বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা। প্রতিবেদনে খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। সারের সংকটে যদি চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে নতুন করে দরিদ্র হবে ১৪ লাখ মানুষ।
এমনিতেই ডিজেলের ঘাটতিতে সেচসংকট ও বন্যার কারণে বোরোর উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমনের উৎপাদনে যাতে কোনোভাবে ব্যাঘাত না ঘটে, তার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বাস্তবে সেটা যে হয়নি, সার নিয়ে কৃষকের দুশ্চিন্তা, ভোগান্তি, বিক্ষোভ ও ডিলারদের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাপ্রবাহই তার বড় প্রমাণ। আমনের সঙ্গে রবি মৌসুমের ফসল নিয়েও কৃষকেরা শঙ্কায় পড়েছেন।
কৃষির ওপর নির্ভরশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও গ্যাসসংকটের কারণে বাংলাদেশ সার আমদানিনির্ভর দেশ। ফলে যুদ্ধ, মহামারিসহ যেকোনো বৈশ্বিক সংকটেই সারের সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে দেশের অর্থনীতি ও কৃষির ওপর তার প্রভাব পড়ে।
সরকারের তরফ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে যে দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক এলাকায় কৃষকেরা তাঁদের প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও ডিলাররা একজন কৃষকের কাছে এক বস্তার বেশি সার বিক্রি করছেন না। এ পরিস্থিতিতে সারসংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দ্য ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশে জুলাই-সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে সারের চাহিদা থাকে ১৩ দশমিক ২১ লাখ টন। গত পরশু পর্যন্ত সরকারি গুদামে মজুত ছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার টন সার। এর বাইরেও ডিলারদের কাছে ২ থেকে ২ দশমিক ৫ লাখ টন সার মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি সারের মজুত থাকার পরও কেন কৃষকেরা প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না? কেন তাঁদের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে হচ্ছে?
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর পর রৌমারীতেও পরিবেশকের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি সরেজমিনে রৌমারীতে সার বিতরণে প্রশাসন, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার চিত্র দেখেছেন। কৃষকের প্রকৃত সংখ্যা বিবেচনায় না নিয়েই ইউনিয়নভিত্তিক সারের বরাদ্দ ঠিক করা হয়েছে। আবার পরিবেশকেরা প্রতিদিন বিক্রয়কেন্দ্র না খোলায় সারের জন্য কৃষকদের দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য হচ্ছে, রবি মৌসুমের ফসলের জন্য কৃষকেরা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত সার কিনছেন বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ভাষ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মানুষ তখনই আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা শুরু করে, যখন চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি থাকে। আমরা মনে করি, সার নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা মূলত অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা। পরিবেশকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়া গেলেও খোলাবাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের অনেকেই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এ রকম বাস্তবতায় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামেই সার কিনতে হচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থেই সরকারকে সারের ওপর ভর্তুকি দিতে হয়। অব্যবস্থাপনার কারণে সেই সার যদি কৃষকের কাছে ঠিকমতো না পৌঁছায়, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে বিতরণকৃত সার যেন কৃষকের কাছে পৌঁছায়। এ জন্য সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। অসাধু পরিবেশকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
