জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে পরকীয়া প্রেমিকের অন্য জায়গায় বিয়ের খবর পেয়ে চার বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তার বাড়িতে অবস্থান নিয়েছেন এক গৃহবধূ। খবর পেয়ে ওই বাড়িতে ছুটে এসেছেন তার স্বামীও।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে সিয়াম নামের ওই যুবক বিয়ে করতে গেলে ১০টার দিকে মামুদপুর ইউনিয়নের মিনিগাড়ি পূর্বপাড়া গ্রামে তার বাড়ির ফটকের সামনে অবস্থান নেন ওই নারী। তার দাবি, দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পর তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সিয়াম।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ওই নারী অবস্থান নেওয়ার পর সিয়ামের পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে তালা দিয়ে অন্য জায়গায় চলে যান।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টা পর্যন্ত ওই নারীকে তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়। স্থানীয় ইউপি সদস্য এমদাদুল হক হেলাল বিষয়টি সমঝোতার চেষ্টা করছেন। তবে সিয়ামকে বিয়ে ছাড়া কোনো সমাধান মানবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন ওই নারী।
ওই নারী মামুদপুর ইউনিয়নের শফিকুল ইসলামের স্ত্রী। তার দাবি, প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে শফিকুলের সঙ্গে তার সংসার চলছে। তাদের চার বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তার স্বামী একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিয়াম হিন্দা এলাকার আব্দুল লতিফের ছেলে। তিনি মিনিগাড়ি গ্রামে তার নানাবাড়িতে থাকেন। চৌমুহনী বাজারে তার একটি মুদিখানার দোকান রয়েছে।
ভুক্তভোগী নারী বলেন, ‘বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সিয়াম আমার সঙ্গে সম্পর্ক করেছে। একপর্যায়ে সে আমার ঘরেও আসা-যাওয়া করত। একদিন এক প্রতিবেশী তাকে ঘরে দেখে ফেলে। তখন সিয়াম আমাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যায়। এরপরও সে আমাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক বজায় রাখে।’
তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে জানতে পারি, সিয়াম কাপাশটিকরি গ্রামের এক তরুণীকে বিয়ে করতে গেছে। এ খবর পেয়ে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাত ১০টার দিকে তার বাড়িতে এসেছি। সিয়াম না আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাব না। আমাকে বিয়ে না করলে আমি আত্মহত্যা করব।’
ওই নারীর অভিযোগের বিষয়ে সিয়ামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ক্ষেতলাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুক্তারুল আলম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসেছি। ওই নারীর স্বামীও এখানে এসেছেন। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধান না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মো. আল-কারিয়া চৌধুরী/এসআর/জেআইএম
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
রবি ঠাকুরের কবিতার লাইনগুলো নিশ্চয়ই জানা? ‘বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু...।’পরের লাইনগুলোয় একটু পরে আসা যাবে। আগে এই লাইনগুলোর তরজমা হোক। রবার্ট লেভানডফস্কি ও ফেরান তোরেস চলে যাওয়ার পর হন্যে হয়ে স্ট্রাইকার খুঁজেছে বার্সেলোনা। পছন্দ ছিল একটাই—আতলেতিকো মাদ্রিদের হুলিয়ান আলভারেজ। সে জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চেষ্টা করেছে বার্সা। আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকারের সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার যত ইচ্ছাই থাকুক, আতলেতিকো তাঁকে ছাড়বে কেন! একে তো অমন একটা স্ট্রাইকারকে ছাড়লে তাদের লোকসান, তার ওপর লিগের প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে আলভারেজকে তুলে দেওয়ার অর্থ হলো নিজেদের পায়েই কুড়াল মারা।অতএব আলভারেজ মিশনে বহুদিন ধরে বহুভাবে চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরেছে বার্সা। মৌসুম শুরুর আগে তাই প্রশ্ন উঠেছিল কাতালান ক্লাবটির সেন্টার ফরোয়ার্ড হবেন কে? স্বয়ং বার্সার এক বোর্ড সদস্যই প্রাক্–মৌসুমে সেন্ট জর্জেস পার্কে বার্সার অনুশীলনে কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফুটিয়ে বলেছিলেন, ‘(দলে) কোনো সেন্টার ফরোয়ার্ড নেই।’কিন্তু এখন আর সেই প্রশ্নের অস্তিত্ব নেই। রসিকতা করে কেউ কেউ বলতে পারেন, বার্সার নীতিনির্ধারকদের হয়তো বিশ্বকবির ওই কবিতার পরের লাইনগুলো জানা ছিল! সে যাহোক, পরের লাইনগুলোয় ফিরে দেখা যাক—‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশিরবিন্দু।’রাফিনিয়া এখন বার্সার সেই ‘শিশিরবিন্দু’।ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে আগে রবি ঠাকুরের লাইনগুলোর সারমর্ম একটু বুঝিয়ে বলতে হয়। কবি বলছেন, প্রচুর অর্থ ও সময় খরচ করে মানুষ দূর-দূরান্তে সৌন্দর্য দেখতে ছুটে যায়, কিন্তু ঘরে কিংবা ঘরের কাছে থাকা সুন্দর রূপটি অনেক সময় অদেখাই থেকে যায়।এই রাফিনিয়াকে আগে দেখা যায়নিবার্সার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতরকার সেই ‘সৌন্দর্য’ অদেখা থাকলেও শেষ পর্যন্ত চোখ ও মস্তিস্কের রাডারে ব্যাপারটা ধরা পড়েছে। তার আগে অবশ্য ক্যাম্প ন্যুর চৌকাঠের ওপাশে দু–পা ফেলে মাদ্রিদে গিয়ে আলভারেজ নামে আর্জেন্টাইন সৌন্দর্যের সন্ধান করেছেন বার্সার নীতিনির্ধারকেরা। সেখান থেকে ব্যর্থ মনোরথে ঘরে ফিরে বার্সার টিম ম্যানেজমেন্ট যেন হঠাৎ করেই ব্রাজিলিয়ান সেই ‘শিশিরবিন্দু’ আবিষ্কার করে ফেললেন! দরকার ছিল শুধু সেই ‘শিশিরবিন্দু’র অবস্থানটা একটু পাল্টানো। কোচ হান্সি ফ্লিক সেটা করার পর ফলটা মিলছে হাতেনাতে।চলতি মৌসুমে ৫ ম্যাচ খেলেছে বার্সা। সবগুলো ম্যাচেই শুরুর একাদশের হয়ে মাঠে নামেন রাফিনিয়া। তবে একটু অন্য ভূমিকায়। উইঙ্গার হিসেবে এত দিন খেললেও চলতি মৌসুমে রাফিনিয়াকে দেখা যাচ্ছে মুক্ত ফরোয়ার্ডের ভূমিকায়। তাতে ৫ ম্যাচে পেয়েছেন ৮ গোল, অ্যাসিস্ট ১টি। কিন্তু এটা তো মাঠের ফল। বার্সার নীতিনির্ধারকদের মনেও একটা প্রভাব পড়ার কথা। আলভারেজকে তাঁরা নিশ্চয়ই ভুলে গেছেন! কিংবা এভাবেও বলা যায়, উইঙ্গার থেকে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলে রাফিনিয়া বার্সার আলভারেজ–বিরহ ভুলিয়ে ছেড়েছেন।বার্সার মাঝমাঠ থেকে পেদ্রি কিংবা ডান প্রান্ত থেকে লামিনে ইয়ামাল গোলের পাস দিতে এখন রাফিনিয়াকে খোঁজেন। ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় গোল সে কথাই বলে।বার্সার সমর্থকেরা সে জন্য তাঁদের ক্লাবকে একটা ধন্যবাদও জানাতে পারেন। সর্বশেষ বিশ্বকাপ থেকে বার্সা আলভারেজের পেছনে ছুটতে শুরু করেছিল বলেই তো এই মৌসুমে রাফিনিয়ার ভেতরকার ফরোয়ার্ড–সত্তাটা জেগে উঠল! আর সেই সত্তায় শুধু গোল এবং অ্যাসিস্ট নয়, ফুটছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সেই ছন্দময় গতি, ড্রিবলিং, স্ট্যামিনা ও ফিনিশিং দক্ষতা। চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম গোলকেই উদাহরণ হিসেবে নিতে পারেন।বক্সে দৌড়ের ওপর রাফিনিয়ার পায়ে বল। তাঁকে ঠেকাতে ডাচ ক্লাবটির দুজন ডিফেন্ডার একসঙ্গে স্লাইডিং ডাইভে সামনে চলে এলেন। তখন রাফিনিয়ার বাঁ পায়ে যেন ফুটবল কবিতার ছন্দ! আলতো স্পর্শে বলটা বাঁ দিকে যখন সরালেন, দুই ডিফেন্ডার তখন তাঁর সামনে দিয়ে স্লাইড করে যেন নেদারল্যান্ডসে চলে গেলেন! তারপর বাঁ পায়ের শটে গোল। জার্সি নম্বর ১১ হলেও কে বলবে এই রাফিনিয়া ৯ নম্বর নয়!রাফিনিয়াকে আটকাতে যাওয়া দুই ফেইনুর্ড ডিফেন্ডার স্লাইডে দূরে সরে শুধু গোল হতে দেখলেনবার্সার গোলের সমস্যা সমাধানে রাফিনিয়ার এগিয়ে আসা নতুন কিছু না। ২০২৪-২৫ মৌসুমে করেছিলেন ৩৪টি গোল ও ২৬টি অ্যাসিস্ট; যার মধ্যে লিগে অবদান ছিল ৩০ গোলে (১৮টি গোল ও ১২টি অ্যাসিস্ট)। বার্সাও জিতেছিল লা লিগা শিরোপা। আর রাফিনিয়াও উইঙ্গার পজিশন থেকে প্রথাগত ফরোয়ার্ডদের মতো বক্সে ঢুকে কিংবা তার আশপাশ থেকে গোলগুলো করেন এবং করান। সরাসরি সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে তখনো খেলা শুরু করেননি।পরের মৌসুমে চোটের কারণে মাসের পর মাস মাঠের বাইরে থাকতে হলেও তাঁর কার্যকারিতা ছিল দেখার মতো। সেবারও ২১ গোল করার পাশাপাশি ৮ অ্যাসিস্ট করে বার্সার লিগ শিরোপা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বিশ্বকাপেও চোটে পড়ায় হলুদ জার্সিতে সেই রাফিনিয়াকে দেখা যায়নি। মরক্কো ও হাইতির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে খেলেছেন। গোল পাননি। চোটে পড়েন হাইতি ম্যাচে। সুস্থ হয়ে শেষ ষোলোয় নরওয়ের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমেও গোল পাননি। ব্রাজিলও হেরে বিদায় নেয় শেষ ষোলো থেকে। এই বিশ্বকাপ চলার মাঝেই বার্সার আলভারেজের পিছু ছোটার খবর বেশি করে চাউর হয় সংবাদমাধ্যমে। রাফিনিয়ার কি তখন আঁতে ঘা লেগেছিল? কে জানে!বল হারালে প্রেস করছেন, আক্রমণে উঠছেন, সব মিলিয়ে আরও সহজ করে তুলছেন বার্সার খেলাকে। অথচ এর আগে কোনো ক্লাবেই ফরোয়ার্ড (৯ নম্বর) পজিশনে খেলেননি রাফিনিয়া।বার্সার জার্মান কোচ ফ্লিক কৌশলে দূরদর্শী মানুষ। বিশ্বকাপ শেষে এবারের মৌসুম শুরুর আগে রাফিনিয়ার পজিশন নিয়ে বার্সার অনুশীলনে বেশ কাজ করেন ফ্লিক। উইঙ্গার পজিশন থেকে তাঁকে সরিয়ে এনে মাঠের ভেতরে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। মুক্ত ফরোয়ার্ড হয়ে আক্রমণভাগ চষে বেড়ানোর ভার দেন রাফিনিয়ার কাঁধে। এতে শুধু বার্সার খেলার কৌশল বদলায়নি, আক্রমণভাগ নিয়ে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তার অবসানও হয়েছে।তবে সন্দেহও ছিল। উইং পজিশনটা সাধারণত বল নিয়ে লম্বা দৌড়ের। সামনে প্রতিপক্ষ পেলে হয় পাস দিয়ে বল ছাড়তে হয় কিংবা ড্রিবলিং করে বেরিয়ে যেতে হয়। রাফিনিয়া এত দিন সেভাবেই অভ্যস্ত ছিলেন। সেখান থেকে একদম বক্সে কিংবা তার আশপাশে সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলার কিছু ঝামেলা ছিল। জায়গাটা সংকীর্ণ, প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জটলায় খেলার জায়গাও খুব কম মেলে। বার্সার খেলার ধাঁচের সঙ্গে মিলিয়ে ওই পজিশনে সফল হতে হলে পায়ের কারুকাজ থাকা বাধ্যতামূলক। এর সঙ্গে ফিনিশ করার সহজাত ক্ষমতাও লাগে। প্রশ্ন ছিল, রাফিনিয়া কি ওই পজিশনে মানিয়ে নিতে পারবেন?