<p>রাতে সাত-আট ঘণ্টা ঘুমানোর পরও সকালে বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করে না অনেকের। চোখ খুললেও মনে হয়, শরীর যেন ভারী হয়ে আছে। মাথা ঝিমঝিম করে, কাজে মন বসে না। এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অথচ ঘুম হয়েছে প্রায় সাত-আট ঘণ্টা। সময়টা তো কম হয়নি। তাহলে সমস্যা কোথায়? পর্যাপ্ত ঘুমের পরও এই ক্লান্তির কারণ কী? এর উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে আপনার ঘুমের গভীরতা, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসের মধ্যে। চলুন দেখে নেওয়া যাক।</p><aside><a href="https://www.bigganchinta.com/biology/p2qnkml1lj">বিকেলে ঘুম থেকে উঠলেই বিষণ্ণ লাগে কেন</a></aside><blockquote>রেস্টলেস লেগস সিনড্রোমে বিশ্রামের সময় পায়ে অস্বস্তিকর অনুভূতি হয়। পা নাড়াচড়া করলে তা কিছুটা কমে। ফলে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে।</blockquote><h2><strong>ঘুমের সঙ্গে সুস্থতার সম্পর্ক</strong></h2><p>ঘুমের সঙ্গে শরীরের সুস্থতার সম্পর্ক বেশ গভীর। এ সময় শরীর বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়াও পরিচালনা করে। মস্তিষ্ক সারা দিনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি গুছিয়ে নেওয়ার কাজ করে। কিন্তু ঘুমের সময় যথেষ্ট হলেও ঘুম যদি বারবার ভেঙে যায়, তাহলে সকালে উঠে ক্লান্তি অনুভব করাটাই স্বাভাবিক। আসলে কতক্ষণ ঘুম হলো, সেটাই বড় কথা নয়; ঘুম কতটা নির্বিঘ্ন হলো, সেটাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।</p><h2><strong>স্লিপ অ্যাপনিয়া ও অন্যান্য ব্যাধি</strong></h2><p>পর্যাপ্ত ঘুমের পরও ক্লান্ত লাগার একটি কারণ হতে পারে স্লিপ অ্যাপনিয়া। এটি এমন একধরনের ঘুমের অসুখ, যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে অথবা শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা তৈরি হয়। ফলে মস্তিষ্ক শরীরকে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে সাহায্য করার জন্য বারবার ঘুমের গভীরতা কমিয়ে দেয়। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি পুরোপুরি জেগে ওঠেন না। এমনকি রাতের এসব ঘটনার কথা তাঁর মনেও থাকে না। কিন্তু এতে ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও ক্লান্তি অনুভূত হয়।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-14/blotr8fn/68dbdc87595bf2136c1a26eaGroup-2.jpg"><figcaption>স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন এক ধরনের ঘুমের অসুখ, যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে অথবা শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা তৈরি হয়</figcaption></figure><p>ঘুমের আরও বেশ কিছু সমস্যাও একই ধরনের উপসর্গ তৈরি করে। যেমন অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া, রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম এবং নারকোলেপসি। রেস্টলেস লেগস সিনড্রোমে বিশ্রামের সময় পায়ে অস্বস্তিকর অনুভূতি হয়। পা নাড়াচড়া করলে তা কিছুটা কমে। ফলে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। অন্যদিকে নারকোলেপসিতে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেয়।</p><aside><a href="https://www.bigganchinta.com/cause/ly7h5rawqs">শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুম কেন দরকার</a></aside><blockquote>ঘুমের সময় যথেষ্ট হলেও ঘুম যদি বারবার ভেঙে যায়, তাহলে সকালে উঠে ক্লান্তি অনুভব করাটাই স্বাভাবিক। আসলে কতক্ষণ ঘুম হলো, সেটাই বড় কথা নয়; ঘুম কতটা নির্বিঘ্ন হলো, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।</blockquote><h2><strong>শারীরিক সমস্যা ও পুষ্টির অভাব</strong></h2><p>ঘুমের ঘাটতি ছাড়াও শরীরের কিছু সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতায় সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, আয়রনের ঘাটতি কিংবা কিছু ভিটামিনের অভাব এর পেছনে দায়ী হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণেও ঘুম থেকে ওঠার পর ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ক্লান্তি মানেই যে শরীরে কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের অভাব রয়েছে, তা কিন্তু নয়।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-14/rjhwk6c5/sleepy_woman_tired.jpg"><figcaption>দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণেও ঘুম থেকে ওঠার পর ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে</figcaption></figure><p>একই উপসর্গের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই নিজের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে আয়রন বা ভিটামিনের ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। চিকিৎসক উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে রক্ত পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন।</p><aside><a href="https://www.bigganchinta.com/biology/pbyyyisz1f">৪৫ মিনিটের ঘুম মস্তিষ্কের শেখার ক্ষমতা বাড়ায়</a></aside><blockquote>দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণেও ঘুম থেকে ওঠার পর ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ক্লান্তি মানেই যে শরীরে কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের অভাব রয়েছে, তা কিন্তু নয়।