‘বোন, এখানে কয়েক দিন ধরে ভয়ংকর গোলাগুলি হচ্ছে। থেমে থেমে গুলি চলে। আতঙ্কে আছি। থাকব না এখানে। দেশে চলে যাব।’
মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে ছোট বোন মঞ্জুরা বেগমকে মুঠোফোনে কথাগুলো বলেছিলেন পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে নিহত বাংলাদেশি রমজান আলী (৫২)। দেশে ফেরার প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর দেশে ফেরা হলো না তাঁর। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হওয়ার পর রমজানের লাশ এখন কোয়েটার একটি হাসপাতালে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা।
রমজান আলীর বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের নডালিয়া এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানে বসবাস করছিলেন তিনি। বেলুচিস্তানের পিশিন জেলার জিয়ারাত ক্রস এলাকায় কাস্টম হাউসে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট রাতে পিশিন জেলার জিয়ারাত ক্রসে কাস্টম হাউসে সন্ত্রাসীরা সমন্বিত হামলা চালায়। হামলায় ছয়জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মী ও একজন কাস্টমস কর্মকর্তা ছিলেন। পাল্টা অভিযানে ১০ হামলাকারী নিহত হয়। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনও এ তথ্য জানিয়েছে।
পরিবারের দাবি, নিহত ছয়জনের একজন রমজান আলী। তাঁর লাশ কোয়েটার একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রমজান তৃতীয়। ১৯৮৯ সালে ১৮ বছর বয়সে কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই তিনি পাকিস্তানে যান বলে জানান তাঁর স্বজনেরা। সেখানে বিয়ে করেননি। একাই থাকতেন।
রমজানের বোন মঞ্জুরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় রমজানের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ছিল। তিনি তাঁদের জন্য টাকা পাঠাতেন। তবে গত সাত-আট বছর পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল না। প্রায় ছয় মাস আগে আবার যোগাযোগ শুরু হয়।
মঞ্জুরা বলেন, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে একের পর এক হামলার ঘটনায় আতঙ্কিত ছিলেন তাঁর ভাই। দেশে ফেরার জন্য পাঁচ-ছয় মাস আগে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়। পরে তাঁর জন্মনিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে পরিবার।
রমজানের ভগ্নিপতি কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিএসবি) একজন উপপরিদর্শক তাঁদের ঠিকানা ও পরিবারের তথ্য যাচাই করেছিলেন। এরপর প্রতিবেদন পাঠানোর কথা ছিল। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই রমজানের দেশে ফেরার কথা ছিল।
মঞ্জুরা বলেন, মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে ফোন করে রমজান দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। তখন তাঁকে খুব আতঙ্কিত মনে হচ্ছিল।
মঞ্জুরা বেগম বলেন, তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে কোয়েটায় আরও কয়েকজন বাংলাদেশি থাকেন। তাঁদের একজন কক্সবাজারের বাসিন্দা ফোন করে রমজানের নিহত হওয়ার খবর দেন। এর পর থেকেই তাঁরা তাঁর লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন।
মঞ্জুরা বলেন, দেশে ফিরে ব্যবসা করার পরিকল্পনা ছিল রমজানের। এ জন্য প্রায় চার লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। বাড়ির লোকজনও তাঁর জন্য একটি দোকান ভাড়া করে রেখেছিলেন।
জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিএসবি) এসআই হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) থেকে রমজান আলীর ঠিকানা ও পরিবারের সদস্যদের তথ্য চাওয়া হয়েছিল। যাচাই করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এরপর কী হয়েছে, তা তাঁদের জানা নেই।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে পুলিশের কাছে কেউ সহযোগিতা চাননি। বিষয়টি তাঁদের জানা নেই।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফকরুল ইসলাম বলেন, পাকিস্তানে সীতাকুণ্ডের কোনো বাসিন্দা সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হওয়ার বিষয়ে তাঁকে কেউ জানায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি জানানো হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, রমজান আলী দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে বসবাস করছিলেন। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে ফেরার জন্য তিনি হাইকমিশনে আবেদন করেন। এরপর তাঁকে দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন ছিল। এর মধ্যেই তিনি মারা যান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, রমজানের লাশ বেলুচিস্তানের একটি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। লাশ দেশে পাঠানোর জন্য পাকিস্তান সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) পাওয়ার পর পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে লাশ দেশে পাঠানো হবে।
রমজানের ভগ্নিপতি কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, লাশ দেশে আনার জন্য তাঁরা পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ দেশে পাঠানো হবে বলে তাঁদের জানানো হয়েছে।
চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে রমজান তৃতীয়। ১৯৮৯ সালে ১৮ বছর বয়সে কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই তিনি পাকিস্তানে যান বলে জানান তাঁর স্বজনেরা। সেখানে বিয়ে করেননি। একাই থাকতেন।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
বাফুফের প্রফেশনাল লিগ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার কথা বাংলাদেশ ফুটবল লিগ এবং ২২ সেপ্টেম্বর ফেডারেশন কাপ। তবে মোহামেডান-আবাহনীসহ শীর্ষভাগ ক্লাব নিরবিচ্ছিন্ন খেলা চালানোর দাবিতে বাফুফেকে চিঠি দেওয়ায় আসিয়ান কাপের আগে ঘরোয়া ফুটবল শুরু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আসিয়ান কাপের পর নভেম্বরে আছে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। বেশ কয়েকটি ক্লাব মনে করছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পর ঘরোয়া ফুটবল শুরু হলেই ভালো। আবার কয়েকটি ক্লাব বলছে, ঘরোয়া ফুটবল শুরু হওয়া জরুরী। এমন অবস্থায় বেকায়দায় পড়েছে বাফুফে। কারণ, ক্লাবগুলো খেলতে না চাইলে কারো পক্ষেই ঘরোয়া ফুটবল শুরু সম্ভব না। তাই তো শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বাফুফের প্রফেশনালী লিগ ম্যানেজমেন্ট কমিটি সভায় বসছে ফুটবল মাঠে গড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে। একই দিন প্রফেশনাল লিগ কমিটি ফেডারেশন কাপের ড্র সম্পন্ন করে রাখবে। বিকেল ৪ টায় সভার পর ফেডারেশন কাপের ড্র হবে, খেলা যেদিনই শুরু হোক। এবার ফেডারেশন কাপে অংশ নেওয়ার জন্য লিগ কমিটি শীর্ষ ১৩ ক্লাবকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং সব ক্লাবই ফেডারেশন কাপে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ক্লাবগুলো হচ্ছে-মোহামেডান, আবাহনী, বসুন্ধরা কিংস, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, রহমতগঞ্জ, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, ফর্টিস এফসি, পুলিশ এফসি, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, সিটি ক্লাব, চট্টগ্রাম সিটি এফসি ও পিডব্লিউডি এসসি। আরআই/এমএমআর
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারাজের কাজ শুরু হবে। পদ্মা ব্যারাজ হলে শুধু রাজবাড়ী নয়, দেশের ২৪টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ সুফল পাবেন।আজ শুক্রবার দুপুরে পাংশার হাবাসপুরে কে রাজ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদমন্ত্রী এ কথা বলেন। সভায় যোগদানের আগে তিনিসহ অতিথিরা হাবাসপুরে প্রকল্পের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেন।শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ২৪টি জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। কৃষিতে বিপ্লব হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ও মাছের উৎপাদন বাড়বে।পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি পানিবিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০৪ সাল থেকে কারিগরি সমীক্ষা নিয়ে আমরা এগিয়ে এসেছি। আজ ২০২৬ সালে এসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) অনুমোদন পেয়েছে। আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।’প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বক্তব্য দিচ্ছেন। রাজবাড়ী, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬পদ্মা ব্যারাজকে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চ মাসের মধ্যে যেকোনো সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাবাসপুর এসে প্রকল্পটির উদ্বোধন করবেন। একই সঙ্গে তিনি পাবনার সুজানগরে গিয়েও এমন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সভা করবেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলে কৃষিবিপ্লব ঘটবে। আধুনিক প্রযুক্তির নানা সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হবে।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারাজের ৭৮টি স্পিলওয়ে (উপচে পড়া পানিনিষ্কাশনের পথ), ১৮টি আন্ডারস্লুইস (বাঁধের তলদেশে থাকা বিশেষ জলকপাট), দুটি ফিশ পাস (মাছের চলাচল পথ), নেভিগেশন লক ও বিশেষ পাইড বাঁধ থাকবে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের মাধ্যমে দুই ধাপে ২টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।পানামা খালের চেয়েও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে পদ্মা ব্যারাজসভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতার আঙ্গিকে পদ্মা ব্যারাজের ডিজাইন (নকশা) করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই পদ্মা ব্যারাজের ডিজাইন করছেন। আপনারা পানামা খালের কথা শুনেছেন, পানামা খালের চেয়েও বড় কায়দায় স্বয়ংসম্পূর্ণ পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হবে।’প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আজকের যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা হয়েছে। এ জন্য তিনি (প্রধানমন্ত্রী) কিন্তু আপনাদের সাথে ব্যথিত।’পদ্মা ব্যারাজের প্রস্তাবিত স্থান পাংশার হাবাসপুর এলাকা পরিদর্শন করেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ অতিথিরা। রাজবাড়ী, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬রাশেদ তিতুমীর আরও বলেন, ‘আজকে কিন্তু সারা দেশে একটা বড় সমস্যা—বেকার সমস্যা। সারা বাংলাদেশে অবহেলিত অঞ্চলের জন্য তিনি (প্রধানমন্ত্রী) কাজ করে যাচ্ছেন। আজ আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বলছি, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়ন করছি, হাওর অঞ্চলের উন্নয়নের কথা বলছি। শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে আপনারা জানুয়ারি মাসে একটা বড় রকমের পরিবর্তন দেখতে পারবেন, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানযোগ্য শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হবে।’হাবাসপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল মান্নান প্রামাণিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন-অর-রশিদ, কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আসলাম মিয়া প্রমুখ বক্তব্য দেন। এ সময় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম শাহাবুদ্দিন, জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত তা ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এই আইনের উদ্দেশ্য খুবই ইতিবাচক। অনেক মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হন। কাউকে কাউকে বাড়ি থেকেও বের করে দেওয়া হয়। নতুন বিধানটির লক্ষ্য হলো তাঁদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া।তবে আইনের উদ্দেশ্য ভালো হলেই তা কার্যকর হয় না। আইনে দেওয়া অধিকারটি কী, সেই অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করা যাবে এবং অধিকার লঙ্ঘিত হলে কোথায় প্রতিকার পাওয়া যাবে, সেটিও পরিষ্কার থাকা দরকার। সংশোধনীটির প্রধান দুর্বলতা এখানেই। মাত্র দুটি নতুন ধারা দিয়ে সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগের মতো জটিল বিষয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে আইনটির উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে।‘ভোগাধিকার’ বলতে কী বোঝাবেসংশোধনীতে জীবনকালীন ভোগাধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভোগাধিকার বলতে ঠিক কী বোঝাবে, তার স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। দাতা কি শুধু ওই সম্পত্তিতে বসবাস করতে পারবেন? নাকি তা ভাড়া বা ইজারা দিয়ে আয়ও করতে পারবেন? কৃষিজমি হলে তিনি কি তা বর্গা দিতে পারবেন? বাড়ি মেরামত, গাছ কাটা কিংবা জমির ব্যবহার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কে নেবেন?এগুলো শুধু আইনি বিতর্কের বিষয় নয়। বাস্তব জীবনে এমন প্রশ্ন উঠবেই। সংশোধিত আইনে মালিকানা ও ভোগদখলের সম্পর্ক খুব পরিষ্কার না থাকায় নামজারি, ব্যাংকঋণ, বিমা ও ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে।‘তৃতীয় পক্ষ’ কীভাবে জানবেদাতার ভোগাধিকার শুধু দাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার বিষয় নয়। ভবিষ্যৎ ক্রেতা, ব্যাংক, ভাড়াটে, বিমা কোম্পানি এবং ভূমি প্রশাসনও এর সঙ্গে জড়িত। দাতার ভোগাধিকারের তথ্য নামজারি ও খতিয়ানে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা না থাকলে একজন সম্ভাব্য ক্রেতা তা জানতে পারবেন না। গ্রহীতা তথ্য গোপন করে সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে পারেন। তখন ক্রেতা ও দাতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবেন। ক্রেতা হয়তো জানতেনই না যে সম্পত্তিতে অন্য একজনের ভোগাধিকার রয়েছে। একটি ঘটনা তখন একাধিক মামলার জন্ম দিতে পারে।এ কারণে নিবন্ধন আইনেও প্রয়োজনীয় সংশোধন দরকার। দাতা ও গ্রহীতার সম্মতি অথবা আদালতের অনুমতি ছাড়া এমন সম্পত্তির বিক্রয় দলিল যেন নিবন্ধিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সাবরেজিস্ট্রারের দায়িত্বও ঠিক করে দেওয়া দরকার। বিক্রয় দলিলে দাতার ভোগাধিকারের তথ্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত।ঋণ, নিলাম ও অধিগ্রহণের জটিলতাগ্রহীতা সম্পত্তি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চাইতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দাতার সম্মতি লাগবে কি না, তা বলা হয়নি। ঋণ পরিশোধ না করলে ব্যাংক সম্পত্তিটি নিলামে তুলতে পারে। তখন দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার টিকে থাকবে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। এই ফাঁকের অপব্যবহারও হতে পারে। সাজানো ঋণ ও নিলামের মাধ্যমে দাতাকে সম্পত্তি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সরকার সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলে ক্ষতিপূরণ কে পাবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু রেকর্ডে থাকা মালিক ক্ষতিপূরণ পেলে দাতা তাঁর জীবনকালীন নিরাপত্তা হারাতে পারেন। সম্পত্তি চলে গেলেও তার বদলে পাওয়া অর্থ থাকবে। সেই অর্থে দাতার অধিকার কী হবে, তা ঠিক করা দরকার। একই প্রশ্ন উঠবে বিমার ক্ষেত্রেও। আগুন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ি নষ্ট হলে বিমার টাকা কে পাবেন? ওই অর্থ দিয়ে আবার বাড়ি তৈরি করা হবে, নাকি গ্রহীতা তা নিজের মতো ব্যবহার করতে পারবেন? আইনে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।অধিকার আছে, কিন্তু দ্রুত প্রতিকার নেইসংশোধনীর আরেকটি অস্পষ্ট দিক হলো, দাতার অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। সন্তান দাতা অর্থাৎ তারা বাবা বা মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে তাঁরা কোথায় যাবেন? কোন আদালতে মামলা করবেন? কত দিনের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি হবে? দ্রুত দখল ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আদালত কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারবেন কি না—এসবের কিছুই স্পষ্ট নয়।সাধারণ দেওয়ানি মামলা শেষ হতে অনেক বছর লাগতে পারে। এরপর আপিলের সুযোগ থাকলে বিরোধ আরও দীর্ঘ হবে। জীবনকালীন অধিকার রক্ষার মামলা যদি দাতার মৃত্যুর পর নিষ্পত্তি হয়, তাহলে সেই অধিকার বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না। বৃদ্ধ দাতাকে যেন বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।যে ইতিবাচক উদ্দেশ্য নিয়ে আইনটি করা হয়েছে তা কার্যকর ও এর সুফল পেতে হলে উল্লেখিত ‘অস্পষ্টতা’ দূর এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হবে। আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর উচিত এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নসংসদে বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, সংশোধনীটি কোরআন-সুন্নাহ ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে এই আপত্তির শক্ত ভিত্তি আছে বলে মনে হয় না। সংশোধনীতে মুসলিম আইনের অধীন প্রচলিত ‘হেবা’ বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়নি। হেবাসহ আইনে স্বীকৃত অন্য পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগও বহাল থাকছে। নতুন আইনে শুধু আরেকটি পদ্ধতি যোগ করা হয়েছে।কোনো মুসলিম দাতা চাইলে হেবার প্রচলিত নিয়মে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। আবার চাইলে সন্তান, নাতি-নাতনি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার সময় নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে দিতে পারবেন। অর্থাৎ নতুন বিধানটি কাউকে ধর্মীয় পদ্ধতি ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে না।ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত কোনো বিষয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম যুক্ত করাও নতুন ঘটনা নয়। যেমন মুসলিম বিয়ের ধর্মীয় বৈধতার জন্য নিবন্ধন আবশ্যক নয়। কিন্তু নাগরিক অধিকার রক্ষা, বিয়ের প্রমাণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্র বিয়ে নিবন্ধনের বিধান করেছে। এ কারণে নতুন একটি দেওয়ানি পদ্ধতি চালু করাকে সরাসরি ধর্মবিরোধী বলা যুক্তিসংগত নয়।এই সংশোধনীর সামাজিক প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এর দুর্বলতাগুলো কাটানোর পথ নিয়েও আলোচনা করা দরকার। ● মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক * মতামত লেখকের নিজস্ব