বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম কমেনি। এখনো এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে বেশি দামেই ডিম ও মুরগি বিক্রি হচ্ছে। এর আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৭০-১৮০ টাকা। আর ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন ছিল ১৩০-১৪০ টাকা। আগস্টের শুরুতে পণ্য দুটির দাম বাড়ে; এরপর আর কমেনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার ও কাঁঠালবাগান বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিক্রেতারা বলছেন, গত পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও গরমে অনেক খামারে ডিম পাড়া মুরগিসহ ব্রয়লার মুরগি মারা যায়। পরে অনেক খামারি নতুন করে আর মুরগি পালন শুরু করেননি। এ ছাড়া সাম্প্রতিক লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণেও খামারে মুরগি পালন কমেছে। এসব কারণে বাজারে ডিম-মুরগির দাম কিছুটা বেশি।
গত সপ্তাহের তুলনায় বাজারে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৩০ টাকার মতো বেড়েছে। গতকাল প্রতি কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩৪০-৩৬০ টাকা। অবশ্য হাইব্রিড সোনালি বা কালারবার্ড মুরগির দাম কিছুটা কম, কেজি ৩০০-৩৩০ টাকা।
দীর্ঘ সময় ধরে ডিম ও মুরগির দাম না কমায় উদ্বেগ জানান রাজধানীর তাজমহল রোডের বাসিন্দা তাজুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার আয় কম। মাংসের মধ্যে মুরগিই মূলত কেনা হয়। সেটির দামই কমছে না।’
মাছবাজারের পরিস্থিতিও ডিম-মুরগির মতো। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রুই, কাতলা, পাবদা, তেলাপিয়া, পাঙাশ মাছ কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে। গতকাল আকারভেদে প্রতি কেজি চাষের পাঙাশ ২৫০-৩০০ টাকায় এবং তেলাপিয়া ২৫০-২৮০ টাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া আড়াই-তিন কেজি ওজনের রুই মাছ ৪০০ টাকা এবং কাতলার কেজি ৪২০ টাকা রাখেন বিক্রেতারা।
সবজির দাম অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বেশির ভাগ সবজির কেজি এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। ১০০ টাকার ওপরে দাম রয়েছে বরবটি, বেগুন ও কাঁচা মরিচের।
২ সেপ্টেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। এতে বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ থেকে বেড়ে ২০৪ টাকা হয়েছে।
মাসখানেক আগে খোলা চিনির কেজি ছিল ১০৫-১১০ টাকা। গতকাল তিনটি বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, খুচরা দোকানে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১১৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর মোড়কজাত চিনির কেজি ১২০ টাকা।
বাজারে পোলাও চাল বা সুগন্ধি চালের দাম এখনো ২০০ টাকার আশপাশে। সম্প্রতি পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছিলেন, সুগন্ধি চাল রপ্তানির উন্মুক্ত সুযোগ থাকায় দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ সংকট থেকে দাম বাড়তি। এ জন্য তাঁরা রপ্তানি কমানোর দাবি জানান। এরপর গত মঙ্গলবার সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে অনুমোদিত কোটা ৫০ শতাংশ কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সবজির দাম অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বেশির ভাগ সবজির কেজি এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। ১০০ টাকার ওপরে দাম রয়েছে বরবটি, বেগুন ও কাঁচা মরিচের।
