জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপর আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামির সবাই পলাতক।
রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার আদেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এর প্রায় ১০ মাস পর দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে মামলার রায় হলো।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায় হলো আজ।
দুটি ট্রাইব্যুনালের সাত রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জনই পলাতক। কারাগারে আছেন চারজন।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

সাত আসামির কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ থেকে জানা যায়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিনটি ‘কাউন্ট’ (ধারা) রয়েছে।
প্রথম কাউন্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে কথোপকথন হয়। আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়ে সাদ্দামকে তখন কাদের বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ সম্বোধন করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন।
পরদিন ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রুখে দিতে ও আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য রাজধানীর ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির দলীয় কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে বক্তব্য দেন। এ বক্তব্যের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন ওবায়দুল কাদের। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ দেন তিনি।
ওবায়দুল কাদেরের উল্লিখিত নির্দেশসহ অন্যান্য বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরীহ-নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংসভাবে পৈশাচিক হামলা চালায়। এ কারণে সেদিন নারীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।
আন্দোলন দমন করতে ১৬ জুলাই তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি–বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। একই দিনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে ওবায়দুল কাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের সব এলাকা দখলে রাখার নির্দেশ দেন।
ওবায়দুল কাদেরের এমন নির্দেশনার পর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করে চট্টগ্রামে চান্দগাঁও থানার মুরাদপুর এলাকায় মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যা করে। একই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দুই নম্বর কাউন্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাজধানীর তেজগাঁওয়ের দলীয় কার্যালয়ে ঢাকা জেলা ও ঢাকা মহানগর (উত্তর-দক্ষিণ) আওয়ামী লীগ এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আন্দোলন দমনের জন্য নিজ নিজ এলাকার প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য নির্দেশ দেন তিনি।
পরদিন ১৮ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দেন ওবায়দুল কাদের। তিনি এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মী ও সমর্থকদের রাজপথে নেমে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ার নির্দেশ দেন।
১৯ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের প্রধানদের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।’ অর্থাৎ দেখামাত্রই গুলির নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।
শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথোপকথনে ওবায়দুল কাদের আন্দোলন দমনের জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র লিপ্ত হন। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে এর দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেন তাঁরা।
আন্দোলন দমনের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান খান, আনিসুল হক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মির্জা আজম, শামীম ওসমান, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদসহ অন্যদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে অপহরণ, গুম, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।
ওবায়দুল কাদেরের এসব নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ১৮ জুলাই শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনসহ ৩ জন, ১৯ জুলাই আসিফ ইকবালসহ ৩০ জন, ২০ জুলাই সিফাত হোসেন, মহাখালী এলাকায় ৬ জনসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করে।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিন নম্বর কাউন্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকে রুখে দিতে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন।
ওবায়দুল কাদেরের এই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শাহরিয়ার হাসান আলভী, মিরাজ ফরাজি, মহিউদ্দিনসহ ১২ জনকে, ফেনীর মহিপালে ইশতিয়াক আহাম্মেদসহ ৭ জনকে এবং লক্ষ্মীপুর সদরে সাদ-আল আফনানসহ ৪ জনকে হত্যা করে। একইভাবে ৫ আগস্ট মিরপুরে মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে এবং রাজশাহী মহানগরে রায়হান আলী ও সাকিব আনজুমসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।
একইভাবে সারা দেশে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করা হয়।
নাছিমের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

বাহাউদ্দিন নাছিমের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই আন্দোলন রুখে দিতে ও আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে দেন।
বাহাউদ্দিন নাছিম সেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন, যাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাহাউদ্দিন নাছিমের নির্বাচনী এলাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংসভাবে হামলা চালায়।
বাহাউদ্দিন নাছিমের সেই প্ররোচনার পর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করে চট্টগ্রামে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ ও মো. ফারুককে হত্যা করে। একই দিন আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জনকে হত্যা করা হয়।
শেখ হাসিনা মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ছাত্র-জনতাকে হত্যার নির্দেশ দেন। ওবায়দুল কাদের ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর (দেখামাত্রই গুলি) নির্দেশ দেন। সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাহাউদ্দিন নাছিম অন্যতম ভূমিকা পালন করেন।
নিজ জেলা মাদারীপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সাবেক মেয়র খালিদ হোসেনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারক করতেন বাহাউদ্দিন নাছিম। সেখানে ১৮ জুলাই দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই তৌহিদকে হত্যা এবং অসংখ্য আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্যাডাররা।
৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন রুখে দিতে দলীয় নেতা–কর্মীদের যে নির্দেশ দেন, সেখানে বাহাউদ্দিন নাছিম উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনের সমর্থন ও প্ররোচনা দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের জামায়াত-শিবির, যুদ্ধাপরাধী, ধর্ম ব্যবসায়ী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অশুভ শক্তি, স্বাধীনতাবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বাহাউদ্দিন নাছিম। এমন প্ররোচনার পর ৪ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আসামির নির্বাচনী এলাকার বাংলামোটরে আবদুল গনি, বেলাল হোসেন ও নয়ন মিয়াকে হত্যা এবং পল্টন নাইটিঙ্গেল মোড়ে ওবায়দুল হককে হত্যা করে। পরদিন ৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলের সামনে রাকিব হোসেন, গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে রমজান মিয়া, বাংলামোটর এলাকায় ইসমাঈল হোসেন, চাঁনখারপুল এলাকায় ইসমামুল হকসহ মোট ১৩ জনকে হত্যা করে।
একইভাবে সারা দেশে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়।
আরাফাতের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তাঁর বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই মন্তব্যসহ নানা উসকানি ও ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য দেন তিনি।
পরদিন ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ সম্বোধন করে উসকানিমূলক যে বক্তব্য দেন, সেখানে আরাফাত উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনের সমর্থন ও প্ররোচনা দেন। ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করে আরাফাত বিভিন্ন রকম উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। পরিকল্পিতভাবে হামলার নির্দেশ দেন তিনি। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগ।
১৯ জুলাই আরাফাত প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী তকমা দেন। পাশাপাশি তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টানা ৫ বছর অস্ত্র-গুলি ব্যবহার করার মতো মজুতের বিষয় উল্লেখ করে হুমকি দেন।
আরাফাতের নির্বাচনী এলাকা মহাখালী রেলক্রসিং, চৌরাস্তাসহ আশপাশ এলাকায় ১৯ জুলাই হামলা চালিয়ে মো. শাহজাহান, গনি মিয়াসহ ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা। এই হত্যাকাণ্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আরাফাত।
ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ২০ জুলাই ফোন আলাপ করেন আরাফাত। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন ও আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আরাফাত বলেন, ‘ওই যে অফ করে দিছি গতকাল দুই–একটাকে (টেলিভিশন)। আজকেও বলে রাখছি, যেগুলা শুনবে না, অফ করে দিতে বলব সাথে সাথে।’
আন্দোলন দমনে সরকারের অবৈধ বল প্রয়োগ ও বিভিন্ন সহিংসতার সংবাদ প্রচার করায় ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টার সংবাদ বুলেটিন চলার সময় বাংলা ভিশন, দেশ টিভি, চ্যানেল ২৪ ও এনটিভি এবং ২২ জুলাই বেলা দুইটায় সংবাদ চলার সময় বাংলা ভিশন ও চ্যানেল ২৪–এর সম্প্রচার ৩০ মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেন আরাফাত।
৪ আগস্ট আন্দোলন গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নিলে আরাফাত সংসদ ভবন এলাকায় পতিত সরকারের মুখপাত্র হিসেবে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেন। আন্দোলনকে সহিংস কর্মকাণ্ড দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মী ও অনুসারীদের আন্দোলন দমনের জন্য নির্দেশ দেন তিনি।
সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করা হয়।
পরশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা আছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলার সময় শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা মোতাবেক সারা দেশে আন্দোলন নস্যাতের জন্য পরশ তাঁর নিয়ন্ত্রিত যুবলীগকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।
পরশের নির্দেশ অনুসরণ করে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও গুরুতর আহত করে।
এ আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪–দলীয় সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর আক্রমণে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে। ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা গুরুতর আহত হন। এই হত্যা, নির্যাতনের অন্যতম নির্দেশদাতা ও নেতৃত্বে ছিলেন পরশ।
১৮ জুলাই যুবলীগ ক্যাডাররা চট্টগ্রাম মহানগরে নির্বিচার গুলি চালিয়ে তানভীর ছিদ্দিকী, সায়মন মাহিন, হৃদয় চন্দ্র তরুয়াকে হত্যা করে।
১৯ জুলাই যুবলীগ ক্যাডাররা মহাখালী এলাকায় শাহাজাহান, গণি মিয়া, আল আমিন রনি, জাহিদ হোসেন, ইমাম মেহেদী হাসান, মামুন হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ১ আগস্ট পরশ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে আগ্রাসন ও ধ্বংসলীলা বলে আখ্যায়িত করেন। পরশ বলেন, ‘আজকে অবশেষে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার একটি নির্বাহী ঘোষণা আসতে পারে। এ ঘোষণা আসার পর ওরা আবারও মরণকামড় দিতে পারে। আপনাদের এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার জামায়াতে ইসলামীর মতো সুশৃঙ্খল দলকে ১৪–দলীয় বৈঠকের আগেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ষড়যন্ত্রের শামিল বলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে আরও বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট পরশের অধীন যুবলীগ ক্যাডাররা লক্ষ্মীপুর শহরে নির্বিচার গুলি করে সাদ-আল আফনান, ওসমান পাটোয়ারী, সাব্বির হোসেন ও কাওসারকে হত্যা করে। ৫ আগস্ট যুবলীগের নেতা-কর্মীরা রাজশাহী মহানগরে আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম নামের দুজনকে হত্যা করে।
মাইনুলের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

মাইনুল হোসেন খানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১২ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশনের এক অনুষ্ঠানে তিনি আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করেন। আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য যুবলীগ নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ ও প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯ জুলাই মাইনুল নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে মিরপুর এলাকায় মহড়া দেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণসহ হামলা করেন। সেদিন বিকেলে তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচার গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।
মাইনুলের উপস্থিতিতে ও তত্ত্বাবধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যুবলীগসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মিরপুরে ৪ আগস্ট শাহরিয়ার হাসানসহ ১২ জনকে হত্যা, ৫ আগস্ট মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে হত্যা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সাদ্দামের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, সাদ্দাম হোসেন ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের এক জমায়েতে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি ও উসকানি দেন।
‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন’—ওবায়দুল কাদেরের এমন নির্দেশনা বাস্তবায়নে সারা দেশে ছাত্রলীগ নামধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্ররোচনা ও নির্দেশ দেন সাদ্দাম। এ ছাড়া তিনি আন্দোলন দমনে দলীয়ভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও অর্থ গ্রহণ করেন।
১৫ জুলাই সাদ্দামের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় বহিরাগত যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। এ হামলায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি, ঢাকা কলেজের কমিটির সদস্যরা সরাসরি জড়িত ছিলেন।
‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’—ওবায়দুল কাদেরের এমন প্ররোচনা ও নির্দেশনা মোতাবেক সাদ্দাম ছাত্রলীগকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন এবং তদারক করেন।
১৫ জুলাই সাদ্দাম ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। ১৬ জুলাই আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন সাদ্দাম। তাঁর এমন বক্তব্যের পর রাজধানীসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা চালায়। ১৬ জুলাই সারা দেশে ৬ জন নিহত হন। তার পরদিন সারা দেশে চার শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ১৮ জুলাই নির্বিচার গুলি করে, যাতে সারা দেশে ২৩ জন নিহত হন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সাদ্দামের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তদারকিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সারা দেশে হামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বিভিন্ন পরিকল্পনা করেন, নির্দেশনা দেন এবং অর্থ গ্রহণ করেন। ১৩ জুলাই মধুর ক্যানটিনে তিনি হিংসাত্মক, বিদ্বেষ ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি দেখান তিনি।
১৫ জুলাই আসিফ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য নির্দেশ দেন। তাঁর নেতৃত্বে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি, ঢাকা কলেজের কমিটির সদস্যরা হামলা চালান।
১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দাম আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার যে হুমকি দেন, তা সেখানে উপস্থিত থেকে সমর্থন করেন আসিফ। সেদিন সারা দেশে ছয়জন নিহত হন।
১৮ জুলাই ছাত্রলীগসহ অন্যদের হামলায় দেশে ২৩ জন নিহত হন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে আসিফের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তদারকিতে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সারা দেশে হামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা। ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে। সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।” জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর। সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন
জামালপুরে ট্রেনের ধাক্কায় জামাল উদ্দিন (৬৫) নামে এক মৎস্যজীবীর মৃত্যু হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পের একটি ভবনে লিফট ছিঁড়ে নিচে পড়ে তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
রাজধানী ঢাকার অলিগলি, আবাসিক এলাকার সড়ক, বাজারের প্রবেশমুখ এমনকি অধিকাংশ প্রধান সড়কে এখন চোখে পড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা।