সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে কুমিল্লা, রাজশাহী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা।
আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন এবং গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ও রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।
মানববন্ধন ও মিছিল-পরবর্তী সমাবেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বক্তব্য দেন। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ‘ভিক্ষা লাগলে ভিক্ষা নে, মেধাবীদের মুক্তি দে’, ‘ভাইভা কোটার বিরুদ্ধে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘মামা-খালুর সুপারিশ, চলবে না চলবে না’, ‘কণ্ঠে আবার লাগা জোর, ভাইভা প্রথার কবর খোঁড়’, ‘ভাইভার নামে দলীয়করণ, বন্ধ কর, করতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
সম্প্রতি ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমিয়ে বিধিমালা পরিবর্তনের নানা খবর এসেছে। এ নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়; বরং দক্ষ-যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই সরকারি চাকরিতে (১১ থেকে ২০মত গ্রেডে কর্মচারী নিয়োগে) মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে পরিবর্তন এনেছে সরকার।
মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিবাদে আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল চত্বরে মানববন্ধন করেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতারাও অংশ নেন।
মানববন্ধনে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী বায়েজিদ হোসেন বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে বৈষম্য ও দলীয়করণের মাধ্যমে ভাইভার নামে কোটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমান সরকার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। যে জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল কোটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, সেই বৈষম্যের পথেই আবার দেশকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব বন্ধ না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।’

জাতীয় ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যসচিব সৈয়দা নাজিফা নাফিল বলেন, তাঁরা সব সময় মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের মাধ্যমে নতুন করে বৈষম্য তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর আবার বৈষম্যের পথ বেছে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। তা না হলে এই প্রতিবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। সরকারি চাকরিতে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
একই ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে ফিরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর এবার ভাইভা নামের কোটা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছাত্রবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে শেখ হাসিনা এই দেশে টিকতে পারেনি। ছাত্রসমাজ এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। শিক্ষার্থীবান্ধব কোনো সিদ্ধান্ত না এলে আমরা কঠিন কর্মসূচিতে যাব।’

মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর থাকলে দক্ষ জনশক্তি মূল্যায়ন পাবে না বলে মনে করেন আসাদুজ্জামান নূর নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি প্রজ্ঞাপন হওয়ার আগেই সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
এদিকে গতকাল রাত ১০টার দিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তাঁরা প্রধান ফটকে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। এতে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মুবাশশির আমিন, শাখা ছাত্রশক্তির সদস্যসচিব ইফতেহার উদ্দিন, শাখা ছাত্রশিবিরের ছাত্র অধিকার সম্পাদক নাহিদ হাসান, শাখা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী মো. সবুজ, শিক্ষার্থী রফিক আল হাসান প্রমুখ বক্তব্য দেন।

সমাবেশে শিক্ষার্থী রফিক আল হাসান বলেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মেধাবীরা বঞ্চিত হবেন। এতে দুর্নীতি বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা মাঠপর্যায়ে কাজ করেন। সেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা নিয়োগ পেলে দেশের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। সরকারের উচিত এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা।
স্বজনপ্রীতির উদ্দেশ্যেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শাখা ছাত্রশক্তির সদস্যসচিব ইফতেহার উদ্দিন। অন্যদিকে শাখা ছাত্রশিবিরের ছাত্র অধিকার সম্পাদক নাহিদ হাসান বলেন, ‘ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির উদ্দেশ্য দলীয় ক্যাডারদের চাকরি দেওয়া। যারা দীর্ঘদিনেও অনার্স শেষ করতে পারেনি এবং যারা ভাইভা বোর্ডে টাকা নিয়ে উপস্থিত হবে, তাদের চাকরি দেওয়ার জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হলে ক্যাম্পাসে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া এবং প্রতিনিধি, কুমিল্লা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
শিক্ষার্থীদের গণিত, বিজ্ঞান এবং পড়ার দক্ষতা মূল্যায়নে এশিয়ার দেশগুলো অনেকটাই এগিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচি পিআইএসএ (পিসা) পরিচালিত এক মূল্যায়নে সবচেয়ে ভালো করেছে সিঙ্গাপুর। দেশটির পর রয়েছে চীন, জাপান ও তাইওয়ান। শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর তালিকায় এশিয়ার শক্ত অবস্থানও দেখা গেছে।বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের একই ধরনের মানদণ্ডে মূল্যায়ন করার কারণে পিআইএসএকে আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।আবার শিক্ষার্থীদের গণিত, বিজ্ঞান এবং পড়ার এই দক্ষতা মূল্যায়নে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া, উজবেকিস্তান, ফিলিপাইন, ডোমিনিকান রিপাবলিক, মরক্কো ও জর্ডান। এসব দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম মোট স্কোর করেছে কম্বোডিয়া। তালিকার নিচের দিকে আরও রয়েছে ফিলিস্তিন, আলবেনিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও উত্তর মেসিডোনিয়া।গণিত, বিজ্ঞান ও পড়ার দক্ষতায় বিশ্বসেরা সিঙ্গাপুর, শীর্ষ দশে এশিয়ার পাঁচ দেশতালিকার নিচের দেশগুলোমোট স্কোরের হিসাবে সবচেয়ে নিচে রয়েছে কম্বোডিয়া। দেশটির স্কোর ১ হাজার ১২। এরপর উজবেকিস্তান ১ হাজার ৫৫, ফিলিপাইন ১ হাজার ৫৮, ডোমিনিকান রিপাবলিক ১ হাজার ৫০, মরক্কো ১ হাজার ৬৯ এবং জর্ডান ১ হাজার ৭৮ স্কোর করেছে।এরপর ফিলিস্তিনের মোট স্কোর ১ হাজার ৮৪। আলবেনিয়ার স্কোর ১ হাজার ১০২, ইন্দোনেশিয়ার ১ হাজার ১০৮ এবং উত্তর মেসিডোনিয়ার ১ হাজার ১২৮।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে মার্কেটিং–বিষয়ক সার্টিফিকেট কোর্স, ২ বছরের অভিজ্ঞতা, ফি ৩২০০০পিআইএসএ কীপিআইএসএ (PISA) হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা মূল্যায়ন কর্মসূচি। এতে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। সাধারণত প্রতি তিন বছর পরপর ৮০টির বেশি দেশ ও অর্থনীতিতে এই মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়।পিআইএসএতে গণিত, বিজ্ঞান এবং পড়ার দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। এতে মুখস্থনির্ভর জ্ঞানের চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগ এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।কাতারে দোহা ইনস্টিটিউটে স্কলারশিপ, আবেদন ১৫ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্তকেন গুরুত্বপূর্ণএকটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ ও আধুনিক অর্থনীতির জন্য কতটা প্রস্তুত করছে, তা তুলনা করতে পিআইএসএর ফল ব্যবহার করা হয়। ফলে বিভিন্ন দেশের মোট স্কোর তাদের শিক্ষার্থীদের দক্ষতার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে।পূর্ণাঙ্গ তালিকসহ বিস্তারিত দেখতে ভিজিট করুন ওয়েবসাইটে।নেটফ্লিক্সে ইন্টার্নশিপ, যুক্তরাষ্ট্র–ভারত–পোল্যান্ড–জাপানে কাজ, সুযোগ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদেরও
জয় দিয়ে অনূর্ধ্ব-২০ নারী জুনিয়র এশিয়া কাপ হকি শেষ করলো বাংলাদেশ। শনিবার নিজেদের শেষ ম্যাচে শক্তিশালী মালয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে পঞ্চম স্থান নিশ্চিত করেছে লাল-সবুজের মেয়েরা। চীনের হুলুনবুয়ির সিটিতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে শুরু থেকেই দুর্দান্ত হকি খেলে বাংলাদেশ দল। ম্যাচের প্রথমার্ধে কোনো দলই গোল করতে পারেনি। অবশেষে তৃতীয় কোয়ার্টারে পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে দারুণ এক গোলে বাংলাদেশকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক শারিকা সাফা রিমণ। এরপর চতুর্থ কোয়ার্টারে চমৎকার এক ফিল্ড গোল করে ব্যবধান ২-০ করেন কনা। শেষ দিকে এক গোল শোধ দেয় মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার শক্তিশালী রক্ষণভাগ ভেঙ্গে নারীদের এই জয়কে দেশের হকি ইতিহাসের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা। পুরো টুর্নামেন্টে লড়াকু পারফরম্যান্স দেখানোর পর, এই জয়ে পঞ্চম স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করল বাংলাদেশ দল। আরআই/আইএন
এক নিরুত্তাপ শহর। বরফে ঢাকা। জনসংখ্যা মোটে ১ হাজার ৮৯০। শহরে অপরাধ নেই বললেই চলে, মানুষজন হাসিমুখে কথা বলে, দোকানে নিত্যদিনের কেনাকাটা চলে, স্থানীয় মেয়রও বেশ বন্ধুবৎসল। এমন শহরে নতুন শেরিফের কাজই–বা কী? তেমন কিছু নয়—কাগজপত্রে সই করা, ছোটখাটো ঝামেলা মেটানো আর ছয় সপ্তাহের দায়িত্ব শেষ করে অন্য শহরে চলে যাওয়া। অন্তত উলিসিস রিচার্ডসনের (বব ওডেনকার্ক) পরিকল্পনা এমনই। কিন্তু শহরের নাম ‘নরমাল’ হলেও এখানকার কিছুই স্বাভাবিক নয়; বরং বরফে ঢাকা এই ছোট শহরের শান্ত মুখোশের নিচে জমে আছে লোভ, অস্ত্র, সহিংসতা, দুর্নীতি আর নানা গোপন হিসাব–নিকাশ। আর সেই গোপন জগতের মাঝখানে এসে পড়েন এমন এক শেরিফ, যিনি নিজের জীবন নিয়েই খুব একটা আশাবাদী নন।একনজরেসিনেমা: ‘নরমাল’ধরন: অ্যাকশন–থ্রিলারপরিচালক: বেন হুইটলিঅভিনয়: বব ওডেনকার্ক, হেনরি উইঙ্কলার, লিনা হিডি, রায়ান অ্যালেন, বিলি ম্যাকলেলান, জেস ম্যাকলয়েডস্ট্রিমিং: এইচবিও ম্যাক্সদৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৩১ মিনিটবেন হুইটলির ‘নরমাল’ সিনেমাটি মূলত অ্যাকশন-কমেডি, তবে এর ভেতরে আছে ছোট শহরের আমেরিকান জীবনের নানা অসংগতির ব্যঙ্গ। ছবির গল্প লিখেছেন ওডেনকার্ক ও ডেরেক কোলস্টাড। অ্যাকশন সিনেমার ভক্তরা জানেন, এই কোলস্টাডই ‘জন উইক’ ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ওডেনকার্কের ‘নোবডি’ ছবিগুলোর চিত্রনাট্যকার। ফলে ‘নরমাল’ দেখতে বসলে ‘নোবডি’ কিংবা ‘জন উইক’-এর ছায়া চোখে পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে এবার ওডেনকার্কের চরিত্রটি অবসরপ্রাপ্ত গুপ্তঘাতক বা সাধারণ চেহারার সুপ্ত অ্যাকশন হিরো নয়। তিনি সত্যিই একজন সাধারণ মানুষ—অন্তত শুরুতে।‘নরমাল’–এর পোস্টার। আইএমডিবি উলিসিসের জীবনও খুব একটা স্বাভাবিক নেই। স্ত্রী থেকে আলাদা হয়ে আছেন, আগের কর্মস্থলে ঘটে যাওয়া একটি সহিংস ঘটনার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজের কাজ সম্পর্কে তাঁর দর্শনও বেশ নির্লিপ্ত, ‘জীবন অনেক সহজ হয়, যখন আপনি একটু কম চিন্তা করেন।’ নরমাল শহরেও তাঁর লক্ষ্য খুব সাধারণ: যেভাবে পেয়েছেন, সেভাবেই শহরটিকে রেখে চলে যাবেন।এই ক্লান্ত, খানিকটা হতাশ, মধ্যবয়সী মানুষটির চরিত্রেই ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ। এই চরিত্রে বব ওডেনকার্ক যথারীতি দুর্দান্ত। ‘বেটার কল সল’-এর শৌল গুডম্যান কিংবা ‘নোবডি’র হাচ ম্যানসেলের মতো চরিত্রে তাঁর যে অস্বস্তিকর, খানিকটা অসহায় হাস্যরস—এখানেও সেটিই কাজ করে। কিন্তু এবার তাঁর শরীরী ভাষায় আছে আরও বেশি ক্লান্তি। তিনি ঝামেলা চান না; পরিস্থিতিই তাঁকে বারবার অ্যাকশনের দিকে ঠেলে দেয়। আর সেখানেই ওডেনকার্কের কমেডি ও অ্যাকশন অভিনয়ের মিশেলটি সবচেয়ে মজার হয়ে ওঠে।শুরুতেই অবশ্য বোঝা যায়, নরমাল শহরটি যতটা শান্ত দেখাচ্ছে, আসলে ততটা নয়। সদ্য মারা যাওয়া আগের শেরিফের মৃত্যু রহস্যজনক। তাঁর বাড়ি অস্বাভাবিক রকম বড়। পুলিশ বিভাগের অস্ত্রভান্ডারও যেন ছোট শহরের জন্য বেমানান। হার্ডওয়্যার দোকানের তালাবদ্ধ ঘর, পুলিশ স্ক্যানার শুনতে থাকা বৃদ্ধা, স্থানীয় দোকান ও রেস্তোরাঁয় অস্বাভাবিক সংখ্যক বন্দুক—সবকিছু মিলিয়ে উলিসিসের সন্দেহ বাড়তে থাকে।‘নরমাল’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি এর মধ্যেই শহরের ব্যাংকে ডাকাতি করতে আসে দুই ‘হতভাগ্য অপরাধী’। সাধারণ কোনো ব্যাংক ডাকাতির মতো ব্যাপারটি শুরু হলেও এরপর যা ঘটে, তা ছবিটিকে পুরোপুরি অন্যদিকে নিয়ে যায়। শহরের মানুষ, পুলিশ, মেয়র—সবাই যেন একে একে উলিসিসের বিরুদ্ধে চলে যেতে থাকে। ভদ্রতা মুহূর্তেই উধাও হয়ে শুরু হয় বন্দুকযুদ্ধ।এই জায়গাতেই ‘নরমাল’ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। পরিচালক বেন হুইটলি এর আগে ‘ফ্রি ফায়ার’-এ একটি সীমিত জায়গার মধ্যে বন্দুকযুদ্ধকে দুর্দান্ত ব্ল্যাক কমেডি সিকোয়েন্সে পরিণত করেছিলেন। ‘নরমাল’-এও তাঁর সেই পুরোনো মেজাজ ফিরে এসেছে। বরফঝড়, পুলিশের গাড়ির আলো, বিস্ফোরণ, গুলি আর চারপাশে ছিটকে পড়া মানুষ—সব মিলিয়ে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দেখতে মন্দ লাগে না।কখনো রান্নাঘরের হাতিয়ার দিয়ে মারামারি, কখনো শটগান, কখনো ভারী অস্ত্র—উলিসিসের হাতে যা আসে, সেটিই যেন অস্ত্র হয়ে ওঠে। ওডেনকার্কের মতো দেখতে আপাতনিরীহ একজন মানুষকে কখনো খাবারের দোকানে ভয়ংকর মারামারি করতে, কখনো বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখাই সিনেমাটির বড় ইউএসপি। তাঁর গম্ভীর মুখ আর ভয়াবহ সহিংসতার মধ্যে বৈপরীত্যটি বারবার হাসায়।‘নরমাল’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি তবে ছবির সহিংসতা নিছক বিনোদনের জন্য নয়। ছোট শহরের গল্পের ভেতর দিয়ে নরমাল আমেরিকার কিছু বাস্তব প্রবণতাকেও ব্যঙ্গ করে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, ক্রমবর্ধমান বিভাজন, অস্ত্রের প্রতি অস্বাভাবিক আসক্তি, ‘আমরা বনাম তারা’ ধরনের মানসিকতা—সবকিছুকেই এখানে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় বার ও রেস্তোরাঁর দেয়ালজুড়ে শত শত বন্দুক ঝোলানো। উলিসিস জানতে চান, সেগুলো কি সব লোড করা? উত্তরে হাসিমুখে জানানো হয়—লোড করা না থাকলে তো মজাই নেই। ‘নরমাল’–এর কমেডির কোনোটাই প্রায় জোর করে করা হয় না; বরং পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেখায়। ফলে অনেক দৃশ্যই আরও মজার হয়ে ওঠে।দাম্পত্যের টানাপোড়েন, যৌনতা আর অস্বস্তিকর ডিনার পার্টির গল্পএকই সঙ্গে ছবিটি ‘ফার্গো’র কথাও মনে করিয়ে দেয়। তুষারে ঢাকা মিনেসোটা, শান্ত ছোট শহর, অদ্ভুত মানুষ, অপরাধের আড়ালে থাকা গোপন জগৎ—সব মিলিয়ে কোয়েন ভ্রাতৃদ্বয়ের সিনেমার সঙ্গে মিল অস্বীকার করা যায় না। আগের শেরিফের নামও গন্ডারসন—ফার্গোর ফ্রান্সেস ম্যাকডরম্যান্ড অভিনীত শেরিফের নামের সঙ্গে স্পষ্ট মিল। তবে ‘নরমাল’ ‘ফার্গো’র মতো ডার্ক কমেডির টোনে যায় না; বরং ‘জন উইক’ দুনিয়ার অতিরঞ্জিত অ্যাকশন বা ‘ফ্রি ফায়ার’-এর উন্মুত্তার পথ বেছে নেয়।ছবির গল্পে রাজনৈতিক ইঙ্গিতও আছে। আগের শেরিফের কিশোর সন্তান অ্যালেক্সের (জেস ম্যাকলয়েড) গল্পের মধ্য দিয়ে শহরের মানুষের নিয়ন্ত্রণপ্রবণতা, সামাজিক বিভাজনও সামনে আনে। পাশাপাশি অস্ত্র, আত্মরক্ষা, সামরিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণের বিষয়গুলোও ছুঁয়ে যায়। ‘নরমাল’ অবশ্য এসব নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেয় না। গুলি চলার শব্দই অনেক সময় সংলাপের জায়গা নিয়ে নেয়।‘নরমাল’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি ‘নরমাল’-এর কিছু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। এতগুলো চরিত্র ও উপকরণ হাজির করা হলেও সব কটির যথেষ্ট বিকাশ হয়নি। উলিসিসের অতীত, তাঁর ভেঙে যাওয়া সংসার, আগের চাকরির ট্র্যাজেডি, অ্যালেক্সের গল্প কিংবা স্থানীয় কিছু চরিত্র—সবকিছুই সম্ভাবনাময়, কিন্তু ছবির ৯০ মিনিটের দৌড়ে অনেক কিছুই ছুঁয়ে চলে যায়। ফলে কিছু আবেগঘন মুহূর্তও পুরোপুরি প্রভাব ফেলতে পারে না। কমেডিও সব সময় সমান কার্যকর নয়। কিছু দারুণ, কিছু আবার বেশ চেনা।ছবির আরেকটি সমস্যা হলো, এর চমকগুলো অনেকটা আগে থেকেই আন্দাজ করা যায়। তবে ‘নরমাল’ এমন কোনো সিনেমা নয়, যা দর্শককে রহস্য সমাধানের জন্য বসিয়ে রাখে। এর মূল আনন্দ গল্পের চমকের চেয়ে বরং কীভাবে সেই চমকগুলোকে রক্তাক্ত, অদ্ভুত ও হাস্যকর অ্যাকশনে পরিণত করা হচ্ছে, সেখানে।‘নরমাল’ অ্যাকশন সিনেমা হিসেবে খুব বেশি নতুন কিছু দিতে পারেনি। তবে কিছুটা ডার্ক কমেডি, কিছুটা রোমাঞ্চ, কিছুটা অ্যাকশন আর সঙ্গে বব ওডেনকার্কের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স মিলিয়ে ছবিটি মোটের ওপর উপভোগ্য হয়েছে।