শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পথের দাবী উপন্যাসে বিপ্লববাদী আন্দোলনের প্রসঙ্গ থাকায় প্রকাশের পরপরই এটি বাজেয়াপ্ত হয়। তবে উপন্যাসে অহিংস আন্দোলনের প্রতি লেখকের সমর্থনও দেখা যায়। শরৎচন্দ্র কি উপন্যাসে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শন প্রকাশ করতে চেয়েছেন, নাকি সে সময়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারা ও আদর্শ তুলে ধরতে চেয়েছেন—পথের দাবী প্রকাশের শতবর্ষ উপলক্ষে এ লেখায় সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজা হয়েছে। লিখেছেন তারিক মনজুর
ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় বিশ শতকের শুরুতে বিপ্লবী ও অহিংস—এই দুটি প্রধান রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবের পর সূচনা হয় স্বদেশি আন্দোলনের। সেখানেও ছিল দুটি ধারা—রাজনৈতিক চরমপন্থা ও দেশগঠনের প্রচেষ্টা। বিপ্লবীদের ‘সন্ত্রাসবাদ’, মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ, কিংবা অপরাপর রাজনৈতিক চিন্তা ও আদর্শ দেশের মানুষকে স্বাধীনতা–আকাঙ্ক্ষী করে তোলে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেসব চিন্তা ও আদর্শ সম্পর্কে যে পরিষ্কার ধারণা রাখতেন, পথের দাবী উপন্যাস তার সাক্ষ্য বহন করে।
পথের দাবী ১৯২৬ সালের আগস্টে বই আকারে প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে ব্রিটিশ সরকার সেটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর আগে বঙ্গবাণী মাসিকপত্রে ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন-চৈত্র সংখ্যা থেকে অনিয়মিতভাবে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ পর্যন্ত এটি প্রকাশিত হয়। বাজেয়াপ্ত ঘোষণায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মর্মাহত হন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে গিয়ে ধরেন, ‘আপনি যদি একটা প্রতিবাদ করেন তো কাজ হয়; পৃথিবীর লোক জানতে পারে যে গভর্নমেন্ট সাহিত্যের প্রতি কী রকম অবিচার করছে!’
রবীন্দ্রজীবনী রচয়িতা প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় শরৎচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথের এই সাক্ষাৎকারের স্বীকৃতি দিচ্ছেন; কিন্তু সেটি ঠিক কেমন ছিল, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না। বোধ হয় এই আলাপের পরেই রবীন্দ্রনাথ পথের দাবী প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্রকে একটি পত্র লেখেন। পত্রের বক্তব্য এ রকম—লেখকেরা উত্তেজক গ্রন্থ লিখবেন, অথচ সেই সঙ্গে তাঁরা এই আশাও করবেন যে ইংরেজ-সরকার তাঁদের শাস্তি দেবে না, এ রকম মনোভাব ঠিক নয়। রবীন্দ্রনাথের মতে, লেখকের কর্তব্যের হিসাবে সেটা দোষের না হতে পারে—কেননা, লেখক কোনো শাসনকে গর্হিত মনে করলে সেই বিষয়ে চুপ থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু স্বীকার করা চাই। তিনি আরও বলেন, সব দেশেই শাস্তি স্বীকার করেই কলম চালাতে হচ্ছে, যেকোনো দেশেই রাজশক্তিতে-প্রজাশক্তিতে সত্যিকার বিরোধ ঘটেছে—রাজ-বিরুদ্ধতা আরামে নিরাপদে থাকতে পারে না, এই কথা নিশ্চিতভাবে জেনেই চলেছে।

তিরিশের দশকের রাজনৈতিক চিন্তার নানা স্রোতের সঙ্গে, বিপ্লবীদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। তিনি অনেক দিন হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন, প্রায় নিয়মিতই খদ্দর পরতেন এবং একটি রিভলভার বহুদিন তাঁর কাছে ছিল। এসব তথ্য প্রমাণ করে, শরৎচন্দ্র নিছক কল্পনা থেকে পথের দাবী লেখেননি। কংগ্রেসের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থক।
