বাংলাদেশ

নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, বুয়েটের আবরার ফাহাদ ও সিনহা হত্যা মামলায় আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ

অক্টোবর ১৯, ২০২৬
নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, বুয়েটের আবরার ফাহাদ ও সিনহা হত্যা মামলায় আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ
নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, বুয়েটের আবরার ফাহাদ ও সিনহা হত্যা মামলায় আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ
<p>নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা এবং মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা—আলোচিত এই তিন মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক আজ রোববার আপিল বিভাগে শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন।</p><p>তিন মামলার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় করা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য ১৭ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য ২৪ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য ১ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।</p><p>নারায়ণগঞ্জে খুনের ঘটনাটি ঘটে ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করা হয় ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর সকালে। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে গুলিতে নিহত হন সিনহা। নৃশংস এসব হত্যাকাণ্ডে তখন দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।</p><p>হত্যাকাণ্ডের পৃথক ঘটনায় করা পৃথক মামলায় বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন। পৃথক তিন মামলায় দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। পৃথক তিন মামলায় দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল চেম্বার আদালতের রোববারের কার্যতালিকায় ওঠে।</p><p>আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান।</p><h3>শুনানির জন্য রাষ্ট্রপক্ষের উদ্যোগ </h3><p>পরে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এসব আলোচিত মামলা, যেসব মামলা সমাজকে ও সাধারণ মানুষের বিবেককে আলোড়িত করেছে—এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। তার প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে তিনটি মামলা নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা এবং কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে যে আপিল করেছেন, সেই আপিলগুলো শুনানির জন্য আমরা আদালতের কাছে প্রার্থনা করেছি।’</p><p>আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ওই তিন মামলার তারিখ নির্ধারণ করেছেন উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আদালতের আদেশ অনুসারে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার শুনানি হবে ১৭ নভেম্বর। বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার আপিল শুনানি ২৪ নভেম্বর শুরু হবে আশা করা যাচ্ছে। মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলা যেটি শুনানির তারিখ ১ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।…আমাদের প্রত্যাশার জায়গাটা হচ্ছে, এই মামলাগুলো নির্ধারিত তারিখে যেন শুনানি শুরু হয়।’</p><h3>এক যুগ আগে সাত খুন </h3><p>২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় র‌্যাবের সদস্যরা চেকপোস্ট বসিয়ে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের গাড়ি থামান। র‌্যাব নজরুল, তাঁর তিন সহযোগী ও গাড়িচালককে তুলে নিয়ে যায়। এ সময়ে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন আইনজীবী চন্দন সরকার। তিনি অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় তাঁকে ও তাঁর গাড়িচালককেও র‌্যাব তুলে নিয়ে যায়। পরে তাঁদের সবাইকে হত্যা করে ওই রাতেই পেট কেটে এবং ইটের বস্তা বেঁধে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেয়। ওই বছরের ৩০ এপ্রিল ছয়জন ও পরদিন একজনের লাশ ভেসে ওঠে। সাতজন হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তাঁর বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম। ওই ঘটনায় দুটি মামলা হয়, একটির বাদী নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম এবং অপরটির বাদী আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল।</p><p>ওই দুই মামলায় ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি রায় দেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত। রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল এবং অপর ১১ আসামির দণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া ৯ আসামির দণ্ড বহাল থাকে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ২০১৯ সালে র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেন, এম মাসুদ রানা এবং সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বহিষ্কৃত নেতা নূর হোসেনসহ দণ্ডিত আসামিরা পৃথক আপিল করেন।</p><h3>আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা </h3><p>একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরারের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। পরদিন সকালে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। আবরারের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তিনি বুয়েটের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে হত্যায় জড়িত সবাই ছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতা-কর্মী। ছাত্রলীগ এখন নিষিদ্ধ। এরপর ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট সব আসামির দণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। কারাগারে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পরে আপিল এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা লিভ টু আপিল করেন বলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান।</p><h3>মেজর (অব.) সিনহা হত্যা </h3><p>২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন সিনহা। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় দেন। রায়ে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও সাবেক পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২ জুন রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে প্রদীপসহ আসামিরা আপিল করেন।</p>

Prothomalo

View more
ডেমরায় পিকআপ ভ্যানের চাপায় অজ্ঞাত নারী নিহত
ডেমরায় পিকআপ ভ্যানের চাপায় অজ্ঞাত নারী নিহত

<p>রাজধানীর ডেমরায় সুলতানা কামাল সেতুর ওপর পিকআপ ভ্যানের চাপায় অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী নিহত হয়েছেন। রোববার রাতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ওই নারীর বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর।</p><p>আক্তার হোসেন নামের এক পথচারী গুরুতর আহত অবস্থায় ওই নারীকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে রাত পৌনে নয়টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।</p><p>পুলিশ জানায়, নিহত নারীর পরনে প্রিন্টের কাপড় ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর নাম-পরিচয় জানা যায়নি। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।</p><p>ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেকের মর্গে রাখা হয়েছে।</p>

অক্টোবর ১৯, ২০২৬
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি

পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি দুজনের আগের বদলি আদেশ বাতিল করা হয়।

অক্টোবর ১৯, ২০২৬
রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব...
রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব...

<p>‘কাজলরেখা’ সিনেমায় অভিনয় করে আলোচনায় আসেন মন্দিরা চক্রবর্তী। নতুন কোনো সিনেমায় কাজ না করলেও একাধিক পরিচালক ও প্রযোজকের সঙ্গে কথা হয়েছে। ব্যাটে–বলে মিললে হয়তো নতুন সিনেমায় শিগগিরই দেখা যাবে। এখন পূজার আনন্দে মেতেছেন। দেখুন এই সময়ে মন্দিরার সাতটি ছবি</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/hahr354h/8560603941866934845172710985001976827089573n.jpg"><figcaption>রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করেন মন্দিরা চক্রবর্তী। গুনগুন করে মনের আনন্দে গেয়েও থাকেন। পূজার সাজে একগুচ্ছ ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে ক্যাপশনে রবীন্দ্রসংগীতের এই লাইনগুলো ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব/ আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো, গান দিয়ে দ্বার খোলাব/ ভরাব না ভূষণভারে, সাজাব না ফুলের হারে/ প্রেমকে আমার মালা ক’রে গলায় তোমার দোলাব।’ জুড়ে দিয়েছেন।</figcaption></figure><aside><a href="https://www.prothomalo.com/entertainment/aqvgf90k27">আবেদনময়ী লুকে মন্দিরা, রইল ১২ নতুন ছবি</a></aside><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/878yzngu/8554369011866934831839378700998619996213610n.jpg"><figcaption>মন্দিরার পোস্ট করা স্থিরচিত্রে ভক্ত শুভাকাঙ্ক্ষীরা মন্তব্য করেছেন। কেউ লিখেছেন, ‘সবগুলো ছবিই সুন্দর, কিন্তু পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে আপনার লুকটা একদম ঠিকঠাক লাগছে। সবগুলো একসঙ্গে দেখে ভালো লাগল।’ কেউবা লিখেছেন, ‘চমৎকার! মন ছুঁয়ে যায়। শুভকামনা।’</figcaption></figure><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/02ookpuv/85543687918669348118393801777404371257960953n.jpg"><figcaption>মন্দিরাকে নিয়ে রয়েছে প্রেমের গুঞ্জন। এ বিষয়ে বেশ স্পষ্টবাদি তিনি। মন্দিরার মতে, ‘প্রেম ছাড়া তো একজন মানুষ থাকতে পারে না। আমার মনে হয়, প্রত্যেক মানুষের জীবনে প্রেম থাকা জরুরি, প্রেম করা উচিত। প্রেম করলে মন ভালো থাকে, শরীর ভালো থাকে। এখন বিয়ে করার কোনো ইনটেনশন একদম নেই, পরিবার থেকেও এখন প্রেশার নেই। এখন কাজে মনযোগ দিতে চাই।’</figcaption></figure><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/1kpqygm6/85543681318669344151727533459471412262484875n.jpg"><figcaption>ছোটবেলা থেকেই নিজেকে নায়িকা ভাবতেন মন্দিরা চক্রবর্তী। কাছের বন্ধুরাও তাঁকে নায়িকা বলেই ডাকতেন। নাচের প্রতি ঝোঁক ছিল বেশি। তাই প্রথমে নাচের মাধ্যমেই বিনোদন অঙ্গনে আসা। এরপর অভিনয়ে যুক্ত হন। এরই মধ্যে দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। সর্বশেষ মুক্তি পেয়েছে তাঁর অভিনীত ‘নীলচক্র’।</figcaption></figure><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/es5662g5/85538263418669345785060704331466662651392590n.jpg"><figcaption>মন্দিরা চক্রবর্তী অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কাজলরেখা’। গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরিচালিত এই ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করে আলোচনায় আসেন তিনি। চ্যানেল আইয়ের রিয়েলিটি শো ‘সেরা নাচিয়ে’ দিয়ে বিনোদন অঙ্গনে পথচলা শুরু করেন মন্দিরা। এরপর ‘কাজলরেখা’ ছবিটি তাঁকে আরও পরিচিতি এনে দেয়। এতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন শরীফুল রাজ। এরপর ‘নীলচক্র’ ছবিতে অভিনয় করেন আরিফিন শুভর বিপরীতে</figcaption></figure><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/qugl6wzk/85538230318669346485060638156749783562633445n.jpg"><figcaption> ‘নীলচক্র’ মুক্তির পরের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে মন্দিরা বলেন, ‘আমার কাছে কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব এসেছে। গল্প শুনেছি, শুনছিও। কয়েকটি ছবি না–ও করেছি। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছি।’</figcaption></figure><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/hgb8eb0e/85533984618669345485060737491556545380092571n.jpg"><figcaption>কথা প্রসঙ্গে মন্দিরা বলেন, ‘আমি নাচের মেয়ে। এখন পর্যন্ত যেসব ছবিতে অভিনয় করেছি, তেমনভাবে নাচের মুনশিয়ানা দেখানোর সুযোগ পাইনি। আমি যেমন পিওর রোমান্টিক গানে পারফর্ম করতে চাই, তেমনি আইটেম গানেও নিজেকে উপস্থাপন করতে চাই।’</figcaption></figure>

অক্টোবর ১৯, ২০২৬
বাংলাদেশে উঠতি মধ্যবিত্তের বিকাশ এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সম্ভাবনা
বাংলাদেশে উঠতি মধ্যবিত্তের বিকাশ এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সম্ভাবনা

<p><strong>সারকথা</strong></p><p><br>অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত কারা, সেটা চিহ্নিত করা গেলে তাদের অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও অবদানের সুযোগগুলোও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফল ও কারণ হিসেবে নতুন এক উঠতি মধ্যবিত্তকেও দেখা যাচ্ছে। উন্নয়ন গবেষক মহা মির্জা প্রশ্ন করছেন, শ্রমিকের আয় না বাড়লে উঠতি মধ্যবিত্তেরও বিকাশ থমকে যায় কিনা। রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর একচেটিয়াভাবে ভর না করে স্থানীয় বাজার ও স্থানীয় চাহিদানির্ভর শিল্পায়নের গুরুত্ব কতটা। স্থানীয় শিল্পায়নভিত্তিক কর্মসংস্থান ছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হবে কীভাবে? বাংলাদেশের উন্নয়নের নীতির গুরুতর একটা ফাঁক হলো এই নীতির মধ্যে শ্রমিক ও নিম্নমধ্যবিত্তের অস্তিত্বটা প্রায়ই ভুলে থাকা হয়। শেষ পর্যন্ত সেটা অর্থনীতির সার্বিক বিকাশকেই ভারসাম্যহীন করে ফেলে। অর্থনীতির তত্ত্বের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞান ও সর্বজনের স্বার্থ মেলানো অর্থনৈতিক আলোচনা যেখানে বিরল, সেখানে মহা মির্জার প্রবন্ধটি বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনাকে একসঙ্গেই আলোচনা করেছে।</p><p><strong>অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত</strong></p><p><br>মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংজ্ঞা কী? ঠিক কাকে মধ্যবিত্ত বলে? খুব স্বাভাবিকভাবেই মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা স্থান, কাল বা একাডেমিক ডিসিপ্লিন অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। যেমন সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যবিত্তের সংজ্ঞায়ন এবং অর্থনীতিবিদদের সংজ্ঞায়ন এক নয়। আবার ঔপনিবেশিক সময়ের মধ্যবিত্ত এবং এখনকার 'শহুরে' নাগরিক মধ্যবিত্ত এক নয়। যেমন 'সামন্তীয়' ইউরোপে মধ্যবিত্ত বলতে বোঝানো হতো পেজেন্ট্রি (কৃষক) ও নোবেলিটির (অভিজাত) মাঝখানে গড়ে ওঠা শ্রেণিটি। আবার পশ্চিমের এখনকার সমাজবিজ্ঞানীরা মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উচ্চশিক্ষা এবং ‘হোয়াইট কলার’ চাকরির মানদণ্ডে চিহ্নিত করেছেন, যাঁরা মূলত টেবিলে বসে চাকরি করেন এবং দৈহিক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত নন। ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ হোমি খারাস মধ্যবিত্তকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে : Being in the middle class implies having a comfortable standard of living, economic security, and self-reliance. The middle classes come from a range of occupations : government officials, college graduates, rich farmers, traders, business people, and professionals. They are in various management and clerical jobs. Many are self-employed in small businesses, crafts, and on commercialized family farms (খারাস ২০১১ : ৫৯) ।</p><p>বলা বাহুল্য, অর্থনীতিবিদেরা মধ্যবিত্তকে সংজ্ঞায়িত করেন আয় ও ব্যয়ের নিক্তিতে। যেমন ব্যানার্জি এবং ডাফলো (২০০৮) মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করেছেন দৈনিক মাথাপিছু ব্যয় (এক্সপেন্ডিচার) ৬ থেকে ১০ ডলারের মধ্যে ধরে। বার্ডসল (২০০৭) মধ্যবিত্ত চিহ্নিত করেছেন দৈনিক মাথাপিছু আয় ১০ ডলারের ওপরে ধরে। রাভালিওন (২০০৯) পশ্চিমা দেশের মধ্যবিত্ত (ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড মিডল ক্লাস) এবং উন্নয়নশীল দেশের মধ্যবিত্তকে (ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড মিডল ক্লাস) আলাদা আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে চিহ্নিত করেছেন। আবার হোমি খারাস (২০১০) ‘গ্লোবাল মিডল ক্লাস’র হিসাব দেখিয়েছেন মাথাপিছু ব্যয় ১০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে (এডিবি ২০১০ : ৫ ।) তাঁর মতে, এই পরিসীমার মধ্যবিত্তের মধ্যে নতুন ধরনের পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা তৈরি হয়। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ (বিশ্বব্যাংকে কর্মরত) এজাজ ঘানি অর্থনীতিতে মধ্যবিত্তের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : A bigger middle class spends more, leading to higher business profits, savings and investment, higher growth and a larger middle class (খারাস ২০১১ : ৭৫)। তবে সব মধ্যবিত্তের মাপকাঠি এক নয়। মধ্যবিত্তের মধ্যে আছে উচ্চমধ্যবিত্ত আবার নিম্নমধ্যবিত্তও। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে মধ্যবিত্তের এই ভাগগুলোর সংজ্ঞায়নও আবার এক নয়।</p><p>মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক সংজ্ঞার ক্ষেত্রে নানা রকমের হিসাব দেখা গেলেও এটি আসলেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো অর্থনৈতিক চরিত্র হলো তার বাড়ন্ত ক্রয়ক্ষমতা। মধ্যবিত্ত কেবল খাদ্যবস্ত্র, বাসস্থানে খরচ করে না, বরং ‘এসেনশিয়াল’ বা আবশ্যক পণ্যগুলোর বাইরেও ‘নন-এসেনশিয়াল’ কিন্তু ডিজায়ারেবল (কাঙ্ক্ষিত) পণ্যগুলোতে খরচ করা শুরু করে। মধ্যবিত্ত রেস্টুরেন্টে খেতে যায়, মধ্যবিত্ত ঘর সাজানোর জিনিস কেনে, মধ্যবিত্ত প্লাস্টিকের সস্তা আসবাবের পরিবর্তে কাঠের মজবুত আসবাব কেনে। মধ্যবিত্ত কার্পেট কেনে, বালিশের কুশন কেনে, বছরে একবার কক্সবাজার বা সিলেটে বেড়াতে যায়। লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মধ্যবিত্ত আইপিএস কেনে। তাই একটি দেশের মধ্যবিত্তের উত্থান মানেই হচ্ছে সামগ্রিকভাবে ওই দেশের বাজার ও অর্থনীতির চরিত্র ও ধরন বদলে যাওয়া, বাজারের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও সরবরাহে পরিবর্তন ঘটা।</p><p><strong>ভারতের মধ্যবিত্ত এবং ‘কনজ্যুমার গুড’র উত্থান</strong></p><p>মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে ভারত ও ভিয়েতনামে এবং তার কিছু পরে বাংলাদেশের মতো এককালীন দরিদ্র দেশগুলোতেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে। মূলত গ্রামীণ কৃষক পরিবারের সন্তানদের শহরে পড়তে আসা, পড়ালেখা শেষে শহরেই চাকরির খোঁজ করা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর শহরে থেকে যাওয়া, পরিবারের অন্য সদস্যদের শহরের দিকে টানা ইত্যাদি নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে, এমনটাই আমরা দেখি। ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ২০০৭ সালেই দেখিয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইন্সিটিউট ২০০৭)। ম্যাকেন্জি রিপোর্টের মতে, এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিটির কনজাম্পশন বা ভোগের প্রবণতায় নাটকীয় পরিবর্তন আসবে, ‘These groups choose what they will consume, rather than be driven by the necessities of life. Such discretionary choices, reflecting the tastes of the new Indian middle class, will dominate consumption patterns.’ (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইন্সিটিউট ২০০৭)। যেমন, নব্বইয়ের দশকে ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের সঙ্গে  সঙ্গে বেশ কিছু কনজ্যুমার গুড বা ভোগ্যপণ্যের চাহিদা হুহু করে বাড়তে থাকে। এই বাড়তি চাহিদার পণ্যের তালিকায় আছে গাড়ি, মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং রেফ্রিজারেটর। ২০০৭ সালের ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ভারতীয় মধ্যবিত্ত সম্পর্কে মন্তব্য করেছে এভাবে : They enjoy a lifestyle that most of the world would recognize as middle class and typically own a television, a refrigerator, a mobile phone and perhaps even a scooter or a car. Although their budgets are stretched, they scrimp and save for their children's education and their own retirement (ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০০৭)।</p><p>অন্যদিকে উপমহাদেশের উচ্চমধ্যবিত্তরা হলেন সাধারণত ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারিয়াল পদের কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী। ২০০৭ সালের ম্যাকেন্জি রিপোর্ট ভারতীয় উচ্চমধ্যবিত্ত সম্পর্কে বলছে, Successful and upwardly mobile, they are highly brand-conscious, buying the latest foreign-made cars and electronic gadgets. They are likely to have air conditioning, and can indulge in an annual vacation, usually somewhere in India.</p><p>উচ্চমধ্যবিত্তের শৌখিন বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় বলেই ভারতের বাজারে ক্রিশ্চিয়ান ডিওর বা টমি হিলফিগারের মতো দামি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো ইতিমধ্যে ব্যবসাসফল হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, উচ্চমধ্যবিত্তের উত্থানের সঙ্গে আমদানি করা পণ্য এবং হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্টের মতো পর্যটন-পণ্যেরও চাহিদা বেড়েছে। আবার আমদানি করা পণ্যের চাহিদা বাড়ার মধ্য দিয়ে বড় শহরগুলোতে ‘সুপারমল’-এর সংখ্যাও বেড়েছে।</p><p>এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই পূরণ করেছে ভারতের স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাত। যেমন একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়ের পক্ষে গাড়ি কেনার সামর্থ্য ছিল না। মধ্যবিত্তের বাড়ন্ত গাড়ির চাহিদাকে আমলে নিয়েই আশি-নব্বইয়ের দশকে ভারতে অটোমোবাইল খাতে বিপুল বিনিয়োগ ঘটে। সাম্প্রতিক কালে আবার নতুন মধ্যবিত্তের চাহিদা এবং ক্রয়ক্ষমতাকে মাথায় রেখেই টাটা মোটরস মাত্র এক লাখ টাকার গাড়ি এনেছে ভারতের বাজারে (‘ওয়ান লাখ রুপি কার’ নামে পরিচিত)। এ ছাড়া মধ্যবিত্তের উত্থান মানেই শহরে আধুনিক আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধি ও রিয়েল এস্টেট বা নির্মাণ খাত বিকশিত হওয়া। উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ভারতে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। যেমন স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এবং মারুতি-সুজুকির মতো গাড়ি কোম্পানি একসঙ্গে চুক্তি করে স্বল্প কিস্তিতে গাড়ি কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে ভারতীয় মধ্যবিত্তকে। আবার ভারতীয় ইলেকট্রনিক উৎপাদন কোম্পানি ভিডিওকন স্বল্প আয়ের মধ্যবিত্তকে মাথায় রেখে খুব সস্তা দামের ওয়াশিং মেশিন বাজারে এনেছে।</p><p><strong>বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত কারা?</strong></p><p>বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কত, এই হিসাব করতে গেলে সাধারণত তিনটি গবেষণা প্রতিবেদন সামনে আসে (জাইকা ২০১৬ : ৬২)। এর মধ্যে ড. বিনায়ক সেনের (২০১৫) হিসেবে দৈনিক ২ থেকে ৩ ডলারের মধ্যে আয় হলে তাকে মধ্যবিত্ত বলা হচ্ছে (স্বভাবতই আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থাগুলো ২ থেকে ৩ ডলারের এই ‘ইনকাম রেঞ্জ’ বা আয়ের পরিসীমাকে অনেক কম মনে করছে)। বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ-এর হিসাবে দৈনিক ১৩ থেকে ২১ ডলার আয় হলে তাকে মধ্যবিত্ত বলা যায়। তবে আমেরিকার পিউ রিসার্চ সেন্টার মধ্যবিত্তের আয় নির্ণয় করতে আরেকটু সতর্কতা অবলম্বন করেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার দৈনিক ২ থেকে ১০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করছে ‘লো ইনকাম’ বা নিম্ন আয় হিসেবে আর দৈনিক ১০ থেকে ২০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করছে মধ্যবিত্তের আয় হিসেবে। এ ছাড়া দৈনিক ২০ থেকে ৫০ ডলার আয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে উচ্চমধ্যবিত্ত হিসেবে (মাসিক ৪০-৭৮ হাজার টাকা) (জাইকা ২০১৬ : ৬২) ।</p><p>এদিকে জাইকার ‘ইমার্জিং মিডল ইনকাম ক্লাস ইন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনটি পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপটিকেই বাস্তবসম্মত হিসেবে গ্রহণ করেছে, যদিও জাইকা আরও এক ধাপ এগিয়ে মধ্যবিত্তের ক্যাটাগরিটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। যেমন দৈনিক ২ থেকে ৪ ডলারকে নিম্ন আয় হিসেবে দেখিয়েছে (৮-১৫ হাজার টাকা), আর ৪ থেকে ১০ ডলার আয়কে দেখিয়েছে নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে (১৫-৪০ হাজার টাকা) (জাইকা ২০১৬ : ৬২) ।</p><p>জাইকার ২০১৬ সালের হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ, নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ, নিম্নমধ্যবিত্ত প্রায় ৩৪ শতাংশ আর উচ্চমধ্যবিত্ত মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ (জাইকা ২০১৬ : ৬৩) । এদিকে বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের ২০১৫ সালের জরিপ বলছে, পরবর্তী এক দশকে প্রতিবছর বাংলাদেশের ২০ লাখ মানুষের মাসিক আয় ৩৫ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাবে। অর্থাৎ এই গ্রুপের ভোক্তা পরিবারগুলো এসি, আইপিএস বা বিদেশি শ্যাম্পু বা কসমেটিকসের মতো পণ্যগুলো কেনার মতো সক্ষমতা রাখবে।</p><p><strong>বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা ও ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার</strong></p><p>সাধারণত মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা ছাড়ালে (অর্থাৎ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের পরিসীমায় প্রবেশ করলে) ভোক্তা পরিবারগুলোর প্রধান প্রবণতা হলো স্মার্টফোন, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর বা ইস্ত্রি কেনা। মাসিক আয় আরও বৃদ্ধি পেলে পরের ধাপে মোটরবাইক, এসি, আইপিএস বা রাইস কুকার কেনা। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানে ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে। এদিকে শুধু পণ্যের বাজার তৈরি হলেই হবে না, পণ্য কোথায় তৈরি হচ্ছে (দেশে না বিদেশে), কোথায় সংযোজন হচ্ছে, আমদানি হচ্ছে নাকি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, অর্থনীতির বিকাশে এটি একটি অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন।</p><p>জাইকার (২০১৬) জরিপে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত পণ্যের বাজার সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। যেমন বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্যের স্থানীয় সংযোজনকারী (অ্যাসেম্বলার) হিসেবে দেশীয় বাজারের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, বাটারফ্লাই, ইউনিটেক, খান ট্রেডিংস, হাওলাদার ইলেকট্রনিকস, রয়াল, ইলেক্ট্রোমার্ট এবং স্কয়ার। আর বাজারে প্রতিযোগিতা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে এলজি, সনি, স্যামসাং, শার্প, হিটাচি, প্যানাসনিক, ফিলিপস, মিয়াকো, নোভা, ডিজিটাল, সিঙ্গার, হাইকো, জেনারেল ইত্যাদি। তবে কেবল এসি, রেফ্রিজারেটর ও ব্লেন্ডার ছাড়া বাকি ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার প্রায় পুরোটাই জাপানিজ, চায়নিজ ও কোরীয় কোম্পানির দখলে। রেফ্রিজারেটর ও এসির ক্ষেত্রে বেশ ভালো করছে দেশীয় কোম্পানি ওয়ালটন। শার্প ও সিঙ্গারের মতো বিদেশি কোম্পানিগুলোকে টেক্কা দিয়ে ওয়ালটন-এর পণ্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। আবার আইপিএসের ক্ষেত্রে সিঙ্গার বা স্যামসাংয়ের চেয়ে রহিমআফরোজের বাজার বড়।</p><p>অন্যান্য বেশ কিছু পণ্যের ক্ষেত্রেও ওয়ালটনের সক্ষমতা খেয়াল করার মতো। যেমন মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে সুজুকি, হোন্ডা ও হিরোর পরেই ওয়ালটনের বাজার। সেলফোনের ক্ষেত্রে স্যামসাংয়ের পরেই ওয়ালটনের বাজার। এ ক্ষেত্রে সিম্ফনির থেকেও ভালো করছে ওয়ালটন। ব্লেন্ডার বিক্রির ক্ষেত্রেও ফিলিপস, নোভা, প্যানাসনিককে ছাড়িয়ে ওয়ালটন সবচেয়ে এগিয়ে (জাইকা ২০১৬ : ৭৪)। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মধ্যবিত্তের উত্থানে নানা রকমের ইলেকট্রনিক পণ্যের যে নতুন বাজার তৈরি হয়েছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত না হলেও স্থানীয়ভাবে সংযোজিত। উৎপাদন, সংযোজন, সেলস, ডিস্ট্রিবিউশন ও মার্কেটিং মিলিয়ে দেশীয় এই দু-একটি কোম্পানি উল্লেখযোগ্য মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের মধ্যে যেহেতু প্রকারভেদ আছে এবং উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যে যেহেতু নতুন ধরনের পণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হচ্ছে, তাই এমন বলা যেতে পারে যে ‘রাইজিং’ মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়লেই স্থানীয় শিল্পের সংখ্যা বাড়বে বা স্থানীয় শিল্পের বিকাশ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রবণতা বলে, মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরেকটু বেশি খরচের আমদানিকৃত পণ্যের চাহিদা বাড়বে। যেমন জাইকার ২০১৫ সালের জরিপ বলছে, বাংলাদেশের উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কিনতে আগ্রহী। যেখানে ৫৮ শতাংশই আমদানি করা পণ্য কিনতে আগ্রহী এবং ২৪ শতাংশ স্থানীয়ভাবে সংযোজিত (এসেম্বেল্ড) পণ্য কিনতে আগ্রহী (জাইকা ২০১৬ : ৪৯) । মূলত গাড়ি ও টিভির ক্ষেত্রেই বিদেশি পণ্যের প্রতি এই আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।</p><p>আবার অন্যদিকে দরিদ্র থেকে নিম্নমধ্যবিত্তে উপনীত হওয়া শ্রেণিটির তুলনামূলক বেশি দামে আমদানিকৃত পণ্য কেনার সামর্থ্য নেই। তাঁরা দেশে তৈরি পণ্যেই ভরসা রাখেন। তাই এমন বলাই যায় যে নতুন মধ্যবিত্তের উত্থানের সঙ্গে স্থানীয় পণ্যের চাহিদা অবশ্যই বাড়ে এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধনী বা উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি স্থানীয় শিল্পায়নের জন্য সুবিধাজনক না-ও হতে পারে। বরং উচ্চমধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আমদানিকৃত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সম্পর্কটি বেশ দৃশ্যমান। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের শিল্পায়নের জন্য মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে শ্রমিকের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা প্রাথমিক ধাপে অন্তত শ্রমিকের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তরণ।</p><p><strong>শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও মধ্যবিত্তে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা</strong></p><p>বাংলাদেশের মতো দেশে শ্রমিক তাঁর মজুরির প্রায় পুরোটাই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে ব্যয় করেন। ‘নেসসিটি’ বা প্রয়োজনের বাইরে অন্যান্য কনজ্যুমার গুড কেনার সামর্থ্য তাঁর কম। বাংলাদেশের একজন পোশাকশ্রমিকের ‘কনজাম্পশন প্যাটার্ন’ বা খরচের তালিকাটি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ, চাল, ডাল, সবজি, ডিম ইত্যাদি প্রাথমিক খাদ্যপণ্য কিনতেই তাঁর মজুরির প্রায় সম্পূর্ণটা খরচ হয়ে যায় (বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে মাসের প্রথম দেড় থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই পোশাক-শ্রমিকের মজুরির সম্পূর্ণ টাকাটাই শেষ হয়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা।) এদিকে বিপুলসংখ্যক নারী পোশাকশ্রমিকদের খাদ্যপণ্যের বাইরে সামান্য কিছু বাড়তি খরচের আকাঙ্ক্ষার ওপর নির্ভর করেই আশুলিয়া, গাজীপুর, সাভার ও টঙ্গীর মতো এলাকাগুলোতে সস্তা কাপড়, সস্তা জুতা, ইমিটেশনের গয়না ও কসমেটিকসের বাজার গড়ে উঠেছে। মূলত ১৫ হাজার টাকার কিছুটা ওপরে মজুরি পাওয়া নারী শ্রমিকরাই এসব সস্তা কাপড়ের দোকানের নিয়মিত ক্রেতা। পোশাকপল্লির চারদিকে গড়ে ওঠা এই বাজারগুলোর বহু পণ্য চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা হলেও রেডিমেড থ্রি-পিস, ম্যাক্সি, ওড়না, স্যান্ডেল ও সাবান-শ্যাম্পুর মতো পণ্যগুলোর একটি বড় অংশই দেশীয় ছোট-বড় বিভিন্ন কারখানায় তৈরি হয়। উল্লেখ্য, কেরানীগঞ্জ বা পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠা প্রায় কয়েক শ দর্জির দোকান বা রেডিমেড কাপড় সেলাইয়ের কারখানার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই সরবরাহ করা হয় ঢাকার আশপাশের পোশাক-পল্লিগুলোতে। আবার শ্রমিকের জুতা বা স্যান্ডেলের চাহিদা মাথায় রেখেই পুরান ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের নানান জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে অজস্র পাদুকা কারখানা।</p><p>এ ছাড়া পোশাকশিল্পের নারী কর্মীরা সস্তা দেশীয় কসমেটিকস ব্যবহার করে থাকেন। পোশাককর্মীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় দুটি দেশীয় কসমেটিকস ব্র্যান্ড হলো লতা হারবাল ও রেমি স্পট ক্রিম। দুটোই রং ফর্সাকারী ক্রিম হিসেবে পরিচিত। ১২ গ্রামের একটি লতা হারবাল কৌটার দাম মাত্র ৫০ টাকা। এ ছাড়া তিব্বতের লিপ জেল, ঘামাচি পাউডার, তিব্বত পমেড, কিউট গ্লিসারিন, দেশে তৈরি লাক্স ও সানসিল্কের শ্যাম্পু, কাপড় কাচার সাবান, কসকো ও দেশে তৈরি পন্ডস পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের নিয়মিত ব্যবহার্য সামগ্রী।</p><p>পোশাকের ক্ষেত্রে পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের রোজগারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের লোকাল পোশাকশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। একদিকে বাজারে ভারতীয় ও পাকিস্তানি থ্রি-পিসের রমরমা চাহিদা থাকলেও নারী শ্রমিকেরা মূলত সস্তা দেশীয় থ্রি-পিস কেনেন বেশি (৬০০ টাকার মধ্যে ।) নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বহু ছোট-বড় বস্ত্রকল তৈরি হয়েছে, যেখানে পাওয়ার লুম বা অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে কাপড় তৈরি হয়। ছাপা কাপড় বা স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের জন্য আছে আলাদা কারখানা, আবার গজ কাপড় সেলাই করেও থ্রি-পিস বা টু-পিস বানানো হয় দর্জি কারখানাগুলোতে। পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও এসব কারখানার দেখা মেলে। একেকটি কারখানায় ৫ থেকে ১০ জন করে শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। বলা বাহুল্য, এসব পণ্যের মূল ক্রেতা শ্রমজীবী মানুষ।</p><p>এ ছাড়া পোশাকপল্লিগুলোকে ঘিরে রান্নার কাজে ব্যবহৃত দেশীয় হাঁড়ি, পাতিল, বাসন, বাটি, গ্লাস, ছুরি, বঁটি, আর প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রীর এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। দেশীয় কোম্পানির মধ্যে মূলত গাজী আর আরএফএলের প্লাস্টিকের চেয়ার, টেবিল আর অন্যান্য আসবাবের ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়।</p><p>পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে ইলেকট্রনিক পণ্যেরও চাহিদা আছে, তবে কম। ইলেকট্রনিক পণ্যের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারে সবার উৎসাহ থাকলেও সবাই কিনতে পারছেন না। কিছুটা বেতন বাড়লে বা কিছু টাকা জমাতে পারলে মূলত টিভি, ফ্রিজ আর স্মার্টফোন কেনাতেই আগ্রহ দেখা যায়। ফ্রিজের ক্ষেত্রে পোশাকশ্রমিকদের প্রথম পছন্দ মূলত ওয়ালটন, তুলনামূলক অনেক কম দাম ও ওয়ালটনের ভালো সার্ভিসের জন্য। পোশাককর্মীদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, শ্রমিকদের সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়ালটনের কর্মীরা খুবই আন্তরিক। তাঁরা পোশাকশিল্পের নারী কর্মীদের খুবই সম্মান করেন এবং ‘বোন’ হিসেবে সম্বোধন করেন।</p><p><strong>শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়?</strong></p><p>সাধারণত বেতন বাড়লে পোশাকশ্রমিকেরা কী ধরনের পণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষা করেন? পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, প্রথমেই তাঁরা মূলত আরেকটু ভালো খাবার কিনতে চান। যেমন বেশির ভাগ পোশাকশ্রমিক এখন পর্যন্ত নিয়মিত মাছ, মাংস, দুধ বা ফলমূল কেনার সামর্থ্য রাখেন না। মূলত ডিম, ডাল ও শাকসবজিই তাঁদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা। এমনও দেখা গেছে, মাছ কেনার সামর্থ্য নেই বলে পোশাকশ্রমিকেরা সন্ধ্যার পর পোশাকপল্লির কাঁচাবাজারগুলোতে ভিড় করেন, মূলত পচতে থাকা মাছ সস্তায় পাবেন এই আশায়। বলা বাহুল্য পোশাকশ্রমিকদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়লে বাজারে মাছ, মাংস বা মুরগির চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়বে। অর্থাৎ গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক বা খামারভিত্তিক উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ বাড়বে।</p><p>অন্যদিকে কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে একটু ভালো মানের দেশীয় ক্রিম, শ্যাম্পু, স্যান্ডেল বা প্রসাধনসামগ্রীর চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য, পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকেরা বেশির ভাগই লোশন কিনতে পারেন না। দেশে ইউনিলিভারের তৈরি করা লোশন তাদের সামর্থ্যের বাইরে। বরং লোশনের পরিবর্তে ভ্যাসলিন, তেল বা পমেড ব্যবহার করেন। বলা বাহুল্য, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পেলে লোশনের মতো পণ্যগুলোর চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার পোশাকশ্রমিকের অনেকেই এক জোড়া স্যান্ডেলেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করেন। কামিজের ক্ষেত্রেও ২-৩ পিস কামিজ বারবার ধুয়ে ধুয়ে পরেন। মজুরি বৃদ্ধি পেলে বাড়তি এক জোড়া স্যান্ডেল, কামিজ বা ওড়নার ব্যবহার বাড়বেই। ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যাপারে আগেই বলা হয়েছে। উঁচু গ্রেডের শ্রমিকের ঘরে টিভি, রেফ্রিজারেটর, স্মার্টফোন, ইস্ত্রি বা রাইস কুকারের মতো পণ্যগুলোর দেখা পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ শ্রমিকের নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে দেশীয় ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।</p><p>সামগ্রিকভাবে দেখলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বেতন বৃদ্ধি আসলে কারখানার মালিকের জন্য একটি বাড়তি ‘উৎপাদন খরচ’ হিসেবে গণ্য হলেও এই বর্ধিত বেতনের সম্পূর্ণটাই বাজারে বিভিন্ন সস্তা পণ্য কেনায় ব্যয় হয়, যা সস্তা পণ্যের দেশীয় ও স্থানীয় শিল্পায়নের পেছনের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হতে পারে।</p><p><strong>ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদন : লোকাল শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় শিল্পায়নের সম্পর্ক</strong></p><p>বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বরাবরই উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঢালাও রপ্তানির পক্ষে। কিন্তু এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি ব্যতিক্রম অবস্থান নিয়েছে ইউএনসিটিএডি (ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)। ২০১৭ সালে এই সংস্থার একটি প্রতিবেদন রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ঝুঁকি নিয়ে বিশদ আলোচনা করে। প্রতিবেদন বলছে, such a model is no longer viable in the current context of slow growth in developed economies. To address the prospect of a prolonged period of considerably slower export growth, policymakers need to give greater weight to domestic demand (ইউএনসিটিএডি ২০১৩)।</p><p>এই রিপোর্টের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারকে দীর্ঘ কয়েক দশকের রপ্তানিমুখিতার ফর্মুলা থেকে সরে আসতে বলা হয়েছে এবং ডমেস্টিক ডিমান্ড বা স্থানীয় চাহিদার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিমা দেশের অনিশ্চিত চাহিদার ওপর নির্ভর করে নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে আঞ্চলিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মাত্রা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে রিপোর্টে। যেমন প্রতিবেদন বলছে : if many developing and transition economies simultaneously give domestic demand a greater role in their growth strategies, their economies could become markets for each other, fostering regional and ‘South-South trade,’ and thus further growth for all (ইউএনসিটিএডি ২০১৩)।</p><p>সাধারণত, স্থানীয় চাহিদা বা ডমেস্টিক ডিমান্ডের ওপর ভিত্তি করে যে শিল্পায়ন হয়, তাতে বৈশ্বিক এক্সটার্নালিটির ঝুঁকি কম। যুদ্ধ, বৈশ্বিক মন্দা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, পশ্চিমা ভোক্তাদের প্রেফারেন্স বা পছন্দ পরিবর্তন—এসব নিজেদের নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে থাকা ঘটনাবলি স্থানীয় অর্থনীতিতে অপেক্ষাকৃত কম প্রভাব ফেলতে পারে (যদিও এই শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আমদানি করা কাঁচামালের ‘কম্পোজিশনে’র ওপরও অনেক কিছুই নির্ভর করে)।</p><p>স্থানীয় মধ্যবিত্তের চাহিদার ওপর নির্ভর করে চাহিদা-জোগানের যে নিয়মিত চক্রটি তৈরি হয়, অর্থনীতির ভাষায় তাকে বলা হচ্ছে ‘ডমেস্টিক ডিমান্ড ড্রিভেন গ্রোথ’ বা স্থানীয় চাহিদানির্ভর প্রবৃদ্ধি। যদিও প্রচার করা হয় যে, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ‘ইকোনমিক মিরাকল’ বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই হয়েছে রপ্তানিভিত্তিক বাণিজ্যের কারণে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, সত্তর-আশির দশকে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি ছিল স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পায়ন। বিশেষ করে বৈশ্বিক মন্দা-পরবর্তী সময়ে এশিয়ার রপ্তানি বাজারে ধস নামলেও স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশের কারণেই মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর অর্থনীতি ক্রমাগতই সমৃদ্ধ হতে থাকে [হা জু চান (১৯৯৩, ২০১০) এবং লাই ওয়াহের (২০১০) কাজে স্থানীয় চাহিদা এবং স্থানীয় শিল্পায়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে।]</p><p>এদিকে আমেরিকার অর্থনীতিবিদ থমাস প্যালে ধনী দেশের ক্রেতাদের ‘আর্টিফিশিয়াল ডিমান্ড’ বা কৃত্রিম চাহিদাকে রপ্তানিমুখী অর্থনীতির একটি প্রধান সমস্যা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ইউরোপ-আমেরিকার কনজ্যুমার গুডের কৃত্রিম চাহিদা বা ‘খামোখা’ চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হচ্ছে একের পর এক দরিদ্র দেশের শিল্প খাত।</p><p>এদিকে শিক্ষণীয় হলো, ২০০৮ সালের মন্দায় আমেরিকার এই ঋণনির্ভর বাজারব্যবস্থাটাকেই আমরা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে দেখেছি। ওই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর পোশাকের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আমাদের পোশাকশিল্প মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছিল। একের পর এক অর্ডার যখন বাতিল হচ্ছিল, তখন ধারাবাহিকভাবে ভর্তুকি দিয়েই বাঁচানো হয়েছিল দেশের পোশাকশিল্পকে। প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমের এই ‘আর্টিফিশিয়াল’ বা ‘ইনফ্লেটেড’ চাহিদার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠল যে রপ্তানি-অর্থনীতির ভিত্তি, সেই অর্থনীতি আসলে দীর্ঘ মেয়াদে কতটুকু টেকসই? এটা সত্য যে পশ্চিমের পোশাকের চাহিদা ঠিক কখনোই ফুরিয়ে যাবে না, কিন্তু এ ক্ষেত্রে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, দেশের প্রধান শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পশ্চিমা দেশগুলোর ঋণনির্ভর এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়া ব্র্যান্ড পণ্যের চাহিদার ওপর। অর্থাৎ দেশের এত বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নির্ভর করছে অত্যন্ত অস্থির ও অস্থিতিশীল একটি বাজারের টিকে থাকার ওপর।</p><p>এর মধ্যে আবার ব্যাপক অটোমেশনের বাস্তবতায় আগের মতো কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না পোশাক খাতে। বরং এক দশকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ব্যাপক হারে কমে এসেছে।</p><p>বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে আমলে নিয়েই তাই ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে ‘ডমেস্টিক ডিমান্ড’ বা লোকাল চাহিদার সঙ্গে স্থানীয় শিল্পায়নের সম্পর্কটিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টের ভাষ্যমতে, প্রতিটি রপ্তানিমুখী শিল্পকেই তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সামনে পড়তে হয়। কর্মীদের বর্ধিত বেতন-ভাতাকে তাই বাড়তি উৎপাদন খরচ বা কষ্ট হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। ম্যানেজমেন্টের মূল উদ্দেশ্যই থাকে যেকোনো উপায়ে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে যেকোনো মূল্যে দমন করা। কিন্তু ইউএনসিটিএডির রিপোর্ট বলছে, মজুরি বা ওয়েজকে শুধু উৎপাদনের খরচ (ভেরিয়েবল কষ্ট) হিসেবে না দেখে বরং ভোক্তা শ্রমিকের ইনকাম বা খরচ করার সক্ষমতা বা ক্রয়ক্ষমতার জায়গা থেকে দেখা দরকার। কারণ, ব্যবসায়ীর জন্য শ্রমিকের মজুরি একটি ‘কষ্ট’ বা উৎপাদন খরচ হতে পারে, কিন্তু সরকারকে ব্যবসায়ীদের মতো চিন্তা করলে চলে না। সরকার লাভ-ক্ষতির হিসাব করবে সামগ্রিক অর্থনীতির লাভ-ক্ষতির জায়গা থেকে। শ্রমিকের বর্ধিত মজুরি এখানে শ্রমিকের সস্তা দেশি পণ্য কেনার ‘ইনসেনটিভ’ বা প্রণোদনা এবং তা সামগ্রিকভাবে স্থানীয় অর্থনীতি বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউএনসিটিএডির (২০১৩) প্রতিবেদন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বলছে, ‘new perspective on the role of wages and the public sector’। প্রতিবেদনের ভাষায় : …export-oriented strategies emphasize the cost aspect of wages. By contrast, a strategy giving a greater role to domestic demand would emphasize the income aspect of wages, as it would be based on household spending as the largest component of domestic demand। অর্থাৎ এখানে শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতাকে স্থানীয় চাহিদা সৃষ্টির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখতে বলা হচ্ছে।</p><p>এই পরিপ্রেক্ষিতে খুলনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ২৬টি পাটকল বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আলোচনা করা প্রয়োজন। পাটকলগুলো কেন লাভ করতে পারছে না, এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায়ই সরকারি মিলের শ্রমিকদের ‘অতিরিক্ত’ বেতনকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়।</p><p>উল্লেখ্য, সরকারি শ্রমিকেরা বিভিন্ন ধরনের ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে বেতন পান ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি আকিজ জুট মিল বা যশোরের নোয়াপাড়া জুট মিলের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাবে, তাঁদের দৈনিক মজুরি মাত্র ২৪০ টাকা! অর্থাৎ বেসরকারি পাটকলশ্রমিকের মাসিক আয় টেনেটুনে ৫ হাজার টাকা! এখানে জরুরি প্রশ্ন হলো মাত্র ৫ হাজার টাকায় একজন শ্রমিক চাল, ডাল, তেল, লবণের মতো জরুরি খাদ্যপণ্যগুলো ছাড়া আর কোনো কিছু কেনার সামর্থ্য রাখেন কি না? তাঁরা কি মাছ, মাংস কিনতে সক্ষম? একজন বেসরকারি মিলের শ্রমিকের পক্ষে শখের বশে একটি বাড়তি প্যান্ট, বাড়তি এক জোড়া স্যান্ডেল বা সস্তা প্রসাধনী কেনা কি সম্ভব? নোয়াপাড়া জুট মিলের শ্রমিকদের বাড়িঘর কেমন? তাঁরা কি দেশি প্লাস্টিকের আসবাব কিনতে পারেন? নিয়মিত তেল, সাবান, শ্যাম্পু বা কোল্ড ক্রিম কিনতে পারেন? বাচ্চাদের জন্য ১০ টাকার এক প্যাকেট এনার্জি প্লাস মাসে দু-চারবারের বেশি কিনতে পারেন? সপ্তাহে একদিন পাড়ার দোকান থেকে নন-ব্র্যান্ডের কেক, বানরুটি বা বিস্কুট কিনে খেতে পারেন? মাত্র ৫ হাজার টাকা মজুরিতে ওয়ালটনের টেলিভিশন বা রেফ্রিজারেটর কেনার সামর্থ্য কি তাঁদের কোনো দিন হবে?</p><p><strong>সরকারি শ্রমিকের বাসাবাড়ি, ক্রয়ক্ষমতা ও কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা</strong></p><p>২০২০ সালে মিল বন্ধ হওয়ার পর পিপলস জুট মিল কলোনির শ্রমিকদের বাসাবাড়িতে বসে আলাপচারিতা করার সুযোগ হয়েছিল। যে বাড়িতে আমরা প্রথম বসেছিলাম, সেই বাড়িটি লিটন মিয়ার। তিনি প্রায় ২৭ বছর ধরে কাজ করেছেন পিপলস মিলে। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন। পাটকল বন্ধ হওয়ার ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন সময় কলোনি ছেড়ে তাঁদের চলে যেতে বলা হচ্ছিল। লিটু মিয়ার পরিবারও উচ্ছেদের ভয়ে ছিল।</p><p>কলোনির বহুতল দালানগুলো মিল কর্তৃপক্ষ করে দিয়েছে। তবে একই জমিতে শ্রমিকেরা নিজেরাও শত শত ইটের ঘর তুলেছেন। পোশাককর্মীদের মতো ঠাসাঠাসি করে ৭ থেকে ১০ জন মিলে থাকতে হয়নি তাঁদের। বসার ঘর আছে, শোবার ঘর আছে; আলাদা রান্নাঘর, বারান্দা আছে। সারবাঁধা ঘরগুলোর সামনে লাউয়ের মাচা, লেবুগাছ, ধনে-পুদিনার চাষ। জানালার গ্রিল ঘেঁষে হাসনাহেনার গাছ আছে। ঘরের ভেতরে নানান ধরনের আসবাবের দেখা মেলে। যেমন স্টিলের আলমারি, কাঠের সোফা, ড্রেসিং টেবিল, কাঠের চেয়ার-টেবিল ইত্যাদি। কারও ঘরে বেতের সোফা এবং রঙিন ফুলতোলা কুশনকভার দেখা গেল। জানালায় রঙিন পর্দাও আছে। প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই কাঠের স্টাডি টেবিল ও টেবিল ক্লথের দেখা মেলে। বেশির ভাগ টেবিলেই দেখা যাবে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের বই, গাইড বই এবং বিসিএস পরীক্ষার গাইড। এ ছাড়া আরেকটা চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই দেখা যাবে সাজিয়ে রাখা বেশ কিছু গল্পের বই।</p><p>লিটু মিয়ার বড় ছেলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বড় মেয়ে খুলনার সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে মাস্টার্স করছেন। তাঁদের মা খুব দুঃখ করে বলছিলেন, ছেলেমেয়েগুলোকে তো শিক্ষিত করেছি কিন্তু চাকরি কি পাবে? লিটু মিয়ার মেয়ের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো খুবই আত্মবিশ্বাসী ও শিক্ষিত মানসিকতার একজন তরুণী। তাঁর প্রথম ইচ্ছা বিসিএস দেবেন। সেটা না হলে শিক্ষকতা করবেন। জানালেন, কলেজের অধ্যাপকেরা তাঁকে খুবই পছন্দ করেন এবং কলেজের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পাওয়ার একটা সম্ভাবনা তাঁর রয়েছে। বোঝা গেল, সেই আশাতেই আছে গোটা পরিবার।</p><p>বিষয়টি উল্লেখ করছি এই কারণে যে শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে পড়ালেখার চর্চা আসলে কতটুকু—সে বিষয়ে কোনো গবেষণা বা রিপোর্ট চোখে পড়ে না। পোশাকশ্রমিকের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, বিসিএস দিচ্ছেন, এমনটা কি কল্পনা করা যায়? পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে আমরা বরং সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রটি দেখি। পোশাকশ্রমিকদের সন্তানেরা বেশির ভাগই স্কুল থেকে ঝরে পড়ে এবং দ্রুত কাজে লেগে যায়। বেশির ভাগই দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগই পায় না। অথচ সরকারি মিলের শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার রেওয়াজ বহুদিনের। মিলশ্রমিকদের সন্তানেরা সবাই স্কুলে যাচ্ছে এবং স্কুলের পর কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। লিটু মিয়ার মেয়ের মতোই কলোনির অন্য বাড়িগুলোতেও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা আছেন। কেউবা পাস করে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউবা ঢাকার কোনো কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছেন এমন উদাহরণও আছে। এবং এটা সরকারি পাটকলশ্রমিকদের জীবনমান বোঝার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক তো অবশ্যই।</p><p>লিটু মিয়ার মেয়ের পড়ার টেবিলে ছিল হুমায়ূন আহমেদ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও ইমদাদুল হক মিলনের বই এবং একটি রান্নার বই। পরে আরও দুজন পাটকলশ্রমিকের ঘরেও গল্পের বই চোখে পড়ল। প্রশ্ন জাগল, আমাদের দেশে গল্পের বই কারা কেনে? শুধুই মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত? পোশাকশ্রমিক বা বেসরকারি মিলশ্রমিকের ঘরে গল্পের বইয়ের দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। দেশি যেসব প্রকাশনী সস্তা কাগজে গল্পের বই ছাপে, তাদের বাজার কী রকম? মানসম্মত মজুরি পাওয়া শ্রমিকদের সন্তানেরা গল্পের বই কেনা শুরু করলে এসব দেশীয় প্রকাশনীর বাজার কি বিকশিত হতো?</p><p>পাবলিক মিলের বেতন বেশি, পাবলিক মিল লোকসানে চলে, পাবলিক মিলগুলোকে বছরে ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়, অথচ পাবলিক মিলের শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে একটি শিক্ষিত পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। গড়ে উঠেছে একটি গোটা অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতি। দক্ষিণের পাটকল বা উত্তরবঙ্গের চিনিকলশ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও সরকারি মজুরির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলাকার ভাতের হোটেল, কাপড়ের বাজার, ছাপা লুঙ্গির ফ্যাক্টরি, বাচ্চাদের খেলনা, কাঠের ফার্নিচার থেকে শুরু করে দেশীয় কেক, বিস্কুট, চানাচুর, চিপস বা কোক-পেপসির ছোট-বড় অসংখ্য দোকানের ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ মিলগুলো লাভে চলছে না লোকসানে চলছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই পাটকল-চিনিকলশ্রমিকদের বাড়তি খরচ করতে পারার সক্ষমতার ওপর অনেকগুলো অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতি নির্ভরশীল। অথচ চাল, ডাল কিনতেই যাঁদের বেতন ফুরিয়ে যায়, সেই বেসরকারি মিলের শ্রমিকদের বাসস্থানের আশপাশে এত বিচিত্র বাহারি পণ্যের অর্থনীতি গড়ে ওঠার সুযোগ আছে কি?</p><p>কাজেই এটি পরিষ্কার যে শ্রমিকের ‘বেশি’ মজুরিকে শুধু ‘উৎপাদন খরচ’ বা ‘লোকসানের কারণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা একটি ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রমিকের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতাকে স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখতে না পারা এবং দরিদ্র শ্রমিককে নিম্নমধ্যবিত্তের কাতারে নিয়ে আসার প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচনা করতে না পারা মূলধারার অর্থনীতিবিদদের স্থানীয় অর্থনীতির বহুবিধ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রমাণই বহন করে।</p><p>সামগ্রিকভাবে বলা যায়, দরিদ্র শ্রমিক থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়ায় যেহেতু স্থানীয় বাজার ও জাতীয় অর্থনীতিতে বহু রকমের পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়, এই চাহিদাকে ঘিরে দেশীয় শিল্পায়নের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হতে পারে।</p><p><strong>পরিশেষে</strong></p><p>ওপরের আলাপটি মূলত তিনটি বিষয় মাথায় রেখে করা হয়েছে।<br>এক. নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে রূপান্তরিত হওয়ার অর্থনৈতিক পূর্বশর্ত</p><p>দুই. শ্রমিকের বাড়তে থাকা ক্রয়ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মধ্যবিত্তের বিকাশ ও স্থানীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি।</p><p>এবং তিন. রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীলতার বিপরীতে স্থানীয় বাজার ও স্থানীয় শিল্পায়নের গুরুত্বদান।</p><p>কিন্তু এই পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূরক কিছু প্রশ্ন করা আবশ্যক; যেমন বাজারের হাতে ছেড়ে দিলেই কি আপনা-আপনি শিল্পায়ন ঘটে যায়?<br>উত্তর : না।</p><p>স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়ন ঘটা মানেই কি শ্রমিক উপযুক্ত মজুরি পাবে বা শ্রমিকের জীবনমান বৃদ্ধি পাবে?<br>উত্তর : না।</p><p>মারাত্মক খরচবহুল জীবনব্যয়ের বাস্তবতায় দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত শ্রমিক একটু বেশি মজুরি পেলেই কি ‘মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা’ অর্জন করতে পারবে?<br>উত্তর : না।</p><p>অথবা মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটলেই কি স্থানীয় শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুরসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি হবে?<br>উত্তর : অটোমেশনের বাস্তবতায় শিল্পের ধরন ও অঞ্চলভেদে কর্মসংস্থান তৈরি হয়।</p><p>বলা বাহুল্য, প্রতিটি প্রশ্নই আলাদা করে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। তবে সংক্ষিপ্ত আকারে বলা যেতে পারে যে দিনে দিনে মারাত্মক ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি ছাড়াও শ্রমিকের আবাসনসংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ বিপর্যয়, বিশুদ্ধ পানির অপ্রতুলতা, পুলিশি নিপীড়ন, চাঁদাবাজি ও প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতায় শুধু নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেই বা মধ্যবিত্তের বিকাশের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়ন ঘটলেই সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে—এমন সরলীকরণ করার উপায় নেই। বরং রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে না পারলে, সুলভে ইউটিলিটি সেবা প্রদান করতে না পারলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পরিবহন বা আবাসনসংক্রান্ত পলিসিগুলোতে গণমুখী/অধিকারভিত্তিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে, শুধু আর্থিক ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ানো ও মধ্যবিত্তের চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ করে দীর্ঘ মেয়াদে একটি টেকসই ও বৈষম্যবিহীন অর্থনীতি তৈরি করা আদৌ সম্ভব নয়।</p><p><strong>রচনাপঞ্জি</strong></p><p><sub>ইউএনসিটিএডি ২০১৩।। United Nations Conference on Trade and Development (UNCTAD), </sub><em><sub>Trade and Development Report, 2013</sub></em><sub>, New York and Geneva।</sub></p><p><sub>এডিবি ২০১০।। Asian Development Bank (ADB), </sub><em><sub>The Rise of Asia’s Middle Class</sub></em><sub>, <a href="https://www.google.com/url?sa=E&amp;q=https%3A%2F%2Fwww.adb.org%2Fsites%2Fdefault%2Ffiles%2Fpublication%2F27726%2Fki2010-special-chapter.pdf" target="_blank">https://www.adb.org/sites/default/files/publication/27726/ki2010-special-chapter.pdf</a>, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।</sub></p><p><sub>খারাস ২০১১।। Homi Kharas, ‘The Rise of the Middle Class’, in Ejaz Ghani (ed.), </sub><em><sub>Reshaping Tomorrow: Is South Asia Ready for the Big Leap?</sub></em><sub>, New Delhi: Oxford University Press।</sub></p><p><sub>জাইকা ২০১৬।। Japan International Cooperation Agency (JICA), </sub><em><sub>Emerging Middle Income Class in Bangladesh</sub></em><sub>, March 2016, <a href="https://www.google.com/url?sa=E&amp;q=https%3A%2F%2Fwww.jica.go.jp%2Fbangladesh%2Fbangland%2Fpdf%2Fabout%2FMiddle%2520Income%2520Survey.pdf" target="_blank">https://www.jica.go.jp/bangladesh/bangland/pdf/about/Middle%20Income%20Survey.pdf</a>, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।</sub></p><p><sub>প্যালে ১৯৯৬।। Thomas Palley, ‘The Forces Making for an Economic Collapse’, </sub><em><sub>The Atlantic</sub></em><sub>, July 1996, <a href="https://www.google.com/url?sa=E&amp;q=https%3A%2F%2Fwww.theatlantic.com%2Fmagazine%2Farchive%2F1996%2F07%2Fthe-forces-making-for-an-economic-collapse%2F376621%2F" target="_blank">https://www.theatlantic.com/magazine/archive/1996/07/the-forces-making-for-an-economic-collapse/376621/</a>, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।</sub></p><p><sub>বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ ২০১৫।। The Boston Consulting Group, </sub><em><sub>The Surging Consumer Market Nobody Saw Coming</sub></em><sub>, October 2015, <a href="https://www.google.com/url?sa=E&amp;q=https%3A%2F%2Fwww.bcg.com%2Fpublications%2F2015%2Fbangladesh-the-surging-consumer-market-nobody-saw-coming" target="_blank">https://www.bcg.com/publications/2015/bangladesh-the-surging-consumer-market-nobody-saw-coming</a>, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।</sub></p><p><sub>ম্যাকেন্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০০৭।। McKinsey Global Institute, </sub><em><sub>How India’s Rising and Unique Middle Class Will Reshape Global Consumer Markets</sub></em><sub>, May 2007, <a href="https://www.google.com/url?sa=E&amp;q=https%3A%2F%2Fwww.mckinsey.com%2Fmgi%2Foverview%2Fin-the-news%2Fnext-big-spenders-indian-middle-class" target="_blank">https://www.mckinsey.com/mgi/overview/in-the-news/next-big-spenders-indian-middle-class</a>, প্রবেশ: ১০ই জুন, ২০২২।</sub></p><p><sub>সেন ২০১৫।। Binayak Sen, </sub><em><sub>Size and Growth of Middle Class in Bangladesh: Trends, Drivers and Policy Implications</sub></em><sub>, Dhaka: Bangladesh Institute of Development Studies।</sub></p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/8jfpgykn/maha021"></figure><p><strong>লেখক পরিচিতি</strong></p><p>ড. মাহা মির্জা উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক। খণ্ডকালীন শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি জার্মানির বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর পিএচডির বিষয় ছিল: স্টেট বিজনেস নেক্সাস এন্ড ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ: দি কেস অফ এশিয়া এনার্জি, বিজিএমইএ, এন্ড কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ বিশ্লেষণমূলক সাময়িকী 'সর্বজনকথা'র সম্পাদনা পর্ষদে যুক্ত আছেন। সর্বজনকথা এবং প্রথম আলোতে নিয়মিত উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ে লেখালেখি করেন।</p><p><strong>নোট:</strong> আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত। দেখুন, <em>প্রতিচিন্তা</em>, দ্বাদশ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, ঢাকা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২২</p>

অক্টোবর ১৯, ২০২৬
নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, বুয়েটের আবরার ফাহাদ ও সিনহা হত্যা মামলায় আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ
নারায়ণগঞ্জে সাত খুন, বুয়েটের আবরার ফাহাদ ও সিনহা হত্যা মামলায় আপিল শুনানির তারিখ নির্ধারণ

<p>নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা এবং মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা—আলোচিত এই তিন মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক আজ রোববার আপিল বিভাগে শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন।</p><p>তিন মামলার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় করা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য ১৭ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য ২৪ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল শুনানির জন্য ১ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।</p><p>নারায়ণগঞ্জে খুনের ঘটনাটি ঘটে ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করা হয় ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর সকালে। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে গুলিতে নিহত হন সিনহা। নৃশংস এসব হত্যাকাণ্ডে তখন দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।</p><p>হত্যাকাণ্ডের পৃথক ঘটনায় করা পৃথক মামলায় বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন। পৃথক তিন মামলায় দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। পৃথক তিন মামলায় দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের করা আপিল চেম্বার আদালতের রোববারের কার্যতালিকায় ওঠে।</p><p>আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান।</p><h3>শুনানির জন্য রাষ্ট্রপক্ষের উদ্যোগ </h3><p>পরে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এসব আলোচিত মামলা, যেসব মামলা সমাজকে ও সাধারণ মানুষের বিবেককে আলোড়িত করেছে—এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। তার প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে তিনটি মামলা নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা এবং কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে যে আপিল করেছেন, সেই আপিলগুলো শুনানির জন্য আমরা আদালতের কাছে প্রার্থনা করেছি।’</p><p>আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ওই তিন মামলার তারিখ নির্ধারণ করেছেন উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আদালতের আদেশ অনুসারে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার শুনানি হবে ১৭ নভেম্বর। বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার আপিল শুনানি ২৪ নভেম্বর শুরু হবে আশা করা যাচ্ছে। মেজর (অব.) সিনহা হত্যা মামলা যেটি শুনানির তারিখ ১ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।…আমাদের প্রত্যাশার জায়গাটা হচ্ছে, এই মামলাগুলো নির্ধারিত তারিখে যেন শুনানি শুরু হয়।’</p><h3>এক যুগ আগে সাত খুন </h3><p>২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় র‌্যাবের সদস্যরা চেকপোস্ট বসিয়ে কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের গাড়ি থামান। র‌্যাব নজরুল, তাঁর তিন সহযোগী ও গাড়িচালককে তুলে নিয়ে যায়। এ সময়ে ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন আইনজীবী চন্দন সরকার। তিনি অপহরণের বিষয়টি দেখে ফেলায় তাঁকে ও তাঁর গাড়িচালককেও র‌্যাব তুলে নিয়ে যায়। পরে তাঁদের সবাইকে হত্যা করে ওই রাতেই পেট কেটে এবং ইটের বস্তা বেঁধে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেয়। ওই বছরের ৩০ এপ্রিল ছয়জন ও পরদিন একজনের লাশ ভেসে ওঠে। সাতজন হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তাঁর বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম। ওই ঘটনায় দুটি মামলা হয়, একটির বাদী নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম এবং অপরটির বাদী আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল।</p><p>ওই দুই মামলায় ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি রায় দেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত। রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল এবং অপর ১১ আসামির দণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ পাওয়া ৯ আসামির দণ্ড বহাল থাকে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ২০১৯ সালে র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেন, এম মাসুদ রানা এবং সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বহিষ্কৃত নেতা নূর হোসেনসহ দণ্ডিত আসামিরা পৃথক আপিল করেন।</p><h3>আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা </h3><p>একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে আবরারের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। পরদিন সকালে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। আবরারের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তিনি বুয়েটের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে হত্যায় জড়িত সবাই ছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতা-কর্মী। ছাত্রলীগ এখন নিষিদ্ধ। এরপর ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট সব আসামির দণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। কারাগারে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পরে আপিল এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা লিভ টু আপিল করেন বলে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান।</p><h3>মেজর (অব.) সিনহা হত্যা </h3><p>২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন সিনহা। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় দেন। রায়ে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও সাবেক পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২ জুন রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে প্রদীপসহ আসামিরা আপিল করেন।</p>

অক্টোবর ১৯, ২০২৬
‘পানিপথ’-এর দুই ঠিকানা, জাতীয় ভাবের দুই কল্পনা
‘পানিপথ’-এর দুই ঠিকানা, জাতীয় ভাবের দুই কল্পনা

<p><strong>সারকথা</strong></p><p>কোনো দেশে জাতীয় চৈতন্য বাস্তব জমিনে পা রাখার আগে আগুয়ান সমাজ ও সেই সমাজের বিদ্বৎজনের কল্পনায় তা আসে। সেই কল্পনা আকার পেতে থাকে জাতীয় ইতিহাসের কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। কল্পনা প্রতীকায়িত হয় এবং ক্রমে তা সামূহিক চৈতন্যের অংশ হয়ে যায়। এমনকি জাতীয় ভাব বাস্তব চেহারা নেওয়ার পরও কিন্তু কল্পনার এই অভিযাত্রা থেমে থাকে না। ইতিহাসে দেখা যায়, জাতীয় ভাব ও কল্পনার নেতৃত্ব থাকে আগুয়ান শ্রেণির হাতে। আর সেই শ্রেণির মধ্যে যে জাতীয় ভাব ও কল্পনা গড়ে ওঠে, তার সংকট ও সম্ভাবনার আয়না হয়ে ওঠে সেই শ্রেণির সাহিত্য। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস ও কায়কোবাদের মহাশ্মশান-এর পর্যালোচনায় ইমরান কামাল ভারতবর্ষের অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ধরনের কল্পনার রূপরেখা দেখতে পেয়েছেন। ঐতিহাসিক পানিপথের যুদ্ধ নিয়ে দুটি সাহিত্যকর্মের তুলনার চমৎকার প্রয়াস ‘“পানিপথ-এর দুই ঠিকানা, জাতীয় ভাবের দুই কল্পনা’প্রবন্ধটি।</p><p>১.</p><p>ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮১৭—১৮৯৪) ও কাজেম আল কোরায়শীর (বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে যিনি কায়কোবাদ নামে সুপরিচিত, ১৮৫৭—১৯৫১) সাহিত্যজগতের মধ্যে তুলনা-বিচার চলে না। একজন ভারতের ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম যুগের সমাজচিন্তক ও দার্শনিক, অন্যজন উনিশ শতকের শেষ পর্বের সমাদৃত কবি। দুজনই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বনামধন্য। তারপরও দুই ভুবনের এই দুই বাসিন্দাকে এক শিরোনামে বন্দী করা কেন? কারণ, তাঁরা দেশভাগ-পূর্ব বাংলা সাহিত্যে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ওপর রচিত দুটি অসামান্য সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে উপজীব্য করে ভূদেব রচনা করেন স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৩০২ বঙ্গাব্দ, ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ)। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কায়কোবাদের হাতে সৃজিত হয় <em>মহাশ্মশান</em> (১৯০৪)। দুই গ্রন্থেই তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ চিত্রিত হয় ভারতের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে। একই সঙ্গে উভয় রচনার বয়ান ও বর্ণনায় ভারতবর্ষের জাতীয়তার কল্পনা এবং জাতীয় ভাব প্রসঙ্গ হিসেবে জোরালোভাবে উপস্থিত। <em>স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস</em>-এ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তার (ভূদেবের দৃষ্টিতে ‘হিন্দু জাতীয়তা’) পরাজয় এবং ‘স্বাধীন ভারত’ নামের স্বপ্নের শেষ সম্ভাবনার মৃত্যু হিসেবে হাজির হয়। <em>মহাশ্মশান</em>-এ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ হয় ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানের বীরত্বের গৌরবময় কীর্তিগাথা (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৫১)।</p><p>এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, দুটি রচনাই তাঁদের স্বস্ব সময়খণ্ডের (কোনো ক্ষেত্রে পরের কালেও) বিদ্বৎসমাজে হয় উপেক্ষিত, না হয় তীব্র কটাক্ষের শিকার। ভূদেবের স্বপ্নকল্পনার অখণ্ড ভারত তাঁর সমসাময়িক বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফিকশনাল ও অলীক রাষ্ট্রকল্পনার বিরাট নির্মিতির নিচে চাপা পড়ে। আর কায়কোবাদের জাতীয় গৌরবের আখ্যান তৎকালীন বাংলার (বিশেষ করে) মুসলমান সমাজে সৃষ্টি করে বিপ্রতীপ প্রতিক্রিয়া। এই কাব্যের বিরুদ্ধে আনা হয় ‘নীতিহীনতা’র ভীষণ অভিযোগ (শামসুদ্দীন ১৯৯৪)। তৎকালীন বাঙালি মুসলিম সমাজে একভাবে উপেক্ষিত <em>মহাশ্মশান</em> পরবর্তী সময়ে মুনীর চৌধুরীর (<em>রক্তাক্ত প্রান্তর</em>, ১৯৬২) হাতে নবজীবন পায় বটে। কিন্তু সাবভার্শনে (sub version) যুদ্ধবিরোধী চেতনা আর সেক্যুলার ভাবের ভিড়ে তার পুরোনো মহিমা ঢাকা পড়ে যায়। সমকালীন উপেক্ষা আর তির্যক আক্রমণের পরও ভূদেবের <em>স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস</em> পরবর্তী প্রজন্মের ‘ভারত’ কল্পনায় এবং উপনিবেশবাদবিরোধী ভাবাদর্শিক শিবিরে চিন্তার রসদ জুগিয়ে গেছে। আবার অন্যদিকে <em>মহাশ্মশান</em>-এর তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের চোরাস্রোতের মতো মুনীর চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী মৃধাদের (<em>পাতকী পানিপথ</em>, ১৯৮৪) সাহিত্যিক নির্মিতির মধ্য দিয়ে বলা যায়, বদলে গিয়ে জীবিত থেকেছে।</p><p>তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে উপজীব্য করে এ দুই গ্রন্থনাকে পাশাপাশি রেখে পড়ার উদ্দেশ্য, বাঙালি উচ্চবর্গ ও বাংলার অগ্রণী শ্রেণির সংস্কৃতিতে ‘জাতীয় ভাব’ ও ‘জাতীয় পরিচয়’কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অলীক কল্পনার তত্ত্ব-তালাশ এবং জাতীয় ভাব ঘিরে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলায় বেড়ে ওঠা উচ্চবর্গের চিন্তাসংকটের ওপর মোটাদাগের অনুসন্ধান চালানো।</p><p>২.</p><p>ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের <em>স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস</em> সাহিত্যের প্রচলিত ধরনের ছাঁচে ফেলে পাঠ করা মুশকিল। আবার এ লেখায় সাহিত্যকল্পনার এত প্রশ্রয় আছে যে একে সাহিত্য-আঙিনার বাইরে রাখাও কঠিন। অন্যদিকে ইতিহাস হিসেবে এই রচনার এক রকম পাঠ দাঁড়াতে পারে। কিন্তু আগাগোড়া বয়ানধর্ম ইতিহাসের উল্টোরথে ঘোরে, তাই একে ইতিহাস হিসেবে না পড়ে কল্পিত ইতিহাসরূপে পাঠ করাই শ্রেয় মনে হয়। ভূদেব নিজেও অবশ্য তা-ই চেয়েছেন; অর্থাৎ পাঠক তাঁর এই রচনা একটি অলীক (utopic) কল্পনা হিসেবে পাঠ করুন। এমন এক স্বপ্ন পাঠকের মনে ঈপ্সিত হোক, যা ভবিষ্যতের কোনো এক পর্বে ‘পুনরুত্থান’-এর আশা রূপে ভারতবর্ষে (না হলে অন্তত বাংলায়) প্রকট হবে।</p><p>১৩০২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত গ্রন্থের ভূমিকায় ভূদেব মুখোপাধ্যায় <em>স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস</em> রচনার পরিপ্রেক্ষিতের একটি চমৎকার বর্ণনা দেন। সেই ভূমিকায় তিনি বলেন:</p><p><sup>“আমার কোন আত্মীয় একখানি ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখিতেছেন। তাঁহার অনুরোধ পরতন্ত্র হইয়া আমি ঐ পুস্তক তাঁহার সহযোগে পাঠ করিয়া দেখিতেছি। যে দিন তাঁহার অনুবাদিত তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ পাঠ করি সেই দিন হঠাৎ আমার কণ্ঠতালু বিশুষ্ক হইতে লাগিল, শরীর পুনঃ পুনঃ রোমাঞ্চিত হইল, পুস্তক পাঠ যেন মহা ভার হইয়া পড়িল। পাঠ নিবৃত্ত করিয়া ঐ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অন্যরূপে পরিসমাপ্ত হইলে কি হইত, সে বিষয়ে ভাবিতে লাগিলাম।” (ভূদেব ২০১৪)</sup>  </p><p>আত্মীয়রচিত (অথবা অনুবাদিত) ইতিহাসে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের অংশটি পড়তে গিয়ে ভূদেবের অসুস্থ হয়ে পড়াটা ঘটনা হিসেবে বেশ চিন্তাজাগানিয়া হলেও পানিপথের ইতিহাস পাঠের সঙ্গে এর সংযোগকে সমাপাতনিক বা আকস্মিক বলে ধরে নেওয়াই ভালো। তবে তার বাইরেও ভূদেব লিখিত গ্রন্থের ভূমিকাতে এই অসুস্থতার আলাদা তাৎপর্য আছে। ভূদেব অসুস্থ বোধ করেছেন, তাই রচনাটি পাঠে নিবৃত্ত হয়েছেন। আর সেই ফাঁকে তাঁর মনে খেলে গেছে এক অদ্ভুত কল্পনা, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অন্যরূপে সমাপ্ত হলে কী হতো। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ভূদেব তাঁর বিচিত্র কল্পনায় একই সঙ্গে দুটি জিজ্ঞাসার সূত্র তৈরি করেছেন। প্রথমত, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের পরিণতি অন্য কী রকম হতে পারত? দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের পরিণতি অন্য রকম হলে ভারতবর্ষের হালসুরত কেমন হতো? তাঁর <em>স্বপ্নলব্ধ</em> সমগ্র রচনাটিই বলতে গেলে এই দুই জিজ্ঞাসাকে এক কল্পিত সুতায় বাঁধার নিবিড় চেষ্টা।</p><p>ভূদেব তাঁর গ্রন্থের ভূমিকার পরবর্তী অংশে যে দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন তাতে দেখা যাবে, এই সৃজনকল্পকে তিনি কিছুটা দৈবগুণে প্রাপ্ত বাণী বলেও মনে করেছেন। যেন কেবল ‘আমি’ নয়, আরেক ‘পশ্চাতের আমি’ও তাঁর লিখনে পাশাপাশি সক্রিয় থেকেছে। যেন স্বপ্নে পাওয়া, কিন্তু স্বপ্নের অনুঘটককে চেনার উপায় নেই, তাই রচয়িতাকে সৃজনকর্মটির নামের সঙ্গে ‘স্বপ্নলব্ধ’ কথাটা জুড়ে দিতে হয়েছে। তাঁর ভূমিকার শেষাংশে একখণ্ড শাস্ত্রকথা আছে, ‘স্বপ্নলব্ধ ঔষধ এবং উপদেশ কদাপি অগ্রাহ্য নহে’ (ভূদেব ২০১৪)। ভূদেবের কাছে ‘স্বপ্ন’ নিত্যযাপনের বিমূর্ত চলচ্চিত্র বা আয়নাবাজি নয়। তাঁর জগতে স্বপ্ন এমন সক্রিয় সম্ভাব্যতা, যাকে অগ্রাহ্য করা যায় না।</p><p>৩.</p><p>আত্মীয়রচিত তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের ইতিহাস পড়তে গিয়ে ভূদেব যুদ্ধের যে অন্য রকম পরিণতি কল্পনা করেন, তার রূপ ক্রমে স্বচ্ছ হয় <em>স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস</em>-এর প্রথম পরিচ্ছেদে। ভূদেবের স্বপ্নকল্পিত বিকল্প ‘পানিপথে’র যুদ্ধ সমাপ্ত হয় মহারাষ্ট্রীয় শক্তির বিজয়ের মধ্য দিয়ে। মারাঠা সেনাপতিদের সুচতুর যুদ্ধকৌশলের কাছে পরাস্ত হয় আহমদ শাহ আবদালী দুররানির নেতৃত্বে সংগঠিত মুসলিম বাহিনী। যুদ্ধের অন্তিমলগ্নে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধরত আহমদ শাহ আবদালীর কাছে মহারাষ্ট্রীয়দের বন্দী কাশীরাজ বিশেষ দূত রূপে আবির্ভূত হন। মহারাষ্ট্রীয়দের বিশেষ দূত কাশীরাজের মুসলিম শিবিরে আগমন যে বার্তা বয়ে আনে তার মূল কথা, ‘ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া যদিও বরাবর অনিষ্ট ঘটিয়াছে, তথাপি হিন্দুদিগের জাতীয় প্রকৃতির অন্যথাচরণ হইতে পারে না। হিন্দুরা পূর্বের ন্যায় এক্ষণেও সদয় আচরণ করিতে প্রস্তুত। আপনি নিজ দলবল সহিত নির্বিঘ্নে স্বদেশে গমন করুন’ (ভূদেব ২০১৪, ৩১)। এই বার্তার মূলকথা, ‘ক্ষমাশীলতা’, যার ওপর ‘হিন্দু জাতীয়তা’ প্রতিষ্ঠিত। ভূদেবের কল্পনায় ক্ষমা হিন্দু জাতির মৌলিক প্রকৃতি, তাই সুনিশ্চিত বিজয় এবং মুসলিম বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করার সুযোগ থাকার পরও মহারাষ্ট্রীয়দের পক্ষ থেকে সন্ধিপ্রস্তাব পাঠানো সম্ভব হয়। এভাবে হিন্দু জাতির জাতীয়তা এবং চৈতন্য যে পৃথক ধাতুতে গড়া, তার রূপ ভূদেবের স্বপ্নকল্পনায় শুরু থেকেই স্পষ্ট হতে থাকে।</p><p>এভাবে হিন্দুপ্রকৃতির ক্ষমাশীলতার স্মারক হিসেবে সন্ধিপ্রস্তাব এবং যুদ্ধে মহারাষ্ট্রীয়দের বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রথম পরিচ্ছেদের সমাপ্তির পর ভূদেব মনোনিবেশ করেন তাঁর কল্পনায় স্থিত দ্বিতীয় জিজ্ঞাসায়। যেখানে পরবর্তী ৯ পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত তাঁর কল্পনায়ুদ্ধের পরিণতি অন্য রকম হলে ভারতবর্ষের হালসুরত কেমন হতো, এর জবাব দিয়ে যায়।</p><p>ভূদেবকল্পিত ভারতবর্ষের বিকল্প ইতিহাসে অখণ্ড ভারতের সম্রাট হবেন রামচন্দ্র। সপ্তদশ মোগল সম্রাট ‘মহামতি শাহ আলম’ স্বেচ্ছায় তাঁকে মুকুট পরিয়ে দেবেন। ভূদেবের রামচন্দ্র কল্পিত চরিত্র। মারাঠা ইতিহাসে দ্বিতীয় শিবাজিপুত্র ‘রাম’ নামে পরিচিত। এই পরিচয় ভূদেবের স্বপ্নলব্ধ ইতিহাসের বাস্তব ভিত্তি। কিন্তু এর বাইরেও ভূদেবের কল্পনায় ‘রামচন্দ্র’-এর পৌরাণিক তাৎপর্যও আছে, নামে তার মহিমা বোঝা যায়। ইতিহাসের রাম আর মিথের রামচন্দ্র একাকার হয়ে যে চরিত্রটি দাঁড়ায়, তাকে অগ্রে রেখে অখণ্ড ভারতের সংবিধানের কল্পনা করেন ভূদেব। সেই সংবিধান সভা বসে মোগল দিল্লির প্রখ্যাত জুমা মসজিদে। সেই সভার সভাসদদের কথোপকথনে ‘রাম’ নামের আরেক রূপ প্রস্ফুটিত হয়, ‘যে রাম সেই রহীম, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়’ (ভূদেব ২০১৪, ৩৭)। এই নাম ভূদেব বলিয়েছেন অধিবেশন সভায় উপস্থিত এক ব্রাহ্মণের কণ্ঠে এক মুসলমানের উদ্দেশ্যে। এমন কথা শুনে সেই শ্রোতা মুসলমানই-বা নীরব থাকবেন কেন। কণ্ঠে আরও একপ্রস্থ মধু মাখিয়ে তিনি উত্তর দিচ্ছেন, ‘ঠাকুর যথার্থ কহিয়াছেন, সমস্ত জগৎ সেই এক অদ্বিতীয় ঈশ্বরেরই বিভূতি মাত্র, মানুষভেদে যেমন আচরণভেদ, পরিচ্ছদভেদ, ভাষাভেদ তেমনি উপাসনার প্রণালিভেদও ভেদ হইয়া থাকে। সকলেই এক পিতার পুত্র। সেই পিতা ভিন্ন ভিন্ন পুত্রকে ভিন্ন ভিন্ন পোশাক পরাইয়া দেখিতেছেন। কিন্তু সকলেরই চামড়ার নীচে লহু লাল বই কাহারো কাল, কাহারো জরদ নহে’ (ভূদেব ২০১৪, ৩৭)। এ থেকে বোঝা যায়, ভূদেবের স্বপ্নলব্ধ অলীক রামরাজত্বের হিন্দু-মুসলমান ভারতের মসনদে রামচন্দ্রের অধিষ্ঠানকে কেমন সম্প্রীতির সঙ্গে বিবেচনা করে থাকবে। ভূদেবের রচনায় এই সম্প্রীতির অন্য গুরুত্বও আছে। স্বপ্নলব্ধ কল্পনার বয়ানে ভূদেব ভারতের যে সংবিধান ও রাষ্ট্রপরিকল্পনা হাজির করবেন, এমন চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রেক্ষাপট থাকলে তা পাঠকের কাছে অধিক নির্ভরযোগ্যও হবে। এই প্রেক্ষাপটে কল্পনার বিকাশে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ পরিবেশে অনুষ্ঠিত সভায় ক্রমে স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্রফলকে সংবিধান রচিত হতে থাকে। ভূদেবের কল্পিত ইতিহাসের সেই সংবিধানে অখণ্ড ভারতের যে রাজনৈতিক প্রকৃতি দাঁড় করানো হয়, তার প্রথম মর্মকথা, অখণ্ড ভারত হবে রাজতন্ত্র। দ্বিতীয় মর্মকথা, সমাজ (হিন্দুসমাজ) এবং গ্রাম (হিন্দুসমাজের প্রাণকেন্দ্র রূপে) হবে ভারতের রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থার প্রাণ। তৃতীয় মর্মকথা, ভারত-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো ‘ভগবান’-এর বিরাট মূর্তির মতো চার ভাগে বিন্যস্ত হবে। যার নিম্নভাগে থাকবে কৃষিজীবী, শিল্প-ব্যবসায়ী (ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অর্থে) ও শ্রমিক প্রজারা। অর্থ-প্রতিপত্তিসম্পন্ন বনিয়া সম্প্রদায় হবে এর মধ্যভাগ। সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্র হবে এর দুই বাহু। আর পণ্ডিতমণ্ডলী হবে এর মস্তিষ্ক। এই মিলিয়ে ভারতের যে বিরাট রাজনৈতিক শরীরটি দাঁড়াবে, ব্যবস্থাপক সভা হবে তার মুখ। ‘আত্মশুদ্ধি’, ‘নিষ্কাম ব্রত’, ‘পরার্থ’ আর ‘সহনশীলতা’ হবে ভারতীয়ের জাতীয় ভাব ও ভাবপ্রসূত চৈতন্যের চার স্তম্ভ। ভূদেবের দৃষ্টিতে এই চার স্তম্ভ হিন্দু জাতীয় প্রকৃতির গুণ। ফলে এটা স্পষ্ট যে ভূদেব দেখাতে চেয়েছেন, হিন্দু জাতীয়তাই অখণ্ড স্বাধীন ভারতের জাতীয় ভাব। এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই জিজ্ঞাসা দাঁড়ায়, অপরাপর ধর্ম-সমাজের মধ্যে কেনো অখণ্ড ভারতের জাতীয় ভাব গড়ে উঠবে না? এই জিজ্ঞাসার জবাব মিলবে হিন্দু জাতীয়তা প্রসঙ্গে ভূদেবের ভাবনা অনুসরণ এবং সেই ভাবনায় তাঁর দৃঢ় অবস্থানের উদ্দেশ্যের দিকে নজর দিলে। প্রথমত, ভূদেব মনে করেন, ‘ভারতভূমি যদিও হিন্দু জাতীয়দিগেরই যথার্থ মাতৃভূমি, যদিও হিন্দুরাই ইহার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তথাপি মুসলমানেরাও আর ইহার পর নহেন, ইনি উহাদিগকেও আপন বক্ষে ধারণ করিয়া বহুকাল প্রতিপালন করিয়া আসিতেছেন। অতএব মুসলমানেরাও ইহার পালিত সন্তান।’</p><p>ভূদেবের কথা ঘুরিয়ে বললে দাঁড়াচ্ছে, অপরাপর ধর্ম-সম্প্রদায়-সমাজ, যারা দীর্ঘদিন ভারতে বসবাস করছে, তারাও ভারতমাতার পর নয়। কিন্তু যেহেতু হিন্দুসমাজ এই মাতৃকার আপন সন্তান, ফলে জাতীয় ভাব নির্মাণের দায়িত্ব ও অধিকার তার ওপরই বর্তায়। দ্বিতীয়ত, ভূদেব মনে করেন, হিন্দুত্বের সঙ্গে অপরাপর ধর্ম-সম্প্রদায়ের স্পষ্ট ভাব ও দর্শনগত দূরত্ব আছে। এই দূরত্বের মানচিত্র পাওয়া যায় তাঁর <em>সামাজিক প্রবন্ধ</em> গ্রন্থে:</p><p>১. প্রাক্তন, পুরস্কার ও পরকাল—এই ত্রিশক্তিবাদী হিন্দু শান্তিপরায়ণ, পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল ও অনাসক্তচিত্ত।<br>২. ওইরূপ ত্রিশক্তিবাদী কিন্তু দ্রব্যগুনবাদতৎপর বৌদ্ধজাতীয়েরা শান্ত, পরিশ্রমী, ধৈর্যশালী ও সাধনশীল।<br>৩. ইচ্ছাশক্তি এবং পরকালবাদী খ্রিস্টধর্মী ইউরোপীয় অশান্ত, স্বৈরাচার, উদ্যমশীল ও ভোগসুখলিপ্সু।<br>৪. ইচ্ছাশক্তি এবং পরকালবাদী মুসলমান অশান্ত, স্বৈরাচার এবং সাম্যধর্মী। (ভূদেব ২০১০, ১৫১)</p><p>ভূদেবের দৃষ্টিতে এই সব ধর্মের মধ্যে একমাত্র হিন্দুধর্মই ‘একাত্মবাদী’; অর্থাৎ তার ‘আত্মপর’ নেই (ভূদেব ২০১০, ১৬৯)। ফলে বহু জাত, ধর্ম, সম্প্রদায়ে বিভক্ত ভারত ভাব ও বস্তুগত দিক থেকে যদি আত্মনির্ভরশীল হতে চায়, তবে হিন্দুত্ব ছাড়া তার অন্যথা হওয়ার সুযোগ নেই; অর্থাৎ যেহেতু অন্য ধর্ম-সম্প্রদায় (বিশেষ করে খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম) একাত্মবাদ ও পরার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় এবং যেহেতু হিন্দুধর্ম একাত্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার ‘আত্মপর’ নেই (এই বিচারের সঙ্গে সংযুক্তি রূপে এ-ও বলে রাখা যেতে পারে যে হিন্দুধর্মে শয়তান বা absolute evil-এর উপস্থিতি নেই), সেহেতু হিন্দুসমাজের সঙ্গেই অপরের মিলন সম্ভব বলে ভূদেব মনে করেন। তাঁর দৃষ্টিতে একাত্মবাদ ও মিলন সম্ভাব্যতা জাতীয় ভাব নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রত্যয়। হিন্দুধর্মে এই প্রত্যয় ‘সাদৃশ্যে’র ধারণার সঙ্গে যুক্ত। ভূদেবের দৃষ্টিতে সাদৃশ্যের উপলব্ধি দুই ধরনের, ‘উহা বিধিমুখেও হয় আর নিষেধমুখেও হয়’ (ভূদেব ২০১০, ১৩১)। এই সাদৃশ্য ধারণাটিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে সুদীপ্ত কবিরাজ দেখান :</p><p><sup>According to Indian logic, similarity is a term with a dual meaning. It can mean that objects A and B are directly similar, placed in a relation of identity or indiscernible resemblance. But even if A and B are not directly similar, they may exhibit a negative similarity. B may not be identical to A, but its difference from A may be negligible compared to its differences with C, D, E, etc. (কবিরাজ ২০১০, ২৫৯)</sup></p><p>অর্থাৎ ভারতীয় যুক্তিবিদ্যায় সাদৃশ্য যেমন ‘তুমি’ ‘আমার’ মতো, এভাবে নির্ণয় করা যায়। তেমনি আবার ‘তুমি’ ‘আমার’ মতো না হলেও ‘তার’ চেয়ে ‘তোমার’ সঙ্গে ‘আমার’ মিল বেশি অথবা ‘তার’ চেয়ে ‘তুমি’ ‘আমার’ কাছের, এভাবেও নির্ণয় করা যায়। ফলে সাদৃশ্য এমন ধারণা, যার সাহায্যে ‘হ্যাঁ’ বা ‘বিধি’ এবং ‘না’ বা ‘নিধি’ দুই পথেই মিলন সম্ভব। আর এই সাদৃশ্যের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে হিন্দুধর্মে অপরত্ব বলে কিছু থাকে না।</p><p>এই ধারণা থেকেই ভূদেবের জাতীয়ভাবে মুসলমান এবং অপরাপর ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের যে সুনির্দিষ্ট স্থান থাকবে, তার চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু ভূদেবের অখণ্ড স্বাধীন জাতীয় ভাব নির্মাণের জন্য এত উদ্যোগের প্রয়োজন বোধ হচ্ছে কেন? কারণ নিহিত আছে তাঁর উপনিবেশ ও ঔপনিবেশিকের সংস্কৃতিবিরোধী প্রবল অবস্থানে। উনিশ শতকের সমাজচিন্তকদের মধ্যে ভূদেবই প্রথম স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে ব্রিটিশ উপনিবেশের ছায়ায় সংগঠিত ভারত একপ্রকার অখণ্ড রূপ পেয়েছে বটে, কিন্তু অনবরত ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির অনুকৃতিজাত হীনতা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বা ইউরোপীয় সংস্কৃতির ভ্রান্তবিলাস তার জাতীয় চরিত্রকে নষ্ট করে ফেলছে। স্বাধীন জাতীয় ভাব ছাড়া এই দশা থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও জিজ্ঞাসা থাকে, ঔপনিবেশিক ভাবের বিপরীতে ভূদেবের জাতীয় ভাবকেন্দ্রিক স্বপ্নকল্পনায় ‘সাম্রাজ্য’-এর প্রয়োজন পড়ল কেন। অন্যভাবে বললে, তাঁর বিকল্প তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের ওপর প্রতিষ্ঠিত রামরাজ্যকে কেন সাম্রাজ্যই হতে হবে? ভূদেব কিন্তু শুধু সাম্রাজ্যের কল্পনাতেও থেমে থাকেননি। তিনি তাঁর স্বপ্নলব্ধ ভারতকে রীতিমতো সমুদ্রবাণিজ্য ও সমরসম্ভারে সজ্জিত একটি মহাশক্তি হিসেবে কল্পনা করেছেন এবং এই কল্পনার কারণকে নির্দিষ্ট করেছেন যুগধর্মে (ভূদেব ২০১৪, ৪৪-৫০)। ফলে দেখা যাচ্ছে, তাঁর স্বপ্নকল্পনার ‘হতে পারত’র মধ্যে এক ‘হয়ে আছে’ বিদ্যমান। অনুমিত হয়, তাঁর কল্পনায় এই ‘হয়ে আছে’র আবির্ভাব ঘটেছে ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার সূত্রেই। এ ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসা দাঁড়ায়, ভূদেবের স্বকীয়তার অলীক কল্পনার সঙ্গে পরকীয় বাস্তবতার মিলনের মধ্য দিয়ে সৃজিত এই যে খোয়াব, তা কি স্রেফ কল্পনার খাতিরে কল্পনা? এক ‘হতে পারত’র সঙ্গে এক ‘হয়ে আছে’র যুগলবন্দীতে কী ‘হতে পারে’ নামের এক সম্ভাব্যতাও উঁকি দিয়ে যায় না? <em>স্বপ্নলব্ধ ইতিহাস</em> নামে ভূদেব যে স্বপ্ন হাজির করেন, তা আর যা-ই হোক, অতীতমুখী নয়। প্রফেটিক ও ভিশনারি উপাদান তাতে এত প্রবল মাত্রায় আছে যে তাকে ভারতবর্ষের কল্পিত সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ‘আশা’রূপে দেখলেও বাড়িয়ে দেখা হয় না।</p><p>৪.</p><p>কায়কোবাদের <em>মহাশ্মশান</em> কাব্যের গ্রন্থরূপে আবির্ভাবের সময়টা বেশ চিন্তাকর্ষক। বঙ্গভঙ্গের এক বছর আগে, তখন এই কাব্য প্রকাশ পেয়েছিল। সেকালে বাংলার রাজনৈতিক আবহ কেমন ছিল, তা বোধ করি সহজে অনুমেয়। সেকালে এই কাব্য যে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল, তার কথা নিবন্ধের শুরুতেই উল্লিখিত আছে। বিশেষ করে বাংলার মুসলমান সমাজে এই কাব্যের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বেশি। সে সময় এই কাব্যের আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন ফজলর রহমান খাঁ, সৈয়দ এমদাদ আলী, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীরা। আবার এই কাব্যের প্রশংসা করে দীর্ঘ রচনা লিখেছিলেন আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন। এর মধ্যে <em>মহাশ্মশান</em> প্রসঙ্গে সেকালের বাঙালি মুসলমান সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ভালো বোঝা যায় মোহাম্মদ শামসুদ্দীনের ‘মহাশ্মশান কাব্য’ নামে রচিত প্রবন্ধের শেষাংশের বর্ণনায় :</p><p><sub>...কতিপয় দোষ এবং কাব্যগত আরও কিছু কিছু ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মহাশ্মশান যে আমাদের জাতীয় সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠতম এবং ভাষা জননীর অন্যতম সুন্দর অলংকার তৎসম্বন্ধে আশা করি কোনরূপ মতদ্বৈধ হইবে না। বাঙ্গালী মুসলমানদের দুর্ভাগ্য যে, তাঁহারা এমন সুন্দর কাব্যের সমাদর করিতে পারিতেছেন না। (শামসুদ্দীন ১৯৯৪, ৪১৫)</sub></p><p>মোহাম্মদ শামসুদ্দীনের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে মুসলিম সমাজে এই কাব্য যতটা আদর পাওয়ার কথা, ততটা পায়নি। বিশেষ করে মুসলিম নারী চরিত্র নির্মাণে কায়কোবাদ যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, বাঙালি মুসলিম সমাজ তাকে যথেষ্ট রুচিশীল সৃজন বলে মনে করেনি। এর বাইরেও <em>মহাশ্মশান</em>-এর একটি বিশেষ তাৎপর্যের কথা মোহাম্মদ শামসুদ্দীনের বক্তব্যে স্পষ্ট। শামসুদ্দীন এই কাব্যকে জাতীয় সাহিত্য বলে অভিহিত করেন। কারণ, এই কাব্যের প্রেক্ষাপট, বিষয় ও ব্যাপ্তি। কায়কোবাদও যে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি জাতীয় ঘটনা হিসেবে মনে করেছেন, তা গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণের উৎসর্গপত্রেই উল্লেখ আছে (শামসুদ্দীন ১৯৯৪, ৩৫১)। কবির দৃষ্টিতে কাব্যটিতে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ ঘিরে জাতীয় ভাবের আধার খোঁজার চেষ্টা আছে। সেই আধারের সন্ধান যে কায়কোবাদ <em>মহাশ্মশান</em>জুড়ে করে গেছেন, তার উদাহরণ কাব্যের বহু স্থানে ছড়িয়ে আছে। কায়কোবাদ বোধ করেন, তাঁর কাব্য এবং কাব্যের বিষয় ‘জাতীয় গৌরবের মহাশ্মশান’ (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৫১) এবং সেই গৌরবের সঙ্গে জুড়ে দেন ‘আমাদের’ শব্দটি। এই ‘আমাদের’ বলতে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতিকেই বোঝাতে চান। <em>মহাশ্মশান</em>-এ তার প্রমাণও পাওয়া যায়।</p><p><em>মহাশ্মশান</em>-এ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে উপজীব্য করে জাতীয়তার বোধ বিরাজমান থাকে ঘটনার সমাবেশে, চরিত্রদের দৈনন্দিন বীরত্ব, প্রেম, প্রতারণা, বিরহ, হিংসা, আক্রোশ, লিপ্সা, খেউর, কামনা, নৈতিকতা, ধর্মবোধ, ছোট ছোট বিজয়ের উল্লাস এবং ছোট ছোট পরাজয়ের গ্লানির মতো মানবিক প্রকাশ, অনুভব ও অনুভূতির মধ্যে। ভূদেবের মতো কায়কোবাদ বিকল্প ইতিহাসের বৈপ্লবিক কল্পনা করেননি। <em>স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস</em>-এর মতো জাতীয়ভাবের বিপুল প্রজ্ঞাদীপ্ত দার্শনিক অভিজ্ঞান <em>মহাশ্মশান</em>-এ নেই। কথাটি ঘুরিয়ে বললে, এই কাব্যে আছে দার্শনিক অভিজ্ঞানের প্রতিস্থাপনা রূপে মানবিক অনুভব। তিন খণ্ডে রচিত এই বিশাল আখ্যানের প্রথম খণ্ড পরিক্রমণিত হয় জোহরা বেগম-ইব্রাহিম কার্দি এবং হিরণবালা-আতা খাঁ প্রণয়-সম্বন্ধের নানান ঘাত-প্রতিঘাতকে কেন্দ্র করে। একদিকে প্রেম, ব্যক্তি-সম্পর্ক; অন্যদিকে ধর্ম, সম্প্রদায় ও কর্মনীতি তাদের জীবন দ্বিখণ্ডিত করে রাখে একাধারে মানবিক ও সত্তার সংকট রূপে বিরাজমান থেকে। ফলে দেখা যায়, আখ্যানে প্রধান প্রধান চরিত্রের মনে একাধারে সামষ্টিক পরাজয়ের ভীতি এবং প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা দুই-ই সমানভাবে সক্রিয়। বলাবাহুল্য, অস্তিত্বের এই প্রবল টানাপোড়েনের মৌলিক কারণ ‘পানিপথের তৃতীয় সমর’। কাব্যের তৃতীয় খণ্ডে সেই সমর এক প্রকাণ্ড সংঘটন রূপে আবির্ভূত হয়, যা শেষ হয় মুসলিম শিবিরের বিজয় ও মারাঠা শিবিরের বিনাশের মধ্য দিয়ে। আখ্যানের শেষ ভাগে বিজয়ী ও বিজিত—উভয় পক্ষের মানসে বেদনার গাঢ় অনুভূতিই স্থায়ী দাগ হয়ে থেকে যায়। দেখা যায়, চরিত্রের প্রত্যেকেই মহাযুদ্ধের ভেতর চলমান নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধে পরাজিত। কেউ নিহত, কেউ পরাভূত। সমগ্র রণক্ষেত্রে যেন একই সুর গুঞ্জরিত, ‘যে রত্ন হারায়ে গেনু এ জন্মের মত/ পানিপথ যুদ্ধক্ষেত্রে সরস্বতী তীরে!/ আর না পাইব তাহা; যুদ্ধে জয়ী হনু/ তাহাতে কী লাভ মোর? ভিখারীর মত/ ভগ্ন প্রাণ নিয়ে আমি চলিনু স্বদেশে!/ সব শূন্য মোর কাছে শূন্য মোর হৃদি,/ শূন্য গৃহ, শূন্য মোর রাজ-সিংহাসন!/ এ শূন্য কি দিয়া আমি করিব পূরণ?’ (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩১৩)। মহাভারতের ‘স্ত্রী পর্ব’-এর মতো মহাবিজয়ের উল্লাস নয়, <em>মহাশ্মশান</em>ও সৌন্দর্য ছড়ায় অসংখ্য ছোট ছোট হারিয়ে ফেলার বেদনা, মানুষের নিজের কাছে নিজের পরাজয়ের শোকগাথায়। হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে সব চরিত্রের মধ্যে এমন মানবিক অনুভূতিগুলোর সমান্তরাল উপস্থিতি কাব্যটিকে জাতীয় চরিত্র দেয়। এই চরিত্র থেকে উত্থিত ভাব ভারতবর্ষের দুই প্রধান ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে অনুভবের অলীক সাম্যাবস্থা তৈরি করে বটে, কিন্তু তা বাস্তবিক রাজনৈতিক মীমাংসার দিকে অগ্রসর হয় না। কায়কোবাদের তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের জাতীয় বয়ান তাই ইতিহাসের প্রচলিত পথে অগ্রসর হতে হতে হিন্দু-মুসলমান দুই বীর জাতির হয়ে এই গৌরবেই আশ্রয় খুঁজে ফেরে। এক যুদ্ধের আখ্যান-কল্পনায় একাকার না হয়ে তারা রাজনৈতিকভাবে দুই শিবিরেই বিভক্ত থেকে যায়। এই আখ্যান কোনো রাজনৈতিক মোহনায় মেলে না। অমীমাংসা তার মীমাংসা হয়ে থেকে যায়। আর এই কাব্যকল্পনার ফাঁক গলে এমন অশনিসংকেতও কবির শিহরণের কারণ হয় যে মারাঠাদের কবল থেকে ভারতের মুসলমানদের রক্ষায় কাবুলের অধিপতি আহমদ শাহ আবদালী যদি এগিয়ে না আসতেন এবং মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধ না করতেন, তাহলে ইতিহাসের পাতা ও ভারতের মানচিত্র অন্য বর্ণে রঞ্জিত হতো (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৫৯-৩৬০)। <em>মহাশ্মশান</em>-এর তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় কায়কোবাদ আরও বলেন :</p><p>যদিও এই পানিপথের মহাযুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানদেরই জয় হইয়াছিল বটে, কিন্তু ইহার ফল ভোগ করিবার শক্তি তখন তাঁহাদের আদৌ ছিল না। কারণ এই মহাযুদ্ধে উভয় শক্তিই একেবারে বিধ্বস্ত হইয়া গিয়াছিল।...যুদ্ধ জয়ের কিছুকাল পরেই মহাবীর আহমদ সাহ্ আব্দালী নিজ দেশে চলিয়া যান, ঠিক সেই সময় সেই সঙ্কটময় দুর্দিনে ভারতীয় মুসলমানদের সৌভাগ্যবশতই ইংরেজগণ ভারতে আগমন করিয়া তাঁহাদের সাম্রাজ্যের ভিত্তি পত্তনের চেষ্টা করিয়াছিলেন, এবং এই মহাযুদ্ধই তাহাদের সেই ভিত্তি পত্তনের পথ সুগম করিয়া দিয়াছিল।...ভারতীয় মুসলমানদের উপরে জগদীশ্বরের অপার করুণা বলিয়াই ভারতে ইংরেজগণের আগমন হইয়াছিল। নচেৎ আহমদ সাহ্ আব্দালী চলিয়া যাওয়ার অব্যবহিত পরেই ভারতীয় কোনও না কোন হিন্দু সম্প্রদায়ের তীক্ষ্ণধার অসির আঘাতে ভারতের নগরে নগরে পল্লীতে পল্লীতে আবার সেই মুসলমান নর-নারীর প্রাণের পবিত্র শোণিতে রক্ত-প্রবাহিনী বহিয়া ভারতীয় মুসলমানদিগকে গিরি গুহায় ও বনেজঙ্গলে আশ্রয় লইতে হইত। তাই বলিতেছি, ভারতে ইংরেজগণের আগমনে ও তাঁহাদের রাজত্বের ভিত্তি পত্তনে মুসলমানদের উপকার বই অপকার হয় নাই। (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৬০)</p><p>ফলে দেখা যাচ্ছে, ভূদেব সৃজিত ভারতের স্বপ্নলব্ধ বিকল্প ইতিহাস কায়কোবাদের কল্পনাতীত। তাঁর দৃষ্টিতে আহমেদ শাহ আবদালীর ভারতে আগমন, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় এবং ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্রিটিশদের হাতে না গেলে বা এর অন্যথা হলে ভারতীয় মুসলমানের আত্মবিনাশ ও বিলয় ছাড়া অন্য কোনো পরিণতির কথা তিনি ভাবতেই পারেননি। কবিচৈতন্যের এই অভাব একদিকে যেমন ঔপনিবেশিকদের উপস্থিতির নৈতিক বৈধতার ক্ষেত্র তৈরি করে, আবার অন্যদিকে ভূদেবের অখণ্ড স্বপ্নিল ভারতের ভাবকল্পের বিপরীতে এক বিরাট ‘নাহং’ হয়ে দাঁড়ায়। সাতচল্লিশ পেরিয়ে উপমহাদেশের ওপর দিয়ে এখনো যে ভাব আর পরিচয়-সংকটের লু হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, তার একপ্রকার আদিরূপ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে ঘিরে ভূদেব আর কায়কোবাদের ভাবকল্পের বৈপরীত্যের মধ্যেই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।</p><p>৫.</p><p>কোনো দেশে জাতীয় চৈতন্য বাস্তব জমিনে পা রাখার আগে জাতি-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের অগ্রবর্তী সমাজ ও সমাজের বিদ্বৎজনের কল্পনায় আসে। সেই কল্পনা আকার পেতে থাকে জাতীয় ইতিহাসের কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। কল্পনা প্রতীকায়িত হয় এবং ক্রমে সামূহিক চৈতন্যের অংশ হয়ে যায়। এমনকি জাতীয় ভাব বাস্তব চেহারা নেওয়ার পরও কিন্তু কল্পনার এই অভিযাত্রা থেমে থাকে না (রণজিৎ ২০১৯, ১২৭)। ইতিহাসে প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়, জাতীয় ভাব ও কল্পনার নেতৃত্ব থাকে অগ্রবর্তী শ্রেণির হাতে। আর সেই শ্রেণির মধ্যে যে জাতীয় ভাব ও কল্পনা গড়ে ওঠে, তার সংকট ও সম্ভাবনার আয়না হয়ে ওঠে সেই শ্রেণির সাহিত্য (রণজিৎ ২০১৯, ১২৯)। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের <em>স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস</em> ও কায়কোবাদের <em>মহাশ্মশান</em>-এর মধ্য দিয়ে এ কথা আরও স্পষ্ট রূপে দৃশ্যমান হয়। এটা দেখা যায় যে একই ঘটনায় একজন যেখানে পরাজয়ের গ্লানি বোধ করেন, অন্যজন সেখানে জাতীয় গৌরব খুঁজতে প্রবৃত্ত হন। একই ইতিহাসের বিকল্প কল্পনা একজনের কাছে ‘আশা’রূপে হাজির হলে অন্যজনের কাছে তা হাজির থাকে ‘অকল্পনীয় আতঙ্ক’রূপে। আবার দুজনের দুই ভাব অনুভবে ঔপনিবেশিকতা হাজির থাকে বিচিত্ররূপে। ভূদেবের কল্পনায় রামসাম্রাজ্যের কাঠামো তৈরি হয় ঔপনিবেশিক যুগধর্মের তরিকায়। কায়কোবাদের মানসপটে ভারতে ঔপনিবেশিকের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ভারতীয় মুসলমানের পরিত্রাতা রূপে আবির্ভূত হয়। আর এসবের মধ্য দিয়ে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত বাংলার দুটি অসামান্য রচনা, সাহিত্যকর্ম হয়ে ওঠার পাশাপাশি ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ ও বাংলার প্রতিনিধিত্বশীল শ্রেণির অভিন্ন জাতীয় ভাব নির্মাণে ব্যর্থতার সাক্ষ্যও বহন করে চলে।</p><p><strong>রচনাপঞ্জি</strong></p><p><sub>ওয়াজেদ ১৯৯৪।। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ‘মহাশ্মশান সম্বন্ধে দুই একটি কথা’, </sub><em><sub>কায়কোবাদ রচনাবলী</sub></em><sub> (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ঢাকা: বাংলা একাডেমি।</sub></p><p><sub>কবিরাজ ২০১০।। Sudipta Kaviraj, ‘The Reversal of Orientalism : Bhudev Mukhopadhyay and the Project of Indigenist Social Theory’, </sub><em><sub>The Imaginary Institution of India : Politics and Ideas</sub></em><sub>, New York: Columbia University Press।</sub></p><p><sub>কায়কোবাদ ১৯৯৪।। কায়কোবাদ, </sub><em><sub>মহাশ্মশান</sub></em><sub>, </sub><em><sub>কায়কোবাদ রচনাবলী</sub></em><sub> (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ঢাকা: বাংলা একাডেমি।</sub></p><p><sub>ভূদেব ২০১০।। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, ‘সামাজিক প্রবন্ধ’, </sub><em><sub>প্রবন্ধসমগ্র</sub></em><sub>, মনস্বিতা সান্যাল ও রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, কলকাতা: চর্যাপদ।</sub></p><p><sub>ভূদেব ২০১৪।। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, </sub><em><sub>স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস</sub></em><sub>, গায়ত্রী ভট্টাচার্য সম্পাদিত, কলকাতা: চর্যাপদ।</sub></p><p><sub>রণজিৎ ২০১৯।। রণজিৎ গুহ, ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’, </sub><em><sub>রচনাসংগ্রহ ১</sub></em><sub>, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।</sub></p><p><sub>শামসুদ্দীন ১৯৯৪।। আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন, ‘মহাশ্মশান কাব্য’, </sub><em><sub>কায়কোবাদ রচনাবলী</sub></em><sub> (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ঢাকা: বাংলা একাডেমি</sub></p><p><strong>লেখক পরিচিতি</strong> </p><p>ইমরান কামাল, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: imrankamal@ban.ku.ac.bd</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-18/sghrbukv/imran-kamal-pic.jpg"></figure><p>নোট: আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত। দেখুন, <em>প্রতিচিন্তা</em>, দ্বাদশ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২২। </p>

অক্টোবর ১৯, ২০২৬
সেকেন্ডে বাইক চুরি করে বিক্রি হতো ৫০ হাজার টাকায়
সেকেন্ডে বাইক চুরি করে বিক্রি হতো ৫০ হাজার টাকায়

<p>মাত্র কয়েক সেকেন্ডে মোটরসাইকেল চুরির সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর মাঠে নামে ডিবি। ঢাকা, কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে টানা অভিযানে চোর চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার, উদ্ধার ৯টি চোরাই বাইক। বিস্তারিত ভিডিও প্রতিবেদনে...</p><figure></figure>

অক্টোবর ১৯, ২০২৬
বর্জ্য সরিয়ে বৃক্ষরোপণ, ঢাকা জেলা প্রশাসনের প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী
বর্জ্য সরিয়ে বৃক্ষরোপণ, ঢাকা জেলা প্রশাসনের প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী

<p>ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের পাশে ময়লা অপসারণ, মাটি ভরাট, পালিসেডিং, সারফেস ড্রেন নির্মাণ ও নেটিংসহ সবুজায়ন প্রকল্পের প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিস্তারিত ভিডিওতে...</p><figure></figure>

অক্টোবর ১৮, ২০২৬
আর্সেনালের জয়, ইউনাইটেডের দুর্দশা চলছেই
আর্সেনালের জয়, ইউনাইটেডের দুর্দশা চলছেই

৮০ মিনিটে করা একমাত্র গোলে নটিংহাম ফরেস্টের মাঠ থেকে জিতে ফিরেছে আর্সেনাল। অন্য ম্যাচে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ড্র করেছে লিডসের সঙ্গে।

অক্টোবর ১৮, ২০২৬
Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন