রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবারের মতো সিলেট যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে বিমানযোগে তার সিলেটে পৌঁছানোর কথা।
রাষ্ট্রপতিকে বরণ ও সংবর্ধনার জন্য সিলেটজুড়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। কয়েকদিন ধরেই চলছে নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সব মিলিয়ে নগরজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ।

সফরসূচি অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানযোগে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হবেন রাষ্ট্রপতি। বেলা সোয়া ১১টায় তাকে বহনকারী বিমানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। সেখান থেকে মোটর শোভাযাত্রাসহ বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে সিলেট সার্কিট হাউজে পৌঁছাবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে গার্ড অব অনার গ্রহণের পর দুপুর সাড়ে ১২টায় হযরত শাহজালাল (রহ.) ও দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন রাষ্ট্রপতি।
এরপর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নগর ভবনে সিলেট সিটি করপোরেশন আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠান শেষে সার্কিট হাউজেই অবস্থান করবেন তিনি। রাত ৮টায় বিমানযোগে ঢাকার উদ্দেশে সিলেট ত্যাগ করার কথা রয়েছে রাষ্ট্রপতির।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে সিলেট মহানগর পুলিশের পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মকর্তা ও ফোর্স মোতায়েন থাকবে। সফরের দিন এক হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আরও ২০০ সদস্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। এর বাইরে নিরাপত্তার অংশ হিসেবে কাজ করবে পুলিশের বিশেষ ইউনিটগুলো।
পুলিশ কমিশনার আরও জানান, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় সিলেট মহানগর পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। বিভিন্ন ভেন্যুতে পোশাকি পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে নগরের সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর ডিভাইডার, কিন ব্রিজ, সার্কিট হাউজসহ বিভিন্ন এলাকায় রং করা হয়। এছাড়া সিটি করপোরেশন এবং হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধণের কাজ করা হয়।
সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান ও বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি বহুবার সিলেটে এসেছেন, দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, বিভিন্ন সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এবার তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে সিলেটে আসছেন এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য গর্ব ও আনন্দের বিষয়।’
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির এই সফর সিলেটবাসীর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আমরা আশা করি, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার এই সফরের মধ্য দিয়ে সিলেটের মানুষের প্রত্যাশা ও দাবিগুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাবে।
সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সিলেট একটি পর্যটননগরী। রাষ্ট্রপতি যাতে সিলেটের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন এবং তার সফরকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতিতে কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। আমরা রাষ্ট্রপতিকে বরণ করতে প্রস্তুত। তার সফর উপলক্ষে সিলেট সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নাগরিক সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে আমরা রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে চাই।
আহমেদ জামিল/এফএ
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। যা হয়তো আপনি আজীবন কল্পনা করেছেন, স্বপ্নে দেখেছেন, কখনো জেগে থেকেও চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে চেয়েছেন, সেই স্বর্গের মতো সুখী জীবনটি যদি একদিন হঠাৎ আপনার দরজায় এসে দাঁড়ায়? ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, চারপাশটা ঠিক আগের মতোই আছে, অথচ আপনার ভেতরটা বদলে গেছে। বুকের ওপর জমে থাকা অদৃশ্য পাথরটি নেই, মাথার ভেতর ঘুরপাক খাওয়া দুশ্চিন্তাগুলো নেই, গতকালের কষ্টগুলো যেন অনেক দূরের কোনো গল্প। জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, পৃথিবীটা এত সুন্দর ছিল, অথচ এতদিন আপনি তা দেখতে পাননি। কীভাবে সম্ভব? কোথায় যাবেন? কী চাইবেন? চলুন, আজ কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতার হিসাবটা পাশে রেখে অনুভূতির এক ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। এখানে আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করবে না, আপনার কত টাকা আছে, কী হারিয়েছেন, কোথায় ব্যর্থ হয়েছেন, কিংবা জীবনে কতবার কেঁদেছেন। এখানে শুধু একটি প্রশ্ন, আপনি কী চান? বলুন, কী চাই? এক কাপ চা? নাকি গাঢ় সুগন্ধের কফি? অথবা এমন কোনো অমৃতের স্বাদ, যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো পানীয়ের তুলনা চলে না? আপনি যা চাইবেন, তাই যেন আপনার সামনে হাজির। চায়ের কাপটি হাতে নিতেই তার সঙ্গে মিশে যাবে ভোরের মাটির গন্ধ, দূরের পাখির ডাক আর এমন এক প্রশান্তি, যার কথা আপনি হয়তো বহুদিন ভুলে গেছেন। কফি চাইলে তার গন্ধে যেন পাহাড়ি সকালের উষ্ণতা। আর যদি সেই অমৃত চান, এক চুমুকেই মনে হবে, এতদিন যে স্বাদের খোঁজে ছিলেন, সেটি হয়তো আপনার জিভে নয়, আপনার স্মৃতির কোনো অচেনা কোণে লুকিয়ে ছিল। কোথায় যাচ্ছি, এখনই জানতে চাইবেন না। শুধু আমার সঙ্গে কয়েক পা হাঁটুন। চারপাশে অন্ধকার। এত গভীর অন্ধকার যে নিজের হাতটিও ঠিকমতো দেখা যায় না। কিন্তু ভয় পাবেন না। দূরে কোথাও অদ্ভুত এক আলো দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ঘন জঙ্গলের বুক চিরে কেউ যেন একটি পথ রেখে দিয়েছে। বাতাসে অচেনা ফুলের গন্ধ। কোথাও অদৃশ্য কোনো পাখি ডাকছে। পাতার ওপর শিশির জমে আছে। পায়ের নিচে নরম মাটি। যত এগিয়ে যাচ্ছেন, আলোটা তত পরিষ্কার হচ্ছে। আর হঠাৎ… জঙ্গল শেষ। আপনার সামনে খুলে গেল এমন এক দৃশ্য, যা হয়তো পৃথিবীর কোনো ছবিতেও পুরোপুরি আঁকা সম্ভব নয়। দূরে বরফে ঢাকা পাহাড়, তার নিচে নীলাভ হ্রদ। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে সরু জলপ্রপাত। আকাশে ভোরের প্রথম আলো। চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে নিজের হৃদস্পন্দনও শোনা যায়। আপনি থেমে গেলেন। আমি শুধু বললাম, “কেমন লাগছে?” আপনি হয়তো কোনো উত্তর দিতে পারবেন না। কারণ এমন সৌন্দর্যের সামনে ভাষা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। আপনি যদি বলেন, “আমি সমুদ্র দেখতে চাই।” চোখ ফেরাতেই পাহাড়ের জায়গায় দেখা যাবে অসীম নীল সমুদ্র। ঢেউ এসে আপনার পায়ের কাছে ভেঙে পড়ছে। নরম বালুর ওপর আপনি খালি পায়ে হাঁটছেন। বাতাসে লবণের গন্ধ, দূরে সূর্য ধীরে ধীরে জলের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। আপনি যদি বলেন, “না, আমি পাহাড়েই থাকতে চাই।” তাহলে আবার ফিরে আসবে সেই পাহাড়। কুয়াশা নেমে আসবে উপত্যকায়। দূরে কোনো কাঠের ঘর থেকে ধোঁয়া উঠবে। মনে হবে, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেকে আপনি বহু দূরে চলে এসেছেন। আর যদি বলেন, “আমি শুধু একটু শান্তি চাই।” তাহলে এবার কোনো দৃশ্য বদলাবে না। শুধু চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে থেমে যাবে। আপনি বুঝতেও পারবেন না কখন এই ভ্রমণটি আপনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা থেকে আপনার নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর দিকে নিয়ে গেছে। হঠাৎ মনে পড়বে সেই মানুষটির কথা, যাকে আপনি বহুদিন আগে হারিয়েছেন। সে হয়তো আপনার বাবা, মা, কোনো প্রিয় বন্ধু, কিংবা এমন কেউ, যার সঙ্গে আর কোনোদিন কথা বলা সম্ভব হয়নি। আপনি তাকিয়ে দেখবেন, সে আপনার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। আপনি তার হাত ধরবেন। কিছু বলার প্রয়োজন হবে না। হয়তো চোখের জলই অনেক কথা বলে দেবে। এখানে সময়ের কোনো দেয়াল নেই। অতীত আর বর্তমানের মাঝেও কোনো দরজা নেই। আপনি চাইলে ফিরে যেতে পারেন আপনার শৈশবে, সেই বয়সে যখন একটি বিকেলই ছিল আনন্দের জন্য যথেষ্ট। মাঠের ওপর দিয়ে দৌড়াবেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন, কাদায় পা ডোবাবেন, কোনো কারণ ছাড়াই হাসবেন। তখন বুঝতে পারবেন, সুখ কখনো খুব বড় কোনো জিনিস ছিল না। আমরা বড় হতে হতে তাকে জটিল করে ফেলেছি। এখানে আপনার কোনো দুঃস্বপ্ন নেই। আছে স্বপ্ন। কোনো ভয় নেই। আছে কৌতূহল। কোনো অভিযোগ নেই। আছে কৃতজ্ঞতা। আর কোনো তাড়া নেই। আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকার মতো যথেষ্ট সময় আছে। কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। এই পৃথিবীতে আপনি যত বেশি কিছু চাইবেন, তত বেশি কিছু আপনার সামনে আসবে না। বরং ধীরে ধীরে আপনি বুঝতে শুরু করবেন, আপনার আসল চাওয়া কত সামান্য। হয়তো আপনি আর প্রাসাদ চাইছেন না, শুধু এমন একটি ঘর চাইছেন যেখানে সন্ধ্যায় ফিরে এসে শান্তিতে বসতে পারেন। কোটি টাকা চাইছেন না, শুধু এমন কিছু মানুষ চাইছেন যারা আপনাকে ভালোবাসে। দীর্ঘ জীবন চাইছেন না, শুধু বেঁচে থাকা প্রতিটি দিনকে অর্থপূর্ণ করতে চাইছেন। হঠাৎ আপনি খেয়াল করবেন, আপনার পাশে যে মানুষটি এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল, সে আপনাকে বলছে, “তুমি এতদিন সুখ খুঁজতে কোথায় কোথায় গেলে? সুখ তো তোমার কাছেই ছিল।” আপনি অবাক হয়ে তাকাবেন। সে হাসবে। “তুমি শুধু দেখতে পাওনি।” হয়তো তখনই আপনার মনে হবে, এই জায়গাটি কোথাও বাইরে নয়। কোনো দূর দেশের পাহাড়ে নয়, কোনো বিলাসবহুল দ্বীপে নয়, কোনো রাজপ্রাসাদেও নয়। এই জায়গাটি আপনার নিজের ভেতরেই ছিল। শুধু দুঃস্বপ্ন, দুশ্চিন্তা, অভিমান, ভয় আর না-পাওয়ার হিসাব এত বেশি জায়গা দখল করে রেখেছিল যে, সেখানে সুখের জন্য একটু জায়গাও অবশিষ্ট ছিল না। তাই আজ, যখন মনটা খুব ক্লান্ত হয়ে যাবে, যখন পৃথিবীটাকে অসহ্য মনে হবে, যখন মনে হবে কেউ আপনাকে বুঝছে না, তখন একটু থামুন। চোখ বন্ধ করুন। গভীরভাবে শ্বাস নিন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, “আমি আসলে কী চাই?” তারপর উত্তরটির দিকে হাঁটতে শুরু করুন। আরও পড়ুন প্রবাসে বাংলাদেশের গর্ব হয়ে ওঠার সেই স্মরণীয় দিন হয়তো আপনি কোথাও যাবেন না। আপনার ঘরেই থাকবেন। আপনার চায়ের কাপটিও আগের মতোই থাকবে। জানালার বাইরের পৃথিবীও বদলাবে না। কিন্তু আপনি যদি নিজের ভেতরের দরজাটা একটু খুলে দেন, তাহলে দেখবেন, সেই দরজার ওপাশে একটি ছোট্ট পৃথিবী অপেক্ষা করছে, যেখানে আপনি আবার স্বপ্ন দেখতে পারেন। সেই পৃথিবীর প্রবেশমূল্য কত? কিছুই না। শুধু একটু সময়, একটু কল্পনা, আর নিজের প্রতি একটু মমতা। হয়তো এখানেই আমাদের এই স্বপ্নের ভ্রমণ থেকে ফিরে এসে একটু থামা দরকার। কারণ মানুষের জীবনে এমন সময় আসতেই পারে, যখন চারপাশের সব দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যায়। প্রিয় মানুষকে হারাতে হয়, নিজের ওপর বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়, দীর্ঘদিনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হয়। তখন মনে হতে পারে, আর কোনো পথ নেই। কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্য একটি কথা বলে। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, রাসুলুল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও এমন এক গভীর দুঃসময় এসেছিল। মক্কার সেই কঠিন সময়ে তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-কে, হারিয়েছিলেন তাঁর চাচা আবু তালিবকে, যিনি তাঁকে দীর্ঘদিন রক্ষা ও সমর্থন করেছিলেন। এরপর তায়েফে গিয়েও তিনি প্রত্যাখ্যাত ও নির্যাতিত হন। সেই সময়টিকে ইসলামী ঐতিহ্যে ‘আমুল হুযন’, অর্থাৎ দুঃখের বছর, বলা হয়। আর সেই গভীর সংকটের সময়ের পরই আসে ইসরা ও মিরাজের সেই মহান রাত, যে রাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-কে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে আসমানের উচ্চতম স্তরে নিয়ে যান। ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, এই অসাধারণ যাত্রার মধ্যেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধানও দেওয়া হয়। এখানে আমাদের জন্য একটি গভীর শিক্ষা আছে। মিরাজ আমাদের জন্য পুনরাবৃত্তি করার মতো কোনো ঘটনা নয়, কারণ এটি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মুজিজা। কিন্তু মিরাজের আগে যে অন্ধকার সময় এসেছিল, তার পরেও আল্লাহর পক্ষ থেকে যে আলো এসেছিল, সেই শিক্ষাটি আমাদের সবার জন্য। অন্ধকার মানেই পথ শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাতের পরেই মানুষের সামনে নতুন ভোরের দরজা খুলে যায়। যে দরজাটি আজ বন্ধ মনে হচ্ছে, তার ওপারে হয়তো এমন একটি পথ অপেক্ষা করছে, যার কথা আপনি এখনো কল্পনাও করতে পারছেন না। তাই দুঃস্বপ্নকে সত্যি বলে মেনে নেবেন না। দুশ্চিন্তাকে ভবিষ্যতের ভবিষ্যদ্বাণী ভাববেন না। আজকের ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ অধ্যায় মনে করবেন না। একটু থামুন। নিজের ভেতরে ফিরে তাকান। প্রার্থনায় দাঁড়ান। আশা ধরে রাখুন। আপনার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যান। আর মনে রাখুন, কষ্টের সময়টি আপনার পুরো জীবন নয়, এটি আপনার জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র। হয়তো আপনার মিরাজ হবে না। আমারও হবে না। কিন্তু আপনার জীবনে এমন একটি সকাল আসতেই পারে, যেদিন ঘুম থেকে উঠে আপনি দেখবেন, যে জীবনটাকে একসময় অসহ্য মনে হয়েছিল, সেই জীবনেই আবার আলো ফিরে এসেছে। আর তখন হয়তো আপনি পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলবেন, “সেদিন আমি ভেবেছিলাম সব শেষ। অথচ সেদিনই হয়তো আমার নতুন পথের শুরু হয়েছিল।” তাই চলুন, স্বপ্ন দেখা বন্ধ না করি। কারণ কখনো কখনো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে শুধু তার আজকের বাস্তবতা নয়, আগামী দিনের একটি সুন্দর সম্ভাবনার স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের দরজাটি হয়তো এখনো খোলা আছে। শুধু আপনাকেই সেখানে পৌঁছানোর জন্য আরেকটু পথ হাঁটতে হবে। রহমান মৃধাগবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com এমআরএম
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আলমগীর পেশায় রিকশাচালক। এত দিন প্রতিবার নাশতায় আলমগীরের খরচ হতো ২০ টাকা। এর মধ্যে বনরুটি ১০ টাকা, দুধ চা ১০ টাকা। কিন্তু গত রোববার থেকে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ টাকায়। কারণ, বাজারে বনরুটির দাম পিসপ্রতি ৫ টাকা বেড়েছে। রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকাতেই এখন বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বেকারির তৈরি খোলা পাউরুটি (বনরুটি) ও কেক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বাইরেও বেশ কিছু অঞ্চলে রুটি-কেকের দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশে ইসলামি ক্যালিগ্রাফি এখন আর কেবল আরবি অক্ষরের সৌন্দর্যচর্চা নয়, ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছে স্বতন্ত্র এক ভিজ্যুয়াল আর্টের পরিসর। শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া আর্ট অব ফেইথ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ২০২৬ সেই পরিবর্তনেরই একটি জোরালো প্রতিফলন। প্রদর্শনীটি শেষ হবে ১৬ সেপ্টেম্বর। ইসলামি ক্যালিগ্রাফি বলতে বাংলাদেশে একসময় বোঝাত আরবি ও উর্দু নির্দিষ্ট অক্ষরের চর্চা। মাত্র দুই দশকে সেই চর্চা বদলে গেছে অনেকখানি। ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং ও পেইন্টিং ক্যালিগ্রাফির নতুন ধারা তৈরি হয়েছে, রং ও তার প্রয়োগে নৈপুণ্যের প্রভাব বেড়েছে বহুগুণ। একসময় যে চর্চা সীমাবদ্ধ ছিল ড্রয়িংরুম আর ক্যালেন্ডারের পাতায়, তা এখন পৌঁছে গেছে পাবলিক ওয়ালেও। জুলাইয়ের গ্রাফিতি উৎসবে দেয়ালে দেয়ালে দেখা গেছে বাংলা ও আরবি ক্যালিগ্রাফির অনবদ্য ও শক্তিশালী প্রকাশ।মাধ্যমেও এসেছে বৈচিত্র্য। শিল্পীরা আর কাগজ-ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ নেই; চট, কাঠ, রেজিন, স্টিল, বুনন ও বৈদ্যুতিক লাইটিংয়ের ব্যবহারেও হাত পাকিয়েছেন। বিষয়বস্তুতেও ধর্মীয় বাণীর পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রসঙ্গ। অক্ষর থেকে পেইন্টিং, দেয়াল থেকে পাবলিক স্পেস, কাগজ থেকে বহুমাত্রিক মাধ্যম, নিছক ধর্মীয় অলংকরণ থেকে সমকালীন ভাবনা—এ যাত্রাই সম্ভবত গত দুই দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।মাত্র দুই দশকে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামি ক্যালিগ্রাফির চর্চা করেন এমন মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সহস্রাধিক। চাইলেই এখন ৫০-১০০ শিল্পীর প্রদর্শনী আয়োজন করে ফেলা যায়।রাজধানীর গ্যালারিগুলোতে সাধারণত যেসব আর্ট এক্সিবিশন হয়, তার তুলনায় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো বেশি। এর একটা কারণ সম্ভবত জাদুঘরের অবস্থান ও পরিচিতি। আরেকটা কারণ ধর্মীয় বিষয়বস্তুর প্রতি সাধারণ দর্শকের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ, যা প্রচলিত সমকালীন শিল্প প্রদর্শনীতে সব সময় দেখা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রদর্শনীর প্রচার হয়েছে ভালোভাবে, যা তরুণ দর্শকদের টেনে আনতে সাহায্য করেছে বলে মনে হয়েছে। পুরো গ্যালারি ছিল ছবিতে ভরা, অধিকাংশ দেয়ালে দুই সারি ছবি টানানো, কিছু অংশে তিন সারি ছবিও দেখা গেছে।আয়োজক সংগঠন ইসলামিক কালচারাল অর্গানাইজেশনের সভাপতি ইসমাইল হুসাইন জানালেন, ২০১ জন শিল্পীর ৩১০টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে এই প্রদর্শনীতে। নবীন-প্রবীণ শিল্পীর পাশাপাশি জায়গা পেয়েছে ২১ জন শিশুশিল্পীর কাজও।প্রদর্শিত শিল্পকর্মের বেশির ভাগই ইসলামি ক্যালিগ্রাফি। কোরআনের আয়াত, হাদিসের বাণী আর মনীষীদের কথামালা আরবি ও বাংলায় নানা রঙে ও নৈপুণ্যে চিত্রিত হয়েছে। কিছু নিসর্গচিত্রও ছিল প্রদর্শনীতে, তার মধ্যে কিছু রিয়েলিস্টিক, কিছু সেমি–রিয়েলিস্টিক, কিছু আবার সম্পূর্ণ বিমূর্ত।শিল্পী আনাস খান তাঁর স্টিলের শিল্পকর্মে ব্যবহার করেছেন আরবের সুগন্ধি। তাঁর ভাষ্য, ‘শিল্পকর্ম সাধারণত দেখার বিষয়, আমি চেয়েছি সুগন্ধির ব্যবহারে একে বিশেষায়িত করতে। সম্ভবত আমি সফল, দর্শনার্থীরা ভালোই উপভোগ করছেন।’ ঘ্রাণকে শিল্পের উপকরণ বানানোর এই সিদ্ধান্ত প্রদর্শনীর মাধ্যম-বৈচিত্র্যের সবচেয়ে সাহসী উদাহরণগুলোর একটি।নারী শিল্পীদের অংশগ্রহণও ছিল লক্ষণীয়। তাবাসসুম আম্বিয়া সামিরা, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ক্রাফট বিভাগে পড়েন, জানালেন শিল্পকর্মে বৈপ্লবিক থিমের ব্যবহার তাঁকে অন্য রকম অনুভূতি দেয়। তাঁর একটি ক্যানভাসে এঁকেছেন ফিলিস্তিনের পতাকা ও কেফিয়াহ, মাঝে ব্যবহৃত গ্রেনেটে ফুলগাছে ফুল ফুটে আছে। কেবল বিপ্লব বা প্রতিবাদ নয়, দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতিও তাঁর দরদ স্পষ্ট। আরেকটি কাজে এঁকেছেন জামদানির টেক্সচার ও চারপাশে অক্ষরের নানা শৈল্পিক উপস্থাপনা। ধর্মীয় ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতীক ও দেশীয় কারুকাজের এই মিশেল প্রদর্শনীর সবচেয়ে সমকালীন দিকটি স্পষ্ট করে তোলে।সিনিয়র শিল্পীদের মধ্যে অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার, আরিফুর রহমান, ইব্রাহীম মণ্ডল ও আমিনুল ইসলাম আমিনের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আমিনের একটি কাজ বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে। সাদা কাগজে কালো কলমের ক্রস-হ্যাচিং পদ্ধতিতে তিনি এঁকেছেন সুরা আর-রাহমানের সেই বিখ্যাত পুনরাবৃত্ত আয়াত, গোটা সুরাজুড়ে যা এসেছে ৩১ বার। এর বাংলা ভাবার্থ, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে। কেবল আয়াতের অর্থ নয়, রেখার প্রতিটি স্তর কীভাবে একটির পর একটি বসেছে তার কারুকাজেই বোঝা যায় ধৈর্য আর মনোযোগের কতটা বিনিয়োগ হয়েছে এই একটি কাজে।শিল্পী জোবায়ের আহমদ জামিলের কাজও আলাদাভাবে বলার দাবি রাখে। তিনি শিল্পকর্ম গড়তে রংতুলির ব্যবহারই করেননি। ছালার চট, টুকরা টুকরা কাঠ ও পাটের রশি দিয়ে গড়েছেন এক অসাধারণ কম্পোজিশন, যার সামনে মুগ্ধ হয়ে লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। মোল্লা হানিফ, উসাইদ মুহাম্মাদ, সুলতান আমানুর রহমান, সিফাতুল্লাহ, আব্দুর রহমান রুমি, ত্বাসীন ত্বাহা, ওসমান হায়াত, রেদওয়ান নুর, আজিজুল হক রিয়াজ, আবরারুল হক, আজমিরা মুনা, রাইসা তাসনিম, ইশরাত আমিনা, সাওদা ইসলাম, সুলতানা জয়নব ও মুশফিকা মেহেকের কাজও প্রশংসার দাবি রাখে, যদিও প্রতিটি নিয়ে আলাদা করে বলার সুযোগ এই স্বল্প পরিসরের লেখায় নেই।গত দুই যুগে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অনেক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী হয়েছে, তার অধিকাংশই আমার দেখা। বিষয়, মাধ্যম ও নৈপুণ্যের বৈচিত্র্যের বিচারে এই প্রদর্শনী আমার কাছে বিশেষ মনে হয়েছে। শিল্পীর সংখ্যা ও প্রদর্শিত শিল্পকর্মের পরিমাণ বিবেচনায়, আমার দেখা প্রদর্শনীগুলোর মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম বৃহৎ, বরং বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ইসলামি ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড়গুলোর একটি বলা যায়। বাংলাদেশি শিল্পীদের পাশাপাশি ভারতের দুজন শিল্পীও এবার তাঁদের শিল্পকর্ম পাঠিয়েছেন। আয়োজকদের আশা, আগামী বছর ঢাকায় তাঁরা আন্তর্জাতিক পরিসরে ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর আয়োজন করবেন।এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো শিল্পকর্মের সংখ্যা নয়, বরং ইসলামি ক্যালিগ্রাফিকে নিছক ধর্মীয় অলংকরণের গণ্ডি থেকে বের করে এক বিস্তৃত শিল্পভাষার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। এই ভাষা এখনো তার নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব, সীমা ও সম্ভাবনা খুঁজে চলেছে। তবে আর্ট অব ফেইথ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ২০২৬ দেখিয়ে দিল, সেই অনুসন্ধান ইতিমধ্যে অনেকখানি এগিয়েছে।