দেশের ব্যাংক খাতে কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন হিসাবের সংখ্যা ও জমার পরিমাণ উভয়ই বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে কোটিপতি হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি। একই সময়ে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা।
তবে কোটিপতি হিসাবের মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে আমানত কমেছে। বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা অর্থ বেড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টি। এর মধ্যে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে- এমন হিসাবের সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টি।
এর আগে মার্চ শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। সে হিসাবে তিন মাসে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চ শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে মোট জমা ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা।
কোটিপতি হিসাব বাড়লেও ব্যক্তি পর্যায়ে এর ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। জুন শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যক্তি শ্রেণির হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৭০১টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ৯০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা।
মার্চ শেষে ব্যক্তিশ্রেণির এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ৪০ হাজার ৬৩০টি। তখন এসব হিসাবে জমা ছিল ৯১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ তিন মাসে ব্যক্তি পর্যায়ে কোটিপতি হিসাব বেড়েছে ৭১টি। তবে এসব হিসাবে মোট আমানত কমেছে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের কোটি টাকার হিসাবের এই পরিসংখ্যানে ব্যক্তি হিসাবের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংকে জমা থাকছে।
বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন এবং বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার পরিবর্তে অর্থ ধরে রাখছে।
ফলে প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন, ব্যবসায়িক লেনদেনের অর্থ এবং সাময়িকভাবে অব্যবহৃত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবে আমানতের পরিমাণে।
অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি পর্যায়ে সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমেছে। ফলে ব্যক্তি শ্রেণির কোটিপতি হিসাবে আমানত কমলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকে অর্থ রাখার প্রবণতার কারণে সামগ্রিকভাবে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবে অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।
ইএআর/এমএএইচ/
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
জামালপুরের মেলান্দহে মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশের চার সদস্য। এসময় ধস্তাধস্তিতে একজন উপপরিদর্শকসহ (এসআই) চার পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় অভিযুক্ত আসামি ও তার স্ত্রীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টা দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন মেলান্দহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এটিএম মাহমুদুল হক। এর আগে সন্ধ্যায় উপজেলার শ্যামপুর ২ নম্বর চর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গ্রেফতার হওয়া এনামুল হক (৩০) উপজেলার ২ নম্বর চর এলাকার আব্দুল কুদ্দুছের ছেলে। তিনি একটি মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। তার স্ত্রীর নাম সবুজা বেগম (২৮)। পুলিশ জানায়, মেলান্দহ থানার এসআই হিমনের নেতৃত্বে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আওয়াল, এএসআই আবু রায়হান ও কনস্টেবল আবু তাহের ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এনামুল হককে গ্রেফতারে অভিযান চালান। এসময় এনামুল ও তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশ সদস্যদের বাধা দেন এবং ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। আরও পড়ুন পল্লবীতে বস্তাবন্দির ভিডিও ‘অপহরণ নাটক’, চট্টগ্রাম থেকে নজরুল উদ্ধার একপর্যায়ে আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। ধস্তাধস্তির সময় এসআই হিমন বাম হাতে আঘাত পান। এছাড়া অভিযানে অংশ নেওয়া আরও তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে তারা মেলান্দহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে স্থানীয়দের সহযোগিতায় এনামুল হক ও তার স্ত্রী সবুজা বেগমকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। মেলান্দহ থানার ওসি মাহমুদুল হক বলেন, মাদক মামলার পরোয়ানাভুক্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করতে গেলে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে চারজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তবে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আলাদা একটি মামলার কথাও জানান তিনি। হৃদয় আহম্মেদ/এসআর/এএসএম
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম হাঁটু প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স সার্জারি বিভাগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৬০ বছর বয়সী বিবিজান নামের এক রোগীর ক্ষতিগ্রস্ত হাঁটুতে কৃত্রিম হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, বিবিজান দীর্ঘদিন ধরে অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ভুগছিলেন। এতে তার হাঁটুর ক্ষয় গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়। একপর্যায়ে হাঁটু শক্ত ও বাঁকা হয়ে যাওয়া এবং তীব্র ব্যথার কারণে স্বাভাবিক চলাফেরায় সমস্যা দেখা দেয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তার হাঁটু প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রামেক হাসপাতালে প্রথমবারের মতো এ অস্ত্রোপচারে অংশ নেন অর্থোপেডিক্স সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আলমগীর হোসেন, ডা. মনোয়ার তারিক সাবু, ডা. সফিকুল ইসলাম, ডা. সাইদ আহমেদ, ডা. মাতিউল ইসলাম, ডা. সালেহীনসহ বিভাগের আরও কয়েকজন চিকিৎসক। অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, কৃত্রিম হাঁটু প্রতিস্থাপনের ফলে রোগীর হাঁটুর কার্যক্ষমতা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাসহ দৈনন্দিন কাজ করতে পারবেন। তবে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। আরও পড়ুন রাজশাহীতে এইচআইভি আক্রান্তদের ৬৬ শতাংশই সমকামী তিনি আরও বলেন, ‘এখন থেকে রামেক হাসপাতালে এ ধরনের অস্ত্রোপচার নিয়মিতভাবে চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের রোগীদের জন্য চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য হবে। হাঁটু প্রতিস্থাপনের জন্য তাদের ঢাকায় কিংবা বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমবে।’ ডা. মনোয়ার তারিক সাবু বলেন, ‘ঢাকায় নিয়মিত কৃত্রিম হাঁটু প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার করা হলেও রামেক হাসপাতালে এবারই প্রথম এ ধরনের অস্ত্রোপচার করা হলো। এখন থেকে হাসপাতালে নিয়মিতভাবে কৃত্রিম হাঁটু প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ মনির হোসেন মাহিন/এসআর/এএসএম
শান্তিনিকেতন থেকে নোবেল চুরির ঘটনার মধ্যে কেমন একটা সাহিত্য-সাহিত্য ভাব আছে। শুনতে খারাপ লাগে না।কল্পনায় নোবেলচোরকে ঠিক চোর চোর মনে হয় না, কেমন যেন সূক্ষ্ম শিল্পকর্মের প্রতি গভীর অনুরাগবিশিষ্ট প্রাণীবিশেষ মনে হয়। কারণ শান্তিনিকেতনের সঙ্গে নোবেল চুরির মতো জিনিস যায়; মুরগি চুরি যায় না।প্রায় সেই কায়দায় আমাদের হেয়ার রোডের মন্ত্রীর বাড়ির সঙ্গে সরকারি নথি বা কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার চুরির ঘটনা যতটা ভদ্রস্থ ও স্বাভাবিক শোনায়, ছাগলচুরি ততটা শোনায় না। না শোনালেও এই ঘটনা ঘটেছে বেশ আগে। তবে তার রেশ তো কাটেইনি, বরং তা আবার গাঁজিয়ে উঠেছে।উদ্ভূত পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে, নোবেলচোর আর ছাগলচোর এক না। এই কারণে নোবেল চোরের মতো ছাগলচোর মনের মধ্যে ‘মর্যাদার’ আসন পায় না। ছাগলচোর শুনলে মনের মধ্যে ছ্যাঁচ্চড় টাইপের কিছু লোকের বীভৎস ছবি ভেসে ওঠে।আমাদের দেশে হবে সেই ‘ছাগল’ কবে!দুটো ছাগল কালো, বাকিসব সাদা? ঘটনা হলো, ২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা থাকাকালে ড. আসিফ নজরুলের হেয়ার রোডের সরকারি বাংলো থেকে তাঁর ছোট মেয়ের একটি পোষা ছাগল উধাও হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।শোনা যাচ্ছিল, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে অপসারণে এনসিপির নেতারা জোরালো দাবি করেছিলেন। কিন্তু আসিফ নজরুল নাকি তাতে বাধ সেধেছিলেন।সেই কারণে এনসিপির নেতারা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন। রাগের চোটে তাঁরা তাঁর একটি ছাগল জবাই করে খেয়ে ফেলেন এবং একটি ছাগলের গলায় ‘চুপ্পুর অপসারণ চাই’ লেখা কাগজ ঝুলিয়ে রেখে যান।ওই সময় একটি টক শো’তে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের সঙ্গে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কথা হচ্ছিল। হুবহু কথাগুলো ছিল—নাসীরুদ্দীন : আসিফ স্যারের ছাগল খাওয়া হইছে রান্নাবান্না করে। এটা আমি শুনেছি।খালেদ মুহিউদ্দীন: সিরিয়াসলি? সিরিয়াসলি? আপনারা আসিফ নজরুলের ছাগল রান্নাবান্না করে খায়া ফেলছেন? এটা কি তাকে শিক্ষা দিতে? ইয়া করতে? মানে, কী করতে? আমি তো ভাবছিলাম এটা রেটোরিক্যাল।বদিউরের চোখে ‘ছাগল-কাণ্ডের’ মতিউরউচ্চবংশীয় ছাগল–কাণ্ড থেকে কথিত পিতার কাণ্ডনাসীরুদ্দীন : এটা অনেকে মনে করে যে, এটার মাধ্যমে আসিফ স্যার এটার মাধ্যমে শিক্ষা পাবে। আবার এটা অনেকে মনে করে যে, বাড়ির পাশে ছাগল থাকলে...হাহা হাহা...পরে আমি শুনছি নাকি তাকে (আসিফ নজরুলকে) একটা ছাগল কিনে দেওয়া হয়েছে এবং এটা নিয়ে উনি রাগ করেছেন। যেটাকে খাওয়া হয়েছে, সেটা নাকি কালো নাকি লাল ছিল...ওনাকে যেটা কিনে দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে রং মেলে নাই, সেজন্য নাকি উনি সে ছাগল নেননি। ফেরত দিয়েছেন।খালেদ মুহিউদ্দীন: কারা খেয়েছিলেন ছাগলটা?নাসীরুদ্দীন : আমি তো মন্ত্রীপাড়ায় থাকি না, তাদের পাড়াপ্রতিবেশিরা বলতে পারবেন। আসিফ নজরুল স্যারকেও আপনার জিজ্ঞাসা করতে পারেন।নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভাষ্য অনুযায়ী, যাঁরা ছাগলটি খেয়েছিলেন, তাঁরা ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি ছাগল আসিফ নজরুলকে দিতে চেয়েছিলেন।কিন্তু আসিফ নজরুলের মেয়ের পোষা ছাগলের গায়ের রংয়ের সঙ্গে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এনসিপির নেতাদের প্রস্তাবিত ছাগলটির গাত্রবর্ণের মিল না থাকায় তিনি তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন।আসিফ নজরুল বলেন, ছাগল চুরি নিয়ে যা ঘটেছে, তা তাঁর জীবনের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা।ওই ঘটনা সেখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি। দিন কয়েক আগে খালেদ মুহিউদ্দীনের শো’তে আসিফ নজরুল আসেন।সেখানে সংবিধান, গঠনতন্ত্র, বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের মতো অতি উচ্চমার্গীয় দুর্বোধ্য প্রসঙ্গের মাঠে সহজবোধ্য ঘাস খেতে খেতে সেই ছাগলটি ঢুকে পড়ে। তাঁদের কথোপকথন হুবহু ছিল এ রকম:খালেদ মুহিউদ্দীন: আপনার ওপর তারা (এনসিপি নেতারা) এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে আপনার শিশুকন্যার ছাগল প্রতিশোধ হিসেবে তারা খেয়ে ফেলেছে এবং তারা প্রকাশ্যেই এটা বলেছে।আসিফ নজরুল: ছাগল চুরি নিয়ে যা ঘটেছে, তা আমার জীবনের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা। এটা যদি কেউ আপনাকে বলে থাকে প্রতিশোধ হিসেবে করেছে, তাহলে তার মতো অমানুষ, তার মতো পিশাচ, তার মতো নির্মম, তার মতো খারাপ কোনো মানুষ হইতে পারে না।এ ছাগলটাকে কাটা হইছে কীভাবে সেটাও শুনতে হবে আপনার। পুরা ঘটনাটা তারা মজা করে করেছে। আমার বাচ্চাটা...তখন তার বয়স ছিল সাড়ে নয় বছর। সে যখন ফুলার রোড থেকে চলে যায়, হেয়ার রোডে তার বন্ধুবান্ধব কেউ ছিল না। সে প্রচণ্ড ট্রমাটাইজড হয়ে যায়। হেয়ার রোডে একা বাসা। তখন তাদের পালার জন্য ছাগলটা আমরা কিনে দিই এবং এই ছাগলটা প্রত্যেক দিন বসে থাকত, কখন সে স্কুলে যাবে। সে স্কুল থেকে আসার পর ছাগলটা তার সঙ্গে খেলত। ওর যে ফোন ছিল, সেখানে তার মায়ের ছবি বাদ দিয়ে ছাগলের সঙ্গে গলা জড়িয়ে ধরে থাকা ছবিটাকে সেভ করে রেখেছিল। ছাগলটাকে যখন খেয়ে ফেলা হয়, তখন আমার মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বমি করে দিচ্ছিল। দেড় দিন ধরে সে কিছু খেতে পারেনি। খুবই অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। আজ পর্যন্ত সে জানে না ছাগলটাকে খাওয়া হয়েছে। ভাগ্য ভালো সে টক শো দেখে না। আমরা বলেছি, ‘বাবা দরজাটা খোলা ছিল, ছাগলটা পালায়ে চলে গেছে।’খালেদ, আপনাকে আমি বলতে চাইনি। কিন্তু আপনি যখন বললেন, প্রতিশোধ হিসেবে..., তখন বলছি, ওর মতো ইতর, বদমাইশ, পাষণ্ড পশু আর কেউ নাই। এই ছাগলটাকে কাটা হয়েছে কীভাবে, এটাও শুনতে হবে আপনাকে। ছাগলটা যখন প্রথম বটি দিয়ে কাটে তখন কাটছিল না। তো অর্ধেক কাটা হয়েছে, তখন নাকি আপনার কারওরানবাজার থেকে ধারালো বটি এনে ছাগলটাকে কাটা হয়।লাখ টাকার বাগান ও দুই টাকার ছাগলছাগল বৃত্তান্ত২.আসিফ নজরুলের ছাগল ছাত্ররা খেয়েছেন—বিষয়টিকে স্নেহের চোখে দেখার সুযোগ এই সমাজে আছে। কারণ এ দেশে মুরগি বা ছাগল চুরি করে মজা করে খাওয়ার রেওয়াজ আছে।শুধু তা-ই না, সেই মুরগি বা ছাগল খাওয়ার পর এক ধরনের অধিকার আদায়ের গৌরব প্রচারের মতো করে মালিকের কাছে তা বুক ফুলিয়ে স্বীকার করার মধ্যে কোনো ধরনের সংকোচ না দেখানোর ঐতিহ্য এখানে অতি প্রাচীন। অনেক মহান নেতা ছোটবেলায় ছাগল চুরি করে খেয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।দক্ষিণ আফ্রিকার মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা পর্যন্ত শৈশবের ছাগল চুরি করেছেন। ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ শিরোনামের আত্মজীবনীতে সেই ঘটনার বিশদ বিবরণ তিনি দিয়েছেন। আর শৈশব-কৈশরের ডাব চুরি, মাছ চুরি, ফল চুরি আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই ‘ধুর বাদ দেন তো’ বলে উপেক্ষাযোগ্য অপরাধ। আসিফ নজরুলও বলেছেন, তাঁর ধারণা ছাগলটি এনসিপির নেতারা স্রেফ মজা করে খেয়েছেন। তাই তিনি এ নিয়ে কিছু বলতে চাননি।নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন: ‘আমি মনে করি যে আসিফ নজরুলের ছাগল একটা খাওয়া হয়েছে, কিন্তু দুইটাই খাওয়া উচিত ছিল।কিন্তু ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে ছাগলটি খাওয়া হয়েছে বলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দেওয়া স্বীকারোক্তি তিনি হজম করতে পারেননি।সে কারণেই তিনি বলেছেন, ‘আপনি যখন বললেন, প্রতিশোধ হিসেবে..., তখন বলছি, ওর মতো ইতর, বদমাইশ, পাষণ্ড পশু আর কেউ নাই।’আসিফ নজরুলের জবানিতে তাঁর মেয়ের ট্রমাটাইজড্ হয়ে যাওয়ার কথা যাঁরা শুনেছেন, তাঁদের কাছে ছাগল চুরির ঘটনা আর মজা করার মতো বিষয় থাকেনি। তারা মেয়েটার আহাজারির কথা শুনে কষ্ট পেয়েছেন।ধারণা করেছিলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আসিফ নজরুলের কথাগুলো শোনার পর দুঃখপ্রকাশ করবেন এবং মেয়েটার উদ্দেশে কোনো সান্ত্বনার কথা বলবেন।রাজনীতিক হিসেবে তাঁর দিক থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসার বিষয়টাই প্রত্যাশিত ছিল।কিন্তু নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন: ‘আমি মনে করি যে আসিফ নজরুলের ছাগল একটা খাওয়া হয়েছে, কিন্তু দুইটাই খাওয়া উচিত ছিল। এবং আসিফ নজরুল খুব ভালো মানুষ না। এবং গতকাল দেখলাম...উনি...ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট ছিল কত...এক বছর, দেড় বছর...এর মধ্যে উনি গরু ছাগল মুরগি পালা শুরু করছে। যেখানে গরু ছাগল মুরগি পালত, সেখানে পুলিশের সিকিউরিটিও দাঁড় করাইছে। তো আসিফ নজরুলের এটা যারা খাইছে, আমি মনে করি যে তাদের আরেকটাও খাওয়া উচিত ছিল।’নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এই আক্রমণাত্মক কথায় ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের আবদুল কাদেরের ছোটোবিবির কথা মনে পড়ে। ‘ছোটোবিবি সতিনকে উদ্দেশ করে “তোমার বুড়ার সম্পত্তিত হামি প্যাশাব করি, প্যাশাব করি” বলতে বলতে তার কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত সে এমনভাবে দোলায় যে মনে হয়, তার সংকল্পটি সে এক্ষুনি কার্যকর করতে যাচ্ছে।’নাসীরুদ্দীন যে উত্তেজিত অভিব্যক্তিতে আসিফ নজরুলের আরও একটি ছাগল খাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন, তার সঙ্গে ‘বুড়ার সম্পত্তিত হামি প্যাশাব করি’ বলে কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত দোলানি দিয়ে ‘নিজ সংকল্প এক্ষুনি কার্যকর করতে’ উদ্যত হওয়া ছোটোবিবির বিরল মিল দেখা গেছে। মনে হয়েছে, পারলে তিনি এখনই আসিফ নজরুলের দ্বিতীয় ছাগলটিকে খেয়ে ফেলতেন। ছাগলচুরির বিষয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যে তেমন কোনো লজ্জাশরম বা অনুশোচনা দেখা গেল না। বরং দুটো ছাগল না খেয়ে একটা খাওয়ার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট ছাগলচোরদের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে তাঁদের হৃদয় নিংড়ানো ধিক্কার জানিয়েছেন।নাসীরুদ্দীনের ছাগল চুরিবিষয়ক ‘অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস’-এর আসল কারণ হলো, বাংলাদেশে ছাগল আর শুধু ছাগল নেই।ছাগল এখন রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাগল এখন প্রতিবাদ। ছাগল এখন প্রতিশোধ। ছাগল এখন রাষ্ট্রচিন্তা। ছাগল এখন টকশোর বিষয়। ছাগল এখন রাজনৈতিক দর্শনেরও অংশ।শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সূচনার পেছনে ১৫ লাখ টাকা দাম ওঠা এক ঐতিহাসিক উচ্চবংশীয় রামছাগলের বিরাট ভূমিকা ছিল।আজ ছাগল নেই, বলিও নেই; কিন্তু মানুষের রাজনীতিতে স্কেপগোটের অভাব নেই। অর্থাৎ, ছাগল গেছে, ছাগলামি যায়নি। হেয়ার রোডের দুই ছাগলের একটিকে জবাই করে খাওয়া ও একটিকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ইয়োম কিপুরের কথা মনে করিয়ে দেয়।৩.প্রাচীন জেরুজালেমের মন্দিরে ইয়োম কিপুরের বিশেষ আচার হিসেবে দুটি ছাগল নেওয়া হতো। লটারির মাধ্যমে একটি নির্ধারিত হতো ঈশ্বরের উদ্দেশে বলির জন্য।অন্য ছাগলটির ওপর মহাযাজক ইসরায়েলিদের পাপের প্রতীকী দায় চাপিয়ে দিয়ে সেটিকে মরুভূমির দিকে পাঠিয়ে দিতেন। দ্বিতীয় এই ছাগলটি এস্কেপ করত বা চলে যেত বলে এটাই পরে ইংরেজিতে ‘scapegoat’ শব্দের উৎস হয়।অর্থাৎ সেখানে একটি ছাগল বলি হতো। আরেকটি হয়ে যেত ‘স্কেপগোট’—অর্থাৎ সবার পাপের দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে বিদায়।আজ ছাগল নেই, বলিও নেই; কিন্তু মানুষের রাজনীতিতে স্কেপগোটের অভাব নেই। অর্থাৎ, ছাগল গেছে, ছাগলামি যায়নি। হেয়ার রোডের দুই ছাগলের একটিকে জবাই করে খাওয়া ও একটিকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ইয়োম কিপুরের কথা মনে করিয়ে দেয়।আমাদের রাজনীতিতেও বলির পাঁঠার অভাব নেই। পার্থক্য শুধু এই-সেখানে একটি ছাগলকে বলি দেওয়া হতো পাপের দায় বহনের প্রতীক হিসেবে; এখানে কখনো ছাগলকে খাওয়ানো হয় রাজনৈতিক রাগের প্রতীক হিসেবে।রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ছাগলের যতটুকু শিং আছে, তাহাতে তাহার কাজ চলিয়া যায়, কিন্তু হরিণের শিঙের পনেরো আনা অনাবশ্যকতা দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়া থাকি।’নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ছাগল-সংক্রান্ত বক্তব্য সেই অর্থে এক বিরল রাজনৈতিক সম্পদ। কারণ, তাঁর বক্তব্য শুনলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ ছাগলের শিং নিয়ে যা বলেননি, সেটিও নাসীরুদ্দীন বলে গেছেন—শিংয়ের প্রয়োজন সামান্য, কিন্তু যথার্থ ছাগলের শিং দেখানোর আকাঙ্ক্ষাটা অসীম।সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক।sarfuddin2003@gmail.com