</blockquote><h2><strong>ঘুমের পরিবেশ ও মেলাটোনিন হরমোন</strong></h2><p>ঘুমের পরিবেশকে আমরা অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। অথচ পরিপূর্ণ ঘুমের জন্য ঘরের আলো, শব্দ ও তাপমাত্রা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত গরম ঘর, রাস্তার যানবাহনের শব্দ কিংবা জানালা দিয়ে আসা তীব্র আলো ঘুমের মধ্যে বারবার ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। আলোর সঙ্গে ঘুমের সম্পর্ক আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীরের জৈবিক ঘড়ি আলো-অন্ধকারের সংকেত অনুসরণ করে। অন্ধকার বাড়লে মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নিঃসরণের সংকেত তৈরি হয়। মেলাটোনিন মূলত একধরনের হরমোন, যা আমাদের ঘুমের প্রস্তুতিতে সাহায্য করে। রাতে উজ্জ্বল আলো মেলাটোনিনের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করতে পারে।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2024-08-09/2m8rs7y0/pexels-cottonbro-6940872.jpg"><figcaption>নিয়মিত বিছানায় ফোন ব্যবহার করলে বিছানার সঙ্গে ঘুমের বদলে জেগে থাকার অভ্যাসই তৈরি হয়</figcaption></figure><p>বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় ফোন চালানোর অভ্যাসও ঘুমের ক্ষতির আরেকটি বড় কারণ। শুধু ফোনের স্ক্রিনের আলোই নয়; বরং ভিডিও দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা কিংবা বারবার নতুন কিছু দেখার আগ্রহ ঘুমানোর সময় কমিয়ে দেয়। নিয়মিত বিছানায় ফোন ব্যবহার করলে বিছানার সঙ্গে ঘুমের বদলে জেগে থাকার অভ্যাসই তৈরি হয়। তাই ঘুমানোর আগে ফোন সরিয়ে রাখা এবং শোবার ঘর যথাসম্ভব অন্ধকার, নীরব ও আরামদায়ক রাখা জরুরি।</p><aside><a href="https://www.bigganchinta.com/biology/lvi2cc7sje">নিজের নাক ডাকার শব্দে নিজের ঘুম ভাঙে না কেন</a></aside><blockquote>মেলাটোনিন মূলত একধরনের হরমোন, যা আমাদের ঘুমের প্রস্তুতিতে সাহায্য করে। রাতে উজ্জ্বল আলো মেলাটোনিনের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করতে পারে।</blockquote><h2><strong>খাদ্যাভ্যাস ও ক্যাফেইনের প্রভাব</strong></h2><p>রাতে কী খাচ্ছি এবং কখন খাচ্ছি, সেটিও ঘুমের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত খাবার খেলে হজমের অস্বস্তি বা বুকজ্বালার কারণে ঘুম ব্যাহত হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হবে। ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে ভারী খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2023-10/8cd3db6b-6e7f-4b9b-988f-7252cefe7d98/pexels_karolina_grabowska_6660116.jpg"><figcaption>ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত খাবার খেলে হজমের অস্বস্তি বা বুকজ্বালার কারণে ঘুম ব্যাহত হতে পারে</figcaption></figure><p>ভালো ঘুমের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের প্রভাবও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চা, কফি ও কিছু কোমল পানীয়তে থাকা ক্যাফেইন মস্তিষ্কে ঘুমের সংকেত তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। কেউ কেউ দাবি করেন, কফি খেয়েও তাঁদের খুব সহজেই ঘুম চলে আসে। কিন্তু দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে পারা আর ভালো মানের ঘুম হওয়া এক বিষয় নয়। ক্যাফেইন ঘুমের গভীরতা ও স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলে। তাই বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা-কফি কমিয়ে দেওয়াই ভালো।</p><aside><a href="https://www.bigganchinta.com/cause/t5pvifn024">রাতে টিভি দেখলে কি ঘুম কমে যায়</a></aside><blockquote>ভালো ঘুমের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের প্রভাবও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চা, কফি ও কিছু কোমল পানীয়তে থাকা ক্যাফেইন মস্তিষ্কে ঘুমের সংকেত তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।</blockquote><h2><strong>মানসিক চাপ ও উদ্বেগ</strong></h2><p>পরীক্ষার চাপ, কাজের চিন্তা, সম্পর্কের জটিলতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সারা দিনের এসব অভিজ্ঞতা রাতেও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। শরীর বিছানায় থাকলেও মন তখন নানা চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। উদ্বেগের কারণে মস্তিষ্ক থাকে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থায়। ফলে সহজে ঘুমিয়ে পড়া এবং গভীর ঘুম ধরে রাখার পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ছাড়াও বিষণ্নতা ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গে ঘুমের পরিবর্তন ও ক্লান্তির সম্পর্ক রয়েছে। তাই ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।</p><p>সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম উপযোগী। তবে সবার ঘুমের চাহিদা এক নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত পার্থক্যের কারণে কারও বেশি ঘুমের প্রয়োজনও হয়। তবে নিয়মিত দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরও ক্লান্তি লাগলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।