাত্রজীবনে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে ১৯২১ সালে কারাভোগ করেন। তারপর সরাসরি যুক্ত হন বাংলার কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৩০ সালের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে গ্রেপ্তার হন। কারাবাসের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং রাজনীতির উপদলীয় কোন্দল ও সংঘাত ধীরে ধীরে রাজনীতির প্রতি তাঁকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। কারামুক্তির দিনই প্রতিজ্ঞা করেন, সাহিত্যসাধনার মধ্য দিয়েই মানুষের মুক্তির কথা বলবেন। উল্লেখ্য, পাষাণপুরী ও চৈতালী ঘূর্ণি এই সময়ের রচনা। ফলে তাঁর উপন্যাসে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ছবি সহজাতভাবে চিত্রিত হয়েছে। ধাত্রী দেবতার কথাও বলা যায়। শিবনাথ চরিত্রের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটিতে স্বাধীনতা আন্দোলনের যে আবেগ ও জাতীয়তাবোধের দৃঢ়তা প্রস্ফুটিত হয়েছে তা বিস্মিত করে।তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়লেখায় উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন এবং তাদের ছোট–বড় গুণ ও মহত্ত্বকে ফুটিয়ে তুলতে তারাশঙ্করের দক্ষতা ঈর্ষণীয়। উপরন্তু মানুষের প্রবৃত্তি, নিয়তি এবং সহমর্মিতার মেলবন্ধনের মহৎ দিকটিও লেখনীর মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করেছেন। তাই তাঁর চরিত্ররা নিয়তির কাছে যেমন অসহায়, তেমনি জীবনসংগ্রামে প্রত্যয়ীও।তাঁর রচনায় প্রত্যন্ত গ্রামীণ জীবন যেমন ভাষা পেয়েছে, তেমনি লোকাচার, প্রথা, ধর্মবিশ্বাস ও ভাষার বিবর্তনও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোকিত হয়েছে। সাঁওতাল, বাগদি, বোষ্টম, বাউরি, ডোম, বেদে, পটুয়া, কাহারদের জীবনযাত্রার ছবি দারুণভাবে এঁকেছেন তারাশঙ্কর। ফুটিয়ে তুলেছেন গ্রামবাংলার সামাজিক ভাঙন, মূল্যবোধের সংঘাত, শ্রেণিচেতনা এবং নিম্নবর্গীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম ও অস্তিত্বের সংগ্রামও।আঞ্চলিক ভাষার সহজ সাবলীল ব্যবহারের কৌশলও প্রশংসাযোগ্য। স্থানীয় উপভাষা চরিত্রগুলোর মুখে এত স্বাভাবিকভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন যে আঞ্চলিক পটভূমিকে তা আরও জীবন্ত করে তুলেছে। কবিয়ালদের গান, ঝুমুর দলের জীবন, গ্রাম্য নানা আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কারের নানা দিক কোনো রকম ভণিতার আশ্রয় না নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তুলে ধরেছেন। আর সমাজ-সংস্কৃতি তুলে ধরার এই বৈচিত্র্যময়তা তারাশঙ্করের রচনাকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।সামাজিক পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি দিলেও দেখা যাবে, এই জায়গাটিও দারুণভাবে তুলে ধরেছেন তারাশঙ্কর। এর পেছনে কারণ হতে পারে, নিজের চোখে দেখা জমিদারি প্রথার অবসান ও নতুন এক ধনিক শ্রেণির উদ্ভব। ফলে গ্রামের চিরায়ত স্থিতিশীল সমাজের ভাঙন ও যন্ত্রনির্ভর নগরজীবনের বিকাশের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও নৈতিক দ্বন্দ্ব, খুব সহজেই তাঁর রচনার উপজীব্য হয়েছে।শ্রেণিসংঘাতের বিষয়টিও আলাদাভাবে নজর পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ, লেখায় উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবন এবং তাদের ছোট–বড় গুণ ও মহত্ত্বকে ফুটিয়ে তুলতে তারাশঙ্করের দক্ষতা ঈর্ষণীয়। উপরন্তু মানুষের প্রবৃত্তি, নিয়তি এবং সহমর্মিতার মেলবন্ধনের মহৎ দিকটিও লেখনীর মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করেছেন। তাই তাঁর চরিত্ররা নিয়তির কাছে যেমন অসহায়, তেমনি জীবনসংগ্রামে প্রত্যয়ীও।তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসের প্রচ্ছদরচনারীতির দিক থেকে তারাশঙ্কর সহজ ও গতিশীল, ব্যাপ্তির দিক থেকে মহাকাব্যিক। তাঁর বর্ণনা ক্ষীণ কিন্তু সুদূরপ্রসারী। তিনি চিরায়ত ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে সমাজ ও জীবনের ক্ষয়িষ্ণুতাকে গভীর বেদনার সঙ্গে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর নিতাই, বনওয়ারী, করালী, জীবন মশায় চরিত্রগুলো বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন সম্পদ। মানবচরিত্রের জটিলতা, প্রেম, প্রতিহিংসা, কুসংস্কার ও মানবতাবাদের জয়গান তাঁর রচনার প্রধান সুর।পুরাতনের সঙ্গে নতুনের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। বিষয়টিকে কৌশলের সঙ্গে রচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন তারাশঙ্কর। তাঁর উপন্যাসে চিরায়ত সংস্কার, ধর্মবিশ্বাস এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বা নতুন মূল্যবোধের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্ব রয়েছে। আরোগ্য–নিকেতন–এর উদাহরণ টানা যায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক জীবন মশায় এবং আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক পৌত্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব মূলত চিরায়ত ভাবনা ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যকার সংঘাত। জীবন মশায়ের জীবনদর্শন, মৃত্যুচিন্তা এবং তাঁর পুরাতন চিকিৎসাপদ্ধতির প্রতি বিশ্বাস উপন্যাসের মূল উপজীব্য।তারাশঙ্করের উপন্যাসের সংখ্যা ৬০–এর বেশি। গল্পও লিখেছেন প্রচুর। সৃষ্টি করেছেন বহু কালজয়ী চরিত্র ও কাহিনি। বীরভূমের কোপাই নদীর ‘হাঁসুলি বাঁক’ নামে পরিচিত অঞ্চলের মানুষের জীবন নিয়ে রচিত হাঁসুলি বাঁকের উপকথা উপন্যাসটি আঞ্চলিক সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। গণদেবতায় গ্রাম্য জীবনের রূপান্তর ও রাজনৈতিক চেতনার বিস্তারের প্রভাব লক্ষণীয়। সিক্যুয়েল পঞ্চগ্রাম-এ পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার বিলুপ্তি, মধ্যস্বত্বভোগী ও মহাজন শ্রেণির উদ্ভবের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জাগরণ ও অধিকার বিষয়েও আলোকপাত আছে। কবি উপন্যাসের নিতাইয়ের কণ্ঠে লেখক ধ্বনিত করেছেন মানুষের চিরন্তন আক্ষেপের বাণী—হায় এ খেদ মোর মনেভালবেসে মিটল না আশ—কুলাল না এ জীবনে।জীবন এত ছোট কেনে? হায়—জীবনে যা মিটল নাকো মিটবে কি তাই হায় মরণে?এ ভুবনের কান্না যত হয় কি হাসি ও ভুবনে?জীবন এত ছোট কেনে? হায়—রচনারীতির দিক থেকে তারাশঙ্কর সহজ ও গতিশীল, ব্যাপ্তির দিক থেকে মহাকাব্যিক। তাঁর বর্ণনা ক্ষীণ কিন্তু সুদূরপ্রসারী। তিনি চিরায়ত ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে সমাজ ও জীবনের ক্ষয়িষ্ণুতাকে গভীর বেদনার সঙ্গে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর নিতাই, বনওয়ারী, করালী, জীবন মশায় চরিত্রগুলো বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন সম্পদ। মানবচরিত্রের জটিলতা, প্রেম, প্রতিহিংসা, কুসংস্কার ও মানবতাবাদের জয়গান তাঁর রচনার প্রধান সুর।