মার্চের শেষে নেপালে ল্যাংট্যাং ট্রেকে গিয়েছিলাম। কথা ছিল ওই ট্রেকের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা, আনন্দের অভিজ্ঞতা আর রোমাঞ্চকর ঘটনা নিয়ে লিখব। কিছুটা লেখার পর দেখি, অভিযানের চেয়ে পাহাড়ি নদীর রূপ ও চঞ্চলতা নিয়েই লেখা হয়েছে বেশি। তখন লেখাটা ওখানেই থামিয়ে রেখে অন্য কিছু লেখালেখির কাজ শেষ করি। তারপর একটা দীর্ঘ ভ্রমণে চলে যাই আমেরিকা ও কানাডায়।
সেখানে বসেই নেপালের দুর্যোগের খবরটা পাই। খবরের সঙ্গে অথবা অন্যান্য মাধ্যমে যেসব ভিডিও ক্লিপ দেখি, তার পটভূমি, পর্বত, নদী ও তীরের জনপদ আমার মনে হয় চেনা। কিছু ভিডিওতে যা দেখি তা আগে কোনো দিন দেখা হয়নি। মনে হয় কৃত্রিম ও অবিশ্বাস্য। রাতে ঘুমাতে পারি না। ঘুমের মধ্যে ত্রিশূলী বা ল্যাংট্যাং নদীর গর্জন শুনে জেগে উঠি।
ট্রেকিংটা করেছিলাম গত বসন্তে, রডোডেনড্রন ফোটার সময়। অথচ পাহাড়ে তখন শীত ছিল। আকাশ পরিষ্কার থাকলে তুষারশৃঙ্গগুলো অসাধারণ উজ্জ্বল দেখাত। মনে হতো, এই পৃথিবীতে স্থিরতার কোনো চেহারা যদি থাকে, তবে তার নাম হিমালয়। এখন দেখছি, হিমালয়ের স্থিরতাও আসলে আমাদের দেখার বিভ্রম। আসলে পাহাড়ের ভেতরে সব সময় কিছু না কিছু ঘটছে। বরফ জমছে, বরফ গলছে। পাথর ভাঙছে। ঢাল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। হিমবাহ এগোচ্ছে, পেছাচ্ছে, বড় হচ্ছে অথবা গলে যাচ্ছে। নতুন পথ কাটছে নদী। পাহাড়ের শরীরের এই পরিবর্তন মানুষের জীবনের তুলনায় এত ধীর যে আমরা তাকে স্থিরতা বলে ভুল করি। তারপর কোনো একদিন সেই ধীর পরিবর্তন হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একটি বরফের অংশ ভেঙে পড়ে। একটি পাথরের ঢাল নড়ে যায়। একটি নদী বাধা পায়। তৈরি হয় জলাধার। তারপর সেই জলাধার ভেঙে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বহু বছরের পরিচিত ভূগোল বদলে যায়।

২৬ আগস্ট ঠিক এমনই এক ভয়াবহ রূপ আমরা দেখলাম।
খবরের ছবিতে ধ্বংস দেখা যায়। ধ্বংসের আগের জীবন দেখা যায় না। একটি বাড়ি ভেঙে গেল। সেই বাড়ির রান্নাঘরের গন্ধ মুছে যায়। দেয়ালে ঝোলানো ছবি? শিশুর বই? কাঠের দরজায় বছরের পর বছর হাতের ছাপ? বিকেলে বসে চা খাওয়ার জায়গা? এগুলো কোনো স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায় না। একটি লজ ভেসে গেলে আমরা দেখি তার টিনের চাল, কাঠ, মাটি ও পাথর। একজন ট্রেকারের কাছে সেই লজ হয়তো ছিল একটি রাতের আশ্রয়। লজ–মালিকের কাছে সেটিই ছিল সংসার। যে লজগুলো আমার ভ্রমণকাহিনির চরিত্র হয়ে উঠেছিল, সেগুলো এখন আমার কাছে মানুষ হয়ে উঠেছে। আমি লিখতে শুরু করেছিলাম—
‘লজের বারান্দায় ভেজা কাপড় শুকাতে দিই। পাশের দেশের অভিযাত্রীর সঙ্গে গল্প করি। শেখর বললেন, ল্যাংট্যাং উপত্যকা এভারেস্ট বেজক্যাম্পের চেয়েও বেশি সুন্দর। ওর কথা সত্য কি না জানি না।’
আমি লিখি—
‘নদীর পাশে ছোট্ট একটি লজে রাত কাটালাম।’
এখন সেই বাক্য লিখতে গিয়ে থমকে থাকি। ভাবি, কোন লজ? কোন নদী? কোথায় ছিল সেটি? এখনো আছে কি? খবর দেখতে চাই না, তবু রয়টার্সের খবর থেকে জেনেছি, রাসুয়া জেলার যে এলাকা থেকে ল্যাংট্যাং ট্রেক শুরু হয়, সেই সাব্রুবেসির ৫৫৯টি ভবনের ৪৩৩টিই ধ্বংস হয়ে গেছে। ২৬ আগস্ট সকাল থেকেই কয়েকবার আমার গাইড তেজ, নির্মল ও সন্তোষের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। অনেকটা সময় অচেতনের মতো হয়ে থাকি। জেগে উঠে আবার মার্চের ছবিগুলো খুলে বসি।

একটি ছবিতে পাহাড়ের ঢালে কয়েকটি বাড়ি। লামা হোটেল থেকে ফিরে আসার সময় নদীর কিনারে যে গেস্টহাউসটায় থেকেছিলাম, সেখানকার কোনো ছবি নেই। তবে নদীর ছবি আছে। সেতু আছে। পথের ধারে লজের বেঞ্চিতে বসে আছে অচেনা কোনো মানুষ। তখন ছবি তুলেছিলাম দৃশ্যের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে। সেই ছবিগুলোই এখন অন্য ভাবনা নিয়ে আসে। ছবির পেছনে যে পর্বতটি দেখা যাচ্ছে, সেটি থেকেই ধসে পড়েছে হিমবাহের টুকরা। ছবির নিচ দিয়ে যে নদী বয়ে গেছে, সেটিই এখন অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী। একটি সেতু, যার ওপর দিয়ে আমি হেঁটেছিলাম, তা এখন আর নেই। এভাবেই পুরোনো ছবি বদলে যায়।
স্থির ছবি অনেক কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে। ভিডিও পারে না। সেখানে পাহাড় নড়ে। জলধারা এগিয়ে আসে। পাথর গড়িয়ে আসে। মানুষ দৌড়ায়। কেউ চিৎকার করে। ক্যামেরা কেঁপে যায়। একটি মুহূর্তের মধ্যে বোঝা যায়, প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে যে দূরত্বটাকে আমরা নিরাপদ ভেবেছিলাম, তা আসলে ছিল খুবই সামান্য। কিছু ভিডিওতে ধ্বংসের গতি দেখে মনে হয়, পৃথিবী যেন কয়েক মিনিটের জন্য তার স্বাভাবিক নিয়ম ভুলে গেছে। আসলে পৃথিবী কোনো নিয়ম ভুলে যায়নি। আমরাই হয়তো তার নিয়মকে খুব সরল করে বুঝেছিলাম। ভেবেছিলাম পাহাড় মানেই নিরাপদ। নদী মানেই পথ। হিমবাহ মানেই বরফে ঢাকা সৌন্দর্য। আমরা বিপদের আশঙ্কাকে দৃশ্যের সৌন্দর্যের পেছনে সরিয়ে রেখেছিলাম।

পাঁচ–ছয় বছর পরপর একটি করে দুর্যোগ আসে, আর থমকে দাঁড়ায় নেপালের পর্যটনশিল্প। নতুন করে বিপর্যস্ত হয় আমাদের পরিচিত এজেন্সি, শেরপা ও গাইডদের জীবন। এবারের খবরের কোনো কোনো দৃশ্য ও কিছু তথ্য অবিশ্বাস্য লাগে। তেজকে আবার জিজ্ঞেস করি, ওরা সবাই কেমন আছে। কেমন আছেন লজ-দিদি, যিনি আমাকে উপত্যকা থেকে বিদায় জানানোর জন্য উত্তরীয় পরিয়ে দিয়েছিলেন। এমনটি আর কেউ করেননি কখনো। আর তারপর খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি সাব্রুবেসির খবর কি সত্য? কতটা ক্ষতি হয়েছে?
‘ইয়েস, সাব্রুবেসি কমপ্লিটলি কলাপসড,’ তেজের উত্তর শুনে আমার শরীর ও মন অবশ হয়ে যায়। আমি চুপ করে বসে থাকি। নদী ও পাহাড়ের দিকে মুখ করে থাকা একলা চেয়ার, সেলস-গার্ল, মেয়েটির বাবা, তিব্বতি প্রবীণার মুখের ভাঁজ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—সবকিছু মিশে থাকে আমার দুচোখ থেকে নেমে আসা দুই ফোঁটা জলে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (জিএসটি) গুচ্ছভুক্ত ভর্তি প্রক্রিয়ায় থাকা ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নতুন করে আরও দু-তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হতে পারে। এর মধ্যে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় ও মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদনের ওপর। গতকাল শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সভায় এবারের গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার মূল কমিটি গঠন করা হয়েছে। সভায় ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ভর্তি পরীক্ষা ও ভর্তি কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে। সভায় গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা উপস্থিত ছিলেন।সভায় জিএসটি গুচ্ছভুক্ত ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে একাধিক কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মূল কমিটির পাশাপাশি টেকনিক্যাল, ক্রয়, অর্থসহ বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হবে। এবারের ভর্তি পরীক্ষার মূল কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক এস এম হেমায়েত জাহান। সহ-আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম রব্বানী।এ বিষয়ে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার আহ্বায়ক পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক এস এম হেমায়েত জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের যে মিটিংটি হয়েছে, সেটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া শেষ করা। এ ছাড়া পরীক্ষাসংক্রান্ত যেসব কাজ ও আর্থিক বিষয় পেন্ডিং ছিল—কোন খাতে কী পরিমাণ খরচ হয়েছে বা হয়নি—সেসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে আগের কমিটির মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টিও এ সভায় আলোচনা করা হয়েছে।’বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণাঅধ্যাপক এস এম হেমায়েত জাহান বলেন, ‘পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণের পাশাপাশি টেকনিক্যাল, ক্রয়, অর্থসহ বিভিন্ন কমিটিসহ আরও কিছু কমিটি গঠন করতে হবে। নতুন কমিটির আহ্বায়কের সভাপতিত্বে খুব শিগগিরই এ বিষয়ে একটি সভা হতে পারে। সম্ভবত দু-এক দিনের মধ্যেই সভাটি হবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে তাদের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে। কৃষি গুচ্ছও তাদের পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে। তাই আমরাও চিন্তা করেছি, এই সপ্তাহের মধ্যেই সভা করে সবার মতামতের ভিত্তিতে দ্রুত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা।’ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে, নতুন যেসব বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, তারা গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় আসবে। কারণ, তাদের এখনো পরীক্ষা পরিচালনার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল বা সক্ষমতা তৈরি হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই তারা জিএসটি গুচ্ছে আসতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কারা কারা যুক্ত হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আলোচনা হয়নি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রস্তাব আমাদের কাছে আসেনি।’ঢাবি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ভর্তির আবেদন ১১ নভেম্বর থেকে, পরীক্ষা ৫ ডিসেম্বরগুচ্ছভুক্ত ২০ বিশ্ববিদ্যালয়ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে আবেদন শুরু ১২ নভেম্বর, পরীক্ষা শুরু ৮ জানুয়ারিজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি আবেদন শুরু ১৫ নভেম্বর
সারা দেশে তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধনে পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে দেশবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শিশুদের গ্যাজেট বা স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ে আগে থেকেই নানা আপত্তি আছে। অনেক দেশে আইন করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে এআইয়ের ব্যবহার। শিক্ষায় এআইয়ের ব্যবহার কীভাবে হবে, এর ইতিবাচক–নেতিবাচক প্রভাব, স্কুলে এআই ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নীতিও কেমন হতে পারে, তা নিয়ে লিখেছেন মুনির হাসানমুনির হাসান৪ সেপ্টেম্বর সকালে প্রথম আলো হাতে নিয়ে চোখে পড়ল নিউইয়র্কের মেয়রের একটি ঘোষণা। নিউইয়র্ক শহরের সরকারি স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী আগামী এক বছর এআই ব্যবহার করতে পারবে না। মেয়র জোহরান মামদানি বলছেন, শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার ক্ষমতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক রক্ষাই এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য। এক বছর পর এর প্রভাব মূল্যায়ন করে ঠিক করা হবে স্কুলে এআই ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নীতি।পড়তে পড়তে মনে পড়ল আগস্ট মাসের শুরুতে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ ম্যাথ ও সায়েন্স অলিম্পিয়াডের (বিডিএমএসও) এবারের আয়োজনের সময় অভিভাবকদের সঙ্গে কথোপকথনের কথা। একজন অভিভাবক তাঁর ছেলের গণিতের পারদর্শিতার কথা বলতে গিয়ে বললেন, তাঁর ছেলে যখনই কোনো অঙ্ক সমাধান করতে পারে না, তখন চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে সেটি ‘করে ফেলে’ বটে! বাচ্চাদের অঙ্কও তাহলে এখন চ্যাটজিপিটি করে দিচ্ছে। কিন্তু কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? শিশুরা ভুল না করলে কীভাবে শিখবেঅভিভাবকদের বলেছি, বাচ্চারা যখন কোনো অঙ্ক বা সমস্যা সমাধান করতে বসে, তখন তাদের একটু সময় দিন। না পারলে সঙ্গে সঙ্গে সমাধানটা বলে দেবেন না। এমনকি কীভাবে শুরু করতে হবে, সেটাও সব সময় বলে দেওয়ার দরকার নেই। বাচ্চাকে সমস্যার সঙ্গে একটু থাকতে দিন।সে হয়তো ভুল করবে। একভাবে চেষ্টা করে হবে না, অন্যভাবে করবে। ছবি আঁকবে, আঙুলে গুনবে। একটা রাস্তা ধরে কিছুদূর গিয়ে বুঝবে, এই পথে হবে না। আবার শুরু করবে। দশ মিনিট পরেও হয়তো উত্তর বের করতে পারবে না।এমনটা হলে আমাদের বড়দের তখন অস্থির লাগে। মনে হয়, আহা, এইটুকু বুঝতে পারছে না! একটু বলে দিলেই তো হয়।কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা অন্য রকম। একটা অঙ্কের সঠিক উত্তর বের করাটাই সব সময় শেখা নয়। উত্তর খুঁজতে গিয়ে শিশুটি যে অনুমান করছে, পরীক্ষা করছে, ভুল করছে, ভুলটা বুঝতে পারছে এবং নতুন একটা পথ খুঁজছে—শেখাটা অনেক সময় ঘটছে এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই।আজকে নিউইয়র্কের মেয়র মনে করিয়ে দিলেন এআইয়ের সময়ে এ কথাগুলোই নতুন করে জোরেশোরে ভাবতে হবে।এআই সাক্ষরতা: পাঞ্জাবের দৃষ্টান্ত থেকে বাংলাদেশ যা শিখতে পারেএআই এআই ডাক পাড়ি, মোদের এআই কার বাড়িপ্রশ্নের সঙ্গে থাকাটা কেন জরুরি কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের অনলাইন বাছাই পরীক্ষা ছিল। ইচ্ছা করে আমরা প্রতিটি ক্যাটাগরিতে এমন কিছু সমস্যা রেখেছি, যা কিনা সেই ক্যাটাগরির জন্য প্রযোজ্য নয়। আমরা দেখলাম, অনেক শিক্ষার্থীই এআই ব্যবহার করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিভাবকের সহযোগিতাতেই সেটি হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে কারও কারও ১৫ মিনিট সময়ও লাগেনি!এত কম সময়ে প্রশ্নগুলো ঠিকমতো পড়া, বোঝা, চিন্তা করা এবং উত্তর দেওয়া সম্ভব কি না, সেটিই একটি প্রশ্ন। মনে করার সংগত কারণ আছে, কোনো কোনো শিক্ষার্থী প্রশ্নের ছবি তুলে এআইকে দিয়েছে এবং পাওয়া উত্তরটি জমা দিয়েছে। প্রথম প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষার সততা নিয়ে। এভাবে বাছাই পরীক্ষা নেওয়া যাবে কী করে? ভবিষ্যতে আমাদের কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে? কিন্তু পরে আমার কাছে তার চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন মনে হয়েছে। শিশুটি প্রশ্নটির সঙ্গে থাকল কখন?১৫টি প্রশ্ন থেকে সে হয়তো ১৫টি উত্তর পেয়েছে। কিছু নম্বরও পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্নগুলো নিয়ে যদি তাকে ভাবতেই না হয়, তাহলে ওই ১৫টি প্রশ্ন থেকে সে কী শিখল?বাড়ির কাজে নম্বর বাড়ছে, শেখাও কি বাড়ছে?সম্প্রতি চীনের একটি বড় গবেষণা এ প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করেছে। সেখানে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ২৬ হাজার ৮১১ শিক্ষার্থীর ৩০ মাসের তথ্য গবেষকেরা বিশ্লেষণ করেছেন। দেখা যাচ্ছে, এআই ব্যবহারের পর বাড়ির কাজের নম্বর বেড়েছে ১৮ শতাংশ এবং বাড়ির কাজ করতে সময় কমেছে ৩০ শতাংশ। গণিত উৎসবে মন দিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে এক শিক্ষার্থী। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে দেখা যাচ্ছে একই শিক্ষার্থীর মাসিক পরীক্ষায় নম্বর ২০ শতাংশ কমেছে। বলা বাহুল্য পরীক্ষায় এআই ব্যবহারের সুযোগ নেই। চূড়ান্ত পরীক্ষাতেও একই ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বাড়ির কাজের খাতায় যে উন্নতি দেখা গেছে, তার সবটা শিক্ষার্থীর নিজের শেখায় রূপান্তরিত হয়নি। গবেষণাটি এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি, তবে সতর্ক হওয়ার মতো প্রশ্ন এটি অবশ্যই তুলেছে।শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রোডাক্টিভ স্ট্রাগল বা শেখার জন্য চেষ্টা করা বলে একটি ধারণা আছে। সব চেষ্টা অবশ্যই ফলপ্রসূ নয়। কোনো কিছু না বুঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা শেখা নয়। কিন্তু নিজের সামর্থ্যের একটু ওপরে থাকা সমস্যার সঙ্গে লড়াই করা, ভুল করা, ফিডব্যাক পাওয়া, আবার চেষ্টা করা—এ কষ্টটুকু শেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।এআইয়ের একটা বিপদ হলো, চাইলে সে এই মধ্যবর্তী অংশটুকুই নাই করে দিতে পারে। কারণ, সে সরাসরি উত্তর দিতে পারে। মাঝখানে প্রশ্ন বোঝা নেই, অনুমান নেই, ভুল নেই, আবার চেষ্টা করাও নেই। কাজ শেষ। শেখা?গণিত শেখা নিয়ে একটি গবেষণাআরেকটি গবেষণার কথা বলা যায়। পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা তুরস্কের নবম থেকে একাদশ শ্রেণির এক হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে গণিত শেখার একটি গবেষণা করেছেন। শিক্ষার্থীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল এআই ছাড়া প্রচলিত পথে অনুশীলন করেছে, দ্বিতীয় দল ব্যবহার করেছে চ্যাটজিপিটির মতো এআই। আর তৃতীয় দলকে দেওয়া হয়েছে একটি বিশেষভাবে উন্নয়নকৃত এআই টিউটর, যেটি সরাসরি উত্তর না দিয়ে সংকেত, পাল্টা প্রশ্ন করে। দেখা গেল অনুশীলনের সময় জিপিটি ব্যবহারকারীদের ফল এআই ছাড়াদের তুলনায় ৪৮ শতাংশ ভালো হলেও পরে এআই সরিয়ে পরীক্ষা নিলে তারাই এআই ছাড়াদের চেয়ে ১৭ শতাংশ খারাপ করেছে। অন্যদিকে তৃতীয় গ্রুপটি যারা কিনা এআই টিউটর ব্যবহার করেছে, তাদের ওপর এত নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। এই পার্থক্যটা আগামী দিনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।এ দুই গবেষণা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এআইকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এআই কি আমার হয়ে চিন্তা করছে, নাকি আমাকে চিন্তা করতে সাহায্য করছে? প্রথম ক্ষেত্রে এআই খুবই পটু, দক্ষ, উত্তর দেওয়ার মেশিন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠতে পারে একটি দক্ষ টিউটর বা চিন্তার সঙ্গী।শিশুর কাজ শিশুকেই করতে দিন। তাকে ভাবতে দিন। চিন্তা করতে দিন। এর মধ্যে দিয়েই সে শিখবে। চিন্তা করার কাজটাও এআইকে দিয়ে দিচ্ছি?বেশ কিছুদিন আগে করা ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটির) একটি ছোট গবেষণার কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। সে গবেষণায় তিনটি দলকে রচনা লিখতে দেওয়া হয়। একটি দল এলএলএম বা এআই ব্যবহার করেছে, দ্বিতীয় দলটি সার্চ ইঞ্জিন বা গুগল ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে তৃতীয় দলটি কোনো ডিজিটাল টুল ব্যবহার করেনি। রচনা লেখার সময় শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের কার্যাবলি লক্ষ করা হয়। দেখা গেল যারা কোনো ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করেনি, তাদের মস্তিস্ক অন্যদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। এমনকি এলএলএম ব্যবহারকারীদের নিজেদের লেখা পরে মনে করার ক্ষেত্রেও তুলনামূলক সমস্যা দেখা গেছে। গবেষণাটি ছোট ও প্রাথমিক বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়তো নেওয়া যায় না। কিন্তু আগের প্রশ্নটিই থেকে যাচ্ছে—কাজ সহজ করতে গিয়ে আমরা কি চিন্তা করার কাজটাও এআইকে দিয়ে দিচ্ছি?এ ক্রান্তিকালে শুধু শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের নিয়ম শেখালেই হবে না। শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভূমিকাও নতুন করে ভাবতে হবে। আগে সন্তান একটা অঙ্ক না পারলে হয়তো মা–বাবা পাশে বসে অঙ্কটা করে দিতেন। এখন আরও সহজ। মুঠোফোন বের করে ছবি তুলে এআইকে দিলেই হলো। দুই ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য ভালো। আমরা সন্তানকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু সাহায্য করা আর তার হয়ে কাজটা করে দেওয়া এক জিনিস নয়।একজন ভালো শিক্ষক সব সময় উত্তরটা বলে দেন না। তিনি হয়তো জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কীভাবে শুরু করার কথা ভাবছ?’ অথবা বলেন, ‘এই জায়গাটা আরেকবার দেখো।’ কখনো শুধু একটা ধারণা দেন। এআইয়ের ব্যবহারও হয়তো তেমন হতে পারে। কোনো অঙ্ক নিয়ে তাকে বলা যায়, ‘উত্তরটা বলে দিয়ো না। আমাকে একটা ধারণা দাও।’ নিজের সমাধান দেখিয়ে বলা যায়, ‘কোথায় ভুল করেছি, শুধু সেটা বলো।’ কিংবা বলা যায়, ‘আমাকে এমন একটা প্রশ্ন করো, যাতে পরের ধাপটা আমি নিজেই বের করতে পারি।’মূল চ্যালেঞ্জ এআই থেকে দূরে রাখা নয়শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করবে কি না, সেই বিতর্কের সময় সম্ভবত ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে। সে নিউইয়র্কের মেয়র যা–ই বলুন। তিনি স্কুলে ঠেকাতে পারলেও বাসায় ঠেকাতে পারবেন না। শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করছে এবং আরও বেশি করবে—বাড়ির কাজ করবে, বিজ্ঞান শিখবে, অঙ্ক করবে, রচনা লিখবে, প্রোগ্রামিং করবে।কাজেই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ এআই থেকে তাদের দূরে রাখা নয়। বরং এআই থাকার পরও চিন্তা করার অভ্যাসটা কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেটা নিয়ে ভাবা। বিডিএমএসওর সেই অভিভাবকদের কাছে ফিরে যাই। বাচ্চাটি একটা অঙ্ক নিয়ে বসে আছে। পারছে না। ভুল করছে। আঙুলে গুনছে। কাগজে আঁকিবুঁকি করছে। আপনার মনে হচ্ছে একটু বলে দিলেই তো হয়ে যায়।বলবেন না।উত্তর পেতে তার একটু দেরি হোক। কারণ, উত্তর পাওয়ার আগের ওই সময়টুকুতেই হয়তো তার আসল শেখাটা হচ্ছে।বাচ্চাকে অঙ্কটার সঙ্গে একটু থাকতে দিন।● মুনির হাসান প্রথম আলোর পরামর্শক ও বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি* মতামত লেখকের নিজস্ব