রাত তখন গভীর। ইউক্রেনের ছোট্ট শহর প্রিপিয়াতের বেশির ভাগ মানুষ ঘুমিয়ে। শহরটি তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি আধুনিক, পরিকল্পিত শহর; স্কুল, হাসপাতাল, দোকান ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করা হাজারো মানুষের ব্যস্ততায় গড়ে ওঠা। শহরের বাইরে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অবশ্য তখনো কাজ চলছে। ৪ নম্বর রিঅ্যাক্টরে একটি পরীক্ষা চলছিল। কেউ তখনো জানত না, কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে এমন একটি বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে, যার তেজস্ক্রিয় ছাপ শুধু একটি শহর বা একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বাতাসের সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়বে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে।
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলের সেই রাত শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে। চেরনোবিল দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টর ধ্বংস হয়, বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে লাখো মানুষের জীবন বদলে যায়। জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির মূল্যায়নে, দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৩০ শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে এবং ১০০–এর বেশি মানুষ বিকিরণজনিত আঘাত পান।
কিন্তু সেই রাতের গল্প শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউক্রেনে, প্রিপিয়াত শহরের কাছে। কেন্দ্রটিতে আরবিএমকে–১০০০ ধরনের রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হতো। ৪ নম্বর ইউনিটটি ১৯৮৩ সালে চালু হয়। ১৯৮৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সেখানে একটি পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বাইরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে টারবাইন ঘুরতে থাকা অবস্থায় তার জড়তা থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ কিছু সময়ের জন্য জরুরি পাম্প ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালাতে পারবে কি না, সেটি পরীক্ষা করা। পরীক্ষাটি নিজে অস্বাভাবিক কোনো বিষয় ছিল না। সমস্যা তৈরি হয় পরীক্ষাটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং রিঅ্যাক্টরের কিছু নকশাগত দুর্বলতার কারণে। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, দুর্ঘটনাটিকে শুধু অপারেটরদের ভুল বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। আইএইএর পরবর্তী আইএনএসএজি–৭ বিশ্লেষণে রিঅ্যাক্টরের নকশাগত ত্রুটি, বিশেষ করে উচ্চ পজিটিভ ভয়েড কোএফিশিয়েন্ট ও কন্ট্রোল রডের নকশার সমস্যা, দুর্ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে বাষ্পের পরিমাণ বাড়লে শক্তি কমার বদলে আরও বাড়তে পারত।
২৫ এপ্রিল রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ধীরে কমিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ গ্রিডের চাহিদার কারণে পরীক্ষাটি কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে যায়। ফলে অপারেটরদের একটি দল অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর পরীক্ষাটি চালানোর প্রস্তুতি নেয়। এ সময় রিঅ্যাক্টরের অবস্থা আগের পরিকল্পনার তুলনায় জটিল হয়ে ওঠে। রিঅ্যাক্টরের শক্তি কমিয়ে একটি নিম্ন পর্যায়ে আনা হলে সেটি প্রত্যাশার মতো স্থিতিশীল থাকেনি। রিঅ্যাক্টরের ভেতরে জেনন পয়জনিংয়ের মতো প্রক্রিয়াও শক্তি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। শক্তি ধরে রাখতে অপারেটররা অনেক কন্ট্রোল রড বের করে আনেন। এর ফলে রিঅ্যাক্টরের নিরাপদ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেটিং রিঅ্যাকটিভিটি মার্জিন বা ওআরএম খুব কমে যায়। পরবর্তী তদন্তে দেখা যায়, এই সীমা ও এর গুরুত্ব অপারেটরদের কাছে যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না এবং সেই সময়কার নকশা ও নির্দেশনায়ও গুরুতর দুর্বলতা ছিল।