শরৎচন্দ্রকে লেখা রবীন্দ্রনাথের মূল চিঠি বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রসদনে আছে। এই পত্রে শরৎচন্দ্র বিশেষ খুশি হতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে সমালোচকদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যকে কবির ‘ইংরেজপ্রীতি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তা যে পুরোপুরি ঠিক নয়, সেটা শরৎবাবুকে লেখার কয়েক দিন আগে দৈনিক ফরোয়ার্ড-এ প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের একটা ‘খোলাচিঠি’ থেকে প্রমাণ করা যায়। ইংরেজ সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ সেখানে বলেছিলেন, ‘শারীরিক বলে দুর্বলদের ওপর যে শাসকগোষ্ঠীর শাসন করার দুর্ভাগ্য ঘটেছে, তাদের মন দিনে দিনে দুর্নীতির গভীর অতলে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে।...আমাদের একমাত্র দাবি মানবতার দাবি; তা যদি অগ্রাহ্য হয়, তবে তা তাদেরই গোপনে আঘাত করবে।’
প্রকাশের পরপরই পথের দাবী অসাধারণ জনপ্রিয়তা পায়। কেনো কোনো সূত্র বলে, এই বইয়ের পাঁচ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল; আর তা ফুরিয়ে যেতে সাত দিনও লাগেনি। তিন টাকা দামের বই দোকানদারেরা ১০ টাকাতে বিক্রি করেছেন। নিষিদ্ধ হওয়ার পর উপন্যাসটির কপি না থাকার দরুন অনেকে হাতে লিখেও নকল করে নিয়েছিলেন। গোপন সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনকে ঘিরে তখন রোমাঞ্চ আর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। কারও কারও মতে, বিপ্লবী যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় ছিলেন এই উপন্যাসের সব্যসাচী চরিত্রের মডেল।
তিরিশের দশকের রাজনৈতিক চিন্তার নানা স্রোতের সঙ্গে, বিপ্লবীদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। তিনি অনেক দিন হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন, প্রায় নিয়মিতই খদ্দর পরতেন এবং একটি রিভলভার বহুদিন তাঁর কাছে ছিল। এসব তথ্য প্রমাণ করে, শরৎচন্দ্র নিছক কল্পনা থেকে পথের দাবী লেখেননি। কংগ্রেসের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষচন্দ্র বসুর সমর্থক। দেশবন্ধুকে তিনি কী চোখে দেখতেন তার পরিচয় আছে চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর লেখা ‘স্মৃতিকথা’ প্রবন্ধে, যা মাসিক বসুমতীর ১৩৩২ আষাঢ় দেশবন্ধু স্মৃতিসংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং পরে স্বদেশ ও সাহিত্য গ্রন্থে সংকলিত হয়।

শিল্পের দাবি আর রাজনীতির চাহিদা—এ দুইয়ের সামঞ্জস্য করা সহজ নয়। পথের দাবী সম্পর্কে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, উপন্যাসের সব্যসাচী চরিত্রটি ‘অস্বাভাবিকভাবে’ গড়ে উঠেছে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিযোগ করেন, উপন্যাসের মূলধন হিসেবে ‘ইংরেজ-বিদ্বেষের ব্যবহার’ হয়েছে।
রক্তাক্ত বিপ্লবের পথেই স্বাধীনতা আসবে—শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পথের দাবী উপন্যাসে এমনটি সব্যসাচীর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন। আবার ১৯২৯ সালে রংপুরের এক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে প্রায় একই রকম কথা তিনি বলেছিলেন। তবে জীবনের বৃহত্তর প্রয়োজন ও আদর্শ সম্পর্কেও শরৎচন্দ্র ওয়াকিবহাল ছিলেন। ১৯২৪ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক চিন্তা ও আদর্শের প্রকাশ হিসেবে এই ভাষণ এবং পথের দাবী উপন্যাসটিকে বিবেচনায় নেওয়া যায়।
ভাষণে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা শুধু একটা নামমাত্র নয়। দাতার দক্ষিণ হস্তের দানে একে ভিক্ষার মতো পাওয়া যায় না—এর জন্য মূল্য দিতে হয়। ...কিন্তু একটা কথা তোমরা ভুলো না যে কখনো কোনো দেশেই শুধু বিপ্লবের জন্যই বিপ্লব আনা যায় না। অর্থহীন অকারণ বিপ্লবের চেষ্টায় কেবল রক্তপাতই ঘটে, আর কোনো ফল লাভ হয় না।’ আবার উপন্যাসে ভারতীকে সব্যসাচী বলছে, ‘স্বাধীনতা ছাড়া আমার নিজের আর দ্বিতীয় লক্ষ্য নেই, কিন্তু মানবজীবনে এর চেয়ে বৃহত্তর কাম্য আর নেই—এমন ভুলও আমার কোনো দিন হয়নি। স্বাধীনতাই স্বাধীনতার শেষ কথা নয়। ধর্ম, শান্তি, কাব্য, আনন্দ—এরা আরও বড়। এদের একান্ত বিকাশের জন্যই তো স্বাধীনতা, নইলে এর মূল্য ছিল কোথা?’
শিল্পের দাবি আর রাজনীতির চাহিদা—এ দুইয়ের সামঞ্জস্য করা সহজ নয়। পথের দাবী সম্পর্কে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, উপন্যাসের সব্যসাচী চরিত্রটি ‘অস্বাভাবিকভাবে’ গড়ে উঠেছে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিযোগ করেন, উপন্যাসের মূলধন হিসেবে ‘ইংরেজ-বিদ্বেষের ব্যবহার’ হয়েছে। সব্যসাচীর কর্মকাণ্ড রোমাঞ্চকর, তাতে সন্দেহ নেই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত তার কর্মক্ষেত্র। ভারতীর কাছে সব্যসাচী তার ভবিষ্যৎ কর্মসূচির আভাসমাত্র দিয়েছে। তা থেকে জানা যায়, সব্যসাচী বর্মা (বর্তমান মিয়ানমার) থেকে হাঁটাপথে দক্ষিণ চীনের ক্যানটনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাবে, উত্তর ও পূর্বের দেশগুলোর বিপ্লবকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করবে। সব্যসাচী বলে, ক্যানটনের এক গুপ্ত সভায় ১৯১০ সালে সুন-ইয়াৎ-সেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। এই বিবরণ পাঠকের রোমান্সজাত কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করে। আবার শাসক ইংরেজের প্রতি সব্যসাচীর বিদ্বেষের সীমা নেই। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সে ভারতীকে বলে, ‘আমার দেশ গেছে বলেই আমি এদের শত্রু নই। একদিন মুসলমানের হাতেও এ দেশ গিয়েছিল। কিন্তু সমস্ত মনুষ্যত্বের এত বড় পরম শত্রু জগতে আর নেই। স্বার্থের দায়ে ধীরে ধীরে মানুষকে অমানুষ করে তোলাই এদের মজ্জাগত সংস্কার।’
অপূর্ব-ভারতী প্রেম প্রসঙ্গের এখানে ইতি টেনে শরৎচন্দ্র তাঁর পাঠকসমাজকে হতাশ করতে পারতেন। কিন্তু অপূর্ব বর্মা থেকে আবার ফিরে আসে ভারতীর কাছে। অনুতপ্ত অপূর্ব জানায়, সে দেশের কাজে দশের কাজে আত্মনিয়োগ করবে। সব্যসাচী এটা শুনে বলে, ‘সাধু প্রস্তাব।’ লেখক যদি ‘সন্ত্রাসবাদ’কেই একমাত্র সমাধান মনে করতেন, তবে সব্যসাচীর মুখ দিয়ে এমনটি বলাতেন না। অপূর্ব-ভারতীর মিলনের অপেক্ষা হয়তো সব্যসাচীও করছিল; কিংবা লেখক শরৎচন্দ্র উপন্যাসের সমাপ্তির প্রয়োজনে নিজেই করছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের পত্রের জবাবে শরৎচন্দ্র চার-পাঁচ দিন পর একটি চিঠি লেখেন, যদিও তিনি ‘বন্ধুদের অনুরোধে’ সেটি আর পাঠাননি। সেই চিঠিতে শরৎচন্দ্র বলেন, ‘গ্রন্থের মধ্যে যদি মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে থাকি, এবং তৎসত্ত্বেও যদি রাজরোষে শাস্তি ভোগ করতে হয়, তো করতেই হবে—তা মুখ বুজেই করি বা অশ্রুপাত করেই করি। কিন্তু প্রতিবাদ করা কি প্রয়োজন নয়? প্রতিবাদেরও দণ্ড আছে, এবং মনে করি তারও পুনরায় প্রতিবাদ হওয়া আবশ্যক।... আমার প্রশ্ন, ইংরাজ-রাজশক্তির এ বই বাজেয়াপ্ত করার জাস্টিফিকেশন যদি থাকে, পরাধীন ভারতবাসীর পক্ষে প্রোটেস্ট করার জাস্টিফিকেশনও তেমনি আছে।’
কিন্তু বিপ্লব কাদের জন্য? অধিকারহারা মানুষের জন্যই তো। ‘সাহিত্যের আর্ট ও দুর্নীতি’ প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র লিখেছেন, ‘এই অভিশপ্ত, অশেষ দুঃখের দেশে নিজের অভিমান বিসর্জন দিয়ে রুশ সাহিত্যের মতো যেদিন সে আরও সমাজের নিচের স্তরে নেমে গিয়ে তাদের সুখ, দুঃখ, বেদনার মাঝখানে দাঁড়াতে পারবে, সেদিন এই সাহিত্যসাধনা কেবল স্বদেশে নয়, বিশ্বসাহিত্যেও আপনার স্থান করে নিতে পারবে।’ পথের দাবীতেও নিচুতলার মানুষের প্রতি সমবেদনা আছে। কারখানার মালিক ইংরেজের শোষণের নগ্ন রূপ লেখক দেখিয়েছেন পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে। এই পরিচ্ছেদে বাঙালি, বিহারি, ওড়িয়া, মাদ্রাজি পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের নরকতুল্য জীবনের ছবি পাওয়া যায়। পরের দুই অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন অসংঘবদ্ধ শ্রমিকদের আন্দোলনের ব্যর্থতা। ফয়ার মাঠের জনসভায় উপস্থিত বিশাল জনতাকে হটিয়ে দিতে মুষ্টিমেয় কয়েকজন মাউন্টেড পুলিশের লাঠিপেটাই
যথেষ্ট ছিল।
শরৎচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসের মতো এখানেও নারীর প্রেম গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। নারীর ভালোবাসা বিচার-বিবেচনা মানে না, ভালোবাসার বদলে অপমান পেয়েও সে ভালোবেসে যায়—এই হলো শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের ভালোবাসার ধরন। অপূর্ব চাকরি করতে বর্মায় গিয়েছিল। মাঝখানে কদিনের জন্য ভারতীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। অপূর্ব নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের ছেলে; তার দেশ আছে, সমাজ আছে, আত্মীয়স্বজন-বাড়িঘর আছে। আর ‘অস্পৃশ্য’ খ্রিষ্টানের মেয়ে ভারতী; তার দেশ নেই, ঘর নেই, মা-বাবা নেই, আপনার বলতে কেউ নেই। অপূর্বর সঙ্গে পরিচয়টুকুর মধ্যেই যদি সব শেষ হয়ে যায়, তাতে কষ্ট পাওয়ার কী আছে—এটা ভেবে ভারতী নিজের মনকে প্রবোধ দিতে চেয়েছে; কিন্তু তার মন মানতে চায় না, দুই চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে।
অপূর্ব-ভারতী প্রেম প্রসঙ্গের এখানে ইতি টেনে শরৎচন্দ্র তাঁর পাঠকসমাজকে হতাশ করতে পারতেন। কিন্তু অপূর্ব বর্মা থেকে আবার ফিরে আসে ভারতীর কাছে। অনুতপ্ত অপূর্ব জানায়, সে দেশের কাজে দশের কাজে আত্মনিয়োগ করবে। সব্যসাচী এটা শুনে বলে, ‘সাধু প্রস্তাব।’ লেখক যদি ‘সন্ত্রাসবাদ’কেই একমাত্র সমাধান মনে করতেন, তবে সব্যসাচীর মুখ দিয়ে এমনটি বলাতেন না। অপূর্ব-ভারতীর মিলনের অপেক্ষা হয়তো সব্যসাচীও করছিল; কিংবা লেখক শরৎচন্দ্র উপন্যাসের সমাপ্তির প্রয়োজনে নিজেই করছিলেন। কারণ, তার পরপরই দুর্যোগের রাতে সব্যসাচী নিরুদ্দেশের পথে চলে যায়—বিপ্লবকে অসম্পূর্ণ রেখেই, তবে সম্ভাবনাকে মেরে ফেলে নয়।
এটি রাজনৈতিক উপন্যাস; এখানে বিপ্লবী ও অহিংস দুই ধারার রাজনৈতিক চিন্তাই জায়গা পেয়েছে। চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক যতটা না নিজের বক্তব্য যুক্ত করতে চেয়েছেন, তার চেয়ে বেশি সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারা ও আদর্শই তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু বইটির বিপুল জনপ্রিয়তা হয়তো ইংরেজ সরকারকেই ভীত করে তোলে।
ভারতী বরাবরই সব্যসাচীর সহিংস বিপ্লবের বিরোধিতা করেছে। ভারতীর মধ্যে গান্ধীবাদী অহিংস আদর্শের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সব্যসাচীর সঙ্গে ভারতীর মূল বিতর্ক স্বাধীনতা নিয়ে নয়, বরং স্বাধীনতা লাভের উপায় নিয়ে। অবশ্য শ্রমিক আন্দোলনের বিষয়েও মতের ভিন্নতা রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রেই ভারতী হিংসা ও সহিংসতাকে সমর্থন করতে পারে না। তার প্রশ্ন—‘রক্তপাতের জবাবে যদি রক্তপাতই হয়, তাহলে তারও তো জবাব রক্তপাত। এবং তারও তো জবাবে এই একই রক্তপাত ছাড়া আর কিছু মেলে না। এ প্রশ্নোত্তর সেই আদিম কাল থেকে হয়ে আসচে। তবে কি মানবের সভ্যতা এর চেয়ে বড় উত্তর কোনো দিন দিতে পারবে না?’
পথের দাবী উপন্যাসের শেষেও দেখা যায়, ভারতী তার অহিংসা, শান্তি আর ধর্মের মন্ত্র নিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে, সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োগ করেছে। সে অপূর্বর মতোই দরিদ্র মানুষের সেবা করবে। আর সব্যসাচী তার বিপ্লবের পথেই থাকে। তবে উপন্যাসের শেষে সব্যসাচীর বিপ্লবী সংগঠনে ভাঙন দেখা যায়। কর্মীরা হতাশ, সুমিত্রার মতো অনেকেই দল ছেড়ে চলে যায়, ব্রজেশ্বর চলে আসে বর্মা থেকে, অন্য একটি গুপ্ত সমিতি পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। এগুলো ব্রজেশ্বরেরই বিশ্বাসঘাতকতার ফল বলে সব্যসাচী ধারণা করে; কিন্তু তাতে সে উদ্যম হারায় না, নতুন উৎসাহে নিজেকে প্রস্তুত করে। সব্যসাচী বিশ্বাস করে, পরাজয়টাই সত্য নয়—‘বুক জুড়ে যে বিষ উপচে উছলে উঠছে’, সে শক্তিই সত্য। এটা শরৎচন্দ্রের নিজেরও মনোভাব।
পথের দাবী উপন্যাসটি মাসিকপত্রে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, প্রকাশকেরা বই আকারে ছাপার আগে তার কিছু অংশ বাদ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লেখক তাতে বাদ সাধেন। ফলে প্রকাশক বা প্রেসমালিক খুঁজে পেতেও শরৎচন্দ্রকে বেগ পেতে হয়েছে। এটি রাজনৈতিক উপন্যাস; এখানে বিপ্লবী ও অহিংস দুই ধারার রাজনৈতিক চিন্তাই জায়গা পেয়েছে। চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক যতটা না নিজের বক্তব্য যুক্ত করতে চেয়েছেন, তার চেয়ে বেশি সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক ধারা ও আদর্শই তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু বইটির বিপুল জনপ্রিয়তা হয়তো ইংরেজ সরকারকেই ভীত করে তোলে।
তারিক মনজুর: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
দেশের বাজারে দু-একদিন পরপরই বাড়ে-কমে সোনা-রুপার গহনার দাম। সর্বশেষ গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সোনার গহনার দাম কমানো হয়। নতুন দাম নির্ধারণ না হওয়ায় আগের দামেই সোনার গহনা ও রুপার গহনা বিক্রি হবে। ওই দিন সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার গহনার দাম কমানো হয় ১ হাজার ১০৮ টাকা। এতে ভ্যাটসহ ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। বর্তমানে এই দামেই বাজারে সোনার গহনা বিক্রি হচ্ছে। আর ভালো মানের রুপার গহনার ভরি বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার টাকার ওপরে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) ওয়েবসাইটেও এ তথ্য দেওয়া আছে। আরও পড়ুন বিশ্ববাজারে সোনার দাম বেড়েছে, ভরি কত? বাজুস নির্ধারণ করা দর অনুযায়ী, বর্তমানে সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনা ভ্যাটসহ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনা বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৪১ টাকা। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনা বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৩১ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২২ টাকা। অন্যদিকে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার গহনার দাম রাখা হচ্ছে ৫ হাজার ১৩২ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের রুপা প্রতি ভরি ৪ হাজার ৯৫৭ টাকা, ১৮ ক্যারেটের রুপা ৪ হাজার ২৫৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপা প্রতি ভরি ৩ হাজার ২০৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিএ
নির্জন নাহুয়েলগ্যাংস্টার, ফিরব বলে, তাঁহার খোঁজে অচিনপুরে, অভিমান, আস্কারা—একের পর এক জনপ্রিয় নাটক দিয়ে তরুণ দর্শকের কাছে আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন নির্জন নাহুয়েল। তাঁর এক দশকের পথচলার গল্প শোনাচ্ছেন মনজুরুল আলমমাসে খুব বেশি দিন শুটিং করেন না নির্জন নাহুয়েল। ১২ থেকে ১৬ দিন ক্যামেরার সামনে আসেন। প্রতিটি নাটকের জন্য রাখেন তিন থেকে চার দিন। ফলে হাতে অনেক অবসর থাকার কথা। কিন্তু তারপরও নির্জন নাহুয়েলকে ফোনে পাওয়া একটু কঠিন। কারণ, শুটিংয়ের বাইরের প্রায় পুরো সময়টাই চিত্রনাট্য লেখায় চলে যায়। নির্জন বলেন, ‘আমার প্রায় ৯০ শতাংশ নাটকের চিত্রনাট্যই নিজের লেখা। শুটিংয়ের বাইরে পুরো সময় আমি চিত্রনাট্য লিখি। এখানে অনেক সময় চলে যায়।’নির্জন নাহুয়েলশুধু অভিনয় বা লেখালেখি নয়, পরিচালনার অভিজ্ঞতাও নির্জনের রয়েছে। আসলে নির্মাণ দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর পথচলা। প্রায় এক দশক আগে, ২০১৬ সালে শুরু হয় এই যাত্রা। তখন বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতেন। সেসব কনটেন্ট তৈরির প্রায় সব দায়িত্ব একাই সামলাতেন। এসব কাজের মধ্য দিয়েই পরিচালনা, সম্পাদনা ও কালারের মতো বিষয়গুলো শেখার চেষ্টা করেছেন। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।পরিচালক থেকে অভিনেতা হয়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে নির্জন বলেন, ‘আমার পছন্দের কাজ ছিল সম্পাদনা। সম্পাদক হতে চেয়েছিলাম। সেখান থেকে পরিচালক হয়ে গেলাম, পরে অভিনয়ে নাম লেখালাম।’ ২০২২ সাল থেকে নিয়মিত অভিনয় করছেন, ‘ভবিষ্যতে শিল্পের অন্য কোনো দিক ভালো লাগলে হয়তো সেদিকে চলে যাব।’নির্জন নাহুয়েলভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি পরিকল্পনা করেন না নির্জন। তাঁর উপলব্ধি, ‘আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি না। পরিকল্পনা করে অনেক কিছুই করতে চেয়েছি, কিন্তু সেগুলো থেকে ভালো কিছু হয়নি। আবার পরিকল্পনা না করেও অনেক ভালো কিছু পেয়েছি। এ কারণে এখন যেটা ভালো লাগছে, সেটাই করব।’নির্জনের বেশির ভাগ নাটকই অল্প সময়ের মধ্যে ৫০ লাখ ভিউয়ের মাইলফলক ছুঁয়েছে। অভিমান ও আসকারা নাটকের ভিউ তো তিন কোটির বেশি। এই সাফল্যের পেছনে দর্শকের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় কারণ মনে করেন নির্জন, ‘একশ্রেণির দর্শক নিয়মিত আমার নাটক দেখেন। এটাও শুনি, অনেকে আমার নতুন নাটকের জন্য অপেক্ষা করেন।’ক্যারিয়ারের এই সময়ে এসে কাজের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও মানের সঙ্গে আপস করতে চান না নির্জন, ‘চাইলে বেশি কাজ করতে পারি, বেশি কাজ করতেও চাই। কিন্তু যে কাজটি করব, সেটি ভালোভাবে ও সময় নিয়ে করতে চাই। আমার অভিনীত নাটকের গল্প, চরিত্র, ফ্রেমিং ও উপস্থাপনা দেখলেই বোঝা যাবে, কাজ নিয়ে আমি কতটা সিরিয়াস।’বিরতির পর যেভাবে ফিরছেন অপূর্ব-নীহা জুটিনির্জন নাহুয়েলনির্জনের নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য অ্যাকশন। নির্জন বলেন, ‘কনটেন্ট তৈরি করার সময় থেকেই ভাবতাম, নাটকের মধ্যেই কীভাবে সিনেম্যাটিক অনুভূতি দেওয়া যায়। সেখানে আবেগ থাকবে, অ্যাকশনও থাকবে। সব মিলিয়ে দর্শক বাণিজ্যিক বিনোদনের স্বাদ পাবেন। হয়তো এই জায়গায় কিছুটা সফল হয়েছি বলেই দর্শক আমার নাটক দেখেন।’জুটিপ্রথা বিষয়ে নির্জন বলেন, ‘জুটি হিসেবে দর্শক পছন্দ করায় অনেক পরিচালক ঘুরেফিরে একই শিল্পীদের নেন। কখনো তাঁরা আমার পরামর্শ চান, তবে বেশির ভাগ সময় সিদ্ধান্তটা তাঁদের ওপরই ছেড়ে দিই।’শোবিজ দুনিয়ায় এক দশকের যাত্রা বিষয়ে নির্জনের মূল্যায়ন, ‘অপ্রাপ্তি খুব একটা নেই। সবাই ভালোবাসেন। একসময় পরিবার হয়তো বলত, এসব বন্ধ করে আগে স্নাতক শেষ করো। এখন তাঁরাও আমাকে সমর্থন করেন। বাইরে বের হলে দর্শকেরা বলেন, “আপনার সব কাজ দেখি, আপনার অভিনয় ও সংলাপ ভালো লাগে।” এগুলোই তো অর্জন। দর্শকের এই ভালোবাসা আমাকে আরও ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।’
আর্চি ব্রাউনের মুখের চাহনিই সব বলে দিচ্ছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, এমন কিছু শোনার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।ইস্তাম্বুলে ম্যাচ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। ঘরের মাঠে এএস রোমার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে ফেনেরবাচে। তুর্কি ক্লাবটির সমতাসূচক গোলটি ইংলিশ ডিফেন্ডার ব্রাউনের। রোমা গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে দারুণ চিপে করা গোল। মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে ব্রাউন হয়তো ভেবেছিলেন, প্রথম প্রশ্নটাই হবে তাঁর গোলটি কিংবা ম্যাচসেরা হওয়া নিয়ে।কিন্তু সেসবে না গিয়ে তাৎক্ষণিক এক খবরের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয় ব্রাউনের কাছে। খবরটি হলো ফেনেরবাচে কোচের পদ ছেড়েছেন ইসমাইল কারতাল। ভাষান্তরিত প্রশ্নটি শুনে পুরোপুরি হতবাক হয়ে যান ব্রাউন। দলের কোচ পদত্যাগ করেছেন কিন্তু তিনি কিছুই জানেন না!চোখেমুখে বিস্ময় ফুটিয়ে ব্রাউন পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘বলেন কী, তিনি পদত্যাগ করেছেন? আমি তো এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’ব্রাউন কিছুই জানতেন না। এমন কিছু যে ঘটতে যাচ্ছে, সে আভাসও ছিল না তাঁর কাছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেই ফেনেরবাচের ইতিহাসে প্রথম তুর্কি কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগে পয়েন্ট অর্জন করেছেন কারতাল। দলের খেলা সমর্থকদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট না করলেও দ্বিতীয়ার্ধে বেশ ভালোই খেলে ফেনেরবাচে।সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে কারতাল নিজেই বলেছেন, ‘এটি ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের যোগ্য এক ফুটবল প্রদর্শনী। আমি আমার খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানাতে চাই।’ কিন্তু তখন পর্যন্তও কেউ ভাবতে পারেননি, যে ক্লাবে কারতাল এক সময় খেলেছেন, সহকারী কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন, সেই ক্লাবের প্রধান কোচের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেবেন।ফেনেরবাচে সভাপতি আজিজ ইলদিরিমকারতাল প্রথমে ক্লাব সভাপতির প্রশংসা করে বলেন, ‘এখানে তিন মাস হলো আছি। মৌসুমের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের নিয়ে করা ট্রেনিং সেশন, ক্যাম্প ও আমাদের ক্লাবের সভাপতির প্রচেষ্টা অত্যন্ত সহায়ক ছিল। দিনগুলো দারুণ কেটেছে।’ এরপরই আসে কোচের দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা, ‘নিজের পদ থেকে আমি সরে দাঁড়াচ্ছি। ক্লাবের জন্য নতুন পথ উন্মুক্ত করতেই এ সিদ্ধান্ত। আমরা পুরো কোচিং স্টাফ মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্তটি নিয়েছি। ফেনেরবাচে, আমার খেলোয়াড় ও ভবিষ্যৎ কোচদের সুবিধার্থে আমি পদত্যাগ করেছি—আর কখনো না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে।’চলতি বছর জুনে চতুর্থ মেয়াদে ফেনেরবাচের কোচের দায়িত্বে ফেরেন ৬৫ বছর বয়সী কারতাল । তাঁর হাত ধরেই ১৮ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেরে ক্লাবটি। তুর্কি সুপার লিগে দুই জয় ও দুই হারে দল টেবিলের ৯ নম্বরে থাকা অবস্থায় এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের মাত্র একটি ম্যাচ পরই কোচের দায়িত্ব ছাড়লেন তিনি।তবে ৬৫ বছর বয়সী কারতালের পদত্যাগ মেনে নেননি ফেনেরবাচে সভাপতি আজিজ ইলদিরিম।ক্লাবটির ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে ইলদিরিম বলেন, ‘ইসমাইল কারতাল এখনো দায়িত্বে আছেন। ক্লাব কর্তৃপক্ষের উচিত আমাদের কোচকে সমর্থন করা। আমি যত দিন আছি, তত দিন ইসমাইল কারতালই ফেনেরবাচের প্রধান কোচ।’ফেনেরবাচে সভাপতি আজিজ ইলদিরিমইসমাইল কারতালের নিজে থেকে বলার প্রয়োজন নেই যে তিনি থাকবেন। আমি তাঁর বড়, আমি বলেছি তিনি থাকবেন—ব্যস, এটাই শেষ কথা। আমরা একটি পরিবার।ইলদিরিম নিশ্চিত করেন যে সংবাদ সম্মেলনের পর তিনি কারতালের সঙ্গে কথা বলেছেন। তীব্র মানসিক ‘চাপ’ ও খেলা চলাকালে গ্যালারি থেকে ছোড়া বোতলের আঘাতে আহত হওয়ার ঘটনা তাঁকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেনেরবাচে জানিয়েছে, বোতল ছোড়ার ঘটনায় জড়িত দর্শককে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁকে স্টেডিয়ামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।প্রত্যাবর্তনে ইউনাইটেডের বড় জয়, বায়ার্নেরও গোল–উৎসব, কোমোর স্মরণীয় অভিষেকসমর্থক ও সংবাদমাধ্যমের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন ইলদিরিম। ক্রমাগত সমালোচনার মাধ্যমে যে মানসিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে তা উল্লেখ করে দুই পক্ষকেই ‘ফেনেরবাচে পরিমণ্ডলের ভাবমূর্তি রক্ষা’ করা এবং কারতালের প্রতি আরও সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান তিনি।গোলের পর ফেনেরবাচে লেফট ব্যাক আর্চি ব্রাউনের উদ্যাপনকারতালের বিষয়ে আরও শক্ত অবস্থান নিয়ে ইলদিরিম বলেন, ‘ক্লাব পরিমণ্ডলের উচিত ইসমাইল কারতালকে সমর্থন করা। এভাবে আঘাত করে তো সমর্থন জানানো যায় না। ইসমাইল কারতালের নিজে থেকে বলার প্রয়োজন নেই যে তিনি থাকবেন। আমি তাঁর বড়, আমি বলেছি তিনি থাকবেন—ব্যস, এটাই শেষ কথা। আমরা একটি পরিবার।’এর আগে সহকারী কোচ হিসেবে চার বছর কাটানোর পর ২০১৪ সালে ফেনেরবাচের প্রধান কোচ হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদে তুর্কি সুপার কাপ জেতেন কারতাল। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ক্লাবটির কোচের দায়িত্ব পালন করেন সাবেক এ রাইটব্যাক। খেলোয়াড় হিসেবে ক্লাবটির হয়ে দুটি লিগ শিরোপাসহ মোট ছয়টি ট্রফি জিতেছিলেন কারতাল।