মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও এলাকায় একের পর এক হামলা চালানো হচ্ছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে হামলার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবকে হুমকির মুখে ফেলেছে। একই সময়ে ইরাক থেকেও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এসব হামলার জেরে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালির পর বাব আল-মান্দেবও যদি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতেই সামনে এসেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে করা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তির আওতায় কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ কীভাবে পাশে দাঁড়াবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
জাজানে ফের হুথি হামলা
সর্বশেষ সৌদি আরবের জাজান প্রদেশে হামলা চালিয়েছে হুথিরা। সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, রোববার একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন জাজানের আল-তুয়াল এলাকায় আঘাত হানে। এতে একটি মসজিদসহ বেশ কয়েকটি বাড়ি ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাজান ইয়েমেন সীমান্তবর্তী একটি প্রদেশ।
সৌদি কর্তৃপক্ষ হুথিদের এই হামলাকে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে।

এর আগে হুথিরা সৌদির নাজরান প্রদেশের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের হামলা চালানো হয়। আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরানকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ইরাক থেকেও তেল স্থাপনায় হামলা
শুধু ইয়েমেন নয়, ইরাক থেকেও সৌদি আরবের ওপর হামলা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ইরাক থেকে ছোড়া ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
ইরাক সরকার স্বীকার করেছে, হামলাটি ইরানের সীমান্তবর্তী মাইসান প্রদেশ থেকে চালানো হয়েছিল। ঘটনার পর ওই প্রদেশের একজন সামরিক কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বাগদাদ।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো সম্ভব হয়।
পাইপলাইনটি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ পরিবহন করা হয়। ফলে এটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।
আপাতত পাল্টা হামলা নয়
ইরাক থেকে হামলার পরও সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর রিয়াদ আপাতত সংযত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আরও পড়ুন>
সৌদিতে হুথিদের হামলা, মসজিদসহ বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত
সৌদির তেল পাইপলাইনে হামলা, যা বলল পাকিস্তান
ইয়েমেন যুদ্ধে কারা জড়িত, কার কী ভূমিকা?
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা বন্ধে বাগদাদ যে উদ্যোগ নেবে, সৌদি আরব তা সমর্থন করবে। তবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও তারা সংরক্ষণ করছে।
মক্কা চুক্তির সামনে বড় পরীক্ষা
সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক হামলা এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। চলতি বছরের আগস্টে তুরস্কও এতে যুক্ত হলে এটি ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পায়। তিন দেশ রিয়াদে একটি যৌথ সচিবালয়ও গঠন করেছে।
চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো তিন দেশের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। তবে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেবে, তার বিস্তারিত কাঠামো এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অবশ্য সম্প্রতি বলেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে হামলা হলে কিংবা ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে মক্কা চুক্তি কার্যকর হবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এর আগে চুক্তিটির কাঠামোকে ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আক্রান্ত দেশকেই প্রথমে জানাতে হবে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। সেই সহায়তা সরাসরি সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য বা সামরিক সরঞ্জাম—যেকোনো কিছু হতে পারে।
পাকিস্তান কি ইয়েমেনে সেনা পাঠাবে?
এখন পর্যন্ত সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা চুক্তি সক্রিয় করেনি। ফলে পাকিস্তান বা তুরস্কের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নও ওঠেনি।
তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে পাকিস্তান সৌদি আরবকে বিমান প্রতিরক্ষা, সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা সহায়তা বাড়াতে পারে। সৌদি আরবে এরইমধ্যে পাকিস্তানের প্রায় ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।
তবে ইয়েমেনের ভেতরে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা আপাতত কম। আফগানিস্তান যুদ্ধে জড়ানোর তিক্ত অভিজ্ঞতা পাকিস্তানকে এ ধরনের সংঘাতে সতর্ক করে তুলেছে।
ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অর্থনীতি, সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করাও কঠিন হতে পারে।
কূটনীতিতেই জোর ইসলামাবাদের
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
ইসলামাবাদ ইরানকে হুথিদের সৌদি আরবে হামলা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে হুমকির মুখে ফেলা থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথাও তেহরানকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন>
সৌদিতে হুথিদের হামলা, মসজিদসহ বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত
সৌদির তেল পাইপলাইনে হামলা, যা বলল পাকিস্তান
ইয়েমেন যুদ্ধে কারা জড়িত, কার কী ভূমিকা?
তুরস্কও কূটনৈতিকভাবে ইরান ও হুথিদের সংযত করার চেষ্টা করতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে পাকিস্তান ও তুরস্ক প্রথম পর্যায়ে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিমান প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তায় বহুজাতিক নৌজোট গঠনের উদ্যোগেও পাকিস্তান ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ মক্কা চুক্তি কার্যকর হওয়ার অর্থ অবিলম্বে ইয়েমেনে পাকিস্তানি বা তুর্কি সেনা পাঠানো নয়। বরং সৌদি আরব কী ধরনের সহায়তা চাইছে, তার ওপরই প্রতিক্রিয়ার মাত্রা নির্ভর করবে।
মক্কা চুক্তি এখনো একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো। এর যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া, পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম পুরোপুরি গড়ে উঠতে সময় লাগবে। কিন্তু সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক হামলা এই চুক্তির জন্য প্রথম বড় বাস্তব পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হতে পারে সৌদির প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন করা। এতে একদিকে রিয়াদের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদের প্রতিশ্রুতি বজায় থাকবে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কম থাকবে।
শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সৌদি আরব আক্রান্ত হলে তিন দেশ কীভাবে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেয় এবং সামরিক সহযোগিতার সীমা কোথায় নির্ধারণ করে তার ওপর।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি
এমএসএম
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
হিন্দু ধর্মের মেলার আয়োজনকে কেন্দ্র করে শাহী মসজিদের একটি অংশ সরিয়ে সড়ক প্রশস্ত করার কাজ শুরু হয়, আর তা নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, মেলার সময় বাড়তি যানবাহনের চাপ ও ভক্তদের যাতায়াত সহজ করার জন্য ওই সড়ক প্রশস্ত করা জরুরি।
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরোটা এখন দেশটির হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। গত সপ্তাহান্তে তারা বন্দরনগর মোখা দখল করে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন (পেরিম) দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নেয়।এখন আফ্রিকার উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে হুতি বাহিনী। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপরও তাদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ইয়েমেনের বাইরে হুতিরা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই। তবে এই যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে আফ্রিকা মহাদেশেও পড়তে শুরু করেছে।ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী কারা, কীভাবে উত্থানআন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) গতকাল রোববার জানিয়েছে, বিগত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেন থেকে ২ হাজারের বেশি মানুষ আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে পালিয়ে গেছেন।ইয়েমেনের উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে জিবুতির শহর ওবকে ইয়েমেনিরা পৌঁছাচ্ছেন। সেখানে তাঁদের খাবার ও পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে আইওএম সতর্ক করে বলেছে, আরও সহায়তা প্রয়োজন।সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথবিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ বাব আল-মানদেব দিয়ে পরিচালিত হয়। সমুদ্রপথে পরিবহন করা তেলের প্রায় ১১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৮ শতাংশও এই পথ দিয়ে যায়।কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) ছবিতে বাব আল–মানদেব প্রণালি। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারঅন্যদিকে হুতিদের মিত্র ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। এ যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য হাজেম আল-আসাদ বলেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবে নৌ চলাচলসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে।ইরান বলে আসছে, ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুতিরা একটি স্বাধীন গোষ্ঠী।তবে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।সমুদ্রপথের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নৌ কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রু ক্রিস্তিয়ান হুদিস্তেয়ানু আল-জাজিরাকে বলেন, বাব আল-মানদেব প্রণালি হরমুজ প্রণালির চেয়ে সরু।এক দেশ, বহু শক্তির লড়াই: ইয়েমেন কীভাবে বারবার যুদ্ধের আগুনে পুড়ছেহেলিকপ্টার নিয়ে লোহিত সাগরে একটি জাহাজের পিছু নিয়েছে হুতিরাহুদিস্তেয়ানু বলেন, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাদের সামগ্রিক সক্ষমতায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনেনি। তবে এর ফলে আগের তুলনায় জাহাজ নিশানা করা তাদের জন্য সহজ হয়েছে।এর একটি উদাহরণ হলো, সম্প্রতি একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উপকূলে থাকা এক হুতি কমান্ডারকে বলতে শোনা যায়, ওই এলাকায় কামান বসিয়ে ইয়েমেনের উপকূলের কাছের জলসীমায় থাকা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব।আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পোর্টওয়াচের তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ ও পরিবহন করা পণ্যের পরিমাণ ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে জাহাজে হুতিদের হামলার পর লোহিত সাগরে উত্তেজনা আবার বেড়ে গিয়েছিল।বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চালাচ্ছে। এতে একটি যাত্রায় ২০ দিনের বেশি সময় বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।লোহিত সাগরে সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন আটালান্টা’ টাস্কফোর্স কাজ করছে। তবে লোহিত সাগরে আবার জাহাজে হামলা শুরু হলে নির্ধারিত দায়িত্বের সীমাবদ্ধতার কারণে এই বাহিনীর পক্ষেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে।মুখোমুখি লড়াইয়ে হুতি ও সরকারি বাহিনী, সৌদিতেও হামলাইরান যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারত। ৩১ আগস্ট ২০২৬ হুদিস্তেয়ানু বলেন, এই অঞ্চলে নৌবহরের রসদসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে অনেক দেশের নৌবাহিনী জিবুতিকে বন্দর হিসেবে ব্যবহার করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে অপারেশন আটালান্টার মতো চলমান অভিযানের আওতায় থাকা জাহাজগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করা কঠিন।হুদিস্তেয়ানু আরও বলেন, ‘তবে আমি বলব না যে এসব জাহাজ শুধু নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে রয়েছে।...হুমকির জবাব দিতে দেরি করলে বা নিষ্ক্রিয় থাকলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে।’ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালির দিকে বেশি পাঠানো হয়েছিল। এর ফলে হর্ন অব আফ্রিকার উপকূলের কাছে নিরাপত্তার কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে সংগঠিত সামুদ্রিক অপরাধী চক্রগুলো।হুদিস্তেয়ানু সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা বিশেষ করে সোমালিয়ার উপকূলজুড়ে জলদস্যুতার পুনরুত্থান দেখতে পাচ্ছি। বহুস্তরীয় এই সংকটের সময় আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজর হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে সরে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।’হুতিদের শক্তি কোথায়, বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধে জড়িয়েও কেন পিছু হটল যুক্তরাষ্ট্রমিসরের দুশ্চিন্তালোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না বলে হুতিরা আশ্বস্ত করেছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো নিশানা করে হামলা চালিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হুতিরা লোহিত সাগরে ১০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। হুতিদের দাবি ছিল, এসব জাহাজ ইসরায়েল বা দেশটির মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় মিসরের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস সুয়েজ খালের টোল।সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মিসর প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে। এই অর্থ সুয়েজ খালের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ।হুদিস্তেয়ানু বলেন, হুতিদের এই অভিযান ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়। লোহিত সাগর দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করত, সেগুলোর বড় একটি অংশ একপর্যায়ে পুরোপুরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে হুতিরা জাহাজে হামলা বন্ধ করার কথা জানায়। কিন্তু অনেক কোম্পানি কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখে। তারা আর আগের পথে ফিরে আসেনি।ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক কুচকাওয়াজহরমুজ প্রণালিতে জাহাজে নতুন করে হামলা, তেল সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছেআফ্রিকা অধ্যয়নের অধ্যাপক ও সংঘাত নিরসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বদর হাসান আল-শাফেই বলেন, এই সময়ে ক্ষতি সত্ত্বেও মিসর কৌশলগতভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছিল।আল-শাফেই আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তাতে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকার নীতি অনুসরণ করে মিসর। ২০১৫ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোর ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের সময় থেকেই এটি মিসরের একটি স্থায়ী অবস্থান।’আল-শাফেই আরও বলেন, বাব আল-মানদেব দিয়ে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের দিকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এসব সত্ত্বেও মিসর হস্তক্ষেপ করেনি। যদিও এতে দেশটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি হুতিদের, বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষতিইরিত্রিয়ার গুরুত্ব বেড়েছেইয়েমেনিরা এখন লোহিত সাগরে প্রবেশের পথে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে। এর ফলে ইয়েমেনের অপর পাশে বাব আল-মানদেবের কাছে অবস্থিত আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কির শাসনামলে দেশটি স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছে। এ কারণে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে দেশটির যোগাযোগও সীমিত ছিল।তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফওয়ার্কি লোহিত সাগরে ইরিত্রিয়ার কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কও উন্নত করেছেন তিনি।আল-শাফেই বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তা থেকে নিজেকে দূরে রাখার ভান করছেন আফওয়ার্কি। কিন্তু বাস্তবে লোহিত সাগরে যা ঘটছে, তা থেকে তিনি অনেক সুবিধা পাচ্ছেন।’লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের ওপর ইয়েমেন সরকারের হামলা