তারপর আসে সেই কয়েক সেকেন্ড, যা ইতিহাস বদলে দেয়। ২৬ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা ২৩ মিনিটের দিকে পরীক্ষা শুরু হয়। টারবাইনের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমতে থাকায় পানির প্রবাহ ও রিঅ্যাক্টরের ভেতরের পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। আরবিএমকে রিঅ্যাক্টরের একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য তখন সামনে আসে, বাষ্পের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে রিঅ্যাক্টরের রিঅ্যাকটিভিটি বাড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করে। অপারেটররা জরুরি শাটডাউন ব্যবস্থা চালু করেন। কিন্তু এখানেও রিঅ্যাক্টরের নকশাগত একটি গুরুতর দুর্বলতা বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। কন্ট্রোল রডের নকশায় এমন গ্রাফাইট ডিসপ্লেসার ছিল, যার কারণে রড প্রবেশের শুরুর মুহূর্তে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিঅ্যাকটিভিটি কমার বদলে সাময়িকভাবে বাড়তে পারত। আইএইএর পরবর্তী বিশ্লেষণ এই নকশাগত ত্রুটিকে দুর্ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
রিঅ্যাক্টরের শক্তি অত্যন্ত দ্রুত বেড়ে যায়। একটি বিশাল বাষ্প বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আরেকটি বিস্ফোরণ বা শক্তিশালী ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটে বলে তদন্তে বিবেচনা করা হয়। রিঅ্যাক্টরের ছাদ ও কাঠামো ভেঙে যায়। ৪ নম্বর ইউনিট কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। রিঅ্যাক্টরের ভেতরের জ্বলন্ত গ্রাফাইট ও অন্যান্য পদার্থ থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আকাশে উঠে যেতে থাকে তেজস্ক্রিয় ধোঁয়া ও কণা। কিন্তু তখন সেখানে থাকা অনেক মানুষ জানতেনই না যে তাঁরা কতটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। আগুন নেভাতে প্রথম যে মানুষগুলো ছুটে যান, তাঁদের অনেকেই ছিলেন অগ্নিনির্বাপণকর্মী। তাঁদের কাজ ছিল আগুন নিয়ন্ত্রণ করা। তাঁরা পারমাণবিক দুর্ঘটনার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না এবং তখনো বিকিরণের মাত্রা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা ছিল না। তাঁদের কেউ রিঅ্যাক্টরের ধ্বংসস্তূপের খুব কাছে চলে যান। উচ্চ মাত্রার বিকিরণের কারণে অনেকের শরীরে দ্রুত রেডিয়েশন সিকনেসের লক্ষণ দেখা দেয়। চেরনোবিলের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তাঁদের কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগুন আরও ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় সাইটে থাকা প্রায় ৬০০ কর্মীর মধ্যে ১৩৪ জন উচ্চ মাত্রার বিকিরণে তীব্র রেডিয়েশন সিকনেসে আক্রান্ত হন। তাঁদের মধ্যে ২৮ জন প্রথম তিন মাসে মারা যান।
এদিকে প্রিপিয়াত শহরে তখনো স্বাভাবিক জীবনের মতোই রাত কাটছিল। ২৬ এপ্রিল সকালে মানুষ জানালা দিয়ে ধোঁয়া দেখতে পায়। কিন্তু শহরের সবাই বুঝতে পারেনি আসলে কী ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ মানুষকে ঘরে থাকতে এবং দরজা–জানালা বন্ধ রাখতে বলে। স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু পূর্ণ মাত্রায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তখনো নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি বুঝতে সময় লাগছিল। বিকিরণ মাপার যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ছিল, দুর্ঘটনার প্রকৃত মাত্রা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল এবং সোভিয়েত প্রশাসনের মধ্যে তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতাও ছিল।

পরবর্তী জাতিসংঘের পারমাণবিক বিকিরণবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কমিটির নথি অনুযায়ী, ২৬ এপ্রিল রাত থেকে প্রিপিয়াতে রেডিয়েশন লেভেল দ্রুত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২৭ এপ্রিল দুপুরে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং বেলা দুইটার দিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। প্রায় ১ হাজার ২০০টি বাস ব্যবহার করা হয়। প্রিপিয়াতের মানুষদের বলা হয়েছিল, তারা কয়েক দিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। অনেকে তাই সঙ্গে খুব অল্প জিনিস নিয়েছিল।
সেই কয়েক দিন আর কখনো শেষ হয়নি। প্রিপিয়াত থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরও বিপদ শেষ হয়নি। আশপাশের আরও অনেক এলাকা খালি করা হয়। ১৯৮৬ সালে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষকে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় আরও প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়। অর্থাৎ বলা যায়, একটি রাত শুধু একটি শহরকে খালি করেনি; বরং মানুষের বাড়ি, জমি, চাকরি, প্রতিবেশী, পরিচিত পরিবেশ—সবকিছু থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। আর তখনো বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ জানত না, আসলে কী ঘটেছে।