ফেনীতে জেলা পুলিশের বিশেষ সাঁড়াশি অভিযানে ডাকাত দলের সদস্য, আন্তঃজেলা চোরচক্র ও মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিসহ বিভিন্ন অপরাধে মোট ২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গ্রেফতারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল থেকে শুরু হয়ে বুধবার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে একযোগে এই অভিযান পরিচালিত হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযানের অংশ হিসেবে ফেনী রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন ব্রাহ্মণপুকুর পাড় ও ফেনী সরকারি কলেজের পেছনের সড়কে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ তিনজনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- কুমিল্লার লাকসাম এলাকার মো. শুকুর প্রকাশ কানা শুক্কুর (২৬), ফেনী পৌরসভার বিরিঞ্চির মো. আব্দুল মমিন (৪৬) এবং নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির কাউছার হোসেন আশিক (২৩)। পুলিশের দাবি, এদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় একাধিক চুরি ও ডাকাতির মামলা রয়েছে। ডাকাতচক্রের বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় নতুন একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আরও পড়ুন নদীভাঙন / কিছুই করতে না পেরে কবর খুঁড়ে বাবা-দাদির কঙ্কাল সরিয়ে নিলেন নিজাম পৃথক এক অভিযানে চট্টগ্রাম থেকে গাজীপুরগামী কাভার্ডভ্যান থেকে অ্যালুমিনিয়াম ওয়্যার চুরির ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলম (৪১) নামে চোরচক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসময় তার কাছ থেকে চোরাইকৃত মালামাল উদ্ধার করে পুলিশ। এছাড়া অভিযানের বাকি অংশে জিআর ও সিআর পরোয়ানাভুক্ত আসামি, তালিকাভুক্ত মাদককারবারি ও সেবীদের গ্রেফতার করা হয়। অভিযানের বিষয়ে ফেনী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, জেলাজুড়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে এই বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। ডাকাত দলের সদস্য ও চোরচক্রের মূলহোতাসহ গ্রেফতার ২২ জনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাদের জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। জেলা থেকে চুরি, ডাকাতি ও মাদকের অপরাধ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। আবদুল্লাহ আল-মামুন/এনএইচআর
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০২৫ সালের অনার্স দ্বিতীয়বর্ষ পরীক্ষার বিলম্ব ফিসহ ফরম পূরণের সময় বাড়ানো হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এনামুল করিমের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা ১০ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনার্স দ্বিতীয়বর্ষ পরীক্ষার আবেদন ফরম পূরণ করতে পারবেন। এছাড়া ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত কলেজ কর্তৃপক্ষ আবেদন ফরমের ডাটা এন্ট্রি ও নিশ্চয়ন সম্পন্ন করতে পারবে। অন্যদিকে, ১৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত সোনালী সেবার মাধ্যমে পরীক্ষার ফি জমা দেওয়া যাবে। এর আগে গত ২৯ জুন প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা অন্যান্য নিয়ম ও শর্তাবলি অপরিবর্তিত থাকবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বিস্তারিত তথ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের অনলাইন ফরম পূরণ সংক্রান্ত বিভাগে পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়। এএএইচ/এমকেআর
দেশের মানুষ মুঠোফোনে কার সঙ্গে কথা বলেন, কী বার্তা পাঠান, কোথায় কোথায় যান—এসব তথ্য টাকা দিলেই জানা যায়। রীতিমতো ওয়েবসাইট খুলে নাম নিবন্ধন করে তা বহুদিন ধরে বিক্রি হয়। যাঁরা বিক্রি করেন, তাঁদের কাছে ৬ সেপ্টেম্বর পাঠানো হয়েছিল একজন মন্ত্রীর নম্বর। দেওয়া হয়েছিল তাঁদের দাবি করা টাকা। কয়েক ঘণ্টা পরই পাওয়া যায় সেই মন্ত্রীর মুঠোফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর)। সিডিআরে মন্ত্রী তিন মাসে কার সঙ্গে কত সময় কথা বলেছেন, কখন কথা বলেছেন, কথা বলার সময় তিনি কোথায় অবস্থান করেছেন ইত্যাদি নানা গোপন তথ্য রয়েছে। সিডিআর আসল কি না, তা জানতে ৭ সেপ্টেম্বর গেলাম মন্ত্রীর দপ্তরে। সিডিআর দেখানোর পর মন্ত্রী নিজের মুঠোফোন বের করলেন। মিলিয়ে দেখলেন। তারপর অবাক হয়ে বললেন, এটা কীভাবে সম্ভব! তাহলে তো কেউ নিরাপদ নয়। প্রথম আলো অনুসন্ধানে বের করেছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্যও নিরাপদ নয়। এমনকি যাঁদের দায়িত্ব মানুষকে নিরাপদ রাখা, তাঁদের গোপন তথ্যই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের যেকোনো মুঠোফোন ব্যবহারকারীর নম্বরের সিডিআর পাওয়া সম্ভব। প্রথম আলো একজন মন্ত্রীর পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার দুজন প্রধানের মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি প্রথম আলোর দুজন কর্মীর মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করা হয়। মিলিয়ে দেখা যায়, সব কটিই সঠিক।মুঠোফোনের গোপন তথ্য কেনাবেচাকে ঘিরে অনলাইনে একটি বাজার গড়ে উঠেছে। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে, ওয়েবসাইট খুলে এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এসব তথ্য বিক্রি হচ্ছে। টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, সিডিআর, মুঠোফোনের অবস্থান, খুদে বার্তা বা এসএমএস, কর শনাক্তকরণ নম্বরের (টিআইএন) সনদ, পাসপোর্টের তথ্য ও মুঠোফোনে লেনদেনের আর্থিক বিবরণী।সিডিআর আসল কি না, তা জানতে ৭ সেপ্টেম্বর গেলাম মন্ত্রীর দপ্তরে। সিডিআর দেখানোর পর মন্ত্রী নিজের মুঠোফোন বের করলেন। মিলিয়ে দেখলেন। তারপর অবাক হয়ে বললেন, এটা কীভাবে সম্ভব! তাহলে তো কেউ নিরাপদ নয়।প্রথম আলো গত অক্টোবরে এ বিষয়ে কিছু তথ্য এবং কয়েকজনের মুঠোফোনের সিডিআর সংগ্রহ করেছিল। এদিকে গত ৩১ আগস্ট বিষয়টি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে এমন ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ৬০০টির বেশি পোস্টের সন্ধান পেয়েছে তারা।প্রথম আলো অনুসন্ধানে বের করেছে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্যও নিরাপদ নয়। এমনকি যাঁদের দায়িত্ব মানুষকে নিরাপদ রাখা, তাঁদের গোপন তথ্যই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।টাকা দিলেই অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে ‘কল ডিটেল রেকর্ড, অবস্থানের তথ্যতথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগ তাঁর একান্ত গোপনীয় তথ্য। সেটা যখন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়, তখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। তিনি বলেন, ধরা যাক কোনো অপরাধী চক্র কারও ক্ষতি করতে চায়। তাহলে মুঠোফোনের সিডিআর কিনে তিনি কোথায় কোথায় যান, সে সম্পর্কে আঁচ করতে পারে।কারও তিন মাসের সিডিআর কিনতে চাইলে খরচ হবে ১ হাজার ৫০ টাকা। আর ছয় মাসের সিডিআরের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা। এসব ওয়েবসাইট যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁরা ক্রেতাদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে বার্তা আদান-প্রদান করেন।তিন মাসের তথ্যের দাম ১০৫০ টাকাযেসব ওয়েবসাইটে সিডিআর বিক্রি হয়, তার একটিতে নিবন্ধন করে হোমপেজে ঢুকলে দেখা যায়, সেখানে এনআইডি ক্রিয়েট, স্মার্ট এনআইডি ক্রিয়েট, জন্মনিবন্ধন ক্রিয়েট, অটো সাইন কপি, বায়োমেট্রিক অর্ডার, লোকেশন অর্ডার, কললিস্ট অর্ডার, মোবাইলে আর্থিক সেবা অ্যাপের অর্ডার, পাসপোর্টের এসবি কপি বিক্রি ইত্যাদির বিজ্ঞাপন দেওয়া রয়েছে। প্রতিটি সেবার জন্য আলাদা আলাদা ফি ও সময়সীমা উল্লেখ আছে।কারও তিন মাসের সিডিআর কিনতে চাইলে খরচ হবে ১ হাজার ৫০ টাকা। আর ছয় মাসের সিডিআরের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা।এসব ওয়েবসাইট যাঁরা পরিচালনা করেন, তাঁরা ক্রেতাদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে বার্তা আদান-প্রদান করেন।মানুষের মুঠোফোনের গোপন তথ্য ফাঁস নিয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রথম আলোকে বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি হওয়া, ফাঁস হওয়া চলতে দেওয়া যায় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত এই চক্রকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে।সংস্থা প্রধান বললেন, ‘সিডিআর ঠিক আছে’টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরকারি একটি সংস্থার মহাপরিচালকের মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর সংগ্রহের একটি ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে টাকা দেওয়া হয় ৬ সেপ্টেম্বর। ঘণ্টা পাঁচেকের মধ্যে সিডিআর চলে আসে।বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীনাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য যদি এভাবে বিক্রি হয়, সেটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে মিলে বিটিআরসি কাজ করছে।৮ সেপ্টেম্বর ওই সংস্থা প্রধানের কাছে গেলে তিনি নিশ্চিত করেন, সিডিআর ঠিক আছে। তিনি বলেন, সিডিআর ফাঁস হওয়ার বিষয়ে তাঁর ধারণা ছিল। কিন্তু এত হালনাগাদ তথ্য হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে, সেটা তিনি ধারণা করেননি।টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা দেখার দায়িত্বও তাদের।বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য যদি এভাবে বিক্রি হয়, সেটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে মিলে বিটিআরসি কাজ করছে।দায়ী কেদেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের গ্রাহকসংখ্যা ১৯ কোটির কিছু বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ (২০২২) জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য বলছে, দেশের পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের ৫৬ শতাংশ মানুষ মুঠোফোন ব্যবহার করেন।একজন ব্যক্তি মুঠোফোনে কাকে কল করেন, কে তাঁকে ফোন করেন, কী কী খুদে বার্তা বিনিময় হয়—এসব তথ্য সংরক্ষণ করে মোবাইল অপারেটরগুলো। এ বিষয়ে তাদের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সিডিআরে এসব তথ্য থাকে। এর সঙ্গে থাকে আইএমইআই (মুঠোফোনের শনাক্তকরণ নম্বর) এবং কল বা এসএমএসের সময় ব্যবহৃত মোবাইল টাওয়ারের তথ্য।অপারেটরদের এই ডেটাবেইস বা তথ্যভান্ডার ব্যবহারের সুযোগ পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থা। অবশ্য সিডিআরে হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল, টেলিগ্রামসহ মুঠোফোন অ্যাপের তথ্য পাওয়া যায় না।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মোবাইল অপারেটরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, কিছু সরকারি সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা অপারেটরের অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ পান। এমনকি এ ক্ষেত্রে অপারেটরের কাছে আলাদাভাবে তথ্য চাওয়ারও প্রয়োজন হয় না।কীভাবে মানুষের তথ্য ফাঁস হয়, সে বিষয়ে বক্তব্য জানতে গ্রামীণফোন ও রবির কাছে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। জবাবে দুই অপারেটরই তথ্যভান্ডারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে বলে দাবি করেছে। এর বাইরে আইন অনুযায়ী শুধু অনুমোদিত ব্যক্তিদের এসব তথ্যে প্রবেশাধিকার রয়েছে বলেও জানায় তারা।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মোবাইল অপারেটরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, কিছু সরকারি সংস্থার নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা অপারেটরের অনুমোদিত প্রক্রিয়ার বাইরে সরাসরি তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ পান। এমনকি এ ক্ষেত্রে অপারেটরের কাছে আলাদাভাবে তথ্য চাওয়ারও প্রয়োজন হয় না।মোবাইল অপারেটর সূত্র বলছে, কারা কীভাবে মানুষ তথ্য নিয়ে যাচ্ছে, তা বের করা সম্ভব। তবে দরকার সরকারের জোরালো উদ্যোগ।‘সর্বোচ্চ’ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ‘দরকার’তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) গত মাসের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি ও ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের।ফাঁস হয়েছে মানুষের নানা ব্যক্তিগত তথ্য। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভান্ডারের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালেও ৫ কোটি মানুষের এনআইডির তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।২০২৩ সালের জুলাইয়ে তথ্য ফাঁসের ঘটনাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ। টিজিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপদ রাখার দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠানের, তাদের বেশির ভাগই তথ্য ফাঁসের ঘটনা সম্পর্কে জানত না। ঘটনার পর জবাবদিহি কিংবা শাস্তির নজির নেই।নাগরিকদের মুঠোফোন-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য বাণিজ্যিকভাবে ফাঁস ও বিক্রি হওয়ার ঘটনা পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের তথ্য বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে কারা এতে জড়িত, তা শনাক্ত করা উচিত। একই সঙ্গে তথ্য ফাঁসের সুযোগ তৈরি করা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে প্রযুক্তিগত ও কৌশলগতভাবে তা সংশোধন করতে হবে।