২০২৬–২৭ মৌসুমের প্রথম পাঁচ ম্যাচে ৮ গোল করে রাফিনিয়া এখন উড়ছেনউত্তর মিলছে মাঠেই। কতটা মানিয়ে নিয়েছেন এ মৌসুমে গোল–পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ। আর গোল করার বাইরে সতীর্থদের নিয়ে যেভাবে খেলে যাচ্ছেন, তা হয়তো আরও বড় প্রমাণ। বার্সার মাঝমাঠ থেকে পেদ্রি কিংবা ডান প্রান্ত থেকে লামিনে ইয়ামাল গোলের পাস দিতে এখন রাফিনিয়াকে খোঁজেন। ফেইনুর্ডের বিপক্ষে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় গোল সে কথাই বলে।সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার, রাফিনিয়ার খেলা দেখে মনে হচ্ছে এটাই তাঁর চিরাচরিত পজিশন। বল হারালে প্রেস করছেন, আক্রমণে উঠছেন, সব মিলিয়ে আরও সহজ করে তুলছেন বার্সার খেলাকে। অথচ এর আগে কোনো ক্লাবেই ফরোয়ার্ড (৯ নম্বর) পজিশনে খেলেননি। আরও মজার বিষয়, ২০২২ সালে বার্সায় যোগ দেওয়ার সময় রাফিনিয়া কিন্তু বাঁ প্রান্তের উইঙ্গার ছিলেন না। ডান প্রান্তের উইঙ্গার হয়ে ক্লাবটিতে যোগ দিয়ে দেম্বেলে ও তারপর ইয়ামালের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সরে যান বাঁয়ে। ক্লাবের প্রয়োজনেই সেই রাফিনিয়া এখন ফরোয়ার্ড—ফোঁটা ফোঁটা শিশিরবিন্দুর মতো তাঁর একেকটি গোলে ব্রাজিলিয়ানের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি কি দেখছে বার্সা?উত্তর আপনার কাছে।আবারও বার্সেলোনার পাঁচ গোল, এবার উড়ে গেল ফেইনুর্ড
সন্ধ্যায় গ্রামের আখড়ায় করমা বা কারামগাছের ডাল পুঁতে পূজা দেওয়ার পরই আগের দিন ভোর থেকে না খাওয়া গ্রামের কুমারী মেয়েরা উপোস ভাঙতে পারে। এটাই করমা পূজা বা ডাল পূজার ধর্মীয় রীতি। কিন্তু সন্ধ্যার আগে থেকেই ঝুম বৃষ্টি। সঙ্গে ছিল আকাশের গর্জন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ১১টা বাজার পরও যখন বৃষ্টি থামল না, তখন বৃষ্টি মাথায় নিয়েই নেমে পড়ল উপোস থাকা কিশোরীরা। সঙ্গে গ্রামের নারীরা। বসে থাকতে পারলেন না পূজারি ও গ্রামের মোড়লও।আখড়ার ওপর ছিল কাপড়ের শামিয়ানা। কিন্তু তাতে বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা হচ্ছিল না। ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হয়ে গেল ভুঁইয়াদের করমা পূজা বা ডাল পূজা, যাকে করমা উৎসবও বলা হয়ে থাকে।গ্রামের আখড়ায় চলছে পূজাবৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভুঁইয়াদের গ্রাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের দেওপুরায় গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য। এবার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভুঁইয়াদের করমা উৎসবের বিশেষত্ব ছিল ১৫টি গ্রামের ভুঁইয়ারা মিলে আয়োজন করেছে করমা উৎসবের। বৃষ্টির মধ্যে গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা অতিথিরা। এবার বিশেষভাবে আয়োজিত উৎসবে গ্রামের যুবকদের নেতৃত্ব দেন মানিক রাই।মানিক রাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরাওঁদের কারামেল উৎসব থেকে ভুঁইয়াদের করমা একটু আলাদা। ওরাওঁদের আখড়ায় পুঁতে রাখা কারামগাছের ডালের সামনে থাকে চাঙারিতে রাখা মাটি ও বালুর মিশ্রণে বপন করা বীজ থেকে গজানো চারা। কিন্তু ভুঁইয়াদের চারার সঙ্গে থাকে পূজারির নিজ হাতে মাটি দিয়ে বানানো হাতি ও ঘোড়া। অর্থাৎ আমরা বৃক্ষের সঙ্গে জীবজন্তুও রক্ষার প্রার্থনা নিয়েও করমা পালন করে থাকি।’ভুঁইয়ারা জানান, এবার চাঙারিতে বপন করা বীজের মধ্যে ছিল মাষকলাই, যব, গম, ছোলা, ধান, অড়হড়, শসা ও তিল। এদের বলা হয় সাতভাই এক বোন। এখানে তিল হচ্ছে বোন। বোন কে হবে ধরাবাঁধা নেই। কখনো ধানও বোন হতে পারে।বীজ বপনের পর প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় দুটি চাঙারি আখড়ায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে চাঙারি ঘিরে নাচ-গান চলত। বলা হয়ে থাকে করমার গীত শুনে শুনে বীজ থেকে চারাগুলো দ্রুতই বেড়ে ওঠে।পূজার নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেয়েরা আখড়ায় পুঁতে রাখা গাছের ডালে শাপলা ফুলের মালা পরায়। পাতায় গেঁথে দেয় তালের রুটি। কিশোরীর উপোস ভেঙে গ্রামের নারী-পুরুষের সঙ্গে করমা ডালকে ঘিরে মাদলের তালে তালে শুরু করে নাচগান। চলে ভোর পর্যন্ত বিরতিহীন।আখড়া থেকে কারামগাছের ডাল তুলে বিসর্জনে নিয়ে যাওয়ার আগে শেষ নাচগান। শুক্রবার সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের দেওপুরায়নাচগানে অংশ নিতে দেখা যায় নওগাঁর সাপাহার উপজেলার খরিয়াপাড়ার কিশোরী মৌমিতা রায়কে (১৫)। সে বলল, ‘আমি জীবনে এমন উৎসব দেখিনি। আমাদের গ্রামে এটা হয় না। তাই দিদার সঙ্গে আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছি বেড়াতে। আসাটা সার্থক হয়েছে। অনেক আনন্দ করলাম।’কথা হয় গৃহবধূ সোহাগী রাইয়ের সঙ্গে। এবার করমা জাঁকজমকপূর্ণ হবে বলে এসেছেন বাবার বাড়ি। তাঁর শ্বশুরবাড়ি নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার নিতিনপুরে। সেখানেও করমা হয়। তবে জাঁকজমকপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, ‘বাপের বাড়ি এসেছি শুধু মনভরে নাচগান করতেই। বৃষ্টির কারণে সন্ধ্যা থেকে নাচতে পারিনি। তবে রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত নাচলাম।’সোহাগী মাদলও বাজাতে পারেন। নেচে নেচে মাদল বাজালেন অনেকক্ষণ। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বাপের মাদল বাজানো দেখে দেখে শিখেছি। কেউ আমাকে শেখায়নি। হামার বাপ হোইলো গাঁয়ের পূজারি ধিরেণ রাই।’ আয়োজনে দেখা যায়, একবার বাবা আর একবার মেয়ের হাতেই বাজছে মাদল।শুক্রবার সকাল আটটার দিকে আখড়া থেকে করমার ডাল তুলে মাদলের তালে তালে নেচে গ্রামে পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রাম থেকে চাল-ডাল ও তরকারি জোগাড় করে আয়োজন করা হয় খিচুড়ির।গ্রামের প্রতিটি বাড়ির মাটির দেয়াল ছিল লেপাপোঁছা। লাল মাটি দিয়ে আংশিক রাঙানো। উৎসবের রঙে রেঙেছিল গ্রামবাসীর মনও।
সমাজের প্রকৃত প্রাণশক্তি নিহিত থাকে মানুষের উন্নত চরিত্র, মার্জিত আচরণ ও আত্মিক নৈতিকতার ভেতরে। আর এই নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের মূল চাবিকাঠি হলো শালীনতা।শালীনতা হলো মানুষের চিন্তা, পোশাক-পরিচ্ছদ, ভাষা ও সামগ্রিক জীবনাচারের সেই মার্জিত রূপ—যা সমাজকে কুরুচি, অবক্ষয় ও অরাজকতা থেকে সুরক্ষিত রাখে।ইসলাম মানুষকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিনম্র, মার্জিত, রুচিশীল ও শালীন হওয়ার জোর তাগিদ দেয়।কোরআনের নীতিপবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানবজাতিকে শিষ্টাচার ও শালীন জীবনাচরণের স্পষ্ট নীতিমালা শিক্ষা দিয়েছেন। লোকমান হাকিম তাঁর প্রিয় সন্তানকে চরিত্র গঠনের যেসব মৌলিক উপদেশ দিয়েছিলেন, আল্লাহ–তাআলা তা চিরন্তন উপদেশ হিসেবে কোরআনে সংরক্ষণ করেছেন।তিনি বলেছিলেন, ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। আর তোমার পদচারণে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রাখো...।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮-১৯)শালীনতা মানুষের মধ্যকার হিংস্র পাশবিকতা ও বেপরোয়া কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন সমাজে অশালীনতা, কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি কিংবা উগ্র বেশভূষার বিস্তার ঘটে, তখন মানুষের ভেতরের অপরাধপ্রবণতা ও কুপ্রবৃত্তিগুলো দ্রুত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন মানুষ নীতিবিবর্জিত ও গর্হিত কাজে লিপ্ত হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না।একমাত্র আত্মিক শালীনতা ও সংযমের অনুশীলনের মাধ্যমেই এসব অবক্ষয় থেকে নিজেকে পূতপবিত্র রাখা সম্ভব।সুরা আহজাব, আয়াত: ৩৩আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলি যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না...।সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সম্মানহানি করার পরিণতিলজ্জাহীনতা কী ক্ষতি করেঅশালীনতা ও লজ্জাহীনতা সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নানাবিধ নৈতিক অপরাধের পথ সুগম করে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সুস্থ আবহ বজায় রাখার লক্ষ্যে পবিত্র কোরআনে শালীনতা ও শালীন পোশাকের বিধান স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে।বিশেষ করে নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তার স্বার্থে আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলি যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না (উদ্দাম সাজসজ্জা প্রকাশ কোরো না)...।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৩৩)এখানে ইসলাম শুধু ঘরের ভেতর আবদ্ধ থাকার কথা বলেনি; বরং সর্বপ্রকার প্রদর্শনকামী মানসিকতা ও কুরুচিপূর্ণ বেশভূষা পরিহার করে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও মার্জিত জীবনাচার বজায় রাখার দিকনির্দেশনা দিয়েছে।লজ্জা ইমানের সৌন্দর্যের উৎসশালীনতার মূল ভিত্তি ও উৎস হলো লজ্জাশীলতা (হায়া)। লজ্জা মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং শালীন আচরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।রাসুল (সা.) মানবচরিত্রের এই সূক্ষ্ম মানসিকতা তুলে ধরে বলেছেন, ‘যখন তোমার মধ্য থেকে লজ্জাই চলে যাবে, তখন তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারো!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৮৪)লজ্জাশীলতার সুফল কোনো একক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের সামগ্রিক সত্তাকে কল্যাণময় করে তোলে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা পুরোটাই কল্যাণ বয়ে আনে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৭)অন্য হাদিসে এসেছে, ‘লজ্জাশীলতা হলো ইমানের অন্যতম একটি মৌলিক শাখা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯)মানুষের আচরণ ও কথাবার্তার সৌন্দর্য নির্ধারণে লজ্জার ভূমিকা তুলে ধরে নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘অশ্লীলতা কোনো বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে তা সেই বিষয়কে কলুষিত ও ত্রুটিপূর্ণ করে দেয়; আর লজ্জাশীলতা কোনো বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে তা সেই বিষয়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৪)‘হায়া’ মানে শুধু শালীনতা নয়মার্জিত আচরণ মানুষের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে; পক্ষান্তরে অশোভন ও রুচিহীন আচরণ মানুষের ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করে দেয়।নবীজির সতর্কতাশালীনতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পরিমিত ও মার্জিত পোশাক পরিধান করা এবং সংযত ভাষায় কথা বলা। মার্জিত আচরণ মানুষের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে; পক্ষান্তরে অশোভন ও রুচিহীন আচরণ মানুষের ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করে দেয়। অশালীন ও কটুভাষী ব্যক্তিকে সমাজ কখনো মন থেকে ভালোবাসে না।রাসুল (সা.) হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক থেকে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে নিকৃষ্ট হবে, যার মুখের কটু ও অশ্লীল ভাষা থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তাকে পরিহার করে চলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩২)এমন ব্যক্তিকে মহান আল্লাহও চরম অপছন্দ করেন। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অশালীন ও দুশ্চরিত্র ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০০২)পরিবার, শিক্ষাঙ্গন ও ভার্চ্যুয়াল জগতে শালীনতার চর্চাশালীনতা মানবচরিত্রের সবচেয়ে মূল্যবান অলংকার। আর এই অলংকারে নিজেকে সাজানোর প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় পরিবার থেকে। মাতা-পিতা ও অভিভাবকের পবিত্র দায়িত্ব হলো শৈশব থেকেই সন্তানদের মার্জিত পোশাকের গুরুত্ব বোঝানো, সত্য ও কোমল ভাষায় কথা বলার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং গুরুজনদের শ্রদ্ধা ও কনিষ্ঠদের স্নেহ করার আবহ তৈরি করা।একইভাবে বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান বিতরণের জায়গা নয়; বরং এগুলো হওয়া উচিত নীতি-নৈতিকতা ও শিষ্টাচার চর্চার অন্যতম কেন্দ্রস্থল।এর পাশাপাশি সমকালীন ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চ্যুয়াল পরিসরেও শালীনতা বজায় রাখা এক বিরাট ইমানি পরীক্ষা। সাইবার জগতে অন্যের পোস্টে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, উগ্র ট্রল, মিথ্যা রটনা বা অসৌজন্যমূলক আচরণ থেকে বিরত থেকে সুস্থ সাইবার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভার্চ্যুয়াল জগতেও মুমিনের ওপর আল্লাহর নজরদারি সমানভাবে কার্যকর।একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য ও মানবিক সমাজ গঠন করতে হলে কুৎসিত ও কুরুচিপূর্ণ মানসিকতা পরিহার করে শালীনতাকে জীবনের ভূষণ বানাতে হবে। যখন কোনো সমাজের চিন্তা, ভাষা, পোশাক ও আচরণে শালীনতার শুভ্র প্রকাশ ঘটে, তখন সেখানে পারিবারিক শান্তি, পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। সুন্দর ও সুশৃঙ্খল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের সর্বস্তরে শালীনতার চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া সময়ের অপরিহার্য দাবি।সাকী মাহবুব: সহকারী শিক্ষক, নাদির হোসেন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, পাংশা, রাজবাড়ীইসলামে বয়স্কদের জন্য দুটি বিশেষ উপহার