কিছু ভ্রমণ শুধু নতুন দেশ দেখা নয়; কিছু ভ্রমণ যেন বহুদিন ধরে পড়ে আসা ইতিহাসের পাতার ভেতর নিজে হেঁটে যাওয়া। আমার সাম্প্রতিক স্পেন সফরে সেভিল, কর্ডোভা ও গ্রানাডায় ঘুরতে গিয়ে বারবার সেই অনুভূতিই হয়েছে।
যে আল-আন্দালুসকে এত দিন চিনেছি বইয়ের পাতায় তারিক ইবনে জিয়াদের জিব্রাল্টার অতিক্রম, কর্ডোভার উত্থান, ইশবিলিয়ার রাজপ্রাসাদ, আলমোহাদদের গিরালদা, গ্রানাডার আলহামরা এবং ১৪৯২ সালে মুসলিম শাসনের শেষ অধ্যায়—এবার সেই ইতিহাসের সামনে এসে দাঁড়ালাম সশরীর।
সেভিলের আলকাসারের দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফি দেখে থমকে দাঁড়িয়েছি; গিরালদার দিকে তাকিয়ে কল্পনা করেছি সেই সময়কে, যখন এটি ছিল মসজিদের মিনার। কর্ডোভার মসজিদের অন্তহীন লাল-সাদা খিলানের নিচে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছে, সময় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে। আর গ্রানাডার পাহাড়ের ওপর আলহামরায় দাঁড়িয়ে অনুভব করেছি একটি সভ্যতার শেষ বিকেলের সৌন্দর্য ও বিষণ্নতা।
তবে এই লেখা কোনো সাম্রাজ্যের গৌরবগাথা নয়, আবার তার পতনের বিলাপও নয়। ইতিহাস কখনো এত সরল নয়। আল-আন্দালুসে যেমন জ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, চিকিৎসা, স্থাপত্য ও শিল্পের বিকাশ ঘটেছে, তেমনি ছিল যুদ্ধ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রাজবংশের সংঘাত এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি-বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা, সহাবস্থান ও সংঘাত মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই দীর্ঘ ইতিহাস।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com
আমি তাই বর্তমানের স্পেনের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সেই অতীতের চিহ্ন খুঁজেছি একজন সাধারণ পর্যটকের চোখে—কখনো প্রাসাদের দেয়ালে, কখনো মসজিদের খিলানে, কখনো নদীর নামে, কখনো বাগানের পানিতে, আবার কখনো একটি মিনারের গায়ে।
সাম্রাজ্য আসে, সাম্রাজ্য চলে যায়। রাজা-বাদশাহদের নাম একসময় ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু মানুষের সৃষ্ট সৌন্দর্যের কিছু চিহ্ন থেকে যায় শতাব্দীর পর শতাব্দী। সেই থেকে যাওয়া চিহ্নগুলোর সন্ধানেই আমার এই আন্দালুসিয়া ভ্রমণ।
এই ভ্রমণকাহিনিতে তাই বর্তমানের পথ ধরে আমি ফিরে যেতে চাই অতীতে-সেভিল থেকে কর্ডোভা, কর্ডোভা থেকে গ্রানাডা; আর আজকের স্পেন থেকে হারিয়ে যাওয়া আল-আন্দালুসে।
সেভিলের মুসলিম অতীতের গল্প শুরু করতে হলে আমাদের সেভিল থেকে আরও দূরে, সময়ের হিসাবে প্রায় ১৪০০ বছর পেছনে আরব উপদ্বীপে ফিরে যেতে হয়।
৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের সময় আরব উপদ্বীপের একটি বড় অংশ ইসলামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিসরে এসে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথম চার খলিফা-হজরত আবু বকর (রা.), হজরত উমর (রা.), হজরত উসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.)-এর সময়ে মুসলিম রাষ্ট্র দ্রুত আরবের সীমানা অতিক্রম করে।