আকারভেদে প্রতি কেজি চাষের পাঙাশ ২৫০-৩০০ টাকায় এবং তেলাপিয়া ২৫০-২৮০ টাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া আড়াই-তিন কেজি ওজনের রুই মাছ ৪০০ টাকা এবং কাতলার কেজি ৪২০ টাকা রাখেন বিক্রেতারা।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
আমার ঘরে ১১টা কান আছে।কাচের বয়ামে, সারি করে, জানালার তাকে, যেখানে সকালের রোদ পড়ে। ১১টাই বাঁ কান। কেন বাঁ কান, সেটা আপনি গল্পের মাঝামাঝি গেলে বুঝবেন। আর কেন সংখ্যাটা ১১–তে থেমে আছে, সেটা বুঝবেন শেষে গিয়ে। যদি শেষ পর্যন্ত যেতে পারেন। অনেকে পারে না। আমার গল্পটা আরামের নয়।আগে নিজের পরিচয়টা দিই। আমি ছবি আঁকি, ২৩ বছর ধরে। চারুকলার ডিগ্রি আছে, দুইটা গ্রুপ এক্সিবিশনের সার্টিফিকেট আছে, আর আছে একটা ঘরভর্তি না-বেচা ক্যানভাস। ২৩ বছরে আমি বিক্রি করেছি একটা ছবি—সাত হাজার টাকায়, এক এনজিওর অফিসের দেয়ালের জন্য, যেখানে ওটা এখন এসির পানির দাগের নিচে ঝুলছে।হাসবেন না। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘও জীবনে একটাই ছবি বেচেছিলেন—‘লাল আঙুরখেত’। ৪০০ ফ্রাঁ। লোকটা আট শতাধিক ছবি এঁকে গেছেন, আর দুনিয়া তাঁকে জ্যান্ত অবস্থায় একটার দাম দিয়েছে। মরার পরে সেই দুনিয়াই তাঁর ‘সূর্যমুখী’ কিনেছে ৯৪ মিলিয়ন ডলারে। এখন তাঁর ‘স্টারি নাইট’ পেইন্টিং ছাপা হয় মগে, টি–শার্টে, মোবাইলের কভারে, ক্যাফের দেয়ালে। যেই দুনিয়া মানুষটাকে এক বেলা ভাত দেয়নি, সেই দুনিয়া এখন তাঁর যন্ত্রণা ছাপা মগে কফি খায়, ছবি তুলে ক্যাপশন দেয় গভীর দার্শনিক কিছু।দুনিয়া আসলের দাম দেয় মরার পরে। আর নকল বা সস্তা জিনিসের দাম দেয় নগদে। এই এক লাইনেই আমার ২৩ বছরের হিসাব শেষ।ভ্যান গঘের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ভক্তির নয়, আত্মীয়তার। মানুষটার জীবনী আমি মুখস্থ বলতে পারি। আর্লের হলুদ বাড়ি, যেখানে উনি স্বপ্ন দেখেছিলেন শিল্পীদের একটা সংসার হবে। গঘ্যাঁর সঙ্গে দুই মাসের সেই রোজ তর্ক, রোজ বন্ধুত্ব, রোজ ভাঙন। তারপর ১৮৮৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাত। গঘ্যাঁ চলে যাবেন শুনে মানুষটার মাথায় কী যেন ছিঁড়ে গেল, আর উনি খুর হাতে নিজের বাঁ কানটা ছিন্ন করে আনলেন। মনের বিষণ্নতা কান কেটে ফেলার যন্ত্রণাকেও হার মানাল। কানটা উনি কাগজে মুড়ে এক মেয়ের হাতে দিয়ে এসেছিলেন, যত্ন করে, উপহারের মতো। ‘এই জিনিসটা রেখো।’সবাই এই গল্প বলে পাগলামির প্রমাণ হিসেবে। আমি ২৩ বছর ধরে অন্য একটা জিনিস ভেবেছি। মানুষটা কানটাই–বা কাটলেন কেন? আঙুল না, হাত না—কান!উত্তরটা আমি পেয়েছি।মানুষের সব ইন্দ্রিয়ের দরজায় পাহারা আছে। চোখের পাতা আছে, বন্ধ করা যায়। মুখ বন্ধ করা যায়, নিশ্বাস না নিয়ে কিছুক্ষণ থাকা যায়। খালি কানের কোনো ঢাকনা নেই। কান হলো সেই দরজা, যেটা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খোলা। যা আসে, ঢোকে। ঘুমের মধ্যেও ঢোকে। আর যা ঢোকে, জমা হয়। কান আসলে শোনার যন্ত্র নয়। কান হলো স্মৃতির গুদামঘর। মানুষ সারা জীবনে যা শুনেছে, সব ওই দুইটা প্যাঁচানো খোলের ভেতরে স্তরে স্তরে জমা। প্রিয় মানুষের ডাক, মায়ের ঘুমপাড়ানি, অপমানের বাক্য, প্রিয়-অপ্রিয় গান, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল—সব। আগে মানুষ ঠিক করত কী শুনবে। এখন অ্যালগরিদম মেশিন ঠিক করে।ভ্যান গঘ যন্ত্রণায় পাগল হয়ে গুদামঘরটাই ফেলে দিতে চেয়েছিলেন। ভুল গুদাম বেছেছিলেন অবশ্য। সে অন্য আলাপ।এবার আমার শহরের কথা বলি। আর সেই ডিসেম্বরের কথা।গত বছর ২৩ ডিসেম্বর আমি ঠিক করেছিলাম, আমার শেষ শিল্পকর্মটা করব—ক্যানভাসে নয়। নিজের ওপর। ভ্যান গঘের মৃত্যুদিন নয়, কান কাটার রাতটাই আমার কাছে আসল তারিখ, কারণ ওই রাতেই শিল্পী আর দুনিয়ার মধ্যে বাঁধনের গিট্টুটা ছিঁড়ে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য। আমি ঠিক করেছিলাম, ওই রাতে আমি আমার বাঁ কানটা কাটব, প্রতিবাদ হিসেবে। পারফরম্যান্স আর্ট। যে শহর ২৩ বছরে আমার একটা ছবির দিকে দুই মিনিট তাকায়নি, সেই শহর অন্তত একটা কাটা কানের দিকে তাকাবে। কারণ, পুরো ব্যাপার ঘটবে ফেসবুক লাইভে। ধারালো খুর কেনা হয়ে গিয়েছিল। আয়নার সামনে চেয়ার পাতা হয়েছিল।তারপর খুরটা যখন কানের কাছে, ঠিক তখন, দেয়ালের ওপাশ থেকে শব্দটা এল।পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটা রিল বানায়। সারা দিন। একই ১৫ সেকেন্ডের গান, একই ভাইরাল অডিও, ঘুরে ঘুরে, দিনে ৪০–৫০ বার। ওই মুহূর্তে, আমার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্তে, দেয়াল ভেদ করে ঢুকল সেই অডিওটা, সেদিনের ৪৭নম্বর বার।আর আমার হাতটা থেমে গেল। খুর নামিয়ে আমি অনেকক্ষণ আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর হাসলাম। কারণ, আমি ভুলটা ধরে ফেলেছি।আমি ভুল কান কাটতে বসেছিলাম।বিশ্বাস করেন, আমি ন্যায়বিচারক। প্রতিটি কান আমি রাতের পর রাত শুনেছি, খুঁজেছি, আসল কিছু পাই কি না। এক নম্বর বয়াম, রিল বানানো ইনফ্লুয়েন্সার মেয়েটা। ওর কানে তিন হাজার বার একই ভাইরাল গানের মিউজিক, ৩৩টা রিংটোনের মতো সুর, আর অন্যের শিল্প চুরি। এরপরে সাহিত্য পেজ চালানো মেয়েটা, যে ইংরেজি লেখা বাংলা করে নিজের নামে ছাপে। ওর কানে খালি নোটিফিকেশনের টুংটাং, হাজারে হাজারে, শিলাবৃষ্টির মতো।আমার কান তো নিরপরাধ। আমার কান ২৩ বছর ধরে রঙের নাম শুনেছে, রবীন্দ্রসংগীত শুনেছে, বিটলস শুনেছে, পিংক ফ্লয়েড শুনেছে, বৃষ্টি শুনেছে। অপরাধী তো তাদের কান, যারা ওই খোলা দরজা দিয়ে বছরের পর বছর শুধু বাতিল সস্তা জিনিস ঢুকিয়েছে। ধার করা গান, ধার করা মতবাদ, ধার করা মেকি হাসি-কান্না, অন্যের বানানো ১৫ সেকেন্ডের অর্থহীন সংলাপ। যাদের গুদামে নিজের বলতে একটা শব্দও নেই, কান জিনিসটা ওদের কাছে অপচয়। আর অপচয়ের জিনিস কেড়ে নেওয়াকে চুরি বলে না, বলে উদ্ধার।সেই রাতে আমি খুরটা ধুয়ে তুলে রাখলাম, নিজের জন্য নয়।কান কীভাবে নিই, সেই প্রশ্নটা করবেন না। শিল্পীর টেকনিক শিল্পীর সম্পদ। এটুকু জানেন, আমার হাত সার্জনের চেয়ে স্থির, কারণ আমি ২৩ বছর শূন্য দশমিক ৩ মিলিমিটারের তুলি টেনেছি। আর এটুকু জানেন, ওরা কেউ মরে নাই, একজনও না। আমি কসাই নই, আমি সংগ্রাহক। মিউজিয়াম মমি রাখে, আমি রাখি কান। শহরে এখন ১১ জন মানুষ চুল লম্বা রেখে ঘোরে, বাঁ দিকটা ঢেকে। পুলিশ বলে কানকাটা চক্র, পত্রিকা নাম দিয়েছে কানকাটা ভ্যান গঘ। মূর্খের দল। ওরা ভাবছে আমি কান কেনাবেচা করি।প্রতিটি কাজ আমি করেছি শিল্পীর নিয়মে। তাড়াহুড়া নাই, রাগ নাই, একটা অতিরিক্ত আঁচড় নাই। কসাইয়ের সঙ্গে শিল্পীর পার্থক্য জানেন? কসাই শুধু মাংস কাটার কাজ শেষ করে। শিল্পী কাজ সম্পূর্ণ করে।আগে আসত প্রস্তুতি। যাকে নেব, তাকে আমি আগে শুনতাম, সপ্তাহের পর সপ্তাহ। তার রুটিন, তার মোবাইলে কী বাজে, তার কণ্ঠে কার কথা। ক্যানভাস না চিনে কেউ তুলি ধরে না। তারপর সেই রাতে, কাজের আগে, আমি তাদের ঘুমটা নিশ্চিত করতাম।কিন্তু ব্যথা একেবারে না দিলে তো ঠকানো হয়। সত্য আর্ট ব্যথা ছাড়া হয় না, এই শিক্ষাটাই তো দিতে বের হয়েছি। তাই ব্যথাটুকু আমি দিতাম মেপে, আমার নিজস্ব সিগনেচার টাচে। ২৩ বছরে একটা গ্যালারি আমাকে দেয়াল দেয় নাই। আমি নিজের গ্যালারি নিজে বানিয়ে নিয়েছি।তারপর কাজ শেষে ধোয়ামোছা, ওষুধ, ব্যান্ডেজ—সব নিয়মমতো। আমার একটা ক্যানভাসেও ইনফেকশন হয় নাই, এই রেকর্ড যেকোনো সার্জারি ওয়ার্ডের চেয়ে ভালো এবং সবার শেষে, যাওয়ার আগে আমার গুরু ভ্যান গঘের চিত্রকর্ম। যেখানে কানটা ছিল, সেই জায়গাটার চারপাশের চামড়ায় আমি এঁকে দিয়ে আসতাম একটা ছোট্ট ঘূর্ণি—তারাভরা রাতের সেই পাক খাওয়া আকাশ, দুই ইঞ্চিতে। ভ্যান গঘ সব ছবিতে সই করতেন না, জানেন তো। যে কাজটাকে উনি সম্পূর্ণ মনে করতেন, খালি সেইটাতে লিখতেন, ভিনসেন্ট। পদবি নয়, খালি নামটা। আমিও তা–ই। প্রতিটি কানের লতিতে, এত মিহি করে যে আতশি কাচ লাগে পড়তে, আমি লিখে দিতাম একটাই শব্দ—ভিনসেন্ট।এখানে এসে আপনি হয়তো আমাকে পাগল ভাববেন। ভাবেন, ক্ষতি নাই। ভ্যান গঘকেওসবাই ভাবত।আর হ্যাঁ, আমার বাছাইয়ের একটা নীতি ছিল। শক্ত নীতি। রিকশাওয়ালা ছেলে যখন ভাইরাল গানে ঠোঁট মেলায়, ওইটা তার একমাত্র বিনোদন। গার্মেন্টসের মেয়ে যখন নকল ডিজাইন তোলে, ওইটা তার ভাত। পেটের দায়ের নকল আমার আদালতে মাফ। ওইটা অপরাধ নয়, বেঁচে থাকার লড়াই। বেশির ভাগ মানুষের কাছেই আজকাল নকল আরামের, আসল লাগে ব্যথার। মানুষ আরামটা বেছে নেয়, তারপর সারা জীবনব্যথায় থাকে।আমার লিস্টে উঠত অন্যরা। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা, যারা ঠিক ভ্যান গঘের ছেড়ে যাওয়া বন্ধুর মতো। ব্যাংকের ম্যানেজারের কন্যা, যে বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে এসে অন্যের কবিতা, ছবি, ভিডিও নকল করে তার সঙ্গে নেচে নিজের পেজে পোস্ট করে। শিল্পপতির বউ, যে এআই দিয়ে আর্ট বানিয়ে গ্যালারি ভাড়া করে একক প্রদর্শনী করে, উদ্বোধনে মন্ত্রী আসে।দুনিয়ার সব দরজা খোলা পেয়েও এরা নিজের একটা শিল্প বানায়নি। তাই আমার খুর কোনো দিন ক্ষুধার্ত কান ছোঁয় নাই। আমি খালি শিকার করতাম সচ্ছল কান।কাটা কান ফরমালিনে রাখলে সে মরে না। সে বাজে। রাত দুইটার পরে, ঘর যখন নিস্তব্ধ, বয়ামগুলো চালু হয়। প্রতিটি কান তার গুদামের মাল ফেরত দেয়, স্তরের পর স্তর, যা যা সে জীবনে জমিয়েছে, বেশির ভাগ বাজে বস্তাপচা জিনিস। সবারই ছোটবেলার সময়গুলোর গল্পে সত্য আর্ট ছিল। আমি চেয়ার টেনে বসি, চোখ বন্ধ করি, আর কানের গল্প শুনি। ১১টা কান, ১১টা পডকাস্টের মতন।বিশ্বাস করেন, আমি ন্যায়বিচারক। প্রতিটি কান আমি রাতের পর রাত শুনেছি, খুঁজেছি, আসল কিছু পাই কি না। এক নম্বর বয়াম, রিল বানানো ইনফ্লুয়েন্সার মেয়েটা। ওর কানে তিন হাজার বার একই ভাইরাল গানের মিউজিক, ৩৩টা রিংটোনের মতো সুর, আর অন্যের শিল্প চুরি।এরপরে সাহিত্য পেজ চালানো মেয়েটা, যে ইংরেজি লেখা বাংলা করে নিজের নামে ছাপে। ওর কানে খালি নোটিফিকেশনের টুংটাং, হাজারে হাজারে, শিলাবৃষ্টির মতো।নকল, নকল, নকল। ১১টা গুদামে একটা আসল শব্দ নাই। কখনো নকল গান, কখনো নাচ, কখনো সস্তা কৌতুক, অভিনয় আর লাইফস্টাইল ভ্লগ।লাইভটা ফেসবুক মুছেছে ৫৪ মিনিটের মাথায়। ততক্ষণে স্ক্রিন রেকর্ড টেলিগ্রামে, হোয়াটসঅ্যাপে, রিঅ্যাকশন ভিডিওতে। ফজরের আজান পড়ার আগেই আমার নামে তিনটা ফ্যানপেজ, কানকাটা ভ্যান গঘ। সকাল ১০টায় হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং, দুপুরে টক শোতে দুই বুদ্ধিজীবী ঝগড়া করছেন আমি সাইকোপ্যাথ না প্রতিবাদী শিল্পী। বিকেলে এক অনলাইন মিডিয়ার শিরোনাম, ‘নকলের যুগের ডিজিটাল গুরু’। ২৩ বছর গ্যালারিতে দেড় শ দর্শক পাই নাই। এক রাতে আমার মুরিদ হয়ে গেল একটা প্রজন্ম, যারা আমার একটা ছবিও দেখে নাই।