চেরনোবিল দুর্ঘটনার তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসের সঙ্গে ইউক্রেনের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বেলারুশ, রাশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ শনাক্ত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বিশ্বের অন্য দেশগুলো নিজেদের রেডিয়েশন মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে অস্বাভাবিক মাত্রা শনাক্ত করতে শুরু করে। তখন দুর্ঘটনাটি আর গোপন রাখা সম্ভব ছিল না। সুইডেনে অস্বাভাবিক রেডিওঅ্যাকটিভিটি শনাক্ত হওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক মনোযোগ সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যায়, কোনো পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ পরে দুর্ঘটনার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে।
এখানে চেরনোবিলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। সেটা হলো, তথ্য গোপন করার সংস্কৃতি। দুর্ঘটনার প্রকৃত মাত্রা বুঝতে ও দ্রুত জনগণকে সতর্ক করতে সময় লেগেছিল। পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৎকালীন সোভিয়েত ব্যবস্থায় নিরাপত্তা, তথ্য আদান–প্রদান ও কর্তৃপক্ষের কাছে সমস্যার কথা প্রকাশ করার সংস্কৃতিতে গুরুতর দুর্বলতা ছিল। চেরনোবিলের পর ‘সেফটি কালচার’ ধারণাটি পারমাণবিক নিরাপত্তা আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে চেরনোবিলের গল্প শুধু ব্যর্থতার গল্প নয়। বিপর্যয়ের পর কয়েক লাখ মানুষ উদ্ধার ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত হন। তাঁদের বলা হয় লিকুয়িডেটর। সেনাবাহিনীর সদস্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী, অগ্নিনির্বাপণকর্মী, পুলিশ, প্রকৌশলী, নির্মাণকর্মী বিভিন্ন পেশার মানুষ এই বিশাল অভিযানে অংশ নেন। তাঁদের কাজ ছিল তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা, দূষিত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা, মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং ধ্বংস হওয়া রিঅ্যাক্টরের ওপর একটি অস্থায়ী সুরক্ষার কাঠামো তৈরি করা। এই মানুষদের অনেকেই জানতেন যে তাঁরা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। তবু তাঁদের কাজ করতে হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোয় তাঁদের অনেকের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়।
তবে চেরনোবিল নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, দুর্ঘটনার পর বহু মানুষকে বিকিরণের কারণে মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি মৃত্যুর মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান রয়েছে। বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সরাসরি প্রমাণিত মৃত্যু ও ভবিষ্যতে সম্ভাব্য রেডিয়েশন–ইনডাসড ক্যানসারের মধ্যে পার্থক্য করে। চেরনোবিলের স্বাস্থ্যগত প্রভাবের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণগুলোর একটি হলো থাইরয়েড ক্যানসার। বিশেষ করে দুর্ঘটনার সময় শিশু ও কিশোরদের মধ্যে রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন গ্রহণের কারণে ঝুঁকি বেড়ে যায়। দূষিত দুধ ও খাবারের মাধ্যমে আয়োডিন–১৩১ শরীরে প্রবেশ করতে পারত এবং থাইরয়েড গ্রন্থিতে জমা হতো।
আয়োডিন–১৩১–এর অর্ধেক জীবন মাত্র আট দিন হলেও দুর্ঘটনার প্রথম সময়ে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০০৬ সালের ডব্লিউএইচও মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের দুর্ঘটনার সময় শিশু–কিশোরদের মধ্যে পরবর্তী বছরগুলোয় হাজার থাইরয়েড ক্যানসারের ঘটনা শনাক্ত হয়। তবে সব স্বাস্থ্যের সমস্যাকে সরাসরি বিকিরণের কারণে হয়েছে বলা যায় না। ডব্লিউএইচও ও ইউএনএসসিইএআর উভয়েই মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, স্থানান্তর, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার মতো বিষয়কে চেরনোবিলের বড় মানবিক প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
পরিবেশের ওপরও এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন, সিজিয়াম–১৩৪ ও সিজিয়াম–১৩৭ সহ বিভিন্ন রেডিওনিউক্লাইড ছড়িয়ে পড়ে। বাতাস ও বৃষ্টির মাধ্যমে দূষণ একেক এলাকায় একেক মাত্রায় জমা হয়। কৃষিজমি, বন, নদী ও বসতিপূর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সব জায়গায় একই মাত্রার বিকিরণ ছিল না। দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকায় প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি, আর দূরের অনেক ইউরোপীয় দেশে গড় রেডিয়েশন ডোজ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সময়ের সঙ্গে কিছু রেডিওনিউক্লাইড ক্ষয় হয়ে গেছে, কিছু দূষণ প্রাকৃতিকভাবে কমেছে। কিন্তু সিজিয়াম–১৩৭–এর মতো দীর্ঘ অর্ধ জীবন পদার্থের কারণে কিছু এলাকায় দূষণ দীর্ঘদিন ধরে থেকে গেছে। ফলে চেরনোবিলের প্রভাব শুধু ১৯৮৬ সালের একটি ঘটনা নয়, এটি বহু দশকের একটি বাস্তবতা।
