জাতীয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচারের প্রত্যাবর্তন কি সম্ভব?

News সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ 0
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচারের প্রত্যাবর্তন কি সম্ভব?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচারের প্রত্যাবর্তন কি সম্ভব?

রাজনীতি মূলত মতের প্রতিযোগিতা, মানুষের আস্থা অর্জনের শিল্প এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন মতের প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগত বিদ্বেষে রূপ নেয়, বিতর্ক গালিগালাজে পরিণত হয়, ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখা শুরু হয়, তখন রাজনীতি তার নৈতিক ভিত্তি হারাতে থাকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতা অনেকাংশেই এই সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। প্রশ্ন তাই ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি আবার শিষ্টাচারের প্রত্যাবর্তন সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণতন্ত্র, সামাজিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ রাজনীতির ভাষা শেষ পর্যন্ত সমাজের ভাষাকেও প্রভাবিত করে। সংসদে যদি অসহিষ্ণুতা বাড়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি বিদ্বেষই রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে, তাহলে সেই প্রভাব পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং নাগরিক সম্পর্কেও ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শিষ্টাচারের ঐতিহ্য একেবারে অনুপস্থিত ছিল—এমন বলা যাবে না। স্বাধীনতার আগে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের রাজনীতি কিংবা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কেরও একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি ছিল। স্বাধীনতার পরও সংসদে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, কঠোর সমালোচনা হয়েছে; কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে থেকেছে। প্রবীণ রাজনীতিকদের মধ্যে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সংসদে তীব্র বিতর্কের পরও ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য বজায় ছিল।

কিন্তু গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক উপাদান হিসেবে নয়, বরং অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ভাষা ক্রমশ আক্রমণাত্মক হয়েছে, সংলাপের পরিবর্তে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে এবং সমঝোতার রাজনীতি দুর্বল হয়েছে।

রাজনীতিতে শিষ্টাচারের অবক্ষয়ের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, নির্বাচনকে ঘিরে অবিশ্বাস, সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, দলীয় আনুগত্যের অতিরিক্ত গুরুত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাজনমূলক প্রচারণা—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। রাজনৈতিক বক্তব্যে তথ্যের চেয়ে আবেগ, যুক্তির চেয়ে স্লোগান এবং নীতির চেয়ে ব্যক্তি-আক্রমণ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই বাস্তবতার একটি বড় ক্ষতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংলাপের সংকোচন। গণতন্ত্রে মতভেদ স্বাভাবিক; কিন্তু মতভেদকে যদি শত্রুতায় রূপ দেওয়া হয়, তাহলে সমাধানের পথ সংকুচিত হয়ে যায়। তখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোও দলীয় অবস্থানের বাইরে আলোচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্বের পরিণত গণতন্ত্রগুলোর অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র দেখায়। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা তীব্র বিতর্কে অংশ নেন, কিন্তু সংসদীয় আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। কানাডা, জার্মানি কিংবা নর্ডিক দেশগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সমঝোতার সংস্কৃতিও সমানভাবে বিদ্যমান। নির্বাচন শেষ হলে প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রের শত্রু নয়, জনগণের আরেকটি প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশেও কি এমন সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব, তবে সেটি কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারেরও প্রশ্ন।

শিষ্টাচার মানে দুর্বলতা নয়। ভিন্নমতের প্রতি সম্মান দেখানো মানে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসা নয়। বরং এটি আত্মবিশ্বাসী গণতন্ত্রের লক্ষণ। যে রাজনৈতিক দল নিজের যুক্তির ওপর আস্থা রাখে, সে প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে ভয় পায় না; বরং বিতর্কের মাধ্যমে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়।

রাজনীতিতে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। নেতাদের বক্তব্যই কর্মীদের আচরণের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি শালীন ভাষা ব্যবহার করেন, প্রতিপক্ষকে সম্মান দেখান এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলেন, তাহলে মাঠপর্যায়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতভাবে, নেতৃত্বের ভাষা যদি উত্তেজনাপূর্ণ হয়, তাহলে সেই উত্তেজনা দ্রুত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