১১ নম্বরের রাতটার কথা বলি। অভিনেতা, নির্মাতা, সিঙ্গার, মিউজিশিয়ান, ইনফ্লুয়েন্সার আর মার্কেটিয়ার। একের ভেতর সব। কিন্তু সব আর্টেই তাঁর ভেজাল। কান থাকার কোনো যোগ্যতাই নেই। তাঁর উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ভিডিওগুলোর সুবাদে নামকরা এক কনডম কোম্পানি তাঁকে মুখপাত্র বানিয়েছে। গুলশানের ১১ তলা, দুইটা সিকিউরিটি গেট, ফেশিয়াল রিকগনিশন লক। ধনী মানুষ ভাবে নিরাপত্তা কেনা যায়। কেনা যায় ঠিকই, খালি বিক্রেতা সব সময় সৎ নয়। ছেলেটার ঘুম ভাঙল রাত দুইটা ১৭–তে এবং সে দেখল, তার শোবার ঘরটা আর চেনা ঘর নেই। কোনায় একটা হলুদ বাতি জ্বলছে, যেটা তার নয়। দেয়ালে প্রজেক্টরে চলছে তাঁর নিজের ভেরিফায়েড পেজের রগরগে কনটেন্ট, স্ক্রল হচ্ছে আপনাআপনি, পোস্টের পর পোস্ট। ট্রাইপডে একটা ফোন দাঁড়ানো, লাল বিন্দুটা জ্বলছে। আর তার সামনে চেয়ারে পা তুলে আরাম করে আমি। মেহমানের ভঙ্গিতে। সে চিৎকার দিতে মুখ খুলল, আমি আঙুল তুললাম না, চুপ করতেও বলি নাই। খালি বললাম, ‘দাও। চিৎকার দাও। শোনো, ৬৩ হাজার মানুষ লাইভ দেখতেছে এ মুহূর্তে। এর মধ্যে চাইরজন রিপোর্ট করছে, বাকিরা শেয়ার দিতেছে। কেউ আসতেছে না। চিৎকারে কাজ হইলে এই শহরে এত দিনে অনেক কিছু বদলাইত।’ছেলেটা চিৎকার দিল না। মানুষ চিৎকার দেয় আশা থাকলে। সে ফিসফিস করে বলল, ‘টাকা লাগবে? যা চান।’আমি বললাম, ‘আছে সব। খালি একটা জিনিস চাই। তোমার পেজের যেকোনো একটা যে গানটা গাইছ, সেটা খালি গলায় গেয়ে শোনাও।’সে শোনাল, কাঁপা গলায়, নিজের পেজের সবচেয়ে ভাইরাল গানটা, যার মিউজিক ভিডিওতে ১৮+ সতর্কবার্তা দেওয়া উচিত ছিল। আমি বললাম, ‘ভালোই তো গাও, এইবার সত্যিই নিজের লেখা একটা লাইন—যেকোনো একটা। একটা সত্য নিজের বানানো লাইন শোনাইলেই আমি উইঠা চইলা যামু, আল্লার কসম।’তারপর, আপনারা বিশ্বাস করেন আর না করেন, আমি সাড়ে তিন মিনিট অপেক্ষা করেছি। ঘড়ি ধরে। ৬৩ হাজার মানুষও করেছে। কমেন্ট থেমে গিয়েছিল, ভাবা যায়? ফেসবুক চুপ। সাড়ে তিন মিনিটে সাত বছরের ট্যালেন্ট ক্রিয়েটিভ নির্মাতা নিজের একটা লাইন বানাতে পারল না। ওই নীরবতাটাই রায়, আমি খালি কার্যকর করেছি। কীভাবে, জিজ্ঞেস করবেন না। বলেছি তো, ফ্রেমের বাইরে। ক্যামেরা দেখেছে খালি দেয়ালে তার স্ক্রল হতে থাকা চুরির খাতা, আর শুনেছে আমার তাল, চার মিনিট, হলুদ আলোয়। ও ব্যথা পেয়েছে স্বপ্নের ভেতর দিয়ে, জেগে ওঠার আগেই ব্যান্ডেজ, ওষুধ, গজের ওপর ছোট্ট সূর্যমুখী। যাওয়ার আগে আমি ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে প্রথমবার কথা বলেছিলাম দর্শকদের সঙ্গে, মুখ অন্ধকারে রেখে। বলেছিলাম, ‘আপনারা ভাবতেছেন আমি ওর কান নিছি। উল্টা। ও সাত বছর ধইরা আপনাদের কান নিতেছিল। আমি খালি চুরির মালটা উদ্ধার করলাম। ওর ভিডিও দেখে হুকআপ কালচার এত কুল মনে করে সবাই, ভালোবাসার দাম আর নাই এ প্রজন্মের কাছে। কেউ একটা প্রেমের কবিতা লেখে না, গান গায় না, সবাই রিলস পাঠায়, মিম পাঠায় একে অন্যকে। ও সমাজের জন্য ক্যানসার।’লাইভটা ফেসবুক মুছেছে ৫৪ মিনিটের মাথায়। ততক্ষণে স্ক্রিন রেকর্ড টেলিগ্রামে, হোয়াটসঅ্যাপে, রিঅ্যাকশন ভিডিওতে। ফজরের আজান পড়ার আগেই আমার নামে তিনটা ফ্যানপেজ, কানকাটা ভ্যান গঘ। সকাল ১০টায় হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং, দুপুরে টক শোতে দুই বুদ্ধিজীবী ঝগড়া করছেন আমি সাইকোপ্যাথ না প্রতিবাদী শিল্পী। বিকেলে এক অনলাইন মিডিয়ার শিরোনাম, ‘নকলের যুগের ডিজিটাল গুরু’। ২৩ বছর গ্যালারিতে দেড় শ দর্শক পাই নাই। এক রাতে আমার মুরিদ হয়ে গেল একটা প্রজন্ম, যারা আমার একটা ছবিও দেখে নাই। তা–ও এআই দিয়ে এক বাংলাদেশি চেহারা আর রঙের কানকাটা ভ্যান গঘের ছবি জেনারেট করে সবাই প্রোফাইল ছবি দিতে থাকল। এবং এই জায়গাটায় এসে আমি প্রথমবার টের পেয়েছিলাম, আমার হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কারণ, ভক্তরা কেউ আমার শিল্প ভালোবাসে নাই। ওরা ভালোবাসছিল তামাশা। আমি নকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিলাম, আর আমার সেনাবাহিনী হয়ে দাঁড়াল তারা, যাদের কান আমার জব্দ করার কথা। শিল্পী চাইছিল শ্রোতা, ভক্তি। পেল সার্কাসের দর্শক। দুটো যে এক জিনিস না, ওই সকালে আমার চেয়ে ভালো কেউ জানত না।আমার রায় ঠিক ছিল। আমি ঘুমাতে যেতাম শান্তিতে—যে শান্তি বিচারকের; জল্লাদের না। ব্যাপারটা নিয়ে মনের খচখচানি গেল না।আরেকজনের বয়ামে, নোটিফিকেশনের শিলাবৃষ্টির তলায়, ফজরের আগের অন্ধকারে একটা ফিসফিসে মোনাজাত, মায়ের অসুখ নিয়ে, ভাইয়ের চাকরি নিয়ে। আসল ছিল। সবগুলোতে ছিল। বুঝলাম মানুষের গুদাম কখনো পুরো নকলে ভরে না। কোথাও না কোথাও এক কোনায় প্রতিটা মানুষ নিজের একটা সুর লুকিয়ে রাখে। আমি ওপরের তাকের ময়লা দেখে গুদাম সিলগালা করে দিয়েছি, ১২ বার।তারপর এল ১২ নম্বর।চারুকলার মেয়েটা, যে বিখ্যাত ছবি ট্রেস করে হাতে আঁকা বলে অনলাইনে বেচে। ওর কানে ইউটিউব টিউটোরিয়ালের আমেরিকান গলা, হাউ টু পেইন্ট লাইক ভ্যান গঘ ইন টেন মিনিটস। ১০ মিনিট! মানুষটার লেগেছিল ১০ বছর আর একটা কান। মেয়েটাকে আমি দেখতাম এক ফেসবুক পেজে। রংতুলি আর প্যাস্টেল দিয়ে ও ছবি আঁকত, পয়সার জন্য। কী আঁকত? মোনালিসা। তারাভরা রাত। সূর্যমুখী। দিনের পর দিন, একই বিখ্যাত ছবি, পর্যটকদের জন্য, টাকার বাকসো পাশে রেখে। আমার চোখে ও ছিল নকলের রানি। ভ্যান গঘের যন্ত্রণা রংতুলি দিয়ে ঘষে নকল করে ও রোজগার করত। আর ফেসবুকে এসে কানকাটা ভ্যান গঘকে মস্তিষ্ক বিকৃত মানুষ বলে স্ট্যাটাস দিত।ওরটা আমি নিয়েছি সবচেয়ে যত্নে, কাগজে মুড়ে, যেভাবে উনি মুড়েছিলেন, উপহারের মতো।১২ নম্বর বয়াম তাকে উঠল রাত দুইটায়। আমি চেয়ার টানলাম। চোখ বন্ধ করলাম।আর আমার দুনিয়াটা ভেঙে গেল।১২ নম্বর কান রিংটোন বাজাল না। ভাইরাল অডিও বাজাল না। ১২ নম্বর কান বাজাল একটা সুর। গুনগুন, খালি গলা, মেয়েলি, ক্লান্ত। সুরটা আমি চিনি না। কোনো সিনেমার না, কোনো ব্যান্ডের না, কোনো যুগের না। আমি সারা জীবন গান শুনেছি, আমার কানের গুদাম আমি চিনি। এই সুর পৃথিবীর কোনো গুদামে নাই।এই সুর কেউ বানিয়েছে।আমি তিন রাত ঘুমাইনি। চতুর্থ দিনে গেলাম হাসপাতালে, যেখানে মেয়েটা ভর্তি ছিল। আর কানে ছিল স্টারি নাইটের ঘূর্ণি। সরাসরি যাইনি, আমি অত বোকা না। ওর পাশের বেডের রোগীর লোকজনের সাথে ভাব করলাম, ফল নিয়ে গেলাম। যা জানলাম, সেটা আমি আপনাকে যেভাবে শুনেছি, সেভাবেই বলি।মেয়েটার সাত বছরের বাচ্চা ক্যানসারের রোগী, ওই হাসপাতালেরই ছয়তলায়, সাত মাস ধরে। ফেসবুকে আর্ট ভিডিও করে আর আর্ট বিক্রি করে যা ওঠে, তার একেবারে পুরোটা যায় চিকিৎসায়। আর মেয়েটা প্রতি রাতে তার ছেলের বেডের পাশে বসে একটা ঘুমপাড়ানি গান গায়। নিজের বানানো। বাচ্চাটার নাকি কোনো কিছুতেই ঘুম আসে না, খালি ওর মায়ের সুরটায় আসে।সেই সুর। ১২ নম্বর বয়ামের সুর।আমি হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে পড়েছিলাম। হিসাবটা তখন আমার সামনে দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে। মেয়েটা দিনের বেলা নকল পেইন্টিং বেচত পেটের জন্য, আর রাতের বেলা বিশুদ্ধ সুন্দর সুরে গাইত সন্তানের জন্য। নকল করে আঁকাটা ছিল ওর পেশা, বেঁচে থাকার লড়াই। আসলটা ছিল ওর প্রার্থনা।সেই রাতে ফিরে আমি বাকি ১১টা বয়াম আবার শুনলাম। এবার অন্যভাবে। এবার আরও গভীরভাবে কান পাতলাম, স্তরের নিচের স্তরে, আর নতুন কিছু শুনতে পেলাম।১ নম্বর বয়ামে, তিন হাজার ভাইরাল ভিডিওর নিচে, একটা ১৬ বছরের গলা আয়নার সামনে নিজেকে বলছে, তুই পারবি, ওরা যা-ই বলুক, তুই পারবি। নিজের বানানো বাক্য, নিজের গলায়, রোজ সকালে। কিন্তু জীবন তাকে হতাশই করেছে।আরেক বয়ামে, ভাইরাল কথা গানের নিচে, একটা মেয়ে ফোনে ছোট ভাইকে অঙ্ক বোঝাচ্ছে নিজের বানানো উদাহরণে, আর ভাইটা হাসছে।আরেকজনের বয়ামে, নোটিফিকেশনের শিলাবৃষ্টির তলায়, ফজরের আগের অন্ধকারে একটা ফিসফিসে মোনাজাত, মায়ের অসুখ নিয়ে, ভাইয়ের চাকরি নিয়ে।আসল ছিল। সবগুলোতে ছিল। বুঝলাম মানুষের গুদাম কখনো পুরো নকলে ভরে না। কোথাও না কোথাও এক কোনায় প্রতিটা মানুষ নিজের একটা সুর লুকিয়ে রাখে। আমি ওপরের তাকের ময়লা দেখে গুদাম সিলগালা করে দিয়েছি, ১২ বার।হাতটা উঠছে। আমি বাধা দিচ্ছি না। আবার চালাচ্ছিও না। ভ্যান গঘ আর আমি, দুজন আয়নার দুই পাশে বসে আছি। মাঝখানে একটা খুর। আর সিদ্ধান্তটা ঝুলে আছে আমাদের দুজনের কারও হাতে না, সম্ভবত আপনার হাতে, কারণ আপনি এখনো পড়ছেন। এখন সময় সেই প্রশ্নের।শ্রোতা? আমি? আমি ছিলাম সেই সমালোচক, যে বইয়ের মলাট দেখে লেখকের ফাঁসি দেয়।আর তারপর এল শেষ ধাক্কাটা। সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে নির্মম ধাক্কা।আমি বেসিনে মুখ ধুতে গিয়ে আয়নায় তাকালাম। এবং এই প্রথম, ২৩ বছরে এই প্রথম, লোকটাকে দেখলাম।লালচে দাড়ি, ছাঁটা ভ্যান গঘের মতো। মাথায় খড়ের হ্যাট, আর্লের রোদের জন্য বানানো, ঢাকার ডিসেম্বরে। দেয়ালে সূর্যমুখীর প্রিন্ট, তারাভরা রাতের প্রিন্ট, হলুদ রং করা একটা ঘর, ক্যালেন্ডারে তেইশে ডিসেম্বর লাল কালিতে গোল করা। একটা লোক, যে আরেকটা মানুষের দাড়ি, টুপি, ঘর, যন্ত্রণা, এমনকি খুরের তারিখ পর্যন্ত টুকে টুকে নিজের জীবন বানিয়েছে। এবং সেই লোক শহরের মানুষের কান কেটে বেড়াচ্ছে। তাদের অপরাধ, তারা নকল।শহরের সবচেয়ে বড় নকলটা ১২টা বয়ামের মালিক।আজ তেইশে ডিসেম্বর। ঠিক এক বছর পর আমি আবার আয়নার সামনে বসে আছি। আর খুরটা আবার আমার হাতে। এবার কার কান, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।১২ নম্বর বয়ামটা আমি হাসপাতালের গেটে রেখে এসেছি ভোরে, কাগজে মুড়ে, মেয়েটার নামে—যা যার আমানত। বাকি ১১টা ফেরত দেওয়ার রাস্তা খুঁজছি।বয়াম ফেরত দিয়েছি, তাতে আমার লাভ হয়নি, কারণ তাদের কথাগুলো এখন আমার গুদামে ঢুকে গেছে। আমার কানে। দিনরাত বাজছে, আর তার তলায় আমার ২৩ বছরের সব দম্ভ পুড়ে ছাই হচ্ছে। ভ্যান গঘ কেন কান কেটেছিলেন, আমি এখন হাড়ে হাড়ে জানি। মানুষ কান কাটে ভেতরের শব্দ থামাতে। আর আমি এটাও জানি, ওনারটা থামেনি। কাটা কানে উনি আরও দেড় বছর ওই শব্দ শুনেছেন, তারপর গমখেতে গিয়ে…খুরটা হাতে নিয়ে বসে আছি অনেকক্ষণ। জানালার বাইরে ডিসেম্বরের কুয়াশা। ১২টা খালি বয়াম ধোয়া হয়ে ওলটানো আছে তাকে, শুকাচ্ছে।কানটা কাটলে কি সুরটা থামবে? ভ্যান গঘেরটা থামেনি। নাকি এই সুরটার থামার দরকার নাই, এই সুরটাই আমার সাজা, আমার ২৩ বছরে শোনা একমাত্র আসল জিনিস, যেটা আমি চুরি করে এনেছি একটা মেয়ের থেকে, যে মেয়ে ওটা বানিয়েছিল তার মরণাপন্ন শিশুর এক রাতের ঘুমের জন্য?হাতটা উঠছে। আমি বাধা দিচ্ছি না। আবার চালাচ্ছিও না। ভ্যান গঘ আর আমি, দুজন আয়নার দুই পাশে বসে আছি। মাঝখানে একটা খুর। আর সিদ্ধান্তটা ঝুলে আছে আমাদের দুজনের কারও হাতে না, সম্ভবত আপনার হাতে, কারণ আপনি এখনো পড়ছেন। এখন সময় সেই প্রশ্নের।এক. আজ সারা দিন আপনার কানের খোলা দরজা দিয়ে যা যা ঢুকেছে, হিসাব করেন তো, তার কয়টা শব্দ আপনার জন্য বানানো, আর কয়টা স্রেফ ইউজলেস, এত কিছুর আড়ালে চাপা পড়ে থাকা আপনার নিজের শব্দটা, নিজের আসল সুরটা, শেষ কবে শুনেছেন? মনে পড়ছে না? বেশির ভাগ মানুষ মরে যায় সেই সুরটা একবারও না বাজিয়ে।তাহলে দ্বিতীয় প্রশ্ন: কান নামক গুদামটা তাহলে রেখেছেন কিসের জন্য?শহরে শ্রোতা আমি একলা না।
২০২০ সালের করোনাকাল থেকে ছয় বছর ধরে ভাসমান, অসহায় ও অনাহারী মানুষের মুখে একবেলা গরম খাবার তুলে দিচ্ছে ‘নৃ ফাউন্ডেশন’। বিস্তারিত ভিডিও প্রতিবেদনে...
সন্দ্বীপে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছিলেন দ্রুত চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে। কিন্তু ঘাটে কোনো নৌযান নেই; স্বজনেরা দৌড়াদৌড়ি করে একটি স্পিডবোটের ব্যবস্থা করলেও লাভ হয়নি। বোটে ওঠার আগেই তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। সন্দ্বীপে এটা কোনো ব্যতিক্রম নয়। মুমূর্ষু রোগীর যাতায়াতের জন্য যে নৌ অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজন ছিল, সেটা এক কেওড়াবাগানের গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। কারণ, এটা সমুদ্রপথে চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত। শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও সন্দ্বীপ নিয়ে প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। কেবল যথাযথ ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে অকালমৃত্যু বাংলাদেশের নাগরিক অধিকারের এক মর্মান্তিক চিত্র প্রকাশ করেছে।অকালমৃত্যুর মর্মান্তিকতার পাশাপাশি এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, অবহেলা ও উদাসীনতার রূপটিও উন্মোচিত করেছে। এই অব্যবস্থাপনার বলি হয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। সমুদ্রঘেরা সন্দ্বীপের অসুস্থ ও মুমূর্ষু রোগীদের জন্য যেখানে নৌ অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা, সেখানে স্থানীয় মানুষকে স্পিডবোট, মালবাহী ট্রলার বা ঝুঁকিপূর্ণ ছোট নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, দ্বীপের মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর জন্য সরকারের দেওয়া ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ের দুটি নৌ অ্যাম্বুলেন্সের একটিও আজ কাজে আসছে না। ২০০৮ সালে দেওয়া প্রথম নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চালক ও জ্বালানির অভাবে ১৫ বছর ধরে অচল পড়ে রয়েছে। আর ২০১৫ সালে ৬৫ লাখ টাকায় কেনা দ্বিতীয় নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি এক দিনের জন্যও রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত হয়নি। কারণ, সমুদ্রঘেরা দ্বীপের জন্য যে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছে, সেটা মূলত হাওর বা নদীর মতো জলপথের জন্য উপযোগী; সমুদ্রপথে চলাচলের সক্ষমতাই নেই। প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? সরকারি অর্থ ব্যয় করে নৌযান কেনা হলো, অথচ চালক ও জ্বালানির মতো মৌলিক জোগান নিশ্চিত করার কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রাখা হলো না। তারপরও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে সমুদ্রের জন্য দেওয়া হলো হাওরের নৌযান।নাগরিকের জীবন–মৃত্যুর প্রশ্ন যেখানে জড়িত, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও উদাসীনতা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। আর কত প্রাণ অকালে ঝরলে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে? স্রেফ চালক ও জ্বালানির অভাবে মুমূর্ষু রোগীরা একটা নৌ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে না পেরে মারা যাচ্ছেন, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সন্দ্বীপবাসীর জন্য নৌ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করবে।