দুর্ঘটনার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত রিঅ্যাক্টরকে ঘিরে তৈরি করা হয় একটি বিশাল সারকোফ্যাগাস, যার উদ্দেশ্য ছিল ধ্বংসাবশেষ ও তেজস্ক্রিয় পদার্থকে আরও ছড়িয়ে পড়া থেকে নিয়ন্ত্রণ করা। পরে পুরোনো কাঠামোর ওপর আরও বড় ও আধুনিক নতুন নিরাপদ আবরণ কাঠামো নির্মাণ করা হয়। চেরনোবিলকে নিরাপদ অবস্থায় নিয়ে আসার কাজ তাই দুর্ঘটনার পরপরই শেষ হয়ে যায়নি; এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকৌশল ও পরিবেশগত প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। আজ প্রিপিয়াতের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও অদ্ভুত মনে হয়। একসময় যে শহরে শিশুরা স্কুলে যেত, পরিবারগুলো সন্ধ্যায় হাঁটত, দোকানপাট খোলা থাকত, সেই শহর এখন পরিত্যক্ত। ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে, মানুষের স্বাভাবিক জীবন নেই। কোথাও পুরোনো স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, কোথাও ভাঙা অ্যাপার্টমেন্ট, কোথাও পড়ে থাকা আসবাব—সবকিছু যেন একটি থেমে যাওয়া জীবনের চিহ্ন হয়ে আছে।
চেরনোবিলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই যে, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনা শুধু একটি যন্ত্রের ব্যর্থতা নয়। এর পেছনে থাকতে পারে নকশার দুর্বলতা, ভুল সিদ্ধান্ত, অসম্পূর্ণ নির্দেশনা, নিরাপত্তার প্রতি অবহেলা, তথ্য গোপন করার সংস্কৃতি ও মানুষের ভুল। চেরনোবিলের পর আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় এসব বিষয়কে নতুনভাবে দেখা হয়। আইএইএর পরবর্তী বিশ্লেষণও দেখিয়েছে, দুর্ঘটনার জন্য শুধু অপারেটরদের দোষ দেওয়া যথেষ্ট নয়, রিঅ্যাক্টরের নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটিও কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিল।
২৬ এপ্রিল ১৯৮৬–এর সেই রাতের কথা ভাবলে তাই শুধু একটি বিস্ফোরণের কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে প্রিপিয়াতের সেই পরিবারগুলোর কথা, যারা কয়েক ঘণ্টার নোটিশে ঘর ছেড়েছিল। মনে পড়ে সেই অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের কথা, যাঁরা বিপদের প্রকৃত মাত্রা না জেনেই আগুনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। মনে পড়ে হাজার উদ্ধারকর্মীর কথা, যাঁরা পরবর্তী মাস ও বছরগুলোয় দূষিত এলাকায় কাজ করেছেন। আর মনে পড়ে সেই ব্যবস্থার কথা, যেখানে সত্য প্রকাশ করতে দেরি হওয়াও একটি বিপর্যয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। চেরনোবিল হয়তো আমাদের কাছে এখন ইতিহাস। কিন্তু সেই ইতিহাসের ভেতরে আজও একটি সতর্কবার্তা আছে। পারমাণবিক শক্তি মানুষের জন্য বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই শক্তির সঙ্গে ভুলের সুযোগ খুব কম। একটি ছোট ভুল, একটি দুর্বল নকশা, একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা সত্য গোপন করার সংস্কৃতি—সবকিছু একসঙ্গে মিলে কখনো এমন একটি রাত তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব শেষ হতে কয়েক দশক লেগে যায়।
চেরনোবিলের রাত তাই শুধু একটি রিঅ্যাক্টরের ধ্বংসের গল্প নয়। এটি মানুষের প্রযুক্তির ওপর আস্থা, সেই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও ভুল থেকে শেখার প্রয়োজনের গল্প। যে শহরটি এক রাতে তার মানুষ হারিয়েছিল, সেটি আজও দাঁড়িয়ে আছে নীরবে। আর সেই নীরব শহর যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাগুলো অনেক সময় শুধু আমাদের কী ঘটেছিল তা শেখায় না, ভবিষ্যতে কীভাবে একই ভুল না করতে হয়, সেটাও শেখায়।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র সংসদ নেতৃবৃন্দ ডাকসুর ঐতিহ্য ও নির্দলীয় চরিত্র বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ডাকসু সদস্যরা কখনো পুলিশের ভূমিকা নিয়েছেন, কখনো ডাকসুকে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা প্রচারে ব্যবহার করেছেন, আবার কখনোবা শিক্ষকদের সঙ্গে দারুণ হঠকারী ব্যবহার করেছেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ডাকসু নানা সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছে, দলীয় লেজুড়বৃত্তিও হয়েছে, তবে বিভিন্ন সময় ঐতিহ্যগতভাবে নির্দলীয় মনোভাব ধরে রেখে দায়িত্ব পালন করারও বড় নজির রয়েছে। ডাকসু বাংলাদেশের একাধিক ক্রান্তিলগ্নে সব দলের ছাত্রনেতাদের একত্র করে বড় ভূমিকাও রাখতে পেরেছে। বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হওয়ায় নানা সময় ডাকসুর নির্দলীয় মনোভাব ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল। তবে এবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রায় পুরোটা শিবির–সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত হওয়ায় এখানে একদলীয় ক্ষমতার প্রভাব দেখা গেছে, যেখান থেকে তৈরি হয়েছে আদর্শিক বিভেদ।