চীন থেকে প্রায় ১০০ মাইল প্রশস্ত একটি প্রণালি দ্বারা পৃথক হওয়ায়, সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলার প্রথম প্রতিরক্ষা লাইন হিসেবে তাইওয়ান তার নৌবাহিনীর ওপর নির্ভর করে। বড় উভচর জাহাজে তাইওয়ান প্রণালি পার হয়ে আসা চীনা বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করার সক্ষমতা তাইওয়ানের থাকতে হবে।
ঐতিহ্যগতভাবে তাইওয়ান তার বহরের মূল ভিত্তি হিসেবে ডেস্ট্রয়ার ও ফ্রিগেটের মতো বড় জাহাজগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে, যা রাষ্ট্রীয় শক্তির দৃশ্যমান প্রতীক এবং চীনের চাপ মোকাবিলার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
তাইওয়ানের বর্তমান জাহাজ নির্মাণ পরিকল্পনার মধ্যেও তাদের পুরোনো সারফেস বহরকে নতুন, বড় ও ব্যয়বহুল জাহাজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবু তাইওয়ান প্রণালির সংকীর্ণ জলসীমায় বড় সারফেস জাহাজগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যে সমস্যাটি প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ, এখন সেগুলোকে শনাক্ত করা, নজরদারিতে রাখা এবং আক্রমণ করা আরও সহজ। চীন অত্যাধুনিক গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার পাশাপাশি ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রণালি, ড্রোন ও মিসাইলে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
তাইওয়ানের বড় সারফেস জাহাজগুলো এখন তাদের জন্য একপ্রকার বোঝার মতো। তবে তাইওয়ানের একটি সুবিধাজনক দিক রয়েছে—এই একই প্রযুক্তি সংকুচিত জলসীমায় চীনের বড় উভচর জাহাজগুলোকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে এবং সেই জাহাজগুলোকে ছোট ও সহজে লুকিয়ে রাখা যায়, এমন বিকল্প দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
তাইপেই তাদের ডেস্ট্রয়ার ও ফ্রিগেটগুলোকে তুলনামূলক ছোট কিন্তু বিপুলসংখ্যক সারফেস কমব্যাট্যান্ট দিয়ে প্রতিস্থাপন করে এই বৈষম্যের সুযোগ নিতে পারে।
এই ছোট জাহাজগুলোর চীনা আক্রমণের প্রথম ধাক্কা সামলে টিকে থাকার এবং চীনা আক্রমণকারী বহরের ওপর পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা অনেক বেশি।
তাইওয়ানের নৌবাহিনী বড় ধরনের সারফেস কমব্যাট্যান্টে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। চীনা হুমকির মুখে তাইওয়ান নৌবাহিনীর যে আমূল রূপান্তর প্রয়োজন, তাতে এই বড় জাহাজগুলো অন্যতম প্রধান বাধা।
তাইওয়ানের জন্য শিক্ষা হলো বড় যুদ্ধজাহাজের যুদ্ধক্ষমতা নিরর্থক যদি তারা লড়াই করার জন্য পর্যাপ্ত সময় টিকে থাকতে না পারে এবং শুরুতে একটি জাহাজের ক্ষতি পুরো নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাইওয়ান প্রণালির যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য স্টেলথ (রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি) সুবিধা এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ এই আকারের জাহাজ তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে আর এই সুবিধাগুলো ছাড়া চীনা আক্রমণকারী বাহিনীকে তাইওয়ান প্রণালি ব্যবহারে বাধা দেওয়ার যে মূল যুদ্ধকালীন মিশন, তাতে বড় জাহাজগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
বড় জাহাজে সম্পদ অপচয় না করে তাইপেইয়ের উচিত ৭০০ থেকে ১,০০০ টনের মধ্যে স্টেলথ কর্ভেট তৈরি করা।
মিসাইল ও ড্রোনে সজ্জিত এসব জাহাজ শনাক্ত করা ও লক্ষ্যবস্তু বানানো কঠিন, কিন্তু প্রণালি পার হতে যাওয়া চীনা জাহাজগুলোতে আক্রমণ চালানোর মতো যথেষ্ট ফায়ারপাওয়ার বা সামরিক সক্ষমতা তাদের থাকবে।

বড় জাহাজগুলো জাতীয় ক্ষমতার শক্তিশালী প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সেগুলো সহজে লক্ষ্যবস্তু বানানো যায় এবং যুদ্ধে হারালে তার রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি দিতে হয়। যখন ভারী নজরদারির মধ্যে সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ যুদ্ধ করে, তখন তাদের এই দৃশ্যমানতা দ্রুত একটি প্রাণঘাতী দায়ে পরিণত হয়।
একটি বড় জাহাজের সলিল সমাধি তাৎক্ষণিক সামরিক ক্ষতির চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। একটি অতি-দৃশ্যমান ও ব্যয়বহুল ক্ষতি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের সংঘাত চলাকালে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ঝুঁকিতে ফেলার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক করে তুলতে পারে।
গত চার দশকের বেশি সময়ের প্রধান প্রধান নৌ সংঘাত নির্দেশ করে যে কোনো দেশের নৌবাহিনী যদি শত্রুর উপকূলের কাছে যুদ্ধ করার প্রত্যাশা করে, তবে ব্যয়বহুল ও অপূরণীয় যুদ্ধজাহাজকে কেন্দ্র করে বহর গঠন করার বিষয়ে তাদের সতর্ক হওয়া উচিত।
তাইওয়ানের জন্য শিক্ষা হলো বড় যুদ্ধজাহাজের যুদ্ধক্ষমতা নিরর্থক যদি তারা লড়াই করার জন্য পর্যাপ্ত সময় টিকে থাকতে না পারে এবং শুরুতে একটি জাহাজের ক্ষতি পুরো নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একটি ছোট জাহাজ হারানো রাজনৈতিক ও সামরিক—উভয় দিক থেকেই একটি বড় যুদ্ধজাহাজ হারানোর চেয়ে কম ক্ষতিকর।
তাইওয়ানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগর অভিযান দেখিয়েছিল যে একটি দুর্বল শক্তি সমুদ্রের কর্তৃত্ব বা সমকক্ষ বহর না থাকা সত্ত্বেও বিতর্কিত জলসীমায় শক্তিশালী পক্ষকে কোণঠাসা করতে পারে।
এই অভিযানে ভূমিভিত্তিক অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল, চালকহীন সারফেস ভেসেল (ইউএসভি)-এর ঝাঁক, আকাশপথের ড্রোন এবং বহিরাগত গোয়েন্দা তথ্যের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌবাহিনীর কর্মকাণ্ডে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করা হয়।
এই আক্রমণগুলো রাশিয়ার বেশির ভাগ বহরকে ইউক্রেনের উপকূল থেকে দূরে ঠেলে দিতে সাহায্য করেছিল।
ইরানের ওপর চলমান সংঘাতও এই ধরনকে পুনর্ব্যক্ত করে: সংঘাতের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সারফেস নৌবাহিনীর মারাত্মক ক্ষতি করলেও তাদের ছড়িয়ে থাকা মিসাইল, ড্রোন, টহল নৌকা এবং মাইন ফেলার নৌকাগুলো পুরোপুরি নির্মূল করতে বেগ পেতে হচ্ছে।

এই উদাহরণগুলো যেমন দেখায়, একটি কম শক্তিশালী নৌবাহিনীর তার উপকূলীয় জলসীমা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন নেই, বরং শক্তিশালী প্রতিপক্ষ যাতে এটি অবাধে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট। তাইওয়ান প্রণালিতে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সমুদ্র ব্যবহারে বাধা প্রদান করা, অর্থাৎ চীন যাতে স্বাধীনভাবে জলপথ ব্যবহার করে আক্রমণ চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
সমুদ্র ব্যবহারে বাধা প্রদানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাইওয়ানকে সারফেস নৌবাহিনী পরিত্যাগ করতে হবে না। তবে তাকে ভিন্ন ধরনের একটি বহর গড়ে তুলতে হবে, এমন একটি বহর যা অনেক ছোট জাহাজের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হবে, যেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার পাশাপাশি তথ্য আদান-প্রদান এবং তাদের আক্রমণ সমন্বিত করতে পারবে।
সেকেলে জাহাজগুলোকে আধুনিকীকরণ করার পরিবর্তে তাইওয়ানের উচিত সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে বাতিল করা এবং স্বল্প সম্পদকে তাদের প্রয়োজনীয় হালকা সারফেস জাহাজের দিকে চালিত করা।
ফিনল্যান্ড ও সুইডেন এ ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট মডেল হতে পারে। দুটি দেশকেই আরও বড় ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ—রাশিয়াকে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে হয়, তারা উভয়ই তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে এবং নিজেদের উপকূলে সম্ভাব্য উভচর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
তারা তাদের জলসীমায় প্রবেশ করা রুশ জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে এবং মস্কোর কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। উভয় দেশেরই ব্যাপক, পরিশীলিত এবং ক্রমাগত উন্নতি লাভ করা নজরদারি, যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা রয়েছে।
তাইওয়ানের সারফেস বহর পুনর্গঠন করার লক্ষ্যটি নাগালের মধ্যেই রয়েছে। গত জুলাইয়ে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে নৌবাহিনীর অষ্টম ও নতুন মিসাইল প্যাট্রোল জাহাজের কমিশনিং অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
এটি তাইওয়ানে তৈরি একটি হালকা কিন্তু ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কর্ভেট, যার উদ্ভাবনী ‘ক্যাটামারান হাল’ বা দ্বিখণ্ডী কাঠামোর কারণে এটি দ্রুতগামী ও অধিক স্থিতিশীল। এমন আরও চারটি জাহাজ বছরের শেষ নাগাদ বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
তাইওয়ানের জাহাজ নির্মাণশিল্প দ্রুত এই জাহাজগুলো তৈরি করতে পারে এবং তারা যত বেশি তৈরি করবে, তত বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে। ধারাবাহিক উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনবে এবং প্রতিটি নতুন ব্যাচের জাহাজে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত হওয়া নতুন অস্ত্র, সেন্সর এবং চালকহীন ব্যবস্থা যুক্ত করা যাবে।
এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে তাইওয়ানের সশস্ত্র বাহিনীর সেন্সর, যোগাযোগমাধ্যম, ড্রোন ও মিসাইল নেটওয়ার্কের একটি ব্যাপক আধুনিকীকরণ ঘটানো উচিত। তাইওয়ান ইতিমধ্যেই এই খাতগুলোতে কিছুটা বিনিয়োগ করছে।
তাদের সাম্প্রতিক বিশেষ বাজেট এবং নৌ পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ সামুদ্রিক নজরদারি ড্রোন, সামরিক বাহিনীকে পরিচালনা ও সমন্বয়ের জন্য উন্নত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক যুদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘কিল চেইন’কে আরও শক্তিশালী করছে। এগুলো চীনকে তাইওয়ান প্রণালিতে অবাধে চলাচলে বাধা দেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।
তাইওয়ানের পুনর্গঠিত সারফেস বহর তাদের আটটি নতুন সাবমেরিন তৈরির পরিকল্পনাকেও ত্বরান্বিত করবে, যার প্রথমটির সমুদ্র পরীক্ষা ইতিমধ্যেই চলছে।
