বাদাবন সংঘ ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার সমতা: নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
ড. মো. সাইমুম পারভেজ
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়
আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন এলেও নারীর দৃষ্টিভঙ্গি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। তাই প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে, টোকেন প্রতিনিধিত্ব নয়। এ ধরনের আলোচনা নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের নানা ধরনের সংকটে নারীর ওপর বিরূপ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। দুর্যোগের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি, বাস্তুচ্যুতি ও চলাচলের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ক্ষেত্রেও নারীদের বেশি ক্ষতির শিকার হতে দেখি। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, কমিউনিটি থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীদের উপস্থিতি আমরা এখনো সেভাবে দেখতে পাই না।
আমরা শুধু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছি না, এর সমাধানেও কাজ করছি। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় কমিউনিটি পর্যায়ের বৃক্ষরোপণে ৮০ শতাংশ নারীকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা করেছি। প্রতিটি জেলায় স্থানীয় ও দেশীয় জাতের গাছকে উৎসাহিত করা হবে এবং নারীদের হাতে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা থাকবে। কোথাও কোথাও রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ—দুই দায়িত্বই নারীদের দেওয়া হবে।
এটিকে শুধু সরকারি প্রকল্প হিসেবে নয়, সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে চাই। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় জেন্ডার, বিশেষ করে প্রজননস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য ও পানি সম্পর্কিত বিষয়গুলো যুক্ত করা জরুরি। উপকূলের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও পানির সংকট ও খাদ্যনিরাপত্তার সমস্যা বাড়ছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিক নারী ও পুরুষের কণ্ঠ নিশ্চিত করতে হবে।
এনএপিতে নারীর প্রজননস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পানির বিষয় অন্তর্ভুক্তির জন্য আলোচনা করা হবে।
সেখ ফরিদ আহমেদ
যুগ্ম সচিব, ত্রাণ কর্মসূচি অধিশাখা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়
আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৫ হাজার ২০০ কিলোমিটার খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের সঙ্গে যুক্ত। খালের দুই পাড়ের দরিদ্র নারী–পুরুষকে সম্পৃক্ত করে মাছ ও শাকসবজি চাষ এবং সামাজিক বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই বছর সরকারি সহায়তায় পরিচালনার পর স্থানীয় মানুষের হাতে এর দায়িত্ব দেওয়া হবে। উপকারভোগীদের ৫০ শতাংশ নারী ও ৫০ শতাংশ পুরুষ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমে ২০টি খালে এটি পাইলট হিসেবে শুরু হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির সঙ্গে পানির সংকট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সামাজিক পটভূমির কারণে উপকূলের নারীরা যে বেশি দুর্ভোগ পোহান, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগেও নারী, শিশু ও বয়স্করা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অঞ্চলভেদে নারীদের বাস্তবতাও ভিন্ন। কোথাও নারীরা মাঠে কাজ করেন, আবার কোথাও সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে তা করতে পারেন না। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে শিক্ষার বিস্তার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিতে হবে।
শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। ছেলে ও মেয়ের কাজ আলাদা করে দেওয়ার যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা নারীর সক্ষমতাকে সীমিত করে। এই পরিবর্তন এক দিনে হবে না, তবে পরিবর্তনের শুরুটা আমাদের নিজেদের জায়গা থেকেই করতে হবে।
ফারাহ কবির
কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ
উপকূলীয় সাতক্ষীরা এলাকায় তিন বছরের গবেষণায় আমরা দেখেছি, পানির সংকট ও লবণাক্ততার কারণে নারী-পুরুষ উভয়েই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যে এর প্রভাব রয়েছে।
সুপেয় পানির সংকটে ৯০ শতাংশ পরিবারে স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলেও চিকিৎসা ব্যয় বহনের সক্ষমতা না থাকায় অনেকে সেবা নিতে পারেন না। নারীর এসব ঝুঁকির সঙ্গে জেন্ডার বৈষম্য ও সামাজিক কাঠামোর প্রভাবও যুক্ত হচ্ছে। তাই শুধু জীবিকার বিকল্প বা প্রশিক্ষণ নয়, এসব সামাজিক ও কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে হবে।
উপকূলীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে। ওপর থেকে পরিকল্পনা চাপিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। নারীকে কৃষক বা মৎস্যজীবী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে শুধু দায়িত্ব দিলেও হবে না; দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, উপকরণ ও সহায়তা দিতে হবে।
জলবায়ু ও জেন্ডার সম্পর্কিত নীতিমালা ও বাজেট থাকলেও বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ না করলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। পরিবেশ, নারী ও শিশু, স্বাস্থ্যসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা বাড়াতে তাঁদের স্বীকৃতি, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও প্রয়োজনীয় বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।
আজমান আহমেদ চৌধুরী
কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ
সমতার জায়গা থেকেই আমাদের শুরু করা দরকার। পানির সংকট মানবসৃষ্ট হোক বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফল, সংকটটি বাস্তব। কিন্তু পানি সংগ্রহের দায়িত্ব শুধু নারীর—এটি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বিষয়, জলবায়ুর কারণে নয়। সাতক্ষীরায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, নারীরা পানি আনছেন, অথচ পুরুষেরা মনে করেন, এটি তাঁদের দায়িত্ব নয়। এই জেন্ডার বৈষম্য ভাঙতে প্রজন্মগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
দুর্যোগের পর কর্মক্ষম পুরুষেরা বাইরে চলে গেলে পরিবারে আয়ের সংকট তৈরি হয়। এ অবস্থায় নারীদের আয় ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। আমরা পানি উদ্যোক্তা তৈরির একটি উদ্যোগ নিয়েছি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পরিশোধনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনা নারীদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাঁদের ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ ও প্রাথমিক মূলধনের সুযোগও তৈরি করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারীর স্বাস্থ্যেও পড়ছে। অবকাঠামো নির্মাণেও জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। আমার মনে হয়, শুধু অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করলেই হবে না; নারীর নেতৃত্বের সক্ষমতা তৈরিতেও বিনিয়োগ করতে হবে।
যেসব নারী জলবায়ুর সংকট নিজেরা মোকাবিলা করছেন, তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই জেন্ডার বৈষম্যের চর্চা বদলাতে হবে। তাহলেই জলবায়ুর সংকট মোকাবিলায় নারীর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
গওহার নঈম ওয়ারা
প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব, ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম
সুন্দরবনের পানির সংকটের সব দায় জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। ফারাক্কার কারণে পানির সংকট, পদ্মা থেকে বিভিন্ন এলাকায় পানি প্রত্যাহার এবং সুন্দরবন পর্যন্ত পানির প্রবাহ—এসব বিষয়ও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। সাত মাস বৃষ্টি হলেও সেই পানি ধরে রাখতে পারছি না। তাই স্থানীয়ভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কার্যকর উপায় খুঁজতে হবে।
নারী ও কিশোরীর সক্ষমতার ক্ষেত্রেও এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনে কাঁকড়া কমে যাওয়ায় কুমির লোকালয়ে আসছে, নারীরা কুমিরের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। আবার কাঁকড়ার প্রজনন নষ্ট করার সঙ্গে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়টিও আমাদের বুঝতে হবে। বাল্যবিবাহও নারীদের পিছিয়ে দিচ্ছে। বিয়ের পর কোনো মেয়ে স্কুলে ফিরতে চাইলেও সামাজিক নিয়মের কারণে তাকে অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে ফিরতে দেওয়া হয় না। এসব বিষয়ে আমাদের আরও সোচ্চার হতে হবে।
সুন্দরবন রক্ষায় মানুষকে সুন্দরবন থেকে দূরে সরিয়ে দিলেই হবে না। সুন্দরবনের মানুষই এর ওপর নির্ভরশীল এবং তাঁরা সুন্দরবন ধ্বংস করেন না। স্থানীয় অভিযোজন ও জীবনযাপনের পদ্ধতিগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ুর ওপর সব দায় না চাপিয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ডের দায়ও স্বীকার করতে হবে। তাহলেই সুন্দরবন ও এর মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
মো. শামসুদ্দোহা
প্রধান নির্বাহী, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে হলে লবণাক্ততার সঙ্গে নারীর এক্সপোজার বা সংস্পর্শের বিষয়টি দেখতে হবে। পানি সংগ্রহ, চিংড়ির পোনা ধরা, কাঁকড়ার ঘেরে কাজসহ নানা কারণে নারীরা দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকেন। এ কারণে তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
নারীরা কেন এত বেশি লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে থাকছেন? এর পেছনে তাঁদের কাজের ধরন, সামাজিক ও আর্থিক বাস্তবতা এবং সস্তা শ্রম হিসেবে নারীর শ্রম ব্যবহারের বিষয়টি রয়েছে। দাদন, ঋণব্যবস্থা ও বনসম্পদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নানা ধরনের শোষণও তাঁদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব সংকটকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে দেখলে হবে না; এখানে শাসনব্যবস্থার সংকটও রয়েছে।
পানিসংকট মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো সমন্বিত ও টেকসই নয়। তাই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে সেবাব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে।
একই সঙ্গে শুধু অবকাঠামোকেন্দ্রিক নয়, মানুষকে কেন্দ্র করে অভিযোজন পরিকল্পনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করলেই নারী ও কিশোরীর ঝুঁকি কমানো এবং সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
লিপি রহমান
নির্বাহী পরিচালক, বাদাবন সংঘ
২০১৬ সালে বাগেরহাটে আমাদের কাজ শুরু হয়। শুরু থেকেই নারীর অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করছি। মোংলায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশেষ করে নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ঝুঁকিতে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে নারীরা কীভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং তাঁদের জীবন-জীবিকায় এর কী প্রভাব পড়ছে—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আনা প্রয়োজন।
এসব ঝুঁকির পেছনে কী কারণ কাজ করছে, কেন তা যথাযথভাবে মোকাবিলা করা যাচ্ছে না এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে কী করা প্রয়োজন—এসব বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা নয়, এর কারণগুলো বুঝে কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজে বের করাও আমাদের লক্ষ্য। এ জন্য আমরা প্রমাণভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা করছি, যাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়গুলো তুলে ধরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
এই গবেষণার মাধ্যমে উপকূলীয় নারী ও কিশোরীর বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং তাঁদের স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আজকের আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের মতামত ও অভিজ্ঞতা আমাদের গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তন ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে সহায়ক হবে।
স্নিগ্ধা রেজওয়ানা
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বুঝতে হলে পানির সঙ্গে জেন্ডারের সম্পর্ক বুঝতে হবে। নারীরা পানি সংগ্রহ ও গৃহস্থালির কাজে যুক্ত থাকায় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে বেশি আসেন। নিরাপদ পানি সংগ্রহের জন্য ঋণে ‘পিংক ট্যাংক’ পেলেও মাসিক ব্যবস্থাপনায় সেই পানি ব্যবহারের সুযোগ তাঁরা পান না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমাদের গবেষণায় দেখেছি, উপকূলীয় নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকিকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তন বা লবণাক্ততার ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। চিংড়িঘেরের বিস্তার, দাদন, ঋণব্যবস্থা, বনসম্পদ সংগ্রহ এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থার নানা সংকটও নারীদের দীর্ঘ সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে থাকতে বাধ্য করছে। বাল্যবিবাহ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও নারীর প্রতি সামাজিক নিয়ন্ত্রণও তাঁদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।
উপকূলের স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সেবাব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। শুধু অবকাঠামোকেন্দ্রিক নয়, মানুষকে কেন্দ্র করে অভিযোজন পরিকল্পনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার সংকট বিবেচনায় নিয়েই নারী ও কিশোরীর ঝুঁকি কমিয়ে তাঁদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দিলরুবা হায়দার
প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট, ইউএন উইমেন
জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে আমাদের পরিমাণগত গবেষণা দরকার। আমরা অনেক বিষয় জানি, কিন্তু সেগুলোর পক্ষে শক্ত প্রমাণ দিতে হলে সংখ্যাভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন ও জেন্ডার কর্মপরিকল্পনাকেও আমাদের গবেষণার আওতায় আনতে হবে। সেখানে থাকা প্রকল্প ও সূচকগুলো পর্যালোচনা করাও জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখতে গিয়ে শুধু লবণাক্ততা বা পানির সংকটের দিকে তাকালে হবে না, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবও দেখতে হবে। সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলেই নারী ও কিশোরীর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সামগ্রিক প্রভাব আমরা বুঝতে পারব। এ ছাড়া বনায়নের জন্য উপযুক্ত জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। বাংলাদেশের বাঁধগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সামাজিক বনায়নে নারীরা বড় ভূমিকা পালন করেছেন। একইভাবে বনায়ন কার্যক্রমে নারীদের যুক্ত করতে পারলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার সমতা ও নারী-কিশোরীর সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে হলে গবেষণা, তথ্য ও বাস্তব উদ্যোগ—সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
ইকবাল কবীর
সাবেক পরিচালক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ
উপকূলের বাস্তবতার সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মানিয়ে নিতে হবে। মোংলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আমরা কমিউনিটির অংশগ্রহণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে জলবায়ু-সহনশীল ও নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবার মডেল তৈরি করেছি।
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এর সঙ্গে পানি, স্বাস্থ্য, জীবিকা, সামাজিক রীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যক্তিগত পরিচর্যায় বৈষম্য এবং চিংড়িঘেরসহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নারীর শ্রম বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় তাঁদের ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
উপকূলের অনেক নারী জরায়ু প্রোল্যাপ্সের সমস্যা সামাজিক সংকোচে গোপন রাখেন এবং চিকিৎসা নেন না। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে কাজ করায় তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। একপর্যায়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু অপসারণের প্রয়োজন হয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তন, জেন্ডার বৈষম্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আন্তসম্পর্কিতভাবে বিবেচনা করে নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
মুমিতা তানজিলা
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
নারীকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষ হিসেবে দেখলে তাঁর সক্ষমতার জায়গাটি আড়ালে থেকে যায়। নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা, দৈনন্দিন জীবনে অর্জিত দক্ষতা এবং স্থানীয় জ্ঞান ও চর্চাকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। নীতিতে নারীদের শুধু সুবিধাভোগী নয়, সক্রিয় অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
সুন্দরবন এলাকার ৪০০ বনজীবী পরিবারের ওপর আমাদের একটি গবেষণায় দেখেছি, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ায় বননির্ভর মানুষের জীবিকায় প্রভাব পড়েছে। স্থায়ী অভিবাসন কম হলেও মৌসুমি অভিবাসনের ক্ষেত্রে নারীদের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ু ও জেন্ডার বিষয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণগত তথ্য নেই। তাই বড় পরিসরে পরিমাণগত গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরি করা জরুরি।
উপকূলের স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সেবাব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। শুধু অবকাঠামোকেন্দ্রিক নয়, মানুষকে কেন্দ্র করে অভিযোজন পরিকল্পনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার সংকট বিবেচনায় নিয়েই নারী ও কিশোরীর ঝুঁকি কমিয়ে তাঁদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
মাহফুজা পারভীন
বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
সচেতনতা বাড়ানো, স্থানীয় জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা গেলে নারীরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন। উপকূলের লবণাক্ততার জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করলে হবে না। এর সঙ্গে মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপ, পানি উত্তোলন এবং স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। লবণাক্ততা দ্রুত কমবে না, তাই এর সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেওয়া যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
পানির সংকট মোকাবিলায় পুকুরগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে কৃত্রিম জলাভূমিতে রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে যে পরিবর্তন আসছে, তার প্রভাব বননির্ভর মানুষের জীবিকার ওপরও পড়ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নারী ও কিশোরীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা, পানিপ্রবাহ ও জীবিকার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতিনির্ভর সমাধান কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
ডা. জেবুন্নেসা রহমান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
মানসিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর জোর দিতে চাই। অতিরিক্ত গরম, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকি নারী ও কিশোরীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। দুর্যোগে গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় নিরাপদ প্রসব ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রয়োজনীয় সবজি বেশি দামে কিনতে হয়, যা নারী ও কিশোরীর পুষ্টিতে প্রভাব ফেলে। খাদ্যসংকটে অপুষ্টির পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জেন্ডার-সংবেদনশীল জলবায়ু অভিযোজন
নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগে মাতৃ ও শিশুসেবার ধারাবাহিকতা, জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও রেফারেল ব্যবস্থার পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পারভীন সুলতানা
নারী মৎস্যজীবী, মোংলা, বাগেরহাট
আমি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা থেকে এসেছি। কয়েক বছর আগে ৬০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে একটি জাল কিনেছিলাম। সেই জাল দিয়ে স্বামী-স্ত্রী পশুর নদে মাছ ধরি। মাছ দেওয়ার বিনিময়ে দাদন শোধ করলেও ঋণের চক্র থেকে বের হতে পারছি না। মাছ ধরার পাশাপাশি সংসারের কাজ ও সুপেয় পানি সংগ্রহের বাড়তি চাপ, শারীরিক অসুস্থতা এবং দাদন শোধের চিন্তা সামলাতে হয়।
পশুর নদের পাড়ের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ নদীনির্ভর। আমাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা পানিতে থাকতে হয়। লবণাক্ততার কারণে চুলকানি, চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছি। তাপমাত্রা বাড়ায় কৃষিকাজেও সমস্যা হচ্ছে। বৈশাখ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত বেশি মাছ ধরতে হয়, তখন দাদনের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ে। ১ হাজার টাকা নিলে মাছ বিক্রি করে ৬০০ টাকা করে পরিশোধ করতে হয়। ফলে মাছ ধরেও সংসার চালাতে পারছি না।