</p><aside><a href="https://www.bigganchinta.com/biology/abjmgq499t">অর্থকষ্টে কেন মানুষের ঘুম আসে না, বিজ্ঞান কী বলে</a></aside><blockquote>শরীর বিছানায় থাকলেও মন তখন নানা চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। উদ্বেগের কারণে মস্তিষ্ক থাকে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থায়। ফলে সহজে ঘুমিয়ে পড়া এবং গভীর ঘুম ধরে রাখার পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।</blockquote><h2><strong>ক্লান্তি কাটাতে করণীয়</strong></h2><p>প্রথমে নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে নজর দিন। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া আর ঘুম থেকে ওঠা, শোবার আগে ফোন ব্যবহার কমানো, রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলা এবং ঘুমের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা ভালো অভ্যাস। পাশাপাশি দিনে নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখা এবং মানসিক চাপ সামলানোর চেষ্টা করাও জরুরি।</p><p>তবে এসব পরিবর্তনের পরও যদি নিয়মিত সকালে ক্লান্তি লাগে, দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পায় কিংবা জোরে নাক ডাকার সঙ্গে ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে আসার লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে ঘুমের পরীক্ষা বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে কারণ শনাক্ত করা সম্ভব।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-09-28/vlaxlvvq/1771040912-sleepingwiththelightonb3f1c30ac2.png"><figcaption>ভালো ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, সুস্থ থাকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত</figcaption></figure><p>ঘুমকে আমরা প্রায়ই দিনের কাজের ফাঁকে শরীরের বিশ্রাম নেওয়ার অংশ হিসেবে দেখি। কিন্তু ভালো ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, সুস্থ থাকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তাই ঘড়ির হিসাবে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি শরীর সতেজ না হয়, তাহলে ভাবতে হবে, আপনার ঘুমের মান ঠিক হয়তো ঠিক নেই।</p><h4>লেখক: শিক্ষার্থী, কৃষিবিজ্ঞান বিভাগ, এগ্রিকালচারাল সায়েন্স অনুষদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি</h4><h4>সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক</h4><aside><a href="https://www.bigganchinta.com/biology/v01abd9vo9">ঘুম নিয়ে আমাদের যত ভুল ধারণা</a></aside>
<p>সুইডিশ একাডেমির পক্ষ থেকে যখন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে কানাডিয়ান কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক অ্যান কারসনের নাম ঘোষণা করা হলো, তখন তা বিশ্বজুড়ে গভীর সন্তোষ ও আনন্দের এক নতুন তরঙ্গ তৈরি করেছে। একাডেমির আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল ও খেলাচ্ছলে সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের নতুন নতুন রূপ সৃষ্টিতে তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের জন্য তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হলো। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসলে এমন একজন অনন্য শব্দশিল্পীকে দেওয়া হয়েছে, যিনি দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্য এবং স্বাধীন সৃজনশীলতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে চলেছেন। তাঁর সাহিত্যচর্চা কোনো একটি নির্দিষ্ট ধারার ফ্রেমে বন্দী নয়; বরং তা একই সঙ্গে কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং কথাসাহিত্যের প্রথাগত সীমানাকে সম্পূর্ণ একাকার করে দেয়। এই অনন্য মিশ্রণই তাঁকে সমসাময়িক সাহিত্যবিশ্বে এক সম্পূর্ণ পৃথক ও কালজয়ী আসন দিয়েছে, যা এই নোবেলপ্রাপ্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পেল। বিশ্বজুড়ে তাঁর এই মূল্যায়ন প্রমাণ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা কীভাবে আধুনিক পাঠকদের হৃদয়ে আলোড়ন তুলতে পারে এবং কেন তাঁর লেখনী সমকালীন সাহিত্যের গতিপথ নির্ধারণে এক অপরিহার্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।</p><p> অ্যান কারসন কানাডার অন্টারিওর টরন্টোতে জন্মগ্রহণ করেন এবং খুব অল্প বয়স থেকেই গ্রিক ও লাতিন ভাষার ধ্রুপদি সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের জন্ম হয়। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ধ্রুপদি সাহিত্যে তাঁর স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং ডক্টরাল থিসিস সম্পন্ন করার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের এই কঠিন ও নিবিড় ভিত্তিটিই পরবর্তী সময়ে তাঁর কবিসত্তার প্রধান জ্বালানি ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করেছে। কারসন নিজে একজন নিখাদ শব্দতত্ত্ববিদ, যিনি শব্দের আদি উৎসের গভীরে ডুব দিয়ে নতুন অর্থ ও দর্শনের অন্বেষণ করেন। তাঁর প্রথম দিককার তাত্ত্বিক কাজ ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ গ্রন্থে তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার সূত্র ধরে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা এবং দূরত্বের এক মহাজাগতিক মনস্তত্ত্ব উন্মোচন করেছিলেন। এই বইটির পর থেকেই মূলত আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক মহলে তাঁর ধ্রুপদি পাণ্ডিত্য এবং আধুনিক কাব্যিক বোধের যুগলবন্দী নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়, যা তাঁকে বিশ্বমঞ্চে এক উজ্জ্বল নাম হিসেবে পরিচিত করে তোলে।