ডাকসু সংগ্রহশালা: ছবি বদলে কি ইতিহাস বদলানো যায়শিক্ষক হেনস্তাঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময় বিভিন্ন মত ও ধারার শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকদের মধ্যে কে ধার্মিক, কে নাস্তিক, কে কমিউনিস্ট—এসব নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে মুখরোচক আলোচনা হতো, কিন্তু কোনো বিরূপতা ছিল না। দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির কারণে যদিও শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন নিয়ে নানা সময় বিতর্ক ও সমালোচনা দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হেনস্তার ঘটনার কথাও খুব একটা শোনা যায় না। তবে এবার ডাকসু নেতাদের হাতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে হেনস্তার ঘটনা আলোচিত হয়। যদিও এ শিক্ষকের নামে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময় নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে; কিন্তু এভাবে হেনস্তার বিষয়টি কোনোভাবে কাম্য ছিল না। চাকসুতেও এ ধরনের শিক্ষক হেনস্তা ঘটে।লেজুড়বৃত্তির কারণে আমাদের দেশে শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—সব রাজনীতিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি সব সময় ছিল; আগেও শিক্ষার্থীরা রাজনীতি করতেন এবং শিক্ষকেরাও। তবে শিক্ষার্থী-শিক্ষক যাঁর যাঁর রাজনীতির পরিসর ছিল ভিন্ন। অনেকের মধ্যেই মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকলেও একটা সমীহ ছিল। শিক্ষকেরা কোথায় কী বিবৃতি দিয়েছেন, কার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছেন, কী বলেছেন, কী লিখেছেন—এই নিয়ে শিক্ষার্থীদের কারও কারও হয়তো অসন্তোষ ছিল; কিন্তু শিক্ষার্থীরা কখনো শিক্ষকদের সঙ্গে সংঘাত জড়াতেন না। বিগত দেড় দশকের রাজনীতি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি এখানে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সেখানে ডাকসুর বিতর্কিত ভূমিকাও আমাদের দেখতে হলো।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনশিক্ষক মূল্যায়নডাকসু এখন ওয়েবসাইট বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করছে তাদের নিজেদের তৈরি প্রশ্নমালায়। কেউ বলেছেন, এটা শিক্ষক হেনস্তার অংশ। কেউ বলেছেন, শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য কোণঠাসা করার উদ্যোগ। আবার কেউ এতে দেখেছেন অপরিপক্ব সরল প্রয়াস।তাদের এই উদ্যোগ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনকানুনবিরোধী, সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকেরা এর মধ্যে উচ্চ স্বরে প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেছেন, ‘শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার একটা বিশাল সুযোগ এখানে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।’শিক্ষার্থীরা কীভাবে শিক্ষকদের শিক্ষাদানকে মূল্যায়ন করবেন, তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। সেই মূল্যায়ন অবশ্যই হতে হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দুই পক্ষেরই গোপনীয়তা বজায় রেখে।শিক্ষক মূল্যায়ন কেন ডাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত কাজবিদেশে আমার শিক্ষকতাজীবনেও আমার পড়ানো নিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতামত দিয়েছেন বিভাগীয় পদ্ধতির মাধ্যমে। সেমিস্টার শেষে একটা কোর্সের শেষ ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নমালা বিতরণ করা হতো এবং তাঁদের উত্তর একটা খামে সিল করে চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। বিভাগীয় তত্ত্বাবধানে গোপনীয়তা বজায় রেখে সেগুলো পর্যালোচনা করে শিক্ষককে তার সারসংক্ষেপ জানানো হতো। এখানে ছাত্র সংসদ বা স্টুডেন্ট বডির কোনো ভূমিকা নেই।পুরো উদ্দেশ্যটা হলো, কীভাবে একটা কোর্সের শিক্ষাদান হয়েছে, পর্যালোচনা করা এবং কীভাবে এটাকে আরও ভালো করা যায়।অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পেয়ে আমি দারুণ তৃপ্তি পেয়েছি; আবার অনেক সময় নিরাশ হয়েছি—মনে হয়েছে, কোর্সটা অন্যভাবে পড়ানো যেত কিংবা পরীক্ষাগুলো অন্যভাবে নেওয়া যেত! এ ধরনের মূল্যায়ন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয় পক্ষকে উপকৃত করে এবং শিক্ষকদের ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে।আশা করব, ডাকসু নেতৃবৃন্দ তাঁদের ভুলটা বুঝবেন এবং স্বীকার করে নেবেন যে শিক্ষক মূল্যায়নের সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।গত ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ওয়েবসাইট চালু করে বর্তমান ডাকসু। ডাকসুর সংগ্রহশালাএবারের ডাকসুর সবচেয়ে বিতর্কিত কার্যক্রম হলো ডাকসুর সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে আলোকিত করে রাখা এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনা করা। ইতিহাস বিকৃতি থেকে বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই বের হয়ে আসতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যাঁরা এখনো ইতিহাস নিয়ে লেখাপড়া করছেন; তাঁদের কে অধিকার দিল ডাকসুতে বিকৃত ইতিহাস সাজাতে?এখানে যুক্ত করা হয়েছে শেখ মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামালের বিয়ের ছবিও। ডাকসুর সংগ্রহশালায় সেই পারিবারিক ছবি সংগ্রহে রাখার উদ্দেশ্য কী? একজন সাংবাদিক ডাকসুর সংগ্রহশালার সমন্বয়কারীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেখ মুজিবের ৭ মার্চ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো ছবি কেন রাখা হয়নি? তাঁর উত্তর ছিল, ‘ইচ্ছে হয়নি, তাই।’ প্রশ্ন উঠতে পারে, তাঁর ইচ্ছামতেই কি বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হবে?ডাকসু নেতৃবৃন্দের জিন্নাহপ্রীতি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেনে নেননি, তাঁরা ডাকসু সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর করেন এবং একই স্থানে গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি টাঙিয়েছেন। কাউকে জুতাপেটার ছবি টাঙানোও ভালো সংস্কৃতি নয়। পুরা ব্যাপারটা সম্ভবত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের অনেক গৌরবময় ইতিহাস আছে এবং সেগুলোর অনেক গৌরবময় স্মৃতি ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেছে। সেই পাতাগুলো ওলটালে বর্তমান ডাকসুর নেতৃবৃন্দ এই সংগ্রশালাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারতেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের অনেক গৌরবময় ইতিহাস আছে এবং সেগুলোর অনেক গৌরবময় স্মৃতি ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেছে। সেই পাতাগুলো ওলটালে বর্তমান ডাকসুর নেতৃবৃন্দ এই সংগ্রশালাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারতেন।১৯৬৯ সালে ভিপি তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে ডাকসু তৈরি করেছিল সর্বদলীয় ছাত্র পরিষদ, যেখানে এনএসএফ এবং ইসলামী ছাত্র সংঘের মতো ছাত্রসংগঠনও ছিল আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে। ১৯৭১ সালে ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব দীপ্ত হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে প্রথম উত্তোলন করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।১৯৯০ সালে এরশাদের একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তৎকালীন ডাকসু ভিপি আমানুল্লাহ আমানের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শুরু করেছিল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। শেখ হাসিনাকে শাসনক্ষমতা থেকে সরানোর প্রথম বীজ বপন করেছিলেন নুরুল হক নুর—২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে—এ আন্দোলনের পর তিনি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন।এগুলো সবই ডাকসুর উজ্জ্বল স্মরণীয় ইতিহাস এবং তখনকার সময় ডাকসু কীভাবে সব শিক্ষার্থীর ঐক্যের প্রতীক ছিল, তার নিদর্শন। সেই তুলনায় ২০২৫-২৬ সালের ডাকসু ইতিহাসে নাম লেখাচ্ছে শিক্ষক হেনস্তা, শিক্ষক মূল্যায়ন, জিন্নাহপ্রীতি এবং জামায়াতের রাজনীতির প্রচারণা—এসব বিতর্কিত পদক্ষেপ দিয়ে। ডাকসুর ঐতিহ্যকে এভাবে পদায়ন করা খুবই দুঃখজনক। এখনো হয়তো কিছু সময় আছে, বর্তমান ডাকসু নেতৃবৃন্দ কিছু কার্যক্রম নিতে পারেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের দলমত সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করবে।সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ই-মেইল: salehpublic711@gmail.comমতামত লেখকের নিজস্ব
প্রচণ্ড গরমে ঘেমে-নেয়ে যখন আপনি এসির রিমোট খুঁজছেন কিংবা ফ্যানের রেগুলেটর ফুল স্পিডে ঘুরিয়ে দিয়েও শান্তি পাচ্ছেন না, ঠিক তখন ইউরোপীয় জলবায়ু সংস্থা কোপার্নিকাস শোনাল এক ভয়ংকর খবর। সদ্য বিদায় নেওয়া অগাস্ট মাসটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে উত্তপ্ত মাস! চারপাশের এই হাঁসফাঁস করা গরম কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। মানুষের তৈরি করা জলবায়ু পরিবর্তন ও শক্তিশালী এল নিনোর যৌথ হামলায় আমাদের এই চিরচেনা নীল গ্রহটি এখন রীতিমতো একটি ফুটন্ত কড়াইতে পরিণত হয়েছে।কোপার্নিকাসের তথ্যমতে, গত মাসে পুরো বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৬.৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৈশ্বিক গড়ের হিসাবটি সারা পৃথিবীর দিন-রাত এবং মেরু অঞ্চলের বরফশীতল তাপমাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে করা হয় বলে সংখ্যাটি আপনার কাছে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এটি রীতিমতো একটি সাইরেন! এই তাপমাত্রা গত বছরের জুলাই মাসের রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রার একেবারে সমান।পৃথিবীর প্রভাবে গরম হয়ে উঠছে চাঁদের একপাশ!মানুষের তৈরি করা জলবায়ু পরিবর্তন ও শক্তিশালী এল নিনোর যৌথ হামলায় আমাদের এই চিরচেনা নীল গ্রহটি এখন রীতিমতো একটি ফুটন্ত কড়াইতে পরিণত হয়েছে।বিজ্ঞানীদের বিরক্তি ও আমাদের নির্বিকার দশারাস্তায় বের হলে যখন রোদের তাপে পিঠ পুড়ে যায়, তখন আমরা অনেকেই বেশ অবাক হয়ে বলি, ‘আরে! এত গরম কেন আজ?’ কিন্তু টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ডেসলার এই অবাক হওয়া ব্যাপারটিতে বেশ বিরক্ত। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা, এই গ্রহের তাপমাত্রা যে লাগামহীনভাবে বাড়বে, তা বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক আগেই একেবারে নিখুঁতভাবে বলে দিয়েছিলেন। তাই এখন আকাশ থেকে পড়ার কোনো মানেই হয় না! ডেসলার বেশ চমৎকার একটি উপমা টেনেছেন। তিনি বলেন, আমরা এমন এক অদ্ভুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বিশাল ট্রেন আমাদের পিষে ফেলার জন্য ছুটে আসছে। আর আমরা ট্রেনটি থামানোর কোনো চেষ্টা না করে, ঠিক রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে বোকার মতো সেটির দিকে তাকিয়ে আছি!২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে একটি বিপদসীমা ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল—পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে কোনোভাবেই ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে দেওয়া যাবে না। কিন্তু বিদায়ী আগস্ট মাস সেই সীমানাকে রীতিমতো বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১.৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ ছিল। কোপার্নিকাস-এর তথ্য বলছে, গত বছরের জুলাই মাস থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত টানা আটটি মাস আগের সব গরমের রেকর্ড তছনছ করে দিয়েছে।পৃথিবী কেন গরমবিশ্বজুড়ে এবারের গ্রীষ্মকাল এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, গত প্রায় ৯০ বছর ধরে টিকে থাকা অনেক দেশের পুরোনো সব তাপপ্রবাহের রেকর্ড এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।গলে যাওয়া রাস্তা আর ফুটন্ত মহাসাগরজলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একসময় মানুষের ধারণা ছিল, এটি হয়তো অনেক দূরের কোনো ব্যাপার। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে বা দূরবর্তী কোনো দ্বীপ ডুবে যাচ্ছে; এমন খবরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুব একটা যায়-আসত না। কিন্তু কোপার্নিকাসের জলবায়ু প্রধান সামান্থা বার্জেস জানাচ্ছেন, ‘সেই দিন আর নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা এখন সরাসরি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এসে পড়েছে। তীব্র দাবদাহের কারণে স্কুল বন্ধ করে দিতে হচ্ছে, হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীতে হাসপাতালগুলো উপচে পড়ছে, পিচঢালা রাস্তা গরমে গলে যাচ্ছে, এমনকি রেললাইনও অতিরিক্ত তাপে বেঁকে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।’শুধু ডাঙাতেই নয়, পানির নিচেও চলছে আরেক তাণ্ডব। গত ২২ অগাস্ট ছিল বিশ্বের সমুদ্রগুলোর ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তপ্ত দিন! বিশ্বজুড়ে এবারের গ্রীষ্মকাল এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, গত প্রায় ৯০ বছর ধরে টিকে থাকা অনেক দেশের পুরোনো সব তাপপ্রবাহের রেকর্ড এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।