তারাশঙ্কর যে নিজের ঘর ছেড়ে ঘরের বাইরে, দুয়ার ছেড়ে পৃথিবীর দুয়ারে পৌঁছাতে পেরেছেন, এখানেই কি তিনি আলাদা নন? তা ছাড়া উপন্যাসে, গল্পে জীবনকে দেখার সহজ, স্বাভাবিক দৃষ্টিও তাঁকে আলাদা করেছে। সাহিত্যের প্রান্তরে দিয়েছে নিজস্বতা, তৈরি হয়েছে তারাশঙ্করীয় রীতি।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ঐকতান’ কবিতায় বলেছেন,‘সাহিত্যের ঐকতান-সংগীতসভায়একতারা যাহাদের তারাও সম্মান যেন পায়—মূক যারা দুঃখে সুখে,নতশির স্তব্ধ যারা বিশ্বের সম্মুখে।ওগো গুণী,কাছে থেকে দূরে যারা তাহাদের বাণী যেন শুনি।তুমি থাকো তাহাদের জ্ঞাতি,তোমার খ্যাতিতে তারা পায় যেন আপনারি খ্যাতি—আমি বারংবারতোমারে করিব নমস্কার।’তারাশঙ্কর যে নিজের ঘর ছেড়ে ঘরের বাইরে, দুয়ার ছেড়ে পৃথিবীর দুয়ারে পৌঁছাতে পেরেছেন, এখানেই কি তিনি আলাদা নন? তা ছাড়া উপন্যাসে, গল্পে জীবনকে দেখার সহজ, স্বাভাবিক দৃষ্টিও তাঁকে আলাদা করেছে। সাহিত্যের প্রান্তরে দিয়েছে নিজস্বতা, তৈরি হয়েছে তারাশঙ্করীয় রীতি।১৮৯৮ সালের ২৩ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। মাত্র আট বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়ায় মা প্রভাবতী দেবী এবং বিধবা পিসিমা শৈলজা ঠাকুরাণীর স্নেহ-শাসনে বড় হন। পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তৎকালীন জমিদার সমাজের প্রতিনিধি। আর মা ছিলেন শিক্ষার প্রসারে আগ্রহী ও ধর্মশাস্ত্রের অনুরাগী।তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের প্রচ্ছদতারাশঙ্কর শৈলজানন্দকে বলেছিলেন, দ্যাখো আমি জীবন আর সাহিত্যকে আলাদা করে দেখি না। গল্প-উপন্যাসে ভালো ভালো কথা বলব, নিজের জীবনে সেটা মানব না, সেটা কী করে সম্ভব? অগত্যা যা ঘটার তা–ই ঘটল। তারাশঙ্কর আটক হলেন। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও আপস করেননি এই কথাশিল্পী। মাথা উঁচু করে জেল বরণ করে নিয়েছিলেন।সাহিত্যের পথে হেঁটে যেমন দুহাত ভরে দিয়েছেন, তেমনি পেয়েছেনও অনেক। ভূষিত হয়েছেন রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার, পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণসহ নানা পদক ও পুরস্কারে। শুধু কি তাই? ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য সুইডিশ একাডেমি তাঁকে মনোনীত করেছিল বলে জানা যায়। তাঁর গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত জলসাঘর এবং অভিযান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তপন সিংহ হাঁসুলি বাঁকের উপকথা উপন্যাসটিকেও সফলভাবে চলচ্চিত্রে রূপান্তর করেছেন।একটা ঘটনা দিয়ে লেখা শেষ করব। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা মানুষ তারাশঙ্কর–এ পড়েছিলাম। স্বাধীনতা আন্দোলনের দামামা বাজছে চারদিকে। ইংরেজ ভারত ছাড়, কলরবে আকাশ-বাতাস মুখর। তারাশঙ্কর সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করলেন এই মহারণে। অনেকেই তাঁকে সক্রিয়ভাবে না জড়িয়ে পড়ার জন্য অনুরোধ, উপদেশ, পরামর্শ দিলেন। এই প্রসঙ্গে আলাপকালে তারাশঙ্কর শৈলজানন্দকে বলেছিলেন, দ্যাখো আমি জীবন আর সাহিত্যকে আলাদা করে দেখি না। গল্প-উপন্যাসে ভালো ভালো কথা বলব, নিজের জীবনে সেটা মানব না, সেটা কী করে সম্ভব? অগত্যা যা ঘটার তা–ই ঘটল। তারাশঙ্কর আটক হলেন। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও আপস করেননি এই কথাশিল্পী। মাথা উঁচু করে জেল বরণ করে নিয়েছিলেন। তাই প্রশ্ন জাগে গণদেবতার দেবু পণ্ডিতের মধ্যে কি নিজেকে খুঁজতে চেয়েছেন তারাশঙ্কর?১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর না–ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা কথাসাহিত্যের মহাকাব্যিক এই শিল্পী। কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকেন।
কোরআন যখন কোনো উপমা দেয়, তখন একটি পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে মানুষের জন্য গভীর কোনো সত্যকে তুলে ধরে। কখনো একটি বৃক্ষের মাধ্যমে ভালো ও মন্দ কথার পরিণতি বোঝায়, কখনো পিঁপড়ার আচরণ দিয়ে সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা দেয়। আবার মরীচিকা ও সমুদ্রের অন্ধকারের দৃশ্যের মাধ্যমে মানুষের আমল ও কুফরের ভয়াবহ পরিণতি চোখের সামনে তুলে ধরে। ইতিপূর্বে আমরা প্রাণপ্রকৃতির বেশ কিছু চমৎকার উপমা দেখেছি। এখানে আরও কয়েকটি উপমা উপস্থাপন করা হলো।৮. বৃক্ষ দিয়ে ভালো ও মন্দ বাক্যের উপমা আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ কীভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ, যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা ওপরে বিস্তৃত, যা সব সময় তার রবের অনুমতিক্রমে তার ফলদান করে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমাসমূহ পেশ করে থাকেন, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। আর মন্দ বাক্যের তুলনা এক মন্দ গাছ, যার মূল ভূপৃষ্ঠ হতে বিচ্ছিন্নকৃত, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত ২৪-২৬)কেয়ামতের দিন পুনরুত্থানের পর সে দেখল—যেসব আমলের ওপর সে ভরসা করেছিল, তা তার কোনো কাজে আসছে না। তখন তার অবস্থা সেই তৃষ্ণার্ত মানুষের মতোই হবে।একটি বৃক্ষের দৃশ্যের মাধ্যমে কোরআন ভালো ও মন্দ বাক্যের প্রকৃতি কত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে! ভালো বাক্যকে এমন উৎকৃষ্ট বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যার শিকড় সুদৃঢ়, শাখা-প্রশাখা ঊর্ধ্বমুখী এবং যা নিয়মিত ফল দেয়।অর্থাৎ সত্য ও কল্যাণের কথা গভীর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রভাবও স্থায়ী ও ফলপ্রসূ হয়। বিপরীতে মন্দ বাক্য এমন গাছের মতো, যার শিকড় মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন; তাই তার কোনো স্থায়িত্ব নেই। কী অপূর্ব অলংকার! একটি দৃশ্যমান বৃক্ষের দৃঢ়তা ও পতনের চিত্র দিয়ে কোরআন অদৃশ্য কথার শক্তি ও দুর্বলতাকে চোখের সামনে এনে দিয়েছে।ধর্মে পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণের বিপদ৯. পিঁপড়ার দলবদ্ধতা দিয়ে উপমা ‘যখন তারা পিপীলিকা–অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছাল, তখন এক পিপীলিকা বলল, হে পিপীলিকাদল! তোমরা তোমাদের বাসায় প্রবেশ করো, নয়তো সুলাইমান এবং তাঁর বাহিনী তাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের পদতলে পিষে ফেলবে।’ (সুরা নামল, আয়াত ১৮)এটি পবিত্র কোরআনের একটি চমৎকার উপমা। এই আয়াতে একটি ছোট পিঁপড়ার সতর্কবার্তার দৃশ্যের মাধ্যমে মানুষের মনে পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।নবী সোলাইমান (আ.)-এর বাহিনী সামনে আসতে দেখে একটি পিঁপড়া নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে একা সরে যায়নি; বরং পুরো দলকে সতর্ক করে বলেছে, তোমরা নিজেদের বাসায় প্রবেশ করো।অর্থাৎ বিপদ এলে শুধু নিজেকে বাঁচানো নয়, অন্যদের নিরাপদ রাখার চেষ্টাও করতে হবে। সমাজে বসবাসকারী মানুষের দায়িত্বও এমনই। প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা সমাজের অন্য মানুষের বিপদকে নিজের বিপদ মনে করে তাদের সতর্ক করা, সাহায্য করা এবং কল্যাণ কামনা করা সামাজিক দায়িত্বেরই অংশ।মরীচিকার পেছনে ছুটে যাওয়া মানুষটি দুনিয়াতেই তার ভুল বুঝতে পারে; কিন্তু কাফের তার আমলের প্রকৃত পরিণতি এমন সময় বুঝবে, যখন আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না।১০. কাফেরের পরিণতির উপমা আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর যারা কুফরি করে তাদের আমলসমূহ মরুভূমির মরীচিকার মতো, পিপাসায় কাতর ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন সে সেটার কাছে উপস্থিত হয়, তখন দেখে সেটা কিছুই নয়। আর সে সেখানে আল্লাহকে পায়; অতঃপর তিনি তাকে তার হিসাব পূর্ণমাত্রায় দেন। আর আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’ (সুরা নুর, আয়াত ৩৯)এই আয়াতে কাফেরের আমলের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে । কল্পনা করুন, দুনিয়ায় একজন অনেক আমল করেছে, হয়তো মানুষের প্রশংসাও পেয়েছে, নিজের আমল নিয়ে তার গর্বও হতো, আর সে ভাবত—মৃত্যুর পর অবশ্যই সে এসব আমলের প্রতিদান পাবে।কিন্তু কেয়ামতের দিন পুনরুত্থানের পর সে দেখল—যেসব আমলের ওপর সে ভরসা করেছিল, তা তার কোনো কাজে আসছে না। তখন তার অবস্থা সেই তৃষ্ণার্ত মানুষের মতোই হবে, যে মরুভূমিতে পানির আশায় ছুটে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সেখানে কিছুই পেল না।নবীজি (সা.) যেভাবে উপমা ব্যবহার করতেনপার্থক্য হলো, মরীচিকার পেছনে ছুটে যাওয়া মানুষটি দুনিয়াতেই তার ভুল বুঝতে পারে; কিন্তু কাফের তার আমলের প্রকৃত পরিণতি এমন সময় বুঝবে, যখন আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না।পবিত্র কোরআনের এই উপমা আমাদের সতর্ক করে দেয়—ইমানহীন আমল যত বড়ই মনে হোক, আখিরাতে তা মরীচিকার মতো ‘নাই’ হয়ে যাবে।১১. সমুদ্রের অন্ধকার দিয়ে কুফরের উপমা আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অথবা (ওদের আমলের উপমা) গভীর সমুদ্রতলের অন্ধকার সদৃশ, তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ যাকে আচ্ছন্ন করে, যার ঊর্ধ্বদেশে ঘন মেঘ, এক অন্ধকারের ওপর আরেক অন্ধকার, কেউ নিজ হাত বার করলে তা প্রায় দেখতেই পায় না। আর আল্লাহ যাকে আলো দান করেন না, তার জন্য কোনো আলো নেই।’ (সুরা নুর, আয়াত ৪০)সত্যকে অস্বীকার করার অন্ধকার, ভ্রষ্টতা ও শিরকি বিশ্বাসের অন্ধকার; এর সঙ্গে আছে নিজের প্রতিপালক ও পরকালের শাস্তি সম্পর্কে অজ্ঞতার অন্ধকার।আগের উপমায় কাফেরদের আমলের পরিণতি বোঝানো হয়েছিল; আর এই উপমায় দেখানো হয়েছে তাদের কুফরের অন্ধকারময় জীবন। একজন কাফের যেন সারা জীবন একের পর এক অন্ধকারের মধ্যে ডুবে থাকে।কুফর ও অবিশ্বাসের অন্ধকার, সত্যকে অস্বীকার করার অন্ধকার, ভ্রষ্টতা ও শিরকি বিশ্বাসের অন্ধকার; এর সঙ্গে আছে নিজের প্রতিপালক ও পরকালের শাস্তি সম্পর্কে অজ্ঞতার অন্ধকার। একের পর এক এসব অন্ধকার তাকে এমনভাবে ঘিরে ধরে যে তার সামনে হেদায়েতের পথ থাকলেও সে তা দেখতে পায় না।যেমন গভীর অন্ধকারে মানুষ নিজের হাত সামনে মেলে ধরেও তা দেখতে পায় না, তেমনই কুফরের অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষ সত্য একেবারে সামনে থাকার পরও তা চিনতে পারে না।মওলবি আশরাফ: আলেম, লেখক ও অনুবাদকmawlawiashraf@gmail.comরাসুল (সা.)–এর দেওয়া সর্বশেষ নবীর উপমা