তাইওয়ানের নৌবাহিনীর এই রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাধাগুলো প্রযুক্তিগত চেয়ে বেশি প্রাতিষ্ঠানিক। আকারে বড় হওয়ার কারণে এই বড় জাহাজগুলো রাজনীতিবিদদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এগুলো শিপইয়ার্ডের জন্য বড় চুক্তি, ফিতা কাটার অনুষ্ঠান, জাতীয় অর্জনের অনুভূতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের দৃশ্যমান প্রমাণ নিয়ে আসে।
এর বিপরীতে সাধারণ জনগণ ড্রোনে ভরা কোনো গুদাম বা পাহাড়ে লুকিয়ে রাখা মোবাইল মিসাইল লঞ্চার দেখতে পায় না। নৌবাহিনীর নেতৃত্বের জন্যও বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়ার চেয়ে বর্তমান স্থিতি বজায় রাখা অনেক সহজ।
কিন্তু এই অপ্রচলিত, এমনকি বলা চলে সেকেলে জাহাজগুলোকে আধুনিকীকরণ করার পরিবর্তে তাইওয়ানের উচিত সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে বাতিল করা এবং স্বল্প সম্পদকে তাদের প্রয়োজনীয় হালকা সারফেস জাহাজের দিকে চালিত করা।
প্রচলিত সামরিক প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে সরে আসার জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের ঝুঁকি নিতে হবে এবং যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের সঙ্গে আসা বাধা ও সমালোচনা অতিক্রম করতে হবে।
কয়েক বছর স্থবিরতা ও হ্রাসের পর তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যয় অবশেষে বাড়ছে।
তাইওয়ানের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং আইনসভা মে মাসে একটি ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেটও পাস করেছে। তবে এই সম্পদ যদি পুরোনো প্রতিরক্ষা ধারণায় এবং স্বল্পসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ বড় যুদ্ধজাহাজে ব্যয় করা হয়, তবে তাইওয়ান মোটেও নিরাপদ হবে না।
হোমস লিয়াও তাইওয়ানের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির ওয়ার কলেজের সাবেক সম্মানসূচক চেয়ার; ডেনিস ব্লেয়ার ইউএস প্যাসিফিক কমান্ডের কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
শেখ হাসিনা ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি কাটেনি। একদিকে বাংলাদেশ বারবার ভারতে অবস্থানরত সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে নয়াদিল্লি এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে একই সময়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের নানা বার্তা দিচ্ছে ভারত। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর, ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে নয়াদিল্লি সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে ঘিরে একের পর এক ঘটনা সেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কী প্রক্রিয়ায় তিনি দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। এর মধ্যেই সম্প্রতি দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে সরাসরি বক্তব্য দেন তিনি। এ ঘটনায় বাংলাদেশ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বিশেষ করে বাংলাদেশে দণ্ডিত শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতের মাটিতে থেকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলেন, তা নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের নীরবতা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া এখন ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে নয়াদিল্লির কাছে তাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আরও পড়ুন>শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যা বললেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলাবাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়: দীনেশ ত্রিবেদী তবে ভারত এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। নয়াদিল্লির বক্তব্য, বাংলাদেশের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফলে ঢাকার পক্ষ থেকে বারবার দাবি জানানো হলেও ভারতের অবস্থান এখনো অনেকটাই অস্পষ্ট। এই বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলছে। দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষোভ দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের ঘটনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, পলাতক ও দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া উদ্বেগজনক। ঢাকার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের দাবি, শেখ হাসিনার বক্তব্যে সরকারের সম্পর্ক নেই দিল্লিতে শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল এবং এতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না। শেখ হাসিনা সেখানে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গেও ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানায় নয়াদিল্লি। ভারতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার মতামতকে ভারত সরকার সমর্থন করে না। দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় ভারত শেখ হাসিনা ইস্যুতে অস্বস্তি থাকলেও ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা অব্যাহত রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে বলেন, যেকোনো সম্পর্ক তখনই কার্যকরভাবে এগিয়ে যায়, যখন উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে অভিন্ন জায়গা ও পারস্পরিক স্বার্থ খুঁজে বের করতে পারে। তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি। জয়শঙ্করের বক্তব্যে একদিকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হয়নি। তারেক রহমানের ভারত সফর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও দুই দেশের সম্পর্কের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত এরই মধ্যে তাকে দুইবার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক জোরদারে ভারতের আগ্রহের বিষয়টি সামনে এসেছে। হর্ষবর্ধন শ্রিংলার বক্তব্য ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলাও শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। ৯ সেপ্টেম্বর বারাসতের আদামাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা কী বলছেন, সেটি তার নিজের বিষয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তার বিষয়। ভারত সরকার বারবার স্পষ্ট করেছে যে শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। শ্রিংলা বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক চায়। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং পারস্পরিক স্বার্থে দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ব্রিকসে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ বাংলাদেশের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নিয়েও কথা বলেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। তিনি জানান, ভারত তার ঘনিষ্ঠ অংশীদার দেশগুলোকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বাংলাদেশকেও জি৭-এর মতো প্ল্যাটফর্মে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে কোনো প্ল্যাটফর্মে অংশ নেবে কি না, সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বলে জানান তিনি। শ্রিংলার মতে, ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অংশ নিলে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নেতৃত্বের যোগাযোগ ও বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের সেমিনার বাতিল দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই নতুন আরেকটি ঘটনা সামনে আসে। নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব একটি সেমিনারের পরিকল্পনা করেছিল। সেখানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দিল্লি পুলিশ অনুমতি না দেওয়ায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়। ২৯ আগস্ট ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। এই ঘটনাও দিল্লিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে। সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার গুরুত্ব দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার কথাও সামনে এসেছে। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া জলবায়ু ও পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য নয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করতে চান না বলেও জানান দীনেশ ত্রিবেদী।তার বক্তব্য, বাংলাদেশের মানুষ এবং নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারই দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানে। আরও পড়ুন>শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে যা বললেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলাবাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়: দীনেশ ত্রিবেদী এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়কে ভারত কীভাবে দেখছে, সে বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। তারেক রহমানকে সর্বোচ্চ সম্মানের বার্তা তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হবে। ভারত তার সফরের জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে বলেও জানান তিনি। এই সফর দুই দেশের জনগণের জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সম্পর্কের সামনে শেখ হাসিনা ইস্যুই বড় প্রশ্ন সব মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখনো অব্যাহত। ঢাকা তাকে ফেরত দেওয়ার দাবি থেকে সরে না এলেও ভারত প্রত্যর্পণ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। অন্যদিকে নয়াদিল্লির শীর্ষ কর্মকর্তারা বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর, ব্রিকসের আমন্ত্রণ, সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ওপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে ভারত ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। তবে সেই সম্পর্ক কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তার বড় একটি প্রশ্ন এখনো শেখ হাসিনা ইস্যুতেই আটকে আছে। একদিকে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা, অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ঘিরে কূটনৈতিক অস্বস্তি এই দুই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক। এমএসএম
জিয়াউদ্দিন লিটন একসময় উৎসব মানে ছিল মানুষ। এখন উৎসব মানে মানুষ, বাজার, ব্র্যান্ড, বিজ্ঞাপন, ক্যামেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব মিলিয়ে এক বিশাল আয়োজন। আগে উৎসবের কেন্দ্র ছিল উঠান; এখন তার একটি বড় অংশ শপিংমল। আগে উৎসবের স্মৃতি থাকত মানুষের মনে; এখন তার একটি বড় অংশ থাকে মোবাইলের গ্যালারিতে। আগে মানুষ উৎসব করত; এখন অনেক সময় উৎসব একই সঙ্গে একটি ‘ইভেন্ট’, একটি ‘কনটেন্ট’ এবং একটি ‘মার্কেট’। তবে এই পরিবর্তনকে কেবল অবক্ষয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ উৎসবের সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক নতুন নয়। হাট-মেলা, কারুশিল্প, মিষ্টি, পোশাক, পিঠা, বই—সবই বহুদিন ধরে উৎসবের অর্থনীতির অংশ। সমস্যা বাণিজ্য থাকা নয়; সমস্যা তখনই; যখন বাণিজ্য উৎসবের অর্থ নির্ধারণ করতে শুরু করে। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্নটি জরুরি হয়ে ওঠে—উৎসব আছে, কিন্তু সংস্কৃতি কোথায়? বাংলার উৎসবের শেকড় খুঁজলে আমরা অর্থনীতির আগে পাই জীবনকে। কৃষি, ঋতু, নদী, মাটি, ধর্ম, লোকবিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক—এসবের ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে উৎসবের সামাজিক কাঠামো। নবান্ন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দ ছিল কৃষিজীবনের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রকাশ। নতুন অন্ন শুধু নিজের ঘরে থাকবে না—প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের ঘরেও যাবে। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত ছিল ভাগাভাগির নৈতিকতা। পহেলা বৈশাখের ক্ষেত্রেও দেখা যায় একই সামাজিক প্রবণতা। বাংলা সন ও পহেলা বৈশাখের ইতিহাস নিয়ে নানা মত থাকলেও ইউনেস্কার বাংলাদেশ বিষয়ক ঐতিহ্য-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ আছে, বাংলা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মুঘল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থার সম্পর্ক ছিল এবং গ্রামীণ জীবনে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। একই নথিতে পহেলা বৈশাখের গ্রামীণ মেলা, খাদ্য, খেলনা, কারুশিল্প ও সামাজিক সমাগমের বিবরণও আছে। অর্থাৎ উৎসবের শুরুতেই অর্থনীতি ছিল। কিন্তু সেই অর্থনীতি ছিল জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত—মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আজকের প্রশ্ন হলো, সেই সম্পর্কটি কোথায় বদলে গেল? পহেলা বৈশাখ এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর একটি। এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনেস্কার বর্ণনা অনুযায়ী, মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের উদ্যোগে; এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল জনসংহতি, অশুভের বিরুদ্ধে প্রতীকী অবস্থান এবং নতুন ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা নিজেই দেখায়, সংস্কৃতি কখনো স্থির কোনো জাদুঘর-নির্ভর বস্তু নয়। সময়ের প্রয়োজন থেকে নতুন সাংস্কৃতিক রূপ জন্ম নিতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের আরেকটি রূপও দৃশ্যমান হয়েছে—বৈশাখী পোশাক, বিশেষ খাবার, রেস্তোরাঁর মেন্যু, করপোরেট ক্যাম্পেইন, অনলাইন অফার, ব্র্যান্ডেড আয়োজন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতি, নাকি পুঁজিবাদী সংস্কৃতি? গবেষণাটি শহর ও গ্রাম এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির বৈশাখ উদ্যাপন তুলনা করে উৎসবটির মধ্যে জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদী সংস্কৃতির টানাপোড়েন বিশ্লেষণ করেছে। এখানে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। বৈশাখী পোশাক বিক্রি হচ্ছে—এটি খারাপ নয়। বরং এতে তাঁতি, কারিগর, ডিজাইনার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হতে পারেন। কিন্তু যখন বৈশাখের সাংস্কৃতিক পরিচয়টি ‘লাল-সাদা কালেকশন’-এ সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সংস্কৃতিকে ধারণ করছি, নাকি সংস্কৃতির একটি বাজারযোগ্য চিহ্ন কিনছি? মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যেও বাজার আছে কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ইউনেস্কোর নথিতে মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী ও শিল্পকর্মের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথাও উঠে আসে। অর্থাৎ সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য বাজার কখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। তাহলে বাণিজ্যিকীকরণ সব সময় সংস্কৃতির শত্রু নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাজার কি সংস্কৃতিকে বাঁচাচ্ছে, নাকি সংস্কৃতির জায়গা দখল করছে? একজন পটুয়া যদি তার আঁকা ছবি বিক্রি করে সংসার চালান, সেখানে বাজার সংস্কৃতির সহায়ক। একজন তাঁতি যদি বৈশাখে তার শাড়ির ন্যায্যদাম পান, সেটিও সাংস্কৃতিক অর্থনীতির সুস্থ রূপ। কিন্তু কোনো লোকঐতিহ্যের অর্থ, ইতিহাস ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কেবল তার নকশা, রং বা প্রতীককে পণ্যে পরিণত করা হলে সেখানে সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি হয়। অর্থাৎ বাণিজ্য নয়, বাণিজ্যের আধিপত্যই মূল সমস্যা। আরও পড়ুন ভিডিও ভাইরালে তোলপাড় / হাসপাতালে বাবার স্বাক্ষর নেওয়া কাগজটি আইনগত দলিল নয় নবান্নের প্রসঙ্গে এই প্রশ্ন আরও তীব্র। নতুন ধানকে কেন্দ্র করে যে উৎসব, তার কেন্দ্রে থাকার কথা কৃষকের। অথচ শহুরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমরা অনেক সময় নবান্নকে দেখি পিঠা, আল্পনা, লোকগান ও মঞ্চসজ্জার মধ্যে; কৃষকের জীবন, উৎপাদন ব্যয়, ফসলের ন্যায্যমূল্য কিংবা জলবায়ু ও কৃষির অনিশ্চয়তা থাকে আড়ালে। এখানে তৈরি হয় এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ। আমরা নবান্নের খাবারটিকে রাখি, নবান্নের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলি। কৃষকের উৎপাদিত ধান শহরের বাজারে আসে। সেই ধান থেকে তৈরি হয় চাল, পিঠা, পায়েস। কিন্তু উৎসবের ভোগের সঙ্গে উৎপাদকের জীবন কতটা যুক্ত থাকে? একটি সংস্কৃতি তখনই জীবন্ত, যখন তার প্রতীক এবং তার মানুষ—দুটিই দৃশ্যমান থাকে। নবান্নকে যদি কেবল ‘গ্রামীণ নস্টালজিয়া’ বানিয়ে ফেলি, তবে সেটি আর জীবন্ত কৃষিসংস্কৃতি থাকে না; হয়ে যায় শহুরে প্রদর্শনীর একটি থিম। বাংলাদেশে ঈদ উৎসবের সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক সবচেয়ে স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ঈদকে ঘিরে ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা লেনদেনের একটি আনুমানিক হিসাব প্রকাশ করা হয়েছিল। পোশাক, জুয়েলারি, খাদ্যসহ নানা খাতে ঈদকেন্দ্রিক ভোগব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সাময়িক গতি সৃষ্টি করে বলে অর্থনীতিবিদদের মতও সেখানে তুলে ধরা হয়। এই বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শুধু ‘ভোগবাদ’ বলে বাতিল করা যাবে না। কারণ ঈদের বাজারে যুক্ত থাকেন—দর্জি, তাঁতি, পোশাকশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, রেস্তোরাঁকর্মী, কৃষক, মিষ্টি প্রস্তুতকারক, অনলাইন উদ্যোক্তা—অসংখ্য মানুষ। অর্থাৎ উৎসবের অর্থনীতি অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এখানেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসে—ঈদের আনন্দ কি ক্রমে ক্রয়ক্ষমতার প্রদর্শনে পরিণত হচ্ছে? একটি পরিবারের ঈদের পোশাক কত দামি, কোথায় কেনাকাটা হয়েছে, কোন ব্র্যান্ড, কোন রেস্তোরাঁ—এসব যখন সামাজিক মর্যাদার চিহ্ন হয়ে ওঠে; তখন উৎসবের সাম্যের দর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য তো নতুন পোশাকে যতটা নয়; অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারার মধ্যে। আবার যদি আমরা পূজার উৎসবের দিকে দৃষ্টি দেই, তাহলে দেখতে পাই দুর্গাপূজা বা অন্যান্য পূজার ক্ষেত্রেও অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ। মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা, আলোকসজ্জা, পোশাক, খাবার, পরিবহন, শিল্পী ও কারিগরের শ্রম—সবকিছু মিলে একটি বিশাল অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি হয়। এখানেও বাজারকে বাদ দেওয়া অসম্ভব। কিন্তু যখন আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা, ব্যয়ের প্রতিযোগিতা, থিমের প্রতিযোগিতা এবং দর্শনার্থী আকর্ষণের প্রতিযোগিতা মূল সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে ছাপিয়ে যায়; তখন উৎসবের চরিত্র বদলাতে থাকে। প্রশ্নটি তাই—উৎসব কত বড় হলো, নাকি উৎসব কত মানুষকে একত্র করল? দুটির উত্তর ভিন্ন ভিন্ন। বইমেলাতেও দেখা যায় দুটি চিত্র; পাঠের সংস্কৃতি বনাম বইয়ের বাজার। অমর একুশে বইমেলা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। বইমেলায় বাণিজ্য থাকবেই। প্রকাশক বই বিক্রি করবেন, লেখক পাঠকের কাছে পৌঁছাবেন, পাঠক বই কিনবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বইমেলার মূল্য কেবল বিক্রির পরিমাণ দিয়ে মাপা যায় না। বাংলা একাডেমি ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলার বই বিক্রির হিসাবও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ বইমেলা নিঃসন্দেহে একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। কিন্তু একটি বইমেলার সবচেয়ে বড় সাফল্য কি বিক্রি হওয়া বইয়ের সংখ্যা? নাকি মেলা শেষে কতজন মানুষ আরও বেশি বই পড়তে শুরু করলেন? এখানেই আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যায়নের দুর্বলতা। আমরা অনেক সময় জিজ্ঞেস করি—‘কত বই বিক্রি হলো?’ কিন্তু জিজ্ঞেস করি না—কত মানুষ বই পড়লেন? বইমেলার ভিড় বাড়া ভালো; কিন্তু পাঠকের সংখ্যা বাড়া আরও ভালো। উৎসব এখন কনটেন্ট ও বাণিজ্যিকীকরণের সবচেয়ে নতুন ও শক্তিশালী বাহন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে প্রায় ৭৭.