সূর্যের কারণে পৃথিবী গরম, মহাকাশ কেন শীতলবিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রায় বড়জোর শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ যোগ করে। বাকি পুরো বিশাল উত্তাপের দায়ভার শতভাগ আমাদের অর্থাৎ মানুষের।অপরাধী কি কেবলই এল নিনোঅনেকেই গরমের সব দায়ভার এল নিনোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বেশ তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশের এই প্রাকৃতিক ও সাময়িক উষ্ণতা অবশ্যই আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন আসল সত্যটা ভিন্ন। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক অটো বেশ কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, এল নিনো হয়তো গরমের আগুনে একটু ঘি ঢেলেছে, কিন্তু আসল আগুনটা জ্বালিয়েছে আমাদের নিজেদের পোড়ানো জীবাশ্ম জ্বালানি। কয়লা, তেল আর গ্যাসের এই লাগামহীন ব্যবহার বন্ধ না করা পর্যন্ত এমন হাড়কাঁপানো গরমের রেকর্ড ভাঙার খেলা চলতেই থাকবে।বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রায় বড়জোর শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ যোগ করে। বাকি পুরো বিশাল উত্তাপের দায়ভার শতভাগ আমাদের অর্থাৎ মানুষের।এল নিনো কী?ফ্রেডেরিক অটো বেশ কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, এল নিনো হয়তো গরমের আগুনে একটু ঘি ঢেলেছে, কিন্তু আসল আগুনটা জ্বালিয়েছে আমাদের নিজেদের পোড়ানো জীবাশ্ম জ্বালানি।সামনে অপেক্ষা করছে আরও অন্ধকার দিনআপনি যদি ভাবেন ২০২৬ সালের এই গরমই সবচেয়ে ভয়ংকর, তবে আপনার জন্য আরও বড় দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। বার্কলে আর্থ-এর জলবায়ু বিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার সতর্ক করে জানিয়েছেন, খুব সম্ভবত ২০২৬ সাল গতবারের রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে চলেছে। আর ২০২৭ সাল এই দুই বছরকেই টপকে যাবে! সে বছর বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিয়েল পুরো পরিস্থিতিকে মানুষের ‘জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি আসক্তি’-এর চরম মূল্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে এই চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া শুধু লাখ লাখ মানুষের প্রাণই কাড়বে না, বরং অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে এবং চাল-ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাবে। তাই প্রকৃতির এই চরম প্রতিশোধ থেকে বাঁচতে হলে এসি ছেড়ে বসে থাকার চেয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর দিকে নজর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই!সূত্র: এনপিআর ডটকমবৃষ্টির দিনেও ভ্যাপসা গরম থাকে কেন?
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এবার পাঁচ বছরের এক শিশু মারা গেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত শিশুর নাম সিরাজুল মনিরা (৫)। সে সীতাকুণ্ড পৌরসভার আমিরাবাদ এলাকার নুরুন্নবীর মেয়ে।এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার ভাটিয়ারি ইউনিয়নের তুলাতুলি গ্রামে এক তরুণ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর ৪৮ ঘণ্টা না পেরোতেই আরেক শিশুর মৃত্যু হলো।বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিহত শিশু সিরাজুল মনিরাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আনা হয়নি। যতটুকু জানতে পেরেছেন ওই শিশুকে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার নির্ধারিত সময়ের পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে চিকিৎসক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে একদিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউতে) চিকিৎসাধীন থাকার পর শিশুটি মারা যায়।শিশুটির প্রতিবেশী মো. সেলিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বেশ কয়েক দিন ধরে তীব্র জ্বরে শিশুটি খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। অবস্থার অবনতি হতে দেখে অভিভাবকেরা তাকে গত মঙ্গলবার চিকিৎসকের কাছে নেন। সেখানে রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ওই সময়ে শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। এরপর পরিবারের লোকজন শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখানে গতকাল বুধবার তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকালে তার মৃত্যু হয়।