উদ্দেশ্য অনিয়ম ঠেকানো। সরকারি সব প্রকৌশল সংস্থার জন্য একক দরতালিকা প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি।
সরকারি কেনাকাটায় একই পণ্যের দরে কতটা পার্থক্য হতে পারে, তার একটি উদাহরণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের বালিশ কেনা। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য ৬ হাজার ৯৫৭ টাকা থেকে শুরু করে ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত দামে বালিশ কেনা হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহারের জন্য একটি বালিশের দর প্রস্তাব করা হয় ২৭ হাজার ৭২০ টাকা।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাবে একেকটি গগলসের দাম ধরা হয় ৫ হাজার টাকা, হ্যান্ড গ্লাভস ৩৫ হাজার টাকা এবং রক্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষুদ্রাকার একটি টিউবের দাম ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। সরকারি কেনাকাটায় পণ্যের এমন অস্বাভাবিক দর নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। কিছু ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাও চলছে।
সরকারি প্রকৌশল সংস্থাগুলোর জন্য একক দরতালিকা প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি। এতে একই ধরনের নির্মাণকাজে দপ্তরভেদে আলাদা দর নির্ধারণের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন কমিটির সদস্যরা।
সরকারি কেনাকাটায় পণ্য ও উপকরণের দরের ফারাক কমাতে চায় সরকার। উদ্দেশ্য, অনিয়ম ঠেকানো। এ জন্য সব সরকারি প্রকৌশল সংস্থার জন্য একটি অভিন্ন দরতালিকা (রেট শিডিউল) করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব সরকারি সংস্থার নিজস্ব দরতালিকা নেই, তাদেরও নতুন তালিকা অনুসরণ করে পণ্য ও উপকরণ কেনাকাটা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারি প্রকৌশল সংস্থাগুলোর জন্য একক দরতালিকা প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি। এতে একই ধরনের নির্মাণকাজে দপ্তরভেদে আলাদা দর নির্ধারণের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন কমিটির সদস্যরা।
একক দরতালিকা মানে দেশের সব এলাকায় একই দরে কাজ করতে হবে, এমন নয়। দেশের দুর্গম, পাহাড়ি, উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যয় বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক (জোনাল) দর রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মূল দরকাঠামো এক হবে, তবে বিশেষ এলাকার অতিরিক্ত ব্যয় আলাদাভাবে বিবেচনায় আসতে পারে। যেসব সংস্থার একেবারে নিজস্ব কাজ থাকবে, সে জন্য আলাদা বিশেষ দরতালিকা নির্ধারণ করা থাকবে।
গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সরকারি নির্মাণকাজের দর তফসিল মূল্যায়ন করে পুনর্নির্ধারণ করতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে আহ্বায়ক করে ওই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, সব সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। কমিটি বেশ কয়েকটি সভা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারদর, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, ভ্যাট ও করহার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দরতালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা যেতে পারে। দরতালিকায় অন্তর্ভুক্ত সব নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নিয়মিত সংগ্রহ করে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে।
প্রতিটি সংস্থার ব্যবহৃত পণ্য ও উপকরণসামগ্রীর একক মূল্য বিবিএসের ওয়েবসাইটে থাকবে। সংস্থা তাদের নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী ওই একক দর ব্যবহার করে তাদের প্রকল্পের প্রাক্কলন করবে।
কমিটির সদস্যসচিব পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কবির আহামদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি কেনাকাটায় ইট, রড, সিমেন্ট বালুর মতো যেসব পণ্য ও উপকরণ সব প্রকৌশল সংস্থা সাধারণত ব্যবহার করে থাকে, সেগুলোর একক তালিকা থাকবে। আবার কিছু সংস্থার নিজস্ব কিছু কাজ থাকে, যেটা অন্য কারও থাকে না, তাদের জন্য আলাদা বিশেষ দরতালিকা নির্ধারণ করা থাকবে। তিনি বলেন, একক রেট শিডিউলের কাজ প্রায় শেষ। তারা শিগগিরই প্রতিবেদনটি একনেক সভায় তুলে ধরবেন।
সরকারের অনেক সংস্থার নিজস্ব কোনো দরতালিকা নেই। যেমন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, সেতু বিভাগ। কমিটি মনে করেছে, একটি অভিন্ন দরতালিকা থাকলে এ ধরনের বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে।
রেট শিডিউল হলো সরকারি নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য উপকরণ, শ্রম ও কাজের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত দরতালিকা। বর্তমানে কয়েকটি সরকারি সংস্থার নিজস্ব দরতালিকা রয়েছে। যেমন গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। যদিও এক সংস্থার সঙ্গে আরেক সংস্থার দরতালিকার কোনো মিল বা সমন্বয় নেই। আবার সরকারের অনেক সংস্থার নিজস্ব কোনো দরতালিকা নেই। যেমন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, সেতু বিভাগ। কমিটি মনে করেছে, একটি অভিন্ন দরতালিকা থাকলে এ ধরনের বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রেট শিডিউলকে স্থির কোনো দরতালিকা হিসেবে না রেখে বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা।
বিটুমিনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি মূল্য, শুল্ক, পরিবহন ব্যয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের মূল্য বিবেচনা করে দর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটি এমন একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরির সুপারিশ করেছে, যেখানে সব ব্যবহারকারী প্রবেশ করতে পারবে এবং সময়ের সঙ্গে দর পরিবর্তনের তথ্য হালনাগাদ করা যাবে।
কমিটি প্রতিবেদনে বলেছে, নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয়, কর, আয়কর এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনায় দর নির্ধারণ করা হবে।
কমিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্মাণ ব্যয়ের ওপর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়েছে। প্রতিবেদনে ২০২০ সালে প্রতি ডলারের গড় মূল্য ৮৪ টাকা থেকে ২০২৬ সালের চলতি সময়ে ১২২ টাকায় ওঠার হিসাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একইভাবে নির্মাণশ্রমিকদের মজুরি ও শ্রমের মূল্যও বেড়েছে বলে কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটি নির্মাণকাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর বাজার পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করেছে। পাথরের ক্ষেত্রে দেশে বার্ষিক চাহিদা, আমদানি, পরিবহন এবং বিভিন্ন উৎসের দামের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একইভাবে বালুর স্থানীয় বাজারদর, পরিবহন ব্যয় ও ব্যবসায়ীদের মুনাফা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিটুমিনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি মূল্য, শুল্ক, পরিবহন ব্যয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের মূল্য বিবেচনা করে দর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটি এমন একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরির সুপারিশ করেছে, যেখানে সব ব্যবহারকারী প্রবেশ করতে পারবে এবং সময়ের সঙ্গে দর পরিবর্তনের তথ্য হালনাগাদ করা যাবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো কোনো সংস্থা কখনো নিজেরা কমিটি গঠন করে বাজারমূল্য দেখে পণ্য ও উপকরণের দাম নির্ধারণ করে। আবার কখনো কখনো আগের বছরের পণ্যের দাম তুলনা করে মূল্যস্ফীতি দেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে থাকে। এ কারণে একেক সংস্থার পণ্যের দাম ভিন্ন ভিন্ন হচ্ছে। যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আইসিটি বিভাগের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের দাম নির্ধারণে কোনো দরতালিকা নেই।
তবে পণ্য কেনাকাটায় একক ও অভিন্ন দাম নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন না বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, সমস্যার শিকড়ে যেতে হবে। সরকারি নির্মাণকাজের অনিয়ম ঠেকাতে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও ক্রয় বিধি (পিপিআর) পুরোপুরি অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) মাধ্যমে পুরো কেনাকাটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। মূলত সেখানে সংস্কার আনতে হবে। তাহলে পণ্য কেনাকাটায় অনিয়ম কমবে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
দীর্ঘ দুই বছর পর আবারো বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মুখর হয়ে উঠল শান্ত তিতাস নদী। শরতের পড়ন্ত বিকেলে নৌকাবাইচকে ঘিরে উৎসবে মেতে উঠলেন নদীর দুই পাড়ের লাখো মানুষ। বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের গর্জন আর দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে সৃষ্টি হয় বর্ণিল উৎসবের আবহ। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের আয়োজনে তিতাস নদীতে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে সদর উপজেলার ক্ষমতাপুর গ্রামের শাপলা বয়েজ ক্লাবের নৌকা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০২৩ সালে তিতাস নদীতে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভরা তিতাসে নৌকাবাইচ ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাসীর প্রাণের উৎসব হিসেবে পরিচিত। এ আয়োজনকে ঘিরে জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে। শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতা শুরু হলেও দুপুরের আগেই তিতাসের দুই তীরে দর্শনার্থীদের ভিড় জমতে থাকে। প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর মুহূর্তেই শিমরাইলকান্দি থেকে মেড্ডা পর্যন্ত নদীর দুই তীর পরিণত হয় জনসমুদ্রে। জেলা শহরের শিমরাইলকান্দি থেকে মেড্ডা এলাকার তিতাস নদীর অংশে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ৯টি নৌকা অংশ নেয়। বাহারি রঙের নৌকা নিয়ে মাঝিদের বৈঠার ছন্দে একে অন্যকে পেছনে ফেলার লড়াই শুরু হলে তিতাসপাড়ে তৈরি হয় টানটান উত্তেজনা। দুই তীরে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা প্রতিযোগিতা উপভোগের পাশাপাশি নিজেদের পছন্দের নৌকার পক্ষে উচ্ছ্বাস ও সমর্থন জানান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবুসাঈদ বলেন, নৌকাবাইচ এখানকার মানুষের প্রাণের উৎসব। আগামী বছর থেকে আরও জমজমাটভাবে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জি. খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও এখানকার সংস্কৃতি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। নৌকাবাইচের মতো আয়োজনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি সাংস্কৃতিক রাজধানী। নৌকাবাইচ এ অঞ্চলের ঐতিহ্যের অংশ। মানুষ প্রতিবছর এ আয়োজন দেখতে চায়। আগামী বছর থেকে নিয়মিতভাবে নৌকাবাইচ আয়োজন করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। পরে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রঞ্জন চন্দ্র দে, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মোবারক হোসেন, জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জহিরুল হক, সাবেক সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আবুল হাসনাত মো. রাফি/এফএ
চামড়ার বেল্ট দিয়ে স্বামী পেটাচ্ছেন। পাশের কক্ষে সন্তানদের কান্নাকাটি। স্বামীর অভিযোগ অস্বীকার করেও মারের হাত থেকে নিস্তার পাচ্ছিলেন না। গত সপ্তাহে এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী ওই নারীর নাম মুক্তা ইসলাম। তাঁর মৃত্যুর পর এই ভিডিওটি সম্পর্কে জানা যায়।এই ঘটনার আলোচনা শেষ না হতেই নির্যাতনে আল মাইদা আক্তার (২০) নামে আরেক নারীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর মাইদাকে মৃত ঘোষণা করা হলে পালিয়ে যান স্বামী মো. সিয়াম আল মুরসালিন আকাশ (৩০)। স্থানীয় লোকজন পরে তাঁকে আটক করে পুলিশে দেয়। পরিবারটির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৃত্যুর দুদিন আগে মারধরে জখম হওয়ার ছবি খালাতো বোনের কাছে পাঠিয়েছিলেন মাইদা। গালে ব্যান্ডেজ, চোখ ফোলা। মাইদা বলেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মারছে।’মুক্তা ইসলামকে নির্যাতনের একটি ভিডিও তাঁর ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠিয়েছিলেন স্বামী সোহেল শিকদার। সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানো হচ্ছে। পাশের কক্ষে সন্তানদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ মারতে মারতে সোহেল বলছিলেন, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসায় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।কম সময়ের ব্যবধানে দুটি মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার দুটি থেকে জানা যায়, দুই নারীই স্বামীর কাছে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতন সহ্য করে তাঁরা সংসার করতেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হলো তাঁদের পরিণতি। পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাকে অপরাধ না ভেবে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার কারণে নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন নারী অধিকারকর্মীরা।এদিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এর কলের হিসাব অনুসারে, নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর মধ্যে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগই বেশি। এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আট মাসে হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্ত করা, আত্মহত্যার প্ররোচনা, আটকে রাখা, স্বামী, মা-বাবা ও অন্যদের হাতে নির্যাতন, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনসহ নানা অভিযোগে নারী নির্যাতনের মোট কল এসেছে ২৭ হাজার ৯১১টি। এর মধ্যে স্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগ ১৭ হাজার ১৯৬টি। অর্থাৎ মোট অভিযোগের প্রায় ৬২ শতাংশ স্বামীর বিরুদ্ধে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের কল এসেছে ৭০টি। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মোট কলের মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ।সন্তানদের কারণে সংসার ছাড়তে চাইতেন না মাইদাসিয়ামদের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের শালমারা গ্রামে। আর মাইদার মায়ের বাড়ি সাদুল্লাপুর উপজেলার ইদিলপুরে। প্রেমের সম্পর্ক থেকে ২০২১ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে চার ও এক বছর বয়সী দুটি ছেলেসন্তান রয়েছে। মাইদা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। দুই ভাই–বোনের মধ্যে মাইদা ছিলেন ছোট। তাঁর ভাই চীনে পড়াশোনা করছেন। বাবা শাহাজাদা মিয়ার মৃত্যুর পর মা মোছা. রহিমা খাতুন (৪৮) ভূমি অফিসে দলিল লেখার কাজ করে দুই সন্তানকে বড় করেন।গতকাল মুঠোফোনে ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না মা রহিমা খাতুন। তিনি আহাজারি করে বলছিলেন, বিয়ের পর থেকেই তাঁর মেয়েকে মারধর করতেন সিয়াম। এ নিয়ে একবার সালিসও হয়েছিল। ওই সময় সিয়াম তাঁকে বলেছিলেন, ‘পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর একটু সমস্যা হতেই পারে। এসব মেনে নিতে হবে।’রহিমা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তাঁকে জামাতা ফোন করে বলেন, মাইদা অসুস্থ। এখন পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তিনি হাসপাতালে গিয়ে দেখেন মেয়ে বেঁচে নেই। জামাতা লাশ রেখে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছেন। মেয়েকে হত্যার অভিযোগে রহিমা জামাতা সিয়ামসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে শুক্রবার পলাশবাড়ী থানায় মামলা করেছেন।মোসাম্মৎ শাফিয়া, মাইদার খালাতো বোনমাইদার দুই শিশুসন্তান এখন নানির কাছে। এর মধ্যে বুকের দুধ না পেয়ে ছোট ছেলেটা সারা দিন কান্নাকাটি করে।মাইদার খালাতো বোন মোসাম্মৎ শাফিয়া প্রথম আলোকে বলেন, সিয়ামের বাবা-মা বেঁচে নেই। একমাত্র বোন কাতারে থাকেন। মাইদা তাঁকে ফোন করে প্রায়ই জানাতেন যে স্বামী কথায় কথায় মারধর করে। সবশেষ মৃত্যুর দুই দিন আগে মাইদা তাঁকে একটি ছবি পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মেরেছে।’ ছবিতে দেখা যায়, মাইদার মুখে আঘাতের চিহ্ন। চোখ ফোলা। গালের একপাশে ব্যান্ডেজ লাগানো।ছবি দেখে আঁতকে উঠে শাফিয়া বলেন, ‘তুই কেন ওই সংসারে থাকিস। তুই চলে আয়।’ জবাবে মাইদা বলেছিলেন, সব সময়ই তো মারে। সন্তানেরা ছোট। সংসার ছেড়ে এলে সন্তানেরা কষ্ট নিয়ে বড় হবে।শাফিয়া বলেন, মাইদার দুই শিশুসন্তান এখন নানির কাছে। এর মধ্যে বুকের দুধ না পেয়ে ছোট ছেলেটা সারা দিন কান্নাকাটি করে। তিনি দাবি করেন, মাইদার চার বছরের সন্তানের কাছ থেকে তাঁরা শুনেছেন, ‘মাকে বাবা অনেক মেরেছে। পরে ফ্যানে ঝুলিয়ে দিয়ে সুইচ ছেড়ে দিয়েছে। পরে বাবার বন্ধুরা ফ্যান থেকে মাকে নামিয়ে আনে।’ শাফিয়া জানান, মাইদাকে নামিয়ে নিজেদের মাইক্রোবাস চালিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান সিয়াম।পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সারওয়ার আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, মাইদার গলায় দাগ ছিল। পুরোনো আঘাতের কিছু চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। সিয়াম পুলিশের কাছে বলেছেন, বিকেলে তাঁদের মধ্যে মারপিট হয়। পরে মাইদা ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেন। তাঁর বন্ধুরা মিলে মাইদার অচেতন দেহ নামিয়ে আনেন। তিনি এরপর মাইদাকে নিয়ে হাসপাতালে যান।পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ ভাবা হচ্ছে নাদেশের স্বামী বা সঙ্গীর হাতে পারিবারিক সহিংসতা কতখানি প্রকট, তা উঠে এসেছে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনসঙ্গী বা স্বামীর হাতে প্রায় ৭০ ভাগ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। ৪১ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে জরিপের সময়ের আগের ১২ মাসে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃতি, মাত্রা ও প্রভাবের চিত্র তুলে ধরতে বিবিএস ও ইউএনএফপিএর এটা ছিল তৃতীয় প্রতিবেদন। এর আগে ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে ৭৩ শতাংশ ও ২০১১ সালের প্রতিবেদনে ৮০ শতাংশ নারী স্বামীর হাতে সহিংসতার শিকার হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।মাইদার ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় গত বছরের আগস্ট মাসে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিনের (কেয়া) মৃত্যুর ঘটনা। স্বামী সিফাত আলী ফাহমিদা অসুস্থ জানিয়ে তাঁর বাবা-মাকে ফোন করে হাসপাতালে আসতে বলেন। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা ফাহমিদাকে মৃত ঘোষণা করলে তিনি লাশ রেখে পালিয়ে যান। চার সন্তানের মা ফাহমিদা আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করেন স্বামী। এ ঘটনায় ফাহমিদার মা হত্যা মামলা করেন সিফাতের বিরুদ্ধে। সিফাত দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। সবশেষ এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ফাহমিদার ফুপা মো. শামসুদ্দোহা খান প্রথম আলোকে বলেন, আগাম জামিন নিতে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন সিফাত। জামিনের আবেদন নাকচ হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দেড় মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান। ফাহমিদার চার সন্তান এখন নানা-নানির কাছে আছে বলে তিনি জানান।বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার সংস্কৃতি রয়েছে। এই অপরাধকে গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটা মেয়ের জীবনে যেন বিয়েটাই সব! মেয়েটিকে নির্যাতন সহ্য করেও সংসার করতে বলা হয়। তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও পারিবারিক সহিংসতা (সুরক্ষা ও প্রতিরোধ) আইনের আওতায় ভুক্তভোগীরা বিচার চাইতে পারেন। তবে নারী নির্যাতনের অভিযোগে হওয়া মামলার বিরুদ্ধে এক ধরনের অপপ্রচার চালানো হয় যে ৯৯ শতাংশই ভুয়া। এ ধরনের অপপ্রচার বন্ধ করে ভুক্তভোগীদের বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে পরিবারগুলো বিচার চাইতে আগ্রহী হয়।বিচার না হওয়ায় অভিযুক্তরা সাহসী হয়ে উঠছেস্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন। কারণ, অনেকে অভিযোগই করেন না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সংকলিত করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত আট মাসে পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি খবর প্রকাশ হয়েছে। মামলা হয়েছে ১১৯টি ঘটনায়। বাকিগুলোর বিষয়ে তথ্য নেই। ভুক্তভোগী নারীদের মধ্যে ১০৮ জন স্বামীর হাতে হত্যা ও ২২ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ১২ মাসে পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। মামলা হয়েছিল ২৪৮টি ঘটনায়। স্বামীর হাতে ২১৭টি হত্যা ও ২৮টি নির্যাতনের ঘটনা ছিল।পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’র (উই ক্যান) প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা কখনোই কম নয়। এই নির্যাতন প্রতিরোধে যেভাবে কাজ করা উচিত, সেভাবে হচ্ছে না। শুধু আইন পরিবর্তন, সংস্কার—এসবের মাধ্যমে এ ধরনের নির্যাতন প্রতিরোধ হবে না। মাঠে গিয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে যে নারীর প্রতি তাদের আচরণগত পরিবর্তন দরকার। বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা কাটাতে রাষ্ট্রকে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, বিচারের হার কম হওয়ায় অপরাধীরা সাহসী হয়ে উঠছে। মাইদার মৃত্যুর দুদিন পার হয়েছে। যে মেয়ে মাকে প্রতিদিন কল দিতেন, তাঁর কল আর আসে না। শোকগ্রস্ত মা আহাজারি করতে করতে বলছিলেন, ‘মেয়েটার বয়স যখন তিন বছর, তখন ওর বাবা মারা গেছে। অনেক কষ্ট করে ওদের মানুষ করছি। আমার মেয়েটারে শ্বাসরোধ করে মারছে। আপনারা দেইখেন, ওর (সিয়াম) যেন ফাঁসি হয়।’নির্যাতনের ভিডিও ভাইকে পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘বোনকে নিয়ে যাও’, দুই দিন পরে পেলেন মৃত্যুর খবরজুলাইয়ে নারী নির্যাতনের ঘটনা কমলেও ধর্ষণ ও আত্মহত্যা বেড়েছে