গ্রামীণ কৃষিপণ্যের হাট থেকে আজকের আধুনিক রেমিট্যান্স–নির্ভর ব্যবসা—স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক বিবর্তনের এক জীবন্ত চিত্র।
বর্ষার স্নিগ্ধ সকালে মৌলভীবাজার শহরের প্রবেশপথে বাঁক নেওয়া মনু নদ পার হলেই শুরু হয় এক বিশাল বাণিজ্যিক কর্মযজ্ঞ। নদের সমান্তরালে এম সাইফুর রহমান রোড (পুরোনো সেন্ট্রাল রোড) ধরে কিছুটা এগোলেই দেখা মেলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম স্নায়ুকেন্দ্র পশ্চিম বাজারের। প্রায় ছয় হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যকেন্দ্রের শিকড় প্রোথিত শত বছর আগের এক গ্রামীণ হাটের ইজারা প্রথা ও মনু নদকেন্দ্রিক বাণিজ্যের গভীরে।
বাজারের ভেতরে আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনের দাপট বেশি চোখে পড়লেও আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো ‘সাধনা ঔষধালয়’ এবং আরও প্রাচীন টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ ভবন। শতবর্ষী এই টেলিগ্রাফ ভবনের দেয়াল যেন সেকালের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গল্প বলে। একসময় যে মনু নদের ঘাটকে কেন্দ্র করে এখানকার ব্যবসার গোড়াপত্তন হয়েছিল, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক নগরায়ণের চাপে আজ বাজার থেকে সেই নদের নাগাল পেতে বেশ খানিকটা পথ হাঁটতে হয়।
কালের পরিক্রমায় নদের পুরোনো লঞ্চঘাট হারিয়ে গেলেও পশ্চিম বাজার সময়ের সঙ্গে নিজেকে রূপান্তর করেছে। গ্রামীণ কৃষিপণ্যের হাট থেকে আজকের আধুনিক রেমিট্যান্স–নির্ভর ব্যবসাকেন্দ্রটি মৌলভীবাজারের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক বিবর্তনের এক জীবন্ত চিত্র।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ইতিহাস-অনুরাগী সৈয়দ আবদুল মতালিব রঞ্জুর তথ্য অনুযায়ী, ১৮১০ সালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র হজরত ইয়াছিন (রহ.)-এর উত্তরসূরি জমিদার মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ মনু নদের পশ্চিম তীরে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৯৩ সালে তিনি মুন্সেফ বা বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তাঁর নামানুসারে জনপদটি ‘মৌলভীবাজার’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই জনপদ তৎকালীন দক্ষিণ শ্রীহট্টের অংশ ছিল।
শুরুর দিকে পশ্চিম বাজারে সপ্তাহে দুই দিন—সোম ও বৃহস্পতিবার হাট বসত। স্থানীয় কৃষকেরা তেল, চাল, ধান, তাজা সবজি, হাওরের মাছ, শুঁটকিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নিয়ে আসতেন।
তখন হাটের রাজস্ব বা কর আদায়ের পদ্ধতিও ছিল আলাদা। ইজারাদার বা জমিদারেরা হাটে আসা বিক্রেতাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে খাজনা আদায় করতেন, যা স্থানীয় ভাষায় ‘তুলা’ নামে পরিচিত ছিল। এটিই ছিল হাটের আয়ের মূল উৎস। কৃষিপণ্যের বিনিময়ে বা নগদ অর্থে এই তুলা আদায় করা হতো এবং তা জমিদারদের মূলধন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখত।
বাণিজ্যিক কাঠামোর দিক থেকে পশ্চিম বাজারের নিজস্ব চরিত্র ছিল। পাশের উপজেলা শ্রীমঙ্গল ঐতিহাসিকভাবে চা ও কৃষিপণ্যের পাইকারি বাণিজ্যের হাব হিসেবে পরিচিত হলেও পশ্চিম বাজার শুরু থেকেই শক্তিশালী খুচরা বাজার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
সড়কপথের উন্নয়নের আগে এ অঞ্চলের ব্যবসার প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। স্থানীয়দের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে মনুমুখ বাজারের কথা। মনু নদ কুশিয়ারা নদীতে যেখানে মিশেছে, সেখানে গড়ে ওঠা মনুমুখ বাজারের কাছে অতীতে একটি লঞ্চঘাট ছিল। এই ঘাটকে কেন্দ্র করে কুশিয়ারা নদী হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, ভৈরব ও নারায়ণগঞ্জের মতো বড় বাণিজ্যিক হাবের সঙ্গে লঞ্চ ও স্টিমারে পণ্য পরিবহন হতো।
এই নদীপথের বাণিজ্যের বড় অংশজুড়ে ছিল ‘সোনালি আঁশ’ পাট। মনুমুখ লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে পাটের বড় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করে কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করার পর তা নৌপথে নারায়ণগঞ্জ বা ভারতে পাঠানো হতো। পাটের ব্যবসার কারণে তখন এলাকাটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
পাটের পাশাপাশি কাঠের ব্যবসাও ছিল অর্থনীতির আরেক স্তম্ভ। রাজকান্দি সংরক্ষিত বন, জুড়ী বন বিভাগ ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি এলাকার গাছ কাটা হতো। গাছ কেটে প্রায় ১৫ ফুট লম্বা লগ তৈরি করে হাতি দিয়ে টেনে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে ঘাটে আনা হতো। চা-শিল্পের প্যাকিং বাক্স তৈরিতেও শিমুল, আম, কদম ও হারিশগাছ ব্যবহৃত হতো। ১৯৮৯ সালে সংরক্ষিত বনের গাছ কাটার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞার পর কাঠের ব্যবসায় ভাটা পড়ে। একই সময়ে নদী ভরাট হয়ে নৌ-বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যায়।
পাট ও কাঠের সেই ব্যবসা এখন নেই, বন্ধ নদীপথও। তবে পশ্চিম বাজারের অর্থনীতি থেমে যায়নি। বরং তা রূপ নিয়েছে রেমিট্যান্স–নির্ভর আধুনিক খুচরা বাজারে।
বর্তমান পশ্চিম বাজার উৎসবনির্ভর কোনো বাজার নয়। দেশের অনেক বাজার যেখানে ঈদ বা পূজার দিকে তাকিয়ে থাকে, পশ্চিম বাজারে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ও তাঁদের দেশে ফেরার সময়ের বেচাকেনা বড় ভূমিকা রাখে। স্থানীয় ব্যবসায়ী রিপন সরদারের ভাষায়, ‘এই এলাকায় মানুষের হাতে পয়সা আছে। তাই বাজার চলে।’
ইউরোপ-আমেরিকায় গ্রীষ্ম বা শীতকালীন ছুটি শুরু হলে দলে দলে প্রবাসী দেশে ফেরেন। তখন পশ্চিম বাজারের ব্যবসাও বাড়ে। তাঁদের রুচি ও ক্রয়ক্ষমতা মাথায় রেখে দোকানগুলোর সাজসজ্জা ও ব্র্যান্ডিংয়েও পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপ-আমেরিকার বিপণিবিতানের আদলে অনেক দোকানে আধুনিক ইন্টেরিয়র দেখা যায়। বাজারের কেন্দ্রের শপিং মলগুলোও মানসম্মত পণ্যের জন্য ক্রেতাদের কাছে বিশ্বস্ত।
কসমেটিকস ও পোশাক ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার বলেন, ‘আমাদের ব্যবসার মূল প্রাণই হলো প্রবাসীরা।’ লন্ডন-আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাঁরা ছুটিতে এলে বেচাকেনা বহুগুণ বেড়ে যায়। তাঁদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী বিদেশি ব্র্যান্ডের আদলে পণ্য সাজানো হয়।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স পশ্চিম বাজারের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি। দৈনিক কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানির এলসি খোলা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙানোর সুবিধার জন্য পশ্চিম বাজার ও এম সাইফুর রহমান রোড এলাকায় এক্সিম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকসহ দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের শাখা এবং এক্সচেঞ্জ হাউস গড়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ক্রেতা ফয়সল আহমেদ বলেন, ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে এই বাজারে আসতেন। তখন বাজারটি অনেক সাদামাটা ছিল। এখন আধুনিক শপিং মলের সাজসজ্জা ভালো লাগে। তবে বাজারের পরিধি বাড়লেও হাঁটার পরিবেশ ও পার্কিং–সুবিধা সেই অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি।
প্রায় ছয় হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যকেন্দ্রের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাজারের কয়েকটি মালিক সমিতি, ব্যাংক কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ ও মূল্যস্ফীতির কারণে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
কাঠের প্রাচুর্যের কারণে পশ্চিম বাজারে একসময় কাঠের ফার্নিচার ও বাদ্যযন্ত্র তৈরির শিল্প গড়ে ওঠে। বাদ্যযন্ত্রের বাজার এখনো টিকে আছে। ‘আলো মিউজিক সেন্টার’-এর মালিক পিঙ্কু দাস জানান, একটি হারমোনিয়াম বানাতে প্রায় সাত দিন সময় লাগে। দাম ১২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। আকাশমণি, গামারি, কেরোসিন, মেহগনি ও সেগুন কাঠ দিয়ে এসব তৈরি হয়। তবে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পীরা মূলধনসংকটে ভুগছেন।
পশ্চিম বাজারে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের আরেকটি নিদর্শন বেতের ফার্নিচার। শিফা কেইন ফার্নিচারের দোকানে সোফা, চেয়ার, দোলনা, মোড়া ও নানা ধরনের বেতের আসবাব পাওয়া যায়। একসময় বৃহত্তর সিলেট বাঁশ ও বেতশিল্পের জন্য পরিচিত হলেও কাঁচামালের অভাব এবং আধুনিক প্লাস্টিক-বোর্ডের আসবাবের দাপটে শিল্পটি হুমকির মুখে। স্বত্বাধিকারী শাহিন মিয়া জানান, পরিবেশবান্ধব ও কারুকার্যময় এসব আসবাব এখনো শৌখিন ক্রেতা এবং বিশেষ করে দেশে আসা প্রবাসীদের আকর্ষণ করে।
কাঁচামালের অভাব, দক্ষ কারিগরের সংকট ও সস্তা বিকল্প আসবাবের কারণে অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বিসিকের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ ও কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত না হলে বেতশিল্প হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ব্যবসায়ীরা জানান, কৃষিপণ্যের বাজারও এখন বাইরের জেলার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কলার আড়তদার মোহাম্মদ আতাউর রহমান ও নূর মিয়া জানান, স্থানীয় উৎপাদন নগণ্য হওয়ায় সাগর, সবরি ও চাঁপা কলার প্রায় পুরোটাই রাজশাহী ও বগুড়া থেকে আসে। বিভিন্ন আয়োজনে ব্যবহৃত পান আসে বরিশাল থেকে। একসময় যে বাজার তিসি, কাউন ও চিনার মতো কৃষিপণ্য রপ্তানি করত, এখন তা অন্য জেলার ওপর নির্ভরশীল।
পশ্চিম বাজারের পাইকারি মৎস্য আড়তে বৃহত্তর সিলেটের মৎস্য অর্থনীতির চিত্রও দেখা যায়। একসময় হাইল হাওর বা হাকালুকির প্রাকৃতিক মাছের ওপর বাজারটি অনেকটাই নির্ভরশীল থাকলেও এখন ৯০-৯৫ শতাংশ মাছই আসে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা পুকুর থেকে।
স্থানীয় আড়তদারদের মতে, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীত মৌসুমে হাওর-বিলের প্রাকৃতিক মাছ পাওয়া যায়। বছরের বাকি সময় বাণিজ্যিক মৎস্য খামারগুলোই বাজারের মূল চালিকা শক্তি। প্রতিদিন ভোর থেকে আড়তে কোটি টাকার মাছ নিলামে বেচাকেনা হয়। এসব মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও রেস্তোরাঁয় যায়।
ব্যবসা-বাণিজ্যের এত প্রসার থাকলেও শহরে অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে। শহরের বিসিক শিল্প এলাকার অবস্থা করুণ। দু-তিনটি স্থানীয় বেকারি কোনোমতে টিকে থাকলেও বেশ কিছু কারখানা পরিত্যক্ত। ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেও অব্যবস্থাপনার কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
সরু রাস্তা ও অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে শহরে যানজটও লেগে থাকে। মুদি ও কৃষিপণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ী সুধীর চন্দ্র বলেন, রাস্তাঘাট বেহাল হওয়ার কারণে মালবাহী ট্রাক বাজারে ঢোকাতে কষ্ট হয়। এতে পরিবহন খরচ বাড়ে এবং তার প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে।
মনু নদের তীরের পশ্চিম বাজার তাই শুধু পণ্য কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি মৌলভীবাজারের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত মানচিত্র। জমিদারদের ‘তুলা’ আদায়ের হাট থেকে পাট ও কাঠের ব্যবসা, সেখান থেকে আজকের রেমিট্যান্স–নির্ভর আধুনিক খুচরা বাজার—সময় ও অর্থনীতির সঙ্গে পশ্চিম বাজারও বদলে গেছে।
একদিকে আধুনিক শপিং মল, ইউরোপীয় ধাঁচের বিপণিবিতান ও ব্যাংকের সারি; অন্যদিকে কাঠের বাদ্যযন্ত্রের দোকান, কলার আড়ত, মাছের বাজার, পানের দোকান, মুদিদোকান—সব মিলিয়ে পশ্চিম বাজারে ঐতিহ্য ও আধুনিক বাণিজ্যের সহাবস্থান। ব্যাংকঋণের সহজলভ্যতা, প্রশস্ত রাস্তাঘাট ও পরিত্যক্ত বিসিক নগরীর মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে মনুতীরের এই বাজার আগামী দিনেও বৃহত্তর সিলেটের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হয়ে থাকতে পারে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
হাসান মাহমুদ নন, আইসিসির আগস্ট মাসের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন শ্রীলঙ্কার সোনাল দিনুশা। আইসিসির মাসসেরা খেলোয়াড়ের দৌড়ে দিনুশা পেছনে ফেলেছেন হাসান ও ওলি রবিনসনকে। গত বছর জুনে অভিষিক্ত দিনুশা এবারই প্রথম আইসিসির মাসসেরা খেলোয়াড় হলেন।হাসান আগস্টের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার বড় দাবিদার ছিলেন। কারণটা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টে তাঁর ৯ উইকেট। রবিনসন আগস্ট মাসে দুই টেস্টে নেন ১৬ উইকেট। ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জেতানোর নায়ক এই পেসার।তবে এসব পারফরম্যান্সকেও ছাপিয়ে গেছেন দিনুশা। গত আগস্টে ভারতের বিপক্ষে ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজে যেন রান করার নেশায় পেয়েছিল দিনুশাকে। ২ টেস্টে চার ইনিংসের তিনটিতে করেছিলেন সেঞ্চুরি। যে ইনিংসে সেঞ্চুরি পাননি, সেটিতেও ৮৪। ডারউইন টেস্টে ৯ উইকেট নিয়েছিলেন হাসান৪২০ রান করে সিরিজে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন দিনুশা। কলম্বোতে তাঁর জোড়া সেঞ্চুরিতে ভারতের বিপক্ষে অবিশ্বাস্যভাবে একটি টেস্ট ড্র করেছিল শ্রীলঙ্কা। অথচ সেই সিরিজ শুরুর আগে শ্রীলঙ্কার হয়ে মাত্র তিনটি টেস্ট খেলেছিলেন এই ক্রিকেটার।হ্যাটট্রিকের কথা ভুলেই গিয়েছিলেন খালেদপ্রথমবার মাসসেরার পুরস্কার পেয়ে দিনুশা বলেছেন, ‘এই স্বীকৃতি আমার কাছে অনেক কিছু। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে এই পুরস্কার পাওয়া পাওয়া আমার জন্য বিশেষ। এই সম্মানের জন্য আমি আইসিসির কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞ।’ভারতের বিপক্ষে সেই সিরিজের স্মৃতিও আলাদা করে মনে রেখেছেন দিনুশা, ‘ভারতের বিপক্ষে সিরিজটি সব সময় আমার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে থাকবে। তিনটি সেঞ্চুরি করা ছিল স্বপ্নের মতো। আর সেটি আরও অর্থবহ হয়েছে কলম্বো ও গলে নিজেদের দর্শকদের সামনে সেঞ্চুরি করতে পারায়।’আমাকে যেন নেকড়েদের সামনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল, ‘স্যান্ডপেপার’ কেলেঙ্কারি নিয়ে স্মিথ
২০০৬ সালে বিনয় মজুমদারের মৃত্যুর পর তার দীর্ঘদিনের বন্ধু বেলাল চৌধুরী প্রথম আলোর শুক্রবারের সাময়িকীতে এ নিবন্ধটি লিখেন। তখনো প্রথম আলোর অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই এতদিন লেখাটি শুধু ছাপা কাগজের পাতাজুড়ে ছিল। আজ বিনয় মজুমদারের জন্মদিনে লেখাটি অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক। কলকাতার সাহিত্যজগৎ বেশ রমরমা। ‘ছোটগল্প’ নামে একটা কাগজে লেখার সূত্র ধরে একঝাঁক নতুন গল্পকারের আবির্ভাব। এদের মধ্যে দেবেশ রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, রতন ভট্টাচার্য, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শংকর চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ প্রমুখ। সেই ছোটগল্পের কাগজটিও আজ আর নেই। সেদিনের সেই প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখকদের মধ্যে কেউ আজ খ্যাতির শিখরে, কেউ এখনো লিখে চলেছেন। কেউবা ইহলীলা সাঙ্গ করে চিরবিদায় নিয়ে নিয়েছেন। কেউবা আর লিখছেনই না। প্রত্যেক দেশের সাহিত্যে এ রকমই হয়।এখানে যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তখন দুনিয়া তোলপাড় করা দুই আমেরিকান শীর্ষ কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ আর পিটার অরলোভস্কি ভারত ছেড়ে চলে গেছেন। ১৯৬৪ সালে নামগোত্রহীন এক যুবকের রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ। যাকে বলা হচ্ছিল জোব চার্নকের পর এ রকমটি আর দেখা যায়নি। চালচুলোহীন শুধু কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসকে কেন্দ্র করে হেলাফেলায় দীর্ঘ এক যুগের ওপর কাটিয়ে এসেছে। অ্যালেন গিন্সবার্গদের প্রায় পিছু পিছুই মার্কিন বৃত্তি নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আমেরিকাগামী। এর মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় মূলত কবিতা লেখার লোক হলেও একটি আঞ্চলিক ভাষায় কুয়োতলা নামে একটি অসাধারণ উপন্যাস লিখে দারুণ হইচই ফেলে দিয়ে নিরুপদ্রব নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। লিখতে শুরু করেছেন কবিতা। কবিতার মধ্যে আবার লিরিকের প্রাধান্যই বেশি। ঠিক এ সময় পাশাপাশি আর একটি নতুন নাম শোনা যেতে লাগল। কবির নাম বিনয় মজুমদার। শেকড়-সূত্রে বাংলাদেশের ফরিদপুরের ছেলে। যদিও জন্ম সেকালের সুদূর বর্মা মুলুকের এক গ্রামে। পিতার কর্মস্থলে। সেই ১৯৫৮-তে বেরিয়েছে জীবনানন্দ দাশকে আত্মসাৎ করা নক্ষত্রের আলোয় নামের কাব্যগ্রন্থটি। এরপরই কবিদের চিরকালীন বন্ধু দেবকুমার বসুর প্রকাশনা সংস্থা বিশ্বজ্ঞান থেকে বেরোয় সেই রহস্যময় সাংকেতিক কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরে এসো চাকা’। কিন্তু এর আগে বিনয় এক রুশ ভদ্রমহিলার কাছে রুশ ভাষা শিখে বেশ কটি চিরায়ত রুশ গ্রন্থের অনুবাদ বের করে বেশ নাম কুড়োন। এই সময় প্রবলভাবে শক্তিমান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় বললেন, ‘বিনয় আমার বন্ধু। সহপাঠী এবং জাত-কবি। ও আমাদের সমসাময়িক হলেও কৃত্তিবাস-এর সঙ্গে সেই অর্থে জড়িত ছিল না। যদিও বিনয়ের কবিতা আমি কৃত্তিবাস-এ নিয়ে গেছি, সুনীলের হাতে দিয়েছি, বেশ কয়েকবার ছাপাও হয়েছে। ওর প্রথম বই ‘নক্ষত্রের আলোয়’ জীবনানন্দের অনুসরণে মুখর, কিন্তু তার পর থেকেই ও জীবনানন্দের অনুসরণে যতি টানে। নিজস্ব ভঙ্গিতে গায়ত্রীর প্রতি কবিতাগুচ্ছ উত্সারিত হয়। সেসব খুব মারাত্মক কবিতা। বিনয় মঞ্চের ওপর ঠিকমতো কেন উঠে দাঁড়াল না, তা আমি বুঝতে পারি না, কিন্তু মনে হয়, ও যে ধরনের কবিতায় বিশ্বাসী, তা মঞ্চে পাঠের উপযোগী নয়, একা একা পড়ার ব্যাপার। আমাদের সময়ে প্রকৃত অলৌকিক কবিতা কী, তা বিনয় লিখে দেখিয়েছে। আমার সঙ্গে দীর্ঘকাল কোনো যোগাযোগ নেই। ওর কবিতাও সাম্প্রতিককালে নজরে আসেনি। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে ওর একটি বিশেষ স্থান আছে এবং থাকবে।’এ ছাড়া বিনয়ের কবিতার আলোচনার সূত্র ধরে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ই প্রথম বিনয়ের কাব্যপ্রতিভার প্রতি যথোচিত অঙ্গুলিনির্দেশ করেন। এবং তার পর থেকেই বিনয়ের কবিতা নিয়ে, বিনয়কে নিয়ে অনেক কল্পকথার জন্ম নিতে থাকে। আসলে বিনয় নিজের জীবনটাকেই কবিতার মধ্যে মিশিয়ে দিয়েছে। বিনয় তার দিনলিপিতে লিখেছে, বারবার লিখেছে, ‘বেঁচে থাকা জিনিসটা খুব ভালো’। তাঁর ডায়েরি বা দিনলিপি আর কবিতা একই—বলেছেন কৃত্তিবাসের সম্পাদক কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।অসুখী বাল্যকাল একজন যুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির মেধাকেও যে কতটা অযৌক্তিক করে তোলে এমনকি ক্রমশ তাঁর মানসিক ভারসাম্য বিপন্ন ও পর্যুদস্ত করে, বিনয় তার প্রমাণ। বিনয় মজুমদারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল—না, কফি হাউসে নয়, আমাদের দেবুদা মানে দেবকুমার বসুর প্রকাশনী সংস্থা বিশ্বজ্ঞান আর যখন-খুশি-বেরুনো নাটক-সম্পর্কিত পত্রিকা দর্শক অফিসে। এর পরে অবধারিতভাবেই কফি হাউসে। কারণ, কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে গেলে সব নদী নয় সব পথ কফি হাউসে গিয়েই মেলে। বিনয়দাকে প্রথম পরিচয়ে আমার মোটেই অস্বাভাবিক মনে হয়নি। শুধু মাঝেমধ্যে দেখা যেত হঠাৎ কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে টেবিলে তাল ঠুকতে ঠুকতে আনমনে গাইছেন ‘অগ্নিবীণা বাজাও তুমি...’। তার পরেই কিছুক্ষণ অন্য জগতে। এভাবে দিনের পর দিন একই টেবিলে বসার সুবাদে যতটুকু আলাপ-পরিচয় হয়, তার চেয়ে কিছুটা বেশিই হয়ে গিয়েছিল। কথাবার্তা হতো। তবে বিক্ষিপ্ত। কোনো কোনো দিন দেখা যেত, হয়তো প্রথম ট্রেন ধরেই ঠাকুরনগর থেকে বিনয় এসে টেবিলজুড়ে বসে আছে। ওকে দেখলে সে টেবিলে কোনো অর্বাচীন ছাড়া বসবার সাহস হবে কার। আর আমি আগে এসে বসে থাকলে তো কথাই নেই, বিনয়দা সরাসরি এসে তার হাতের ঢাউস ব্যাগটা একপাশে রেখে বসে পড়লেই হলো। মেজাজ–মর্জি অনুকূল থাকলে এসব সময় অনেক অন্তরঙ্গ কথাবার্তাও হতো। আবার কোনো কোনো দিন উগ্রচণ্ডী ধারণ করলে অন্যের জন্য প্রমাদ গুনতে হলেও আমার সঙ্গে হৃদ্য আলাপে কোনো বিঘ্ন ঘটত না।তখন আমি আমার ভাসমান জীবনে থাকতুম শিয়ালদার কাছাকাছি বৈঠকখানা রোডে। কারমাইকেল হোস্টেলের পাশে। একদিন শহরব্যাপী কী একটা বড় ধরনের গোলমাল হয়ে যাওয়াতে বিনয়দা আমার সঙ্গেই বিনা দ্বিধায় রাতের আশ্রয়টুকু শেয়ার করলেন। স্বাভাবিকভাবেই মেঝের ওপর ফরাস পেতে রাত কাটালেন বিনা উপদ্রবে। একসময় বিনয়দা সম্পর্কে ‘কলকাতা স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় ক্যালকাটা নোটবুকে বিনয়ের প্রশস্তি করে একটা লেখা বেরুল। পরে জানা গিয়েছিল, লেখাটি লিখেছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। যাঁর অনেক পরিচয়ের মধ্যে বুদ্ধদেব বসুর বড় জামাতা, স্টেটসম্যানেই কাজ করেন। নিজেও কবিতা লেখেন। কবিদের ওপর অসাধারণ সব মননশীল ও সুখপাঠ্য প্রবন্ধ লেখেন। চলাফেরায় সাহেবি কেতা। দু-একবার দূর থেকে দেখেছি। ওই লেখালেখির পর থেকে বিনয়ের আশ্রয়দাতা হলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। জ্যোতির্ময়রা তখন থাকেন এক বিরাট পরিবার নিয়ে বন্ডেল রোডে। সে বাড়িরই একটা ঘরে জায়গা হলো বিনয়ের। তখন পর্যন্ত আমি এসবের কিছুই জানতুম না। বুদ্ধদেব বসুর কন্যা মীনাক্ষী দত্ত তখন রীতিমতো কিংবদন্তির নায়িকা। একদিন বিনয়দা আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, জ্যোতির্ময় বাবুকে চেনো তো, তিনি আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে তাঁদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে চান। আমি তোমার কথাই ভেবেছি। আমাকে একটু দোনোমনা করতে দেখে বললেন, আরে ভয়ের কিছু নেই। জ্যোতির্ময় বাবু মীনাক্ষী দেবী এরা খুবই ভালো মানুষ। তুমি আর কিছু না ভেবে, এই ঠিকানা দিচ্ছি, কাল সকালে চলে এসো। আমি অপেক্ষায় থাকব।পরদিন সকালে গুটি গুটি পায়ে গিয়ে ঠিকানামতো কড়া নাড়লুম। একটা লোক বেরিয়ে এসে বলল, ওই যে ছোট্ট দোতলা ঘরটা দেখছেন, ওটাতেই বিনয়বাবু থাকেন। হেলাফেলায় কথা কটি বলে লোকটি তার কাজে চলে গেল। লোকটির বলা এবং চলার ভঙ্গিতে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব দেখে একবার ভাবলুম, যা হবার হয়েছে, এবার মানে মানে কেটে পড়ি। হঠাৎ দেখি দোতলার একটি ঘর থেকে সহাস্যে উত্ফুল্ল মুখে বেরিয়ে আসছেন বিনয়দা। বললেন, আরে এসো এসো বেলাল, তুমি এসেছ দেখে কত যে খুশি হয়েছি। বিনয়দার গা–ভর্তি তুলো। বোঝা গেল, বালিশটা ফেঁসে গিয়ে সব তুলো বেরিয়ে তার শরীরে লেপ্টে রয়েছে। যাহোক, সে অবস্থাতেই আমাকে প্রায় টেনেহিঁচড়ে বড় বাড়ির নিচের তলায় একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে একজন সুবেশী হাস্যোজ্জ্বল তরুণের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, এই আমার বন্ধু বেলাল, যার কথা আগেই আপনাকে বলেছিলাম। ভদ্রলোক, মানে জ্যোতির্ময় দত্ত দেখলুম বিনয়ের অবতার। আরে কী সৌভাগ্য, আসুন আসুন, ভেতরে আসুন। বাড়িটা আপনারই ভাববেন, এখানে সংকোচের কোনো বালাই নেই। এই যে কী একটা নাম বললেন, এখানে একজন মান্য অতিথি এসেছেন। তাঁকে একটু সমাদর করুন। খাবারটাবার কিছু দিন।পাশেই একটি সুদর্শনা রাতশাড়িতে ঘুমচোখে কাকে যেন খুঁজছিলেন। মেয়েটি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করল না আমাদের দিকে। আমার দৃষ্টি কিন্তু তখনো সেই কিশোরীতে নিবদ্ধ।এরপর প্রথম দেখা সেই মুশকো লোকটা একটা জামবাটিতে করে কয়েক কোষ কাঁঠাল আর মুড়ি এনে হেলাফেলায় আমাদের দিল। বিনয়দা দেখলাম গোগ্রাসে সেই কাঁঠালসহযোগে মুড়ি খেতে শুরু করে দিয়েছেন। আমি কিন্তু কাঁঠাল খাই না। আসলে কাঁঠালের গন্ধটাই কেন জানি না আমার সহ্য হয় না। আমি খেলাম কি খেলাম না, সে আর দেখছে কে। ঘরভর্তি লোকজন। চা খাচ্ছে, গল্পগুজব করছে। আমি সহজেই টের পেয়ে গেলাম গৃহকর্তা যতই খাতির করুন না কেন, এ বাড়িতে বিনয়ের অবস্থানটা কোথায়। ইশারাই কাফি। পরে যখন জ্যোতিদা, দিদি, তিতির ও গোগোর সঙ্গে সম্পর্কটা বেশ গাঢ় হয়ে উঠল, তখন ওদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে আমিও খানিকটা জড়িয়ে পড়লাম।জ্যোতিদার উত্সাহ এক এক সময় এক এক দিকে ছোটে। বিনয়কে নিয়ে তাদের পরিবার তটস্থ হয়ে আছে। বিনয় তখন কবিতায় ঈশ্বরীর খোঁজে ব্যাপৃত। এখানে মীনাক্ষী দত্তের ‘দীর্ঘদিন বিনয়ের সঙ্গে’ লেখাটি থেকে একটি স্তবক তুলে দিলেই পাঠক বুঝতে পারবেন বিনয়ের প্রকৃত মানসিক অবস্থাটা—‘বিনয় মাঝে মাঝেই কোনো না কোনো মেয়েকে ওর “ঈশ্বরী” বানিয়ে নিতো। অমিতা চক্রবর্তী, ফুল্লরা গঙ্গোপাধ্যায়, গায়ত্রী চক্রবর্তী এ রকম অনেক। এদের কাউকেই ও চিনতো না। মানুষ যেমন মূর্তি গড়ে পুজো করে, সেই মূর্তিকে কাপড় গয়না পরায়, দাঁত মাজায়, স্নান করায়, নাম দেয় এও তেমনি। রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা পুরুষ, বিনয়ের নারী ঈশ্বরী। বিশেষ কোনো রমণীর সঙ্গে এর সম্পর্ক খোঁজা হাস্যকর। তখন একটা গল্প চালু ছিল যে গায়ত্রীর ভক্তরা বেকার ল্যাবরেটরির পেছনে নিয়ে গিয়ে বিনয়কে মেরেছিল। মাথায় এমন মেরেছিল যে তারপর থেকেই ওর মাথার গোলমাল। এটা ভুল, কারণ গায়ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, গায়ত্রী বিনয়কে চিনত না। একবার বোধ হয় দেখেছিল—এ ছাড়া ওর বিষয়ে গায়ত্রী আর বিশেষ কিছু জানে না। বিনয় একটা চটি বই বার করেছিল নীল তুলোট কাগজের মলাট দিয়ে, আমাদের বাড়িতে থাকার সময়। তার কপিরাইট আমাকে দিয়েছিল। মাত্রই কয়েক কপি বাঁধাই হয়ে এসেছিল বাড়িতে বোধ হয়। কয়েক দিন পরেই দেখলাম ওই অমূল্য পুস্তকখানির সর্বস্বত্ব আর আমার নেই। তবে ওই সময় ওর কবিতার খাতাগুলি আমাকে দিয়েছিল। আমার জাগতিক জিনিসের প্রতি অমনোযোগ সত্ত্বেও তার দু-একটি এখনো আমার কাছে রয়ে গেছে। সিল্ক বা তসর দিয়ে তৈরি ব্লাউজ সহজে ফেঁসে যায়। সেই ব্লাউজ দিয়ে বিনয় বেশ কায়দা করে খাতা বাঁধিয়েছিল। বিনয়ের যে দুটি খাতা আমার কাছে এখনো আছে, তা আবার ব্লাউজের টুকরো দিয়েই বাঁধানো।’আসলে এই ঈশ্বরীর তালিকায় স্বয়ং মীনাক্ষী দত্তও ছিলেন। তা না হলে কেউ সযত্নে ব্লাউজের কাপড় দিয়ে খাতা বাঁধাই করে? আসলে নারীসংক্রান্ত একধরনের মনোবিকারের কারণেই বিনয় মাঝে মাঝে বলত, আগামী এক শ বছরের মধ্যে পৃথিবী মনুষ্যবিহীন হয়ে যাবে। সমস্ত প্রকৃতিসদন বন্ধ হয়ে যাবে। বিনয়ই করে দেবে। মনস্তাত্ত্বিক হতে হয় না বিনয়ের এসব বিকৃতি বোঝার জন্য। বিনয়ের স্বহস্তেই লেখা রয়েছে, ‘পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানবীকে চিরতরে সম্পূর্ণ বন্ধ্যা করে দিয়েছি।’—ঈশ্বরী ও ঈশ্বর। ১৬/১১/১৯৬৫।বিনয় সম্পর্কে যা জানি, তার সিকিভাগও লেখা গেল না তাড়াহুড়োর কারণে। পরে নাহয় আর একবার দেখা যাবে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে নিজস্ব সোলার প্যানেল স্থাপনের শর্তে রাত আটটায় দোকান বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে দোকান মালিক সমিতি। এ সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটে দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন। লোডশেডিং এবং রাত আটটায় বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে দোকান ও প্রতিষ্ঠানে বেচাকেনা অনেক কমে গেছে, ব্যবসায়ের ক্ষতি বাড়ছে। এ অবস্থায় দেশের সব মার্কেট ও বড় বিপণিবিতানগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ (সোলার প্যানেল) স্থাপনে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।বিপণিবিতানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) বা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২ শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণসহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দোকান মালিক সমিতি। সংগঠনটি বলেছে, স্বল্প সুদে এই ঋণসহায়তা পেলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপণিবিতানগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব।আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মগবাজারে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন।এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন দোকান মালিক সমিতির মহাসচিব মো. জহিরুল হক ভূঁইয়া, সহসভাপতি আব্দুল কাইয়ুম তালুকদার ও হেজাজুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুজ্জামান, আব্দুল মোতালেব রুবেল, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জসীম উদ্দীন আহমেদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফেজ হারুন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শরিফুল ইসলামসহ রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ী নেতারা।সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। রাত আটটায় দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত এবং সন্ধ্যা ছয়টা থেকেই বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দ্রুততম সময়ে সোলার প্যানেল স্থাপনই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।এমন পরিস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনসংক্রান্ত ১০ দফা দাবি জানায় দোকান মালিক সমিতি। সংগঠনটি বলেছে, বিপণিবিতানে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর মেয়াদে মাত্র ২ শতাংশ সুদে (কিস্তিভিত্তিক) ঋণ প্রদান করতে হবে। সোলার প্যানেল যেন মানসম্পন্ন হয়, সে জন্য বিএসটিআই ও ইডকলের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।সোলার প্যানেল স্থাপনের পর লাইসেন্স ফি ও সার্ভিস চার্জ প্রদান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সমিতি। উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ সাড়ে ১০ শতাংশ হারে জাতীয় গ্রিডে বিক্রির সুযোগ আরও সহজ ও জোরালো করার দাবি সংগঠনটির।অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির যৌথ চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপন নিশ্চিত করা; সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন কার্যক্রম তদারকি এবং যেকোনো সমস্যা ও দুর্বলতা নিরসনে তিন মাস মেয়াদি একটি শক্তিশালী রেগুলেটরি বোর্ড গঠন করা; ব্যক্তিমালিকানাধীন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা জেলা পরিষদের অধীনে থাকা যেসব মার্কেট কাঠামোগত অনুমোদনের জটিলতায় আছে, সেগুলোর সোলার প্যানেল স্থাপনের আবেদন সহজ করা; সোলার প্যানেল স্থাপনের খরচ বহন ও ঋণ পরিশোধের জন্য একটি টেকসই তহবিল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।আগামী ছয় মাসের মধ্যে নিজস্ব সোলার প্যানেল স্থাপনের শর্তে ব্যবসায়ীদের জন্য রাত আটটায় দোকান বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে দোকান মালিক সমিতি।দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এই বিদ্যুৎ–সংকটের দীর্ঘ সময় আর ভুগতে রাজি না। বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা পর্যন্ত আমাদের বিপণিবিতান আছে। বিপণিবিতানগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা গেলে এবং ব্যবসায়ীরা সৌর প্যানেলের ঋণ পরিশোধ করে দিতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে মার্কেটকে বিদ্যুৎ বিল দিতেই হবে না। উল্টো আমরা বন্ধের দিনগুলোতে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারব।’হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘যদি মাত্র ২ শতাংশ সুদে ৫ বছর অথবা ৭ বছর মেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সারা দেশে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হব।’