সংসদকে আবারও কার্যকর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। সংসদে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা যত বাড়বে, রাজপথে সংঘাতের প্রয়োজন তত কমবে। সংসদ যদি জাতীয় সমস্যার সমাধানের প্রধান মঞ্চ হয়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক উত্তেজনাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে উত্তেজনা নয়, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ, ভুয়া তথ্য এবং চরিত্রহননের সংস্কৃতি মোকাবিলায় নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্বশীল মতপ্রকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষাব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিতর্ক, মতবিনিময়, সহনশীলতা এবং ভিন্নমত সম্মান করার সংস্কৃতি শেখানো না গেলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবেশও খুব বেশি বদলাবে না। গণতন্ত্র কেবল একটি নির্বাচন পদ্ধতির নাম নয়; এটি একটি নাগরিক সংস্কৃতি।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আলোচনা, মতামত ও জবাবদিহি থাকে, সেখানে শিষ্টাচারের চর্চাও তুলনামূলক বেশি হয়। অন্যদিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে মতবিরোধকে সহজেই অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়, যা পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে।

সুশীল সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোকেও রাজনৈতিক সংলাপের পরিবেশ তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দলীয় অবস্থানের বাইরে নীতিনির্ভর আলোচনা যত বাড়বে, রাজনীতির ভাষাও তত পরিণত হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।” রাজনীতিতে শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনার কাজও তেমনই কঠিন। কারণ এটি কেবল ভাষা পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তনের প্রশ্ন। ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা থাকবে, মতাদর্শের লড়াই থাকবে, কঠোর সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু সেই লড়াই যেন ব্যক্তিগত অপমান, বিদ্বেষ কিংবা সামাজিক বিভাজনের কারণ না হয়।

বাংলাদেশ এখন একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। অর্থনৈতিক রূপান্তর, তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ এবং বৈশ্বিক সংযোগ—সবকিছু মিলিয়ে রাজনীতিকেও নতুন ভাষা শিখতে হবে। সেই ভাষা হবে যুক্তির, তথ্যের, সহনশীলতার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার।

রাজনীতির ইতিহাস বলে, কোনো সমাজ চিরকাল সংঘাতের মধ্যে আটকে থাকে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতিও পরিবর্তিত হয়, যদি নেতৃত্ব সেই পরিবর্তনের সাহস দেখায় এবং নাগরিক সমাজ তা দাবি করে। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার প্রমাণ করেছে, তারা সংঘাতের চেয়ে স্থিতিশীলতা, বিদ্বেষের চেয়ে সহাবস্থান এবং প্রতিহিংসার চেয়ে উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

তাই প্রশ্নটি—বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচারের প্রত্যাবর্তন কি সম্ভব?—এর উত্তর নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর। যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতার পরিবর্তে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়, যদি যুক্তিকে স্লোগানের ওপরে এবং প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ওপরে স্থান দেওয়া যায়, তবে সেই প্রত্যাবর্তন শুধু সম্ভবই নয়, অনিবার্যও। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্যে নয়; ভিন্নমতের মধ্যেও একটি সভ্য, সহনশীল এবং মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মধ্যেই তার সর্বোচ্চ সাফল্য নিহিত।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। | drharun.press@gmail.com

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

Popular post
কাজীরহাটে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের অভিযোগ

শরীয়তপুরের কাজীরহাট এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা মাস্টার মোস্তফা কাজীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, প্রভাব খাটানো ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত হন মোস্তফা কাজী। এরপর থেকে এলাকায় বিভিন্ন জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে কাজীরহাট বাজারের দোকানপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মোস্তফা কাজী। এছাড়া কয়েক মাস আগে কাজীরহাটে একটি দোকান ক্রয়ের সময় ব্যবসায়ী সুমন তপাদারের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী আরও জানান, বি. কে. নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বিভিন্ন মানুষকে জমি সংক্রান্ত জটিলতায় ফেলে হয়রানি করার অভিযোগও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন মোস্তফা কাজী। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির ব্যানারে তার কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন অনেকে। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজ ভগ্নিপতি সিদ্দিক দেওয়ানের সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তফা কাজীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে শান্তি আলোচনা জোরালো করতে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক

ইউরোপের রাজধানী ব্রাসেলসে আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতারা একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন, যার মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা জোরালো করা। এই বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত আছেন। গত বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের কারণে সারা ইউরোপ এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ইউরোপীয় নেতারা এখন যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরিতে কাজ করছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, “আমরা যুদ্ধের মানবিক সংকট বুঝতে পারি এবং এখন আমাদের দায়িত্ব এটি দ্রুত শেষ করার পথ খোঁজা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।” এই বৈঠকে অস্ত্রবিরতি চুক্তি, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং পূর্ব ইউরোপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলো যুদ্ধ সমাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এগুলো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে পরীক্ষার চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশা

দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ক্রমবর্ধমান পরীক্ষার চাপ এবং পরিবারের পাশাপাশি সমাজের অযৌক্তিক প্রত্যাশা। এ দুটি কারণ মিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা।   ফলাফলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করা যেন শিক্ষার্থীর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ—সব জায়গা থেকেই উচ্চ ফলাফলের প্রত্যাশা তৈরি করছে মানসিক চাপের একটি অব্যক্ত বলয়। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাইহান কবির বলেন, “পরীক্ষায় নম্বর কম পেলে মনে হয়, শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। এটা সহ্য করা খুব কঠিন।” শুধু রাইহান নয়, দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা একই অভিজ্ঞতার কথা বলছে।   সামাজিক চাপ ও তুলনার সংস্কৃতি পরিস্থিতি করছে আরও জটিল পরীক্ষার নম্বর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এখন তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গর্ব বা অপমানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কে কোন কলেজে ভর্তি হলো, কে কতো পেল—এসব তুলনার চাপে পড়াশোনার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা তাবাসসুম বলেন, “প্রত্যাশা থাকা ভালো, কিন্তু তা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব সক্ষমতা উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা আত্মসম্মানবোধ নষ্ট করে দেয়। এ থেকেই জন্ম নেয় আত্মগ্লানি, হতাশা এবং মাঝে মাঝে আত্মহননের চিন্তা।”   জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ নিয়মিত মানসিক চাপে থাকে। এর মধ্যে ১২ শতাংশ বিষণ্নতায় ভোগে এবং বড় একটি অংশ কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই দিন পার করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, যা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে ক্ষতিকর।   সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, এবং পরিবারের ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ এই সমস্যার নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম হয়, সেখানে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষাকে কেবল ফলাফলের সীমায় না এনে একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা চাপ নয়, ভালোবাসা থেকে শিখবে, এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ প্রজন্ম।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ফসলের উৎপাদন হুমকিতে, কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কৃষিখাতকে চরমভাবে আঘাত করছে। অপ্রত্যাশিত আবহাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘদিন খরা এবং হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে।   চলতি মৌসুমেই অনেক জেলায় ধান, গম, ভুট্টা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, একদিকে যেমন আবহাওয়ার আচরণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সারের দাম, কীটনাশক ও বীজের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পোকার আক্রমণ ও রোগবালাইয়ের হারও বেড়ে গেছে। এই চাপে পড়ে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।   জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের পক্ষে বারবার ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠে আবার নতুনভাবে চাষাবাদ শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে দেখা গেছে, কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী ফসল বাদ দিয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও লাভজনক অন্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।   বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে এমন জাত ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে যা কঠিন জলবায়ু পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে।   দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কৃষি খাতকে সচল রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিন শুরু, লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া টাইগাররা

কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব ময়দানে চলমান দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ব্যাট হাতে আবারও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে টাইগাররা সংগ্রহ করে মাত্র ২২০ রান, যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল শোয়াড ইসলাম (৪৬), মুশফিকুর রহিম (৩৫) ও লিটন দাস (৩৪)। শ্রীলঙ্কার বোলাররা শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি করে রাখে। ডেবিউ করা স্পিনার সোনাল দিনুষা ৩ উইকেট নিয়ে আলো ছড়ান, আর আসিথা ফার্নান্দো ও বিষ্ণু ফার্নান্দো নেন ২টি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসের জবাবে দ্বিতীয় দিন সকালে শ্রীলঙ্কা উদ্বোধনী জুটি থেকে ভালো সূচনা পায়। ১৩.১ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। ওপেনার পাথুম নিসান্কা ৩৩ এবং লাহিরু উদারা ২৮ রানে অপরাজিত রয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিং শুরু করলেও এখনও পর্যন্ত সাফল্যের দেখা মেলেনি। শ্রীলঙ্কা এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকে ১৫৮ রানে পিছিয়ে আছে, হাতে রয়েছে সকল উইকেট। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রভাব এই টেস্টটি ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হওয়ায় দুই দলের জন্যই পয়েন্টের লড়াই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্টে পরাজিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিরিজে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচ জিততেই হবে। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ স্লো পিচে বাংলাদেশ বোলারদের আরও পরিকল্পিত বোলিং করতে হবে। দ্রুত উইকেট তুলে না নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা বড় লিড নিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেবে টাইগারদের। ফিল্ডিংয়ে মনোযোগ এবং টাইট বোলিংয়ের মাধ্যমেই দ্বিতীয় ইনিংসে নিজেদের ফিরে পাওয়ার আশায় বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (দিন ২, প্রথম সেশন পর্যন্ত): বাংলাদেশ (১ম ইনিংস): ২২০/১০ শ্রীলঙ্কা (১ম ইনিংস): ৬২/০ (১৩.১ ওভার) নিসান্কা: ৩৩*, উদারা: ২৮* বাংলাদেশ বোলার: তাইজুল, মিরাজ – উইকেটহীন

জাতীয়

View more
স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি জরুরি: ব‌্যা‌রিস্টার আনিস
স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি জরুরি: ব‌্যা‌রিস্টার আনিস

দেশের স্থিতিশীলতা নি‌শ্চিত কর‌তে আই‌নের শাস‌নের পাশাপা‌শি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি জরুরি ব‌লে মন্তব‌্য ক‌রে‌ছেন জাতীয় পার্টি একাং‌শের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

News অক্টোবর ৬, ২০২৬ 0
রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা: মুখে কালো কাপড় বেঁধে চবিসাসের প্রতিবাদ

রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা: মুখে কালো কাপড় বেঁধে চবিসাসের প্রতিবাদ

বই ছাপায় ২৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ, এনসিটিবিতে অভিযান

বই ছাপায় ২৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ, এনসিটিবিতে অভিযান

ময়মনসিংহে ওয়ালটনের ব্যতিক্রমী চাকরির মেলা

ময়মনসিংহে ওয়ালটনের ব্যতিক্রমী চাকরির মেলা

বিদ্যুতায়িত টিনের বেড়ায় প্রাণ গেল স্কুলছাত্রীর 
বিদ্যুতায়িত টিনের বেড়ায় প্রাণ গেল স্কুলছাত্রীর 

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার চর বিনোড়া গ্রামে বিদ্যুতায়িত টিনের বেড়ার স্পর্শ লেগে পূর্ণিমা আক্তার (১৩) নামে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। 

News অক্টোবর ৬, ২০২৬ 0
প্রেমিকের বাসায় গিয়ে অসুস্থ তরুণী, হাসপাতালে মৃত্যু  

প্রেমিকের বাসায় গিয়ে অসুস্থ তরুণী, হাসপাতালে মৃত্যু  

বিরোধীদলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়: গোলাম পরওয়ার

বিরোধীদলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়: গোলাম পরওয়ার

নড়াইলে ৫ মামলার আসামি আরাফাতকে কুপিয়ে হত্যা

নড়াইলে ৫ মামলার আসামি আরাফাতকে কুপিয়ে হত্যা

0 Comments