কুসুম আক্তার
নারী মৎস্যজীবী, মোংলা, বাগেরহাট
আমি মোংলার নিচু অঞ্চলের মানুষ। প্রতিদিন দেড়–দুই কিলোমিটার হেঁটে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। সংসার চালাতে বাবার সঙ্গে বাড়ির পাশে দুই বিঘা জমিতে চিংড়ি চাষ করি। দিনের বড় সময় লবণাক্ত পানিতে থাকায় প্রায়ই গায়ে চুলকানি হয়। এক বছরে চিকিৎসায় ১৭–১৮ হাজার টাকা খরচ করেও এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাইনি।
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, তাপদাহ, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে আমাদের ঘরবাড়ি, কৃষি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। পানি আনতে গিয়ে নারীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হয়, অনেক সময় ইভ টিজিংয়ের শিকার হতে হয়। অর্থনৈতিক সংকটে মেয়েদের পড়াশোনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং বাল্যবিবাহও হচ্ছে। চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারায় অনেকে সময়মতো চিকিৎসা ও পরীক্ষা করাতে পারছেন না। সরকারের উদ্যোগ চাই, ব্যবস্থা চাই।
ফারিহা জেসমিন
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাদাবন সংঘ
আমরা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করি। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নারীরা কীভাবে সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হচ্ছেন, তা আমরা মাঠে দেখছি।
মোংলায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীরা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। পুরুষেরা জেলে পরিচয়পত্র পেলেও নারীরা তা পাচ্ছেন না। ফলে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে নারীদের দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে কাজ করতে হচ্ছে। এতে চর্মরোগ, গর্ভপাতসহ নানা শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তাঁরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জেন্ডার বৈষম্য কীভাবে নারীর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, সেটিই আমাদের গবেষণার মূল বিষয়। অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের কারণে বহু নারী ও কিশোরী একাকী জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে বাণিজ্যিক জলযান ও বহিরাগতদের উপস্থিতি, অন্যদিকে জীবন-জীবিকার সংকট এসবের যৌথ প্রভাবে তাঁরা যৌন নিপীড়ন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও বাল্যবিবাহের উচ্চ ঝুঁকিতে পড়ছেন। অতএব, নারীদের স্বীকৃতি ও তাঁদের অধিকার সুরক্ষা করা অত্যন্ত আবশ্যক।
সারাবান তহুরা জামান
নারীবাদী আইনজীবী ও উন্নয়ন পেশাজীবী
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলের নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্য, জীবিকা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় (এনএপি) নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং পানির লবণাক্ততার প্রভাব আরও বিশদভাবে বিবেচনা করতে হবে। দুর্যোগের সময় মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, রেফারেল ব্যবস্থা ও স্থানীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে জীবিকার সংকটে নারীরা যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হতে বাধ্য না হন, সে জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
প্রান্তিক নারীদের শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্রিয় অংশীজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অংশীদারি সংস্থাগুলোকে আরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। জলবায়ু অভিযোজনের অগ্রগতি বুঝতে জেন্ডারভিত্তিক তথ্য ও কার্যকর পর্যবেক্ষণব্যবস্থাও জরুরি।
এনএপিতে নারীর প্রজননস্বাস্থ্য ও লবণাক্ততার প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করা।
স্থানীয় বাস্তবতা ও জ্ঞানভিত্তিক অভিযোজন পরিকল্পনা করা।
জেন্ডারভিত্তিক তথ্য ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
নারীকে কৃষক ও মৎস্যজীবী হিসেবে স্বীকৃতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।
নারীর নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করা।
বাল্যবিবাহ ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে স্থানীয় উদ্যোগ জোরদার করা।
অভিযোজন পরিকল্পনায় নারী ও কিশোরীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
ড. মো. সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; সেখ ফরিদ আহমেদ, যুগ্ম সচিব, ত্রাণ কর্মসূচি অধিশাখা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়; ফারাহ কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ; আজমান আহমেদ চৌধুরী, কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ; গওহার নঈম ওয়ারা, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসচিব, ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম; মো. শামসুদ্দোহা, প্রধান নির্বাহী, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট; লিপি রহমান, নির্বাহী পরিচালক, বাদাবন সংঘ; স্নিগ্ধা রেজওয়ানা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; দিলরুবা হায়দার, প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট, ইউএন উইমেন; ইকবাল কবীর, সাবেক পরিচালক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ; মুমিতা তানজিলা, সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি; মাহফুজা পারভীন, বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ডা. জেবুন্নেসা রহমান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; পারভীন সুলতানা, নারী মৎস্যজীবী, মোংলা, বাগেরহাট; কুসুম আক্তার, নারী মৎস্যজীবী, মোংলা, বাগেরহাট; ফারিহা জেসমিন, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাদাবন সংঘ; সারাবান তহুরা জামান, নারীবাদী আইনজীবী ও উন্নয়ন পেশাজীবী; সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
দেশে হঠাৎ করেই গাড়ির টায়ার আমদানি বেড়ে গেছে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। যদিও দেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টায়ার উৎপাদন করে। বছর দুয়েক আগে গাজী গ্রুপের কারখানা বন্ধের পর অন্য কারখানাগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। দেশীয় কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধির পরও আমদানি বাড়ছে।জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, বাস ও ট্রাকের ৬৪ লাখ টায়ার আমদানি হয়েছিল। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৯৬ লাখে দাঁড়িয়েছে।বিদেশ থেকে টায়ার আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে আমদানি খরচও। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টায়ার আমদানিতে খরচ হয়েছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছর সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকায়। তার মানে দুই বছরের ব্যবধানে টায়ার আমদানিতে খরচ বেড়েছে ৪২৪ কোটি টাকা।খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক উদ্যোক্তা জানান, দেশীয় টায়ার উৎপাদকের মধ্যে গাজী গ্রুপের হিস্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি আর উৎপাদনে নেই। তাদের শূন্য স্থান অন্য কারখানাগুলো পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। সে কারণেই টায়ারের আমদানি বাড়ছে।জানা যায়, দেশে বর্তমানে মেঘনা গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, রূপসা টায়ারস অ্যান্ড কেমিক্যালস, এপেক্স হোসেন টায়ার, যমুনা গ্রুপসহ কয়েকটি কোম্পানি টায়ার উৎপাদন করে। কোম্পানিগুলো রিকশা, ভ্যান ও বাইসাইকেলের টায়ার বেশি উৎপাদন করে। তবে মোটরসাইকেল, সিএনজি ও পিকআপের টায়ারও তৈরি হচ্ছে এসব কারখানায়।এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছর ৩৯ লাখ পিস বাস-ট্রাকের টায়ার আমদানি হয়েছিল। গত অর্থবছর সেটি বেড়ে ৫৭ লাখ ৫১ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমদানি বেড়েছে ৪৭ শতাংশ।মোটরসাইকেলের টায়ার আমদানি বেড়েছে ৪৯ শতাংশ। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ লাখ ৬৩ হাজার মোটরসাইকেলের টায়ার আমদানি হয়েছিল। গত অর্থবছর সেটি বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৪১ হাজার পিস। এ ছাড়া বাইসাইকেলের টায়ার আমদানি বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০ লাখ ৫৫ হাজার বাইসাইকেলের টায়ার আমদানি হয়েছিল। গত অর্থবছর সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ পিসে।আগে রিকশা, তিন চাকার যান ও ছোট বাণিজ্যিক যানবাহনে ব্যবহৃত টায়ারের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করত গাজী টায়ার। এ ছাড়া বাস ও ট্রাকের টায়ারের বাজারের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং মিনিবাসের ৬৫ শতাংশ টায়ারের চাহিদা গাজী টায়ার পূরণ করত।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গাজী টায়ারের দুই কারখানায় লুট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গাজী গ্রুপের মালিকানায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও উৎপাদনে ফিরতে পারেনি গাজী গ্রুপের দুই টায়ার কারখানা।গাজী টায়ারের কারখানায় বছরে ৪৫-৫০ লাখ টায়ার ও টিউব উৎপাদন সক্ষমতা ছিল। দেশের বাজারে রিকশা ভ্যানের টায়ারের প্রায় অর্ধেক এবং বাস-ট্রাক ও অটোর টায়ার-টিউবের প্রায় ৪০ শতাংশ তাদের দখলে ছিল। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৯১ কোটি টাকার টায়ার-টিউব বিক্রি করেছিল গাজী টায়ারের দুই প্রতিষ্ঠান-গাজী টায়ার ও গাজী অটো টায়ার।জানা যায়, উৎপাদনে ফিরতে না পারলেও আমদানি করে ব্যবসায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে গাজী টায়ার ও গাজী অটো টায়ার।আরএফএল গ্রুপ তাদের হবিগঞ্জ শিল্পপার্কে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, সিএনজি, মিশুক এবং দেড় টনের ট্রাকের টায়ার উৎপাদন করে। মাসে তাদের ৮ লাখ পিস টায়ার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে এই শিল্পগ্রুপ যেসব টায়ার উৎপাদন করে, তার ৮০ শতাংশই সাইকেল, রিকশা ও ভ্যানের টায়ার।চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাস ও ট্রাকের টায়ার উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে আরএফএল গ্রুপ—এমন তথ্য দিয়ে শিল্পগোষ্ঠীটির বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বাজারে চাহিদা বিশ্লেষণ করে দেখছি। ইতিবাচক ফিডব্যাক পেলে দ্রুতই উৎপাদনে যাব।’টায়ার আমদানি কেন বাড়ছে জানতে চাইলে কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকায় অটোরিকশার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই তুলনায় উৎপাদন খুব বেশি বাড়েনি। আর্থসামাজিক কারণেও গত দুই বছরে এই খাতে খুব বেশি বিনিয়োগ হয়নি। আবার টায়ার উৎপাদনে গ্যাসও লাগে। সব মিলিয়ে আমরা একটু পিছিয়ে রয়েছি।’১৯৯১ সালে টায়ারের ব্যবসায় নামে রূপসা টায়ারস অ্যান্ড কেমিক্যালস। ২০১৭ সালের আগপর্যন্ত তারা রিকশা, ভ্যান ও বাইসাইকেলের টায়ার উৎপাদন করত প্রতিষ্ঠানটি। তারপর মোটরচালিত যান বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার টায়ার উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে তাদের দিনে ৮ হাজার টায়ার ও ৩০ হাজার টিউব উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। দুই বছর আগে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩০ শতাংশ কম।জানতে চাইলে রূপসা টায়ারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিরাজ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মোটরসাইকেল টায়ারের বাজার বড় হচ্ছে। বাজার চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দেশীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও বেড়েছে। একইভাবে বিদেশি টায়ারও প্রচুর আসছে। তার অন্যতম কারণ ভারতীয় মোটরসাইকেল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। তারা ভারত থেকে টায়ার নিয়ে আসছে। আবার ক্রেতাদের মধ্যে বিদেশি টায়ারের চাহিদা বেশি।মিরাজ রহমান আরও বলেন, ‘বাস-ট্রাকের টায়ার উৎপাদনে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। তবে সে অনুযায়ী আমাদের বাজার অত বড় নয়। তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে পিকআপ ও মিনিবাসের টায়ার আমদানিতে কর বৃদ্ধি করেছে সরকার। আমরা এখন এই দুই ধরনের টায়ারের উৎপাদনে বিনিয়োগ করব।’
চট্টগ্রামে গত দেড় মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগর এবং নগরসংলগ্ন সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলার রোগী বেশি। আর এই তিন স্থানে পৃথক দুটি জরিপ চালিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। জরিপে এই তিন এলাকায় দুই ধরনের মশার লার্ভার উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। জেলা ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, গত জুন মাসে চট্টগ্রাম নগরে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এরপর গত জুলাই-আগস্ট মাসে দুই উপজেলায় আক্রান্ত বাড়লে সেখানেও জরিপ চালানো হয়। দুই জরিপে প্রাপ্ত লার্ভার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’ বা পীত জ্বরের মশা এবং ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’ বা ‘এশিয়ান টাইগার’ মশা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।যেভাবে চিনবেন টাইগার মশা এশিয়ান টাইগার মশা বা এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস ইজিপ্টি দেখতে অনেকটা একই হলেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। অ্যালবোপিকটাসের কালো বক্ষের মাঝখানে একটি সাদা সরল দাগ থাকে, আর এডিস ইজিপ্টির বক্ষে বীণার মতো সাদা নকশা দেখা যায়। এডিস ইজিপ্টি মানুষের ঘরবাড়ির আশপাশে বেশি থাকে এবং মানুষের রক্তে বেশি আকৃষ্ট হয়। অ্যালবোপিকটাস সাধারণত ঘরের বাইরের বাগান-ঝোপঝাড়ে বেশি দেখা যায়।কীটতত্ত্ববিদেরা জানান, দেশে ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টাই। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাস ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার বাহক। অর্থাৎ দুটির কামড়েই ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকি রয়েছে। কোনো এলাকায় এডিস ইজিপ্টাইয়ের লার্ভা বেশি পাওয়া গেলে সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাসের লার্ভা বেশি পাওয়া গেলে সেখানে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ারও ঝুঁকি থাকে।২০১৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, এডিস অ্যালবোপিকটাসের প্রায় ৯৯ শতাংশ লার্ভা বাড়ির বাইরে পাওয়া গেছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয় ও কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাসের প্রজননস্থলের এই পার্থক্যকে মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।জরিপে নগর ও দুই উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, বাসাবাড়ির আশপাশের পাত্রসহ বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। গত জুন মাসের জরিপে নগরের প্রতি চার বাড়ির একটিতে ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া যায়। তবে দুই উপজেলায় চালানো জরিপের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন সৌনম বড়ুয়া বলেন, কর্ণফুলীতে বিভিন্ন বাড়ির উঠান এবং সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন দোকানের সামনে ফেলে রাখা যন্ত্রাংশ, কৌটা ও টায়ারে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এডিস এজিপ্টাইয়ের সংখ্যা বেশি। পাশাপাশি এডিস অ্যালবোপিকটাসের লার্ভাও পাওয়া গেছে। এসব স্থান পরিষ্কার করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বলা হয়েছে। প্রশাসনকেও জানানো হয়েছে।চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভিড় বাড়ছেকোথায় থাকে এই মশা, কখন কামড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, এডিস মশা মূলত দিনের বেলা সক্রিয় থাকে। ভোরের পর এবং সন্ধ্যার আগে এদের কামড়ানোর প্রবণতা বেশি। এডিস ইজিপ্টাই সাধারণত মানুষের বসতির আশপাশে এবং ঘরের ভেতর ও বাইরে থাকে। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাস সাধারণত ঘরের বাইরে, বিশেষ করে ঝোপঝাড় ও গাছপালার আশপাশে বেশি দেখা যায়।ঢাকায় পরিচালিত এক গবেষণায় বাড়িঘরের আশপাশের পানির পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণসামগ্রী ও যানবাহনের পরিত্যক্ত অংশকে এডিস মশার গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইসিডিডিআরবি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জরিপ চালিয়ে ১২ হাজার ৬৮০টি লার্ভা ও পিউপা সংগ্রহ করেন। এর প্রায় ৮২ শতাংশ ছিল এডিস ইজিপ্টাই।২০১৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, এডিস অ্যালবোপিকটাসের প্রায় ৯৯ শতাংশ লার্ভা বাড়ির বাইরে পাওয়া গেছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয় ও কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাসের প্রজননস্থলের এই পার্থক্যকে মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।জেলা কীটতত্ত্ববিদ (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ মো. মঈন উদ্দীন বলেন, এডিস সাধারণত পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। সীতাকুণ্ড উপজেলায় জাহাজের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির দোকানের সামনে ফেলে রাখা ফ্রিজ, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও কৌটায় বৃষ্টির পানি জমে ছিল। এসব জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। কর্ণফুলী উপজেলায় বিভিন্ন বাড়ির উঠান ও সামনের অংশে রাখা পাত্র, পুরোনো টায়ার ও ফুলের টবে জমে থাকা পানিতেও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।এশিয়ান টাইগার মশা বা এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস ইজিপ্টি দেখতে অনেকটা একই হলেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। অ্যালবোপিকটাসের কালো বক্ষের মাঝখানে একটি সাদা সরল দাগ থাকে, আর এডিস ইজিপ্টির বক্ষে বীণার মতো সাদা নকশা দেখা যায়। এডিস ইজিপ্টি মানুষের ঘরবাড়ির আশপাশে বেশি থাকে এবং মানুষের রক্তে বেশি আকৃষ্ট হয়। অ্যালবোপিকটাস সাধারণত ঘরের বাইরের বাগান-ঝোপঝাড়ে বেশি দেখা যায়।‘সকালেও মশারি টানাতে হবে’ কীটতত্ত্ববিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এডিস মশা ঠিক কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি কামড়ায় বা কোন এলাকায় এর কামড়ের ঝুঁকি বেশি—তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধু সন্ধ্যা বা রাতের কথা মাথায় রেখে মশারি ব্যবহার করলেই হবে না। দিনের বেলাতেও বিশ্রাম নেওয়ার সময় মশারি টানিয়ে শোয়া উচিত। পাশাপাশি সম্ভব হলে ফুলহাতা জামাকাপড় পড়তে হবে।কীটতত্ত্ববিদেরা জানিয়েছেন, এডিস মশা সাধারণত দিনের আলো ফোটার পর এবং সূর্য ডোবার কয়েক ঘণ্টা আগে বেশি সক্রিয় থাকে। তবে রাতে ঘরের আলোতেও সক্রিয় হয়ে কামড়াতে পারে। এডিস ইজিপ্টাই সাধারণত মানুষের বসতির কাছাকাছি থাকতে বেশি পছন্দ করে। এডিস অ্যালবোপিকটাস গাছপালা ও ঘরের বাইরের পরিবেশে বেশি থাকে। এই প্রজাতি মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীকে কামড়াতে পারে।চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে। মোট আক্রান্ত ৩ হাজার ২৭০ জনের মধ্যে ১ হাজার ২৩৪ জন আক্রান্ত হয়েছে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে। ইতিমধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে।চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, দিনের বেলাতেও ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়ার সময় মশারি টানাতে হবে। প্রয়োজন হলে এবং সম্ভব হলে ফুলহাতা জামাকাপড় পরতে হবে। একই সঙ্গে ঘরের আশপাশ সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে এডিস মশার কোনো প্রজননস্থল তৈরি না হয়। যেহেতু ভাইরাসের বাহক চিহ্নিত করা গেছে, এখন সচেতনতা মুখ্য।
দেশের কোটি মানুষের রান্নাঘরের চুলা আজ নিবু নিবু। সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত। সরকার জনগণের এই কষ্ট গভীরভাবে অনুভব করে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রতিদিন জ্বালানি পরিস্থিতি মনিটর করছে। আমরা আশাবাদী, এ সংকট সাময়িক এবং সরকার দ্রুততম সময়ে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বদ্ধপরিকর এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি আর না হয়, সে লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই পরিস্থিতিকে শুধু ‘গ্যাস–সংকট’ বললে ভুল হবে। এটি আসলে ‘জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট’। ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে ওই ঘটনার ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এটিকে নিছক দুর্ঘটনা বললে ভুল হবে, এটি গত দেড় দশক ধরে গড়ে ওঠা আমদানিনির্ভর জ্বালানিকাঠামোর অনিবার্য পরিণতি। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন কোটি কোটি মানুষের রান্নাঘর অচল হবে, এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা।বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট বা ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে এক বছর আগেও দেশে গ্যাসের সরবরাহ ছিল প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ঘনফুট। ফলে তখনো প্রতিদিন প্রায় ১.০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকত। এই ঘাটতির একটি বড় অংশ পূরণ করা হতো আমদানি করা এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে। গত ২১ জুলাই ২০২৬ কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে। এতে টার্মিনালের কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো ইউনিট বন্ধ করে দেয়। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৩০ জুলাইয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শুধু এলএনজির ঘাটতিই ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে। এতে রাতারাতি জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন রাজধানীর সাধারণ মানুষ। ঢাকার মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডাসহ প্রায় সব এলাকাতেই বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। নিম্ন আয়ের মানুষেরা মাটির চুলায় ফিরে গেছেন। মধ্যবিত্তরা অনেক ক্ষেত্রে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাঁদের মাসিক বাজেটে বড় ধাক্কা দিচ্ছে। শিল্পের অবস্থাও খারাপ। বিজিইএমএ ও বিকেইএমএ ইতিমধ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে। গ্যাসের অভাবে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং ইউনিটগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। সময়মতো শিপমেন্ট না গেলে ক্রেতা অন্য দেশে চলে যাবে। এর মানে লাখো শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকিতে পড়ছে।একটি দুর্ঘটনায় যদি পুরো দেশের জ্বালানিব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটা দুর্ঘটনায় নয়, ব্যবস্থায়। আর এ অব্যবস্থাপনা এক দিনের নয়। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আজ তিনটি কাঠামোগত ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে। প্রথমত দেশীয় উৎপাদনে ধস ও আমদানিনির্ভরতা, দ্বিতীয়ত ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ফেইলিওর’ ঝুঁকি এবং তৃতীয়ত সিস্টেম লস ও অব্যবস্থাপনা।দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন গত দেড় দশকে ক্রমাগত কমেছে। বিবিয়ানা, তিতাস, হবিগঞ্জে ও জালালাবাদের মতো বড় ক্ষেত্রগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। ফলে আমাদের নিজস্ব উৎপাদন পেট্রোবাংলার তথ্য আনুযায়ী গত এক বছরে দৈনিক সরবরাহ ২.৮ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ২.৩ বিলিয়ন ঘনফুটের ঘরে এসেছে। এই অতিরিক্ত ঘাটতি এখন এলএনজি দিয়েও মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। আজ দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। অর্থাৎ আমরা আমাদের রান্নাঘরের চুলা থেকে শিল্পের চাকা—সবকিছুই আমরা বৈদেশিক জ্বালানির ওপর ছেড়ে দিয়েছি।বাংলাদেশে এখন দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। দুটিই মহেশখালীতে। একটি চালায় এক্সিলারেট এনার্জি, যার ক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যটি সামিটের, যার ক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সমস্যা হলো, এক্সিলারেটের টার্মিনাল একাই মোট এলএনজি সরবরাহের ৫৫ শতাংশ দেয়। এটি বন্ধ হওয়া মানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ২২ শতাংশ রাতারাতি উধাও হয়ে যাওয়া। জাতীয় নিরাপত্তার ভাষায় একে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ফেইলিওর’ বলে। অর্থাৎ একটি পয়েন্টে আঘাত লাগলে পুরো সিস্টেম কলাপস করে। ২১ জুলাইয়ের ঘটনা সেটাই প্রমাণ করেছে।দেশে গ্যাসের সিস্টেম লস এখনো প্রায় ১০ শতাংশ। এর মধ্যে বড় অংশ অবৈধ সংযোগ। একটি হিসাবে দেখা যায়, শুধু অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা গেলে দৈনিক ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে ১০ লাখের বেশি বাসাবাড়ির চাহিদা মেটানো যায়।দেশে গ্যাসের সিস্টেম লস এখনো প্রায় ১০ শতাংশ। এর মধ্যে বড় অংশ অবৈধ সংযোগ। একটি হিসাবে দেখা যায়, শুধু অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা গেলে দৈনিক ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে ১০ লাখের বেশি বাসাবাড়ির চাহিদা মেটানো যায়।এই তিন দুর্বলতা মিলেই আজকের জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট তৈরি করেছে। ২১ জুলাইয়ের আগুন শুধু এই দুর্বলতাকে সবার সামনে উন্মোচিত করেছে। সরকার এই সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও তার কোম্পানিগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।সাম্প্রতিক সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে কারিগরি সমস্যা, আগুন, এলএনজি কার্গোর বিলম্ব কিংবা টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই বাস্তব কারণ। কিন্তু এগুলোকে যদি সংকটের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে আমরা মূল সমস্যাটি এড়িয়ে যাব। বাংলাদেশের গ্যাস-নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো দেশীয় উৎপাদনের ধারাবাহিক পতন। বাংলাদেশের গ্যাস উৎপাদন গত এক বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমেছে অথচ গ্যাসের ওপর অর্থনীতির নির্ভরতা কমেনি; বরং শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন, সিএনজি ও নগরায়ণের সঙ্গে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে; কিন্তু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এ জায়গাতেই বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব। এই ঘাটতি পূরণ করতে আমরা এলএনজি আমদানি করছি। এটি প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু এলএনজি কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। কারণ, এলএনজি কিনতে বৈদেশিক মুদ্রা লাগে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। সরবরাহকারী দেশে উৎপাদন বা ভূরাজনৈতিক সমস্যা হলে আমাদের সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ে। সমুদ্রপথ, এলএনজি carrier, terminal, FSRU, regasification এবং pipeline infrastructure-এর যেকোনো একটি জায়গায় সমস্যা হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। গত সরকারের আমলে এমন একটি জ্বালানিব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে দেশীয় গ্যাসের পতনকে ক্রমবর্ধমান এলএনজি আমদানি দিয়ে পূরণ করার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। তাই বর্তমান সংকট শুধু একটি দুর্ঘটনার ফল নয়। দুর্ঘটনাটি একটি বিদ্যমান দুর্বলতাকে দৃশ্যমান করে দিয়েছে।এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এলএনজি আমদানির বিরোধিতা করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি ও গ্যাস-চাহিদার বাস্তবতায় এলএনজি প্রয়োজন। আগামী কয়েক বছরেও প্রয়োজন হবে। আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই সমস্যা এলএনজি নয়; বরং সমস্যা হলো এলএনজিকে দেশীয় অনুসন্ধানের বিকল্প হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া। একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সাধারণত একটিমাত্র উৎসের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় না। দেশীয় উৎপাদন, আমদানি, অবকাঠামো, মজুত, সরবরাহের বৈচিত্র্য, জরুরি পরিকল্পনা এবং বিকল্প জ্বালানিব্যবস্থা মিলেই একটি স্থিতিশীল জ্বালানিব্যবস্থা তৈরি হয়। আমাদের দেশের সম্পদ মাটির নিচে রেখে বা যথাযথ অনুসন্ধান না করে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা আমাদের জন্য এখনো সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। দেশের স্থলভাগে এমন অনেক সম্ভাবনাময় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে, যেগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক পদ্ধতিতে অনুসন্ধান এখনো সম্পন্ন হয়নি। একই সঙ্গে পুরোনো ও উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নততর সাইসমিক ডেটা এবং নতুন ভূতাত্ত্বিক মডেলের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। পুরোনো তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে নতুন তথ্যের সমন্বয় করে এসব ক্ষেত্রে অবশিষ্ট মজুত, নতুন স্তরে গ্যাসের সম্ভাবনা কিংবা বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও খুঁজে দেখা যেতে পারে। এর পাশাপাশি দেশের সমুদ্রসীমায় অগভীর ও গভীর সমুদ্রে গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানের একটি বড় সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তবে আমাদের অনুসন্ধান কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ধারাবাহিকতা, গতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি। গ্যাস অনুসন্ধানের ফল রাতারাতি পাওয়া সম্ভব নয়। একটি এলাকায় সাইসমিক জরিপ করে একটি কূপ খনন করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। অর্থাৎ আজ যে অনুসন্ধান শুরু হবে, তার সুফল হয়তো কয়েক বছর পর পাওয়া যাবে। তাই আজকের ঘাটতি পূরণের জন্য শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না, বরং পাঁচ বছর পর আমরা আবার একই প্রশ্ন করব।গত কয়েক বছরে জ্বালানি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। অথচ সেই বিপুল ব্যয়ের সমান্তরালে দেশীয় জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও মজুত বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিনিয়োগ করা গেলে পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতে পারত। আমদানি অবশ্যই জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি চাহিদা মোকাবিলায়। কিন্তু আমদানিনির্ভরতা কখনোই একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। ফলে আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।এখানে বাপেক্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাপেক্সকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়; বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম কৌশলগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোথায় নতুন ২ডি সাইসমিক জরিপ প্রয়োজন, কোথায় ৩ডি সাইসমিক জরিপ করা অধিক যুক্তিযুক্ত, কোন পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার এবং কোন সম্ভাবনাময় কাঠামোয় অনুসন্ধান কূপ খনন করা উচিত এই সিদ্ধান্তগুলো আবেগ নয়, বরং ভূতত্ত্ব ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্যাস অনুসন্ধান কোনো এককালীন উদ্যোগ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। একটি কূপ সফল হলো কি না, শুধু তার ভিত্তিতে একটি অনুসন্ধান কর্মসূচির সাফল্য বা ব্যর্থতা বিচার করা উচিত নয়। বরং নিয়মিত সাইসমিক জরিপ, আধুনিক প্রযুক্তিতে ডেটা বিশ্লেষণ এবং প্রতিটি কূপের সফলতা ও ব্যর্থতা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে পরবর্তী অনুসন্ধানে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়েই অনুসন্ধানের সক্ষমতা বাড়ে।নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: ns@prothomalo.comবর্তমান সরকার মনে করে, জ্বালানি নিরাপত্তা মানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব। যত দিন আমরা রান্নার গ্যাসের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকব, তত দিন আমরা পরনির্ভরতা থেকে মুক্তি পাব না। তাই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলো জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জন। সরকার যদি আগামী ছয় মাসে সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে পারে তাহলে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি গ্যাস সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে একটি মাঝারি আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো সম্ভব হবে।বাপেক্সকে শক্তিশালী করার কাজ চলমান আছে। সরকার ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি গভীর কূপ খননও রয়েছে। ভোলার গ্যাস নদী পার করে নিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। লক্ষ্য হলো, আগামী তিন বছরে দেশীয় উৎপাদন দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানো। দেশের তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবিলায় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যে নতুন দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) এবং একটি ল্যান্ড-বেজড (স্থলভিত্তিক) এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।লেখকমিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা জয়ের পর আমাদের বিশাল সমুদ্র এলাকায় গ্যাস থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে সরকার কয়লা, পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এতে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। ফলে সেই গ্যাস শিল্প ও বাসাবাড়িতে দেওয়া যাবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল স্থাপন, সোলার ইনভার্টার উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে সরকারি সহায়তা এবং সৌরবিদ্যুৎকে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও লাভজনক করতে কার্যকর অর্থনৈতিক মডেল প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। জ্বালানিকে তাই শুধু একটি পণ্য হিসেবে নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে একটি সুসমন্বিত ভারসাম্য রেখে পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ছাড়া শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করা সম্ভব নয়।দিন শেষে আমাদের মূল সমস্যা শুধু গ্যাস–সংকট নয়, বরং এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত ও টেকসই জ্বালানিব্যবস্থা, যেখানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন, এলএনজি আমদানি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। এ ধরনের বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানিব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতাও বজায় রাখা সম্ভব হবে।*লেখক: মোহাম্মদ আনিসুর রহমান রানা, পরিচালক, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ওসাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জিওলজিক্যাল সোসাইটি