জিয়াউদ্দিন লিটন
একসময় উৎসব মানে ছিল মানুষ। এখন উৎসব মানে মানুষ, বাজার, ব্র্যান্ড, বিজ্ঞাপন, ক্যামেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব মিলিয়ে এক বিশাল আয়োজন। আগে উৎসবের কেন্দ্র ছিল উঠান; এখন তার একটি বড় অংশ শপিংমল। আগে উৎসবের স্মৃতি থাকত মানুষের মনে; এখন তার একটি বড় অংশ থাকে মোবাইলের গ্যালারিতে। আগে মানুষ উৎসব করত; এখন অনেক সময় উৎসব একই সঙ্গে একটি ‘ইভেন্ট’, একটি ‘কনটেন্ট’ এবং একটি ‘মার্কেট’।
তবে এই পরিবর্তনকে কেবল অবক্ষয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ উৎসবের সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক নতুন নয়। হাট-মেলা, কারুশিল্প, মিষ্টি, পোশাক, পিঠা, বই—সবই বহুদিন ধরে উৎসবের অর্থনীতির অংশ। সমস্যা বাণিজ্য থাকা নয়; সমস্যা তখনই; যখন বাণিজ্য উৎসবের অর্থ নির্ধারণ করতে শুরু করে। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্নটি জরুরি হয়ে ওঠে—উৎসব আছে, কিন্তু সংস্কৃতি কোথায়?
বাংলার উৎসবের শেকড় খুঁজলে আমরা অর্থনীতির আগে পাই জীবনকে। কৃষি, ঋতু, নদী, মাটি, ধর্ম, লোকবিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক—এসবের ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে উৎসবের সামাজিক কাঠামো। নবান্ন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। নতুন ধান ঘরে ওঠার আনন্দ ছিল কৃষিজীবনের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রকাশ। নতুন অন্ন শুধু নিজের ঘরে থাকবে না—প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের ঘরেও যাবে। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত ছিল ভাগাভাগির নৈতিকতা।
পহেলা বৈশাখের ক্ষেত্রেও দেখা যায় একই সামাজিক প্রবণতা। বাংলা সন ও পহেলা বৈশাখের ইতিহাস নিয়ে নানা মত থাকলেও ইউনেস্কার বাংলাদেশ বিষয়ক ঐতিহ্য-সংক্রান্ত নথিতে উল্লেখ আছে, বাংলা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মুঘল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থার সম্পর্ক ছিল এবং গ্রামীণ জীবনে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। একই নথিতে পহেলা বৈশাখের গ্রামীণ মেলা, খাদ্য, খেলনা, কারুশিল্প ও সামাজিক সমাগমের বিবরণও আছে। অর্থাৎ উৎসবের শুরুতেই অর্থনীতি ছিল। কিন্তু সেই অর্থনীতি ছিল জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত—মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আজকের প্রশ্ন হলো, সেই সম্পর্কটি কোথায় বদলে গেল?
পহেলা বৈশাখ এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর একটি। এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনেস্কার বর্ণনা অনুযায়ী, মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের উদ্যোগে; এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল জনসংহতি, অশুভের বিরুদ্ধে প্রতীকী অবস্থান এবং নতুন ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা নিজেই দেখায়, সংস্কৃতি কখনো স্থির কোনো জাদুঘর-নির্ভর বস্তু নয়। সময়ের প্রয়োজন থেকে নতুন সাংস্কৃতিক রূপ জন্ম নিতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের আরেকটি রূপও দৃশ্যমান হয়েছে—বৈশাখী পোশাক, বিশেষ খাবার, রেস্তোরাঁর মেন্যু, করপোরেট ক্যাম্পেইন, অনলাইন অফার, ব্র্যান্ডেড আয়োজন।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতি, নাকি পুঁজিবাদী সংস্কৃতি? গবেষণাটি শহর ও গ্রাম এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির বৈশাখ উদ্যাপন তুলনা করে উৎসবটির মধ্যে জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদী সংস্কৃতির টানাপোড়েন বিশ্লেষণ করেছে।
এখানে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। বৈশাখী পোশাক বিক্রি হচ্ছে—এটি খারাপ নয়। বরং এতে তাঁতি, কারিগর, ডিজাইনার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হতে পারেন। কিন্তু যখন বৈশাখের সাংস্কৃতিক পরিচয়টি ‘লাল-সাদা কালেকশন’-এ সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সংস্কৃতিকে ধারণ করছি, নাকি সংস্কৃতির একটি বাজারযোগ্য চিহ্ন কিনছি?
মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যেও বাজার আছে কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ইউনেস্কোর নথিতে মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী ও শিল্পকর্মের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথাও উঠে আসে। অর্থাৎ সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য বাজার কখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। তাহলে বাণিজ্যিকীকরণ সব সময় সংস্কৃতির শত্রু নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাজার কি সংস্কৃতিকে বাঁচাচ্ছে, নাকি সংস্কৃতির জায়গা দখল করছে?
একজন পটুয়া যদি তার আঁকা ছবি বিক্রি করে সংসার চালান, সেখানে বাজার সংস্কৃতির সহায়ক। একজন তাঁতি যদি বৈশাখে তার শাড়ির ন্যায্যদাম পান, সেটিও সাংস্কৃতিক অর্থনীতির সুস্থ রূপ। কিন্তু কোনো লোকঐতিহ্যের অর্থ, ইতিহাস ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কেবল তার নকশা, রং বা প্রতীককে পণ্যে পরিণত করা হলে সেখানে সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি হয়। অর্থাৎ বাণিজ্য নয়, বাণিজ্যের আধিপত্যই মূল সমস্যা।
নবান্নের প্রসঙ্গে এই প্রশ্ন আরও তীব্র। নতুন ধানকে কেন্দ্র করে যে উৎসব, তার কেন্দ্রে থাকার কথা কৃষকের। অথচ শহুরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমরা অনেক সময় নবান্নকে দেখি পিঠা, আল্পনা, লোকগান ও মঞ্চসজ্জার মধ্যে; কৃষকের জীবন, উৎপাদন ব্যয়, ফসলের ন্যায্যমূল্য কিংবা জলবায়ু ও কৃষির অনিশ্চয়তা থাকে আড়ালে। এখানে তৈরি হয় এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ। আমরা নবান্নের খাবারটিকে রাখি, নবান্নের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলি।
কৃষকের উৎপাদিত ধান শহরের বাজারে আসে। সেই ধান থেকে তৈরি হয় চাল, পিঠা, পায়েস। কিন্তু উৎসবের ভোগের সঙ্গে উৎপাদকের জীবন কতটা যুক্ত থাকে? একটি সংস্কৃতি তখনই জীবন্ত, যখন তার প্রতীক এবং তার মানুষ—দুটিই দৃশ্যমান থাকে। নবান্নকে যদি কেবল ‘গ্রামীণ নস্টালজিয়া’ বানিয়ে ফেলি, তবে সেটি আর জীবন্ত কৃষিসংস্কৃতি থাকে না; হয়ে যায় শহুরে প্রদর্শনীর একটি থিম।
বাংলাদেশে ঈদ উৎসবের সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক সবচেয়ে স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ঈদকে ঘিরে ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাব উদ্ধৃত করে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা লেনদেনের একটি আনুমানিক হিসাব প্রকাশ করা হয়েছিল। পোশাক, জুয়েলারি, খাদ্যসহ নানা খাতে ঈদকেন্দ্রিক ভোগব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সাময়িক গতি সৃষ্টি করে বলে অর্থনীতিবিদদের মতও সেখানে তুলে ধরা হয়।
এই বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শুধু ‘ভোগবাদ’ বলে বাতিল করা যাবে না। কারণ ঈদের বাজারে যুক্ত থাকেন—দর্জি, তাঁতি, পোশাকশ্রমিক, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, রেস্তোরাঁকর্মী, কৃষক, মিষ্টি প্রস্তুতকারক, অনলাইন উদ্যোক্তা—অসংখ্য মানুষ। অর্থাৎ উৎসবের অর্থনীতি অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এখানেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসে—ঈদের আনন্দ কি ক্রমে ক্রয়ক্ষমতার প্রদর্শনে পরিণত হচ্ছে? একটি পরিবারের ঈদের পোশাক কত দামি, কোথায় কেনাকাটা হয়েছে, কোন ব্র্যান্ড, কোন রেস্তোরাঁ—এসব যখন সামাজিক মর্যাদার চিহ্ন হয়ে ওঠে; তখন উৎসবের সাম্যের দর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য তো নতুন পোশাকে যতটা নয়; অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারার মধ্যে।
আবার যদি আমরা পূজার উৎসবের দিকে দৃষ্টি দেই, তাহলে দেখতে পাই দুর্গাপূজা বা অন্যান্য পূজার ক্ষেত্রেও অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ। মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা, আলোকসজ্জা, পোশাক, খাবার, পরিবহন, শিল্পী ও কারিগরের শ্রম—সবকিছু মিলে একটি বিশাল অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি হয়। এখানেও বাজারকে বাদ দেওয়া অসম্ভব। কিন্তু যখন আলোকসজ্জার প্রতিযোগিতা, ব্যয়ের প্রতিযোগিতা, থিমের প্রতিযোগিতা এবং দর্শনার্থী আকর্ষণের প্রতিযোগিতা মূল সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে ছাপিয়ে যায়; তখন উৎসবের চরিত্র বদলাতে থাকে। প্রশ্নটি তাই—উৎসব কত বড় হলো, নাকি উৎসব কত মানুষকে একত্র করল? দুটির উত্তর ভিন্ন ভিন্ন।
বইমেলাতেও দেখা যায় দুটি চিত্র; পাঠের সংস্কৃতি বনাম বইয়ের বাজার। অমর একুশে বইমেলা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। বইমেলায় বাণিজ্য থাকবেই। প্রকাশক বই বিক্রি করবেন, লেখক পাঠকের কাছে পৌঁছাবেন, পাঠক বই কিনবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বইমেলার মূল্য কেবল বিক্রির পরিমাণ দিয়ে মাপা যায় না। বাংলা একাডেমি ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলার বই বিক্রির হিসাবও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ বইমেলা নিঃসন্দেহে একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র।
কিন্তু একটি বইমেলার সবচেয়ে বড় সাফল্য কি বিক্রি হওয়া বইয়ের সংখ্যা? নাকি মেলা শেষে কতজন মানুষ আরও বেশি বই পড়তে শুরু করলেন? এখানেই আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যায়নের দুর্বলতা। আমরা অনেক সময় জিজ্ঞেস করি—‘কত বই বিক্রি হলো?’ কিন্তু জিজ্ঞেস করি না—কত মানুষ বই পড়লেন? বইমেলার ভিড় বাড়া ভালো; কিন্তু পাঠকের সংখ্যা বাড়া আরও ভালো।
উৎসব এখন কনটেন্ট ও বাণিজ্যিকীকরণের সবচেয়ে নতুন ও শক্তিশালী বাহন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে প্রায় ৭৭.৭ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং প্রায় ৬০ মিলিয়ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ছিল বলে ডাটারিপোর্টালের হিসাবে দেখা যায়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৭৭ শতাংশ অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছিলেন। এই বাস্তবতা উৎসবের ভাষা বদলে দিয়েছে। এখন উৎসব শুধু উদ্যাপন নয়; উৎসব হলো ছবি, ভিডিও, রিল, স্টোরি, পোস্ট। ফলে উৎসবের অভিজ্ঞতার একটি অংশ হয়ে উঠেছে দৃশ্যমানতা।
আমি কী পরেছি? কোথায় গিয়েছি? কী খেয়েছি? কার সঙ্গে ছবি তুলেছি? কোন মেলায় গিয়েছি? অর্থাৎ উৎসবের অভিজ্ঞতা কখনো কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে সামাজিক প্রদর্শনে রূপান্তরিত হয়। এখানে প্রযুক্তিকে দোষ দেওয়া সহজ, কিন্তু যথার্থ নয়। প্রযুক্তি নিজে সংস্কৃতির শত্রু নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া লোকগান, আঞ্চলিক খাবার, কারুশিল্প, আঞ্চলিক ভাষা ও লোকঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারে। সমস্যা তখনই; যখন সংস্কৃতি কনটেন্টের চেয়ে বেশি কিছু নয়—এই ধারণা তৈরি হয়।
বাণিজ্যিক উৎসবের আরেকটি বড় সমস্যা শ্রেণিগত। একজন মানুষের কাছে বৈশাখ মানে একটি নতুন পোশাক। অন্যজনের কাছে পাঁচটি পোশাক, রেস্তোরাঁ, ভ্রমণ ও অনুষ্ঠান। একজনের ঈদ মানে পরিবারের জন্য সামান্য কেনাকাটা। অন্যজনের ঈদ মানে ব্র্যান্ডেড পোশাক, দামি রেস্তোরাঁ, উপহার ও বিনোদন। একই উৎসব, কিন্তু ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এখানে উৎসব যদি সামাজিক সংহতির বদলে ভোগক্ষমতার প্রদর্শন হয়ে ওঠে, তবে উৎসবের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উৎসবের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল—অল্পের মানুষও আনন্দ করতে পারে। বাজারের সবচেয়ে বড় প্রলোভন—আরও বেশি না কিনলে আপনার আনন্দ অসম্পূর্ণ। এই দুই দর্শনের সংঘাতই আজকের উৎসব-সংস্কৃতির অন্যতম বড় প্রশ্ন। তবে আমরা অবশ্যই বাণিজ্যবিহীন একটি উৎসব চাই না। এটি বাস্তবসম্মতও নয়, প্রয়োজনীয়ও নয়। সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনীতি থাকবে। শিল্পী পারিশ্রমিক পাবেন। কারিগর পণ্য বিক্রি করবেন। প্রকাশক বই বিক্রি করবেন। তাঁতি কাপড় তৈরি করবেন। রেস্তোরাঁ উৎসবের খাবার পরিবেশন করবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উৎসবকে কেন্দ্র করে আয় করবেন। বরং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দায়বদ্ধ উৎসবের অর্থনীতি।
বাজার থাকবে, কিন্তু বাজার সংস্কৃতিকে গ্রাস করবে না। বিজ্ঞাপন থাকবে, কিন্তু বিজ্ঞাপন উৎসবের ভাষা নির্ধারণ করবে না। ব্র্যান্ড থাকবে, কিন্তু ব্র্যান্ডের চেয়ে শিল্পী ও কারিগর দৃশ্যমান হবেন। উৎসবের পণ্য বিক্রি হবে, কিন্তু সেই পণ্যের পেছনের মানুষটির গল্পও বলা হবে।
আমরা যদি সত্যিই বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষা করতে চাই, তাহলে শুধু উৎসবের দিনে বাঙালি হলেই হবে না। বৈশাখে শাড়ি-পাঞ্জাবি পরলাম—এতেই বাঙালিত্ব সম্পূর্ণ নয়। বছরের বাকি দিন বাংলা বই পড়ি কি না, লোকসংগীত শুনি কি না, স্থানীয় কারুশিল্পকে সমর্থন করি কি না, বাংলা ভাষার শুদ্ধ ও সৃজনশীল ব্যবহার করি কি না, আমাদের লোকঐতিহ্যের ইতিহাস জানি কি না—সেই প্রশ্নও জরুরি।
একদিনের উৎসব দিয়ে একটি জাতির সংস্কৃতি টিকে থাকে না। সংস্কৃতি বেঁচে থাকে প্রতিদিনের আচরণে। উৎসব সেই সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান মুহূর্ত মাত্র। অবশ্যই আমাদের সম্মিলিতভাবে কয়েকটি বিষয়ের ওপরে নজর রাখতে হবে:
সবচেয়ে বড় কথা—উৎসবের সাফল্য পরিমাপের মানদণ্ড বদলাতে হবে। কত টাকা খরচ হলো—তার পাশাপাশি জিজ্ঞেস করতে হবে, কতজন শিল্পী উপকৃত হলেন? কতজন কারিগর ন্যায্যমূল্য পেলেন? কতজন নতুন মানুষ লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হলো? কতজন পাঠে ফিরল? কতজন দরিদ্র মানুষ আনন্দের অংশীদার হলো? তখন উৎসবের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না; সহযোগী হবে।
শেষ কথা হলো—আমরা কখনোই উৎসবকে বাজারের হাতে পুরোপুরি তুলে দেবো না। উৎসবের বিরুদ্ধে বাজার নয়। বাজারের বিরুদ্ধেও উৎসব নয়। প্রয়োজন তাদের মধ্যে একটি সুস্থ সম্পর্ক। কারণ সংস্কৃতি কখনো অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। কিন্তু সংস্কৃতির ওপর অর্থনীতির একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হলে উৎসব তার আত্মা হারাতে পারে। আজ আমাদের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর। কিন্তু সংস্কৃতির প্রশ্ন সব সময় আরামদায়ক হয় না। উৎসবের আলো যত উজ্জ্বল হচ্ছে, তার ছায়াগুলোও তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাই আমাদের উৎসবকে বাতিল করলে চলবে না; বরং উৎসবের ভেতরে সংস্কৃতিকে আবার দৃশ্যমান করতে হবে। মনে রাখতে হবে—
আর শেষ পর্যন্ত—উৎসবের সবচেয়ে বড় পণ্য আনন্দ নয়; উৎসবের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। সেই মানুষটিকে যদি আমরা হারিয়ে ফেলি; তবে আলো থাকবে, মেলা থাকবে, গান থাকবে, বিজ্ঞাপন থাকবে, ছবি থাকবে—সবই থাকবে। শুধু উৎসবটি আর থাকবে না। থাকবে তার একটি সুন্দর, চকচকে, বাজারজাত সংস্করণ। শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে—মানুষকে বাদ দিয়ে উৎসব হতে পারে—আয়োজন হয়তো হয়। কিন্তু সংস্কৃতি হয় না।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কবি ও প্রাবন্ধিক।
এসইউ
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফুয়াদ হোসেন শাহাদাতকে খালাস দিয়েছেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষ প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপনে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মনিরুজ্জামান গত ১৯ আগস্ট এ রায় ঘোষণা করেন। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। আদালত সূত্রে জানা যায়, হাজারীবাগ থানার মামলা ২০২৪ সালের জুনে মামলাটির পরিপ্রেক্ষিতে নারী ও শিশু মামলা হিসেবে মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলে। এতে মোহাম্মদ ফুয়াদ হোসেন শাহাদাত ছিলেন একমাত্র আসামি। রায়ের দিন অর্থাৎ ১৯ আগস্ট মামলাটির যুক্তিতর্ক শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। সেদিন জামিনে থাকা আসামি ফুয়াদ আদালতে হাজির হন। একই সঙ্গে মামলার এজাহারকারীও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলার নথি রায় ঘোষণার জন্য গ্রহণ করেন। পরে প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, আসামি মোহাম্মদ ফুয়াদ হোসেন শাহাদাতের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারায় আনা অভিযোগ প্রসিকিউশন পক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। এ কারণে তাকে মামলার দায় থেকে খালাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জামিনে থাকা আসামির জামিনদারদের জামিননামার দায় থেকেও অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ দেন আদালত। রায়ের অনুলিপি, অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের (সিএমএম) কাছে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, এর আগে ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর দায়রা আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছিলেন ফুয়াদ। পরে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এ চলতে থাকে। এ বিষয়ে বাদীপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমডিএএ/এমএএইচ/
দুর্নীতিবাজ যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার দুপুরে বঙ্গভবনে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি এ আহ্বান জানান। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন কমিশনার (তদন্ত) ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া এবং সচিব সাইদুর রহমান খান। সাক্ষাৎকালে দুদক চেয়ারম্যান কমিশনের সার্বিক কার্যক্রম, চলমান বিভিন্ন উদ্যোগ এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। তিনি দুর্নীতি দমনে কমিশনের কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, দীর্ঘদিনের অপশাসন, অনিয়ম ও জবাবদিহিতার অভাবে দুর্নীতি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও পড়ুন জুলাই জাদুঘরে অশ্রুসিক্ত রাষ্ট্রপতি, বললেন ‘মূল্য দিয়েছি অনেক বেশি’ তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন ও নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করছে জাতির অগ্রগতি ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত। দুদককে সততা ও সাহসের সঙ্গে দুর্নীতি দমনে কাজ করে যেতে হবে রাষ্ট্রপতি দীর্ঘদিনের বিচারাধীন মামলাগুলো আইনগতভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি ও দীর্ঘসূত্রিতা কমানোর জন্য দুদকের প্রতি আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি গুরুতর ও বৃহৎ দুর্নীতির ব্যাপারে দ্রুত অনুসন্ধান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেন। তিনি দুর্নীতিবিরোধী মূল্যবোধ গড়ে তুলতে জনসচেতনতা ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। রাষ্ট্রপতি দুর্নীতি দমন কমিশনকে তার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। কেএইচ/এমআইএইচএস
কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণে ১ হাজার ৯৪৪ জন শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এক হাজার ৬০৮ জনের। এরমধ্যে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২০৭ জন, ফেল থেকে পাস করেছে ৩৩৬ জন। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. মো. শফিকুল ইসলাম এ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। আরও পড়ুন সিলেট / খাতা চ্যালেঞ্জ করে জিপিএ-৫ পেলো ১২১ জন, নতুন করে পাস ১৮৬ শিক্ষাবোর্ড সূত্র মতে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ে বিভিন্ন বিষয়ের ৩৫ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী মোট ৯১ হাজার ৪৯৪টি উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য অনলাইনে আবেদন করে। এরপর পুনর্নিরীক্ষণে এক হাজার ৯৪৪ জন শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়। কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আহসান পারভেজ বলেন, পুনর্নিরীক্ষণের নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন করা উত্তরপত্রগুলো যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই শেষে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। ফল পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীরা ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন। জাহিদ পাটোয়ারী/এনএইচআর