১৯৫৩ সালের এপ্রিল। নিউইয়র্কের আইডলওয়াইল্ড বিমানবন্দরে নিজের উত্তরসূরিকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব ত্রিগভে লি। সুইডিশ কূটনীতিক দাগ হামারশোল্ডকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব চাকরিতে স্বাগতম।’ সাত দশক পরও জাতিসংঘের মহাসচিবের পদটি বিশ্বের অন্যতম কঠিন দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। সাধারণত মহাসচিবের মেয়াদ হয় পাঁচ বছর। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, পরপর দ্বিতীয় মেয়াদেও দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকে। লাতিন আমেরিকা থেকে আসতে পারেন নতুন মহাসচিব এবারের প্রতিযোগিতায় মোট আটজন প্রার্থী রয়েছেন। ভৌগোলিক ভারসাম্যের অনানুষ্ঠানিক রীতি অনুযায়ী, পরবর্তী মহাসচিব লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আসতে পারেন। আরও পড়ুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন খলিলুর রহমান এই অঞ্চল থেকে সর্বশেষ মহাসচিব ছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েলার। তিনি ১৯৯২ সালে দায়িত্ব ছাড়েন। এর পাশাপাশি জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে মহাসচিব করার দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে। বর্তমান প্রতিযোগিতায় লাতিন আমেরিকার একাধিক নারী প্রার্থী থাকায় এই সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। সামনে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন মহাসচিব এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেবেন, যখন জাতিসংঘ নানা দিক থেকে চাপে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অর্থদাতা। কিন্তু ওয়াশিংটন স্বেচ্ছা তহবিলে অর্থ দেওয়া কমিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে, সদস্যদেশগুলোর বকেয়া চাঁদার কারণে সংস্থাটির অর্থসংকট আরও গভীর হয়েছে। গাজা, সুদান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ থামাতে নিরাপত্তা পরিষদের অক্ষমতাও জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে নতুন মহাসচিবের সামনে শুধু কূটনৈতিক সংকট নয়, প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর ও দক্ষ করার চ্যালেঞ্জও থাকবে। আরও পড়ুন ওসমান হাদি হত্যার দ্রুত-স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের নির্বাচন হয় যেভাবে মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিরা সদস্যদেশগুলোকে প্রার্থী মনোনয়নের আহ্বান জানান। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করে। এরপর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে অনুমোদন করে। তবে বাস্তবে মূল লড়াই হয় নিরাপত্তা পরিষদেই। একজন প্রার্থীকে অন্তত নয়টি দেশের সমর্থন পেতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কেউ যেন তাকে ভেটো না দেয়। এই পাঁচ দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। আরও পড়ুন দারিদ্র্য ব্যক্তিগত নয়, এটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা: জাতিসংঘ মহাসচিব গোপন ভোটে কে এগিয়ে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে নিরাপত্তা পরিষদ অনানুষ্ঠানিক ও গোপন ভোট নেয়। এগুলোকে ‘স্ট্র পোল’ বলা হয়। প্রতি প্রার্থীর ক্ষেত্রে সদস্যরা তিন ধরনের মত দেন। ‘এনকারেজ’ অর্থ ইতিবাচক সমর্থন। ‘নো ওপিনিয়ন’ অর্থ নিরপেক্ষ বা সিদ্ধান্তহীন অবস্থান। আর ‘ডিসকারেজ’ অর্থ নেতিবাচক অবস্থান। এখন পর্যন্ত দুটি স্ট্র পোল হয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোটে গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট এগিয়ে রয়েছেন। তার পরেই রয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান এবং আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি। আরও পড়ুন জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে সেনাপ্রধানের সাক্ষাৎ ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট: এই মুহূর্তের এগিয়ে থাকা প্রার্থী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট জাতিসংঘে গায়ানার দূত। এর আগে তিনি দেশটির পররাষ্ট্র ও আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গায়ানার প্রতিনিধিত্ব করেন। ক্যারিবীয় দেশগুলোর জোট ক্যারিকম আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে। রদ্রিগেস-বির্কেট নিজেকে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য একজন নীতিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি জাতিসংঘ সনদের ৯৯ অনুচ্ছেদ আরও সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে চান। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার হুমকি নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনার ক্ষমতা মহাসচিবের রয়েছে। আগস্টের দ্বিতীয় স্ট্র পোলেও তিনি সবচেয়ে ভালো ফল করেছেন। আটটি ‘এনকারেজ’, তিনটি ‘ডিসকারেজ’ এবং চারটি ‘নো ওপিনিয়ন’ ভোট পেয়েছেন তিনি। রেবেকা গ্রিনস্প্যান: প্রথম দফায় এগিয়ে ছিলেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান প্রথম স্ট্র পোলে সবচেয়ে ভালো করেছিলেন। জুলাইয়ের ভোটে তিনি ১০টি ‘এনকারেজ’ ভোট পান। ‘ডিসকারেজ’ ভোট ছিল মাত্র একটি। তবে পরের ভোটে তার সমর্থন কমে যায়। আগস্টে তিনি সাতটি ‘এনকারেজ’ এবং চারটি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পান। গ্রিনস্প্যান মহাসচিবের কার্যালয় পুনর্গঠন করতে চান। জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি তিনি সংস্থার বিভিন্ন বিভাগের কাজের পুনরাবৃত্তি কমাতে চান। দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের বোঝা কমানোও তার অন্যতম অগ্রাধিকার। আরও পড়ুন জাতিসংঘে আস্থা ফেরানো, শান্তি ও রোহিঙ্গা সংকটে গুরুত্ব নতুন সভাপতির রাফায়েল গ্রোসি: পারমাণবিক কূটনীতির অভিজ্ঞ মুখ আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি সাত বছর ধরে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক। চার দশকের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। গ্রোসি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট শক্তিশালী দেশের ওপর নির্ভরশীল নন—এমন একজন স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি জাতিসংঘে বক্তৃতার চেয়ে বাস্তব ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাস্তববাদী বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আগস্টের ভোটে সাতটি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন গ্রোসি। বিপরীতে ছয়টি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পান তিনি। ফলে তার প্রার্থিতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আপত্তিও রয়েছে। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনার নতুন করে সার্বভৌমত্ব আলোচনার দাবিও তার প্রার্থিতাকে জটিল করে তুলেছে। মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা: নারী প্রার্থীদের একজন ইকুয়েডরের কূটনীতিক মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা ২০১৮-১৯ মেয়াদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন ওই পদে বসা মাত্র চতুর্থ নারী। আর লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে প্রথম ব্যক্তি। ইকুয়েডরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি দুই দফা দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অন্যতম প্রস্তাব হলো ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড আর্লি অ্যাকশন হাব’ তৈরি করা। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য সংকট আগেই শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। মারিয়ার আরেকটি অগ্রাধিকার হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরি করা। তবে আগস্টের ভোটে তিনি মাত্র চারটি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন। ফলে তার সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আরও পড়ুন জাতিসংঘের নতুন মানচিত্রে অরুণাচল-আকসাই চিন ‘পৃথক অঞ্চল’, ক্ষুব্ধ ভারত মিশেল ব্যাশেলে: অভিজ্ঞ হলেও পিছিয়ে চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেও এবারের প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত নাম। তিনি দুই মেয়াদে চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাশেলে জাতিসংঘের আমলাতন্ত্র কমিয়ে সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করতে চান। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য ও দূষণকে তিনি ‘ত্রিমুখী বৈশ্বিক সংকট’ হিসেবে দেখেন। তবে স্ট্র পোলে তার অবস্থান নেমে গেছে। আগস্টের ভোটে তিনি মাত্র দুটি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন। বিপরীতে, ‘ডিসকারেজ’ ভোট পেয়েছেন ছয়টি। আফ্রিকার প্রার্থীরাও রয়েছেন সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সালও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। তিনি ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার প্রচারের মূল বক্তব্য ‘নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা’। আফ্রিকার স্বার্থকে জাতিসংঘের আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তিনি। উগান্ডার ওলার ওতুনুও একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক। জাতিসংঘে উগান্ডার রাষ্ট্রদূত এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শিশু ও সশস্ত্র সংঘাত বিষয়ে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আগস্টের স্ট্র পোলে ওতুনু সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি দেখানো প্রার্থীদের একজন। তবে লাতিন আমেরিকার প্রার্থীকে বেছে নেওয়া এবং প্রথম নারী মহাসচিব নিয়োগের অনানুষ্ঠানিক প্রত্যাশা তার সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলছে। আরও একজন প্রার্থী, তবে সম্ভাবনা কম ইকুয়েডরের ইভন এ-বাকিও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। তাকে মনোনয়ন দিয়েছে টোঙ্গা। সংঘাত নিরসনকে তিনি তার প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছেন। তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়েছেন। আগস্টের স্ট্র পোলে তার ফল সবচেয়ে দুর্বল। তিনি কোনো ‘এনকারেজ’ ভোট পাননি। আটটি ‘ডিসকারেজ’ এবং সাতটি ‘নো ওপিনিয়ন’ ভোট পেয়েছেন। ফলে তার পক্ষে প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থানে ফেরা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কে? এখন পর্যন্ত গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেটই সবচেয়ে এগিয়ে। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রার্থীকে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন পেলেই হবে না। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটোও এড়াতে হবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হলে দর-কষাকষি ও কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়বে। নতুন মহাসচিব আগামী ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন। ততদিনে প্রশ্নটির উত্তরও মিলবে—জাতিসংঘের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব চাকরি’ এবার কার হাতে যাচ্ছে? সূত্র: মিডল ইস্ট আইকেএএ/