ম্যাক্স মূলত রাশিয়ার নিজস্ব ‘সুপার অ্যাপ’। এই অ্যাপে বিভিন্ন ধরনের সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। যা রাশিয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। তবে সম্প্রতি এক গবেষণা বলছে, নজরদারির জন্য ম্যাক্স অ্যাপ হলো সবচেয়ে চতুর এবং ভীতিকর এক মাধ্যম।

রাশিয়ায় গত দেড় বছরে দেশটির কয়েক কোটি মানুষকে তাদের মোবাইল ফোনে একটি নতুন অ্যাপ ইনস্টল করতে বাধ্য করা হয়েছে। রঙিন আইকনযুক্ত বার্তা আদান–প্রদান ও লেনদেনের এই অ্যাপটির নাম ‘ম্যাক্স’। তবে গবেষণা বলছে, এই অ্যাপ আসলে ব্যবহারকারীদের ফোনে নজরদারির ‘গোপন প্রবেশদ্বার’ হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে সরকারের নজরদারি চলছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ এই অ্যাপটিকে যোগাযোগের অ্যাপ টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের ‘দেশপ্রেমিক বিকল্প’ হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির নামীদামি তারকারাও তাঁদের র্যাপ ভিডিও এবং কমেডি শোতে এই অ্যাপের প্রচারণা চালিয়েছেন। ফলে চলতি গ্রীষ্মেই এটি রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপে পরিণত হয়েছে।
অ্যাপটি তৈরি করেছে রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি ‘ভিকোনতাকতে’। এই প্রতিষ্ঠানটি দেশটির সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। জানা গেছে, এই অ্যাপে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনেরও পরোক্ষ মালিকানা রয়েছে।
ম্যাক্স মূলত রাশিয়ার নিজস্ব ‘সুপার অ্যাপ’, যেখানে বিভিন্ন ধরনের সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। এটি এমন এক অ্যাপ, যার ভেতর একাধিক ‘মিনি অ্যাপ’ রয়েছে—যেগুলো রাশিয়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং সেবা, টেলিগ্রামের বিকল্প হিসেবে মেসেজিং সেবা এবং সরকারের নানা সেবা প্রদানকারী অ্যাপ।
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত সুপার অ্যাপ হলো চীনের ‘উইচ্যাট’, যা দেশটির সব ধরনের সেবার পাশাপাশি সরকারের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে উইচ্যাট যেখানে চীনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে বহু দশক ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে, সেখানে ম্যাক্সকে হঠাৎ করেই এমন এক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা একসময় অনেকটাই মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পেত।
সাম্প্রতিক এক ফরেনসিক গবেষণায় ম্যাক্সের ভয়াবহ নজরদারি ক্ষমতার বিস্তারিত চিত্র সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক রয়া এনসাফি বলেন, ম্যাক্স অ্যাপের ক্ষমতা মূলত প্রতিটি ব্যবহারকারীর ডিভাইসে থাকা পুরো মিনি অ্যাপ ইকোসিস্টেমে একটি ‘গোপন প্রবেশদ্বারের’ শামিল।
রয়া এনসাফি বলেন, ‘আমরা এক দশক ধরে রাশিয়ার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের তীব্রতা বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করেছি। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো তাদের নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাতে এযাবৎ যেসব কৌশল নিয়েছে, তার মধ্যে ম্যাক্স হলো সবচেয়ে চতুর এবং ভীতিকর একটি মাধ্যম।’ তিনি বলেন, ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ম্যাক্স হলো যেকোনো সরকারের জন্য অনুকরণীয় একটি নীলনকশা বা ব্লুপ্রিন্ট। এটি ইরান, কাজাখস্তান ও ভারতের মতো সরকারগুলো সামনে যা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে, তার এক অত্যাধুনিক রূপ প্রদর্শন করছে।
এনসাফির গবেষক দল রাশিয়ায় ব্যবহৃত অ্যাপটির একটি সংস্করণ ডাউনলোড করতে সক্ষম হয়। তাতে দেখা যায়, ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ডিভাইসের স্ক্রিনশট এবং এর মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি তুলতে পারে ম্যাক্স। এটি এসব মিনি অ্যাপে জমা থাকা সব তথ্য, বার্তা এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাবে প্রবেশ করতে সক্ষম। এমনকি ব্যবহারকারী টের পাওয়ার আগেই তার পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কাউকে বিভ্রান্তও করতে পারে অ্যাপটি।

এমনকি মিনি অ্যাপগুলোর ভেতর ক্ষতিকর কোড প্রবেশের সুযোগও রয়েছে ম্যাক্স অ্যাপে। এনসাফির মতে, এর অর্থ হলো রাশিয়ার সরকার চাইলে ম্যাক্সকে ব্যবহার করে সাইবার হামলাও চালাতে পারবে।
এই গবেষণা ম্যাক্সের নজরদারি ক্ষমতা নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে এনসাফি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে জানান, ব্যবহারকারীদের ফোনে যদি টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল করা থাকে, তবে অ্যাপটি সরাসরি সেগুলোতে ঢুকতে পারে না। যদিও রাশিয়া ইতিমধ্যে এই দুটি অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে।
রাশিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান বা এর সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মরত বহু নাগরিককে কার্যত ‘ম্যাক্স’ ব্যবহারে বাধ্য করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ এই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার জন্য চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ডিভাইসের স্ক্রিনশট এবং এর মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি তুলতে পারে ম্যাক্স। এটি মিনি অ্যাপে জমা থাকা সব তথ্য, বার্তা এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাবে প্রবেশ করতে সক্ষম।
মস্কোর একজন স্কুলশিক্ষক জানান, নগর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার পর তাঁদের স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের যোগাযোগের সব কাজ ম্যাক্সে স্থানান্তরিত করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘গত বছরের মার্চে আমাদের স্কুলের প্রধান আমাদের সরাসরি ডেকে বলেন, এখন থেকে সবকিছুই ম্যাক্সে হবে। এর মধ্যে অভিভাবকদের সঙ্গে চ্যাট, হোমওয়ার্ক পাঠানো এবং স্কুলের অন্য সব যোগাযোগও অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানে “না” বলার আসলেই কোনো সুযোগ নেই। তাই শেষ পর্যন্ত অ্যাপটি ব্যবহার করতেই হয়।’
সেন্ট পিটার্সবার্গের এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী দানিল। তিনি বলেন, শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে ম্যাক্স অ্যাপটি ডাউনলোড করতে বাধ্য হন। তাঁকে জানানো হয়েছিল, এই অ্যাপের মাধ্যমে তৈরি কিউআর কোড ছাড়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন বা হলে প্রবেশ করতে পারবে না।
দানিল জানান, অ্যাপটির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে তাঁর মনে সংশয় ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতে এর বাইরে কোনো বিকল্প ছিল না বললেই চলে।
কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর মতে, রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণির কাছে ম্যাক্স অ্যাপটির ব্যবহার কেবল লোকদেখানো। দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য তাঁরা এখনো টেলিগ্রাম ও সিগন্যাল অ্যাপ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছেন।
ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানান, তিনি ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু শুধু ম্যাক্স ব্যবহার করার জন্যই আলাদা ফোন কিনেছেন। আর আগের মতোই তাঁদের প্রধান ফোন এবং পছন্দের মেসেজিং অ্যাপগুলো দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে যাচ্ছেন। ‘এসবই লোকদেখানো। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেউ সত্যি সত্যি এটা ব্যবহার করে না’, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন ওই ব্যক্তি।
খবরের প্রধান উৎস হিসেবে রাশিয়ার মানুষের কাছে টেলিগ্রাম অ্যাপের জায়গা এখনো দখল করতে পারেনি ম্যাক্স। গণমাধ্যম, ব্লগার এবং সরকারি কর্মকর্তারা বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে সংবাদ ও মতামত পৌঁছে দিতে যে পাবলিক চ্যানেলগুলো ব্যবহার করেন, সেগুলো ম্যাক্সে এখনো তেমন উন্নত নয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে কয়েকজন ‘ম্যাক্স’ ব্যবহারকারী জানান, অ্যাপটির ডিজাইন এবং কাজের ধরন রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় বার্তা আদান–প্রদানের প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামের মতোই। তবে এর গোপনীয়তা এবং সম্ভাব্য নজরদারি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
মিনি-অ্যাপগুলোর মধ্যে ক্ষতিকর কোড প্রবেশের সুযোগও রয়েছে ম্যাক্স অ্যাপে। এনসাফির মতে, এর অর্থ হলো রাশিয়ার সরকার চাইলে ম্যাক্সকে ব্যবহার করে সাইবার হামলাও চালাতে পারবে।
মস্কোর ৩৪ বছর বয়সী বাসিন্দা নিকোলাই বলেন, ‘ম্যাক্স ব্যবহার করার সময় মনে হয়—আপনি জানেন না আর কে বা কারা আপনাকে নজরদারিতে রাখছে।’ অ্যাপটি দেখতে বেশ আধুনিক এবং আকর্ষণীয় হলেও নিকোলাই জানান, এটি ব্যবহারের সময় সব সময় একটা অশুভ অনুভূতির সৃষ্টি হয়। ‘অন্য অ্যাপগুলোর বিকল্প সুবিধা পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে এটি বেশি বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু তা–ও মনে হয় কোথাও যেন একটা বড় ভুল থেকে যাচ্ছে’, উল্লেখ করেন তিনি।
ম্যাক্সকে এত দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সাফল্যকে একটি ‘সতর্কবার্তাসূচক সংকেত’ হিসেবে দেখা উচিত বলে মনে করেন রয়া এনসাফি। চীন ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় ৩৫ বছর সময় নিয়েছে। অথচ রাশিয়া মাত্র এক দশকের মধ্যেই মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারকে পুরোপুরি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত–ব্যবস্থার মধ্যে বন্দী করে এই কঠোর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
রয়া এনসাফি বলেন, ‘পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, ব্যক্তিগত যোগাযোগের যে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো—তা–ও পরিবর্তিত হচ্ছে। আর কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর পক্ষ থেকে আসা এই আক্রমণাত্মক নিয়ন্ত্রণচেষ্টাও অত্যন্ত তীব্র।’
গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ম্যাক্স ও ভিকোনতাকতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের আট দফা যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে বলে সরকারকে হুঁশিয়ার করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলের আট দফা, নয় দফা, দশ দফায় পরিণত হতে পারে। আবার জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এটি এক দফায় পরিণত হতে পারে।আজ শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে রংপুরমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।লং মার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে আসা নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের আট দফা এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে। সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আগে সরকার যেন সাম্প্রতিক অতীত থেকে শিক্ষা নেয়। সেই শিক্ষা নিয়ে সরকার যেন জনগণের দাবি মেনে নেয়। দাবি মানতে ব্যর্থ হলে কোনো চোখ রাঙানিতে কাজ হবে না। বিরোধী দল কোনো কিছুতেই পরোয়া করবে না।বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ সফল হওয়ায় অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে। এর কিছু লক্ষণ গত দুই দিন ধরে রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে। তারা যেন হতাশ হয়ে মাথা গরম না করে জনতার দাবি মেনে নেয়।বিরোধী দল দলীয় কোনো দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামেনি উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ''আমরা ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। আজকে ১৮ কোটি মানুষ ১১ দলের সঙ্গে আছে। সেই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরব ইনশাল্লাহ।''সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চে দেশব্যাপী জোয়ার তৈরি হয়েছে। তাই সরকার সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন কথা বলছে। বিরোধী দলের লংমার্চ শান্তিপূর্ণ হবে বলে জানান তিনি।স্বাগত বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী দলের লংমার্চ শান্তিপূর্ণ হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন ও লড়াই চলবে।জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম ও দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম।আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) প্রমুখ।আট দফা দাবিতে রংপুর অভিমুখে ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চ আজ চট্টগ্রামের ছয় দাবি, রংপুরে আরও দুই৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চে ছয় দফা দাবি সামনে রেখেছিল ১১ দল। দাবিগুলো ছিল গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেল-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।রংপুরের কর্মসূচিতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি। অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির বিষয়গুলোর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের একটি আঞ্চলিক ইস্যুকেও সামনে এনেছে জোট। জোটের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের মানুষের দাবিকে বিবেচনায় নিয়েই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কর্মসূচির অংশ করা হয়েছে।সামনে আরও দুই লংমার্চ১১–দলীয় ঐক্যের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ হবে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা ও সিলেট—দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের দিকে ধারাবাহিক লংমার্চের কর্মসূচি নিয়েছে ১১–দলীয় ঐক্য।১১–দলীয় ঐক্যের সূত্রগুলো বলছে, লংমার্চ ও সমাবেশ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক দাবিগুলোকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি জুলাই সনদ মেনে সংবিধান সংস্কারে সরকারকে চাপেও রাখার বিষয়টিও আছে।লংমার্চ কর্মসূচি শেষ করে ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে ১১–দলীয় ঐক্য। তবে জোটের সূত্র বলছে, ঘোষিত চারটি লংমার্চ কর্মসূচি শেষে আরও কিছু বিভাগীয় শহরে লংমার্চ হতে পারে।
পুরোনো ইটের গায়ে কোথাও টেরাকোটার নকশা ক্ষয়ে গেছে, কোথাও জমেছে শেওলা। দেয়ালের আস্তরণ খসে পড়েছে, ক্ষয়ে গেছে ইটের সিঁড়ি। গাছের শিকড় নেমে এসেছে দেয়াল বেয়ে। নেই সুরক্ষিত সীমানাপ্রাচীর। অরক্ষিত এই পরিবেশের মধ্যেই কয়েক শ বছরের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটি।মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে খসে পড়া ইট ও বালু। ইটের সিঁড়ি বেয়ে দোতলা ও তৃতীয় তলায় ওঠা যায়। তবে ওপরের সিঁড়িগুলো এতটাই ক্ষয়ে গেছে যে প্রতিটি ধাপে পা ফেলতে হয় সাবধানে। দেয়ালের কারুকাজ ও টেরাকোটার অলংকরণের অনেকটাই সময়ের ক্ষয়ে মলিন হয়ে গেছে।১১ সেপ্টেম্বর সকালে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সীমান্তঘেঁষা সোনাবাড়িয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের অযত্নে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে ঐতিহাসিক শ্যামসুন্দর মন্দিরটি। স্থানীয়ভাবে এটি সোনাবাড়িয়া মঠ বা মঠবাড়ি নামেও পরিচিত। স্থাপত্যশৈলী ও ইতিহাসের দিক থেকে এটি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তিগুলোর একটি।দক্ষিণমুখী মন্দিরটির পূর্ব পাশের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই অন্ধকার। ভেতরে রয়েছে একাধিক কক্ষ। দ্বিতীয় তলায় দক্ষিণমুখী একটি কক্ষ এবং তিন দিকে টানা বারান্দা। দক্ষিণ অংশের দেয়ালে পাশাপাশি রয়েছে তিনটি দরজা। তৃতীয় তলায় মাঝখানে একটি কক্ষ, তার ওপরে গম্বুজ। প্রতিটি তলার চার কোণেও রয়েছে চৌকো গম্বুজাকৃতির ছোট ছোট কাঠামো।মন্দিরের পাশ দিয়ে স্থানীয় মানুষের চলাচলে তৈরি হয়েছে সরু কাঁচা পথ। সামনে ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটি পুরোনো পুকুর। পূর্ব কোণে মাটি ও গাছের শিকড়ে ভরা উঁচু একটি ঢিবি। দীর্ঘদিনের অযত্নে পুরো স্থাপনাটির চারপাশ অনেকটা জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছে।কলারোয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে সোনাবাড়িয়া গ্রাম। সাতক্ষীরা শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার। গ্রামের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি এই অঞ্চলের কয়েক শ বছরের স্থাপত্য ইতিহাসেরও সাক্ষী।২৫৯ বছরের পুরোনো মন্দিরস্থানীয়ভাবে সোনাবাড়িয়া মঠ বা মঠবাড়ি নামে পরিচিত হওয়ায় স্থাপনাটির অতীত নিয়েও নানা কথা প্রচলিত আছে। মিজানুর রহমানের ‘সাতক্ষীরার পুরাকীর্তি’ বইয়ে প্রাচীনদের কাছ থেকে পাওয়া একটি ভিন্ন মতের উল্লেখ রয়েছে। বইটির তথ্য অনুযায়ী, বুদ্ধদেবের শিষ্যরা এখানে একটি মঠ তৈরি করেছিলেন বলে একটি মত রয়েছে। তবে এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রচার এবং মানুষের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ কখনো সুবিধাজনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। একপর্যায়ে বুদ্ধদেবের শিষ্যরা সোনাবাড়িয়া ছেড়ে চলে যান। মঠটি কিছুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর হিন্দুরা এটি পুনর্নির্মাণ করে মন্দিরে রূপান্তর করেন বলেও মতান্তরে উল্লেখ রয়েছে।তবে বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিক সূত্রে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি নির্মাণ করা হয় ১৭৬৭ সালে। মন্দিরের গায়ে থাকা একটি প্রাচীন ইটের লিপির পাঠোদ্ধার করে সতীশ চন্দ্র মিত্র লিখেছেন, রামেশ্বরের পুত্র হরিরাম দাস শ্যামসুন্দর বিগ্রহের জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করেন। নির্মাণকাল ১৬৮৯ শকাব্দ, অর্থাৎ ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দ।সতীশ চন্দ্র মিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি একটি নবরত্ন মন্দির। নিচের তলার চার কোণে চারটি, দ্বিতীয় তলার চার কোণে চারটি এবং সর্বোচ্চ চূড়ায় একটি, মোট নয়টি রত্ন বা চূড়া নিয়ে এর নবরত্ন স্থাপত্যরীতি গড়ে উঠেছে।মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য শুধু নয়টি চূড়া বা তিনতলা কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষুদ্রাকৃতির ইট, টেরাকোটার অলংকরণ, খিলান দরজা, বাঁকানো কার্নিশ ও বিভিন্ন নকশায় এর বাইরের দেয়াল সাজানো ছিল। ভেতরে ছিল একাধিক কক্ষ ও প্রদক্ষিণের পথ।মিজানুর রহমানের ‘সাতক্ষীরার পুরাকীর্তি’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের নিচতলা বর্গাকার। ওপরের দুই তলা ক্রমশ সরু হয়ে উঠেছে। ফলে স্থাপনাটি অনেকটা পিরামিডের মতো। চূড়া পর্যন্ত এর উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। এতে ১৬টি কক্ষ, চারপাশে টানা বারান্দা এবং খিলানাকৃতির পাঁচটি প্রবেশদ্বার রয়েছে।সেবায়েতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একসময় মন্দিরে সোনার তৈরি রাধা-কৃষ্ণের প্রতিমা ছিল। দোলযাত্রার সময় তৃতীয় তলায় দোলনা ঝুলিয়ে সেই প্রতিমা দোলানো হতো।পুরোনো ইটের গায়ে কোথাও টেরাকোটার নকশা ক্ষয়ে গেছে, কোথাও জমেছে শেওলা। দেয়ালের আস্তরণ খসে পড়েছে, ক্ষয়ে গেছে ইটের সিঁড়িনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগমন্দিরের পাশের সোনাবাড়িয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা শ্রী মহাদেব কুমার বলেন, ‘আমি যখন ক্লাস টুতে পড়ি, তখন রতি ময়রা নামের ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের কাছে মন্দিরটির কথা জানতে চেয়েছিলাম। তিনিও বলেছিলেন, ছোটবেলা থেকে স্থাপনাটি এমনই দেখে আসছেন। একসময় সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। এরপর বহু বছর কেটে গেলেও আর কাজ হয়নি।’মন্দিরের পাশের বাসিন্দা আরতি দে বলেন, ‘সিঁড়িগুলো ভেঙে যাওয়ায় এখন মন্দিরের ওপরে ওঠা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আগে যে গেট দিয়ে ভেতরে যাওয়া যেত, সেটিও আর আগের মতো নেই। লোকমুখে শোনা যায়, এক রাতে কীভাবে যেন স্থাপনাটি নির্মাণ হয়েছিল। মন্দিরের সামনের পুকুরটিও পুরোনো। মন্দিরের চূড়া থেকে পুকুরের মধ্যে একসময় শিকল ছিল বলে শুনেছি। এখন তো ওসব কিছুই নেই।’বর্তমান অরক্ষিত অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে মন্দিরের সেবায়েতেরও। সেবায়েত সুব্রপ্রসাদ চৌধুরী বলেন, ‘মন্দির প্রাঙ্গণ সীমানাপ্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত করা দরকার। অরক্ষিত পরিবেশের সুযোগ নিয়ে এখানে অনেক সময় বখাটেরাও ঢুকে পড়ে। প্রতিবাদ করাটাও আমাদের জন্য ভয়ের। সংস্কারের পাশাপাশি মন্দিরের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি।’মহিদুল ইসলাম, খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক স্থাপনাটির বর্তমান কাঠামো, নকশা ও স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ করা হবে। এ বছরের মধ্যে প্রি-ডকুমেন্টেশনের কাজ শুরু করার চেষ্টা করব। ভবনটি বড় হওয়ায় কাজ ধাপে ধাপে করতে হবে।সংরক্ষণে লাগতে পারে দুই-তিন কোটি টাকামন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় রয়েছে। সম্প্রতি মন্দিরটি পরিদর্শন করেছেন খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মহিদুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্যামসুন্দর মন্দির সংরক্ষণে আমাদের ইচ্ছা আছে। আগে স্থাপনাটির বর্তমান কাঠামো, নকশা ও স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ করা হবে। এ বছরের মধ্যে প্রি-ডকুমেন্টেশনের কাজ শুরু করার চেষ্টা করব। ভবনটি বড় হওয়ায় কাজ ধাপে ধাপে করতে হবে।’মহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এটি সংরক্ষণে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, দুই থেকে তিন কোটি টাকার কমে মন্দিরটির সংস্কার করা সম্ভব হবে না। প্রথমে যেসব জায়গায় বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে, সেগুলো ঠিক করা হবে।’
দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকা, অর্থাৎ ৩৩ শতাংশই এখন খেলাপি। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি। এমন সংকটের মধ্যেও ব্যতিক্রম ১৩টি বেসরকারি ব্যাংক—এগুলোর প্রতিটিতে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে।ব্যাংকগুলোর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মতান্ত্রিক ও স্বাধীন ঋণ অনুমোদন, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই এবং বড় করপোরেট ঋণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) ও ভোক্তা ঋণে গুরুত্ব দেওয়ায় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।গত জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫ শতাংশের নিচে খেলাপি ঋণ থাকা ১৩টি ব্যাংকের সব কটিই বেসরকারি খাতের। এর মধ্যে নতুন প্রজন্মের ব্যাংক যেমন রয়েছে, তেমনি আছে প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকও। ব্যাংকগুলো হলো কমিউনিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক।আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরস এবং বিশ্বব্যাংকের খেলাপি ঋণ সূচকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ ঋণখেলাপির দেশ হলেও এই খাতে কিছু ব্যাংক এখনো করপোরেট সুশাসনের উত্তম চর্চা ধরে রেখেছে। এর ফলে এসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি যেমন মজবুত হয়েছে, তেমনি মুনাফায়ও তারা এগিয়ে রয়েছে। আর্থিক নানা সূচকে এগিয়ে থাকা ব্যাংকগুলোর আমানতও অন্যান্য ব্যাংকের চেয়ে উচ্চ হারে বাড়ছে। অন্যদিকে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণও কম।এর মধ্যে নতুন প্রজন্মের ব্যাংক যেমন রয়েছে, তেমনি আছে প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকও। ব্যাংকগুলো হলো কমিউনিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক।কম খেলাপি ঋণের ১৩ ব্যাংকবাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের শতকরা হারের দিক থেকে সবচেয়ে কম খেলাপি কমিউনিটি ব্যাংকের। নতুন প্রজন্মের এই ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণও কম। গত জুনের শেষে এই ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি ৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ।দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। গত জুন নাগাদ ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংক বর্তমানে দেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষ মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস–এর তৈরি করা বিশ্বের সেরা পারফর্মিং ৫০০ ব্যাংকের তালিকায় স্থান পেয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক।জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সুশাসন ও সঠিক ঝুঁকি মূল্যায়নই হচ্ছে প্রধান কাজ। এটিই হলো ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণের গুণগত মান ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি। কোনো অনৈতিক চাপ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আমরা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি।’খেলাপি ঋণ আদায় করে দেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আসছে নতুন আইনদেশে সবচেয়ে কম খেলাপি ঋণের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। গত জুনের শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছিল ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ওই সময় নাগাদ ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ৭২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা।এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই ব্যাংকের কোনো ঋণ আমার বা শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার একক পরামর্শ বা ব্যক্তিগত সুপারিশে দেওয়া হয়নি। সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঋণ অনুমোদন করা হয়। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়ও বিবেচনা করা হয়।’মোহাম্মদ আলী আরও বলেন, ‘ব্যাংকের অধিকাংশ বড় ঋণই খাদ্য ও খাদ্যসামগ্রী খাত, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক খাতে দেওয়া হয়েছে। ফলে আমাদের বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়েছে কম। আমরা এখন ভোক্তা খাতে গুরুত্ব বাড়াচ্ছি।’তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকা নতুন প্রজন্মের সিটিজেনস ব্যাংকে গত জুনের শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ।পঞ্চম অবস্থানে আছে প্রাইম ব্যাংক। গত জুনের শেষে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৪৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রেফাত উল্লাহ খানঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সুশাসন ও সঠিক ঝুঁকি মূল্যায়নই হচ্ছে প্রধান কাজ। এটিই হলো ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণের গুণগত মান ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি। কোনো অনৈতিক চাপ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আমরা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি।’প্রাইম ব্যাংকের পরের অবস্থানে, অর্থাৎ ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে সিটি ব্যাংক। গত জুনের শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ।জানতে চাইলে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিটি ব্যাংকের স্বাধীন ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বৈচিত্র্যময় ঋণের কারণে খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। এসএমই ও ভোক্তা ঋণ আমাদের বড় স্বস্তি দিচ্ছে। যেসব ব্যাংক এসএমই ও ভোক্তা ঋণ খাতে বেশি নজর দিচ্ছে, তারা ভালো করছে।’কম খেলাপি ঋণের হারে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক। গত জুনে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ।এরপর অষ্টম থেকে ১৩তম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে যমুনা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক। এর মধ্যে যমুনা ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, এনসিসি ব্যাংকে ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংকে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং সীমান্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলীএই ব্যাংকের কোনো ঋণ আমার বা শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার একক পরামর্শ বা ব্যক্তিগত সুপারিশে দেওয়া হয়নি। সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঋণ অনুমোদন করা হয়। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়ও বিবেচনা করা হয়।১০ ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত ৭২% খেলাপি ঋণবাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে গত জুনে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে ১০ ব্যাংকে খেলাপি ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ।খেলাপি ঋণের পরিমাণের হিসাবে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক। সর্বোচ্চ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে ব্যাংকটির, যা তাদের মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। একইভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা, যা তাদের দেওয়া মোট ঋণের ৭৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে একীভূত ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি।ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এ ছাড়া রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি।দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের সার্বিক বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) সাবেক এমডি আনিস এ খান প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ‘ব্যাংক খাতের উচ্চ খেলাপির মধ্যেও যেসব ব্যাংক ভালো করছে, তারা করপোরেট সুশাসনের উত্তম চর্চা করে যাচ্ছে। এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দিকে তাকালেও দেখা যায় তারা কেমন। গ্রাহকেরা এখন টাকা রাখার ক্ষেত্রে এমন বিষয়ই বিবেচনায় রাখেন। পাশাপাশি দক্ষ ব্যাংকাররা এসব ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ জন্য এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কম।’