</p><p>কারসনের নোবেল জয়ের পর বিশ্বজুড়ে শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলো এবং বিশিষ্ট লেখকেরা তাঁদের উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া ও গভীর বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। বিখ্যাত কানাডীয় লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউড তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ও বন্ধু কারসনের এই সাফল্যে উল্লাস প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ডিলাইটস অ্যাওয়েট! অর্থাৎ বাংলায় বলা যায়, আমাদের সামনে এখন আরও চমৎকার সব বিস্ময় অপেক্ষা করছে। অন্যদিকে সুইডিশ একাডেমির সদস্য ও ঔপন্যাসিক স্টিভ সেম-স্যান্ডবার্গ মন্তব্য করেছেন যে অ্যান কারসনের বইগুলো গ্রন্থাগারের কোন তাকে রাখবেন, তা নির্ধারণ করা অসম্ভব, কারণ তিনি সম্পূর্ণ নিজের তৈরি করা একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যিক কাঠামোতে অবস্থান করেন। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা কারসনের সাহিত্যকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছে যে তাঁর এই পুরস্কার উচ্চমানের মেধাভিত্তিক সাহিত্যের এক মহিমান্বিত জয়, যা প্রমাণ করে যে ধ্রুপদি পাণ্ডিত্য কখনো সেকেলে হতে পারে না। প্রখ্যাত মার্কিন কবি ও সমালোচক ক্লডিয়া র্যাঙ্কিন অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করে বলেছেন যে কারসন হলেন এমন একজন মানুষ, যিনি আমাদের সাহিত্যিক কল্পনাকে সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রথাগত শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন।</p><p>অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তা কোনো সুনির্দিষ্ট জঁরা বা সাহিত্যের রূপভেদ মেনে চলে না। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যেখানে তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকরাসের একটি খণ্ডিত কবিতাকে ভিত্তি করে এক আধুনিক রূপক আখ্যান তৈরি করেছেন। প্রাচীন পুরাণের দানব গেরিওনকে তিনি এখানে উপস্থাপন করেছেন এক বিষাদগ্রস্ত, সমকামী কিশোর আলোকচিত্রী হিসেবে, যে আধুনিক সমাজের রুক্ষতা ও একাকিত্বের মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে আবিষ্কার করে। নিউইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউতে সমালোচক ড্যাফনে মার্কিন এই গ্রন্থের পর্যালোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন যে কারসন সমকালীন কবিতার ছোট জগতে এক বিশাল তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন, যা একই সঙ্গে হিংসা এবং গভীর শ্রদ্ধার জন্ম দেয়। কারসনের এই সাহস পাঠককে শুধু বিনোদিত করে না; বরং মানুষের ভেতরের অবদমিত দানবীয় ও মানবিক সত্তার দ্বন্দ্বকে তীব্রভাবে আলোড়িত করে এবং জীবনের গূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।</p><blockquote>অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তা কোনো সুনির্দিষ্ট জঁরা বা সাহিত্যের রূপভেদ মেনে চলে না। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যেখানে তিনি প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকরাসের একটি খণ্ডিত কবিতাকে ভিত্তি করে এক আধুনিক রূপক আখ্যান তৈরি করেছেন।</blockquote><p>ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে কারসনের এই যে সংযোগ, তা কখনোই একতরফা বা অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং তা অত্যন্ত চপল, কৌতুকপূর্ণ ও সাহসী। সুইডিশ একাডেমি তাঁর এই খেলাচ্ছলে সংলাপের কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, কারণ তিনি প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডি বা দেব-দেবীদের চরিত্র নিয়ে যখন কাজ করেন, তখন তার ভেতর সমকালীন পপ সংস্কৃতিকেও অনায়াসে ঢুকিয়ে দেন। যেমন তাঁর পারফরম্যান্স পিস বা গীতি-আলেখ্য ‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’ গ্রন্থে তিনি প্রাচীন গ্রিসের হেলেন অব ট্রয়ের মিথের সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর মার্কিন পপ আইকন মেরিলিন মনরোর জীবনের ট্র্যাজেডিকে মিলিয়ে দিয়েছেন। দ্য নিউইয়র্কার ম্যাগাজিন কারসনের এই শৈলীকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছে যে কারসন ইতিহাস এবং সমকালকে এমনভাবে মুখোমুখি দাঁড় করান, যেখানে সময়ের ব্যবধান মুছে যায় এবং মানুষের মৌলিক বেদনাগুলো একই সুতোয় গেঁথে যায়। ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড’ কাব্যে তিনি একটি বৈবাহিক সম্পর্কের পতনকে উনত্রিশটি পরিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা প্রথাগত আখ্যানের সীমানাকে ভেঙে দেয়।</p><p>অনুবাদক হিসেবেও অ্যান কারসন বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন, কারণ তাঁর কাছে অনুবাদ কেবল এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর নয়, বরং তা এক সম্পূর্ণ স্বাধীন সৃষ্টি। স্যাফোর কবিতার ভাঙা টুকরোগুলো নিয়ে তাঁর করা অনুবাদ ‘ইফ নট, উইন্টার’ গ্রিক সাহিত্যের ইতিহাসে এক মাইলফলক। প্রাচীন পুঁথির যে অংশগুলো নষ্ট হয়ে গেছে বা হারিয়ে গেছে, কারসন সেগুলোকে কোনো কাল্পনিক শব্দ দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করেননি; বরং সেই শূন্যস্থানগুলোকে ফাঁকা রেখে পেজের ওপর বিশেষ বন্ধনী ব্যবহার করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে নীরবতা বা শূন্যতারও একটি নিজস্ব ভাষা আছে এবং প্রাচীন সাহিত্যের সেই ভগ্নাবশেষই তার আসল সৌন্দর্য। ইউরিপিদিস বা সোফোক্লিসের নাটকগুলোর অনুবাদেও তিনি সমকালীন কথ্য ভাষার ব্যবহার করেছেন, যাতে আধুনিক দর্শকেরা সহজেই সেই প্রাচীন ক্ষোভ, হাহাকার ও ট্র্যাজেডির তীব্রতাকে নিজেদের জীবনে অনুভব করতে পারেন এবং ইতিহাসের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারেন।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-08/vdqgpi81/Ann-Carson.jpg"><figcaption>কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কারসন</figcaption></figure><p>কারসনের সাহিত্য কেবল কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বইয়ের প্রথাগত অবয়ব বা দৈহিক রূপকেও চ্যালেঞ্জ করে। তাঁর ‘নক্স’ নামক বইটি এর একটি বড় প্রমাণ, যা মূলত তাঁর দীর্ঘদিনের নিখোঁজ এবং পরবর্তী সময়ে মৃত ভাই মাইকেলের স্মৃতির উদ্দেশে রচিত একটি শোকগাথা। বইটি কোনো সাধারণ বাঁধাই করা বই নয়, এটি একটি দীর্ঘ কাগজের ভাঁজ, যা অ্যাকর্ডিয়ন বা হারমোনিয়ামের মতো খুলে যায় এবং একটি কাঠের বাক্সের ভেতর বন্দী থাকে। এর ভেতরে রয়েছে তাঁর ভাইয়ের পুরোনো চিঠি, পারিবারিক ছবি, ডায়েরির ছেঁড়া পাতা এবং রোমান কবি ক্যাটুলাসের একটি কবিতার ওপর কারসনের নিজস্ব ব্যবচ্ছেদ। ফরাসি সাহিত্য সমালোচক ল্য মঁদ একে একটি দৃশ্যমান কোলাজ শিল্প এবং সাহিত্যের এক নতুন মাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে শব্দ ও স্পর্শ মিলেমিশে একাকার হয়ে শোকের এক মূর্ত রূপ ধারণ করে। তাঁর অন্য একটি সৃষ্টি ‘ফ্লোট’ বইটিতেও বেশ কয়েকটি স্বাধীন পুস্তিকা একটি স্বচ্ছ কেসের মধ্যে রাখা থাকে, যা পাঠক নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো ক্রমে পড়তে পারেন।</p><p>কারসনের সাম্প্রতিক কাজগুলোর মধ্যে ‘রং নর্মা’ (Wrong Norma) সংকলনটি পাঠকদের মধ্যে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যেখানে তিনি তাঁর প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্র অনুভূতি, পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজের হাতের লেখা বদলে যাওয়ার বেদনা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতাকে একসঙ্গে বুনেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাঁর এই বিবর্তনকে লক্ষ করে লিখেছে যে কারসন কবিতাকে সুশৃঙ্খল বা গীতিময় হওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করেছেন এবং একে এক রূপহীন ও প্রসারিত অবয়ব দিয়েছেন। তাঁর লেখার জগৎটি একটি বিশাল আন্তপাঠযোগ্যতার জাল, যেখানে প্রবেশ করলে হোমার, ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা কাফকার মতো বিচিত্র ব্যক্তিত্বের সঙ্গে অবলীলাক্রমে দেখা হয়ে যায়। এই অন্তহীন জটিলতা ও প্রাঞ্জলতার মিশ্রণই তাঁর কাজকে সাধারণ পাঠকদের কাছে যেমন কৌতূহলোদ্দীপক করে তোলে, তেমনি গবেষকদের জন্যও এক অনন্ত খনি হিসেবে উপস্থাপন করে এবং সমকালীন সাহিত্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।</p><blockquote>অনুবাদক হিসেবেও অ্যান কারসন বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন, কারণ তাঁর কাছে অনুবাদ কেবল এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর নয়, বরং তা এক সম্পূর্ণ স্বাধীন সৃষ্টি। স্যাফোর কবিতার ভাঙা টুকরোগুলো নিয়ে তাঁর করা অনুবাদ ‘ইফ নট, উইন্টার’ গ্রিক সাহিত্যের ইতিহাসে এক মাইলফলক।</blockquote><p>যখন স্টকহোম থেকে নোবেল কমিটি কারসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল, তখন তিনি ছিলেন আটলান্টিকের বুকে বরফঘেরা দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ডে এবং এক নির্জন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বাতাসের শব্দ শুনছিলেন। এই ঘটনা যেন তাঁর পুরো জীবন ও সাহিত্য দর্শনেরই একটি প্রতীকী রূপ, কারণ কারসন সব সময়ই প্রচারের আলো থেকে দূরে, নীরবতার গভীরে শব্দের সন্ধান করতে ভালোবাসেন। নোবেলপ্রাপ্তির খবরে তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সহজ ও সরল, আইসল্যান্ডের পাবলিক ব্রডকাস্টার আরইউভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি কিছুটা রসিকতা করেই বলেছিলেন যে আমার মনে হয় বিচারকদের সবাই পাগল হয়ে গেছেন, পুরো বিষয়টাই আসলে এক পাগলামি। এই আপাত হালকা মন্তব্যটির পেছনে লুকিয়ে আছে তাঁর সেই আজীবন অহংকারহীন স্বভাব, যা বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারের চেয়ে সৃষ্টির আনন্দকে সব সময় বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং যা তাঁর লেখাকেও এনে দিয়েছে একধরনের আদিম ও অকৃত্রিম মুক্তি, যা যেকোনো বড় লেখকের আসল বৈশিষ্ট্য।</p><p>এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, অ্যান কারসনের এই নোবেল জয় কেবল তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিভার স্বীকৃতি নয়; বরং তা সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে ধ্রুপদি জ্ঞান ও পরীক্ষামূলক আঙ্গিকের এক যুগান্তকারী পুনরুত্থান। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন যে প্রাচীন গ্রিস বা রোমের যে ঐতিহ্যকে আমরা মৃত বা জাদুঘরের সামগ্রী বলে মনে করি, তা আসলে কতটা জীবন্ত এবং আধুনিক মানুষের সংকটকে ব্যাখ্যা করার জন্য আজও কতটা অপরিহার্য। কবিতা এবং গদ্যের কৃত্রিম বিভাজনকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে তিনি যে নতুন সাহিত্যের রূপ তৈরি করেছেন, তা আগামী দিনের তরুণ লেখকদের জন্য এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ধ্রুপদি ঐতিহ্যের এই আধুনিক রূপকার তাঁর অসামান্য লেখনীর মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রকে যেভাবে সমৃদ্ধ করলেন, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিরকাল খোদাই করা থাকবে এবং আগামী প্রজন্মকে সাহিত্যের এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যাবে।</p><p>অ্যান কারসনের সাহিত্যিক যাত্রার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় যে তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিধি কেবল একাডেমিক চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল সৃজনশীলতার এক অনন্ত প্রসারণ। তিনি যখন ধ্রুপদি গ্রিক সাহিত্যের উপাদানগুলোকে স্পর্শ করেন, তখন প্রাচীন ট্র্যাজেডিগুলোর ভেতরের চরিত্ররা বর্তমানের নাগরিক একাকিত্বের সমান্তরাল হয়ে ওঠে। তাঁর ডক্টরাল অভিসন্দর্ভ, যা পরবর্তী সময়ে ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ নামে আত্মপ্রকাশ করে, সেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতায় প্রেম একই সঙ্গে মিষ্টি এবং তেতো অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। কারসন যুক্তি দেন যে প্রেমের আসল আনন্দ মিলনে নয়, বরং আকাঙ্ক্ষার মধ্যবর্তী যে দূরত্ব, সেই শূন্যতার মাঝে লুকিয়ে থাকে। এই তাত্ত্বিক দর্শনটি তাঁর পরবর্তী সমস্ত কাব্য ও উপন্যাসের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তিনি চরিত্রদের ভেতরের মানসিক দূরত্ব ও অতৃপ্তিকে ভাষার নিখুঁত কারুকাজে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই কারণেই বিশ্বজুড়ে সাহিত্য সমালোচকেরা তাঁকে কেবল একজন কবি হিসেবে দেখেন না, বরং একজন দার্শনিক হিসেবেও গণ্য করেন, যিনি মানব সম্পর্কের জটিলতাকে ইতিহাসের আলোয় নতুন করে ব্যাখ্যা করতে পারেন।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-08/pg2blyuo/1-32-6ac7705550d4e-scaled.webp"><figcaption>২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডিয়ান কবি অ্যান কারসন</figcaption></figure><p>তাঁর অনুবাদকর্মের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করলে দেখা যায় যে কারসন প্রাচীন লেখার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা বজায় রেখেও তার ভেতর সমকালীন আধুনিকতার প্রাণ সঞ্চার করতে পারেন। সোফোক্লিসের ‘অ্যান্টিগোনে’ নাটকের তাঁর করা অনুবাদ ‘অ্যান্টিগোনিক’ এর একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যেখানে তিনি প্রথাগত নাট্যভাষার সীমানা ভেঙে একদম আধুনিক আমেরিকান কথ্য ভাষা এবং দৃশ্যমান চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন। তিনি মনে করেন যে প্রাচীন ধ্রুপদি সাহিত্যের অনুবাদ মানে কেবল অক্ষরের অনুবাদ নয়; বরং সেই যুগের তীব্র আবেগ ও রাজনৈতিক সংকটকে সমকালের পাঠকদের স্নায়ুতে পৌঁছে দেওয়া। ‘ইফ নট, উইন্টার’ গ্রন্থে স্যাফোর খণ্ডিত কবিতার অনুবাদের সময় তিনি যেভাবে শূন্যস্থানগুলোকে অক্ষত রেখেছেন, তা আধুনিক কবিতার নীরবতার নন্দনতত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সমালোচকদের মতে, কারসনের এই অনুবাদশৈলী বিশ্বসাহিত্যকে শিখিয়েছে যে একটি লেখার যা কিছু হারিয়ে গেছে বা ধ্বংস হয়ে গেছে, তারও একটি নিজস্ব নান্দনিক মূল্য আছে এবং একজন কুশলী অনুবাদক সেই শূন্যতাকেই কবিতার প্রধান শক্তিতে রূপান্তর করতে পারেন।</p><p>কারসনের ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ উপন্যাসটির সাফল্য নিয়ে যখন আমরা আলোচনা করি, তখন এর শৈল্পিক কাঠামোর বৈপ্লবিক রূপটি আমাদের বিস্মিত করে। গ্রিক পুরাণের দানব গেরিওনকে নিয়ে প্রাচীন কবি স্টেসিকরাস যে মহাকাব্য লিখেছিলেন, তার মাত্র কয়েকটি পঙ্ক্তি আজ টিকে আছে। কারসন সেই খণ্ডিত অংশকে ভিত্তি করে এমন এক আধুনিক আখ্যান তৈরি করলেন, যা সমকালীন কথাসাহিত্যের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে। এই উপন্যাসটিতে গেরিওন কোনো পৌরাণিক দানব নয়; বরং সে এক লাল ডানাওয়ালা কিশোর, যে নিজের ভেতরের ভিন্নতা ও সমাজের রুক্ষতার সঙ্গে লড়াই করছে। আলোকচিত্রের প্রতি তার যে গভীর অনুরাগ, তা আসলে জগতের রূপকে নিজের মতো করে ধরে রাখার এক আকুল প্রচেষ্টা। কারসনের এই অনন্য আখ্যানশৈলী প্রমাণ করে যে পুরাণ কোনো দূর অতীতের গল্প নয়, তা আসলে মানুষের অবিনশ্বর মনস্তাত্ত্বিক সংকটেরই এক চিরন্তন রূপক। নিউইয়র্ক টাইমসের সমালোচকেরা একে বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যিক পরীক্ষা বলে উল্লেখ করেছেন, যা কবিতার গভীরতা এবং উপন্যাসের বিস্তারকে এক সুতোয় বেঁধেছে।</p><p>একইভাবে তাঁর সৃষ্টি ‘নক্স’ বইটির অবয়ব ও তার ভেতরের শোকগাথার গভীরতা বিশ্বজুড়ে পাঠকদের স্তব্ধ করে দিয়েছিল। নিজের একমাত্র ভাই মাইকেলের আকস্মিক মৃত্যু এবং তাঁর দীর্ঘদিনের নিখোঁজ জীবনের বেদনাকে কারসন যেভাবে এই বইটিতে রূপ দিয়েছেন, তা আক্ষরিক অর্থেই এক দৃশ্যমান কোলাজ। অ্যাকর্ডিয়নের মতো ভাঁজ করা এই দীর্ঘ কাগজের পাতায় তিনি ক্যাটুলাসের একটি বিশেষ কবিতার প্রতিটি শব্দের লাতিন থেকে ইংরেজি ব্যুৎপত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন। এর পাশাপাশি নিজের ভাইয়ের পুরোনো ঝাপসা ছবি, ডায়েরির ছেঁড়া পাতা এবং হাতের লেখার টুকরা যুক্ত করে তিনি শোকের এক মূর্ত স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছেন। ল্য মঁদ পত্রিকার সাহিত্য সমালোচকেরা এই বইকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছিলেন যে কারসন এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে ব্যক্তিগত শোক এক পরম বৈশ্বিক বেদনায় রূপান্তরিত হতে পারে। বইটির এই অভিনব ভৌত কাঠামো আসলে মানুষের স্মৃতির ভঙ্গুরতা এবং তাকে ধরে রাখার অক্ষমতারই এক বস্তুগত প্রকাশ, যা পাঠককে কেবল পড়তে বাধ্য করে না; বরং সেই বেদনাকে স্পর্শ করার এক অলৌকিক অনুভূতি দেয়।</p><blockquote>কারসনের এই আজীবন সাহিত্যিক নিরীক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নোবেল পুরস্কারের অনেক আগেই ম্যাকআর্থার জিনিয়াস গ্রান্ট, গুগেনহাইম ফেলোশিপ এবং টি এস এলিয়ট প্রাইজের মতো মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তবে এই নোবেল জয় তাঁর সাহিত্যিক দর্শনকে এক বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিকতা দিল, যা সমকালীন সাহিত্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।</blockquote><p>কারসনের এই আজীবন সাহিত্যিক নিরীক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নোবেল পুরস্কারের অনেক আগেই ম্যাকআর্থার জিনিয়াস গ্রান্ট, গুগেনহাইম ফেলোশিপ এবং টি এস এলিয়ট প্রাইজের মতো মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তবে এই নোবেল জয় তাঁর সাহিত্যিক দর্শনকে এক বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিকতা দিল, যা সমকালীন সাহিত্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। সুইডিশ একাডেমির বিচারকেরা যখন তাঁর খেলাচ্ছলে সংলাপের প্রশংসা করেন, তখন তাঁরা আসলে কারসনের সেই ক্ষমতাকে কুর্নিশ জানান, যার মাধ্যমে তিনি গম্ভীর একাডেমিক বিষয়কে অত্যন্ত সহজ ও কৌতুকপূর্ণ করে তুলতে পারেন। কারসন তাঁর লেখায় প্রায়ই নিজেকে এবং নিজের পাণ্ডিত্যকে নিয়ে কৌতুক করেন, যা তাঁর সাহিত্যকে একধরনের অকৃত্রিম মুক্তি দেয়। তিনি কখনো কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বের ফ্রেমে নিজেকে বন্দী রাখেননি; বরং প্রতিনিয়ত ভাষার সীমানাকে প্রসারিত করেছেন। এই কারণেই তাঁর নোবেলপ্রাপ্তি বিশ্বজুড়ে তরুণ ও নিরীক্ষাধর্মী লেখকদের জন্য এক অফুরন্ত সাহসের উৎস হিসেবে কাজ করবে, যা প্রথাগত সাহিত্যের দেয়ালগুলোকে ভেঙে নতুন রূপ সৃষ্টির পথ দেখাবে।</p><p>তাঁর সর্বশেষ কাজ ‘রং নর্মা’ (Wrong Norma) সংকলনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে বয়স বা শারীরিক অসুস্থতা তাঁর সৃজনশীলতার ধারকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি। পারকিনসন্স রোগের কারণে তাঁর হাতের লেখা যখন কাঁপছিল, তিনি সেই কাঁপুনি এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতাকেই তাঁর কবিতার এক নতুন উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষের শরীর যখন অবক্ষয়ের দিকে যায়, তখনো ভাষা কীভাবে তার ভেতরের চেতনাকে সজীব ও অপরাজেয় রাখতে পারে। এই বইয়ে তিনি একই সঙ্গে বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা, পুঁজিবাদের আগ্রাসন এবং নিজের প্রাত্যহিক জীবনের অতি ক্ষুদ্র অনুভূতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। বিশ্বখ্যাত সমালোচকদের মতে, কারসনের লেখার এই বহুমাত্রিকতা এবং আন্তপাঠযোগ্যতা তাঁকে সমকালের অন্য সমস্ত লেখক থেকে আলাদা করে। হোমার থেকে শুরু করে ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা কাফকা—সবার ভাবনার নির্যাস তাঁর লেখনীতে এসে এমনভাবে একাকার হয়ে যায় যে তা বিশ্বসাহিত্যের এক অন্তহীন মহাকাব্যে রূপ নেয়।</p><p>প্রাচীন গ্রিসের নাট্যকারেরা মানুষের ভেতরের যে ট্র্যাজেডিকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, কারসন আজ একবিংশ শতাব্দীর নাগরিক কোলাহলের মাঝে দাঁড়িয়ে সেই একই ট্র্যাজেডির সুর নতুন করে বাঁধলেন। কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদের কৃত্রিম প্রাচীরগুলোকে ভেঙে তিনি যে নতুন এক সমকালীন সাহিত্যিক ভাষা তৈরি করেছেন, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকবে। তাঁর এই নোবেলপ্রাপ্তির ক্ষণটি বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যা আমাদের শেখায় যে অতীতকে ভুলে গিয়ে নয়, বরং অতীতের হাত ধরেই সমকালের সবচেয়ে সাহসী ও আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টি করা সম্ভব। এই পরিবর্তনের ধারা আগামী দিনের লেখকদের জন্য সাহিত্যের এক নতুন মুক্ত আকাশ উন্মোচন করবে, যেখানে বাঁধনহীন চিন্তার বিকাশ ঘটবে।</p><figure><img alt="" src="https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla/2026-10-08/3ycrlmxb/carson.webp"><figcaption>অ্যান কারসন</figcaption></figure><p>কানাডার সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে অ্যান কারসনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং তিনি সেখানে এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য কানাডীয় লেখকের চেয়ে তাঁর কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ তিনি উত্তর আমেরিকান আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে প্রাচীন ইউরোপীয় দর্শনের এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। টরন্টোর সাহিত্য বৃত্ত থেকে শুরু করে মন্ট্রিয়লের একাডেমিক অঙ্গন—সবখানেই তাঁর লেখা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। নোবেল কমিটি যখন তাঁর নাম ঘোষণা করে, তখন কানাডার প্রতিটি সাহিত্য পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের আয়োজন শুরু করে। তাঁর এই বিজয় আসলে প্রমাণ করে যে মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্য কীভাবে সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে। তিনি বিশ্বমঞ্চে কানাডার নাম উজ্জ্বল করার পাশাপাশি পুরো উত্তর আমেরিকার সমকালীন কবিতার ধারাকে নতুন এক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।</p><p>কারসনের রচনার গূঢ় নন্দনতত্ত্ব সাধারণ পাঠকদের মনে এক অপার্থিব অনুভূতির জন্ম দেয়, যা অন্য কোনো সমসাময়িক লেখকের লেখায় সহজে মেলা ভার। তিনি যখন একটি সাধারণ বাক্য লেখেন, তার ভেতরেও লুকিয়ে থাকে সহস্র বছরের ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। এই গভীরতা পাঠকদের কেবল চিন্তিত করে না, বরং তাদের নিজেদের অস্তিত্বের মূল শিকড়কে খুঁজতে বাধ্য করে। তাঁর কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতা কোনো সাধারণ বই পড়ার মতো নয়, তা যেন এক গোলকধাঁধায় প্রবেশ করার মতো, যেখানে প্রতিটি বাঁকে নতুন নতুন সত্য উন্মোচিত হয়। সমালোচকেরা মনে করেন যে কারসনের এই অনন্য জাদুকরি ক্ষমতা আগামী শতাব্দীতেও তাঁর লেখাকে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত করে রাখবে, কারণ মানুষের মনের মৌলিক আবেগগুলো কখনোই স্থান বা কালের সীমানায় আটকে থাকে না।</p><p>আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, কারসনের এই আজীবন সাহিত্যিক নিরীক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নোবেল পুরস্কারের অনেক আগেই ম্যাকআর্থার জিনিয়াস গ্রান্ট, গুগেনহাইম ফেলোশিপ এবং টি এস এলিয়ট প্রাইজের মতো মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তবে এই নোবেল জয় তাঁর সাহিত্যিক দর্শনকে এক বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিকতা দিল, যা সমকালীন সাহিত্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। সুইডিশ একাডেমির বিচারকেরা যখন তাঁর খেলাচ্ছলে সংলাপের প্রশংসা করেন, তখন তাঁরা আসলে কারসনের সেই ক্ষমতাকে কুর্নিশ জানান, যার মাধ্যমে তিনি গম্ভীর একাডেমিক বিষয়কে অত্যন্ত সহজ ও কৌতুকপূর্ণ করে তুলতে পারেন।</p><p>পরিশেষে বলা যায় যে অ্যান কারসন কেবল একজন নোবেলজয়ী লেখক নন, তিনি হলেন একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান এবং সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তাঁর চার দশকের সাহিত্য সাধনা এবং প্রতিনিয়ত নতুন কিছু করার অদম্য ইচ্ছা আজ বিশ্বমঞ্চে তাঁর এই সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অতীতকে বুকে ধারণ করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হয় এবং কীভাবে ভাষার সামান্যতম ব্যবহার করেও এক বিশাল অনুভূতির জগৎ তৈরি করা সম্ভব। ধ্রুপদি ঐতিহ্যের এই আধুনিক রূপকারের নোবেল বিজয় বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক পরম গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এবং পৃথিবীর সমস্ত সাহিত্যপ্রেমী মানুষের মনে এক অনির্বাণ আলো জ্বেলে রাখবে।</p>
ফ্লাইট বাতিল হওয়া সৌদি আরবগামী যাত্রীদের অধিকাংশই বিমানবন্দরে এসেছেন তাঁদের ফ্লাইটের তথ্য জানতে। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন বিকল্প কোনো ফ্লাইটে গন্তব্যে যেতে।
ম্যানচেস্টার সিটির সামনে এখন বড় বিপদের আশঙ্কা। শাস্তি হিসেবে বড় অঙ্কের পয়েন্ট কাটা যেতে পারে তাদের। এমনকি নেমে যেতে হতে পারে দ্বিতীয় বিভাগেও।
রণধীর জয়সোয়াল বাংলাদেশে অতীতে কী হয়েছে বা বর্তমানে কী ঘটছে, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। বাংলাদেশ সরকারকে দোষারোপও করেননি।
১৪ অক্টোবর ‘বি বল্ড অ্যান্ড বি ফ্রি ডে’ উপলক্ষে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বের ৫ বল্ড অ্যান্ড হ্যান্ডসাম ব্যক্তিত্বকে।
<p>গাজীপুরের টঙ্গীর ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড কারখানায় লাগা আগুন প্রায় চার ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ১৪ অক্টোবর সকাল সোয়া ১০টার দিকে এ আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। বিস্তারিত ভিডিও প্রতিবেদনে- </p><figure></figure>
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মো. লুৎফর রহমান শিক্ষার্থীদের তথ্য-উপাত্ত দ্রুত হস্তান্তর করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
উত্তরার বাসার সামনে কাজিনদের সঙ্গে খেলছিলেন সাদনীমা। পাশেই বিজ্ঞাপনের শুটিং করছিল একটি দল। সেদিনই তাঁর অভিনয়জগতে প্রবেশ।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন