জাতীয়

শেষ বয়সে আমাকে একা রেখো না

News সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬ 0
শেষ বয়সে আমাকে একা রেখো না
শেষ বয়সে আমাকে একা রেখো না

সৌদি আরবের দৈনিক আল-মদিনায় কিছুদিন আগে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মক্কায় প্রবীণ মায়ের দেখভাল করার আকুতি জানিয়ে দুই ভাইয়ের প্রতিযোগিতা। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মক্কার সাধারণ আদালত দুই ভাইয়ের সেই বিরোধের নিষ্পত্তি করেছেন, যেখানে দুজনই মায়ের হেফাজত চাইছিলেন। রায়ের পর আদালত থেকে বেরিয়ে দুই ভাই–ই ছিলেন সন্তুষ্ট ও হাস্যোজ্জ্বল।

ছোট ভাই মামলাটি করেছিলেন এই যুক্তিতে যে বড় ভাই বয়সে এতটাই প্রবীণ হয়ে গেছেন যে তিনি আর মাকে যথাযথভাবে দেখাশোনা করতে পারবেন না; তাই মাকে নিজের কাছে রাখার অধিকার তিনি চান। ৭৫ বছর বয়সী বড় ভাই আদালতে আপত্তি জানিয়ে বলেন, মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি চান তাঁর মা তাঁর সঙ্গেই থাকুন। তিনি এখনো মায়ের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন—এমনটাই দাবি করেন তিনি।

বিচারক যখন মাকে দুই ভাইয়ের সামনে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কোন ছেলের সঙ্গে থাকতে চান। মা শান্ত কণ্ঠে বললেন, তিনি দুজনকেই সমান ভালোবাসেন; তাই তিনি কোনো পক্ষই বেছে নেবেন না। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারক সিদ্ধান্ত দেন যে বড় ভাই নিজে এতটাই বয়সী যে তাঁরও দেখাশোনার প্রয়োজন রয়েছে। তাই মায়ের হেফাজতের অধিকার ছোট ভাইকেই দেওয়া হলো। রায় ঘোষণার পর দুই ভাইকে আলিঙ্গন করে হাসিমুখে আদালত ত্যাগ করতে দেখে উপস্থিত সবাই গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছেন।

সব সন্তান যদি এমন হয়, তাহলে তো আর কোনো সমস্যা থাকে না। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। আমরা আমাদের চোখের সামনেই দেখি, গায়ে–গতরে বড় হয়ে ওঠার পর সন্তানেরা কীভাবে মা-বাবাকে চোখরাঙানি দেয়। মা-বাবা যেন পরিত্যক্ত ন্যাকড়া। ব্যতিক্রম আছে অবশ্যই।

মানুষের জীবনে সম্পত্তি কখনো কেবল ইট-পাথরের ঘর নয়; এটি স্মৃতির আশ্রয়, সম্পর্কের ছায়া, সময়ের সঞ্চয়। আর সেই সম্পত্তি যখন উত্তরাধিকার আইনের পাতায় লেখা হয়, তখন আইন হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের এক নীরব ইতিহাস। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্তরাধিকার আইন সংশোধনী সেই ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে, যা কেবল আইনগত নয়; বরং গভীরভাবে মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয়।

মানুষের জীবনে সবচেয়ে প্রথম যে দুটি মুখ দেখা যায়—একটি মায়ের, অন্যটি বাবার। এই দুই মুখের ছায়ায়ই শিশুর পৃথিবী গড়ে ওঠে। কিন্তু সময়ের নদী যখন প্রবাহিত হতে থাকে, তখন সেই মুখগুলো ধীরে ধীরে বয়সের রেখায় ভরে যায়। সন্তানেরা বড় হয়, পৃথিবী বিস্তৃত হয় আর সেই দুই মুখ—যারা একদিন সন্তানের পৃথিবী ছিল—ধীরে ধীরে প্রান্তে সরে যায়। বাংলাদেশে এই প্রান্তচ্যুতি আজ এক গভীর সামাজিক সংকটের নাম: প্রবীণ মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবহেলা।

অবহেলা সব সময় চিৎকার করে না। অনেক সময় তা নীরব, অদৃশ্য, কিন্তু গভীর। নীরব অবহেলার অদৃশ্য ক্ষতগুলো হলো: নিয়মিত খোঁজ না নেওয়া, চিকিৎসার ব্যয় বহনে অনীহা। আলাপচারিতায় অনাগ্রহ, একাকিত্বে ফেলে রাখা, মানসিক সমর্থনের অভাব ইত্যাদি। দৃশ্যমান ক্ষতগুলো হচ্ছে প্রকাশ্য অবহেলা: আলাদা ঘরে বা আলাদা বাড়িতে রেখে দেওয়া, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন এবং বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া।কেন ঘটে এই অবহেলা?

২০২৬ সালের সংশোধনী, যেখানে মা–বাবা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

এ নিয়ে আছে নানান গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ। ঢাকার মতো বড় শহরে কর্মচাপ, যানজট, প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে মানুষের সময় কমে গেছে। শহুরে মানুষ দিনে ৯-১১ ঘণ্টা কর্মক্ষেত্রে ব্যয় করেন। চাকরি, বাসাভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে অনেকেই মনে করেন, প্রবীণ মা-বাবার দায়িত্ব নেওয়া ‘অতিরিক্ত বোঝা’।

ইসলামে মা-বাবার প্রতি সদাচরণকে ইমানের অংশ বলা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমার প্রভু নির্দেশ দিয়েছেন—তোমরা তাঁর ইবাদত করো এবং মা-বাবার প্রতি সদাচরণ করো।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৭:২৩)। আমাদের সংস্কৃতিতেও মা-বাবাকে সম্মান দেওয়া ছিল এক অনিবার্য মূল্যবোধ। কিন্তু বাস্তবতা আজ সেই মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে।

বাংলাদেশে প্রবীণ মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবহেলা শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। যে সমাজ তার শিকড়কে অবহেলা করে, সে সমাজের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মা-বাবা আমাদের জীবনের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম পথপ্রদর্শক। তাঁদের শেষ বয়সে আমরা যদি তাঁদের পাশে না দাঁড়াই, তবে মানবিকতার মৌলিক ভিত্তিই ভেঙে পড়ে। সমাধান সম্ভব, যদি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে দায়িত্ব নেয়। আর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—সন্তানদের হৃদয়ে মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে রাখা।

মানুষের জীবনে সম্পত্তি কখনো কেবল ইট-পাথরের ঘর নয়; এটি স্মৃতির আশ্রয়, সম্পর্কের ছায়া, সময়ের সঞ্চয়। আর সেই সম্পত্তি যখন উত্তরাধিকার আইনের পাতায় লেখা হয়, তখন আইন হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের এক নীরব ইতিহাস। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উত্তরাধিকার আইন সংশোধনী সেই ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে, যা কেবল আইনগত নয়; বরং গভীরভাবে মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয়।

২০২৬ সালের সংশোধনী, যেখানে মা–বাবা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। এই আইন যেন এক প্রবীণ বাবা বা মায়ের কাঁপা হাতে লেখা একটি নিরাপত্তার চিঠি। কিন্তু সেই চিঠি পড়তে গিয়ে সমাজে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ধর্মীয় আইন, দেওয়ানি আইন, পারিবারিক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে এই সংশোধনী যেন এক নদীর দুই তীরকে একসঙ্গে ধরে রাখতে চাওয়া একটি সেতু। আর সেই সেতু নির্মাণের শব্দই আজকের বিতর্ক।

নতুন আইনে বলা হয়েছে, একজন মা বা বাবা তাঁর সন্তানের নামে লিখে দিলেও মৃত্যুর আগপর্যন্ত সেই বাড়িতে থাকার, ব্যবহার করার এবং নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার রাখবেন। এটি আইনগত ভাষায় জীবনকালীন ভোগাধিকার। এই ভোগাধিকার যেন এক প্রবীণ মানুষের শেষ বয়সের আশ্রয়। যেন তাঁর নিজের ঘরের দরজায় লেখা, ‘এই ঘর আমার, যত দিন আমি আছি।’আইনটি এসেছে সেই সব গল্পের প্রতিক্রিয়ায়, যেখানে সন্তানেরা সম্পত্তি পেয়ে মা–বাবাকে ভুলে যান, অবহেলা করেন, কখনো কখনো ঘর থেকে বের করে দেন। আমরা দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে মা–বাবা সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরই তাঁদের দুর্দশা শুরু হয়। নতুন আইন সেই দুর্দশার বিরুদ্ধে এক মানবিক প্রতিরোধ।

কিন্তু আইন যতই মানবিক হোক, ধর্মীয় বিধানের কোনো ব্যাখ্যার সঙ্গে সামান্য সংঘাতও সমাজে বড় আলোড়ন তোলে। বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন—ফরায়েজ—উত্তরাধিকার বণ্টনের মূল ভিত্তি। হেবা, অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান—ইসলামি আইনে একটি স্পষ্ট কাঠামো। কোনো কোনো গোষ্ঠী বা দল বলছে, হেবা মানে সম্পত্তি সঙ্গে সঙ্গে হস্তান্তর।

কিন্তু নতুন আইনে হস্তান্তর হলেও দাতা জীবনভর ভোগাধিকার রাখছেন। এতে হেবার মূল কাঠামো বদলে যায়। ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার বণ্টন জটিল হতে পারে। তাদের ভাষায়, আইনটি ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করবে। সরকার বলছে, হেবা থাকবে হেবাই। নতুন আইন কেবল একটি বিকল্প পথ। এই দুই বক্তব্য যেন দুই নদীর দুই স্রোত—একটি ধর্মীয়, অন্যটির বিবেচনা মানবিক ও সামাজিক। আইন সেই দুই স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য খুঁজছে।

প্রবীণ মা-বাবার প্রতি সন্তানের অবহেলা বাড়ছে। সম্পত্তি নিয়ে নেওয়ার পর মা–বাবাকে ভুলে যাওয়ার ঘটনা সাধারণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা আইনকে মানবিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই সংশোধনীকে কেবল আইন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে এক প্রবীণ মানুষের নিঃশব্দ আর্তি, যে আর্তি বলে, ‘আমার শেষ বয়সে আমাকে আমার ঘর থেকে সরিয়ে দিয়ো না।’ এটি এক মায়ের কাঁপা কণ্ঠ, ‘আমি তোমাদের জন্য জীবন কাটিয়েছি; আমার শেষ বয়সে আমাকে একা রেখো না।’

আইন সেই কণ্ঠগুলোকে শুনেছে। কিন্তু ধর্মীয় বিধানও মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। তাই আইন ও ধর্ম মানুষের মনে একই সঙ্গে অবহেলা ও বিধানভঙ্গ—এই দুই ধরনের ভয়ের বিষয়টিকে তুলে ধরে।

আইন সেই দুই ভয়কে একসঙ্গে শান্ত করতে চায়। এটি যেন এক সেতু, যা মানবিকতার নদীকে ধর্মীয় বিধানের তীরের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়।

  • মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন

জাতীয়

View more
আপত্তির মুখে দিরাইয়ে মহিলা প্রীতিম্যাচ স্থগিত
আপত্তির মুখে দিরাইয়ে মহিলা প্রীতিম্যাচ স্থগিত

সুনামগঞ্জের দিরাই প্রেসক্লাব মহিলা প্রীতি ফুটবল খেলা আপত্তির মুখে স্থগিত করা হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে দিরাইয়ে স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যকার নারী ফুটবলের একটি প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

News অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0
ছেলেকে কুপিয়ে হত্যার দেড় মাস পর বাবাকে গুলি করে হত্যা

ছেলেকে কুপিয়ে হত্যার দেড় মাস পর বাবাকে গুলি করে হত্যা

পৃথিবীর বৃহত্তম ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ৭৮তম আসরে থাকছে পাঞ্জেরী

পৃথিবীর বৃহত্তম ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ৭৮তম আসরে থাকছে পাঞ্জেরী

স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্তির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

স্টক এক্সচেঞ্জে সরাসরি তালিকাভুক্তির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

0 Comments