জয় দিয়ে জুনিয়র এশিয়া কাপ হকির মিশন শেষ করল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ নারী দল। পঞ্চম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মালয়েশিয়াকে আজ ২-১ গোলে হারিয়েছে লাল-সবুজের মেয়েরা।
চীনের মোকি ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক হকি খেলেছে বাংলাদেশ। যদিও গোলমুখে বারবারই সুযোগ নষ্ট হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রথমার্ধে দুই দলের কেউই গোলের দেখা পায়নি।
তৃতীয় কোয়ার্টারে গোলের সুযোগ কাজে লাগায় বাংলাদেশ। পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক সারিকা রিমন। এরপর চতুর্থ কোয়ার্টারে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন কনা আক্তার। দারুণ এক ফিল্ড গোলে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেন।
তবে ম্যাচের শেষ দিকে ৫৯ মিনিটে একটি গোল শোধ করে মালয়েশিয়া। তাতে অবশ্য বাংলাদেশের জয় আটকাতে পারেনি তারা। ২-১ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।

গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করা বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে জাপানের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়। সেই হারে আগামী বছরের জুনিয়র বিশ্বকাপে খেলার সরাসরি সুযোগও শেষ হয়ে যায়। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট পেতে হলে অন্তত সেমিফাইনালে উঠতে হতো বাংলাদেশকে।
যদিও একটা পথ এখনো খোলা। যদি আগামী বছর মেয়েদের জুনিয়র বিশ্বকাপ ভারতে হয়, তাহলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবে।
নিয়ম অনুযায়ী, আয়োজক দেশ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করলে সংশ্লিষ্ট মহাদেশ থেকে আরেকটি দেশ সুযোগ পায়। যেহেতু বাংলাদেশ পঞ্চম হলো, তাই সুযোগটা বাংলাদেশই তখন পাবে।
এর আগে গ্রুপ পর্বে দারুণ খেলেছিল বাংলাদেশ। চায়নিজ তাইপেকে ৭-০, পাকিস্তানকে ৫-১, কাজাখস্তানকে ৪-০ এবং হংকংকে ৬-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপে দাপটের সঙ্গে এগিয়ে যায় তারা।
২০২৩ সালের আসরে খেললেও নবম স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় বাংলাদেশকে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
সকালে বাড়ির পাশের গ্রামীণ রাস্তায় হাঁটছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল রাস্তার ধারের ছোট্ট একটি দেবদারু গাছের পাতায়। পাতার ওপর ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছে এক অদ্ভুত সুন্দর প্রাণী। পুরো শরীর ঘন সোনালি-সাদা লোমে আবৃত, আর পিঠের ঠিক মধ্যভাগে সারিবদ্ধ চারটি হলুদাভ-কমলা তুলির মতো লোমের গুচ্ছ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে প্রকৃতির নিপুণ কোনো শিল্পকর্ম। কিন্তু প্রাণিবিদ্যার শিক্ষার্থী হিসেবে বুঝতে আমার বেশি সময় লাগেনি। এটি কোনো সাধারণ কীট নয়; এটি একটি লোমশ শুঁয়োপোকা। যা একদিন রূপ নেবে একটি মথে। তবে এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে খালি হাতে স্পর্শ করার ভুল করা উচিত নয়। কারণ এর শরীরের লোম আত্মরক্ষার এক কার্যকর অস্ত্র। সংবেদনশীল ত্বকে এই লোমের সংস্পর্শে এলে চুলকানি, জ্বালাপোড়া কিংবা অ্যালার্জির মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আমার দেখা এই শুঁয়োপোকাটি আর্থ্রোপোডা পর্বের ইনসেক্টা শ্রেণিভুক্ত একটি কীট। এটি লেপিডোপ্টেরা বর্গ এবং এরেবিডি পরিবারের সদস্য। শরীরজুড়ে ঘন লোম থাকায় একে সাধারণভাবে হেইরি ক্যাটারপিলার বলা হয়। বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এটি সম্ভবত টাসক মথ গোষ্ঠীর একটি শুঁয়োপোকা। শুঁয়োপোকা হলো প্রজাপতি ও মথের জীবনের দ্বিতীয় ধাপ বা লার্ভা পর্যায়। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে দ্রুত খাদ্য গ্রহণ করে বৃদ্ধি পাওয়া। এ সময় তারা গাছের পাতা খেয়ে শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করে। পরিণত বয়সে তারা নিজেদের চারপাশে কোকুন তৈরি করে পিউপা অবস্থায় প্রবেশ করে। এরপর এক বিস্ময়কর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সেই কোকুন ভেদ করে বেরিয়ে আসে ডানাওয়ালা পূর্ণাঙ্গ মথ। যদিও দেখতে এটি প্রজাপতির মতো মনে হলেও, এটি প্রজাপতি নয়। প্রজাপতির গায়ের রং উজ্জল ও রঙিন, আর মথের কিছুটা অনুজ্জ্বল ও ধূসর বর্ণের। আরও পড়ুন পাচারের থাবায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে বিচিত্র প্রাণী লেমুর বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে বর্ষা ও গ্রীষ্মকালে, নানা প্রজাতির লোমশ শুঁয়োপোকার দেখা মেলে। ফলজ, বনজ এবং শোভাবর্ধনকারী বিভিন্ন গাছের পাতায় এদের বিচরণ সবচেয়ে বেশি। প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও কোনো কোনো সময় এদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে গাছের পাতা খেয়ে কৃষি ও বনজ উদ্ভিদের ক্ষতি করতে পারে। লোমশ শুঁয়োপোকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ঘন লোম। এই লোমই তাদের আত্মরক্ষার প্রধান উপায়। অনেক প্রজাতির লোমে সূক্ষ্ম কাঁটা কিংবা ত্বকে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে সক্ষম রাসায়নিক উপাদান থাকে। এসব লোম মানুষের ত্বকে লাগলে চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা অ্যালার্জির সৃষ্টি হতে পারে। তাই এদের কখনোই খালি হাতে স্পর্শ করা উচিত নয়। ভুলবশত শরীরে লোম লেগে গেলে আক্রান্ত স্থান দ্রুত সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। গ্রামাঞ্চলে অনেকেই আক্রান্ত স্থানে লবণ লাগিয়ে থাকেন, তবে এর কার্যকারিতার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই ঘরোয়া পদ্ধতির পরিবর্তে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরামর্শ অনুসরণ করাই নিরাপদ। প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি হলো মেটামরফোসিস বা পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর। ক্ষুদ্র একটি ডিম থেকে জন্ম নেওয়া শুঁয়োপোকা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিজেকে কোকুনে আবদ্ধ করে। বাইরে থেকে নিশ্চুপ মনে হলেও কোকুনের ভেতরে চলতে থাকে জটিল জৈবিক পরিবর্তন। একসময় সেই কোকুন ভেদ করে বেরিয়ে আসে ডানা মেলা একটি মথ। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি প্রকৃতির অন্যতম চমকপ্রদ রূপান্তর। অনেকেই শুঁয়োপোকা দেখলেই ভয়ে মেরে ফেলেন। অথচ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পর্যবেক্ষণ করলে এই ক্ষুদ্র প্রাণী আমাদের শেখায় প্রকৃতির বৈচিত্র্য, অভিযোজন এবং জীবনচক্রের অসাধারণ গল্প। খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় রাখতেও এদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পাতার আড়ালে নীরবে হেঁটে চলা এই লোমশ শুঁয়োপোকা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য, প্রয়োজনীয়তা এবং টিকে থাকার এক অনন্য কৌশল। ক্ষুদ্র প্রাণীটি শুধু একটি কীট নয়, এটি প্রকৃতির অপার সৃজনশীলতা, বিবর্তন এবং জীবনচক্রের জীবন্ত বিস্ময়। আরও পড়ুন সামুদ্রিক কচ্ছপের বংশরক্ষায় করণীয় এসইউ
সঞ্চয় নিয়ে আমাদের প্রায় সবার মনেই একটা সাধারণ প্রশ্ন ঘোরে—প্রতি মাসে ঠিক কত টাকা সেভ করা উচিত? কেউ শুনেছেন বিশ শতাংশের কথা, কেউ বা বলেন যতটুকু পারা যায়, ততটুকুই যথেষ্ট। সমস্যা হলো, এই প্রশ্নের কোনো একটিমাত্র সঠিক উত্তর নেই। কারণ একজন পঁচিশ বছর বয়সী তরুণের জন্য যে হিসাব কাজ করে, চল্লিশ বছর বয়সী একজন পরিবারপ্রধানের জন্য সেই একই হিসাব যথেষ্ট নাও হতে পারে। বয়স, দায়িত্ব আর জীবনের পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের হারও বদলানো উচিত। একটা সাধারণ গাইডলাইন হিসেবে বলা যায়, আয়ের অন্তত বিশ শতাংশ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে রাখা উচিত। এর মধ্যে জরুরি তহবিল, অবসরকালীন সঞ্চয় আর অন্যান্য বিনিয়োগ—সবকিছুই ধরা হয়। কিন্তু এই বিশ শতাংশ সংখ্যাটাকে একটা স্থির নিয়ম হিসেবে না দেখে, একটা শুরুর বিন্দু হিসেবে দেখাই ভালো। প্রকৃত হিসাবটা আসলে বয়সভেদে বদলে যাওয়া উচিত। জীবনের শুরুর দিকে, অর্থাৎ বিশ থেকে পঁচিশ বছর বয়সে, ইনকাম সাধারণত কম থাকে, আর খরচও তুলনামূলক বেশি থাকে—নতুন চাকরি শুরু হওয়া, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর নানা খরচ। এই বয়সে বড় শতাংশের চাপ নিজের ওপর না দিয়ে, দশ থেকে পনেরো শতাংশ দিয়ে শুরু করাই যথেষ্ট। এই পর্যায়ে সংখ্যাটা যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সঞ্চয়ের অভ্যাসটা তৈরি করা। একবার এই অভ্যাস গড়ে উঠলে, পরবর্তীতে হার বাড়ানো তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। আয়ের অন্তত বিশ শতাংশ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে রাখা উচিত। এর মধ্যে জরুরি তহবিল, অবসরকালীন সঞ্চয় আর অন্যান্য বিনিয়োগ—সবকিছুই ধরা হয়। কিন্তু এই বিশ শতাংশ সংখ্যাটাকে একটা স্থির নিয়ম হিসেবে না দেখে, একটা শুরুর বিন্দু হিসেবে দেখাই ভালো। প্রকৃত হিসাবটা আসলে বয়সভেদে বদলে যাওয়া উচিত। পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে এসে সাধারণত ইনকাম বাড়তে শুরু করে। এই সময়ে সবচেয়ে সাধারণ ভুলটা হলো, বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইফস্টাইলও বাড়িয়ে ফেলা। কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ হলো, ইনকাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের হারও বিশ থেকে পঁচিশ শতাংশে নিয়ে আসা। এই বয়সটাই আসলে বিনিয়োগ শুরু করার সবচেয়ে লাভজনক সময়, কারণ কম্পাউন্ডিংয়ের সুবিধা পাওয়ার জন্য এই সময়ে সবচেয়ে বেশি বছর হাতে থাকে। পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে জীবনে সাধারণত বড় বড় দায়িত্ব চলে আসে—পরিবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়ির ঋণ। এই সময়ে খরচ বাড়া স্বাভাবিক, কিন্তু তাই বলে সঞ্চয়ের হার কমিয়ে ফেলা ঠিক নয়। বরং ইনকাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়ানো উচিত, প্রয়োজনে বাজেটের অন্য জায়গা থেকে খরচ কমিয়ে হলেও। এই পর্যায়ে সঞ্চয়ের হার পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চান্ন বছর বয়সে এসে অবসরের সময় ধীরে ধীরে কাছে আসতে শুরু করে, তাই সঞ্চয়ের গতিও বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়ে। এই বয়সে বসে হিসাব করে দেখা উচিত, অবসরের পর মাসিক খরচ চালাতে ঠিক কত টাকা প্রয়োজন হবে, আর এখন পর্যন্ত কতটা জমেছে। এই দুইয়ের মধ্যে যে ফারাক থাকে, সেটা পূরণ করার জন্য সঞ্চয়ের হার ত্রিশ শতাংশ বা তার বেশি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। পঞ্চান্ন বছরের পর থেকে অবশ্য চিত্রটা কিছুটা বদলে যায়। এই বয়সে নতুন করে সঞ্চয় বাড়ানোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা ইতিমধ্যে জমানো হয়েছে, সেটাকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা আর প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা। এই সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে, তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, যাতে জীবনের এই পর্যায়ে এসে বড় কোনো আর্থিক ধাক্কা সামলাতে না হয়। এখানে একটা কথা মনে রাখা জরুরি—এই সংখ্যাগুলো কোনো কঠোর নিয়ম নয়, বরং একটা সাধারণ দিকনির্দেশনা মাত্র। যাদের ইনকাম তুলনামূলক কম, বা যাদের ওপর বড় পারিবারিক দায়িত্ব আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই শতাংশ কমবেশি হতেই পারে, আর সেটা স্বাভাবিক। সবার জীবনের পরিস্থিতি আলাদা, তাই সবার সঞ্চয়ের হারও এক রকম হবে না। সব মিলিয়ে দেখা যায়, সঞ্চয়ের একটা সহজ বয়সভিত্তিক কাঠামো এভাবে দাঁড় করানো যায়—বিশ থেকে পঁচিশ বছরে দশ থেকে পনেরো শতাংশ, পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরে বিশ থেকে পঁচিশ শতাংশ, পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছরে পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশ, আর পঁয়তাল্লিশ বছরের পর থেকে ত্রিশ শতাংশ বা তার বেশি সঞ্চয়ের দিকে যাওয়া উচিত। তবে এই সংখ্যাগুলোর চেয়েও বড় কথা হলো, নিয়মিত সঞ্চয় করার অভ্যাসটা। যত কম পরিমাণ দিয়েই শুরু করা হোক না কেন, শুরু করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই হার বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু দেরি করে ফেলা সময়টা আর ফিরে পাওয়া যায় না। লেখক : করপোরেট ট্রেইনার, ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এইচআর/এএসএম
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রকৃত আয়ের ক্ষয় বিবেচনায় বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। এ নিয়ে বেশি দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিক থেকে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয় বহনের সক্ষমতা কি সরকারের আছে? আরও বড় প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করবে কারা? এই ব্যয় একবারের নয়। নতুন বেতন ও পেনশন কার্যকর হলে তা প্রতিবছরই বাজেটে বহন করতে হবে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে প্রথম ধাক্কা কিছুটা কমবে, কিন্তু দায় কমবে না। বেতন ও পেনশন এমন ব্যয়, যা একবার বাড়লে সহজে কমানো যায় না। রাজস্ব কমলে উন্নয়ন প্রকল্প পিছিয়ে দেওয়া যায়, কিছু কেনাকাটা স্থগিত করা যায়, কিন্তু বেতন কমানো প্রায় অসম্ভব। ফলে আগামী দিনের বাজেট আরও অনমনীয় হবে। জ্বালানিসংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা বা নতুন অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকারের হাতে স্বাধীনভাবে ব্যয় করার জায়গা কমে যাবে। নতুন বেতনকাঠামো: ‘ওঁরা বনাম আমরা’, সরকারের শঙ্কার জায়গা যেখানেপে স্কেল বনাম দুর্নীতি: মকছেদ সাহেবের দেখা সেই সকালটি আসলে কার গল্প?এ কারণেই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত অর্থায়ন নিয়ে। সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো রাজস্ব বাড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা বহুদিনের। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বছর শেষে বড় ঘাটতি থেকে যায়। এই বাস্তবতায় বড় একটি স্থায়ী ব্যয় যোগ করলে চাপ আরও বাড়বে। পে স্কেল কার্যকর করার আগে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ, অযৌক্তিক কর-ছাড় কমানো, উচ্চ আয় ও সম্পদের ওপর কার্যকর কর নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব প্রশাসনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা দরকার। রাজস্ব সংস্কার ছাড়া বেতন বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত ঋণ, অন্য খাতের ব্যয় সংকোচন অথবা বড় বাজেট ঘাটতিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। এখানে আরেকটি ঝুঁকি আছে। সরকারের আয় যতটা বাড়ছে, তার তুলনায় বাধ্যতামূলক ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সরকারের নীতিগত স্বাধীনতা কমে যাবে। তখন নতুন কোনো সংকটে দ্রুত অর্থ বরাদ্দ করা কঠিন হবে। বাজেট ক্রমেই বেতন, পেনশন, সুদ ও ভর্তুকির মতো স্থায়ী ব্যয়ের চাপে আটকে পড়বে। এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করতে পারে। সরকারি কর্মচারীরা সংগঠিত, দৃশ্যমান এবং নীতিনির্ধারণে তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী। অধিকাংশ বেসরকারি কর্মী সেই অবস্থানে নেই। তাঁদের মজুরি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের আয়, উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজার পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতার ওপর। ছোট ও মাঝারি অনেক প্রতিষ্ঠান বড় সরকারি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন বাড়াতে পারবে না।অন্য খাতের ব্যয় কেটে বেতন দেওয়া আরও খারাপ সমাধান হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা কিংবা উৎপাদনশীল অবকাঠামোর বরাদ্দ কমিয়ে সরকারি বেতন বাড়ানো হলে এক সংকট সামলাতে গিয়ে আরেক সংকট তৈরি হবে। বাংলাদেশ এসব খাতেই প্রয়োজনের তুলনায় কম ব্যয় করে। এমন একটি রাষ্ট্র, যে নিজের কর্মচারীদের বেশি বেতন দেয় কিন্তু স্কুল, হাসপাতাল, দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবহন বা দুর্যোগ মোকাবিলায় কম খরচ করে, সে হয়তো একটি গোষ্ঠীর কল্যাণ বাড়াবে, কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা দুর্বল করবে। ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভরতা সমানভাবে উদ্বেগজনক। সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ ধার করে, ব্যাংকের জন্য রাষ্ট্রকে ঋণ দেওয়া অনেক সময় বেসরকারি খাতের তুলনায় নিরাপদ হয়ে ওঠে। এতে উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে, সুদের হার উঁচু থাকতে পারে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আরও দুর্বল হতে পারে। এখানেই মূল দ্বন্দ্ব। রাষ্ট্র নিজের কর্মচারীদের আয় বাড়ায়, কিন্তু সেই ব্যয় মেটাতে গিয়ে যদি ব্যবসার ঋণ ব্যয় বাড়ে, তবে আজকের স্বস্তির বিনিময়ে আগামী দিনের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সরকারি পে স্কেলে এই সব সংস্কার কেন হবে নাহাসিনোমিকসের ভ্রান্তির পে কমিশন আর্থিক সংকটকে ঘনীভূত করবেমূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও উপেক্ষা করার মতো নয়। বেতন বাড়লে ভোগব্যয় বাড়বে, যা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে কিছু গতি আনতে পারে। এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু পণ্য ও সেবার সরবরাহ যদি একই গতিতে না বাড়ে, অতিরিক্ত চাহিদা আবারও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তখন সরকারি কর্মচারীদের নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার লাভের একটি অংশ মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলবে। আরও বড় সমস্যা হলো, সরকারি চাকরির বাইরে থাকা লাখো পরিবার একই আয় বৃদ্ধি পাবে না, অথচ তারাও উচ্চতর দামের মুখোমুখি হবে। ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নের পথ নেওয়া হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নটি বেসরকারি খাতকে ঘিরে। সরকারি কর্মচারীরা সংগঠিত, দৃশ্যমান এবং নীতিনির্ধারণে তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী। অধিকাংশ বেসরকারি কর্মী সেই অবস্থানে নেই। তাঁদের মজুরি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের আয়, উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজার পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতার ওপর। ছোট ও মাঝারি অনেক প্রতিষ্ঠান বড় সরকারি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন বাড়াতে পারবে না। সরকারি চাকরিতে সর্বশেষ পে কমিশন হয়েছিল ২০১৫ সালে। ফলে সরকারি ও বেসরকারি কর্মসংস্থানের মধ্যে আয় ব্যবধান বাড়তে পারে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বেসরকারি কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে, দক্ষ কর্মী ধরে রাখা কঠিন হবে এবং শ্রমবাজারে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে। এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট, কারণ বাংলাদেশের বড় অংশের শ্রমিক এখনো আনুষ্ঠানিক মজুরি সুরক্ষার বাইরে। বহু খাতে কার্যকর ন্যূনতম বেতন নেই। অনানুষ্ঠানিক খাতে নিরাপত্তা আরও দুর্বল। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারীর মোট আয় অনেক তরুণ স্নাতক, জুনিয়র পেশাজীবী কিংবা দক্ষ বেসরকারি কর্মীর চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে। সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন প্রশাসনিকভাবে নির্ধারণ করতে পারে না, আর সেটি কাম্যও নয়। কিন্তু বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, প্রতিযোগিতা এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারি বেতন নীতি দিয়ে শ্রমবাজারের সামগ্রিক বৈষম্য সমাধান করা যাবে না। নতুন পে স্কেলকে তাই শুধু বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি বড় পরীক্ষা। দীর্ঘ মূল্যস্ফীতির সময়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় রক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সুরক্ষা যদি করদাতা, বেসরকারি কর্মী, উদ্যোক্তা, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ কিংবা জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তবে সমস্যার সমাধান হবে না; বোঝা কেবল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে। আরেকটি বহুল ব্যবহৃত যুক্তি হলো, বেশি বেতন দিলে দুর্নীতি কমবে এবং সরকারি সেবার মান বাড়বে। এই যুক্তি নতুন নয়। আগের বেতনকাঠামোর সময়ও একই কথা বলা হয়েছিল। বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। ভালো বেতন কিছু আর্থিক চাপ কমাতে পারে, কিন্তু দুর্নীতি শুধু কম বেতনের ফল নয়। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল নজরদারি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, শাস্তির অনিশ্চয়তা এবং কম জবাবদিহিও বড় কারণ। তাই বেতন বাড়িয়ে যদি কাজের মূল্যায়ন, অডিট, ডিজিটাল সেবা, সেবার মানদণ্ড এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার না করা হয়, তবে নাগরিকেরা শুধু আরও ব্যয়বহুল আমলাতন্ত্রই পেতে পারেন। এখানে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন। মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন পে কমিশন বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন সমন্বয়ের একটি নিয়মভিত্তিক কাঠামোর কথা বলেছিল। সেই ধারণাটি নতুন করে বিবেচনা করা উচিত। প্রতি দশ বা এগারো বছর অপেক্ষা করে বড় লাফে বেতন বাড়ানোর বদলে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত একটি স্বচ্ছ ও পূর্বনির্ধারিত সমন্বয় ব্যবস্থা অনেক বেশি যুক্তিসংগত। এতে রাজনৈতিক দর-কষাকষি কমবে, আকস্মিক বাজেটীয় ধাক্কা এড়ানো যাবে এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। নতুন পে স্কেলকে তাই শুধু বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি বড় পরীক্ষা। দীর্ঘ মূল্যস্ফীতির সময়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় রক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সুরক্ষা যদি করদাতা, বেসরকারি কর্মী, উদ্যোক্তা, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ কিংবা জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তবে সমস্যার সমাধান হবে না; বোঝা কেবল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে। এখন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাজস্ব সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ঋণের ওপর নির্ভরতা সীমিত করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি শক্তিশালী করা। এগুলো ছাড়া নতুন পে স্কেল কিছু মানুষের জন্য স্বস্তি আনলেও অর্থনীতির জন্য নতুন ঋণ, মূল্যস্ফীতি, সংকুচিত আর্থিক সক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্যের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শেষ বিচারে প্রশ্নটি বেতন বাড়ানো ঠিক কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সেটি টেকসইভাবে অর্থায়ন করতে পারবে কি না। ● সেলিম রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম* মতামত লেখকের নিজস্ব