৭ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং প্রায় ৬০ মিলিয়ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ছিল বলে ডাটারিপোর্টালের হিসাবে দেখা যায়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৭৭ শতাংশ অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছিলেন। এই বাস্তবতা উৎসবের ভাষা বদলে দিয়েছে। এখন উৎসব শুধু উদ্যাপন নয়; উৎসব হলো ছবি, ভিডিও, রিল, স্টোরি, পোস্ট। ফলে উৎসবের অভিজ্ঞতার একটি অংশ হয়ে উঠেছে দৃশ্যমানতা। আমি কী পরেছি? কোথায় গিয়েছি? কী খেয়েছি? কার সঙ্গে ছবি তুলেছি? কোন মেলায় গিয়েছি? অর্থাৎ উৎসবের অভিজ্ঞতা কখনো কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে সামাজিক প্রদর্শনে রূপান্তরিত হয়। এখানে প্রযুক্তিকে দোষ দেওয়া সহজ, কিন্তু যথার্থ নয়। প্রযুক্তি নিজে সংস্কৃতির শত্রু নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া লোকগান, আঞ্চলিক খাবার, কারুশিল্প, আঞ্চলিক ভাষা ও লোকঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারে। সমস্যা তখনই; যখন সংস্কৃতি কনটেন্টের চেয়ে বেশি কিছু নয়—এই ধারণা তৈরি হয়। বাণিজ্যিক উৎসবের আরেকটি বড় সমস্যা শ্রেণিগত। একজন মানুষের কাছে বৈশাখ মানে একটি নতুন পোশাক। অন্যজনের কাছে পাঁচটি পোশাক, রেস্তোরাঁ, ভ্রমণ ও অনুষ্ঠান। একজনের ঈদ মানে পরিবারের জন্য সামান্য কেনাকাটা। অন্যজনের ঈদ মানে ব্র্যান্ডেড পোশাক, দামি রেস্তোরাঁ, উপহার ও বিনোদন। একই উৎসব, কিন্তু ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এখানে উৎসব যদি সামাজিক সংহতির বদলে ভোগক্ষমতার প্রদর্শন হয়ে ওঠে, তবে উৎসবের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরও পড়ুন ভাইরাল গল্প ‘কবরের ঠিকানা’, কী লিখেছেন সোহেল আর রানা উৎসবের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল—অল্পের মানুষও আনন্দ করতে পারে। বাজারের সবচেয়ে বড় প্রলোভন—আরও বেশি না কিনলে আপনার আনন্দ অসম্পূর্ণ। এই দুই দর্শনের সংঘাতই আজকের উৎসব-সংস্কৃতির অন্যতম বড় প্রশ্ন। তবে আমরা অবশ্যই বাণিজ্যবিহীন একটি উৎসব চাই না। এটি বাস্তবসম্মতও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনীতি থাকবে। শিল্পী পারিশ্রমিক পাবেন। কারিগর পণ্য বিক্রি করবেন। প্রকাশক বই বিক্রি করবেন। তাঁতি কাপড় তৈরি করবেন। রেস্তোরাঁ উৎসবের খাবার পরিবেশন করবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উৎসবকে কেন্দ্র করে আয় করবেন। বরং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দায়বদ্ধ উৎসবের অর্থনীতি। বাজার থাকবে, কিন্তু বাজার সংস্কৃতিকে গ্রাস করবে না। বিজ্ঞাপন থাকবে, কিন্তু বিজ্ঞাপন উৎসবের ভাষা নির্ধারণ করবে না। ব্র্যান্ড থাকবে, কিন্তু ব্র্যান্ডের চেয়ে শিল্পী ও কারিগর দৃশ্যমান হবেন। উৎসবের পণ্য বিক্রি হবে, কিন্তু সেই পণ্যের পেছনের মানুষটির গল্পও বলা হবে। আমরা যদি সত্যিই বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষা করতে চাই, তাহলে শুধু উৎসবের দিনে বাঙালি হলেই হবে না। বৈশাখে শাড়ি-পাঞ্জাবি পরলাম—এতেই বাঙালিত্ব সম্পূর্ণ নয়। বছরের বাকি দিন বাংলা বই পড়ি কি না, লোকসংগীত শুনি কি না, স্থানীয় কারুশিল্পকে সমর্থন করি কি না, বাংলা ভাষার শুদ্ধ ও সৃজনশীল ব্যবহার করি কি না, আমাদের লোকঐতিহ্যের ইতিহাস জানি কি না—সেই প্রশ্নও জরুরি। একদিনের উৎসব দিয়ে একটি জাতির সংস্কৃতি টিকে থাকে না। সংস্কৃতি বেঁচে থাকে প্রতিদিনের আচরণে। উৎসব সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান মুহূর্ত মাত্র। অবশ্যই আমাদের সম্মিলিতভাবে কয়েকটি বিষয়ের ওপরে নজর রাখতে হবে: প্রথমত, উৎসবের অর্থনীতিকে সংস্কৃতিবিরোধী না ভেবে সংস্কৃতিবান্ধব অর্থনীতিতে রূপ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, লোকশিল্পী, তাঁতি, কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসবের বাজারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত, উৎসবের আয়োজনের সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস, লোকসংগীত, লোকখাদ্য, কারুশিল্প ও মৌখিক ঐতিহ্যের সংযোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবকে শুধু অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পঞ্চমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উৎসবের ‘দেখানো’ নয়, উৎসবের ইতিহাস ও অর্থ নিয়েও কনটেন্ট তৈরি হওয়া দরকার। সবচেয়ে বড় কথা—উৎসবের সাফল্য পরিমাপের মানদণ্ড বদলাতে হবে। কত টাকা খরচ হলো—তার পাশাপাশি জিজ্ঞেস করতে হবে, কতজন শিল্পী উপকৃত হলেন? কতজন কারিগর ন্যায্যমূল্য পেলেন? কতজন নতুন মানুষ লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হলো? কতজন পাঠে ফিরল? কতজন দরিদ্র মানুষ আনন্দের অংশীদার হলো? তখন উৎসবের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না; সহযোগী হবে। শেষ কথা হলো—আমরা কখনোই উৎসবকে বাজারের হাতে পুরোপুরি তুলে দেবো না। উৎসবের বিরুদ্ধে বাজার নয়। বাজারের বিরুদ্ধেও উৎসব নয়। প্রয়োজন তাদের মধ্যে একটি সুস্থ সম্পর্ক। কারণ সংস্কৃতি কখনো অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। কিন্তু সংস্কৃতির ওপর অর্থনীতির একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হলে উৎসব তার আত্মা হারাতে পারে। আজ আমাদের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— আমরা কি উৎসব উদ্যাপন করছি, নাকি উৎসবের পণ্য কিনছি? আমরা কি বৈশাখকে ধারণ করছি, নাকি বৈশাখী পোশাক পরছি? আমরা কি নবান্নকে অনুভব করছি, নাকি নবান্নের পিঠা খাচ্ছি? আমরা কি ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছি, নাকি নিজেদের সামর্থ প্রদর্শন করছি? আমরা কি বইমেলায় বইয়ের কাছে যাচ্ছি, নাকি বইমেলার ছবির কাছে? প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু সংস্কৃতির প্রশ্ন সব সময় আরামদায়ক হয় না। উৎসবের আলো যত উজ্জ্বল হচ্ছে, তার ছায়াগুলোও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাই আমাদের উৎসবকে বাতিল করলে চলবে না; বরং উৎসবের ভেতরে সংস্কৃতিকে আবার দৃশ্যমান করতে হবে। মনে রাখতে হবে— বাজার উৎসবকে বড় করতে পারে, কিন্তু মানুষই উৎসবকে অর্থ দেয়। ব্র্যান্ড উৎসবের পোশাক বানাতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি তার আত্মা তৈরি করে। মঞ্চ উৎসবকে দৃশ্যমান করতে পারে, কিন্তু মানুষের মিলনই তাকে প্রাণ দেয়। আর শেষ পর্যন্ত—উৎসবের সবচেয়ে বড় পণ্য আনন্দ নয়; উৎসবের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। সেই মানুষটিকে যদি আমরা হারিয়ে ফেলি; তবে আলো থাকবে, মেলা থাকবে, গান থাকবে, বিজ্ঞাপন থাকবে, ছবি থাকবে—সবই থাকবে। শুধু উৎসবটি আর থাকবে না। থাকবে তার একটি সুন্দর, চকচকে, বাজারজাত সংস্করণ। শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে—মানুষকে বাদ দিয়ে উৎসব হতে পারে—আয়োজন হয়তো হয়। কিন্তু সংস্কৃতি হয় না। লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কবি ও প্রাবন্ধিক। এসইউ
চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশে ব্যবসার পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে অপহৃত গ্যারেজ ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনকে (৩৬) উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় অপহরণকারী চক্রের মূলহোতাসহ আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) হাসান মোস্তফা স্বপন সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ। পরে মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের সহায়তায় মহামায়া লেকের বন বিভাগের পরিত্যক্ত একটি কটেজ থেকে হেলাল উদ্দিনকে উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতাররা হলেন- আবুল হাশেম (৫২), শান্ত মিয়া (৩২), মো. আকরাম (৩৪), মঈন উদ্দিন রায়হান (২৯), আমজাদ হোসেন (৩৫), মাহবুব রহমান (২৬), মানিক হোসেন (৩০) ও মো. ফারুক (৩৪)। পুলিশ জানায়, হেলাল উদ্দিন পাঁচলাইশ থানার শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের পাশে একটি গাড়ির গ্যারেজ পরিচালনা করেন। আবুল হাশেম তার পূর্বপরিচিত ও ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে আবুল হাশেম বিভিন্ন সময়ে হেলালের ব্যবসায় ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। এর মধ্যে ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি ছিল ৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এই পাওনা টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে আবুল হাশেম বেশ কিছুদিন ধরে হেলালকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আবুল হাশেমসহ ৭-৮ জন ব্যক্তি একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের সামনে আসেন। পরে হেলালকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান। পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর সকালে অপহৃত হেলালের মোবাইল ফোন নম্বর থেকে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারের মোবাইল ফোনে কল করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হেলালকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে এক লাখ টাকা পাঠানোর দাবি জানানো হয়। এ ঘটনায় জেসমিন আক্তার বাদী হয়ে পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমে আকবরশাহ থানার উত্তর কাট্টলী এলাকা থেকে শান্ত মিয়াকে গ্রেফতার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচলাইশের মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আবুল হাশেম এবং পরে আকবরশাহর লতিফপুর এলাকা থেকে আকরামকে গ্রেফতার করা হয়। আকরামের কাছ থেকে হেলালের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, শান্ত ও আকরামকে জিজ্ঞাসাবাদে হেলালকে মহামায়া লেক এলাকায় আটকে রাখার তথ্য পাওয়া যায়। পরে মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের সহায়তায় মহামায়া লেকের ভেতরে বন বিভাগের পরিত্যক্ত একটি কটেজে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে মঈন উদ্দিন রায়হান, আমজাদ হোসেন, মাহবুব রহমান, মানিক হোসেন ও ফারুককে গ্রেফতার এবং হেলাল উদ্দিনকে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা পুলিশকে জানিয়েছেন, ব্যবসায়িক লেনদেনের বিরোধের জেরে আবুল হাশেম ও তার জামাতা আকরাম হেলালের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন। এজন্য তারা শান্ত মিয়াকে এক লাখ টাকা দিয়ে অন্যদের ভাড়া করে হেলালকে অপহরণ করেন। পাঁচলাইশ মডেল থানার পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। এমআরএএইচ/এমকেআর