বিশেষ করে হজরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে মুসলিম বাহিনী তৎকালীন দুই পরাশক্তি—বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের (বলতে প্রাচীন পারস্য তথা বর্তমান ইরানকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে বোঝায়। এটি ২২৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল) বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিসর ও ইরাক মুসলিম শাসনের অধীন আসে; সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে পারস্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও নতুন মুসলিম রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়।
এই বিস্তারকে শুধু ধর্মপ্রচারের ইতিহাস হিসেবে দেখলে অবশ্য পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ, সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক জোট, প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং নতুন অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘ সামাজিক-সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া। অধিকৃত অঞ্চলের মানুষও সবাই সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেননি; বহু অঞ্চলে ইসলামায়নের প্রক্রিয়া ঘটেছে কয়েক শতাব্দী ধরে।
পরবর্তী উমাইয়া খিলাফতের (৬৬১-৭৫০) সময় মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা আরও বিস্তৃত হয়। পূর্বদিকে তা মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু পর্যন্ত পৌঁছায়, আর পশ্চিমে মুসলিম বাহিনী মিসর পেরিয়ে উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ধরে অগ্রসর হতে থাকে। আর সেই পশ্চিমমুখী যাত্রাই একদিন ইতিহাসকে নিয়ে আসে ইউরোপের দরজায়।
উত্তর আফ্রিকা জয় একদিনে হয়নি। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে কয়েক দশক ধরে আরব মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় বাইজেন্টাইন শক্তি এবং বিভিন্ন আমাজিঘ বা বারবার জনগোষ্ঠীর সংঘর্ষ, প্রতিরোধ ও পরে রাজনৈতিক সমন্বয় চলতে থাকে। ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম সেনাপতি উকবা ইবনে নাফি বর্তমান তিউনিসিয়ায় কাইরোয়ান প্রতিষ্ঠা করেন। এটি পরবর্তী সময়ে উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে উমাইয়া শাসনের প্রভাব পশ্চিমে বর্তমান মরক্কো পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। স্থানীয় বহু বারবার ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। এই সময় উত্তর আফ্রিকার উমাইয়া গভর্নর ছিলেন মুসা ইবনে নুসাইর। আর তাঁর অধীনই ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভূত হন এমন একজন সেনাপতি, যার নামের সঙ্গে স্পেনের ইতিহাস চিরদিনের জন্য জড়িয়ে যায়—তারিক ইবনে জিয়াদ।
আফ্রিকার উত্তর উপকূল থেকে ইউরোপ তখন চোখের সামনেই। মরক্কোর উত্তর প্রান্ত এবং স্পেনের দক্ষিণ প্রান্তের মাঝখানে সরু জিব্রাল্টার প্রণালি। কোনো কোনো স্থানে আফ্রিকা ও ইউরোপের দূরত্ব মাত্র কয়েক শ কিলোমিটার।
অন্যদিকে আইবেরীয় উপদ্বীপে তখন ভিসিগথ রাজত্ব। রাজা রডেরিক বা রোদ্রিগোর শাসনকাল। কিন্তু রাজ্যের ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও উত্তরাধিকার–সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতেই উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শক্তির সামনে আইবেরিয়ার দরজা খুলে যায়।
৭১১ খ্রিষ্টাব্দে মুসা ইবনে নুসাইরের অধীনস্থ সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদ প্রায় সাত হাজার সৈন্য নিয়ে ভূমধ্যসাগরের সরু প্রণালি অতিক্রম করেন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর বাহিনীর অধিকাংশই ছিল সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী উত্তর আফ্রিকার বারবার বা আমাজিঘ যোদ্ধা। পরে আরও কয়েক হাজার সৈন্য তাঁর সঙ্গে যোগ দেয়।
তাঁরা স্পেনের দক্ষিণ উপকূলে একটি বিশাল পাথুরে পাহাড়ের কাছে অবতরণ করেন। তারিকের নামেই সেই পাহাড় পরিচিত হয়-জাবাল তারিক, অর্থাৎ ‘তারিকের পাহাড়’। আরবি জাবাল তারিক নামটিই শতাব্দীর ভাষাগত পরিবর্তনে হয়ে যায় আজকের জিব্রাল্টার।
তারিক ইবনে জিয়াদের স্পেন অভিযানের সঙ্গে একটি বিখ্যাত গল্প আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কথিত আছে, স্পেনে অবতরণের পর তারিক তাঁর সৈন্যদের ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ করতে জাহাজগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারপর সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন-‘তোমাদের পেছনে সমুদ্র, সামনে শত্রু।’
কাহিনিটি নিঃসন্দেহে নাটকীয় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জনপ্রিয়। কিন্তু ইতিহাসের দিক থেকে এখানে সতর্ক থাকা দরকার; জাহাজ পোড়ানোর ঘটনাটির সমসাময়িক কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
তারিকের বাহিনী দক্ষিণ স্পেনে প্রবেশ করার পর ভিসিগথ রাজা রডেরিক বিশাল বাহিনী নিয়ে তাঁদের মোকাবিলায় এগিয়ে আসেন। ৭১১ সালের জুলাই মাসে দুই বাহিনীর মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে এটি সাধারণত ব্যাটল অব গুয়াদালেতে নামে পরিচিত, যদিও যুদ্ধক্ষেত্রের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে।
যুদ্ধে রডেরিকের বাহিনী পরাজিত হয় এবং রডেরিক নিজেও এরপর ইতিহাস থেকে কার্যত অদৃশ্য হয়ে যান—সম্ভবত যুদ্ধেই নিহত হয়েছিলেন। এই একটি বিজয় আইবেরীয় উপদ্বীপের রাজনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে দেয়।
তারিকের বাহিনী এরপর দ্রুত অগ্রসর হয়। কর্ডোভা, তোলেদোসহ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল মুসলিম নিয়ন্ত্রণে আসতে থাকে। পরের বছর (৭১২ সালে) মুসা ইবনে নুসাইর নিজেও উত্তর আফ্রিকা থেকে একটি বড় বাহিনী নিয়ে আইবেরিয়ায় প্রবেশ করেন।
মুসার অভিযানের পথেই আমাদের ভ্রমণকাহিনির শহরটির নাম সামনে আসে-সেভিল।
মুসলিম বাহিনী সেভিল দখল করে। পরবর্তীকালে মুসার পুত্র আবদুল আজিজ ইবনে মুসা আল-আন্দালুসের শাসক হন এবং সেভিলকে তাঁর শাসনকেন্দ্র করেন। রোমান আমলে হিসপালিস নামে পরিচিত শহরটি মুসলিম শাসনে পরিচিত হয় ‘ইশবিলিয়া’ নামে—যা আজকের সেভিল। আর আইবেরীয় উপদ্বীপের মুসলিম-শাসিত অঞ্চল ইতিহাসে পরিচিত হয়ে ওঠে-আল-আন্দালুস।
পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে এই আল-আন্দালুসে গড়ে উঠে কর্ডোভার উমাইয়া আমিরাত ও খিলাফত; বিকশিত হয় নগরজীবন, কৃষি, স্থাপত্য, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আবার একই সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, গৃহযুদ্ধ, রাজবংশের উত্থান-পতন এবং মুসলিম ও খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর যুদ্ধ ও জোটের জটিল ইতিহাস।
কর্ডোভা ছিল এক সময় আল-আন্দালুসের রাজনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। গ্রানাডা হলো মুসলিম শাসনের শেষ বড় আশ্রয়।
সেভিলে পা রাখার অনেক আগেই শহরটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু এবারের স্পেন সফরে শহরটির পথে হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে হয়েছে—আজকের ঝকঝকে সেভিলের নিচে যেন আরেকটি শহর ঘুমিয়ে আছে। সেই শহরের নাম ইশবিলিয়া। তার সন্ধান পেতে হলে আমাদের প্রায় তেরোশ বছর পেছনে ফিরে যেতে হবে।
আজকের পর্যটকের কোলাহলের মধ্যে তেরোশ বছর আগের সেই শহরকে কল্পনা করা সহজ নয়। অথচ বর্তমান সেভিলের অনেক বিখ্যাত স্থাপনার দিকে তাকালেই বোঝা যায়—ইশবিলিয়া একেবারে মুছে যায়নি। তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী রিয়াল আলকাসার।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আজ আমরা যে বিশাল Real Alcázar de Sevilla দেখি, সেটি কোনো একজন রাজা বা একটি যুগে নির্মিত প্রাসাদ নয়। শত শত বছর ধরে মুসলিম ও খ্রিষ্টান শাসকেরা এর সম্প্রসারণ, পরিবর্তন ও পুনর্নির্মাণ করেছেন। বর্তমান আলকাসারের সরকারি ইতিহাস বলছে, ৯১৩ সালে কর্ডোভার উমাইয়া শাসক আবদুর রহমান তৃতীয় আল-নাসির সেভিলের দক্ষিণ প্রান্তে একটি নতুন শাসনকেন্দ্র নির্মাণের নির্দেশ দেন। এর নাম ছিল দার আল-ইমারা (Dar al-Imara)-অর্থাৎ শাসকের আবাস বা প্রশাসনিক প্রাসাদ। এটিই বর্তমান আলকাসার কমপ্লেক্সের প্রাথমিক রাজনৈতিক-প্রাসাদিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। আবদুর রহমান তৃতীয় পরবর্তীকালে ৯২৯ সালে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন এবং কর্ডোভার উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা খলিফা হন।
তবে এখানেই আলকাসারের ইতিহাস শেষ নয়—বরং শুরু।
একাদশ শতাব্দীতে কর্ডোভার খিলাফত ভেঙে যাওয়ার পর আল-আন্দালুস ছোট ছোট তাইফা রাজ্যে বিভক্ত হয়। সেভিলে ক্ষমতায় আসে আব্বাদীয় রাজবংশ। তাদের সময়ে আলকাসারে নতুন প্রাসাদ যোগ হয়। সরকারি আলকাসার ইতিহাসে ‘আল-মুবারক’ নামের একটি প্রাসাদের উল্লেখ আছে। কবি-রাজা আল-মুতামিদের সময় সেভিল রাজদরবার সাহিত্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
এরপর আসে আলমোরাভিদরা, আর তারপর-আলমোহাদরা।
সেভিলের ইতিহাস বুঝতে হলে এই নামটি মনে রাখা জরুরি। কারণ, আজকের সেভিলে মুসলিম স্থাপত্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান নিদর্শনগুলোর কয়েকটি আলমোহাদ যুগের। আলমোহাদ ছিল উত্তর আফ্রিকায় গড়ে ওঠা একটি বারবার মুসলিম সাম্রাজ্যবাদী আন্দোলন ও রাজবংশ। দ্বাদশ শতাব্দীতে তারা পূর্ববর্তী আলমোরাভিদদের সরিয়ে মরক্কো এবং আল-আন্দালুসের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেয়। মারাকেশ ছিল তাদের প্রধান রাজধানী; আল-আন্দালুসে সেভিল তাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র, কার্যত দ্বিতীয় রাজধানী হয়ে ওঠে।
সেভিলের জন্য এই যুগটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আলমোহাদরা এখানে তাদের দুর্গ-প্রাসাদ সম্প্রসারণ করে, নতুন বৃহৎ মসজিদ নির্মাণ করে এবং সেই মসজিদের জন্য তৈরি করে এক অসাধারণ মিনার। আজ আমরা সেই মিনারকেই চিনি লা গিরালদা নামে।
আজ সেভিল ক্যাথেড্রালের পাশে যে গিরালদাকে দেখে পৃথিবীর লাখ লাখ পর্যটক মুগ্ধ হন, তার জন্ম ঘণ্টাঘর হিসেবে নয়—মসজিদের মিনার হিসেবে।
আলমোহাদদের শক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর ত্রয়োদশ শতকে খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রা তীব্র হয়। অবশেষে ১২৪৮ সালে কাস্তিলের রাজা তৃতীয় ফার্দিনান্দ দীর্ঘ অবরোধের পর সেভিল দখল করেন। এর মধ্য দিয়ে সেভিলে প্রায় পাঁচ শতাব্দীর মুসলিম রাজনৈতিক শাসনের অবসান ঘটে।
কিন্তু এখানেই ইতিহাসের একটি আশ্চর্য বাঁক। খ্রিষ্টান রাজারা মুসলিম প্রাসাদটি পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলেননি। বরং এটিকে নিজেদের রাজপ্রাসাদ হিসেবে ব্যবহার এবং নতুন নির্মাণ যোগ করতে শুরু করেন।
ফার্দিনান্দের পুত্র আলফোনসো দশম পুরোনো কাঠামোর ওপর গথিক প্রাসাদ নির্মাণ করান। আরও প্রায় এক শতাব্দী পরে কাস্তিলের রাজা পেদ্রো প্রথম চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আলকাসারের ভেতরে তাঁর বিখ্যাত মুদেজার প্রাসাদ নির্মাণ করেন।
এখানেই আমার কাছে আলকাসার সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ পেদ্রো ছিলেন খ্রিষ্টান রাজা, অথচ তাঁর প্রাসাদে ব্যবহৃত হলো আন্দালুসীয় ইসলামি শিল্পের ভাষা-আরবি ক্যালিগ্রাফি, জ্যামিতিক নকশা, স্টুকো, টাইলস, খিলান, পানি ও বাগানের বিন্যাস।
তাই আলকাসারে ঢুকে প্রথমবার দেয়ালে আরবি লেখা দেখে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক-খ্রিষ্টান রাজার প্রাসাদে এত আরবি কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মুদেহার শিল্পে-খ্রিষ্টান শাসনের অধীন মুসলিম কারিগর ও আন্দালুসীয় ইসলামি শিল্পধারার প্রভাব থেকে বিকশিত এক অনন্য স্থাপত্যভাষা।
পেদ্রো প্রথমের প্রাসাদের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৌঁছলাম সবচেয়ে সুন্দর অংশগুলোর একটিতে-Patio de las Doncellas বা ‘কুমারীদের প্রাঙ্গণ’।
প্রাঙ্গণের মাঝখানে দীর্ঘ জলাধার, দুই পাশে নিচু বাগান। চারদিকে সূক্ষ্ম খিলান, জ্যামিতিক নকশা, টাইলস ও স্টুকোর অলংকরণ। আলো পানিতে পড়ে আবার খিলানের গায়ে ফিরে আসছে। স্থাপত্য যেন স্থির নয়—পানি আর আলোর সঙ্গে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এটি ছিল পেদ্রো প্রথমের প্রাসাদের কেন্দ্রীয় আঙিনা এবং এখান থেকেই প্রাসাদের গুরুত্বপূর্ণ কক্ষগুলোতে প্রবেশ করা যেত। তবে ‘কুমারীদের প্রাঙ্গণ’ নামটি মূল মুসলিম যুগের নাম নয়। আলকাসারের নিজস্ব গবেষণা অনুযায়ী, পাতিও দে লাস দনসেইয়াস নামটি অন্তত ষোড়শ শতাব্দী থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নামটি নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি আছে-মুসলিম শাসকের কাছে খ্রিস্টান রাজ্যগুলো নাকি প্রতিবছর একশ কুমারী পাঠাত উপহার হিসেবে, আর সেই স্মৃতি থেকেই ‘কুমারীদের প্রাঙ্গণ’ নাম। কিন্তু এটিকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে বলা ঠিক হবে না; এটি মূলত পরবর্তী কিংবদন্তির সঙ্গে যুক্ত নাম।
আলকাসারের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে তাই সময়ের হিসাব গুলিয়ে যায়। কোথাও উমাইয়া স্মৃতি, কোথাও আব্বাদীয় যুগ, কোথাও আলমোহাদ; আবার তার পাশেই গথিক খ্রিষ্টীয় নির্মাণ। একটু এগোলেই পেদ্রো প্রথমের মুদেহার প্রাসাদ-যেখানে খ্রিষ্টান রাজকীয় ক্ষমতা নিজেকে প্রকাশ করছে ইসলামি আন্দালুসিয়ার শিল্প ভাষায়।
আমি প্রাসাদের একটি খিলানের নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। চারদিকে পর্যটকের ভিড়। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ গাইডের কথা শুনছেন। অথচ আমার চোখ চলে যাচ্ছিল দেয়ালের নকশা আর আরবি অক্ষরের দিকে।
ভাবছিলাম-রাজা চলে গেছেন, সাম্রাজ্য চলে গেছে, সিংহাসনের মালিক বদলেছে, ইশবিলিয়া নামটিও হারিয়ে গেছে; কিন্তু শিল্প থেকে গেছে।
সেভিলে এসে আমার প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার সম্ভবত এটাই-মুসলিম আন্দালুসিয়াকে খুঁজতে কোনো হারিয়ে যাওয়া শহরের ধ্বংসস্তূপে যেতে হয় না। আজকের সেভিলের শরীরেই সেই ইশবিলিয়া বেঁচে আছে।
আর আলকাসার থেকে বেরিয়ে যখন আকাশের দিকে তাকালাম, চোখে পড়ল সেই সুউচ্চ মিনার-গিরালদা। একদিন যার ওপর থেকে ইশবিলিয়ার আকাশে ভেসে আসত আজানের আহ্বান, আজ সেখানে বাজে ক্যাথেড্রালের ঘণ্টা। সেদিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমার সেভিল ভ্রমণের গল্প আসলে সবে শুরু।
সেভিলের আকাশের দিকে তাকালে যে স্থাপনাটি প্রথমেই চোখ টেনে নেয়, সেটি লা গিরালদা। আজ এটি সেভিল ক্যাথেড্রালের ঘণ্টাঘর। কিন্তু এর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হচ্ছিল—এই টাওয়ারকে শুধু একটি ক্যাথেড্রালের অংশ হিসেবে দেখলে তার ইতিহাসের অর্ধেকটাই অদেখা থেকে যাবে। কারণ, গিরালদার জন্ম হয়েছিল ঘণ্টাঘর হিসেবে নয়; এটি ছিল একটি মসজিদের মিনার। আলমোহাদ খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ ১১৭২ সালে সেভিলে একটি নতুন বৃহৎ জামে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-মানসুরের সময় মসজিদের বিশাল মিনারের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। সেই মিনারই আজকের গিরালদা।
আজকের গিরালদা অবশ্য দ্বাদশ শতাব্দীর মিনারের অবিকল রূপ নয়। মুসলিম যুগে এর শীর্ষে বর্তমান ঘণ্টাঘর ছিল না। মিনারের ওপর ছিল চারটি বিশাল ধাতব গোলক বা জ্যামুর। ১৩৫৬ সালের ভূমিকম্পে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে পুরোনো মিনারের ওপর খ্রিষ্টীয় ঘণ্টাঘরের নতুন অংশ নির্মিত হয়। তার শীর্ষে স্থাপন করা হয় একটি বিশাল ব্রোঞ্জের মূর্তি-বিশ্বাসের বিজয়ের প্রতীক, এল জিরালদিলো। সেই ঘূর্ণমান মূর্তি থেকেই পরবর্তীকালে পুরো টাওয়ারটির নাম হয়ে যায় গিরালদা। এই ইতিহাস জানার পর টাওয়ারটির দিকে তাকানোর অনুভূতিই বদলে যায়। নিচে দ্বাদশ শতকের মুসলিম মিনার, ওপরে ষোড়শ শতকের খ্রিষ্টীয় ঘণ্টাঘর—একই স্থাপনার শরীরে যেন দুই সভ্যতার ইতিহাস লেখা।
গিরালদার ভেতরে ওপরে ওঠার জন্য দীর্ঘ সিঁড়ির পরিবর্তে রয়েছে ঢালু পথ বা র্যাম্প, যাতে মিনারে আরোহণ সহজ হয় কথিত আছে ‘মুয়াজ্জিন আজান দিতে ঘোড়ায় চড়ে ওপরে উঠতেন’-তাই সিঁড়ির পরিবর্তে ঢলু পথ তেলি করা হয়ছে। এর ৩৭ ধাপ—যা বেয়ে আমি উপরে উঠেছিলাম—সেখান থেকে পুরু নিভিলের দৃশ্য সত্যই মনোরম।
একসময় এখান থেকে মুসলিম ইশবিলিয়ায় নামাজের আহ্বান জানানো হতো; আজ সেখান থেকে শোনা যায় ক্যাথেড্রালের ঘণ্টা। ইতিহাস সম্ভবত এভাবেই কথা বলে-একটি যুগকে সম্পূর্ণ মুছে না দিয়ে তার ওপর আরেকটি যুগ নিজের চিহ্ন বসিয়ে দেয়।
১২৪৮ সালে কাস্তিলের রাজা তৃতীয় ফার্দিনান্দ সেভিল দখলের পর আলমোহাদদের জামে মসজিদটি খ্রিষ্টীয় উপাসনালয়ে রূপান্তরিত হয়। কয়েক প্রজন্ম ধরে সেই ভবনই ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু পরে পুরোনো মসজিদের স্থানে বিশাল গথিক ক্যাথেড্রাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে শুরু হওয়া সেই নির্মাণের ফল আজকের ক্যাথেড্রাল দে সেভিয়া। পুরোনো মসজিদের অধিকাংশ আর নেই, কিন্তু সবটা হারায়নি। গিরালদা রয়ে গেছে, আর রয়ে গেছে পুরোনো মসজিদের বিস্তৃতি খোলা আঙিনা—এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ-পাতিও দে লোস নারাংহোস বা কমলাগাছের প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে সারি সারি কমলাগাছ। আজ এটি ক্যাথেড্রালের অংশ, কিন্তু একসময় এই আঙিনা ছিল মসজিদের সঙ্গে যুক্ত খোলা প্রাঙ্গণ। আজ মসজিদ নেই, কিন্তু তার উঠান আর মিনার আছে। ইতিহাসের কী অদ্ভুত পরিহাস-যে মসজিদকে ঘিরে মিনারটি নির্মিত হয়েছিল, সেই মসজিদ বিলুপ্ত; অথচ মিনারটিই হয়ে উঠেছে আধুনিক সেভিলের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক।
ক্যাথেড্রালের ভেতরে এসে ইতিহাসের আরেক অধ্যায়ের মুখোমুখি হলাম। এখানেই রয়েছে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সমাধিসৌধ। ১৪৯২ সাল। এই বছরটির সঙ্গে স্পেনের ইতিহাসের দুটি ঘটনা আশ্চর্যভাবে জড়িয়ে আছে। একদিকে গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে আইবেরিয়ায় মুসলিম রাজনৈতিক শাসনের শেষ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে; অন্যদিকে সেই বছরেই স্পেনীয় রাজমুকুটের পৃষ্ঠপোষকতায় কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দেন। এক ইতিহাসের দরজা বন্ধ হলো, আরেক ইতিহাসের দরজা খুলে গেল। পরে সেভিলই হয়ে উঠবে স্পেনের আমেরিকান সাম্রাজ্যের বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রগুলোর একটি। বাইরে এসে আবার গিরালদার দিকে তাকালাম। সূর্যের আলো তখন পুরোনো মিনারের গায়ে পড়েছে। মনে হলো, আট শ বছরের ব্যবধানেও ইশবিলিয়া যেন আমাকে বলছে-আমি হারাইনি, আমাকে শুধু নতুন করে পড়তে শিখতে হবে।
সেভিলে গুয়াদালকিভি নদীর ধারে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে আরেকটি বিখ্যাত স্থাপনা-তোরে দেল ওরো অর্থাৎ ‘সোনার টাওয়ার’)। এটিও আলমোহাদ যুগের উত্তরাধিকার। ১২২০-২১ সালের দিকে আলমোহাদ শাসনের শেষ পর্যায়ে নদীতীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে এটি নির্মিত হয়।
নাম শুনে প্রথমে মনে হতে পারে, টাওয়ারে হয়তো সোনা রাখা হতো; আবার প্রচলিত গল্প আছে-আমেরিকা থেকে আনা সোনা এখানে জমা রাখা হতো বলেই এর নাম তোরে দেল ওরো। তবে এর বাইরের আবরণ বা টাইলস সূর্যের আলোয় সোনালি আভা ছড়াত—এমন ব্যাখ্যাও প্রচলিত। তাই কিংবদন্তিকে ইতিহাস থেকে আলাদা রাখাই ভালো। তবে এটি নিশ্চিত যে টাওয়ারটি মুসলিম সেভিলের নদী-প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
সেভিলে কয়েক দিন কাটালে আরবি প্রভাব শুধু প্রাসাদ বা মিনারে নয়, শব্দের মধ্যেও চোখে পড়ে। Alcázar এসেছে আরবি al-qasr থেকে, Guadalquivir এসেছে al-wadi al-kabir থেকে। স্প্যানিশ ভাষায় al- দিয়ে শুরু হওয়া বহু শব্দ আরবি ভাষার দীর্ঘ উপস্থিতির স্মৃতি বহন করে। তবে আধুনিক স্পেনকে সরলভাবে ‘আরব সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা’ বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। আট শতকের কাছাকাছি সময়ের আল-আন্দালুস নিজেই একরকম ছিল না। কখনো উমাইয়া, কখনো তাইফা রাজ্য, আলমোরাভিদ, আলমোহাদ-রাজনীতি বারবার বদলেছে। আর সেই সমাজে শুধু মুসলমানই ছিলেন না; ছিলেন খ্রিষ্টান ও ইহুদিরাও। সহবস্থান যেমন ছিল, তেমনি ছিল সংঘর্ষ, বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তাই আল-আন্দালুসকে শুধু হারানো ‘স্বর্গ’ হিসেবে দেখলে যেমন ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়, তেমনি শুধু যুদ্ধের ইতিহাস হিসেবে দেখলেও তার জ্ঞান, শিল্প ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বিশাল অধ্যায়টি হারিয়ে যায়।
সেভিলের মুসলিম রাজনৈতিক শাসন ১২৪৮ সালে শেষ হলেও মুসলিম শিল্পের প্রভাব শেষ হয়নি। এখানেই ফিরে আসে মুদেহার রীতি। খ্রিষ্টান শাসনের অধীন বসবাসকারী মুসলিম কারিগরদের শিল্পকৌশল খ্রিষ্টীয় স্থাপত্যের সঙ্গে মিশে এক নতুন রীতি তৈরি করেছিল। রাজা খ্রিষ্টান, প্রাসাদ খ্রিষ্টান রাজার—কিন্তু দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফি, ছাদে ইসলামি জ্যামিতিক নকশা, আঙিনায় পানি ও বাগানের আন্দালুসীয় বিন্যাস। পেদ্রো প্রথমের আলকাসার তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু বিজয়ীরাও পরাজিত সভ্যতার শিল্পকে এত মূল্যবান মনে করেছে যে সেই শিল্পভাষাকেই নিজেদের প্রাসাদে গ্রহণ করেছে। ক্ষমতা একটি সভ্যতাকে পরাজিত করতে পারে; কিন্তু তার সৌন্দর্যকে সব সময় পরাজিত করতে পারে না।
কোনো শহরকে শুধু তার প্রাসাদ আর স্মৃতিস্তম্ভ দিয়ে চেনা যায় না; কখনো একটি নদী সেই শহরের ইতিহাস আরও ভালোভাবে বলে। সেভিলের সেই নদীর নাম-গুয়াদালকিভির। নামটি স্প্যানিশ হলেও এর শিকড় আরবিতে-আল-ওয়াদি আল-কাবির অর্থাৎ ‘মহান নদী’ বা ‘বড় নদী’।
বিকেলের দিকে গুয়াদালকিভিরের তীরে এসে দাঁড়ালাম। সেভিলের মধ্য দিয়ে শান্তভাবে বয়ে যাচ্ছে নদীটি। কিন্তু আমার চোখে ভেসে উঠছিল অন্য এক নদী-মুসলিম ইশবিলিয়ার নদী। এই নদীপথ দিয়েই শহরের সঙ্গে আটলান্টিক এবং ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যজগতের যোগাযোগ ছিল।
একই নদী দেখেছে মুসলিম ইশবিলিয়া, খ্রিষ্টীয় সেভিল, আবার ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের নতুন যুগ।
সেভিলে আমার শেষ বিকেলে নদীর দিকে গেলাম। গুয়াদালকিভিরের পানিতে তখন বিকেলের আলো পড়ছে। দূরে তোরে দেল ওরো, আর শহরের আকাশরেখায় গিরালদা।
ফিরে যাওয়ার সময় মনে হলো, আমি আসলে খুঁজছিলাম সময়ের মধ্যে একটি হারিয়ে যাওয়া শহরকে-যার নাম ইশবিলিয়া। সেই শহরের রাজা নেই, সৈন্য নেই, বাজার নেই, জামে মসজিদটিও নেই; কিন্তু তার মিনার আছে, প্রাসাদের দেয়ালে আরবি অক্ষর আছে, কমলাগাছের প্রাঙ্গণ আছে, তোরে দেল ওরো আছে, আর আছে আল-ওয়াদি আল-কাবির-গুয়াদালকিভির।
ইতিহাসের হিসাবে মুসলিম সেভিল অবশ্যই ১২৪৮ সালে হারিয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের নির্মিত স্থাপত্য, বাগান, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু অবদান আজও ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে বেঁচে আছে।
আমি এসেছিলাম স্পেনের একটি শহর দেখতে, ফিরে গেলাম ইশবিলিয়ার যা এখন সিভিল তার স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে।
লেখক: আবদুল্লাহ জাহিদ, ম্যানেজার, কুইন্স লাইব্রেরি, নিউইয়র্ক, আমেরিকা
myshathi@gmail.com
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চারজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ভারতের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে স্থলবন্দরভিত্তিক বিধিনিষেধ ও অশুল্ক বাধা দূর করার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ।
শরতের স্নিগ্ধতা ও বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যকে গান, নৃত্য ও আবৃত্তির মধ্য দিয়ে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে উদযাপিত হয়েছে ‘শরৎ উৎসব-২০২৬’।