জাতীয়

ইথার এবং একটি ব্যর্থ পরীক্ষা

News সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ 0
ইথার এবং একটি ব্যর্থ পরীক্ষা
ইথার এবং একটি ব্যর্থ পরীক্ষা

আলবার্ট মাইকেলসন নাছোড়বান্দার মতো উঠেপড়ে লাগলেন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণের লক্ষ্যে। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন এডওয়ার্ড মর্লি। বহু বাধাবিপত্তি পেরিয়ে, সব চেষ্টার পরও তাঁরা ব্যর্থ হলেন। কিন্তু এই ব্যর্থতার হাত ধরে শুরু হলো পদার্থবিজ্ঞানের নতুন পথচলা...

জার্মানির রাজধানী বার্লিন থেকে ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের ছোট্ট শহর পটসডাম। ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সামরিক ঐতিহ্য ও রাজকীয় আবাস হিসেবে পরিচিত শহরটি। হ্যাভেল নদীর তীরে গড়ে ওঠা পটসডাম ঘিরে আছে বিখ্যাত সব রাজপ্রাসাদ আর বাগবাগিচা। চারদিকে ছড়িয়ে আছে ছোট-বড় বেশ কটি স্বচ্ছ জলের হ্রদ। সবুজ গাছে ঢাকা ছোট ছোট টিলা, পাহাড় আর উপত্যকা শহরটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে শতগুণ। তাই প্রুশিয়ার রাজা ও গণ্যমান্য লোকজন থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যটকদের কাছে বেশ পছন্দের জায়গা এ শহর।

বিজ্ঞানীদের কাছেও পটসডামের গুরুত্ব কম নয়। শহুরে কোলাহল থেকে একটু দূরেই মনোরম টেলেগ্রাফেনবার্গ পাহাড়। সেখানে রাজকীয় ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পটসডাম অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল অবজারভেটরি—বিশ্বের প্রথম জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র। ১৮৭৮ সালে বানানো এই মানমন্দিরের মূল টাওয়ারের ঠিক নিচেই রয়েছে একটা বৃত্তাকার ঘর। সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে সেটি। বাইরের কোনো শব্দ কিংবা কম্পন ঘরটাতে যাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিঘ্ন না ঘটায়, সে জন্য এর দেয়ালের পুরুত্ব রাখা হয়েছে এক মিটার।

মার্কিন বিজ্ঞানী আলবার্ট মাইকেলসন

নির্জন সেই ঘরটাকে ১৮৮০ সালে একটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য বেছে নিলেন মার্কিন বিজ্ঞানী আলবার্ট মাইকেলসন। পটসডামে তখন শীতকাল। বাইরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। মাঝেমধ্যেই তুষার ঝরছে আকাশ থেকে। ঠিক এ সময় এই পাহাড়ি নির্জনতায় নিজের গবেষণা শুরু করলেন মাইকেলসন। নিজের হাতে বানানো যন্ত্রপাতি সাজিয়ে বসেছেন ঘরটিতে। আক্ষরিক অর্থেই পিতপতন নীরবতা সেখানে। তাই পরীক্ষণ যন্ত্রপাতির মৃদু টুংটাং ছাপিয়ে নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছিলেন তিনি। ঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একমাত্র আলোর উৎস মাইকেলসনের টিনের লন্ঠন। তার মৃদু আলোও নিয়ন্ত্রিতভাবে আয়নায় ফেলছেন মাইকেলসন। বারবার মাপ নিচ্ছেন। টুকে নিচ্ছেন নোট খাতায়।

পটসডামে তখন শীতকাল। বাইরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। মাঝেমধ্যেই তুষার ঝরছে আকাশ থেকে। ঠিক এ সময় এই পাহাড়ি নির্জনতায় নিজের গবেষণা শুরু করলেন মাইকেলসন।

হিমশীতল বেজমেন্টে একে তো ভুতুড়ে পরিবেশ, তার ওপর প্রচণ্ড ঠান্ডায় প্রায় কাঁপতে কাঁপতে টানা কয়েক মাস পরিশ্রম করে গেলেন এই তরুণ বিজ্ঞানী। একই পরীক্ষা করলেন অনেকবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে ফল পেলেন, তা চোখ কপালে তোলার মতো। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না মাইকেলসন। স্রেফ হতভম্ব হয়ে গেলেন এই মার্কিন বিজ্ঞানী। বুঝে উঠতে পারলেন না, ফলাফলটা কি যন্ত্রের ত্রুটির কারণে, নাকি অন্য কিছু? নাকি ইথার বলে আসলে কিছু নেই?

এই তো কমাস আগে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছুটি নিয়ে ইউরোপে এসেছেন মাইকেলসন। উদ্দেশ্য, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা। স্বদেশে কাজ করতেন মার্কিন নেভাল অবজারভেটরির অধীনে।

মার্কিন নৌবাহিনীতে থাকাকালীন অবস্থায় মাইকেলসন

সোজা কথায়, মার্কিন নৌবাহিনীতে। সহকর্মীদের চোখে মাইকেলসন ছিলেন ‘অকাজের কাজি’। রাজধানী ওয়াশিংটন অফিসে তাঁর কাজকারবার ছিল পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

কিন্তু নৌবাহিনীর গোলাবারুদের লক্ষ্যবস্তু নির্ণয়ের চেয়ে তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল আলোর চালচরিত্র নিয়ে। দিনরাত পড়ে থাকতেন আলোকবিদ্যা বা অপটিকস গবেষণায়। নৌ–কৌশলে দক্ষতা ছিল মোটামুটি, কিন্তু আলোকবিদ্যায় ছিলেন সবার সেরা। বিজ্ঞানে কৌতূহল ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে আলোর গতি মাপার সমস্যাটি তাঁকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। তাই একাডেমির সুপারিনটেনডেন্ট তাঁকে বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে যদি এসব বৈজ্ঞানিক বিষয়ে কম মনোযোগ দিয়ে নৌ–গোলাবারুদের দিকে একটু বেশি মনোযোগ দাও, তাহলে হয়তো একদিন তুমি দেশের কাজে লাগবে।’

হিমশীতল বেজমেন্টে একে তো ভুতুড়ে পরিবেশ, তার ওপর প্রচণ্ড ঠান্ডায় প্রায় কাঁপতে কাঁপতে টানা কয়েক মাস পরিশ্রম করে গেলেন এই তরুণ বিজ্ঞানী মাইকেলসন। একই পরীক্ষা করলেন অনেকবার।

কিন্তু সে কথা কানে না তুলে অপটিকস গবেষণায় আরও ঝুঁকে পড়েন মাইকেলসন। এভাবে ১৮৭৮ সালে, ২৫ বছর বয়সে তিনি আলোর গতি নির্ধারণ করেন ২৯৯,৯১০ ± ৫০ কিমি/সেকেন্ড। সেটা ছিল আগের যেকোনো পরিমাপের চেয়ে ২০ গুণ নির্ভুল। আলোর গতি মাপার এ সাফল্য দেশ-বিদেশে তাঁকে বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, ইউরোপের অনেক বিজ্ঞানীর কাছেও মাইকেলসনের পরিচয় দাঁড়াল ‘আলোর গতির সেই আমেরিকান’ হিসেবে। এ সফলতা ও খ্যাতিই আরও গবেষণায় উৎসাহ জোগাল তাঁকে।

এবার পিছু ধাওয়া করলেন ইথার–রহস্যের। একদম নাছোড়বান্দার মতো। সে যুগের বহুল আলোচিত ইথার তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে নতুন পরীক্ষার ফন্দি আঁটলেন। এর মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চান তিনি। কারণ, সেকালে পদার্থবিদেরা ইথারের অস্তিত্ব তাত্ত্বিকভাবে মেনে নিলেও এর পরীক্ষামূলক কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি কেউই। অসমাপ্ত কাজটাই করে দেখাতে চান মাইকেলসন।

মাইকেলসনের বানানো বিশেষ ইন্টারফেরোমিটার

সেটা করতে ছুটি নিয়ে ছুটে গেলেন জার্মানিতে। সেখানকার নামকরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করলেন। খেটেখুটে একটা পরীক্ষার ডিজাইন করলেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ডিজাইন থেকে শুরু করে সব তৈরি করলেন নিজ হাতে। যন্ত্রপাতি বলতে একটা ছোট্ট লন্ঠন, দুটি আয়না আর টুকিটাকি কিছু জিনিস। যন্ত্রটার নাম দিলেন ইন্টারফিয়ারেন্সিয়াল রিফ্র্যাকটোমিটার। অবশ্য কবছর পর সেটা পরিচিত হয়ে উঠবে ইন্টারফেরোমিটার নামে। মাইকেলসন বিশ্বাস করতেন, এ পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারকে হাতেনাতে প্রমাণ করা যাবে।

কিন্তু ১৮৮০ সালের শীতকালে পটসডাম মানমন্দিরে পরীক্ষায় পেলেন উল্টো ফল। তাতে মুষড়ে পড়লেন মাইকেলসন। সেটাই তাঁর ইথার প্রমাণের স্বপ্নটা স্রেফ গুঁড়িয়ে দিল। কিন্তু এই ইথারের ব্যাপারটা আসলে কী? একে প্রমাণের জন্য মাইকেলসনের এমন জান বাজি রেখে উঠেপড়ে লাগার কারণটাই-বা কী?

১৮৭৮ সালে, ২৫ বছর বয়সে মাইকেলসন আলোর গতি নির্ধারণ করেন ২৯৯,৯১০ ± ৫০ কিমি/সেকেন্ড। সেটা ছিল আগের যেকোনো পরিমাপের চেয়ে ২০ গুণ নির্ভুল।

২.

সে যুগে ইথার ছিল এক অসম্ভব বস্তু—একটা রহস্যের নাম। নানা কারণে আলো ও ইথার নিয়ে বেশ একটা শোরগোল চলছিল বিজ্ঞানজগতে। সতেরো শতকে আলোকে কণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন আইজ্যাক নিউটন। তাঁর খ্যাতির মতোই কণাতত্ত্বও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ-বিদেশে। কালে কালে সেটাই জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠল। নিউটনের প্রায় সমসাময়িক বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হাইগেনস আলোকে তরঙ্গ হিসেবে প্রমাণ করলেন, কিন্তু সেটা হালে তেমন পানি পায়নি। প্রায় ২০০ বছর পর, উনিশ শতকের শুরুতে এসে আলো নিয়ে আবারও বিতর্ক শুরু হলো। এবার আলো যে তরঙ্গ, সে প্রমাণ দাখিল করলেন বিজ্ঞানী টমাস ইয়াং। প্রমাণটা ছিল বেশ শক্তপোক্ত। তাই বিজ্ঞানীরা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হন।।

স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল

ওই শতকের মাঝামাঝিতে তরঙ্গতত্ত্ব সমর্থন করেন স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। ১৮৬৩ সালের দিকে ৮টি সমীকরণে (পরে ৪টিতে সংক্ষেপ করা হয়)  বিদ্যুৎ ও চুম্বকের ধর্মগুলো বর্ণনা করেন ম্যাক্সওয়েল। গতিশীল বা পরিবর্তনশীল বৈদ্যুতিক বলক্ষেত্র কীভাবে চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে এবং গতিশীল চুম্বকীয় বলক্ষেত্র কীভাবে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে, তা দেখানো হয় এসব সমীকরণে। সমীকরণগুলো থেকে অদ্ভুত এক ব্যাপার খেয়াল করেন ম্যাক্সওয়েল। বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গের বেগ নির্ণয় করতে গিয়ে তিনি দেখেন, এর গতি আর আলোর গতি হুবহু এক (শূন্যস্থানে সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার)।

ব্যাপারটাকে কাকতালীয় ভেবে ফেলে দিতে পারলেন না; বরং অবিশ্বাস্য ফলাফলটা থেকে বৈপ্লবিক এক সিদ্ধান্তে আসেন ম্যাক্সওয়েল। বললেন, আলোও একপ্রকার বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ। এভাবেই বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব ও আলোকে একসূত্রে বাঁধতে সক্ষম হন ম্যাক্সওয়েল।

সতেরো শতকে আলোকে কণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন নিউটন। তাঁর খ্যাতির মতোই কণাতত্ত্বও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ-বিদেশে। কালে কালে সেটাই জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠল।

কিন্তু এতে নতুন প্রশ্নেরও উদয় হলো। তরঙ্গ চলার জন্য মাধ্যমের দরকার। যেমন শব্দ চলে বাতাসের ভেতর দিয়ে। কাজেই শব্দ হলো বাতাসের চলমান তরঙ্গ। আবার সাগর-মহাসাগর বা পুকুরের ঢেউ হলো পানিতে চলমান তরঙ্গ। তাই প্রশ্ন ওঠে, আলোও যদি তরঙ্গ হয়, তাহলে আলো চলাচল করে কিসের মধ্য দিয়ে? এর চলার মাধ্যম কী?

সে উত্তর জোগাতে পদার্থবিজ্ঞানীরা একসময় একমত হলেন, এ ক্ষেত্রেও একটা বাহক আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সেটি কী? সে সম্পর্কে কেউ কিছু জানেন না। বিজ্ঞানীরা অজানা–অচেনা সেই বাহকের নাম দেন ইথার। বলা যায়, সেটা ছিল জোড়াতালি দেওয়া একটা সমাধান। তাই ইথার রয়ে গেল রহস্যময় এক পদার্থ। ইথার সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বললেন, এর মধ্য দিয়েই বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ চলাচল করে।

যুক্তির পিঠে যুক্তি সাজিয়ে পদার্থবিজ্ঞানীদের অনুমান করে নিতে হলো, গোটা মহাবিশ্বটাই ইথারে ভরা। সে যুগের প্রভাবশালী বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন বললেন, ইথার এমন এক পদার্থ, যা বাতাসের চেয়েও কোটি কোটি কোটি ভাগ হালকা। এই পদার্থ সেকেন্ডে ৪০০ মিলিয়ন মিলিয়ন বার কম্পিত হতে পারে। এর ঘনত্ব এত কম, যেকোনো বস্তু এর মধ্য দিয়ে চললেও তা কোনো বাধা পায় না। তা না হলে পৃথিবী বা অন্য গ্রহগুলো মহাকাশে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে কীভাবে!

সে যুগের প্রভাবশালী বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন বললেন, ইথার এমন এক পদার্থ, যা বাতাসের চেয়েও কোটি কোটি কোটি ভাগ হালকা। এই পদার্থ সেকেন্ডে ৪০০ মিলিয়ন মিলিয়ন বার কম্পিত হতে পারে।

কেলভিনের কথা মেনে নিলে বলতে হয়, ইথার একই সঙ্গে অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী ও অদৃশ্য। আবার সেটা স্থিতিস্থাপক, স্বচ্ছ, ঘর্ষণহীন এবং রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এমন পদার্থের ভেতরে গোটা মহাবিশ্বটা ডুবে থাকলেও কেউই একে দেখেনি, ছুঁতে পারেনি। এমনকি এর সঙ্গে ধাক্কাও খায়নি। এ রহস্যময় পদার্থের অস্তিত্ব প্রমাণ করতেই আটঘাট বেঁধে নামলেন মাইকেলসন। আরাগো অনুমান করলেন, পৃথিবীর গতির কারণে ইথারের মধ্য দিয়ে আলোর গতির পরিবর্তন হয় কি না, তা পরীক্ষা করতে নক্ষত্র থেকে আসা আলো ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেই সময়ে পরীক্ষাটি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

এদিকে মৃত্যুর কিছুদিন আগে, ১৮৭৯ সালের ১৯ মার্চ মার্কিন নেভিগেশনাল অ্যালম্যানাক অফিসের ডিরেক্টর ডেভিড পেক টডকে একটি চিঠি লেখেন ম্যাক্সওয়েল। তিনি সেখানে ইথার প্রবাহ মাপার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ম্যাক্সওয়েলের মতে, পৃথিবীর কক্ষপথের গতি এবং আলোর গতির বর্গের অনুপাত এতই ক্ষুদ্র (১ কোটি ভাগের ১ ভাগ) যে তা মাপা অসম্ভব।

এ রহস্যময় পদার্থ ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করতেই আটঘাট বেঁধে নামলেন মাইকেলসন

চিঠিটা মাইকেলসনও পড়েছিলেন। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে একমত হতে পারলেন না তিনি, বরং একে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিলেন। সেই কঠিন কাজই সম্ভব করে দেখাতে চাইলেন। অথচ নিজের দেশে এ রকম সূক্ষ্ম গবেষণার সুযোগ-সুবিধা তেমন ছিল না। আসলে সে যুগে যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষা কিংবা উচ্চতর গবেষণার সুযোগ ছিল খুব সীমিত। তাই বেশির ভাগ বিজ্ঞানীই পাড়ি জমাতেন ইউরোপে। সে দলে নাম লেখালেন মাইকেলসনও। ১৮৮০ সালের শরতে নিজের পরিবার, অর্থাৎ স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেসহ জার্মানির উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাহাজে চেপে বসেন আলবার্ট মাইকেলসন।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে, ১৮৭৯ সালের ১৯ মার্চ মার্কিন নেভিগেশনাল অ্যালম্যানাক অফিসের ডিরেক্টর ডেভিড পেক টডকে একটি চিঠি লেখেন ম্যাক্সওয়েল।

৩.

প্রায় ২৬ বছর পর নিজের জন্মভূমি জার্মান সাম্রাজ্যে ফেরেন মাইকেলসন। রাজধানী বার্লিনে এসে সপরিবার থাকতে শুরু করেন ৫৪ কনিগগ্র্যাটজার স্ট্রাসে। ভর্তি হন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইউরোপের নামকরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা পড়াতেন জার্মানির শীর্ষ পদার্থবিদ হারমান ফন হেলমহোল্টজ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে প্রাথমিক কাজ শেষ করে হেলমহোল্টজের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার ক্লাসে যোগ দিতেন মাইকেলসন। আর বাড়িতে চর্চা করতেন গণিত ও মেকানিকস। তাঁর পরীক্ষার পরিকল্পনা নিয়ে হেলমহোল্টজের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনাও করতে লাগলেন। হেলমহোল্টজ পরীক্ষার পদ্ধতির তাত্ত্বিক দিকগুলো খুঁটিয়ে দেখে ত্রুটি খুঁজে পেলেন না।

তবে তাপমাত্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে মন্তব্য করলেন তিনি। কিন্তু নাছোড়বান্দা মাইকেলসন সে সমস্যার সমাধানও বের করে ফেললেন কদিনের মধ্যে। পরীক্ষাগারে বরফ গলিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

তবে অর্থের অভাব তাঁর গবেষণার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ সংকটে ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন টেলিফোনের উদ্ভাবক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। তিনি ভোল্টা ফাউন্ডেশন থেকে মাইকেলসনের প্রকল্পের জন্য আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করেন। তহবিল পেয়ে জার্মানির নামকরা কজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে এ ব্যাপারে সলাপরামর্শ করেন মাইকেলসন। একটা ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত হন, পরীক্ষাটা সফল হলে তা যুগান্তকারী হবে বটে, কিন্তু সফলতার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু সবাই তাঁকে চেষ্টা করে যেতে উৎসাহ দিতে লাগলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে প্রাথমিক কাজ শেষ করে হেলমহোল্টজের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার ক্লাসে যোগ দিতেন মাইকেলসন। আর বাড়িতে চর্চা করতেন গণিত ও মেকানিকস।

বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেজমেন্টে একটি বিশেষ যন্ত্র ডিজাইন শুরু করেন মাইকেলসন। এই সেই ইন্টারফিয়ারেন্সিয়াল রিফ্র্যাকটোমিটার বা ইন্টারফেরোমিটার। যন্ত্রটা বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও জোগাড় করে ফেলেন। পরীক্ষাটাকে এক অর্থে সরলই বলা চলে। তাঁর ইন্টারফেরোমিটার দিয়ে আলোর খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন বা পার্থক্য মাপা যেত। যন্ত্রটা আসলে একটা উৎস থেকে আসা আলোকে একটি বিশেষ আয়না দুই ভাগে ভাগ করে দুটি আলাদা পথে পাঠায়। রশ্মি দুটি চলে পরস্পরের সমকোণে, অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রি কোণে। একটি রশ্মি চলত পৃথিবীর গতিপথের সমান্তরালে, অন্যটি চলত লম্বভাবে।

একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখা দুটি আয়নায় রশ্মি দুটি প্রতিফলিত হয়ে আবারও ফিরে আসে। ফিরে এসে দুই রশ্মি আবার একত্র হয়। রশ্মি দুটি যদি একই দশায় থাকে, তাহলে একে অপরকে শক্তিশালী করে (উজ্জ্বল আলো)। মানে তাদের তরঙ্গশীর্ষগুলো এবং তরঙ্গপাদগুলো পরস্পর একই সময়ে মিলিত হলে পরস্পরকে শক্তিশালী করে। ফলে একটি উজ্জ্বল আলোর সৃষ্টি হয়। কিন্তু রশ্মি দুটি ভিন্ন দশায় থাকলে একে অপরকে দুর্বল বা বাতিল করে দেয় (অন্ধকার)। কারণ, তখন একটি তরঙ্গের তরঙ্গশীর্ষ অন্যটির তরঙ্গপাদের সঙ্গে মিলিত হয়। তাই তারা পরস্পরকে বাতিল করে দেয়।

ফলে অন্ধকার অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। একেই বলে ইন্টারফিয়ারেন্স বা ব্যতিচার প্যাটার্ন। প্রথম প্যাটার্নকে বলা হয় গঠনমূলক ব্যতিচার এবং দ্বিতীয়টিকে বলে ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার। এই আলো-অন্ধকারের প্যাটার্ন দেখে বোঝা যায় কোনো রশ্মির স্থানচ্যুতি বা পথ বদলেছে কি না; অর্থাৎ কোনো কিছুর কারণে খুব ছোট পরিবর্তন (যেমন কম্পন, গতি, চাপ) ঘটেছে কি না। ইন্টারফেরোমিটার যন্ত্রের মাধ্যমে রশ্মি দুটির যাত্রাকালের যেকোনো তারতম্য নির্ণয় করতে পারতেন মাইকেলসন।

একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখা দুটি আয়নায় রশ্মি দুটি প্রতিফলিত হয়ে আবারও ফিরে আসে। ফিরে এসে দুই রশ্মি আবার একত্র হয়। রশ্মি দুটি যদি একই দশায় থাকে, তাহলে একে অপরকে শক্তিশালী করে।

এই বিজ্ঞানী জানতেন, পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘণ্টায় প্রায় ১ লাখ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে। যুক্তি অনুসারে, পৃথিবীও ইথারের মধ্য দিয়ে একই গতিতে এগোচ্ছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, ইথার স্থির মাধ্যম। কাজেই পৃথিবী এই গতিতে ইথারের মধ্যে চলার সময় একটি ‘ইথার উইন্ড’ বা ইথার বাতাসের সৃষ্টি হওয়ার কথা। বাতাসহীন শান্ত কোনো দিন রিকশা বা বাসে খুব জোরে চললে আপনার গায়ে বাতাসের চাপ অনুভূত হয়। বাতাস স্থির থাকলেও সেটা ঘটে আপনার গতির কারণে। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও একইভাবে ইথার বাতাস সৃষ্টি হবে বলে অনুমান করেছিলেন মাইকেলসন। তাই আলো ইথারের মধ্য দিয়ে চলার সময়ও এই ইথারের বাতাস আলোর গতিকে প্রভাবিত করার কথা।

মাইকেলসনের ইন্টারফেরোমিটার পরীক্ষায় একটি আলোকরশ্মি এই ইথার বাতাসের বিপরীতে চলছিল। ফলে এর গতি ও যাত্রাকাল অবশ্যই প্রভাবিত হওয়ার কথা। আরেকটি রশ্মি চলছিল ইথার বাতাসের সঙ্গে লম্বভাবে। তাই এর গতি তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হওয়ার কথা। কাজেই এ পরীক্ষায় এই দুই রশ্মির যাত্রাকালের যদি পার্থক্য পাওয়া যায়, তাহলেই প্রমাণিত হবে যে ইথারের অস্তিত্ব আছে।

ইথার সংক্রান্ত পরীক্ষাটা সহজভাবে বোঝাতে মাইকেলসন দুজন সাঁতারুর উদাহরণ ব্যবহার করেন

ব্যাপারটা আরেকটু সহজ করা যাক। ধরুন, একটি নদীর প্রস্থ ১০০ ফুট। A এবং B নামের দুই সাঁতারু এই নদীতে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। তবে প্রতিযোগিতাটা হবে একটু আলাদা নিয়মে। ধরা যাক, দুজনই প্রতি সেকেন্ডে ৫ ফুট গতিতে সাঁতার কাটতে পারে। নদীটিতে স্রোতের গতি সেকেন্ডে ৩ ফুট। দুই সাঁতারু নদীর তীর থেকে একই সঙ্গে সাঁতার কাটতে শুরু করল। কিন্তু একজন সাঁতারু স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কেটে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত (নদীর প্রস্থের সমান বা ১০০ ফুট) গিয়ে আবারও একই পথে শুরুর বিন্দুতে ফিরে আসবে। আরেকজন নদীটার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে (দূরত্ব ১০০ ফুট) গিয়ে আবারও আগের জায়গায় ফিরে আসবে। প্রশ্ন হলো, কে জিতবে?

পৃথিবীর ক্ষেত্রেও একইভাবে ইথার বাতাস সৃষ্টি হবে বলে অনুমান করেছিলেন মাইকেলসন। তাই আলো ইথারের মধ্য দিয়ে চলার সময়ও এই ইথারের বাতাস আলোর গতিকে প্রভাবিত করার কথা।

মাইকেলসন সাঁতারের এ ধাঁধা ব্যবহার করেছিলেন ইথার পরীক্ষাটি বোঝাতে। দুই সাঁতারু এখানে প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এবার দুই সাঁতারুর জায়গায় দুটি আলোকরশ্মির কথা কল্পনা করুন। রশ্মি দুটি পরস্পরের সাপেক্ষে সমকোণে চলে এবং পরে আবার একত্র হয়। একজন সাঁতারু যেমন প্রথমে স্রোতের অনুকূলে এবং পরে স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কাটে, ঠিক তেমনি একটি আলোকরশ্মি ইথার বাতাসের অনুকূল ও প্রতিকূলে চলে। অপরজন যেমন স্রোতের আড়াআড়ি সাঁতরে কেটে সোজা নদী পার হয়, তেমনি আরেকটি আলোকরশ্মি ইথার বাতাসের সাপেক্ষে লম্বভাবে চলে। এখন দুই সাঁতারুর দুজনেই যদি স্থির পানিতে ৫ ফুট/সেকেন্ড গতিতে সাঁতার কাটতে পারে, তাহলে তারা কে আগে ২০০ ফুট অতিক্রম করতে পারবে?

সাঁতারু A স্রোতের অনুকূলে ১০০ ফুট এবং স্রোতের বিপরীতে ১০০ ফুট সাঁতরে যায়। সাঁতারু B নদী পার হয়ে ১০০ ফুট এবং ফিরে আসতে আরও ১০০ ফুট বা মোট ২০০ ফুট দূরত্ব পার হয়। সাঁতারু A প্রথমে স্রোতের দিকে ১০০ ফুট যায়। কাজেই তার গতি হবে ৫ + ৩ = ৮ ফুট/সেকেন্ড। ফলে প্রথম ১০০ ফুট পার হতে তার সময় লাগে ১২.৫ সেকেন্ড। পরে স্রোতের বিপরীতে ফেরার সময় তার গতি হবে (৫ – ৩) = ২ ফুট/সেকেন্ড। এবার তার সময় লাগবে ৫০ সেকেন্ড। তাহলে A-এর ২০০ ফুট অতিক্রম করতে মোট সময় লাগবে ৬২.৫ সেকেন্ড।

সাঁতারু A স্রোতের অনুকূলে ১০০ ফুট এবং স্রোতের বিপরীতে ১০০ ফুট সাঁতরে যায়। সাঁতারু B নদী পার হয়ে ১০০ ফুট এবং ফিরে আসতে আরও ১০০ ফুট বা মোট ২০০ ফুট দূরত্ব পার হয়।

সাঁতারু B সোজা নদী পার হয়, কিন্তু তাকে কোনাকুনি সাঁতার কাটতে হয়, যাতে স্রোতে ভেসে না যায়। পিথাগোরাসের সূত্রমতে, সে যদি সঠিক কোণে সাঁতার কাটে, তাহলে উজানের দিকে গতি হবে ৩ ফুট/সেকেন্ড। সেটাই স্রোতের প্রভাবের ক্ষতি পূরণ করে। নদী পারাপারের কার্যকর গড় গতি হবে ৪ ফুট/সেকেন্ড। ফলে ১০০ ফুট পাড়ি দিতে তার সময় লাগে ২৫ সেকেন্ড। ফিরে আসতেও লাগবে একই সময়; অর্থাৎ ২০০ ফুট অতিক্রম করতে B-এর মোট লাগবে ৫০ সেকেন্ড (নিচের ছবি)।

এ থেকে বোঝা যায়, স্থির পানিতে দুজনের সাঁতারের গতি একই হলেও স্রোতের বিপরীতে যাওয়া-আসায় বিজয়ী হবে সাঁতারু B। এ বিশ্লেষণ থেকেই মাইকেলসন ধারণা করলেন, ইথার বাতাসের বিপরীতে ও অনুকূলে চলা আলোর রশ্মির ভ্রমণ সময় হবে বেশি, আর ইথার বাতাসে লম্বভাবে চলা রশ্মির সময় হবে কম; অর্থাৎ ইথার বাতাসের বিপরীতে ও লম্বভাবে চলা আলোর রশ্মির যাত্রাকালেও পার্থক্য দেখা যাবে। ধারণাটা যাচাই করতেই পরীক্ষাটার নকশা করেছিলেন তিনি। সে জন্য সে যুগের সর্বোচ্চ মানের আলোর উৎস ও আয়না ব্যবহার করেন তিনি। সবকিছু খুব যত্ন নিয়ে স্থাপন করেন। যন্ত্রটির সংবেদনশীলতা বাড়ানোর জন্য ও বাইরের কম্পনের প্রভাব কমাতে তিনি পুরো যন্ত্রটি পারদভরা পাত্রে ভাসিয়ে রাখেন।

ব্যতিচার নকশায় কোনো স্থানচ্যুতি দেখা গেল না। মানে, দুটি আলোর রশ্মির ফিরে আসার সময়ের কোনো পার্থক্যই নেই। মাইকেলসনের জন্য সেটা ছিল চমকে দেওয়া ফল।

কিন্তু বার্লিনে পরীক্ষাটা করতে গিয়ে আরেক দফা সমস্যায় পড়েন মাইকেলসন। এবার আর্থিক সংকট নয়, সমস্যাটা যন্ত্রের। তাঁর যন্ত্র এতই সংবেদনশীল যে আশপাশে যানবাহনের কম্পনও যন্ত্রে ধরা পড়তে লাগল। তাতে পরীক্ষাটা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। এমনকি টিনের লন্ঠন গরম হলে সৃষ্ট সামান্য তাপেও ব্যতিচার প্যাটার্ন স্থানচ্যুত হতো। আবার অবজারভেটরি থেকে ১০০ মিটার দূরের ফুটপাতে কেউ জোরে পা ফেললেই আলোর ব্যতিচার নকশা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যেত! নিজের যন্ত্রের কর্মক্ষমতা দেখে নিজেই অবাক হলেন মাইকেলসন। এ সমস্যার সমাধান দিলেন হেলমহোল্টজ। তাঁর সুপারিশে যন্ত্রটি বার্লিন থেকে পটসডাম অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল অবজারভেটরিতে সরিয়ে নেওয়া হলো। এই পাহাড়ি নির্জনতায় মাইকেলসন অবশেষে স্থিতিশীল ব্যতিচার নকশা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হন।

তবু শেষ হাসি হাসতে পারলেন না মাইকেলসন। দীর্ঘদিন পরিশ্রমে যে ফলাফল পাওয়া গেল, তা ছিল অপ্রত্যাশিত ও বিপ্লবী। কারণ, ব্যতিচার নকশায় কোনো স্থানচ্যুতি দেখা গেল না। মানে, দুটি আলোর রশ্মির ফিরে আসার সময়ের কোনো পার্থক্যই নেই। মাইকেলসনের জন্য সেটা ছিল চমকে দেওয়া ফল। শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন, যন্ত্রের ত্রুটির কারণে এমন ফল আসছে কি না। কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তেমন কিছুই পাওয়া গেল না।

অবজারভেটরি থেকে ১০০ মিটার দূরের ফুটপাতে কেউ জোরে পা ফেললেই আলোর ব্যতিচার নকশা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যেত! নিজের যন্ত্রের কর্মক্ষমতা দেখে নিজেই অবাক হলেন মাইকেলসন।

নিজের পরীক্ষার ফল মেনে নিতে পারলেন না মাইকেলসন। ফলাফলটা যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে স্বীকার করতে হবে যে ইথার বলে কিছুই নেই। ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়ে ভীষণ হতাশ হন তিনি। কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নন মাইকেলসন। পরীক্ষাটা আবারও করার সিদ্ধান্ত নেন। সে জন্য যন্ত্রটাও আরেকটু উন্নত করার চেষ্টা করেন। এভাবে টানা ছয় মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেলেন তিনি। তবু পরীক্ষার ফলাফলে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। আবারও ব্যর্থ হলো পরীক্ষা। তাহলে কি ইথার বলে কিছু নেই? নাকি পরীক্ষায় কোনো ভুল হলো?

এসব ভাবতে ভাবতেই তাঁর ইউরোপে দুই বছরের ছুটি শেষ হয়ে গেল। ইথার সম্পর্কে সিদ্ধান্তটা প্রায় অমীমাংসিত রেখে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি। তবে তখনই সিদ্ধান্ত নেন, যে করেই হোক, এ রহস্যের শেষ দেখে ছাড়বেন।

ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়ে ভীষণ হতাশ হন মাইকেলসন। কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নন তিনি। পরীক্ষাটা আবারও করার সিদ্ধান্ত নেন। সে জন্য যন্ত্রটাও আরেকটু উন্নত করার চেষ্টা করেন।

৪.

দেশে ফিরে নতুন করে পরীক্ষার জোগাড়যন্ত্র শুরু করলেন মাইকেলসন। আগের পরীক্ষায় ত্রুটি হতে পারে বলে অনুমান করলেন। কিন্তু সেটা যে কী, তা বুঝে উঠতে পারলেন না। ১৮৮১ সালে নৌবাহিনী থেকে পদত্যাগও করেন। দুই বছর পর পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে কেজ স্কুল অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সে (বর্তমান কেজ ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির অংশ)। এবার আর পরীক্ষাটা একা করার সাহস পেলেন না। সঙ্গে নেন মার্কিন রসায়নবিদ এডওয়ার্ড ডব্লিউ মর্লিকে। পার্শ্ববর্তী ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করতেন মর্লি। দুজনে যন্ত্রটি আরও উন্নত করে নতুন করে পরীক্ষা চালাতে লাগলেন—এক-দুবার নয়, বারবার। কিন্তু প্রতিবারই মিলল একই ফলাফল। বলা ভালো, বারবারই ব্যর্থ হলো তাঁদের পরীক্ষা। কোনোভাবেই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা গেল না।

আলবার্ট মাইকেলসন ও এডওয়ার্ড ডব্লিউ মর্লি

ফলাফল দেখে ভুরু কুঁচকে উঠল মাইকেলসন-মর্লির। ব্যাপারটা মেনে নেওয়া দুজনের জন্যই ছিল কষ্টকর। তাঁরা অবাক হয়ে দেখতে পান, শীত হোক, গ্রীষ্ম হোক, আলোর ওই দুটি রশ্মির মধ্যে কোনো দিকেই পুরো বছর বা দিনের কোনো সময়েই এ ধরনের কোনো পার্থক্য পাওয়া যাচ্ছে না। দুই ক্ষেত্রেই আলোর পথটুকু পাড়ি দিতে একই সময় লাগছে। আলো যেন যেকোনো দর্শক সাপেক্ষে সব সময় একই বেগে চলাফেরা করছে। অবশেষে ১৮৮৭ সালে, অনেকটা বাধ্য হয়ে ব্যর্থতা মেনে নেন তাঁরা। পরীক্ষাটার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেন মাইকেলসন-মর্লি। ফলাফল, ইথারের কোনো অস্তিত্ব নেই। সে বছর নভেম্বরে আমেরিকান জার্নাল অব সায়েন্স জার্নালে এ–সংক্রান্ত পেপারটা প্রকাশিত হলো। এর শিরোনাম ছিল: অন দ্য রিলেটিভ মোশন অব দ্য আর্থ অ্যান্ড দ্য লুমিনিফেরাস ইথার।

মাইকেলসন ও মর্লি অবাক হয়ে দেখতে পান, শীত হোক, গ্রীষ্ম হোক, আলোর ওই দুটি রশ্মির মধ্যে কোনো দিকেই পুরো বছর বা দিনের কোনো সময়েই এ ধরনের কোনো পার্থক্য পাওয়া যাচ্ছে না।

তাহলে কি আলো মাধ্যম ছাড়াই শূন্যে চলাচল করতে পারে? সেটা মেনে নেওয়া সে যুগের বিজ্ঞানীদের জন্য সহজ ছিল না। এ সময় দৃশ্যপটে এলেন আইরিশ পদার্থবিদ জর্জ ফিটজেরাল্ড এবং ডাচ পদার্থবিদ হেনড্রিক লরেঞ্জ। মাইকেলসন-মর্লির এই পরীক্ষার পর ইথারকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে লাগলেন তাঁরা। যথাক্রমে ১৮৮৯ ও ১৮৯২ সালে তাঁরা বললেন, ইথারের ভেতর দিয়ে চলার সময় বিভিন্ন বস্তু সংকুচিত হবে এবং তাতে ঘড়িও চলবে ধীরে। এই সংকোচন ও ঘড়ির ধীরগতি এমন হবে যে আলোর গতি মাপলে সব সময়ই একই পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ইথারের সাপেক্ষে আলোর গতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

ফিটজেরাল্ড ও লরেঞ্জের এ কথার মানে হলো, মাইকেলসন-মর্লি ইথারের সাপেক্ষে আলোর গতি মাপতে যে যন্ত্র ব্যবহার করেছেন, তা গতিপথের দিক বরাবর সংকুচিত হয়ে গেছে। আর এই সংকোচনের পরিমাণ ও আলোর গতিবেগ কমে যাওয়ার পরিমাণ এক। তাই দুটি ফলাফল পরস্পরকে বাতিল করায় ওই যন্ত্রে কোনো প্রভাব ধরা পড়েনি।

কিন্তু শত চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ইথার তত্ত্ব বাঁচাতে পারেননি ফিটজেরাল্ড আর লরেঞ্জ। কারণ, এর চেয়ে আরও যুক্তিযুক্ত এবং গ্রহণযোগ্য একটি ব্যাখ্যা ছিল। মাইকেলসন-মর্লির ব্যর্থ পরীক্ষাটাই যে আসলে একটা বৈজ্ঞানিক বিজয়, সেটা বুঝতে বিজ্ঞানীদের সময় লেগে গেল প্রায় এক দশক। স্রেফ তাত্ত্বিক যুক্তির পিঠে যুক্তি সাজিয়ে এক যুবক বুঝে ফেললেন যে ইথারের আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই। আসলে আলোর চলার জন্য ইথারের কোনো প্রয়োজনও নেই। সেই যুবকের নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। ১৯০৫ সালে এভাবেই জন্ম নিয়েছিল বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।

১৮৮৯ ও ১৮৯২ সালে আইরিশ পদার্থবিদ জর্জ ফিটজেরাল্ড এবং ডাচ পদার্থবিদ হেনড্রিক লরেঞ্জ বললেন, ইথারের ভেতর দিয়ে চলার সময় বিভিন্ন বস্তু সংকুচিত হবে এবং তাতে ঘড়িও চলবে ধীরে।

এ ব্যর্থ পরীক্ষার কারণে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান আলবার্ট মাইকেলসন—১৯০৭ সালে। তিনিই ছিলেন নোবেলজয়ী প্রথম মার্কিন বিজ্ঞানী। তাঁর সেই ‘ব্যর্থ’ পরীক্ষাটি দিয়েই শুরু হয়েছিল পদার্থবিজ্ঞানের এক নতুন যুগের জয়যাত্রা।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: দ্য মাস্টার অব লাইট: আ বায়োগ্রাফি অব আলবার্ট এ মাইকেলসন/ ডরোথি মাইকেলসন লিভিংস্টোন; দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল/ স্টিফেন হকিং; আ ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম/ স্টিফেন হকিং; আইনস্টাইনস কসমস/ মিচিও কাকু; বিগ ব্যাং/ সাইমন সিং; দ্য বিউটি অব ফলিং/ ক্লডিয়া দ্য র‍্যাম

বিগ থিঙ্ক ডটকম; নোবেল ডটঅর্গ; ব্রিটানিকা ডটকম; উইকিপিডিয়া

*লেখাটি ২০২৫ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত

Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন

জাতীয়

View more
দেবরের অভিযোগ তার ভাবি ডাইনি, টিজারেই চমক
দেবরের অভিযোগ তার ভাবি ডাইনি, টিজারেই চমক

ভারতীয় অভিনেত্রী ইয়ামি গৌতমকে এবার দেখা যাবে একেবারেই ভিন্ন এক চরিত্রে। ফ্যান্টাসি ও পারিবারিক বিনোদনের গল্প নিয়ে নির্মিত নতুন সিনেমা ‘নয়ি নাভেল্লি’র টিজার প্রকাশ পেয়েছে। টিজারে ইয়ামির চরিত্রকে ঘিরে শুরু থেকেই তৈরি হয়েছে রহস্য ও নানা অদ্ভুত পরিস্থিতি। টিজারের শুরুতে দেখা যায় একটি সাধারণ পরিবারের পরিবেশ। এর মধ্যেই পরিবারের নতুন সদস্য ইয়ামির চরিত্রকে নিয়ে তার দেবর অভিযোগ তোলে তার ভাবি ডাইনি। এরপরই একের পর এক অদ্ভুত চরিত্র ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় গল্পের ঝলক। ‘নয়ি নাভেল্লি’তে ইয়ামি গৌতমকে এমন এক চরিত্রে দেখা যাবে, যা এর আগে তার অভিনীত চরিত্রগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। নির্মাতাদের ভাষ্য, সিনেমাটিতে দর্শক ইয়ামিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন বালাজি মোহন। চিত্রনাট্য লিখেছেন হিমাংশু শর্মা ও দিব্য নিধি শর্মা। সংগীত পরিচালনায় রয়েছেন জি ভি প্রকাশ কুমার। আনন্দ এল রাই ও শর্মা কালার ইয়েলো ব্যানারের অধীনে সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন। এতে ইয়ামির সঙ্গে অভিনয় করেছেন আদিনাথ এম কোঠারে, অনুরাগ ঠাকুর, সুনীতা রাজওয়ার, মিতা বশিষ্ঠ, আদিত্য কুলশ্রেষ্ঠ, সুশ্মিতা মুখার্জি, সোনাল ঝা, সুনীল সিনহাসহ আরও অনেকে। ভারতে আগামী ১৬ অক্টোবর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ‘নয়ি নাভেল্লি’। দশেরার উৎসবকে সামনে রেখে সিনেমাটির মুক্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ইয়ামি গৌতমকে সর্বশেষ ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’-এ অতিথি চরিত্রে দেখা গেছে। এর আগে ‘হক’ ও ‘আর্টিকেল ৩৭০’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি।   এলআইএ

News সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ 0
পাচারের সময় উদ্ধার, তিন প্রজাতির ১০৩টি টিয়া উড়ল মুক্ত আকাশে

পাচারের সময় উদ্ধার, তিন প্রজাতির ১০৩টি টিয়া উড়ল মুক্ত আকাশে

খেলতে গিয়ে কক্ষের ছিটকিনি দিয়ে আটকা দুই বছরের শিশু, উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস

খেলতে গিয়ে কক্ষের ছিটকিনি দিয়ে আটকা দুই বছরের শিশু, উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস

নিয়োগে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধি নির্লজ্জ দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত: জামায়াত

নিয়োগে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধি নির্লজ্জ দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত: জামায়াত

অভিবাসী ভেবে পাকিস্তানের যুব ক্রিকেটারদের ঘিরে বিক্ষোভ!
অভিবাসী ভেবে পাকিস্তানের যুব ক্রিকেটারদের ঘিরে বিক্ষোভ!

ইংল্যান্ডে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই ঘটে গেল অদ্ভুত এক ঘটনা। দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থী ভেবে পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের থাকার হোটেলের সামনে জড়ো হয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। পরে জানা যায়, যাদের নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, তারা আসলে পাকিস্তানের কিশোর ক্রিকেটার। ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ শহরে। পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা তখন শহরের কসামের একটি ম্যারিয়ট হোটেলে অবস্থান করছিলেন। এ সময় হোটেলের সামনে প্রায় ৩০ জন অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারী জড়ো হন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি কোচে একদল তরুণ এশীয় ব্যক্তিকে ওই হোটেলের কাছে দেখা যাওয়ার খবর অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পরই বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হন। তাদের ধারণা ছিল, ওই ব্যক্তিরা সম্ভবত আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসী। পরে ঘটনাস্থলে যান অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকের একজন কাউন্সিলর। বিষয়টি যাচাই করে তিনি নিশ্চিত হন, হোটেলে থাকা তরুণরা কোনো আশ্রয়প্রার্থী নন; তারা পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের সদস্য। এরপর তিনি বিক্ষোভকারীদের সেখান থেকে চলে যেতে সহায়তা করেন। হ্যাম্পশায়ার পুলিশও ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে। তবে পুলিশ সরাসরি পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের বিক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু বলা হয়নি বলে উল্লেখ করেছে। পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হোটেলের কাছে একদল মানুষ জড়ো হওয়ার খবর পেয়ে কর্মকর্তারা সেখানে যান। সেখানে উপস্থিত লোকজন একটি কোচকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন। পুলিশ তাদের সঙ্গে কথা বলে জানায়, তাদের আশঙ্কার কোনো ভিত্তি নেই। পরে প্রায় ৩০ জনের ওই দলটি অল্প সময়ের মধ্যেই সেখান থেকে চলে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা তীব্র। ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে ছোট নৌকায় করে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করে আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টি দেশটির রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক বিক্ষোভ হয়েছে, যার কয়েকটিতে সহিংসতাও দেখা গেছে। পোর্টসমাউথেও মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে অভিবাসীদের একটি দল শহরের কাছে পৌঁছানোর পর তাদের নামতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ঘটনাটি ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছিল। এর মধ্যেই পাকিস্তানের কিশোর ক্রিকেটারদের আশ্রয়প্রার্থী ভেবে হোটেলের সামনে বিক্ষোভের ঘটনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজমের জাতীয় সংগঠক মাইকেল ব্র্যাডলি ঘটনাটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, শরণার্থী ও অভিবাসীদের ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর প্রবণতা সমাজে কতটা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ। ব্র্যাডলি বলেন, পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের মতো একটি দলকে শুধুমাত্র তারা অভিবাসী হতে পারে- এমন ধারণা থেকে বিক্ষোভের মুখে পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার আশঙ্কা, এর ফলে যুক্তরাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় জনগোষ্ঠীর যে কোনো মানুষই উগ্র ডানপন্থীদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। তার ভাষায়, এই ধরনের পরিস্থিতির পরিণতি শেষ পর্যন্ত বর্ণবাদী হামলা ও আরও সহিংসতার দিকে যেতে পারে। ঘটনাটির আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো, একই সময়ে পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দলও ইংল্যান্ডে অবস্থান করছে। পাকিস্তানের সিনিয়র দল তখন বার্মিংহামের এজবাস্টনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্ট খেলছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দল ইংল্যান্ড সফরে নিজেদের ক্রিকেট কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। ফলে ক্রিকেটের কারণে ইংল্যান্ডে থাকা পাকিস্তানি তরুণদের এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে শুধু তাদের চেহারা ও পরিচয় নিয়ে তৈরি ভুল ধারণার কারণে। আইএইচএস/

News সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ 0
৮০-র দশকে সবার চুল কি কোকড়া ছিল? এআইয়ের ছবির রহস্য কী

৮০-র দশকে সবার চুল কি কোকড়া ছিল? এআইয়ের ছবির রহস্য কী

খাদ্যে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ মৌলভীবাজার কেন অন্য জেলার ভরসায়?

খাদ্যে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ মৌলভীবাজার কেন অন্য জেলার ভরসায়?

৭ জন বাদ, ডুলির দলে টিকে রইলেন দুই প্রবাসী ফুটবলার

৭ জন বাদ, ডুলির দলে টিকে রইলেন দুই প্রবাসী ফুটবলার

আমাকে সংসদে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে: রুমিন ফারহানা
আমাকে সংসদে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে: রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, এই সংসদে ডিসেন্ট ওয়েজ নেই। গতকাল (বুধবার) সংসদে যে আচরণ লক্ষ করেছি তা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রীতি হতে পারে না। তিনি বলেন, আমার বক্তব্য শেষে কেউ পাল্টা বক্তব্য দিতে পারেন। কিন্তু গতকাল সংসদে আমার আশপাশ থেকে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে। এটা সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন বিলের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। আরও পড়ুন রুমিন ফারহানার বক্তব্যে সংসদে উত্তাপ রুমিন ফারহানা বলেন, একটা সংসদে সরকারি দল, বিরোধীদল, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য থাকেন। একেক জনের এক ধরনের মত থাকবে। এই সংসদে যখন আমি একা দাঁড়িয়ে ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বলেছি তখন আমি জঘন্যভাবে মুখোমুখি হয়েছি। সংসদে শুধু না এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য বিরোধীদল সেজে বসে থাকার কোনো মানে দেখছি না। রুমিন ফারহানা গতকালে বলেছেন, এত অসহিষ্ণু সংসদ, মনে হয় যেন একবারে আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি আমরা। আওয়ামী লীগকে যখন বলতাম তখন তারাও হট্টগোল করত। এখন বিএনপির একই ধরনের আচরণ করছে।’ এমওএস/এমআইএইচএস/

News সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ 0
ফটিকছড়িতে বিয়ের মেহেদি অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধার মৃত্যু

ফটিকছড়িতে বিয়ের মেহেদি অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধার মৃত্যু

বাড়ির আঙ্গিনায় মশার প্রজনন হলে জেল: ডিএসসিসি প্রশাসক

বাড়ির আঙ্গিনায় মশার প্রজনন হলে জেল: ডিএসসিসি প্রশাসক

খাতা চ্যালেঞ্জের পরও ফেল, ফাঁস নিলো শিক্ষার্থী

খাতা চ্যালেঞ্জের পরও ফেল, ফাঁস নিলো শিক্ষার্থী

0 Comments