নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য সাংবাদিকদের কার্ড ইস্যু প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ লক্ষ্যে Software Requirement Specification বা SRS প্রণয়নের জন্য ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. আব্দুল মমিন সরকার বিষয়টি জানিয়েছেন।
ইসি সচিব আখতার আহমেদের গঠন করে দেওয়া কমিটির আদেশে বলা হয়েছে, অনলাইন নিবন্ধন থেকে শুরু করে কার্ড ইস্যু পর্যন্ত পুরো কার্যক্রমের বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করবে কমিটি।
নির্বাচন কমিশনের সভায় বিস্তারিত আলোচনার পর সাংবাদিকদের নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য কার্ড ইস্যুর লক্ষ্যে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের অংশ হিসেবে SRS প্রণয়নের জন্য এই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমকে। আর সদস্য হিসেবে রয়েছেন ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. আব্দুল মমিন সরকার।
এছাড়া রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’র (আরএফইডি) সভাপতি কাজী এমাদ উদ্দীন জেবেল, সাধারণ সম্পাদক ইকরাম-উদ দৌলাসহ তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং ইসি কর্মকর্তারা কমিটিতে রয়েছেন।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য কার্ড ইস্যুর লক্ষ্যে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের অংশ হিসেবে SRS প্রণয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে কার্ড ইস্যু পর্যন্ত যাবতীয় কার্যক্রমের বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন করতে হবে।
অর্থাৎ সাংবাদিকদের অনলাইন নিবন্ধন, তথ্য যাচাই এবং পরবর্তী সময়ে কার্ড ইস্যু পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাঠামো ও সুপারিশ তৈরি করবে কমিটি।
SRS প্রণয়নের কাজ করতে গিয়ে প্রয়োজন হলে কমিটি নতুন সদস্য কোঅপ্ট করতে পারবে। অর্থাৎ কাজের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা প্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে কমিটির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে কোনো প্রকার ট্রায়াল ছাড়াই অনলাইনে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। সে সময় একটি ওয়েবসাইটও তৈরি করা হয় অনেকটা তড়িঘড়ি করে। তবে সেই সাইটে আবেদনের পর ১৪ হাজার সাংবাদিকের তথ্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় গণমাধ্যমের আপত্তি ও দেশব্যাপী সমালোচনার মুখে সে প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে নির্বাচন কমিশন।
তবে এবার আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি কার্যকর উপায় ও সফটওয়্যার প্রস্তুতের দিকে যাচ্ছে সংস্থাটি।
এমওএস/কেএএ/
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
কয়লা সংকট কাটিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর পর ফের কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট। এতে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্রে জানা গেছে, ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত ৭ আগস্ট থেকে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমতে শুরু করে। প্রায় এক মাস ধরে সীমিত উৎপাদনের পর গত মাসের শেষ দিকে কেন্দ্রটি ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়াতে শুরু করে। সূত্র বলছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে এক ইউনিট বন্ধ হওয়ার পরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। এতে লোডশেডিং বাড়ছে। আরও পড়ুন আদানির এক ইউনিট বন্ধ, দেশে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্যে দেখা যায়, ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা পিক রাত ৯টায় আদানি থেকে বিদ্যুৎ এসেছে ১৪৩০ মেগাওয়াট। এর দুই ঘণ্টা পর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমতে শুরু করেছে। গতকাল ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা পিকে ৬৯১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে। আজও ৭০০ মেগাওয়াট এর কমবেশি বিদ্যুৎ আসছে। যেখানে বিদ্যুৎ আসতো ১২০০ থেকে ১৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় আদানির কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে জাতীয় গ্রিডে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণও বেড়েছে। কেন্দ্রটির কারিগরি ত্রুটি মেরামত করে ইউনিটটি দ্রুত চালু করা গেলে উৎপাদন আবার বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ইউনিটটি কবে নাগাদ পুনরায় উৎপাদনে ফিরবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আরও পড়ুন ঢাকায় চরম লোডশেডিং, দিনে ও রাতে একাধিকবার থাকছে না বিদ্যুৎ ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট আছে সেখানে। একটি ইউনিট বন্ধের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এমনিতেই জ্বালানি সংকটকালীন উৎপাদন ধরে রেখে চাহিদা মতো বিদ্যুৎ সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। এর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমায় চাপ আরও বেড়েছে। এনএস/এমকেআর
রোম শহরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাস্তার পাশে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ইতালীয় সেনারা। সেই মশালের আলোয় ছুটছেন ম্যারাথনের দৌড়বিদেরা। ৪২ কিলোমিটারের বেশি পথ পেরিয়ে দৌড় তখন শেষের দিকে। সবার সামনে দুই আফ্রিকান। একজন ইথিওপিয়ার আবেবে বিকিলা। অন্যজন মরক্কোর রাদি বেন আবদেসসালাম। দুজনের মধ্যে ব্যবধান খুবই কম। দীর্ঘ পথ প্রায় পাশাপাশি দৌড়েছেন। কেউ কাউকে ছাড়তে পারেননি। ফিনিশিং লাইন থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে এসে হঠাৎ গতি বাড়ালেন বিকিলা। রাদি চেষ্টা করলেন তাঁর সঙ্গে থাকার। পারলেন না। একটু একটু করে ব্যবধান বাড়তে শুরু করল। বিকিলা ছুটতে থাকলেন রোমের ঐতিহাসিক আর্চ অব কনস্টানটাইনের দিকে। তাঁর পায়ে কোনো জুতা নেই। কিছুক্ষণ পর ফিনিশিং লাইন পার করলেন তিনি। সময় নিলেন ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ১৬ দশমিক ২ সেকেন্ড। দ্বিতীয় হওয়া রাদি তখনো পেছনে। তারিখটি ছিল ১৯৬০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। সেদিনের ওই দৌড় আবেবে বিকিলার জীবন তো বদলে দিয়েছিলই, একই সঙ্গে বদলে দিয়েছিল বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে আফ্রিকাকে দেখার দৃষ্টিও। বিকিলার সময়টি ছিল তখনকার বিশ্বসেরা। আগের বিশ্বসেরা সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৮ সেকেন্ড কম সময় নিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে গড়েছিলেন অলিম্পিক রেকর্ড। আফ্রিকার কোনো দেশের প্রতিনিধিত্ব করে অলিম্পিক সোনা জেতা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাথলেটও হন তিনি।প্রায় অচেনা একজন দৌড়বিদঅথচ রোমে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বিকিলা খুব পরিচিত নাম ছিলেন না। আবেবে বিকিলার জন্ম ১৯৩২ সালের ৭ আগস্ট, ইথিওপিয়ায়। তাঁর বেড়ে ওঠা ছিল সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে। পরে তিনি ইথিওপিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসির ইম্পেরিয়াল গার্ডে যোগ দেন। সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ই তাঁর দৌড়ানোর ক্ষমতা নজরে আসে।তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ফিনল্যান্ডে জন্ম নেওয়া সুইডিশ কোচ ওনি নিসকানেন। ইথিওপিয়ার অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন নিসকানেন। বিকিলার শারীরিক সক্ষমতা দেখে তাঁকে দূরপাল্লার দৌড়ের জন্য তৈরি করতে শুরু করেন তিনি।রোম অলিম্পিকের আগে ইথিওপিয়ায় বাছাই ম্যারাথনে বিকিলা সময় নেন ২ ঘণ্টা ২১ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। ইথিওপিয়ার উচ্চভূমিতে করা সেই সময়টিও তখনকার অলিম্পিক রেকর্ডের চেয়ে ভালো ছিল। এই ফল তাঁকে অলিম্পিক দলে জায়গা করে দেয়।তবে রোমে ম্যারাথনের সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় বিকিলা ছিলেন না। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সের্গেই পোপভকে নিয়ে। ১৯৫৯ সালে পোপভ ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ৪৫ দশমিক ২ সেকেন্ডে ম্যারাথন শেষ করে বিশ্বসেরা টাইমিং করেছিলেন। ফলে তাঁকেই সোনার অন্যতম দাবিদার মনে করা হচ্ছিল।ফিনিশিং লাইন পেরিয়ে আবেবে বিকিলাখালি পায়ে কেনরোমে এসে বিকিলা আলোচনায় এলেন অন্য একটি কারণে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ম্যারাথনে দৌড়াবেন খালি পায়ে। ইথিওপিয়ায় বিকিলা জুতা পরেও অনুশীলন করতেন, আবার খালি পায়েও দৌড়াতেন। রোমে তাঁর ব্যবহারের জুতা নিয়ে সমস্যা হয়। নতুন জুতা পরে পায়ে ফোসকা পড়ে। ফলে ম্যারাথনের দিন নতুন জুতা পরে ঝুঁকি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। খালি পায়ে দৌড়ানো তাঁর জন্য নতুন কিছু ছিল না। এভাবেই তিনি বহুবার অনুশীলন করেছিলেন।অন্য রকম এক ম্যারাথন১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকের ম্যারাথনটিও ছিল অন্য রকম। অলিম্পিকের ম্যারাথন সাধারণত স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হতো। রোমে সেই প্রথা ভাঙা হয়। এটিই ছিল প্রথম অলিম্পিক ম্যারাথন, যার শুরু বা শেষ—কোনোটিই মূল অলিম্পিক স্টেডিয়ামে হয়নি।দৌড়ের দূরত্ব ছিল ৪২ দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার। রোমের দিনের গরম এড়াতে প্রতিযোগিতা শুরু করা হয় বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। ৩৫টি দেশের ৬৯ জন দৌড়বিদ অংশ নেন।শুরুর জায়গা ছিল রোমের পিয়াজা দেল ক্যাম্পিদোলিও। সেখান থেকে পথ চলে যায় প্রাচীন রোমের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশ দিয়ে। দৌড়বিদেরা কারাকাল্লার স্নানাগার এলাকা পেরিয়ে যান। এরপর পথ চলে যায় প্রাচীন অ্যাপিয়ান ওয়ের দিকে। শেষ গন্তব্য রাখা হয়েছিল আর্চ অব কনস্টানটাইন।দৌড় শুরু হয়েছিল দিনের আলোয়। কিন্তু ম্যারাথন শেষ হওয়ার আগেই রোমে অন্ধকার নেমে আসে। পথের শেষ অংশ আলোকিত করার জন্য রাস্তার পাশে ইতালীয় সেনাদের দাঁড় করানো হয়েছিল। তাঁদের হাতে ছিল মশাল। সেই মশালের আলোয় শেষ কয়েক কিলোমিটার দৌড়ান প্রতিযোগীরা।দৌড় প্রতিযোগিতায় আবেবে বিকিলা (১১ নম্বর)সামনে এলেন দুই আফ্রিকানদৌড়ের শুরুতে বিকিলা একাই সামনে চলে যাননি। প্রথম দিকে এগিয়ে ছিলেন বেলজিয়ামের অরেল ভানদেন্দ্রিসে। সামনের দলে আরও কয়েকজন ইউরোপীয় দৌড়বিদ ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বিকিলা এবং মরক্কোর রাদি বেন আবদেসসালাম।১০ কিলোমিটার পার হতে সময় লাগে ৩১ মিনিট ৭ সেকেন্ড। তখনো কয়েকজন দৌড়বিদের মধ্যে লড়াই চলছিল। ২০ কিলোমিটারের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। বিকিলা ও রাদি অন্যদের থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর কার্যত রোমের ম্যারাথনটি পরিণত হয় ইথিওপিয়া ও মরক্কোর দুই দৌড়বিদের লড়াইয়ে।২০ কিলোমিটার তাঁরা পার করেন ১ ঘণ্টা ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে। ২৫ কিলোমিটারে দুজনের সময়ই ছিল ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট ৪৭ দশমিক ৬ সেকেন্ড। ৩০ কিলোমিটারেও তাঁরা একসঙ্গে। সময় ১ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট ২৯ সেকেন্ড।৩৫ কিলোমিটার পার হওয়ার পরও কেউ কাউকে ছাড়তে পারেননি। তখন তাঁদের সময় ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ২৭ সেকেন্ড। ৩৭ কিলোমিটারেও দুজন পাশাপাশি। সময় ১ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট ৫৮ সেকেন্ড।পেছনের দৌড়বিদেরা ততক্ষণে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন। ফলে সোনার পদক কার হবে, সেটি নির্ভর করছিল বিকিলা ও রাদির শেষ কয়েক কিলোমিটারের ওপর।শেষ ৫০০ মিটারে বদলে গেল সবদুজন পাশাপাশি ছুটতে ছুটতে রোমের পিয়াজা দি পোর্তা কাপেনার কাছে পৌঁছান। ফিনিশিং লাইন তখন প্রায় ৫০০ মিটার দূরে। ঠিক এই জায়গাতেই গতি বাড়িয়ে দেন বিকিলা।এতক্ষণ রাদি তাঁর সঙ্গে তাল রাখতে পেরেছিলেন। এবার আর পারলেন না। বিকিলা ব্যবধান বাড়িয়ে একা এগিয়ে গেলেন আর্চ অব কনস্টানটাইনের দিকে।ফিনিশিং লাইন পার করার সময় বিকিলার ঘড়িতে ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ১৬ দশমিক ২ সেকেন্ড। রাদি বেন আবদেসসালাম দ্বিতীয় হন ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট ৪১ দশমিক ৬ সেকেন্ডে।নিউজিল্যান্ডের ব্যারি ম্যাগি তৃতীয় হন। তাঁর সময় ছিল ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ১৮ দশমিক ২ সেকেন্ড। আর প্রতিযোগিতার অন্যতম ফেবারিট সের্গেই পোপভ হন পঞ্চম।১৯৬০ সালের অলিম্পিক ম্যারাথনে জয়ের পর আবেবে বিকিলাকে ‘স্টার অব ইথিওপিয়া’ পদক দিচ্ছেন সম্রাট হাইলে সেলাসিযে জায়গায় গতি বাড়ালেন, সেখানেও ইতিহাসবিকিলা যে জায়গায় রাদিকে পেছনে ফেলে গতি বাড়িয়েছিলেন, সেই জায়গাটিরও আলাদা ইতিহাস ছিল। পিয়াজা দি পোর্তা কাপেনার কাছে তখন দাঁড়িয়ে ছিল ইথিওপিয়ার প্রাচীন আকসুম নগরী থেকে নিয়ে আসা একটি ওবেলিস্ক। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ইথিওপিয়ার বেদনাদায়ক ইতিহাস।বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট ইতালি ১৯৩৫ সালে ইথিওপিয়া আক্রমণ করে। পরের বছর ইতালীয় বাহিনী আদ্দিস আবাবা দখল করে। ইতালির দখলদারত্বের সময় আকসুমের প্রাচীন একটি ওবেলিস্ক খুলে রোমে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেটি পোর্তা কাপেনার কাছে স্থাপন করা হয়েছিল।দুই দশকের কিছু বেশি সময় পর সেই ওবেলিস্কের পাশ দিয়েই ছুটে গেলেন একজন ইথিওপীয়। আর ঠিক সেই এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলে অলিম্পিক সোনার দিকে এগিয়ে গেলেন বিকিলা।এই ঘটনাকে তাই পরে শুধু ক্রীড়ার দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। এর সঙ্গে ইথিওপিয়ার ইতিহাসও যুক্ত হয়ে যায়। যে দেশের সেনাবাহিনী ইথিওপিয়া দখল করেছিল, সেই দেশের রাজধানীতে দাঁড়িয়ে একজন ইথিওপীয় অলিম্পিকের সবচেয়ে কঠিন ইভেন্টগুলোর একটি জিতলেন। যে ওবেলিস্ক বিজয়ের স্মারক হিসেবে ইথিওপিয়া থেকে রোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার পাশ দিয়েই তিনি সোনার পথে শেষ আক্রমণটি করলেন।আফ্রিকার বছর, আফ্রিকার জয়সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬০ সাল বিশ্ব ইতিহাসে ‘আফ্রিকার বছর’ হিসেবে পরিচিত। ওই বছর ১৭টি আফ্রিকান দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। ঔপনিবেশিক শাসন ভেঙে আফ্রিকার রাজনৈতিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় বিশ্ব ক্রীড়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চে আবির্ভূত হলেন আবেবে বিকিলা।তাঁর আগে আফ্রিকার অ্যাথলেটরা অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন, পদকও জিতেছেন। কিন্তু বিকিলাই ছিলেন আফ্রিকার কোনো দেশের হয়ে অলিম্পিক সোনা জেতা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাথলেট। ফলে তাঁর সাফল্যের তাৎপর্য ইথিওপিয়ার সীমা ছাড়িয়ে যায়।বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে তখনো পূর্ব আফ্রিকার বর্তমান আধিপত্য শুরু হয়নি। এখন ইথিওপিয়া বা কেনিয়ার দৌড়বিদদের ম্যারাথন কিংবা পাঁচ ও দশ হাজার মিটারে ফেবারিট হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। ১৯৬০ সালে পরিস্থিতি এমন ছিল না। বিকিলা সেই ধারণা বদলে দেওয়ার প্রথম বড় নাম।১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকে ম্যারাথনে দৌড়াচ্ছেন আবেবে বিকিলাচার বছর পর আরও বড় বিস্ময়চার বছর পর তিনি দেখিয়ে দেন, রোমের সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ১৯৬৪ সালের অলিম্পিক হয়েছিল টোকিওতে। সেখানে বিকিলা গেলেন বর্তমান অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। কিন্তু প্রতিযোগিতার মাত্র ৪০ দিন আগে তাঁর অ্যাপেন্ডিক্সে অস্ত্রোপচার হয়। ফলে তিনি ম্যারাথনে নামতে পারবেন কি না, তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছিল।শেষ পর্যন্ত তিনি নামলেন। এবার অবশ্য খালি পায়ে নয়। জুতা পরে দৌড়ালেন।১৫ কিলোমিটারের পর গতি বাড়াতে শুরু করেন বিকিলা। এরপর একসময় অন্য সবাইকে পেছনে ফেলে একাই সামনে চলে যান। রোমের মতো শেষ ৫০০ মিটার পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়নি।টোকিওর অলিম্পিক স্টেডিয়ামে যখন তিনি ঢুকলেন, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তখন অনেক পেছনে। বিকিলা ম্যারাথন শেষ করেন ২ ঘণ্টা ১২ মিনিট ১১ দশমিক ২ সেকেন্ডে। আবারও বিশ্বসেরা সময়। দ্বিতীয় হওয়া ব্রিটেনের ব্যাসিল হিটলির সময় ছিল ২ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ১৯ দশমিক ২ সেকেন্ড। অর্থাৎ চার মিনিটের বেশি ব্যবধানে জিতেছিলেন বিকিলা।টোকিওর জয় তাঁকে আরও একটি ইতিহাসের মালিক করে। তিনিই প্রথম পুরুষ দৌড়বিদ, যিনি অলিম্পিক ম্যারাথনে পরপর দুই আসরে সোনা জেতেন।১৩ ম্যারাথনের ১২টিতেই জয়১৯৬০ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে বিকিলা যে ১৩টি ম্যারাথন শেষ করেছিলেন, তার ১২টিতেই জিতেছিলেন। একমাত্র হার ১৯৬৩ সালের বোস্টন ম্যারাথনে। সেখানে তিনি পঞ্চম হয়েছিলেন।১৯৬৮ সালে মেক্সিকো সিটি অলিম্পিকে আবার নামেন বিকিলা। লক্ষ্য ছিল টানা তৃতীয় সোনা। কিন্তু এবার শরীর সঙ্গ দেয়নি। পায়ের সমস্যা নিয়ে দৌড় শুরু করেছিলেন। প্রায় ১৭ কিলোমিটার যাওয়ার পর প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।তবে ম্যারাথনের সোনা ইথিওপিয়ার হাতছাড়া হয়নি। বিকিলার স্বদেশি মামো ওলদে সেবার চ্যাম্পিয়ন হন।এরপর পূর্ব আফ্রিকার উত্থানএরপর বিশ্ব দূরপাল্লার দৌড়ে পূর্ব আফ্রিকার উত্থান আর থামেনি। ইথিওপিয়া ও কেনিয়া হয়ে ওঠে এই খেলার দুই বড় শক্তি। পরের কয়েক দশকে এই অঞ্চল থেকে এসেছেন কিপ কেইনো, মিরুটস ইফটার, হাইলে গেব্রেসেলাসি, পল টারগাট, কেনেনিসা বেকেলে, তিরুনেশ দিবাবা ও এলিউড কিপচোগের মতো দৌড়বিদেরা।বিশ্ব অ্যাথলেটিকসও বিকিলার রোমের জয়কে পরবর্তী পূর্ব আফ্রিকান দূরপাল্লার দৌড়ের উত্থানের পথ দেখানো ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে।১৯৬৮ সালে আবেবে বিকিলাজীবনের শেষ লড়াইতবে বিকিলার নিজের জীবনের শেষ অংশ ছিল কঠিন। ১৯৬৯ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। তাঁর ঘাড় ও মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। চিকিৎসার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তিনি আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেননি।তারপরও খেলাধুলা ছাড়েননি। হুইলচেয়ারে বসে তিরন্দাজিসহ বিভিন্ন খেলায় অংশ নেন। ১৯৬৯ সালের স্টোক ম্যান্ডেভিল গেমসেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা পরবর্তী সময়ে প্যারালিম্পিক আন্দোলনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।১৯৭৩ সালের ২৫ অক্টোবর মারা যান আবেবে বিকিলা। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪১ বছর। গাড়ি দুর্ঘটনার আঘাতের পরবর্তী জটিলতার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল। ইথিওপিয়ায় জাতীয় বীরের মর্যাদা পাওয়া বিকিলার শেষকৃত্যে হাজারো মানুষ অংশ নেন।যে দৌড় শেষ হয়নি১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিক এমনিতেই ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। সেই আসরে যুক্তরাষ্ট্রের উইলমা রুডলফ তিনটি সোনা জিতেছিলেন। বক্সিংয়ে সোনা জিতেছিলেন ১৮ বছরের ক্যাসিয়াস ক্লে। কয়েক বছর পর যাঁকে বিশ্ব চিনেছে মোহাম্মদ আলী নামে।তারপরও রোম অলিম্পিকের সবচেয়ে স্মরণীয় ছবিগুলোর একটি হয়ে আছে অন্য একজনের। রাতের রোম। রাস্তার দুই পাশে জ্বলছে মশাল। প্রাচীন শহরের পথ ধরে ছুটছেন রোগা-পাতলা এক ইথিওপীয়। তাঁর পায়ে জুতা নেই। তাঁর সেই দৌড়ের প্রভাব সেখানেই শেষ হয়নি।আজ বিশ্ব ম্যারাথন বা দূরপাল্লার দৌড়ের ইতিহাস লিখতে গেলে ইথিওপিয়া ও কেনিয়াকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। রোমের মশালের আলোয় খালি পায়ে ছুটে যিনি শুধু একটি অলিম্পিক সোনা জেতেননি, বিশ্বকে প্রথম বড় করে দেখিয়েছিলেন আফ্রিকার দূরপাল্লার দৌড়ের শক্তি।তথ্যসূত্র:১. ‘রিমেম্বারিং বিকিলাস ১৯৬০ অলিম্পিক ম্যারাথন ভিক্টরি অন ইটস ৬০থ অ্যানিভার্সারি’ স্টিভ ল্যান্ডেলস, ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০।২. ‘হল অব ফেম প্রোফাইল—আবেবে বিকিলা (ইথিওপিয়া)’ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস, ৮ মার্চ ২০১২।৩. ‘অ্যান অলমোস্ট মিস্টিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স—৬০ ইয়ার্স সিন্স বিকিলা কমপ্লিটেড ব্যাক-টু-ব্যাক অলিম্পিক ভিক্টরিজ’ ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকস হেরিটেজ, ২১ অক্টোবর ২০২৪।
কাজের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন মো. হেলিম (৩২)। সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েকজন শ্রমিক। ধনিয়াপাতা সংগ্রহের সময় হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ভরে উঠে। শুরু হয় বজ্রপাত। মুহূর্তেই প্রাণ হারান হেলিম। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন খোকন মিয়া (৪০) নামে আরও এক শ্রমিক। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল পৌনে ৭টার দিকে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের বৈরাটিয়াপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত হেলিম ওই ইউনিয়নের নামাপাড়া গ্রামের মুসলিম উদ্দিনের ছেলে। হেলিমের চার বছর, দুই বছর ও নয় মাস বয়সি তিনটি সন্তান রয়েছে। আহত খোকন মিয়া একই বাড়ির সাইদুর রহমানের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে খোকন মিয়াসহ আটজনের একটি দল নিয়ে পাশের নামাপাড়া গ্রামে ধনিয়াপাতা সংগ্রহ করতে যান হেলিম। কাজের এক পর্যায়ে হঠাৎ আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। শুরু হয় বজ্রপাত। এ সময় বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন হেলিম। বিকট শব্দে পাশেই থাকা খোকন মিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। পরে সঙ্গে থাকা শ্রমিক ও স্থানীয়রা দুজনকে করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক হেলিমকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত খোকন মিয়ার চিকিৎসা চলছে। করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান বলেন, বজ্রপাতে হেলিমের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এসকে রাসেল/এসজেডএইচ/জেআইএম